📄 মসজিদ নির্মাণ
বিস্তৃত উপকারী আরেকটি মাধ্যম হলো, মসজিদ নির্মাণ করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُولَئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
'আল্লাহর মসজিদের আবাদ তো তারাই করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ইমান আনে, নামাজ কায়িম করে, জাকাত আদায় করে আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারাই হবে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।'৫৩
উসমান বিন আফফান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন:
مَنْ بَنَى مَسْجِدًا يَبْتَغِي بِهِ وَجْهَ اللَّهِ بَنَى اللَّهُ لَهُ مَثَلَهُ فِي الْجَنَّةِ
'যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ একটি ঘর বানাবেন।'৫৪
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন:
إِنَّ مِمَّا يَلْحَقُ الْمُؤْمِنَ مِنْ عَمَلِهِ وَحَسَنَاتِهِ بَعْدَ مَوْتِهِ عِلْمًا عَلَّمَهُ وَنَশَرَهُ، وَوَلَدًا صَالِحًا تَرَكَهُ ، وَمُصْحَفًا وَرَّثَهُ، أَوْ مَسْجِدًا بَنَاهُ، أَوْ بَيْتًا لابْنِ السَّبِيلِ بَنَاهُ، أَوْ نَهْرًا أَجْرَاهُ، أَوْ صَدَقَةً أَخْرَجَهَا مِنْ مَالِهِ فِي صِحَتِهِ وَحَيَاتِهِ يَلْحَقُهُ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهِ
'মুমিন ব্যক্তি মৃত্যুর পরেও তার যেসব আমল ও পুণ্য তার সাথে যুক্ত থাকে তা হলো, এমন ইলম যা সে শিখিয়েছে এবং প্রচার করেছে, এমন নেক সন্তান যাকে সে রেখে গেছে, কুরআনের কোনো কপি যা উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছে, কোনো মসজিদ যা সে নির্মাণ করেছে, পথিক-মুসাফিরদের জন্য নির্মিত কোনো ঘর যা সে বানিয়েছে, কোনো পানির নহর যা সে খনন করেছে অথবা এমন সদাকা যা সে তার জীবদ্দশায় সুস্থাবস্থায় নিজ সম্পদ থেকে দান করেছে।'৫৫
রাসুল মসজিদে নববি নির্মাণকালে সাহাবিদের সহায়তা করেছেন। মসজিদ নির্মাণ বিষয়ে আবু সাইদ খুদরি থেকে বর্ণিত আছে-
কুননা নাহমিলু লাবিনাতান... 'আমরা একটি করে ইট বহন করছিলাম। আর আম্মার দুটি করে ইট বহন করছিলেন। নবিজি তাকে দেখে তার শরীর থেকে মাটি ঝেড়ে দিলেন এবং বললেন, “আম্মারের জন্য আফসোস! তাকে বিদ্রোহী গোষ্ঠী হত্যা করবে। সে তাদের জান্নাতের দিকে আহ্বান করবে আর তারা তাকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করবে।” বর্ণনাকারী বলেন, আম্মার বললেন, “আমি আল্লাহর কাছে ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।”'৫৬
টিকাঃ
৫৩. সুরা আত-তাওবা: ১৮
৫৪. সহিহুল বুখারি: ৪৫০, সহিহু মুসলিম: ৫৩৩
৫৫. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৪২
৫৬. সহিহুল বুখারি: ৪৪৭
📄 নাসিহা ও কল্যাণ কামনা
তামিম আদ-দারি থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন :
الدِّينُ النَّصِيحَةُ... 'দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা।' আমরা বললাম, 'কার জন্য?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর, তাঁর কিতাবের, তাঁর রাসুলের, মুসলিমদের ইমাম (শাসক) ও সর্বসাধারণের জন্য।'৫৭
ইবনে হাজার বলেন:
'যে হাদিসগুলোকে দ্বীনের চারটি স্তম্ভ বলা হয় এ হাদিসটি তার একটি।'৫৮
নববি বলেন:
'এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস। এর ওপর ইসলামের অক্ষ স্থাপিত। এই হাদিস সম্পর্কে কতক আলিম বলেন যে, এটি ইসলামের সারমর্মবিষয়ক চারটি হাদিসের একটি। তারা যেমন বলেছিলেন, বিষয়টি এমন নয়। বরং ইসলামের মূল অক্ষ কেবল এ হাদিসটির ওপর স্থাপিত।... আর আল্লাহ-ই ভালো জানেন।'৫৯
