📄 উম্মাহর জীবনে বিষাদতম দিন
দিনটা ছিল সোমবার। আল্লাহর রাসূল সেদিন আমাদের ছেড়ে চলে যান। কেমন ছিল সেই দিন? ফজরের ওয়াক্তে আবু বকর মুসলিমদের সালাত পড়াচ্ছেন, রাসূলুল্লাহ তাঁর ঘরের পর্দা সরিয়ে মসজিদের ভেতর তাকালেন। তিনি চোখ ভরে তাঁর উম্মাহকে দেখছিলেন। তাঁর উম্মাহ সারিবদ্ধভাবে সালাহ আদায় করছে। তাওহীদের যে বীজ তিনি রোপণ করেছিলেন, সেই চারাগাছ আজ সুবিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। তাঁর দাওয়াহ সফল, তাঁর মিশন সম্পূর্ণ। মুসলিমরা আজ নিজেরাই জামাতবদ্ধ হয়ে সালাত আদায় করছে। রাসূলুল্লাহর মন এক অপার আনন্দে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল।
তিনি মুচকি হাসলেন। রাসূলুল্লাহর হাসিমুখ দেখে সাহাবিরাও খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠলেন। আনন্দের আতিশয্যে তাদের সালাত ভেঙে যাবার উপক্রম! আনাস ইবন মালিকের বর্ণনায়,
'আল্লাহর রাসূলের মুখ সেদিন যেন কুরআনের পাতার মতো ঝলমল করছিল।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'তাঁর চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল যেন এক ফালি চাঁদ!'
আবু বকর রাসূলাল্লাহকে ইমামতিতে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে পেছনে ফিরে আসছিলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ইশারায় জানিয়ে দিলেন তারা যেন নিজেরাই সালাত আদায় করে নেন। এরপর রাসূলুল্লাহ পর্দা ফেলে আবার ভেতরে চলে গেলেন।
রাসূলুল্লাহ তাঁর উম্মাহর সর্বশেষ যে দৃশ্যটি দেখেছেন সেটি হলো সালাতের জামাত। এই দৃশ্য দেখেই রাসূলুল্লাহর মন আনন্দে ভরে উঠেছিল। নিশ্চয়ই তাওহীদের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সালাহ।
রাসূলুল্লাহকে দাঁড়াতে দেখে সাহাবিরা ভাবলেন রাসূলুল্লাহর শারীরিক অবস্থার হয়তো উন্নতি হয়েছে। তাই আবু বকর অনুমতি নিয়ে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে দেখা করতে আস-সুনহে চলে গেলেন, সেটা ছিল মদীনার কিছু দূরে।
সোমবারের ফজর সালাহ ছিল রাসূলুল্লাহর শেষ সালাহ। আইশার ভাই আবদুর রহমান তাদের ঘরে এলেন, তার হাতে একটা মিসওয়াক ছিল। রাসূলুল্লাহ সেই মিসওয়াকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখে কিছু বলাও তখন কষ্টকর। আইশা তাঁর চাহনি দেখেই বুঝতে পারলেন রাসূলুল্লাহ মিসওয়াকটি ব্যবহার করতে চাইছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি এটা চান?' রাসূলুল্লাহ ইঙ্গিতে বললেন, হ্যাঁ চাই। আইশা তখন মিসওয়াকটি তার ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে এর অন্য পাশ নরম করে রাসূলুল্লাহকে এগিয়ে দিলেন। আইশা বলেন, তিনি এমনভাবে মিসওয়াক করছিলেন যে দেখে মনে হচ্ছিল যেন তিনি একদম সুস্থ। জীবনের একদম শেষ প্রান্তে এসেও রাসূলুল্লাহ মিসওয়াক ব্যবহারের সুন্নাহ ত্যাগ করেননি।
রাসূলুল্লাহর কষ্ট, যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। তাঁর কষ্ট দেখে ফাতিমা বলে উঠলেন, 'বাবার কতই না কষ্ট হচ্ছে!' সেই কষ্টের মুহূর্তেও তিনি মেয়ের কথার উত্তর দিলেন, বললেন, 'আজকের দিনের পর তোমার বাবার আর কোনো কষ্ট নেই মা!'
