📄 মানুষের মাঝে মীমাংসা করা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : لَّا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِّن نَّجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ، وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
'তাদের অধিকাংশ সলা-পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই, কিন্তু যে সলা-পরামর্শ দান-সদাকা বা সৎ কাজ অথবা মানুষের মাঝে মীমাংসা করার জন্য তারা করে তা ব্যতীত। যে এ কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, অচিরেই আমি তাকে বিরাট প্রতিদান দান করব।'৬০
শাইখ সাদি বলেন :
অর্থাৎ মানুষ পারস্পরিক যেসব সলা-পরামর্শ করে থাকে, এগুলোর অধিকাংশই অনর্থক। যেহেতু তাদের এসব কানকথার অধিকাংশই অনর্থক, সেহেতু এগুলোর বিষয়াদি হয়তো সাধারণভাবে অনুমোদিত বৈধ কথাবার্তা অথবা কোনো ক্ষতিকর বা হারামবিষয়ক কথা।
এরপর আল্লাহ তাআলা আয়াতের মধ্যে আলাদা করে বলে দিয়েছেন যে, “তবে যারা সদাকার আদেশ করে” সেটা ভিন্ন বিষয়। এ সদাকা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন: ধন-সম্পদ দান করা, ইলম শেখানো অথবা এমন যেকোনো ধরনের বিস্তৃত-সুপরিসরে উপকার সাধনের ক্ষেত্রেও হতে পারে। এমনকি তা সীমাবদ্ধ উপকারী আমল তাসবিহ, তাহলিল ইত্যাদিও হতে পারে। যেমন রাসুল বলেন :
إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةٌ... 'নিশ্চয় প্রত্যেক তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ বলা) সদাকা। প্রত্যেক তাকবির (আল্লাহু আকবার বলা) সদাকা। প্রত্যেক তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ বলা) সদাকা। প্রত্যেক তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা) সদাকা। সৎ কাজের আদেশ করা সদাকা। মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সদাকা। তোমাদের কারও স্ত্রী সহবাসের জন্য লিপিবদ্ধ হয় সদাকা।'৬১
আয়াতে উল্লেখিত أَوْ مَعْرُوفٍ [সৎ কাজ] দ্বারা উদ্দেশ্য হলো-আনুগত্য করা, অন্যের প্রতি সদাচরণ করা, শরিয়তে যে সকল কাজ সৎ বলে অনুমোদিত সে সকল কাজ, যুক্তিবোধ যাকে ভালো বলে-সে সকল কাজও এর অন্তর্ভুক্ত। আর সৎ কাজের আদেশের বিষয়টি উল্লেখ করে পাশাপাশি খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করার বিষয়টি উল্লেখিত না হলে, বুঝতে হবে সৎ কাজের আদেশের মাঝেই অসৎ কাজের নিষেধও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কারণ, মন্দ কাজ পরিহার করাও সৎ কাজ। তা ছাড়া মন্দকর্ম বাদ দেওয়া ব্যতীত কখনোই কল্যাণকর্ম পূর্ণতা পায় না। আর উভয়টিকে একত্রে আনা হলে তখন মারুফ বা সৎ কাজ করার দ্বারা উদ্দেশ্য হবে শরিয়তে আদিষ্ট কাজগুলো, আর মুনকার বা অসৎ কাজ দ্বারা উদ্দেশ্য হবে শরিয়তে নিষিদ্ধ কর্মগুলোকে বর্জন করা।
আয়াতে উল্লেখিত أَوْ إِصْلَاحِ بَيْنَ النَّاسِ [অথবা মানুষের মাঝে মীমাংসা করা] এর মর্ম হলো, সাধারণত যখন দুজন মানুষ ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মাঝে সমাধান তথা মিটমাট করে দেওয়া। ঝগড়া-বিবাদ, পরস্পর রেষারেষি-এগুলো মূলত মানুষের মাঝে মন্দ ও বিচ্ছেদ ইত্যাদির আবির্ভাব ঘটায়। যা কেবল এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই ইসলামি শরিয়ত মানুষের মাঝে ইজ্জত-সম্মান, ধন-সম্পদ ও রক্তপাত-সম্পর্কীয় সকল বিষয়ে সংশোধন করে দেওয়ার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে। বরং দ্বীনের ক্ষেত্রেও এমন আদেশ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। তিনি ইরশাদ করেন :
