📘 শেষ বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু উত্তম নিদর্শন 📄 পথ দেখানোর মতো কাজ হলেও উপকার করা

📄 পথ দেখানোর মতো কাজ হলেও উপকার করা


বারা বিন আজিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: مَرَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ عَلَى مَجْلِسِ الْأَنْصَارِ فَقَالَ: إِنْ أَبَيْتُمْ إِلَّا أَنْ تَجْلِسُوا ، فَاهْدُوا السَّبِيلَ، وَرُدُّوا السَّলَامَ، وَأَعِينُوا الْمَظْلُوم 'একদা রাসুল আনসারদের একটি মজলিশের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, “তোমরা যদি এখানে বসবেই, তাহলে মানুষকে রাস্তা দেখিয়ে দাও; সালামের উত্তর দাও এবং মাজলুমকে সাহায্য করো।”’

টিকাঃ
১৪১. মুসনাদু আহমাদ: ১৮৫৯০

📘 শেষ বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু উত্তম নিদর্শন 📄 প্রাণিকুলের প্রতি সদয় হওয়া

📄 প্রাণিকুলের প্রতি সদয় হওয়া


মুসলমানদের কল্যাণ হচ্ছে শান্তিময় প্রবাহিত বাতাসের ন্যায়, যা দ্বারা সকল মাখলুক উপকৃত হতে পারে; এমনকি জীবজন্তুও।

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেন: بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْশِي بِطَرِيقٍ، اشْتَدَّ عَلَيْهِ العَطَشُ، فَوَجَدَ بِثْرًا فَنَزَلَ فِيهَا، فَশَرِبَ ثُمَّ خَرَجَ، فَإِذَا كَلْبُ يَلْهَثُ، يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ العَطَশِ, فَقَالَ الرَّجُلُ: لَقَدْ بَلَগَ هَذَا الكَلْبَ مِنَ العَطَশِ মִثْلُ الَّذِي كَانَ بَلَغَ بِي, فَنَزَلَ البِثْرَ فَمَلَأَ خُفَّهُ ثُمَّ أَمْسَكَهُ بِফِيهِ, فَسَقَى الكَلْبَ فَশَكَرَ اللَّهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ, قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، وَإِنَّ لَنَا فِي البَهَائِمِ أَجْرًا? فَقَالَ: فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرُ

‘একদা রাস্তা দিয়ে জনৈক ব্যক্তি হেঁটে যাচ্ছিল। পিপাসায় তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। পাশে একটি কূপ পেয়ে সেখানে নেমে সে পানি পান করে নিল। কূপ থেকে উঠে দেখল—একটি কুকুর পিপাসায় হাঁপাচ্ছে আর মাটি চাটছে। লোকটি মনে মনে বলল, কিছুক্ষণ আগে তৃষ্ণায় আমার যে অবস্থা হয়েছিল, এই কুকুরটিরও একই অবস্থা হয়েছে। সে আবার কূপে নেমে তার মোজায় পানি ভর্তি করে মুখ দিয়ে আঁকড়ে ধরে ওপরে উঠে আসলো। অতঃপর কুকুরটিকে পান করালো। অতঃপর সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করল। ফলে আল্লাহ তাআলা লোকটিকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবিগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, এসব চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলে আমাদেরও সাওয়াব হবে?” তিনি বললেন, “জীবন্ত কলিজাধারী প্রত্যেক প্রাণীর উপকারের ক্ষেত্রে উত্তম প্রতিদান রয়েছে।”’

নববি র. বলেন, ‘(في كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرُ)’ এই কথার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: যেকোনো জীবিত প্রাণিকে পানি পান করালে বা এমন কিছু দ্বারা তার উপকার করলে, এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা অনেক প্রতিদান দান করবেন।’

কতক আলিমের মতে:

অতিশয় তৃষ্ণার্ত সে কুকুরকে পানি পান করানোর ফলে যেহেতু আল্লাহ তাআলা সে ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, তাহলে আল্লাহ সেই মুসলিমকে কেমন প্রতিদান দেবেন, যে পিপাসার্ত মানুষকে পানি পান করায়, ক্ষুধার্তকে আহার দান করে, বিবস্ত্রকে বস্ত্র দান করে?

জাবির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন: مَنْ حَفَرَ مَاءً لَمْ يَশْرَبُ مِنْهُ كَبِدُ حَرِيٌّ مِنْ جِنَّ وَلَا إِنِّসٍ وَلَا طَائِرٍ إِلَّا آجَرَهُ اللَّهُ يَوْমَ الْقِيَامَةِ،

'যদি কেউ কূপ খনন করে, তা থেকে কোনো অনুকূল (তৃষ্ণার্ত) প্রাণী—জিন, মানুষ, পাখি ইত্যাদি পান করে, আল্লাহ তাআলা তাকে এর বিনিময়ে কিয়ামতের দিন প্রতিদান দান করবেন।'

উমর বিন খাত্তাব বলেন: لو عثرت بغلة بالعراق، لسألني الله تبارك وتعالى عنها يوم القيامة

'যদি ইরাকে একটি খচ্চরও হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, তাহলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন আমাকে এর জন্য জিজ্ঞেস করবেন।'

টিকাঃ
১৪২. সহিহুল বুখারি : ২৩৬৩, সহিহু মুসলিম : ২২৪৪
১৪৩. শারহুন নববি আলা মুসলিম : ১৪/২৪১
১৪৪. সহিহু ইবনি খুজাইমা: ১২৯২
১৪৫. আনসাবুল আশরাফ: ৩/৩০৯

