📘 শেষ বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু উত্তম নিদর্শন 📄 করজে হাসানাহ ও অসচ্ছল ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়া

📄 করজে হাসানাহ ও অসচ্ছল ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়া


ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন:

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُقْرِضُ مُسْلِمًا قَرْضًا مَرَّتَيْنِ إِلَّا كَانَ كَصَدَقَتِهَا مَرَّةً

'যদি কোনো মুসলমান অপর মুসলমানকে দুবার ঋণ দেয়, তাহলে তা একবার সদাকা করার সমান হয়ে যায়।'১০৫

হুজাইফা বলেন, রাসুল বলেছেন:

تَلَقَّتِ الْمَلَائِكَةُ رُوحَ رَجُلٍ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ... 'তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক লোকের আত্মার সাথে ফেরেশতারা সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি কোনো ভালো আমল করেছ?” সে বলল, “না, করিনি।” তারা বলল, “স্মরণ করে দেখো?” সে বলল, "আমি মানুষকে ঋণ দিতাম। আর আমার ছেলেদের আদেশ দিতাম যে, অসচ্ছলদের অবকাশ দাও। আর সচ্ছলরা ফেরত দানে কম দিলেও তাদের যেতে দাও।” রাসুল বলেন, “এরপর আল্লাহ বলেন, তোমরা তাকে যেতে দাও।””১০৬

টিকাঃ
১০৫. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৪৩০
১০৬. সহিহু মুসলিম: ১৫৬০

📘 শেষ বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু উত্তম নিদর্শন 📄 খানা খাওয়ানো

📄 খানা খাওয়ানো


আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত,

أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الإِسْلَامِ خَيْرُ؟ قَالَ: تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ

'এক ব্যক্তি নবিজি-কে জিজ্ঞেস করলেন, “ইসলামের কোন আমল অধিক উত্তম?” তিনি বললেন, “খানা খাওয়ানো এবং পরিচিত-অপরিচিতকে সালাম দেওয়া।”১০৭

আব্দুল্লাহ বিন সালাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

লম্ম কদিম রাসুলুল্লাহি ﷺ... 'রাসুল যখন মদিনায় আগমন করলেন, তখন মানুষ তাঁর দিকে দ্রুত ছুটতে লাগল। আর এ কথা বলছিল যে, আল্লাহর রাসুল এসেছেন, আল্লাহর রাসুল এসেছেন, আল্লাহর রাসুল এসেছেন...। মানুষের ভিড়ে আমিও তাঁকে দেখার জন্য এলাম। যখন স্পষ্ট করে তাঁর চেহারা মুবারক দেখলাম, তখনই বুঝলাম যে, এটা কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা হতে পারে না। তিনি প্রথম যে কথাটি বলেছেন তা হলো, "হে লোকসকল, পরস্পর সালাম বিনিময় করো, খানা খাওয়াও, শেষ রাতে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজ পড়ো। তাহলে শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।””১০৮

আবু মুসা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন : فُكُّوا الْعَانِي، وَأَطْعِمُوا الْجَائِعَ، وَعُودُوا الْمَرِيضَ 'বন্দী ব্যক্তিকে মুক্ত করো, ক্ষুধার্তকে খানা খাওয়াও এবং অসুস্থ লোকের সেবা করো। '১০৯

তিনি আরও বর্ণনা করেন, রাসুল বলেন: إِنَّ الْأَশْعَرِيِّينَ إِذَا أَرْمَلُوا فِي الْغَزْوِ... 'যুদ্ধের ময়দানে আশআরিদের পাথেয় শেষ হলে অথবা মদিনায় তাদের পরিবার-পরিজনের আহারাদি শেষ হয়ে গেলে, তারা তাদের কাছে থাকা সবকিছুকে একটি কাপড়ে জমা করত। অতঃপর একটি পাত্রে নিজেদের মাঝে তা সমানভাগে ভাগ করত। তারা আমার অন্তর্ভুক্ত আর আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত। '১১০

