📘 শেষ বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু উত্তম নিদর্শন 📄 চতুর্থত, মানুষকে ভালো কাজের জন্য প্রস্তুত করা

📄 চতুর্থত, মানুষকে ভালো কাজের জন্য প্রস্তুত করা


আপনার চিন্তা-ভাবনা যেন এমন হয় যে, আপনি নিজ প্রচেষ্টায় নিজের চেয়েও ভালো কিছু নেককার মানুষ তৈরি করে যাবেন। এটাই কুরআনের পথ-নির্দেশনা।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

وَوَاعَدْنَا مُوسَى ثَلَاثِينَ لَيْلَةً وَأَتْمَمْنَاهَا بِعَশْرٍ فَتَمَّ مِيقَاتُ رَبِّهِ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً وَقَالَ مُوسَى لِأَخِيهِ هَارُونَ اخْلُفْنِي فِي قَوْمِي وَأَصْلِحْ وَلَا تَتَّبِعْ سَبِيلَ الْمُفْسِدِينَ

'আর আমি মুসাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি ত্রিশ রাত্রির এবং সেগুলোকে পূর্ণ করেছি আরও দশ যোগ করে। এভাবে চল্লিশ রাতের মেয়াদ পূর্ণ হয়ে গেছে। আর মুসা তাঁর ভাই হারুনকে বলেছিলেন, “আমার সম্প্রদায়ে তুমি আমার প্রতিনিধি হিসেবে থাকো। তাদের সংশোধন করতে থাকো এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ কোরো না।”'১৬৩

সুন্নাহর নির্দেশনাও এমনই- فَقَدْ أَتَتْ امْرَأَةً رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ فَكَلَّمَتْهُ فِي শَيْءٍ، فَأَمَرَهَا بِأَمْرٍ، فَقَالَتْ: أَرَأَيْتَ يَا رَسُولَ اللهِ، إِنْ لَمْ أَجِدُكَ؟ قَالَ: إِنْ لَمْ تَجِدِينِي، فَأْتِي أَبَا بَكْرٍ

'এক মহিলা রাসুল ﷺ-এর দরবারে এসে কোনো একটি বিষয়ে তাঁর সাথে কথা বলেছেন। রাসুল ﷺ তাকে একটি কাজের আদেশ করলেন। তখন মহিলাটি বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, যদি আপনাকে না পাই? (তাহলে কী করব?)” রাসুল ﷺ বললেন, “আমাকে না পেলে আবু বকরের নিকট আসবে।”১৬৪

হুমাইদি ইবরাহিম বিন সাআদ -এর সূত্রে বৃদ্ধি করে বলেন, কেমন যেন এ মহিলা মৃত্যুর প্রতি ইঙ্গিত করছিলেন।

রাসুল ﷺ মুতার যুদ্ধে জাইদ বিন হারিসা -কে আমির নির্বাচন করলেন এবং বললেন: إِنْ قُتِلَ زَيْدُ فَجَعْفَرُ ، فَإِنْ قُتِلَ جَعْفَرُ فَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ، وعقد لهم لواء أبيض، ওدفعه إلى زيد بن حارثة

'যদি জাইদ শহিদ হয়, তাহলে জাফর দায়িত্ব নেবে। যদি জাফর শহিদ হয়, তাহলে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহাহ দায়িত্ব নেবে। তাদের জন্য একটি সাদা পতাকা নির্বাচন করে রাসুল ﷺ তা জাইদ বিন হারিসা-এর কাছে অর্পণ করলেন।'১৬৫

রাসুল ﷺ যখনই কোনো যুদ্ধে বের হতেন, তখন তিনি মদিনায় কোনো একজন সাহাবিকে নিযুক্ত করে যেতেন। তাদের সংখ্যা ১১ জনেরও বেশি- সা'দ বিন উবাদা, জাইদ বিন হারিসা , বশির বিন আব্দুল মুনজির, সিবা' আল-গিফারি, উসমান বিন আফফান, ইবনে উম্মে মাকতুমা, আবু জার গিফারি, আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল্লাহ বিন উবাই, নুমাইলা আল- লাইসি, কুলসুম বিন হুসাইন, মুহাম্মাদ মাসলামা প্রমুখ।

আলকামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ-এর সাথে বসে ছিলাম। খাব্বাব এসে বললেন, 'ওহে আবু আব্দুর রহমান, আপনি যেভাবে তিলাওয়াত করেন, এই যুবকেরা সেভাবে তিলাওয়াত করতে পারে?'

তিনি বললেন, 'আপনি ইচ্ছা করলে এদের কাউকে আপনাকে পড়ে শুনাতে বলেন।'

খাব্বাব বললেন, 'হ্যাঁ। হে আলকামা, তুমি পড়ো।'

আলকামা বলেন, 'আমি সুরা মারইয়ামের ৫০ আয়াত পাঠ করলাম। অতঃপর ইবনে মাসউদ বললেন, “কেমন মনে করছেন?”

খাব্বাব বললেন, “সুন্দর পড়েছে।”

আব্দুল্লাহ বললেন, “আমি যা-ই পড়ি, সেও তা-ই পড়ে।”১৬৬

সিয়ার গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, আলকামা অত্যন্ত সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন।

আবু হামজা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাবাহ আবুল মুসান্নাকে বললাম, 'আপনি কি আব্দুল্লাহ-কে দেখেননি?'

তিনি বললেন, 'দেখেছি তো বটেই। বরং আমি তার সাথে তিনবার হজ করেছি।'

তিনি বলেন, 'আব্দুল্লাহ ও আলকামা লোকদের দুটি শ্রেণিতে দাঁড় করাতেন। অতঃপর আব্দুল্লাহ একজনকে কিরাআত পড়ালেন এবং আলকামা অন্য একজনকে কিরাআত শেখালেন। শেখানো শেষ হলে, তখন তারা শরিয়তের বিধানাবলি, হালাল, হারাম ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করতেন। যদি তুমি আলকামাকে দেখতে, তবে আব্দুল্লাহ-কে না দেখাতে তোমার কোনো অসুবিধে হতো না। কারণ তারা দুজন বৈশিষ্ট্য ও নিদর্শনে মানুষের মাঝে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যশীল ছিলেন।

একইভাবে ইবরাহিম নাখয়িকে দেখলে আলকামাকে না দেখাতে তোমার কোনো ক্ষতি হতো না। তাদের দুজনেরও বৈশিষ্ট্যে বেশ মিল ছিল। ১৬৭

আ'মাশ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

'আমি যখন যুবক ছিলাম, তখন ইবরাহিম আমাকে একটি ফরজের ব্যাপারে বললেন, “এর হিফাজত করো। হয়তো তুমি এর সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”'১৬৮

আবু হানিফা ও তাঁর ছাত্র আবু ইউসুফ

ইয়াকুব বিন ইবরাহিম আবু ইউসুফ আল-কাজি বলেন :