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
'আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। '৬২
তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন:
وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
'যদি মুমিনদের দুদল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর আক্রমণ করে, তবে যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে তোমরা সে পর্যন্ত আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দাও এবং সুবিচার করো। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন। '৬৩
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন :
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
'আর সন্ধি (সমাধান) করে দেওয়াই উত্তম। '৬৪
যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে বিবাদ মিটানোর চেষ্টায় লিপ্ত, সে নফল সালাত, সিয়াম ও সদাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ আমলে লিপ্ত ব্যক্তির চেয়েও উত্তম। আর সংশোধনকারীর চেষ্টা ও সংশোধন কর্মকে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই সংশোধন করে দেবেন। যেমনিভাবে যে লোক ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত থাকে, আল্লাহ তার আমলকে পরিশুদ্ধ করে দেন না এবং তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেন না। তিনি বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ
'নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের আমলকে পরিশুদ্ধ করেন না।'৬৫
এই কাজগুলো যেভাবেই করা হোক না কেন, এগুলো অবশ্যই অন্যের জন্য উপকারী আমল, এগুলোর উপকার হয় বিস্তৃত-সুপরিসরে। তবে আসল কথা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ প্রতিদান ও বিনিময় নিয়ত এবং ইখলাসের ওপর নির্ভর করে। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ নُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
'আর যে তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করবে, আমি অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দান করব।'৬৬
আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন :
إِنَّ أَفْضَلَ الصَّدَقَةِ إِصْلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ
'নিশ্চয় সর্বোত্তম সদাকা হলো, মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া। '৬৭
আবু দারদা হতে বর্ণিত, রাসুল বলেন :
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ... 'আমি কি তোমাদের সিয়াম, সালাত ও সদাকার চেয়েও উত্তম আমল বলে দেবো না?' সাহাবিগণ বললেন, 'অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল।' রাসুল বলেন, 'তা হলো মানুষের মাঝে সংশোধন করে দেওয়া। '৬৮
নিঃসন্দেহে নামাজ, রোজার মর্যাদার স্তর অনেক উঁচু। এ দুটি ইসলামের রুকন। হাদিসে উল্লেখিত সালাত ও সিয়াম দ্বারা নফল সালাত ও সিয়াম উদ্দেশ্য। কারণ এ দুই নফল ইবাদতের প্রতিদান ও পুরস্কার কেবল আমলকারীর মাঝেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে মানুষের মাঝে মীমাংসা করার উপকারিতা অন্যদের অন্তর্ভুক্ত করে, এ আমলের উপকারিতা সুপরিসরে ব্যাপ্ত হয়। তাই কারও সময়গুলোকে মানুষের মাঝে সংশোধন কাজে ব্যয় করা তার সময়গুলোকে নফল রোজা বা নফল নামাজে ব্যয় করার চেয়ে উত্তম।
