📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

📄 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম


بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ وَكَفَى وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِينَ اصْطَفَى، خُصُوصًا عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدِ الْمُصْطَفَى مَنْ يَهْدِيْهِ اهْتَدَى
হামদ ও সালাতের পর
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনচরিত —যা শোনা ও শোনানোর জন্যই এই সভার আয়োজন—মূলত ইসলামী শরীআত ও কুরআনে কারীমের বাস্তব রূপেরই অপর নাম। আপন আঁচলে যা মানবজীবনের প্রতিটি যুগ ও অধ্যায়ের জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা রাখে, যা ছাড়া অন্য কোনো মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থায় মানুষের সফলতা ও কল্যাণ এককথায় অসম্ভব। আর সেগুলি পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার মধ্যে রয়েছে দ্বীন-দুনিয়ার চূড়ান্ত সফলতা।
জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ও তদসংশ্লিষ্ট নির্দেশনাবলির দৃষ্টিকোণ থেকে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন গুণ ও অবস্থান রয়েছে। প্রতিটি গুণ ও অবস্থানই স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে।
কিন্তু এটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, কোনো এক সম্মেলনে বা কোনো এক প্রবন্ধে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো একটি বৈশিষ্ট্য বা মর্যাদাকে পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলার সাধ্য কারওরই নেই। বড়োজোর এতটুকু করা সম্ভব যে, এর একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা উপস্থাপন করা যাবে।
আমি এ প্রবন্ধের শিরোনাম দিয়েছি “বিশ্বশান্তির প্রেক্ষিত”। এই বিষয়ে অধম নিজ সক্ষমতা ও জানাশোনার আলোকে কিছু আলোচনা করছি।
দুনিয়ার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে ছোট থেকে বড়, শিশু থেকে বৃদ্ধ, অজ্ঞ-মূর্খ থেকে নিয়ে বিজ্ঞ জ্ঞানী ও বড়মাপের দার্শনিক পর্যন্ত প্রতিটি ব্যক্তির সকল দৌড়ঝাপ ও মেহনত-সাধনায় যদি একটু চিন্তা করা হয়, তাহলে এটাই বের হয়ে আসবে যে, চেষ্টা ও মেহনতের পন্থা যদিও সবার ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু সবার অভিন্ন লক্ষ্য এক মোহনায় এসে মিলে যায়। তা হলো, “শান্তি ও নিরাপত্তার জীবন লাভ”।
এদিকে কোনো মতাদর্শের শুদ্ধতা বা ভ্রান্তি এবং কোনো ব্যবস্থার সৌন্দর্য ও কদর্যতা যাচাইয়ের সহজ পন্থা এই যে, মূল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে দেখা হবে যে, এই মতাদর্শ ও ব্যবস্থা গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সক্ষম কি না? যদি পৌঁছায়, তাহলে পুরোপুরি নাকি অর্ধেক? যে মতাদর্শ ও ব্যবস্থা পরিপূর্ণরূপে গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সক্ষম, সেটিই সঠিক এবং সিরাতে মুসতাকীম। আর যা গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সক্ষম নয় বা গন্তব্য থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়, তা বাতিল ও ভ্রান্ত। আর যা কোনোরকমে গন্তব্যের কাছাকাছি নিয়ে যায় তা অপূর্ণাঙ্গ।
এই মূলনীতিকে সামনে রেখে আসুন পৃথিবীর প্রাচীন ও আধুনিক মতাদর্শ ও ব্যবস্থাসমূহের উপর দৃষ্টিপাত করা যাক। এরপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাস্তব জীবন ও তাঁর শিক্ষা অধ্যয়ন করা হোক। সবগুলোকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হোক যে, এগুলোর মধ্যে কোন মতাদর্শ এবং কোন জীবনব্যবস্থাটি সমগ্র দুনিয়া এবং গোটা মানবজাতিকে পূর্ণ শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও প্রশান্তি দানে সফল।
যদি মন-মস্তিষ্ককে চারপাশের প্রভাব ও সব ধরনের পক্ষপাত থেকে মুক্ত রেখে এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে নির্দ্বিধচিত্তে বলা যায়, এর একটিমাত্র উত্তরই রয়েছে। তা হলো, বিশ্ব শান্তির নিশ্চয়তা দানকারী মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা কেবল রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ ও তাঁর শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনায় যাবার আগে এ কথাটি মনে রাখা দরকার যে; কোনো অন্যায় হত্যাকারীকে কিসাসের বিধান অনুযায়ী হত্যা করা, কোনো চোরকে সাজা দেওয়া, বদমাইশকে শায়েস্তা করা, সংঘবদ্ধ ডাকাতদলকে দমন করা বা খতম করে দেওয়ার মধ্যে বাহ্যিকভাবে যদিও মনে হয় যে, কিছু মানুষকে কষ্ট দেওয়া ও হত্যা করা হচ্ছে, কিন্তু এটা কোনো বিবেকবান মানুষের কাছেই অন্য সবার শান্তি ও নিরাপত্তার পক্ষে সাংঘর্ষিক তো মনে হবেই না; বরং তা শান্তি-সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার একমাত্র উপায় বিবেচিত হবে এবং হয়। যদি কতিপয় অপরাধপ্রবণ লোককে শাস্তি দেওয়া না হয়, তাহলে সমগ্র মানবতার শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং পুরো দুনিয়া নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতায় ভুগবে।
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিহাদ-গাযওয়া, তাঁর প্রতিষ্ঠিত হুদুদ ও তাযীর (দণ্ড বিধি) এ সবকিছুর ভিত্তি এই বাস্তবতার উপরেই, যা সমাজ সংশোধনের সমস্ত উপায় ব্যর্থ হওয়ার পরই সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে।
এখন মূল প্রসঙ্গ বিশ্লেষণে আসা যাক।

