📄 আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেওয়া
বিস্তৃত উপকারী আরেকটি আমল হচ্ছে, আল্লাহর রাস্তায় পাহারাদারি করা। ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেন :
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِلَيْلَةٍ أَفْضَلَ مِنْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ؟ حَارِسٌ حَرَسَ فِي أَرْضِ خَوْفٍ، لَعَلَّهُ أَنْ لَا يَرْجِعَ إِلَى أَهْلِهِ
'আমি কি তোমাদের এমন একটি রাতের সংবাদ দেবো না, যে রাত লাইলাতুল কদরের চেয়েও উত্তম? এটি সে রাত, যে রাতে কোনো প্রহরী এমন ভীতিকর ভূমিতে পাহারা দেয়, যার ব্যাপারে তার আশঙ্কা হয় যে, সে হয়তো তার পরিবারের কাছে আর ফিরে আসবে না।'৪৯
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
সমিআতু রাসুলুল্লাহি ﷺ ইয়াাকুলু: আইানি লা তামাসসুহুমান নারু...
'আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “দুটি চোখকে (জাহান্নামের) আগুন স্পর্শ করবে না। যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে। আর যে চোখ আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দিয়ে রাত যাপন করেছে।”৫০
এখানে চোখ উল্লেখ করে ব্যক্তিকে বোঝানো উদ্দেশ্য। শরীরের একাংশ উল্লেখ করে পুরো শরীরকে বোঝানো হয়েছে। ৫১
টিকাঃ
৪৯. আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন: ২৪২৪
৫০. সুনানুত তিরমিজি: ১৬৩৯
৫১. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৫/২২
📄 মুসলিমদের পাহারায় আব্বাদ বিন বিশর ؓ
জাবির বিন আব্দুল্লাহ আল-আনসারি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : 'আমরা রাসুল-এর সাথে নজদের উদ্দেশে বের হলাম। পথিমধ্যে আমরা মুশরিকদের একটি বাড়ি ঘেরাও করলাম। আমরা তাদের এক মহিলাকে হত্যা করলাম। অতঃপর রাসুল ফেরার পথে চলতে শুরু করলেন। ইতিমধ্যে মহিলাটির স্বামী ফিরে এল। এর আগে তার স্বামী অনুপস্থিত ছিল। আসার পর তাকে তার স্ত্রী নিহত হওয়ার কথা শুনালে সে এই শপথ করল যে, রাসুল-এর সাহাবিদের রক্তপাত ঘটানো ছাড়া সে ফিরবে না।' জাবির বলেন, 'পথিমধ্যে রাসুল একটি উপত্যকায় অবতরণ করলেন এবং বললেন, “এমন কোন দুজন আছে, যারা এই রাতে শত্রু থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য পাহারা দেবে?" জাবির বলেন, মুহাজিরদের মধ্য থেকে একজন ও আনসারদের মধ্য থেকে একজন বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমরা আপনাকে পাহারা দেবো।” জাবির বলেন, এরপর তারা দুজন বাহিনী পেছনে রেখে গিরিপথের সম্মুখভাগে চলে গেলেন। তারপর আনসারি সাহাবি মুহাজির সাহাবিকে বললেন, “রাতের প্রথম ভাগে আমি পাহারা দেবো আর আপনি শেষ ভাগে দেবেন, নাকি আমি শেষ ভাগে দেবো আর আপনি প্রথম ভাগে পাহারা দেবেন?” মুহাজির সাহাবি বললেন, “আপনি প্রথম ভাগে পাহারা দিন, আমি শেষ ভাগে পাহারা দেবো।” এরপর মুহাজির সাহাবি ঘুমিয়ে গেলেন এবং আনসারি সাহাবি নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে কুরআনের একটি সুরা তিলাওয়াত করতে শুরু করলেন। এমনই সময় সে মহিলার স্বামী চলে আসলো। লোকটি সাহাবিকে দণ্ডায়মান দেখে বুঝতে পারল যে, তিনি মুসলিম বাহিনীর পাহারাদার। সে সাহাবিকে লক্ষ্য করে তির নিক্ষেপ করল। তিরটি সাহাবির শরীরে বিঁধল। সাহাবি একটু না নড়ে তিরটিকে খুলে নিয়ে তার সুরা তিলাওয়াত করতে থাকলেন; সুরা শেষ না করে তিনি থামতে চাইলেন না। সে লোক আরেকটি তির নিক্ষেপ করল, এ তিরও সাহাবির শরীরে বিঁধে গেল। সাহাবি নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায়ই সে তিরটি খুলে রাখলেন—সুরা তিলাওয়াতে ব্যাঘাত ঘটবে, এটি তার কাছে খারাপ লাগায় তিনি একটুও নড়লেন না। এরপর সে লোক আরেকটি তির নিক্ষেপ করল। তিনি সেটাও খুলে রাখলেন এবং রুকু-সিজদা করলেন। অতঃপর তার সঙ্গীকে