টিকাঃ
৬০. সুরা আন-নিসা: ১১৪
৬১. সহিহু মুসলিম: ১০০৬
৬২. সুরা আলি ইমরান: ১০৩
৬৩. সুরা আল-হুজুরাত: ৯
৬৪. সুরা আন-নিসা: ১২৮
৬৫. সুরা ইউনুস: ৮১
৬৬. সুরা আন-নিসা: ১১৪
৬৭. আল-মুনতাখাব মিন মুসনাদি আবদ ইবনি হুমাইদ: ৩৩৫
৬৮. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯১৯
📄 সুপারিশ করা ও মাজলুমদের সাহায্য করা
একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো-তার অপর মুসলিম ভাইয়ের যেকোনো উপকার বা কল্যাণ সাধন করার ক্ষেত্রে এবং তার কাছ থেকে অকল্যাণকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করা। এ উপকারটি হবে নিজের সম্মান ও প্রভাব দিয়ে মুসলিমদের উপকার করার মাধ্যমে।
আবু মুসা আশআরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا جَاءَهُ السَّائِلُ أَوْ طُلِبَتْ إِلَيْهِ حَاجَةُ قَالَ: আশফাউ তুজরু... 'রাসুল-এর কাছে যখন কোনো ভিক্ষুক আসত বা কেউ প্রয়োজনের তাগিদে কিছু চাইত, তখন তিনি বলতেন, “তোমরা তার জন্য সুপারিশ করো, তাহলে তোমরাও পুরস্কার পাবে। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবির জবানের মাধ্যমে যা ইচ্ছা তা ফয়সালা করেন।"'৬৯
ইমাম নববি বলেন:
'এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কারও কোনো প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে তার জন্য সুপারিশ করা মুসতাহাব। চাই সে সুপারিশ কোনো সুলতান বা কোনো গভর্নর অথবা এমন স্তরের যেকোনো মানুষের কাছে কিংবা যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছেই হোক না কেন। হতে পারে তা সুলতানের প্রতি তার জুলুম-অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য সুপারিশ, অথবা কোনো অভাবী ব্যক্তিকে সাহায্য করার সুপারিশ। এমন যেকোনো সুপারিশই এর অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে হুদুদ-কিসাস কমানোর ক্ষেত্রে সুপারিশ করা হারাম। একইভাবে কোনো খারাপ কাজ সম্পাদনের বা সত্যকে মিথ্যার রূপ দেওয়ার সুপারিশ করার মতো অন্যান্য সুপারিশ হারাম। '৭০
উল্লিখিত হাদিসে বর্ণিত 'আর আল্লাহ তাআলা তার নবির জবানের মাধ্যমে যা ইচ্ছা তা ফায়সালা করেন' এই কথার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, সুপারিশকারীর সুপারিশ গ্রহণ করা হোক আর না-ই হোক, উভয় অবস্থায় সুপারিশকারী তার বিনিময় পেয়ে যাবে। ৭১
রাসুল মুসলিমদের কল্যাণের জন্য তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তিকে কাজে লাগাতেন। তিনি তাদের যেকোনো বিষয়ে সুপারিশ করতেন, এমনকি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়েও। বারিরা আজাদ হলেন। তার স্বামী তখনো দাসত্বের মধ্যে ছিলেন। বারিরা বিবাহ বিচ্ছেদ করতে চাইলেন। স্বামী এ কথা শুনে অনেক দুঃখ পেলেন। কারণ, স্বামী তাকে অনেক ভালোবাসতেন। এমনকি তিনি মদিনার অলিতে-গলিতে তার পিছে পিছে হেঁটে হেঁটে কাঁদতেন। অবশেষে তিনি তার স্ত্রীর কাছে সুপারিশ করার জন্য নবিজি ﷺ-এর নিকট আসলেন। নবিজি সুপারিশ করে বললেন, 'যদি তুমি তার কাছে ফিরে আসো, তবে সে তো তোমার সন্তানের পিতা।' বারিরা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আদেশ করছেন নাকি সুপারিশ করছেন?' রাসুল বললেন, 'না, আমি তো সুপারিশকারী মাত্র।' এ কথা শুনে বারিরা বললেন, 'তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। '৭২
টিকাঃ
৬৯. সহিহুল বুখারি: ১৪৩২
৭০. শারহুন নববি আলা মুসলিম: ১৬/১৭৭