হাদিসে উল্লেখিত إِذَا أَرْمَلُوا এর অর্থ হচ্ছে, যখন তাদের সামান-পত্র শেষ হয়ে যেত। এটি رমল শব্দ থেকে নির্গত। রমল শব্দের অর্থ বালু। অর্থাৎ সামান শেষ হয়ে যাওয়ায় কেমন যেন তারা মাটির সাথে লেপটে গেছে। পরস্পর ভ্রাতৃত্ব, নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া, সফরে-ইকামাতে সকল্যের সম্পদকে একত্র করে অন্যদের সাহায্য করার ফজিলত হাদিসেও বর্ণিত আছে। আল্লাহ-ই ভালো জানেন।১১১

টিকাঃ
১০৭. সহিহুল বুখারি : ১২
১০৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৪৮৫
১০৯. সহিহুল বুখারি: ৩০৪৬
১১০. সহিহুল বুখারি: ২৪৮৬
১১১. ফাতহুল বারি: ৫/১৩০

📘 শেষ বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু উত্তম নিদর্শন 📄 এতিমের প্রতি অনুগ্রহশীল হওয়া

📄 এতিমের প্রতি অনুগ্রহশীল হওয়া


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُশْرِكُوا بِهِ শَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ

'তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরিক করো না। পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করো এবং নিকটাত্মীয় ও এতিম-মিসকিনদের সাথেও...।'১১২

এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে নবিজি-এর সাথে থাকবেন

সাহল বিন সা'দ থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন:
«أَنَا وَكَافِلُ اليَتِيمِ فِي الجَنَّةِ هَكَذَا... 'আমি ও এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি থাকব।' এ বলে তিনি তার তর্জনি ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন। ১১৩

ইবনে বাত্তাল বলেন:
'প্রত্যেক মুসলিমের এই হাদিসটি শোনা আবশ্যক। যেন তারা এমন কাজে আগ্রহী হয়, যা তাদের জান্নাতে রাসুল-এর প্রতিবেশী ও নবি-রাসুলদের জামাআতের সাথে থাকার সৌভাগ্য এনে দেবে।' ১১৪

আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলদের কাছ থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তারা এতিমদের প্রতি ইহসান করবে। তিনি বলেন :

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ

'যখন আমি বনি ইসরাইলের কাছ থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও উপাসনা করবে না, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও দীন-দরিদ্রের সাথে সদ্ব্যবহার করবে।'১১৫

আর তাদের চেয়ে আমরাই এই মাহাত্ম্যের অধিকারী বেশি।'

যে ব্যক্তি আশা করে যে, তার অন্তর নরম হোক এবং প্রয়োজনগুলো পূরণ হোক—তাহলে সে যেন এতিমের প্রতি দয়া করে, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় এবং তাকে নিজ খাবার থেকে খাওয়ায়।

আবু দারদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

'এক ব্যক্তি নবিজি-এর কাছে এসে তার অন্তরের কাঠিন্যের অভিযোগ করল। তখন তিনি তাকে বললেন, “তুমি কি চাও যে, তোমার অন্তর নরম হোক এবং তোমার প্রয়োজন পূরণ হোক? তবে এতিমকে দয়া করো, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও, তোমার খানা থেকে তাকে খাওয়াও—তাহলে তোমার অন্তর নরম হবে এবং তোমার প্রয়োজন পূরণ হবে।””১১৬