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা

📄 মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা


আমি পূর্বে দুটি শব্দ ব্যবহার করেছি ১. মতাদর্শ। ২. জীবনব্যবস্থা। মতাদর্শ বলা হয়—যে বিশ্বাস ও চেতনাকে মানুষ সঠিক-সত্য বলে মনে করে এবং যার অধীনে জীবনের উদ্দেশ্যকে পরিচালনা করে। আর জীবনব্যবস্থা বলা হয়—ওই জীবনযাত্রা যার মাধ্যমে উদ্দেশ্য সাধন করা হয়।
এই দুটো বিষয়ের শুদ্ধতা ও ভ্রান্তির উপর পৃথিবীর সকল জাতির শুদ্ধতা ও ভ্রান্তি নির্ভরশীল। যার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা ভ্রান্ত, যে ভুল জিনিসকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়েছে, তার কর্মপদ্ধতি যতই মজবুত ও যৌক্তিক হোক না কেন, সে ভালো কোনো ফলাফলে পৌঁছতে পারবে না। আর যার মতাদর্শ ও লক্ষ্য সঠিক, কিন্তু কর্মপদ্ধতি ভুল ও অনুপযোগী, তাহলে সেও নিজের বেআমলীর দরুন ওই ফলাফল লাভ করবে না, যা শুদ্ধ বিশ্বাস ও মতাদর্শের কারণে লাভ করতে পারত।

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 ইসলামী মতাদর্শের তিনটি মূলনীতি