৭১. শারহুল বুখারি লি ইবনি বাত্তাল: ৩/৪৩৪
৭২. সহিহুল বুখারি: ৪৯৭৯
📄 মানুষের অভাব-অনটনে সাহায্য করা, তাদের প্রয়োজন পূরণ করা ও বিপদাপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো
মানুষের সেবা করা ও দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানো মূলত হৃদয়ের স্বচ্ছতা, নিয়তের পরিশুদ্ধতা ও উত্তম চরিত্রের পরিচয় বহন করে। আর আল্লাহ তাআলাও তাঁর বান্দাদের মধ্যে দয়াকারীদের প্রতি দয়া করে থাকেন। এ সকল বিশেষ বান্দাকে তিনি অনেক পুরস্কারে ভূষিত করে থাকেন। অন্যের বিপদ দূর করার পুরস্কারস্বরূপ তিনি তাদের বিপদাপদ থেকে মুক্তি দেন। পরকালের চিন্তা দূর করে দেন।
আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন : الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ... 'মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না। তাকে শত্রুর কাছে সমর্পণ করে না। যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন। যে কোনো মুসলমানের একটি বিপদ দূর করে, আল্লাহ তার বিনিময়ে কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ থেকে একটি বিপদ দূর করে দেবেন। আর যে কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। '৭০
আবু নুআইম আরেকটু বৃদ্ধিসহ বর্ণনা করেন, 'যে কোনো মাজলুমের সাথে তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে যায়, আল্লাহ তাআলা এমন দিনে তার কদমকে দৃঢ় করে দেবেন, যেদিন মানুষের পদযুগল বিচ্যুত হবে।'৭১
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেছেন: مَنْ نَفْسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةٌ... 'যে কোনো মুমিনের একটি দুনিয়াবি বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ থেকে একটি বিপদ দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীর অভাব দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তার দুনিয়া-আখিরাতের অভাব দূর করে দেবেন। যে কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার দোষগুলোকে দুনিয়া-আখিরাতে গোপন রাখবেন। আর বান্দা যতক্ষণ তার অপর ভাইয়ের সাহায্যে থাকবে, আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ তার সাহায্যে থাকবেন। যে ইলম অন্বেষণের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।'৭৫
নববি বলেন:
'এই হাদিসে বহু ইলম, কাওয়ায়িদ ও আদাব বিবৃত হয়েছে। আর نفّস الكربة-এর মানে হচ্ছে, বিপদ দূর করে দেওয়া। এখানে ধন-সম্পদ, ইলম অথবা কোনোভাবে সাহায্য করা বা কোনো কল্যাণের প্রতি ইঙ্গিত করা বা কোনো নাসিহা করা-সহ যেভাবেই হোক মুসলিমদের সাহায্য-সহযোগিতা করার মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণিত হয়েছে।'৭৬
আর ভালো কাজ ও অন্যের প্রতি ইহসানের মাধ্যমে নিজের জীবন আলোকিত হয় এবং জীবনের পরিসমাপ্তিও ভালো হয়। উম্মে সালামাহ হতে বর্ণিত, রাসুল বলেন:
صَنَائِعُ الْمَعْرُوفِ تَقِي مَصَارِعَ السُّوءِ... 'ভালো কাজ খারাপ অবস্থায় মৃত্যু থেকে হিফাজত করে। গোপনে সদাকা আল্লাহর ক্রোধকে প্রশমিত করে। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে আয়ু বাড়ে।'৭৭