মৃত্যুর মুহূর্তে আল্লাহর রাসূল শুয়ে ছিলেন আইশার কোলে মাথা রেখে। পানির পাত্রে হাত ভিজিয়ে বারবার নিজের মুখ মুছে বলছিলেন, 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। নিশ্চয়ই মৃত্যু বড়ই কঠিন।' রাসূলুল্লাহ ছিলেন সমগ্র মানবজাতির সেরা সৃষ্টি, তাঁকেও মৃত্যুযন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল।
শেষ সময় ঘনিয়ে এল। রাসূলুল্লাহ ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে সূরা নিসার একটি আয়াত পড়ে আল্লাহর কাছে দুআ করছিলেন, বলছিলেন,
'হে আল্লাহ! আমাকে অন্তর্ভুক্ত করো নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎ ব্যক্তিদের সাথে, যাদের আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন!
হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দাও! আমার ওপর রহম করো! আমাকে সর্বোচ্চ সাথীর কাছে মিলিত করো!'
মৃত্যুর একেবারে শেষ মুহূর্তে আল্লাহর রাসূল তাঁর তর্জনী উপরে তুলে বলছিলেন, ফীর-রফিকুল আ'লা! ফীর-রফিকুল আ'লা। ফীর-রফিকুল আ'লা!
রাসূলুল্লাহর চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করলেন, দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন তাঁর সর্বোচ্চ সঙ্গী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে। জীবনের শেষ মুহূর্তেও উচ্চারণ করছিলেন তাঁর জীবনভর চেয়ে যাওয়া ইচ্ছার কথা ওয়ালহিক্বনী বির- রফিক্কিল আ'লা আমাকে সর্বোচ্চ সঙ্গীর (আল্লাহ) সাথে সাক্ষাত করিয়ে দিন।
মুসলিম উম্মাহর জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ ছিল রাসূলুল্লাহর মৃত্যু। মুসলিম উম্মাহ হারালো তাদের সবচেয়ে আপনজনকে। মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকা নেতাকে, বাবার মতো বুকের মাঝে আগলে রাখা মানুষটাকে। ভয়ে-কষ্টে-বিপদে-দ্বন্দ্বে সবাই যার কাছে ছুটে যেতো, যার কাছে সবাই নির্বিঘ্নে সব সমস্যার কথা বলতে পারত, যিনি ছিলেন সবার আশ্রয়, সেই মানুষটা আজ চলে গেলেন। উম্মাহর জীবনে সবচেয়ে বড় ফিতনা সেই দিন। সবচেয়ে অন্ধকার আর বিষাদমাখা একটা দিন।
সাহাবিরা এই খবর মেনে নিতে পারলেন না। সবাই খুব বড়সড় একটা ধাক্কা খেলেন। কারো মাথা আর কাজ করছে না। কেউ স্তব্ধ হয়ে গেছে, কেউ নির্বাক হয়ে বসে পড়েছে, উঠে দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো শক্তিটুকুও যেন আর নেই। কেউ কেউ তো রীতিমতো অবিশ্বাস করলেন। উমার ইবন খাত্তাব কোনোভাবেই মানতে পারলেন না রাসূলুল্লাহ তাদের ছেড়ে চলে গেছেন। মসজিদের দিকে ছুটে গেলেন, উমারের পিছু পিছু সবাই মসজিদের দিকে ছুটলো। চারদিকে হাহাকার, হৃদয়গুলো ক্ষত-বিক্ষত, আজ মদীনার বাতাস ভারী হয়ে আছে কান্নায়। রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর সংবাদ মেনে নেওয়া সাহাবিদের জন্য কতটা কঠিন ছিল সেটা আমরা কখনো অনুভব করতে পারবো না, কারণ রাসূলুল্লাহর প্রতি আমাদের সেই পরিমাণ ভালোবাসাই নেই। সাহাবিরা রাসূলুল্লাহর সাথে বছরের পর বছর থেকেছেন। রাসূলুল্লাহ ছিলেন তাদের সব, সবকিছু। তাদের নেতা, তাদের পরামর্শদাতা, তাদের শিক্ষক, তাদের সুখ-দুঃখের বন্ধু, তাদের রাসূল!