কোনো এক সালাফ বলেছেন:
'শুরুতে আমি পাপের সাগরে ডুবে ছিলাম। মদ পান করতাম। একদিন দরিদ্র এক এতিম শিশুকে পেয়ে তাকে আমি সাথে করে নিয়ে আসলাম। সুন্দর করে তার প্রতিপালন করতে লাগলাম। খানা খাওয়ালাম, বস্ত্র পরিধান করালাম, গোসল করালাম, শরীরের ময়লা দূর করলাম, নিজের সন্তানের চেয়েও সুন্দর করে আদর-যত্ন করলাম। এসবের পর এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, কিয়ামত কায়িম হয়ে গেছে, হিসাবের জন্য ডাকা হয়েছে। অতঃপর আমার পাপের দরুন আমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হলো। জাহান্নামের ফেরেশতা আমাকে টেনে নেওয়ার জন্য আসলো। আমি তাদের সামনে নিতান্তই নিঃস্ব, অসহায়, অপমানিত। তারা আমাকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সে এতিমকে দেখলাম। সে পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল, “হে আমার প্রভুর ফেরেশতাগণ, তাকে ছেড়ে দাও। আমি তার জন্য আমার রবের কাছে সুপারিশ করব। কারণ, সে আমার প্রতি দয়া করেছে, আমাকে আদর-যত্ন করেছে।” ফেরেশতাগণ বললেন, “আমাদেরকে এমন কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি।" এ সময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ডাক এল; তিনি বলছিলেন, "তাকে ছেড়ে দাও। এতিমের সুপারিশের আবদারের কারণে এবং তার প্রতি দয়া করার কারণে আমি এ লোককে ক্ষমা করে দিচ্ছি।” তিনি বলেন, "তারপর আমি জাগ্রত হয়ে পড়ি, আল্লাহর কাছে তাওবা করি এবং এতিমদের প্রতি দয়ায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেষ্টা-শ্রম ব্যয় করি।”১১৯

টিকাঃ
১১২. সুরা আন-নিসা: ৩৬
১১৩. সহিহুল বুখারি: ৬০০৫
১১৪. শারহুল বুখারি লি ইবনি বাত্তাল: ৯/২১৭
১১৫. সুরা আল-বাকারা: ৮৩
১১৬. মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক: ১১/৯৭
১১৯. আল-কাবাইর: ৬৫

📘 শেষ বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু উত্তম নিদর্শন 📄 মিসকিন ও বিধবাদের সেবায় ব্যয়িত প্রচেষ্টা

📄 মিসকিন ও বিধবাদের সেবায় ব্যয়িত প্রচেষ্টা


আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন: السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالمِسْكِينِ، كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، أَوِ القَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ

'বিধবা ও মিসকিনদের সেবায় প্রচেষ্টাকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদের ন্যায় অথবা রাতে নামাজ আদায়কারী ও দিনে রোজা রাখে—এমন ইবাদতগুজার বান্দার ন্যায়। '১১৮

নববি বলেন: السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ বা চেষ্টাকারী দ্বারা মূলত বিধবা ও মিসকিনদের জন্য উপার্জনকারী ও তাদের খাদ্যদ্রব্যের জন্য কাজ করে এমন ব্যক্তি উদ্দেশ্য। আর বিধবা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এখন যার স্বামী নেই। পূর্বে সে বিয়ে করুক বা না করুক।' কেউ কেউ বলেন, 'যাকে তার স্বামী ছেড়ে চলে গেছে, সে-ই বিধবা।' ইবনে কুতাইবা বলেন, 'বিধবাকে أَرْمَلَة বলার কারণ হচ্ছে, বিধবার الإرمال হওয়া তথা সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, দারিদ্র্য জেঁকে বসা এবং স্বামীকে হারিয়ে তার জীবনোপকরণ শেষ হয়ে যাওয়া।'

وَالمِسْكِينِ আর মিসকিন হলো, এমন নিঃস্ব যার কিছুই নেই। কেউ কেউ বলেন, 'যার সামান্য কিছু আছে।' মিসকিন দ্বারা দুর্বল ব্যক্তিও উদ্দেশ্য হতে পারে। মিসকিন শব্দের মধ্যে ফকিরও নিহিত। বরং অনেকে মনে করেন, সাহায্য বিচারে ফকির তো মিসকিনদের থেকেও অগ্রগণ্য।

كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ অর্থাৎ তাদের রক্ষণাবেক্ষণকারী, তাদের দায়িত্ব ও ব্যয়ভার বহনকারী আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে ফিরে আসা গাজির মতো। কারণ অর্থ-সম্পদ মানুষের প্রাণের অর্ধেক। মানুষ তো তার নিজের সম্পদকে আঁকড়ে ধরে রাখে। অন্যদিকে মিসকিন ও বিধবাদের জন্য দানকারী নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দান করে। ১১৯

টিকাঃ
১১৮. সহিহুল বুখারি: ৫৩৫৩
১১৯. শারহু মুসলিম: ১৮/১১২

ফন্ট সাইজ
15px
17px