আল্লাহর জন্য নাসিহার অর্থ
আল্লাহর উপযুক্ত গুণকীর্তন করা। বাহ্যিকভাবে ও অভ্যন্তরীণভাবে তাঁর প্রতি অনুগত হওয়া। তাঁর আনুগত্যমূলক কাজের প্রতি আগ্রহী থাকা। আল্লাহর ক্রোধকে ভয় করে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। তাঁর অবাধ্যদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা।
আল্লাহর কিতাবের জন্য নাসিহার অর্থ
আল্লাহর কিতাব শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়া; সহিহভাবে তিলাওয়াত করা; সুন্দরভাবে লেখা, এর অর্থ বোঝা, মুখস্থ করা, তদনুযায়ী আমল করা এবং কুরআন বিকৃতকারী প্রতারকদের বিতাড়িত করা—এগুলো হলো কুরআনের প্রতি কল্যাণকামিতা।
রাসুল ﷺ-এর জন্য নাসিহার অর্থ
তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, জীবিত ও মৃত অবস্থায় তাঁকে সাহায্য করা; তাঁর সুন্নাত নিজে শিখে ও অন্যকে শিখিয়ে জীবন্ত করা; কথা ও কাজে তাঁর অনুসরণ করা এবং তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদের ভালোবাসা।
মুসলিম উম্মাহর নেতৃবর্গের জন্য নাসিহার অর্থ
তাদের যে গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে তাদের সাহায্য করা। দায়িত্ব পালনে তাদের অবহেলা দেখলে তাদের সতর্ক করে দেওয়া। তাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া। তাদেরকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করা। তাদের প্রতি বিরূপ ধারণা রাখে—এমন ব্যক্তিদের তাদের স্বরূপ অবহিত করে বিরূপভাব দূর করা। তাদের প্রতি কারও ঘৃণা থাকলে তাদের সতর্ক করা। তাদের প্রতি সর্বোত্তম কল্যাণকামিতা হলো সুন্দরভাবে ও উত্তম পন্থায় তাদের জুলুম-অন্যায়-অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে রাখা।
সমস্ত মুসলিমের জন্য নাসিহার অর্থ
তাদের ইহকালীন-পরকালীন বিষয়ে কল্যাণের পথের দিশা দেওয়া। যেকোনো বিপদাপদ ও কষ্ট থেকে তাদের হিফাজত করা। দ্বীনের যতটুকু তারা জানে না, তা শিখিয়ে দেওয়া। কথা ও কাজের মাধ্যমে দ্বীন পালনে তাদের সহায়তা করা। তাদের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখা। তাদের ভুল-ভ্রান্তিগুলো ঠিক করে দেওয়া। তাদের ভুল থেকে যথাসাধ্য রক্ষা করা। তাদের উপকার সাধন করা। অপকারকে দূরে রাখা। উত্তম পন্থায় সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে বাধা দেওয়া। তাদের প্রতি দয়ার্দ্র হওয়া, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, সর্বদা উত্তম উপদেশ দেওয়া, তাদের সাথে প্রতারণা না করা, ভেজাল না মিশানো, হিংসা না করা। নিজের জন্য যা পছন্দ করা হয়, তাদের জন্যও তা পছন্দ করা। নিজের জন্য যা অপছন্দ করা হয়, তাদের জন্যও তা অপছন্দ করা। তাদের ধন-সম্পদ ও ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা। আমাদের আলোচিত নাসিহাগুলোর প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধ করা এবং ইবাদতের প্রতি তাদের উচ্চ মনোবল জোগানো। এ ছাড়া কথা ও কাজের মাধ্যমে তাদের জন্য কল্যাণকর অন্য সকল বিষয় নিশ্চিত করাও এ নাসিহা ও কল্যাণকামিতার অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
৫৭. সহিহ মুসলিম: ৫৫
৫৮. ফাতহুল বারি: ১/১৩৮
৫৯. শারহুন নববি আলা মুসলিম: ২/৩৭