'আমার বাবা আবু ইবরাহিম বিন হাবিব আমার ছোটবেলায়ই ইনতিকাল করেন। আর আমাকে মায়ের কোলে রেখে গেলেন। মা আমাকে কোনো এক প্রাসাদে কাজ করার জন্য রেখে আসলেন। কিন্তু আমি প্রাসাদের কাজ ছেড়ে আবু হানিফা-এর ইলমি হালাকায় চলে যেতাম। সেখানে বসে তাঁর দরস মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করতাম। আমার মা আমার পেছনে পেছনে আবু হানিফা-এর হালাকা পর্যন্ত আসতেন। তারপর হাত ধরে আমাকে আবার প্রাসাদের দিকে নিয়ে চলতেন। ইলমের প্রতি আমার আগ্রহ এবং মজলিসে নিয়মিত উপস্থিতির দরুন আবু হানিফা আমার খোঁজখবর নিতেন। অবশেষে আমার মায়ের কাছ থেকে পালিয়ে আসার দিন যতই বৃদ্ধি পেতে লাগল, তখন তিনি আবু হানিফা-কে বললেন, “এই বাচ্চার ভ্রান্তির জন্য আপনিই দায়ী। এ একটি এতিম শিশু। তার কিছুই নেই। আমি আমার সুতা কাটার উপার্জনের অর্থ থেকে তার খাবারের ব্যবস্থা করি। আমার ইচ্ছা ছিল সে এক দানিক হলেও রোজগার করে নিজের উপকার করবে।" আবু হানিফা তাকে বললেন, "হে অস্থিরচিত্তা মা! আপনি চলে যান। সে এখানে শিখবে এবং পেস্তা বাদামে মিশ্রিত ফালুদা খাবে।” অতঃপর তিনি আবু হানিফা-কে এ কথা বলতে বলতে চলে গেলেন যে, “আপনি হচ্ছেন একজন বুড়ো। আপনার মতিভ্রম হয়েছে, মাথাই বিগড়ে গেছে।” এরপর থেকে আমি তাঁর সাথে লেগে ছিলাম। ফলে আল্লাহ তাআলা আমাকে ইলম দিয়ে উপকৃত করেছেন এবং উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। এমনকি আল্লাহ আমাকে কাজির দায়িত্ব অর্পণ করলেন। আমি রশিদের সাথে বসতাম এবং তার সাথে তার দস্তরখানে খানা খেতাম। অতঃপর যখন মাঝে মাঝে বাদশাহ হারুনের কাছে ফালুদা আনা হতো, তখন তিনি আমাকে বলতেন, “হে ইয়াকুব, এখান থেকে খান। কারণ প্রতিদিন আমাদের জন্য এমন খাবার তৈরি করা হয় না।” আমি তাকে বললাম, “হে আমিরুল মুমিনিন! এটা কী? বাদশাহ বলল, এটা হচ্ছে পেস্তা বাদামের মিশ্রণে তৈরি ফালুদা।” এ কথা শুনে আমি হেসে উঠলাম। তিনি বললেন, "আপনি হাসছেন কেন?” আমি কিছু না বলে তার জন্য দুআর বাক্য উচ্চারণ করে বললাম, “ভালো, আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন আমিরুল মুমিনিন।” তিনি বললেন, “ব্যাপারটি আমাকে বলুন।” তিনি শোনার জন্য জেদ ধরে বসলেন। এবার আমি তাকে সম্পূর্ণ ঘটনা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুলে বললাম। তিনি শুনে আশ্চর্য হলেন এবং বললেন, “আমার জীবনের শপথ! ইলম মানুষকে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে এবং দুনিয়া-আখিরাতে প্রভূত উপকার দান করে। এরপর তিনি আবু হানিফার জন্য রহমতের দুআ করলেন এবং বললেন, “তিনি তাঁর বুদ্ধির চোখ দিয়ে এমন কিছু দেখতেন, যা সাধারণ চোখ দিয়ে দেখা যায় না।”১৬৯

একজন আলিম তাঁর ছাত্রদের যেভাবে ভবিষ্যতের কান্ডারি আলিম হিসেবে তৈরি করতে পারবেন

একজন আলিম অবশ্যই তার ছাত্রদের সূক্ষ্ম গবেষণা ও তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের উৎসাহ দেবেন। তারা শাইখের সামনে গভীর মনোযোগের সাথে এ গবেষণা পাঠ করবে। যেন কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে তা সমাধান করে নিতে পারে। যাতে তার এই জ্ঞান থেকে সকলেই উপকৃত হতে পারে।