উমার বলে উঠলেন,
'না! না! আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ মারা যাননি। তিনি তাঁর রবের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেছেন, মূসা যেমন তাঁর রবের সাথে দেখা করতে চল্লিশ দিনের জন্য তাঁর সম্প্রদায়কে রেখে চলে গিয়েছিলেন আর এরপর আবার ফিরে এসেছেন। আল্লাহর রাসূলও তেমনি ফিরে আসবেন, অবশ্যই আসবেন, আল্লাহর কসম করে বলছি। আর ফিরে এসে তিনি তাদের হাত-পা কেটে ফেলবেন যারা বলছে তিনি মারা গেছেন।'
উমার ভাবতেই পারছেন না রাসূলুল্লাহ আর নেই। তিনি ভাবছেন, সব মুনাফিককে হত্যা করার আগে রাসূলুল্লাহ মারা যেতেই পারেন না। তরবারি কোষমুক্ত করে অবুঝের মতো উমার হুমকি দিয়ে বললেন, 'যে এ কথা বলবে যে রাসূলুল্লাহ মারা গেছে, আমি তার মাথা এই তরবারি দিয়ে আলাদা করে দেবো।'
যে উমার জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে অসম্ভব দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, শক্তি-সাহস আর বীরত্বের পরিচয় দিয়ে যাকে সবাই চেনে, যাকে দেখে শয়তানও ভয়ে অন্য পথ ধরতো, সেই উমার আজ মুষড়ে পড়লেন। এমন কি হওয়ার কথা ছিল? হ্যাঁ, সাহাবিরাও মানুষ। রক্ত-মাংসের জলজ্যান্ত মানুষ। যাদের শরীরে লাল রক্ত আছে আছে, যাদের আবেগ আছে, অনুভূতি আছে, দুর্বলতাও আছে। তাই উমারের মতো শক্ত-সমর্থ মানুষটাও সেদিন অবুঝ শিশুর মতো ভেঙে পড়েছিলেন।
কিন্তু একজন ভেঙে পড়েননি। সেই সংকটময় মুহূর্তে যখন কেউ নির্বাক, কেউ হতবিহ্বল, তখন একটা মানুষ বটবৃক্ষের মতো সব ঝড় সামলে নিলেন। কে সেই মানুষটি? আল্লাহর রাসূলের সবচেয়ে কাছের মানুষ, আল্লাহর রাসূলের বন্ধু, ভাই, সাহাবি আবু বকর। নবুওয়াতের প্রথম থেকে যেই মানুষটা পায়ে পায়ে রাসূলের সাথে লেগে ছিলেন, সেই আবু বকর। আল্লাহর রাসূলের সমস্ত সুন্নাহ, সমস্ত শিক্ষা যিনি বুক পেতে গ্রহণ করেছেন, সেই আবু বকর। আল্লাহর রাসূলের দাওয়াতের সবচেয়ে উত্তম দৃষ্টান্ত, আবু বকর।
সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে হারিয়েও তিনি ঈমানী শক্তিতে নিজেকে সামলে নিলেন। সমুদ্রে ঝড় উঠলে যেভাবে শক্ত হাতে জাহাজের হাল ধরতে হয়, তেমনি করেই পুরো উম্মাহর হাল ধরলেন তিনি। রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালের সময়ে আবু বকর মদীনায় ছিলেন না, ছিলেন মদীনার কাছাকাছি আস-সুনহে। খবর পেয়ে তিনি সোজা আইশার ঘরে প্রবেশ করলেন। সেখানে রাসূলুল্লাহর শরীর কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। রাসূলুল্লাহর মুখ অনাবৃত করে আবু বকর কেঁদে উঠলেন, রাসূলুল্লাহকে চুমু দিলেন আর বললেন, 'আপনি জীবিত অবস্থায়ও পবিত্র ছিলেন, মৃত্যুর পরও আপনি পবিত্র। আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে দ্বিতীয়বার মৃত্যুবরণ করাবেন না। যে মৃত্যু আপনার জন্য নির্ধারিত ছিল, তা সম্পন্ন হয়ে গেছে।' এরপর আবু বকর আইশার ঘর থেকে বেরিয়ে মসজিদে গেলেন। সেখানে তখন উমার চিৎকার করছিলেন। উমারকে থামিয়ে আবু বকর বললেন, 'বসো, উমার, বসো!'