আর আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে মুসলিমদের প্রয়োজন পূরণ এবং কল্যাণ সাধনের জন্য ধন-সম্পদ ও নিয়ামত দান করেন। যদি সে বান্দা মুসলিমদের প্রয়োজন পূরণ না করে, তবে তার থেকে এ সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন : إِنَّ لِلَّهِ عِبَادًا اخْتَصَّهُمْ بِالنِّعَمِ لِمَنَافِعِ الْعِبَادِ... 'নিশ্চয় আল্লাহর কিছু বান্দা আছে, যাদের তিনি বিশেষভাবে তাঁর পক্ষ থেকে নিয়ামত দিয়ে থাকেন; কারণ তারা তাঁর বান্দাদের উপকার করে থাকেন। তারা যে অন্যের উপকার করে থাকেন, সে কারণে আল্লাহ তাআলা নিয়ামতের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেন। যখন তারা উপকার করতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন আল্লাহ তাদের থেকে তা ছিনিয়ে নিয়ে অন্যদের প্রদান করেন। '৭৮
ইবনে আব্বাস বলেন: 'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণের জন্য কদম বাড়ায়, তার প্রতিটি কদমের বিনিময়ে একেকটি সদাকা লিপিবদ্ধ হয়। '৭৯
সালাফের অবস্থা তো এমন ছিল যে, তারা নিজেদেরকে তাদের শরণাপন্ন হয়, এমন ব্যক্তিদের চেয়ে বড় মনে করতেন না। বরং তাদেরকেই সর্বক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতেন। কেউ তাদের নিকট কোনো প্রয়োজন নিয়ে আসলে তারা মনে করতেন—অভাবী ব্যক্তিটিই তার ওপর ইহসান করার জন্য এসেছেন।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস বলেন: 'তিন ব্যক্তির জন্য আমি যথেষ্ট হতে পারব না। প্রথমত, এমন ব্যক্তি যে আমাকে প্রথমে সালাম দেয়। দ্বিতীয়ত, এমন ব্যক্তি যে আমাকে বসার জায়গা করে দিতে মজলিসকে প্রশস্ত করে। তৃতীয়ত, এমন ব্যক্তি যে আমাকে সালাম দেওয়ার জন্য আসতে গিয়ে তার পদযুগল ধুলোয় ধূসরিত করেছে। আর চতুর্থ স্তরেও এমন এক ব্যক্তি আছে, যাকে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই পুরস্কার দিতে পারেন।' বলা হলো, 'কে সে?' তিনি বললেন, 'এমন ব্যক্তি যার কোনো প্রয়োজন দেখা দিল। অতঃপর সে ভাবতে ভাবতে রাত অতিবাহিত করল যে, প্রয়োজন সমাধানের জন্য কার কাছে যাবে। অবশেষে আমার কাছেই চলে এল তার প্রয়োজন পূরণের জন্য।'৮০
ফুজাইল বিন ইয়াজ বলেন:
'তারা আমার কাছে উল্লেখ করল যে, একদা এক ব্যক্তি তার প্রয়োজন পূরণের জন্য অন্য আরেক জন লোকের কাছে গেল। তা দেখে সে তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করল এবং বলল, “তোমার প্রয়োজন পূরণের জন্য আমাকে তুমি নির্বাচন করলে! জাজাকাল্লাহু খাইরান। আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।”'
আবু আকিল আল-বালিগ-কে বলা হলো, 'যখন মারওয়ান বিন হাকামের কাছে কোনো প্রয়োজন পূরণের আবদার করা হয়, তখন তুমি তাকে কেমন পেলে?' তিনি বললেন :
'কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের চেয়েও দয়া করতেই তার আগ্রহ বেশি দেখেছি। সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তির চেয়েও উক্ত সমস্যা নিয়ে তাকেই বেশি উদ্বিগ্ন দেখা যেত।'
ইবনুল কাইয়িম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ-এর প্রশংসায় বলেন :
'শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া আন্তরিকভাবে মানুষের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টায় লিপ্ত থাকতেন।'
উচ্চ মনোবলসম্পন্ন ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা বিপদাপদের সময় মানুষের ওপর নির্ভর না করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন।
হাকিম বিন হিজাম বলেন:
'প্রতিদিন সকালে আমার বাড়িতে মানুষ কোনো না কোনো প্রয়োজন নিয়ে আসত। আর তাদের বিপদগুলোও প্রকৃত বিপদই ছিল।'৮১