উত্তাজ ছাত্রদের বিভিন্ন বিষয়ে সমাধান জিজ্ঞেস করবেন এবং এর সঠিক উত্তর দিতে উৎসাহ দেবেন। তাদের মতামতগুলো মনোযোগ সহকারে শুনবেন। কোনোভাবেই তা অবজ্ঞা করবেন না। যেমনিভাবে নবিজি কখনো কখনো তাঁর সাহাবিদের বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞেস করতেন।

イবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ক্বলা রাসুলুল্লাহি ﷺ: ইয়াওমান লি আসহাবিহি: আখবিরুনি আন শাজারাতিন... 'একদিন রাসুল তাঁর সাহাবিদের বললেন, “আমাকে তোমরা এমন একটি গাছের কথা বলো—যার দৃষ্টান্ত একজন মুমিনের মতো...!” অতঃপর রাসুল বলে দিলেন যে, সেটা হলো খেজুর গাছ। ১৭০

ছাত্রদের গবেষণা পদ্ধতি শেখানো, দলিলসংক্রান্ত পন্থা শেখানো, বিভিন্ন অভিমত নিয়ে আলোচনা করা, কাওয়ায়িদ প্রয়োগ করা, মূলনীতিকে শাখার ওপর প্রয়োগ করার পথ ও পদ্ধতি শেখানোর প্রতি মনোযোগ দেওয়া— এগুলো শিক্ষকের কর্তব্য।

এভাবে যখন ছাত্ররা উন্নত পর্যায়ে উন্নীত হবে, তখন শিক্ষকের কাজ হলো অন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তাদের শেখানো ও প্রস্তুত করা; তাদের যোগ্যতাকে শানিত করার জন্য প্রাথমিক ছাত্রদের দরস নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।

এরপর যখন তারা আরও ভালো স্তরে উন্নীত হবে, তখন তাদের কিছুটা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। এর ফলে ছাত্রের ব্যক্তিগত কিছু পুঁজি তৈরি হবে। যেমনটি সালাফের অনেকেই করেছেন। তারা ছাত্রদের ফতোয়া দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। যেমন: ইমাম মালিক, শাফিয়ি প্রমুখ সালাফ।

একজন শিক্ষক ছাত্রদের কখনো অন্ধ অনুসরণের শিক্ষা দেবেন না। বরং তাদেরকে যোগ্য নেতৃত্বের শিক্ষা দেবেন। কেননা, উম্মাহ আজ যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে আছে। আর এতেই রয়েছে তাদের ইহ ও পরকালীন সফলতা। এ জন্য সালাফের মধ্যে অনেককে দেখা যায় যে, তারা কখনো কখনো সেনাবাহিনী বা যুদ্ধের নেতৃত্ব নবীনদের হাতে ন্যস্ত করতেন। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও তাদের ব্যক্তিত্বকে আরও শক্ত করার জন্য সালাফ এমনটা করতেন। এতে করে নবীনরা তাদের পরে যোগ্য উত্তরসূরি হতে সক্ষম হবে।

টিকাঃ
১৬৩. সুরা আল-আরাফ: ১৪২
১৬৪. সহিহুল বুখারি: ৭৩৬০
১৬৫. সহিহুল বুখারি : ৪২৬১
১৬৬. সহিহুল বুখারি: ৪১৩০
১৬৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৪/৫৪
১৬৮. জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি: ৪৮৫
১৬৯. তারিখু বাগদাদ: ১৪/২৫০
১৭০. সহিহুল বুখারি: ৪৬৯৮

📘 শেষ বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু উত্তম নিদর্শন 📄 পঞ্চমত, শরিয়তসম্মত পন্থায় ওয়াকফ করা

📄 পঞ্চমত, শরিয়তসম্মত পন্থায় ওয়াকফ করা


যেসব পন্থায় নেকির পাল্লা বৃদ্ধি করা যায়, দুনিয়াতে আখিরাতের আমল জারি রাখা যায়, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওয়াকফ করা।