উমার আবু বকরের কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ করলেন না। আবু বকর আবার বললেন, 'উমার, বসো বলছি, বসো।' তবুও উমার থামলেন না। আসলে উমার মানসিকভাবে এতটাই বিধ্বস্ত ছিলেন যে, কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আবু বকর উমারকে উপেক্ষা করেই সামনে এগিয়ে গেলেন। লোকেরা উমারকে ছেড়ে তখন আবু বকরের কাছে ভিড় জমালো। তখন আবু বকরের সেই দিনের কথাগুলো উম্মাহ এত বছর পরেও স্মরণ করে। তিনি বলেছিলেন,
'যে মুহাম্মদের ইবাদত করে, সে জেনে রাখুক -- মুহাম্মাদ মারা গেছে। আর যে আল্লাহর ইবাদত করতো সে জেনে রাখুক আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।'
এরপর তিনি কুরআনের একটি আয়াত পাঠ করলেন,
'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল ব্যতীত অন্য কিছু নন। তাঁর আগেও অনেক রাসূল গত হয়েছেন। তাই যদি তাঁরও মৃত্যু হয়, তবে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে? যারা পেছনে ফিরে যায়, তারা আল্লাহর কোনো ক্ষতিই করতে সক্ষম নয়। শীঘ্রই আল্লাহ কৃতজ্ঞদের পুরষ্কৃত করবেন।' (সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৪৪)
কথাগুলো শুনে উমার বসে পড়লেন, তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। তার ভাষায়, 'আমি বুঝতে পারলাম আল্লাহর রাসূল আসলেই আর নেই।' এমন নয় উমার কুরআনের এই আয়াত জানতেন না, কিন্তু অদ্ভুত শূন্যতার সেই মুহূর্তে আবু বকরের মুখে আল্লাহ তাআলার এই আয়াত যেন ঝাঁকুনি দিয়ে সবার মাঝে সম্বিৎ ফিরিয়ে আনলো।
আল্লাহর রাসূলের মৃত্যু সংবাদে উমার ছিলেন দিশেহারা। উসমান হয়ে যান নির্বাক। আলী সবার থেকে লুকিয়ে কোথায় যেন চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আবু বকর সূরা আলে-ইমরানের এই আয়াতটির অর্থ জানতেন যে, মুসলিমরা আল্লাহর জন্য বাঁচে, ব্যক্তি মুহাম্মাদের জন্য নয়। মুহাম্মাদ হলেন আল্লাহর রাসূল, তাঁর মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু তাঁর আনীত দ্বীন চলবে কিয়ামত পর্যন্ত। সেদিন মদীনায় কত হাফেজ ছিল, কত আলেম ছিল, কিন্তু কেউ এই আয়াতকে কাজে লাগাতে পারলো না। সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করেছিলেন মাত্র একজন, আল্লাহর রাসূলের ছায়া যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি, সেই আবু বকর। ইমাম কুরতুবি মন্তব্য করেন,
'সাহসিকতার মানে যদি হয় বিপদ আর কষ্টকর পরিস্থিতিতে দৃঢ় আর অবিচল থাকা, তবে আবু বকরের সাহসিকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো কুরআনের এই আয়াত ও এই ঘটনা। কেননা রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর চাইতে বড় ফিতনা উম্মাহর জীবনে আর ছিল না ... চারদিকে যখন বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম, তখন যিনি হাল ধরেছিলেন তিনি হলেন আবু বকর।'