যাকে আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রয়োজন পূরণকারী বানিয়েছেন অথবা যাকে তিনি মানুষের প্রয়োজন পূরণ করার মাধ্যম বানিয়েছেন কিংবা তার অধীনে তার পরিচালনায় প্রয়োজনটি পূরণ হবে, এমন যোগ্যতা দিয়েছেন—সে ব্যক্তি যদি মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে অসন্তোষ প্রকাশ করে, তার শাস্তির বর্ণনায় এসেছে :
- তার থেকে প্রদত্ত নিয়ামত ছিনিয়ে নিয়ে তাকে সাবধান করা হয়।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন :
مَا مِنْ عَبْدٍ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِ نِعْمَةً فَأَسْبَغَهَا عَلَيْهِ ثُمَّ جَعَلَ مِنْ حَوائِجِ النَّاسِ إِلَيْهِ فَتَبَرَّمَ... 'যেই বান্দাকে আল্লাহ তাআলা যথেষ্ট পরিমাণে নিয়ামত দান করেন, অতঃপর আল্লাহ মানুষের প্রয়োজন পূরণ তার প্রতি নীত করলে সে বিরক্তি প্রকাশ করে। এমন অসন্তোষের মাধ্যমে সে যেন উক্ত নিয়ামত তার থেকে বিলুপ্তির সম্মুখীন করে দিল।'৮২
হাদিসে উল্লেখিত تَبَرَّمَ অর্থ হলো, সে বিরক্তিবোধ করল, সে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করল ইত্যাদি।৮৩ সুতরাং التبرম অর্থ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা, রাগ করা, মনকে সংকীর্ণ করা ইত্যাদি।
হাদিসে উল্লেখিত অসন্তোষ প্রকাশকারী ব্যক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, প্রত্যেক এমন নিয়ামতের অধিকারী, যাকে আল্লাহ তাআলা এমন কোনো নিয়ামত দিয়েছেন, যার ফলে মানুষ তার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে থাকে। যেমন: আলিম, মুফতি, দায়ি, শিক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক, আমির, কাজি, দায়িত্বশীল, ডাক্তার, ব্যবসায়ী, উকিল, ধনী ব্যক্তি - এমন ইত্যাদি গুণের অধিকারী মানুষগুলো যারা বিস্তৃত-সুপরিসরে উপকার করার যোগ্যতা রাখেন। আল্লাহ তাআলা যাদের বিভিন্ন গুণের মাধ্যমে সমাজের মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশেষ অবস্থান দান করেছেন।
এসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিবর্গের নিকট মানুষ মুখাপেক্ষী হওয়ার পর যদি তারা বিরক্তি প্রকাশ করে, অসন্তুষ্টি দেখায়, মানুষের সাথে সামান্য পরিমাণ সংকীর্ণতা প্রদর্শন করে, তাদের সাথে অহংকার করে, মুখ ফিরিয়ে নেয়, অনীহা প্রকাশ করে, তাহলে তাদের থেকে আল্লাহ তাআলার সেই নিয়ামত উঠে যাওয়ার জন্য তারাই দায়ী; তারা নিজেরাই সে নিয়ামত উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরজি পেশ করে। যেমনটি পূর্বোক্ত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাদিসের এ সতর্কবাণীগুলো কুরআনের এ আয়াতের কথা অন্তর্ভুক্ত করে যে - ذلِكَ بِأَنَّ اللهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَى قَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ
'এই শাস্তির কারণ এই যে, আল্লাহ যদি কোনো জাতির ওপর নিয়ামত দান করেন, সেই নিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই জাতি নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন না করে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহাশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী।' ৮৪
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ
'আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ যখন কোনো জাতির ওপর বিপদ আপতিত করতে চান, তখন তা প্রতিহত হওয়ার নয় এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোনো সাহায্যকারী নেই।' ৮৫