📘 শেষ বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু উত্তম নিদর্শন 📄 পরিশিষ্ট

📄 পরিশিষ্ট


আনাস থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন: مَثَلُ أُمَّتِي مَثَلُ الْمَطَرِ لَا يُدْرَى أَوَّلُهُ خَيْرٌ أَمْ آخِرُهُ

'বৃষ্টির ক্ষেত্রে যেমন জানা যায় না, তার প্রথম দিকের ফোঁটাগুলো অধিক কল্যাণময় নাকি শেষ দিকের, আমার উম্মতের উদাহরণ হলো এমন বৃষ্টির মতো।'১৭৮

অন্যান্য হাদিসের মাঝে বৃষ্টি ও তার সমার্থক যে শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে তার মর্মার্থ হচ্ছে, এই উম্মত কল্যাণের উৎসমূল। আল্লাহ তাআলা তাঁর পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ সৃষ্টিজীবের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। এর মাধ্যমেই তিনি জমিনকে শুকিয়ে যাওয়ার পর পুনর্জীবন দান করেন।

একইভাবে সর্বযুগে কল্যাণের ধারক-বাহকদের ইচ্ছাশক্তি, উচ্চ মনোবল এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এমন থাকে যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন এ জন্য যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা করেন, তাকে আমরা মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে মানুষের রবের দাসত্বের দিকে পথ দেখাব। বিভিন্ন ভ্রান্ত ধর্মের অত্যাচার-অবিচার থেকে রক্ষা করে ইসলামের ন্যায়পরায়ণতার ছায়াতলে আশ্রিত করব। দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে বের করে আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে নিয়ে আসব।

মানুষের ওপর তখনই বৃষ্টি বর্ষিত হয়, যখন তারা হতাশা, নিরাশা ও কঠিন সময় অতিক্রম করে। আর মুসলিম উম্মাহর উদাহরণও এমনই। তাদের ওপর যুগের পালা বদলে অনেক বিপদাপদ আপতিত হয়েছে, ইসলামি ইতিহাসের দীর্ঘ সময়ে তারা নানা ভয়-ভীতির সম্মুখীন হয়েছে এবং জুলুম-নির্যাতনের তীব্রতায় তারা প্রকম্পিত হয়েছে। কিন্তু তখনো মুসলিম উম্মাহ ভেঙে পড়েনি, নিরাশ হয়নি, কোনো শক্তির কাছে নত হয়নি। বরং প্রতিটি বিপদের সময় তারা দৃঢ় ইমান-বলে আল্লাহর রহমতে সকল বিপদাপদ ও ষড়যন্ত্রের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে পূর্বের চেয়ে অধিক শক্তিশালীরূপে, পূর্বের চেয়ে অধিক দৃঢ় ইমান নিয়ে। ষড়যন্ত্রকারী মিথ্যা প্রতারকগোষ্ঠী সব সময় মনে করত যে, তারা সফল হয়েছে, ইসলামের আলো তারা নিভিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের সকল ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য পর্যবেক্ষণরত আছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

يُرِيدُونَ أَن يُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا أَن يُتِمَّ نُورَهُ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ

'তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নুরকে নিভিয়ে দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাঁর নুরকে পূর্ণতা দান করবেন; যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।'১৭৯

সাহাবায়ে কিরাম যখন আল্লাহর বাণী শুনলেন— فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ

'তোমরা কল্যাণের কাজে প্রতিযোগিতা করো।'১৮০

وَسَارِعُوا إِلَى মَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ

'আর তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমা এবং এমন জান্নাতের দিকে ছুটে আসো, যার পরিধি আকাশমণ্ডলী ও জমিনের সমান। আর তা মুত্তাকিদের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।'১৮১

তখন তাঁরা এই আয়াতদুটি থেকে অনুধাবন করলেন যে, তাদের সকলকেই চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে হবে। তাদের প্রত্যেককেই এই কল্যাণ অর্জনের জন্য প্রতিযোগী হতে হবে। প্রতিযোগিতা করতে হবে। যেন এ কাজে তিনি অগ্রগামী হন, যেন তিনি হন এ উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছার ক্ষেত্রে সবার আগে।

তাই যখন কোনো সাহাবি অপর সাহাবিকে দেখতেন যে, তিনি তার তুলনায় বেশি নেক আমল করছেন, তখন উক্ত সাহাবিও প্রতিযোগিতায় লেগে যেতেন তার সমান হতে। বরং বলা ভালো, তাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করতেন। তাদের প্রতিটি চেষ্টা, প্রচেষ্টা, প্রতিযোগিতা ছিল আখিরাতের জন্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :

وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ

'আর এতে যেন প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করে।'১৮২

আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি—তিনি যেন আমাদের সকল কল্যাণকর ইলম দান করেন। নেক আমলের তাওফিক দান করেন। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মাদ ﷺ এবং তাঁর সকল সাহাবিদের প্রতি।

- মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

টিকাঃ
১৭৮. মুসনাদু আহমাদ: ১২৪৬১
১৭৯. সুরা আত-তাওবা : ৩২
১৮০. সুরা আল-বাকারা: ১৪৮
১৮১. সুরা আলি ইমরান : ১৩৩
১৮২. সুরা আল-মুতাফফিফিন: ২৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px