আবু বকর আল্লাহর রাসূলের শিক্ষার সবটা আমল করেছিলেন, এজন্যই তিনি হলেন নবী-রাসূলদের পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব।
📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ দাফন
রাসূলুল্লাহর পরিবারের সদস্যরা রাসূলুল্লাহর গোসল ও দাফনের দায়িত্ব পালন করেন। এই কাজে নিয়োজিত ছিলেন আল আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব, আলী ইবন আবি তালিব, আল ফাযাল ইবন আব্বাস, কুসাম ইবন আব্বাস, উসামা ইবন যায়েদ এবং রাসূলুল্লাহর আযাদকৃত দাস শুকরান। আনসারী সাহাবি আওস ইবন খাওলি আলীকে বললেন, 'আল্লাহর কসম এবং রাসূলুল্লাহর ওপর আমাদের হকের দোহাই দিয়ে বলছি, আমাকে ভেতরে আসতে দিন।' তাকে ভেতরে আসতে দেওয়া হলো এবং তিনি গোসলের সময় উপস্থিত ছিলেন।
আইশা বলেন, 'গোসলের সময় তারা বললো, আমরা তো বুঝতে পারছি না, রাসূলুল্লাহর গায়ের কাপড় খুলে গোসল দেবো, যেভাবে করে আমরা অন্যদের গায়ের কাপড় খুলে গোসল দিই, নাকি কাপড় রেখেই যেভাবে আছে সেভাবে গোসল দেবো। যখন তারা এটা নিয়ে বিতর্ক করছিল, তখন আল্লাহ তাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন করে দেন, সেই তন্দ্রায় তাদের প্রত্যেকের মাথা ঢলে পড়লো। এরপর ঘরের পাশ থেকে একটা আওয়াজ এল -- রাসূলুল্লাহর গায়ের কাপড় থাকা অবস্থাতেই তাকে গোসল দাও। কেউ জানে না এই কথা কে বলেছিল। তাই তারা রাসূলুল্লাহর জামার ওপর দিয়েই পানি ঢালে এবং তারা তাদের হাত না দিয়ে জামার ওপর দিয়ে তাঁর শরীর ঘষে দেয়।'
গোসল শেষে রাসূলুল্লাহর শরীরে তিন টুকরো কাপড় জড়ানো হলো। রাসূলুল্লাহর জানাযার সালাত এক জামাতে আদায় করা হয়নি। আইশার ঘরে যতটুকু জায়গা হতো তত মানুষ আসতো, জানাযার সালাত আদায় করে চলে যেতো। এক দলের সালাত আদায় শেষ হলে আরেক দল- এভাবে সালাত আদায় করা হলো। প্রথমে পুরুষরা, তারপর নারীরা, তারপর শিশুরা আর সবশেষে দাসরা। রাসূলুল্লাহর সালাতে কোনো ইমাম ছিল না, প্রত্যেকে আলাদাভাবে সালাত আদায় করে।
রাসূলুল্লাহর শরীর ছিল আইশার ঘরে। উম্ম সালামা বলেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহর স্ত্রীরা খুব কাঁদছিলাম, কিন্তু তখন অতটুকু সান্ত্বনা ছিল যে আমরা রাসূলুল্লাহর মৃতদেহটা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু বুধবার গভীর রাতে যখন কবরের মাটি খোঁড়ার শব্দ পেলাম, তখন আমরা কান্নায় ভেঙে পড়ি, চিৎকার করে উঠি। মসজিদ থেকে আমাদের চিৎকার শুনতে পেয়ে তারাও চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, পুরো মদীনাই যেন একটা বিরাট আর্তনাদে পরিণত হয়।'