ইমাম বাগাবি প্রথম আয়াতের তাফসিরে বলেন :
'আল্লাহ তাআলা যদি কোনো জাতিকে কোনো নিয়ামত দিয়ে থাকেন, তাহলে সেই জাতি অস্বীকৃতি ও অকৃতজ্ঞতা ইত্যাদি অবাধ্যতার মাধ্যমে উক্ত নিয়ামতকে পরিবর্তন করা ছাড়া তিনি তা পরিবর্তন করেন না। সুতরাং যখন তারা কোনো অবাধ্যতা বা অস্বীকৃতি করে বসে, তখন আল্লাহ তাদের থেকে সে নিয়ামত ছিনিয়ে নেন।'৮৬
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন :
وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُم
'যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। অতঃপর তারা তোমাদের মতো হবে না।'৮৭
ইমাম কুরতুবি বলেন :
'আয়াতে কারিমার মধ্যে আল্লাহ তাআলা নেতৃত্ব, পরিচালনা ও কর্তৃত্ব প্রাপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে সতর্ক করে দিয়েছেন। যদি কেউ নেতা হয় আর প্রজাদের মাঝে সুবিচার না করে, বা কেউ যদি আলিম হয় আর ইলম অনুযায়ী আমল না করে, মানুষকে নসিহা না করে—তাহলে আল্লাহ তাদের থেকে তা উঠিয়ে নেবেন এবং অন্যদের প্রদান করবেন। আর আল্লাহ এ বিষয়ে সক্ষম।'৮৮
অতএব বোঝা গেল যে, পূর্বোল্লেখিত হাদিসের মধ্যে মূলত সেসব মানুষকে সতর্ক ও সাবধান করা হয়েছে, আল্লাহ যাদের নিয়ামত দিয়েছেন, সমাজে ভালো অবস্থান দিয়েছেন, যার কাছে মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণের জন্য আসে। অথচ সে আল্লাহর পছন্দনীয় পন্থায় সেগুলো সমাধান করে দেয় না।
টিকাঃ
৭০. সহিহুল বুখারি: ২৪৪২
৭১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/৩৪৮
৭৫. সহিহু মুসলিম: ২৬৯৯
৭৬. শারহুন নববি আলা মুসলিম: ১৭/২১
৭৭. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ৮০১৪
৭৮. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ৫১৬২
৭৯. আবু আব্দুল্লাহ আল-মারওয়াজি কৃত কিতবুল বিররি ওয়াস সিলা: ১৬৩
৮০. শুআবুল ইমান, বাইহাকি: ৭/৪৩৬
৮১. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ৩/৫১
৮২. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ৭৫২৯
৮৩. মুখতারুস সিহাহ: ১/২৭
৮৪. সুরা আল-আনফাল: ৫৩
৮৫. সুরা আর-রাদ: ১১
৮৬. তাফসিরুল বাগাবি: ৩/৩৬৮
৮৭. সুরা মুহাম্মাদ: ৩৮
৮৮. তাফসিরুল কুরতুবি: ৫/৪০৯
📄 করজে হাসানাহ ও অসচ্ছল ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়া
ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন:
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُقْرِضُ مُسْلِمًا قَرْضًا مَرَّتَيْنِ إِلَّا كَانَ كَصَدَقَتِهَا مَرَّةً
'যদি কোনো মুসলমান অপর মুসলমানকে দুবার ঋণ দেয়, তাহলে তা একবার সদাকা করার সমান হয়ে যায়।'১০৫
হুজাইফা বলেন, রাসুল বলেছেন:
تَلَقَّتِ الْمَلَائِكَةُ رُوحَ رَجُلٍ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ... 'তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক লোকের আত্মার সাথে ফেরেশতারা সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি কোনো ভালো আমল করেছ?” সে বলল, “না, করিনি।” তারা বলল, “স্মরণ করে দেখো?” সে বলল, "আমি মানুষকে ঋণ দিতাম। আর আমার ছেলেদের আদেশ দিতাম যে, অসচ্ছলদের অবকাশ দাও। আর সচ্ছলরা ফেরত দানে কম দিলেও তাদের যেতে দাও।” রাসুল বলেন, “এরপর আল্লাহ বলেন, তোমরা তাকে যেতে দাও।””১০৬
টিকাঃ
১০৫. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৪৩০
১০৬. সহিহু মুসলিম: ১৫৬০