📄 পঞ্চমত, শরিয়তসম্মত পন্থায় ওয়াকফ করা
যেসব পন্থায় নেকির পাল্লা বৃদ্ধি করা যায়, দুনিয়াতে আখিরাতের আমল জারি রাখা যায়, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওয়াকফ করা।
ওয়াকফ
কোনো জিনিসের স্বত্ব নিজের করে রেখে সবার জন্য তা থেকে উপকার গ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত করে দেওয়াই হলো ওয়াকফ। ১৭১
এখানে 'স্বত্ব বা মূল জিনস' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এমন সব বস্তু, যেগুলো থেকে উপকার গ্রহণ করলেও তার মূলটা অবশিষ্ট থেকে যায়। যেমন: বাড়ি, দোকানপাট, বাগান ইত্যাদি।
আর 'উপকার গ্রহণ' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো উক্ত মূল বস্তু থেকে অর্জিত ফলাফল সকলে ভোগ করা। যেমন: বাড়ির ভাড়া, বাগানের ফল ইত্যাদি।
আর এ সংজ্ঞাটা রাসুল-এর হাদিসের সাথে সামঞ্জস্যশীল। তিনি উমর-কে বলেছিলেন:
فَاحْبِسْ أَصْلَهَا، وَسَبِّلِ الثَّمَرَةَ
'তুমি স্বত্ব তোমার কাছে রেখে দাও আর ফল সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দাও।' ১৭২
ওয়াকফ শরিয়তসম্মত হওয়ার দলিল
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنفِقُوا مِن শَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ
'যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে খরচ করবে, ততক্ষণ তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে না। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, আল্লাহ তা জানেন।' ১৭৩
তথা তোমরা সদাকা হিসেবে যা ব্যয় করবে। ১৭৪ ওয়াকফ এমনই একটা সদাকা, এটি সদাকার ওপর ন্যস্ত।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা রুকু করো, সিজদা করো, তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত করো এবং সৎ কাজ সম্পাদন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ১৭৫
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন: إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٌ جَارِيَةٌ، وَعِلْمُ يُنتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٌ صَالِحٌ يَدْعُو لَهُ.
'মানুষ মারা গেলে তার আমলের সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি দরজা খোলা থাকে। (আমল-তিনটি হলো) সদাকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম, তার জন্য দুআকারী নেক সন্তান।' ১৭৬
ইমাম নববি বলেন:
'হাদিসে উল্লেখিত সদাকায়ে জারিয়া হলো, ওয়াকফ করা।'১৭৭
ওয়াকফ শরিয়তসম্মত হওয়ার তাৎপর্য
১. ওয়াকফকে এমন অর্থ জোগানের উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়, যার দ্বারা বিশেষভাবে ও ব্যাপকভাবে মানুষ উপকৃত হতে পারে। ওয়াকফ এমন একটি পাত্রের ন্যায়, যাতে আল্লাহর বান্দাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এটি এমন একটি ঝর্ণার ন্যায়, যা শুধু কল্যাণকর জিনিসই উৎপন্ন করে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ওয়াকফের উৎস হচ্ছে মুসলমানদের হালাল পন্থায় উপার্জিত সম্পদগুলো, তাদের মালিকানায় থাকা সম্পত্তি।