ওয়াকফ

কোনো জিনিসের স্বত্ব নিজের করে রেখে সবার জন্য তা থেকে উপকার গ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত করে দেওয়াই হলো ওয়াকফ। ১৭১

এখানে 'স্বত্ব বা মূল জিনস' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এমন সব বস্তু, যেগুলো থেকে উপকার গ্রহণ করলেও তার মূলটা অবশিষ্ট থেকে যায়। যেমন: বাড়ি, দোকানপাট, বাগান ইত্যাদি।

আর 'উপকার গ্রহণ' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো উক্ত মূল বস্তু থেকে অর্জিত ফলাফল সকলে ভোগ করা। যেমন: বাড়ির ভাড়া, বাগানের ফল ইত্যাদি।

আর এ সংজ্ঞাটা রাসুল-এর হাদিসের সাথে সামঞ্জস্যশীল। তিনি উমর-কে বলেছিলেন:

فَاحْبِسْ أَصْلَهَا، وَسَبِّلِ الثَّمَرَةَ

'তুমি স্বত্ব তোমার কাছে রেখে দাও আর ফল সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দাও।' ১৭২

ওয়াকফ শরিয়তসম্মত হওয়ার দলিল

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنفِقُوا مِن শَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ

'যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে খরচ করবে, ততক্ষণ তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে না। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, আল্লাহ তা জানেন।' ১৭৩

তথা তোমরা সদাকা হিসেবে যা ব্যয় করবে। ১৭৪ ওয়াকফ এমনই একটা সদাকা, এটি সদাকার ওপর ন্যস্ত।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

'হে মুমিনগণ, তোমরা রুকু করো, সিজদা করো, তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত করো এবং সৎ কাজ সম্পাদন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ১৭৫

আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন: إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٌ جَارِيَةٌ، وَعِلْمُ يُنتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٌ صَالِحٌ يَدْعُو لَهُ.

'মানুষ মারা গেলে তার আমলের সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি দরজা খোলা থাকে। (আমল-তিনটি হলো) সদাকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম, তার জন্য দুআকারী নেক সন্তান।' ১৭৬

ইমাম নববি বলেন:

'হাদিসে উল্লেখিত সদাকায়ে জারিয়া হলো, ওয়াকফ করা।'১৭৭

ওয়াকফ শরিয়তসম্মত হওয়ার তাৎপর্য

১. ওয়াকফকে এমন অর্থ জোগানের উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়, যার দ্বারা বিশেষভাবে ও ব্যাপকভাবে মানুষ উপকৃত হতে পারে। ওয়াকফ এমন একটি পাত্রের ন্যায়, যাতে আল্লাহর বান্দাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এটি এমন একটি ঝর্ণার ন্যায়, যা শুধু কল্যাণকর জিনিসই উৎপন্ন করে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ওয়াকফের উৎস হচ্ছে মুসলমানদের হালাল পন্থায় উপার্জিত সম্পদগুলো, তাদের মালিকানায় থাকা সম্পত্তি।

২. ওয়াকফকে সর্বাধিক সামাজিক কল্যাণকর কাজ হিসেবে ধরা হয়। ওয়াকফভিত্তিক কল্যাণকর কাজের প্রভাব সমাজে অনেক বেশি প্রতিফলিত হয়। এটি বিরাট উন্নয়নশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ইসলামি ইতিহাসের শত শত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানতে ও বুঝতে পারি যে, ওয়াকফের মাধ্যমে অর্থনৈতিক, সামাজিক, জ্ঞানভিত্তিক, স্বাস্থ্যবিষয়ক ও সামষ্টিক অনেক উপকার সাধিত হয়, এটি উন্নতি ও প্রগতিতে অনেক বড় ভূমিকা রেখে এসেছে সুদীর্ঘ কাল থেকে। মসজিদ, মাদরাসা, লাইব্রেরি, হাসপাতাল ইত্যাদির তত্ত্বাবধানে এর ভূমিকা অনেক ব্যাপক। যার দ্বারা বিশেষ শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও সাধারণ মানুষ উপকার পেতে সক্ষম হয়। তা ছাড়া ওয়াকফভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক আন্দোলন, কৃষি ও শিল্পের জাগরণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন মৌলিক অবকাঠামো যেমন: রাস্তা, সেতু, পুল তৈরি করার জোগান পাওয়া যেতে পারে।