ফজরের সময় হলে প্রতিদিনের মতোই বিলাল আজান দিতে গেলেন। 'আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আশহাদু আল্লা ইলাহা 'ইল্লাল্লাহ।' এরপর আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ বলতে গিয়ে আর বলতে পারলেন না, গলার কাছে আওয়াজগুলো যেন সব দলা পাকিয়ে গেল। কান্নায় ভেঙে পড়লেন বিলাল, আজান শেষ করতে পারলেন না। বিলাল ছিলেন আল্লাহর রাসূলের মুয়াজ্জিন, রাসূলের মৃত্যুর পর তিনি আর কারো জন্য আজান দেননি।
আইশার ঘরে খনন করা হলো রাসূলুল্লাহর কবর। নবীরা যে স্থানে মৃত্যুবরণ করেন, সেখানেই তাঁদের কবর দেওয়া হয়, এটাই নবীদের সুন্নাহ। আইশা একটি স্বপ্নে দেখেছিলেন তিনটি চাঁদ তাঁর কোলে পতিত হয়েছে। আবু বকর এই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, 'যদি তোমার স্বপ্ন সত্যি হয়, তাহলে পৃথিবীর বুকে শ্রেষ্ঠ তিন ব্যক্তির কবর তোমার ঘরে হবে।' যখন রাসূলুল্লাহর দাফনের সময় এল তখন আবু বকর বলেন, 'তোমার চাঁদগুলোর মধ্যে এটা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ চাঁদ।'
রাসূলুল্লাহ মৃতদেহ কবরস্থ করার সময় এল। এই কাজটিও রাসূলুল্লাহর পরিবারের লোকেরা সম্পন্ন করলেন। কবরে নেমেছিলেন আলী, ফাদল ইবন আব্বাস, কুসাম ইবন আব্বাস আর শুকরান। একটি বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহকে কবরস্থ করার সময় মুগীরা ইবন শু'বা ইচ্ছে করে তার একটি আংটি কবরের মধ্যে ফেলে দেন এবং এরপর সবাইকে বলেন, 'দাঁড়ান, দাঁড়ান। আমার আংটিটা নিয়ে নিতে দিন।' এই বাহানায় তিনি রাসূলুল্লাহ এর কবরে নামেন যেন তিনি রাসূলুল্লাহ স্পর্শ করা শেষ ব্যক্তিটি হতে পারেন। এরপর তিনি উঠে আসেন。
দাফনকাজ শেষ করে সবাই একে একে ফিরে এল। তখন ফাতিমা আনাসকে বললেন, 'আনাস, তোমরা কীভাবে পারলে আল্লাহর রাসূলের শরীরের ওপর মাটি নিক্ষেপ করতে!' আসলে রাসূলুল্লাহর মৃত্যু, তাঁর গোসল, তাঁর দাফন- সবই তাঁদের জন্য খুবই কষ্টদায়ক ছিল। সেজন্য রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'যখনই তোমাদের কারো উপর কোনো বিপদ আসবে, তখন আমার মৃত্যুর কথা স্মরণ করবে।' কারণ, একজন মুসলিমের ওপর সবচেয়ে বড় যে বিপদ আসতে পারে, সেটা ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে আর তা হলো আল্লাহর রাসূলের জীবনাবসান। আর কোনো মুসিবতই এর সাথে তুলনা করার মতো নয়। আনাস ইবন মালিক ছিলেন আল্লাহর রাসূলের ঘরে বড় হওয়া সাহাবি। তিনি বলেন,
'আমার জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিন দুইটা -- একটা সবচেয়ে আনন্দের, আরেকটা সবচেয়ে কষ্টের। আনন্দের দিনটি হলো রাসূলুল্লাহর মদীনায় আসার দিন। সেদিন সবকিছু ছিল আলোকিত! আর সবচেয়ে কষ্টের দিন হলো রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর দিন। সেদিন সবকিছু যেন আঁধারে ছেয়ে গেল। রাসূলুল্লাহকে কবর দেওয়ার পর যখন আমরা হাত থেকে ধুলো ঝাড়ছিলাম, তখন থেকেই মনে হতে লাগলো, আমাদের অন্তরগুলো আর আগের মতো নেই।'
