📄 এতিমের প্রতি অনুগ্রহশীল হওয়া
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُশْرِكُوا بِهِ শَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ
'তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরিক করো না। পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করো এবং নিকটাত্মীয় ও এতিম-মিসকিনদের সাথেও...।'১১২
এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে নবিজি-এর সাথে থাকবেন
সাহল বিন সা'দ থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন:
«أَنَا وَكَافِلُ اليَتِيمِ فِي الجَنَّةِ هَكَذَا... 'আমি ও এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি থাকব।' এ বলে তিনি তার তর্জনি ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন। ১১৩
ইবনে বাত্তাল বলেন:
'প্রত্যেক মুসলিমের এই হাদিসটি শোনা আবশ্যক। যেন তারা এমন কাজে আগ্রহী হয়, যা তাদের জান্নাতে রাসুল-এর প্রতিবেশী ও নবি-রাসুলদের জামাআতের সাথে থাকার সৌভাগ্য এনে দেবে।' ১১৪
আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলদের কাছ থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তারা এতিমদের প্রতি ইহসান করবে। তিনি বলেন :
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ
'যখন আমি বনি ইসরাইলের কাছ থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও উপাসনা করবে না, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও দীন-দরিদ্রের সাথে সদ্ব্যবহার করবে।'১১৫
আর তাদের চেয়ে আমরাই এই মাহাত্ম্যের অধিকারী বেশি।'
যে ব্যক্তি আশা করে যে, তার অন্তর নরম হোক এবং প্রয়োজনগুলো পূরণ হোক—তাহলে সে যেন এতিমের প্রতি দয়া করে, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় এবং তাকে নিজ খাবার থেকে খাওয়ায়।
আবু দারদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'এক ব্যক্তি নবিজি-এর কাছে এসে তার অন্তরের কাঠিন্যের অভিযোগ করল। তখন তিনি তাকে বললেন, “তুমি কি চাও যে, তোমার অন্তর নরম হোক এবং তোমার প্রয়োজন পূরণ হোক? তবে এতিমকে দয়া করো, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও, তোমার খানা থেকে তাকে খাওয়াও—তাহলে তোমার অন্তর নরম হবে এবং তোমার প্রয়োজন পূরণ হবে।””১১৬
কোনো এক সালাফ বলেছেন:
'শুরুতে আমি পাপের সাগরে ডুবে ছিলাম। মদ পান করতাম। একদিন দরিদ্র এক এতিম শিশুকে পেয়ে তাকে আমি সাথে করে নিয়ে আসলাম। সুন্দর করে তার প্রতিপালন করতে লাগলাম। খানা খাওয়ালাম, বস্ত্র পরিধান করালাম, গোসল করালাম, শরীরের ময়লা দূর করলাম, নিজের সন্তানের চেয়েও সুন্দর করে আদর-যত্ন করলাম। এসবের পর এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, কিয়ামত কায়িম হয়ে গেছে, হিসাবের জন্য ডাকা হয়েছে। অতঃপর আমার পাপের দরুন আমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হলো। জাহান্নামের ফেরেশতা আমাকে টেনে নেওয়ার জন্য আসলো। আমি তাদের সামনে নিতান্তই নিঃস্ব, অসহায়, অপমানিত। তারা আমাকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সে এতিমকে দেখলাম। সে পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল, “হে আমার প্রভুর ফেরেশতাগণ, তাকে ছেড়ে দাও। আমি তার জন্য আমার রবের কাছে সুপারিশ করব। কারণ, সে আমার প্রতি দয়া করেছে, আমাকে আদর-যত্ন করেছে।” ফেরেশতাগণ বললেন, “আমাদেরকে এমন কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি।" এ সময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ডাক এল; তিনি বলছিলেন, "তাকে ছেড়ে দাও। এতিমের সুপারিশের আবদারের কারণে এবং তার প্রতি দয়া করার কারণে আমি এ লোককে ক্ষমা করে দিচ্ছি।” তিনি বলেন, "তারপর আমি জাগ্রত হয়ে পড়ি, আল্লাহর কাছে তাওবা করি এবং এতিমদের প্রতি দয়ায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেষ্টা-শ্রম ব্যয় করি।”১১৯
টিকাঃ
১১২. সুরা আন-নিসা: ৩৬
১১৩. সহিহুল বুখারি: ৬০০৫
১১৪. শারহুল বুখারি লি ইবনি বাত্তাল: ৯/২১৭
১১৫. সুরা আল-বাকারা: ৮৩
১১৬. মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক: ১১/৯৭
১১৯. আল-কাবাইর: ৬৫
📄 মিসকিন ও বিধবাদের সেবায় ব্যয়িত প্রচেষ্টা
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন: السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالمِسْكِينِ، كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، أَوِ القَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ
'বিধবা ও মিসকিনদের সেবায় প্রচেষ্টাকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদের ন্যায় অথবা রাতে নামাজ আদায়কারী ও দিনে রোজা রাখে—এমন ইবাদতগুজার বান্দার ন্যায়। '১১৮
নববি বলেন: السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ বা চেষ্টাকারী দ্বারা মূলত বিধবা ও মিসকিনদের জন্য উপার্জনকারী ও তাদের খাদ্যদ্রব্যের জন্য কাজ করে এমন ব্যক্তি উদ্দেশ্য। আর বিধবা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এখন যার স্বামী নেই। পূর্বে সে বিয়ে করুক বা না করুক।' কেউ কেউ বলেন, 'যাকে তার স্বামী ছেড়ে চলে গেছে, সে-ই বিধবা।' ইবনে কুতাইবা বলেন, 'বিধবাকে أَرْمَلَة বলার কারণ হচ্ছে, বিধবার الإرمال হওয়া তথা সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, দারিদ্র্য জেঁকে বসা এবং স্বামীকে হারিয়ে তার জীবনোপকরণ শেষ হয়ে যাওয়া।'
وَالمِسْكِينِ আর মিসকিন হলো, এমন নিঃস্ব যার কিছুই নেই। কেউ কেউ বলেন, 'যার সামান্য কিছু আছে।' মিসকিন দ্বারা দুর্বল ব্যক্তিও উদ্দেশ্য হতে পারে। মিসকিন শব্দের মধ্যে ফকিরও নিহিত। বরং অনেকে মনে করেন, সাহায্য বিচারে ফকির তো মিসকিনদের থেকেও অগ্রগণ্য।
كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ অর্থাৎ তাদের রক্ষণাবেক্ষণকারী, তাদের দায়িত্ব ও ব্যয়ভার বহনকারী আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে ফিরে আসা গাজির মতো। কারণ অর্থ-সম্পদ মানুষের প্রাণের অর্ধেক। মানুষ তো তার নিজের সম্পদকে আঁকড়ে ধরে রাখে। অন্যদিকে মিসকিন ও বিধবাদের জন্য দানকারী নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দান করে। ১১৯
টিকাঃ
১১৮. সহিহুল বুখারি: ৫৩৫৩
১১৯. শারহু মুসলিম: ১৮/১১২