ওয়াকফের সামাজিক গুরুত্ব ও উপকারিতাও রয়েছে। যেমন: পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিকভাবে একে অন্যের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয় ওয়াকফের কল্যাণে। মিসকিনদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, দরিদ্রদের সহায়তা করা, যুবকদের বিবাহের ব্যবস্থা করার মতো কাজগুলো করা যায় এর মাধ্যমে। যেমন: প্রতিবন্ধী, মাজুর, অক্ষমদের বিশেষ যত্ন নেওয়া। মৃত ব্যক্তিদের কাফন-দাফন ও কবরস্থ করার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

৩. ওয়াকফের মাধ্যমে ইসলামি শরিয়াহর জ্ঞানের দিকটি অনেক মজবুত ও শক্তিশালী হয়। এ সকল কার্যক্রমকে ধারাবাহিক করা যায়। যার ওপর ইসলামি দাওয়াতের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। ওয়াকফের ফলে মুসলিমরা ইসলামি জ্ঞানের দিগন্তে বড় ধরনের উপকার হাসিল করতে সক্ষম হবে; একটি ইলমি আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হবে। ওয়াকফের মাধ্যমে মুসলিমদের জন্য অনেক বিরাট ইলমি উপকার, ইসলামি উত্তরাধিকার পাওয়ার সুযোগ হয়েছে। আমরা পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে এমন সৎকর্মশীল আলিমদের দেখতে পাই, যাদের অবদানের গৌরবে পৃথিবীর ইতিহাস আজও জ্বলজ্বল করছে।

৪. ওয়াকফ মুসলিম উম্মাহর মনে পারস্পরিক দায়িত্বভার গ্রহণের মানসিকতা নিশ্চিত করে। সামাজিক ভারসাম্য আনয়ন করে। তা ছাড়াও এর ফলে দরিদ্রদের অবস্থার উন্নতি হয়, দুর্বলরা শক্ত-সমর্থ হয় এবং অক্ষম লোকেরা সাহায্য প্রাপ্ত হয়।

৫. ওয়াকফ উম্মাহর ব্যাপক কল্যাণ সাধন করে, তাদের বহু প্রয়োজন পূর্ণ করে। উন্নতি ও প্রগতিতে সাহায্য করে। ওয়াকফ ইলমি গবেষণা- অধ্যয়নের মাধ্যমে বিকশিত হতে সাহায্য করে।

৬. ওয়াকফের মাধ্যমে সম্পদের স্থায়িত্ব ও সে সম্পদ থেকে উপকারিতা পাওয়ার সময়কাল বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ দিক থেকে সম্পদের উপকারিতা কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। সম্পদ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে— এমন লোকদের থেকে ধন-সম্পদ সুরক্ষিত থাকে। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম উপকার লাভ করতে থাকে, আর ওয়াকফকারীর আমলনামায় সাওয়াব লেখা হতে থাকে।

টিকাঃ
১৭১. আল-কাফি: ২/২৫০
১৭২. সুনানুন নাসায়ি: ৩৬০৪
১৭৩. সুরা আলি ইমরান: ৯২
১৭৪. তাফসিরুত তবারি: ৬/৫৮৭
১৭৫. সুরা আল-হজ: ৭৭
১৭৬. সহিহু মুসলিম : ১৬৩১
১৭৭. শারহুন নববি আলা মুসলিম: ১১/৮৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px