২. ওয়াকফকে সর্বাধিক সামাজিক কল্যাণকর কাজ হিসেবে ধরা হয়। ওয়াকফভিত্তিক কল্যাণকর কাজের প্রভাব সমাজে অনেক বেশি প্রতিফলিত হয়। এটি বিরাট উন্নয়নশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ইসলামি ইতিহাসের শত শত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানতে ও বুঝতে পারি যে, ওয়াকফের মাধ্যমে অর্থনৈতিক, সামাজিক, জ্ঞানভিত্তিক, স্বাস্থ্যবিষয়ক ও সামষ্টিক অনেক উপকার সাধিত হয়, এটি উন্নতি ও প্রগতিতে অনেক বড় ভূমিকা রেখে এসেছে সুদীর্ঘ কাল থেকে। মসজিদ, মাদরাসা, লাইব্রেরি, হাসপাতাল ইত্যাদির তত্ত্বাবধানে এর ভূমিকা অনেক ব্যাপক। যার দ্বারা বিশেষ শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও সাধারণ মানুষ উপকার পেতে সক্ষম হয়। তা ছাড়া ওয়াকফভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক আন্দোলন, কৃষি ও শিল্পের জাগরণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন মৌলিক অবকাঠামো যেমন: রাস্তা, সেতু, পুল তৈরি করার জোগান পাওয়া যেতে পারে।
ওয়াকফের সামাজিক গুরুত্ব ও উপকারিতাও রয়েছে। যেমন: পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিকভাবে একে অন্যের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয় ওয়াকফের কল্যাণে। মিসকিনদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, দরিদ্রদের সহায়তা করা, যুবকদের বিবাহের ব্যবস্থা করার মতো কাজগুলো করা যায় এর মাধ্যমে। যেমন: প্রতিবন্ধী, মাজুর, অক্ষমদের বিশেষ যত্ন নেওয়া। মৃত ব্যক্তিদের কাফন-দাফন ও কবরস্থ করার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
৩. ওয়াকফের মাধ্যমে ইসলামি শরিয়াহর জ্ঞানের দিকটি অনেক মজবুত ও শক্তিশালী হয়। এ সকল কার্যক্রমকে ধারাবাহিক করা যায়। যার ওপর ইসলামি দাওয়াতের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। ওয়াকফের ফলে মুসলিমরা ইসলামি জ্ঞানের দিগন্তে বড় ধরনের উপকার হাসিল করতে সক্ষম হবে; একটি ইলমি আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হবে। ওয়াকফের মাধ্যমে মুসলিমদের জন্য অনেক বিরাট ইলমি উপকার, ইসলামি উত্তরাধিকার পাওয়ার সুযোগ হয়েছে। আমরা পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে এমন সৎকর্মশীল আলিমদের দেখতে পাই, যাদের অবদানের গৌরবে পৃথিবীর ইতিহাস আজও জ্বলজ্বল করছে।
৪. ওয়াকফ মুসলিম উম্মাহর মনে পারস্পরিক দায়িত্বভার গ্রহণের মানসিকতা নিশ্চিত করে। সামাজিক ভারসাম্য আনয়ন করে। তা ছাড়াও এর ফলে দরিদ্রদের অবস্থার উন্নতি হয়, দুর্বলরা শক্ত-সমর্থ হয় এবং অক্ষম লোকেরা সাহায্য প্রাপ্ত হয়।
৫. ওয়াকফ উম্মাহর ব্যাপক কল্যাণ সাধন করে, তাদের বহু প্রয়োজন পূর্ণ করে। উন্নতি ও প্রগতিতে সাহায্য করে। ওয়াকফ ইলমি গবেষণা- অধ্যয়নের মাধ্যমে বিকশিত হতে সাহায্য করে।
৬. ওয়াকফের মাধ্যমে সম্পদের স্থায়িত্ব ও সে সম্পদ থেকে উপকারিতা পাওয়ার সময়কাল বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ দিক থেকে সম্পদের উপকারিতা কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। সম্পদ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে— এমন লোকদের থেকে ধন-সম্পদ সুরক্ষিত থাকে। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম উপকার লাভ করতে থাকে, আর ওয়াকফকারীর আমলনামায় সাওয়াব লেখা হতে থাকে।
টিকাঃ
১৭১. আল-কাফি: ২/২৫০
১৭২. সুনানুন নাসায়ি: ৩৬০৪
১৭৩. সুরা আলি ইমরান: ৯২
১৭৪. তাফসিরুত তবারি: ৬/৫৮৭
১৭৫. সুরা আল-হজ: ৭৭
১৭৬. সহিহু মুসলিম : ১৬৩১
১৭৭. শারহুন নববি আলা মুসলিম: ১১/৮৫