📄 মানুষের মাঝে মীমাংসা করা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : لَّا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِّن نَّجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ، وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
'তাদের অধিকাংশ সলা-পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই, কিন্তু যে সলা-পরামর্শ দান-সদাকা বা সৎ কাজ অথবা মানুষের মাঝে মীমাংসা করার জন্য তারা করে তা ব্যতীত। যে এ কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, অচিরেই আমি তাকে বিরাট প্রতিদান দান করব।'৬০
শাইখ সাদি বলেন :
অর্থাৎ মানুষ পারস্পরিক যেসব সলা-পরামর্শ করে থাকে, এগুলোর অধিকাংশই অনর্থক। যেহেতু তাদের এসব কানকথার অধিকাংশই অনর্থক, সেহেতু এগুলোর বিষয়াদি হয়তো সাধারণভাবে অনুমোদিত বৈধ কথাবার্তা অথবা কোনো ক্ষতিকর বা হারামবিষয়ক কথা।
এরপর আল্লাহ তাআলা আয়াতের মধ্যে আলাদা করে বলে দিয়েছেন যে, “তবে যারা সদাকার আদেশ করে” সেটা ভিন্ন বিষয়। এ সদাকা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন: ধন-সম্পদ দান করা, ইলম শেখানো অথবা এমন যেকোনো ধরনের বিস্তৃত-সুপরিসরে উপকার সাধনের ক্ষেত্রেও হতে পারে। এমনকি তা সীমাবদ্ধ উপকারী আমল তাসবিহ, তাহলিল ইত্যাদিও হতে পারে। যেমন রাসুল বলেন :
إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةٌ... 'নিশ্চয় প্রত্যেক তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ বলা) সদাকা। প্রত্যেক তাকবির (আল্লাহু আকবার বলা) সদাকা। প্রত্যেক তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ বলা) সদাকা। প্রত্যেক তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা) সদাকা। সৎ কাজের আদেশ করা সদাকা। মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সদাকা। তোমাদের কারও স্ত্রী সহবাসের জন্য লিপিবদ্ধ হয় সদাকা।'৬১
আয়াতে উল্লেখিত أَوْ مَعْرُوفٍ [সৎ কাজ] দ্বারা উদ্দেশ্য হলো-আনুগত্য করা, অন্যের প্রতি সদাচরণ করা, শরিয়তে যে সকল কাজ সৎ বলে অনুমোদিত সে সকল কাজ, যুক্তিবোধ যাকে ভালো বলে-সে সকল কাজও এর অন্তর্ভুক্ত। আর সৎ কাজের আদেশের বিষয়টি উল্লেখ করে পাশাপাশি খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করার বিষয়টি উল্লেখিত না হলে, বুঝতে হবে সৎ কাজের আদেশের মাঝেই অসৎ কাজের নিষেধও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কারণ, মন্দ কাজ পরিহার করাও সৎ কাজ। তা ছাড়া মন্দকর্ম বাদ দেওয়া ব্যতীত কখনোই কল্যাণকর্ম পূর্ণতা পায় না। আর উভয়টিকে একত্রে আনা হলে তখন মারুফ বা সৎ কাজ করার দ্বারা উদ্দেশ্য হবে শরিয়তে আদিষ্ট কাজগুলো, আর মুনকার বা অসৎ কাজ দ্বারা উদ্দেশ্য হবে শরিয়তে নিষিদ্ধ কর্মগুলোকে বর্জন করা।
আয়াতে উল্লেখিত أَوْ إِصْلَاحِ بَيْنَ النَّاسِ [অথবা মানুষের মাঝে মীমাংসা করা] এর মর্ম হলো, সাধারণত যখন দুজন মানুষ ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মাঝে সমাধান তথা মিটমাট করে দেওয়া। ঝগড়া-বিবাদ, পরস্পর রেষারেষি-এগুলো মূলত মানুষের মাঝে মন্দ ও বিচ্ছেদ ইত্যাদির আবির্ভাব ঘটায়। যা কেবল এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই ইসলামি শরিয়ত মানুষের মাঝে ইজ্জত-সম্মান, ধন-সম্পদ ও রক্তপাত-সম্পর্কীয় সকল বিষয়ে সংশোধন করে দেওয়ার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে। বরং দ্বীনের ক্ষেত্রেও এমন আদেশ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। তিনি ইরশাদ করেন :