📄 ইসলামী মতাদর্শের তিনটি মূলনীতি


যে ইসলামী মতাদর্শ নিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন, সেটি তিনটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। ১. তাওহীদ (একত্ববাদ)। ২. রিসালত (নবী প্রেরণ)। ৩. আখেরাত (পরকাল)।
তাওহীদের সারকথা হলো—সমস্ত সৃষ্টি জগতের খালিক ও মালিক প্রয়োজন পূরণকারী স্রেফ আল্লাহকে মানতে হবে। তাঁর বিশেষ সিফাতগুলো, যেমন : ইলম, কুদরত, সৃষ্টি, তাকদীর ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনো মাখলুককে শরীক করবে না বা তাঁর সমকক্ষ ভাববে না। এই বিশ্বাস রাখবে যে, পৃথিবীতে যা-কিছু ঘটে, সবকিছু তাঁরই ইচ্ছা ও হুকুমে ঘটে। তাঁর হুকুম ছাড়া অণু-পরমাণুও এদিকসেদিক হয় না। সমগ্র পৃথিবীজুড়েই তাঁর রাজত্ব। সর্বত্রে তাঁরই হুকুম ও আইন পালনীয়। এর বিপরীতে অন্য কোনো হুকুম বা আইন পালনীয় নয়; বরং তা পরিত্যাজ্য। তবে তিনি দয়াপরবশ হয়ে মানুষের জন্য বৈধতার বিশাল এক পরিধি রেখে দিয়েছেন, যেখানে মানুষকে নিজ নিজ স্থান-কালের চাহিদানুযায়ী আইনপ্রণয়নের অধিকার দেওয়া হয়েছে।
যখন তাওহীদের বিশ্বাস মানুষকে এ বার্তা দেয় যে, সমগ্র পৃথিবীর অধিপতি এবং পালনকর্তা একজনই, তাঁর কথাই শিরোধার্য, তাঁর মর্জিবিরোধী কোনো কাজ মানেই মানবতাবিরোধী কাজ, তখন এ থেকে রিসালাতের বিশ্বাসও আপনা-আপনি সাব্যস্ত হয়। কেননা আল্লাহ তাআলা তো দূরের কথা, কোনো মানুষের পছন্দ-অপছন্দও অন্য মানুষ কেবল বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে জানতে পারে না, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে জানানো হয়। আর এ তো স্পষ্ট যে, খোদায়ী বিধান কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে দেওয়ার পরই জানা সম্ভব। আর মানুষ কখনোই এর উপযুক্ত নয় যে, আল্লাহ তাআলা সরাসরি তাকে সম্বোধন করবেন। এজন্যই রাসূলের “মধ্যস্থতার” প্রয়োজন, যিনি আল্লাহর হুকুম বর্ণনা করবেন এবং সে মোতাবেক আমল করার এমন পদ্ধতি বলে দেবেন, যা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অনুযায়ী হবে। পাশাপাশি তার প্রতিটি কথা ও কাজ আল্লাহ তাআলার হুকুমের মুখপাত্র হবে।
পূর্বের দুই আকীদা থেকে যখন এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আল্লাহর হুকুমের অনুসরণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণিত পদ্ধতি অনুযায়ী করা ফরয, এর বিপরীত করা অন্যায। তখন এর মধ্য দিয়ে তৃতীয় বিশ্বাস তথা আখেরাতের বিশ্বাস অবধারিত হয়, যেখানে মানুষের ভালো-মন্দ কর্মের হিসাব হওয়া এবং এর ভিত্তিতে শাস্তি ও পুরস্কার লাভের বিষয়টি যৌক্তিকভাবেও আবশ্যক হয়। নচেৎ হুকুম-আহকাম ও রাসূল প্রেরণ অনর্থক সাব্যস্ত হবে।
মোটকথা, এই তিন মৌলিক বিশ্বাস একটি অপরটির সাথে জড়িত। তিনওটির মূল বুনিয়াদ তাওহীদের বিশ্বাস। এটিই মূলত মানুষের কল্যাণ ও সফলতা, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং স্থিরতা ও স্থিতিশীলতার উৎস। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে যেহেতু ইসলামী আকীদার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ মুখ্য নয়, তাই সংক্ষেপে এটুকুই যথেষ্ট মনে করছি।

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 জীবনব্যবস্থা

📄 জীবনব্যবস্থা


এটা খুবই স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াকে যে জীবনব্যবস্থা দান করেছেন, সেটি তাওহীদের বিশ্বাস ও আল্লাহর ইবাদতের ভিত্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি তার ব্যাপ্তি ও ব্যাপকতার মধ্যে ওই সকল জীবন-উপকরণও থাকতে হবে, যা দুনিয়াতে একজন মানুষের সুস্থ ও শান্তিতে সম্মানের সাথে জীবনযাপন করার জন্য প্রয়োজন হয়। যেন ইসলামী জিন্দেগী এমন এক শৃঙ্খল, যার এক মাথা সৃষ্টি জগতের প্রতিপালকের কাছে, আরেক মাথা সৃষ্টিজগতে। এই শৃঙ্খল ও সম্পর্ককেই পরিভাষায় দ্বীন বা ধর্ম বলা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00