বললেন, “উঠুন, আপনার পালা এসেছে।” মুহাজির সাহাবি উঠে বসলেন। যখন মহিলার স্বামী তাদের দুজনকে দেখতে পেল, তখন সে এই ভেবে পালিয়ে গেল যে, সে তার সাথিকে সতর্ক করে দিয়েছে। জাবির বলেন, আনসারি সাহাবিকে রক্তে মাখামাখি অবস্থায় দেখে মুহাজির সাহাবি বললেন, “আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। প্রথমবার নিক্ষেপ করার সাথে সাথে আপনি আমাকে ডাকেননি কেন?” তিনি উত্তরে বললেন, “আমি একটি সুরা পাঠ করছিলাম। সুরাটি অসমাপ্ত রেখে দিতে অপছন্দ করলাম। আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ-এর আদিষ্ট এ পাহারাদারি নষ্ট হওয়ার বিষয়টি না থাকলে আমার প্রাণ শেষ হয়ে গেলেও আমি সুরার তিলাওয়াত পূর্ণ করতাম।”’৫২
টিকাঃ
৫২. মুসনাদু আহমাদ : ১৪৪৫১, সুনানু আবু দাউদ: ১৯৩
📄 মসজিদ নির্মাণ
বিস্তৃত উপকারী আরেকটি মাধ্যম হলো, মসজিদ নির্মাণ করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُولَئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
'আল্লাহর মসজিদের আবাদ তো তারাই করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ইমান আনে, নামাজ কায়িম করে, জাকাত আদায় করে আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারাই হবে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।'৫৩
উসমান বিন আফফান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন:
مَنْ بَنَى مَسْجِدًا يَبْتَغِي بِهِ وَجْهَ اللَّهِ بَنَى اللَّهُ لَهُ مَثَلَهُ فِي الْجَنَّةِ
'যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ একটি ঘর বানাবেন।'৫৪
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন:
إِنَّ مِمَّا يَلْحَقُ الْمُؤْمِنَ مِنْ عَمَلِهِ وَحَسَنَاتِهِ بَعْدَ مَوْتِهِ عِلْمًا عَلَّمَهُ وَنَশَرَهُ، وَوَلَدًا صَالِحًا تَرَكَهُ ، وَمُصْحَفًا وَرَّثَهُ، أَوْ مَسْجِدًا بَنَاهُ، أَوْ بَيْتًا لابْنِ السَّبِيلِ بَنَاهُ، أَوْ نَهْرًا أَجْرَاهُ، أَوْ صَدَقَةً أَخْرَجَهَا مِنْ مَالِهِ فِي صِحَتِهِ وَحَيَاتِهِ يَلْحَقُهُ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهِ
'মুমিন ব্যক্তি মৃত্যুর পরেও তার যেসব আমল ও পুণ্য তার সাথে যুক্ত থাকে তা হলো, এমন ইলম যা সে শিখিয়েছে এবং প্রচার করেছে, এমন নেক সন্তান যাকে সে রেখে গেছে, কুরআনের কোনো কপি যা উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছে, কোনো মসজিদ যা সে নির্মাণ করেছে, পথিক-মুসাফিরদের জন্য নির্মিত কোনো ঘর যা সে বানিয়েছে, কোনো পানির নহর যা সে খনন করেছে অথবা এমন সদাকা যা সে তার জীবদ্দশায় সুস্থাবস্থায় নিজ সম্পদ থেকে দান করেছে।'৫৫
রাসুল মসজিদে নববি নির্মাণকালে সাহাবিদের সহায়তা করেছেন। মসজিদ নির্মাণ বিষয়ে আবু সাইদ খুদরি থেকে বর্ণিত আছে-
কুননা নাহমিলু লাবিনাতান... 'আমরা একটি করে ইট বহন করছিলাম। আর আম্মার দুটি করে ইট বহন করছিলেন। নবিজি তাকে দেখে তার শরীর থেকে মাটি ঝেড়ে দিলেন এবং বললেন, “আম্মারের জন্য আফসোস! তাকে বিদ্রোহী গোষ্ঠী হত্যা করবে। সে তাদের জান্নাতের দিকে আহ্বান করবে আর তারা তাকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করবে।” বর্ণনাকারী বলেন, আম্মার বললেন, “আমি আল্লাহর কাছে ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।”'৫৬
টিকাঃ
৫৩. সুরা আত-তাওবা: ১৮
৫৪. সহিহুল বুখারি: ৪৫০, সহিহু মুসলিম: ৫৩৩
৫৫. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৪২
৫৬. সহিহুল বুখারি: ৪৪৭
📄 নাসিহা ও কল্যাণ কামনা
তামিম আদ-দারি থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন :
الدِّينُ النَّصِيحَةُ... 'দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা।' আমরা বললাম, 'কার জন্য?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর, তাঁর কিতাবের, তাঁর রাসুলের, মুসলিমদের ইমাম (শাসক) ও সর্বসাধারণের জন্য।'৫৭