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
'আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। '৬২
তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন:
وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
'যদি মুমিনদের দুদল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর আক্রমণ করে, তবে যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে তোমরা সে পর্যন্ত আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দাও এবং সুবিচার করো। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন। '৬৩
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন :
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
'আর সন্ধি (সমাধান) করে দেওয়াই উত্তম। '৬৪
যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে বিবাদ মিটানোর চেষ্টায় লিপ্ত, সে নফল সালাত, সিয়াম ও সদাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ আমলে লিপ্ত ব্যক্তির চেয়েও উত্তম। আর সংশোধনকারীর চেষ্টা ও সংশোধন কর্মকে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই সংশোধন করে দেবেন। যেমনিভাবে যে লোক ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত থাকে, আল্লাহ তার আমলকে পরিশুদ্ধ করে দেন না এবং তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেন না। তিনি বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ
'নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের আমলকে পরিশুদ্ধ করেন না।'৬৫
এই কাজগুলো যেভাবেই করা হোক না কেন, এগুলো অবশ্যই অন্যের জন্য উপকারী আমল, এগুলোর উপকার হয় বিস্তৃত-সুপরিসরে। তবে আসল কথা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ প্রতিদান ও বিনিময় নিয়ত এবং ইখলাসের ওপর নির্ভর করে। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ নُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
'আর যে তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করবে, আমি অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দান করব।'৬৬
আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন :
إِنَّ أَفْضَلَ الصَّدَقَةِ إِصْلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ
'নিশ্চয় সর্বোত্তম সদাকা হলো, মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া। '৬৭
আবু দারদা হতে বর্ণিত, রাসুল বলেন :
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ... 'আমি কি তোমাদের সিয়াম, সালাত ও সদাকার চেয়েও উত্তম আমল বলে দেবো না?' সাহাবিগণ বললেন, 'অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল।' রাসুল বলেন, 'তা হলো মানুষের মাঝে সংশোধন করে দেওয়া। '৬৮
নিঃসন্দেহে নামাজ, রোজার মর্যাদার স্তর অনেক উঁচু। এ দুটি ইসলামের রুকন। হাদিসে উল্লেখিত সালাত ও সিয়াম দ্বারা নফল সালাত ও সিয়াম উদ্দেশ্য। কারণ এ দুই নফল ইবাদতের প্রতিদান ও পুরস্কার কেবল আমলকারীর মাঝেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে মানুষের মাঝে মীমাংসা করার উপকারিতা অন্যদের অন্তর্ভুক্ত করে, এ আমলের উপকারিতা সুপরিসরে ব্যাপ্ত হয়। তাই কারও সময়গুলোকে মানুষের মাঝে সংশোধন কাজে ব্যয় করা তার সময়গুলোকে নফল রোজা বা নফল নামাজে ব্যয় করার চেয়ে উত্তম।
টিকাঃ