রাসূলুল্লাহর সাথে থাকা সাহাবিদের জন্য একটা অন্যরকম অনুভূতি। যখন তিনি চলে গেলেন, তখন তাদের মনে হচ্ছিল যেন সবকিছু বদলে গেছে। একদিন আবু বকর আর উমার উম্ম আইমানের সাথে দেখা করতে যান। উমা আইমান তাদের দেখে কাঁদতে শুরু করেন। তারা জানতে চাইলেন, 'আপনি কেন কাঁদছেন?' উম্ম আইমান বললেন,
'আমি জানতাম আল্লাহর রাসূল একদিন না একদিন চলেই যাবেন। আমি কাঁদছি এ কারণে যে আর কখনো ওয়াহী নাযিল হবে না।'
তারা শুধু রাসূলুল্লাহর অভাব বোধ করছিলেন তা নয়, তারা রাসূলুল্লাহর মাধ্যমে যে ওয়াহী পেতেন সেটার অভাবও অনুভব করছিলেন।
রাসূলুল্লাহ মারা যান হিজরী একাদশ বছরের বারো রবিউল আউয়াল। মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ ছিলেন সমগ্র আরবের অবিসংবাদিত শাসক। তিনি এমন একটা সময়ে চলে যান যখন অনারবের রাজা-বাদশাহরা তাঁকে সমীহ করতে শুরু করেছে। কিন্তু এই প্রতাপ আর প্রতিপত্তি থাকা মানুষটি কোনো সম্পদ রেখে যাননি। মৃত্যুর একদিন আগে তিনি সব দাস-দাসীকে মুক্ত করে দেন। সাত দিনার ছিল, সেগুলোও সাদাকা করে দেন। তাঁর একটি বর্ম এক ইহুদির কাছে বন্ধক রাখা ছিল। সেটার বিনিময়ে তিনি কিছু যব নিয়েছিলেন পরিবারের জন্য। তিনি রেখে গেছেন কেবল একটি সাদা খচ্চর, কিছু অস্ত্র আর এক টুকরো জমি। এই জমিটিও তিনি মুসাফিরদের জন্য সাদাকাহ করে দিয়ে গেছেন। না ছিল সম্পদের বাহার, না ছিল সোনা-রুপার বহর, কিছুই না।
তবে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ এই মানুষটি রেখে গেছেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। সেই প্রজন্ম গড়েছে এক নতুন ইতিহাস। মুসলিম জাতির আগে দুনিয়ার বুকে আল্লাহর মনোনিত জাতি ছিল বনী ইসরাঈল। তাদেরকে সৎপথে টিকিয়ে রাখার জন্য আল্লাহ তাদের কাছে একের পর এক নবী পাঠাতেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূল যে উম্মাহকে রেখে গেছেন, সে উম্মাহর জন্য আর কোনো নবী পাঠানোর প্রয়োজন নেই, শেষ নবীই তাদের জন্য ক্বিয়ামত পর্যন্ত যথেষ্ট। এটা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অভাবনীয় সম্মাননা।
আল্লাহর রাসূল যেখানে শেষ করেছেন, সাহাবিরা সেখান থেকে এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন। সে যুগ গৌরবের, সে যুগ সমীহ জাগানিয়া। রাসূলুল্লাহর চলে যাওয়ার অল্প ক'বছরের মাথায় পৃথিবীর তৎকালীন দুই পরাশক্তি রাসূলুল্লাহর অনুসারী সাহাবিদের ভয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। সে আরেক ইতিহাস। আপাতত, এতটুকুই।