ইবনে হাজার বলেন:
'যে হাদিসগুলোকে দ্বীনের চারটি স্তম্ভ বলা হয় এ হাদিসটি তার একটি।'৫৮
নববি বলেন:
'এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস। এর ওপর ইসলামের অক্ষ স্থাপিত। এই হাদিস সম্পর্কে কতক আলিম বলেন যে, এটি ইসলামের সারমর্মবিষয়ক চারটি হাদিসের একটি। তারা যেমন বলেছিলেন, বিষয়টি এমন নয়। বরং ইসলামের মূল অক্ষ কেবল এ হাদিসটির ওপর স্থাপিত।... আর আল্লাহ-ই ভালো জানেন।'৫৯
আল্লাহর জন্য নাসিহার অর্থ
আল্লাহর উপযুক্ত গুণকীর্তন করা। বাহ্যিকভাবে ও অভ্যন্তরীণভাবে তাঁর প্রতি অনুগত হওয়া। তাঁর আনুগত্যমূলক কাজের প্রতি আগ্রহী থাকা। আল্লাহর ক্রোধকে ভয় করে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। তাঁর অবাধ্যদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা।
আল্লাহর কিতাবের জন্য নাসিহার অর্থ
আল্লাহর কিতাব শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়া; সহিহভাবে তিলাওয়াত করা; সুন্দরভাবে লেখা, এর অর্থ বোঝা, মুখস্থ করা, তদনুযায়ী আমল করা এবং কুরআন বিকৃতকারী প্রতারকদের বিতাড়িত করা—এগুলো হলো কুরআনের প্রতি কল্যাণকামিতা।
রাসুল ﷺ-এর জন্য নাসিহার অর্থ
তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, জীবিত ও মৃত অবস্থায় তাঁকে সাহায্য করা; তাঁর সুন্নাত নিজে শিখে ও অন্যকে শিখিয়ে জীবন্ত করা; কথা ও কাজে তাঁর অনুসরণ করা এবং তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদের ভালোবাসা।
মুসলিম উম্মাহর নেতৃবর্গের জন্য নাসিহার অর্থ
তাদের যে গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে তাদের সাহায্য করা। দায়িত্ব পালনে তাদের অবহেলা দেখলে তাদের সতর্ক করে দেওয়া। তাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া। তাদেরকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করা। তাদের প্রতি বিরূপ ধারণা রাখে—এমন ব্যক্তিদের তাদের স্বরূপ অবহিত করে বিরূপভাব দূর করা। তাদের প্রতি কারও ঘৃণা থাকলে তাদের সতর্ক করা। তাদের প্রতি সর্বোত্তম কল্যাণকামিতা হলো সুন্দরভাবে ও উত্তম পন্থায় তাদের জুলুম-অন্যায়-অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে রাখা।
সমস্ত মুসলিমের জন্য নাসিহার অর্থ
তাদের ইহকালীন-পরকালীন বিষয়ে কল্যাণের পথের দিশা দেওয়া। যেকোনো বিপদাপদ ও কষ্ট থেকে তাদের হিফাজত করা। দ্বীনের যতটুকু তারা জানে না, তা শিখিয়ে দেওয়া। কথা ও কাজের মাধ্যমে দ্বীন পালনে তাদের সহায়তা করা। তাদের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখা। তাদের ভুল-ভ্রান্তিগুলো ঠিক করে দেওয়া। তাদের ভুল থেকে যথাসাধ্য রক্ষা করা। তাদের উপকার সাধন করা। অপকারকে দূরে রাখা। উত্তম পন্থায় সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে বাধা দেওয়া। তাদের প্রতি দয়ার্দ্র হওয়া, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, সর্বদা উত্তম উপদেশ দেওয়া, তাদের সাথে প্রতারণা না করা, ভেজাল না মিশানো, হিংসা না করা। নিজের জন্য যা পছন্দ করা হয়, তাদের জন্যও তা পছন্দ করা। নিজের জন্য যা অপছন্দ করা হয়, তাদের জন্যও তা অপছন্দ করা। তাদের ধন-সম্পদ ও ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা। আমাদের আলোচিত নাসিহাগুলোর প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধ করা এবং ইবাদতের প্রতি তাদের উচ্চ মনোবল জোগানো। এ ছাড়া কথা ও কাজের মাধ্যমে তাদের জন্য কল্যাণকর অন্য সকল বিষয় নিশ্চিত করাও এ নাসিহা ও কল্যাণকামিতার অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
৫৭. সহিহ মুসলিম: ৫৫
৫৮. ফাতহুল বারি: ১/১৩৮
৫৯. শারহুন নববি আলা মুসলিম: ২/৩৭