৬০. সুরা আন-নিসা: ১১৪
৬১. সহিহু মুসলিম: ১০০৬
৬২. সুরা আলি ইমরান: ১০৩
৬৩. সুরা আল-হুজুরাত: ৯
৬৪. সুরা আন-নিসা: ১২৮
৬৫. সুরা ইউনুস: ৮১
৬৬. সুরা আন-নিসা: ১১৪
৬৭. আল-মুনতাখাব মিন মুসনাদি আবদ ইবনি হুমাইদ: ৩৩৫
৬৮. সুনানু আবি দাউদ: ৪৯১৯
📄 সুপারিশ করা ও মাজলুমদের সাহায্য করা
একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো-তার অপর মুসলিম ভাইয়ের যেকোনো উপকার বা কল্যাণ সাধন করার ক্ষেত্রে এবং তার কাছ থেকে অকল্যাণকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করা। এ উপকারটি হবে নিজের সম্মান ও প্রভাব দিয়ে মুসলিমদের উপকার করার মাধ্যমে।
আবু মুসা আশআরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا جَاءَهُ السَّائِلُ أَوْ طُلِبَتْ إِلَيْهِ حَاجَةُ قَالَ: আশফাউ তুজরু... 'রাসুল-এর কাছে যখন কোনো ভিক্ষুক আসত বা কেউ প্রয়োজনের তাগিদে কিছু চাইত, তখন তিনি বলতেন, “তোমরা তার জন্য সুপারিশ করো, তাহলে তোমরাও পুরস্কার পাবে। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবির জবানের মাধ্যমে যা ইচ্ছা তা ফয়সালা করেন।"'৬৯
ইমাম নববি বলেন:
'এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কারও কোনো প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে তার জন্য সুপারিশ করা মুসতাহাব। চাই সে সুপারিশ কোনো সুলতান বা কোনো গভর্নর অথবা এমন স্তরের যেকোনো মানুষের কাছে কিংবা যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছেই হোক না কেন। হতে পারে তা সুলতানের প্রতি তার জুলুম-অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য সুপারিশ, অথবা কোনো অভাবী ব্যক্তিকে সাহায্য করার সুপারিশ। এমন যেকোনো সুপারিশই এর অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে হুদুদ-কিসাস কমানোর ক্ষেত্রে সুপারিশ করা হারাম। একইভাবে কোনো খারাপ কাজ সম্পাদনের বা সত্যকে মিথ্যার রূপ দেওয়ার সুপারিশ করার মতো অন্যান্য সুপারিশ হারাম। '৭০
উল্লিখিত হাদিসে বর্ণিত 'আর আল্লাহ তাআলা তার নবির জবানের মাধ্যমে যা ইচ্ছা তা ফায়সালা করেন' এই কথার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, সুপারিশকারীর সুপারিশ গ্রহণ করা হোক আর না-ই হোক, উভয় অবস্থায় সুপারিশকারী তার বিনিময় পেয়ে যাবে। ৭১
রাসুল মুসলিমদের কল্যাণের জন্য তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তিকে কাজে লাগাতেন। তিনি তাদের যেকোনো বিষয়ে সুপারিশ করতেন, এমনকি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়েও। বারিরা আজাদ হলেন। তার স্বামী তখনো দাসত্বের মধ্যে ছিলেন। বারিরা বিবাহ বিচ্ছেদ করতে চাইলেন। স্বামী এ কথা শুনে অনেক দুঃখ পেলেন। কারণ, স্বামী তাকে অনেক ভালোবাসতেন। এমনকি তিনি মদিনার অলিতে-গলিতে তার পিছে পিছে হেঁটে হেঁটে কাঁদতেন। অবশেষে তিনি তার স্ত্রীর কাছে সুপারিশ করার জন্য নবিজি ﷺ-এর নিকট আসলেন। নবিজি সুপারিশ করে বললেন, 'যদি তুমি তার কাছে ফিরে আসো, তবে সে তো তোমার সন্তানের পিতা।' বারিরা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আদেশ করছেন নাকি সুপারিশ করছেন?' রাসুল বললেন, 'না, আমি তো সুপারিশকারী মাত্র।' এ কথা শুনে বারিরা বললেন, 'তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। '৭২
টিকাঃ
৬৯. সহিহুল বুখারি: ১৪৩২
৭০. শারহুন নববি আলা মুসলিম: ১৬/১৭৭
৭১. শারহুল বুখারি লি ইবনি বাত্তাল: ৩/৪৩৪
৭২. সহিহুল বুখারি: ৪৯৭৯