📄 'আমি যার মাওলা, আলী ؓ তার মাওলা'
আলী ইবন আবি তালিব তখন ইয়েমেনের আমীর। সে সময় তার কর্তৃত্ব নিয়ে কিছু গুঞ্জন ওঠে। আলীর সাথে সাদাকার কিছু উট ছিল, তার সৈন্যরা উটগুলোকে ব্যবহার করতে চাচ্ছিল। কিন্তু আলী রাজি হলেন না। তার অবর্তমানে সৈনিকরা সেই উটগুলো ব্যবহার করা শুরু করে। বিষয়টা জানতে পেরে আলী খুব রেগে গেলেন。
কিছু লোকের কাছে আলীর এই আচরণ পছন্দ হলো না। ফলে তার বিরুদ্ধে গুজব রটে গেল। অভিযোগগুলো একসময় আল্লাহর রাসূলের কান পর্যন্ত পৌঁছলো। একজন সাহাবি এই অভিযোগগুলোকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। তার হাঁটুতে হাত রেখে আল্লাহর রাসূল প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা, বলো তো, তুমি কি আলীকে অপছন্দ করো?' সাহাবির সোজাসাপ্টা উত্তর, 'হ্যাঁ, করি।' রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, 'তোমার উচিত তাকে ভালোবাসা।' সেই সাহাবি বলেন, 'এরপর থেকে আলী ইবন আবি তালিব হয়ে গেলেন আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন।'
বিদায় হজ থেকে ফিরে আসার সময় আল্লাহর রাসূল গাদিরখুম নামক এক জায়গায় এসে মানুষদের জড়ো করেন। আলীর ব্যাপারে সেই বিখ্যাত উক্তিটি তিনি সেখানেই করেন। কথাটা ছিল, 'মান কুনতু মাওলা, ফা 'আলীউ মাওলা -- আমি যদি কারো মাওলা হই, তবে আলীও তার মাওলা। মাওলা মানে বন্ধু। রক্ষাকারী। ঘনিষ্ঠ সহচর।
এই সবগুলো অর্থই আলীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু শিয়ারা এই ঘটনা আর এই উক্তিকে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করে। তারা এই উক্তিটি দেখিয়ে দাবি করে, আল্লাহর রাসূল এ কথার মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর পর আলীকে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
আসলে, আল্লাহর রাসূল কেন গাদিরখুমে এই কথাটি বলেছিলেন? আলীর বিরুদ্ধে মানুষের ভুল ধারণা আর বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য। আলীর নামে গুজব সৃষ্টি হয়েছিল, তাই রাসূলুল্লাহ সবার সামনে আলীকে সম্মানিত করলেন যেন সবাই বুঝতে পারে আলীর মর্যাদা কত ওপরে। আলী ছিলেন রাসূলুল্লাহর চাচাতো ভাই, তাঁর মেয়ে ফাতিমার স্বামী, তাঁর রেখে যাওয়া একমাত্র বংশধরদের বাবা। আমরা জানি, নাতি হাসান এবং হুসাইন ছাড়া রাসূলুল্লাহর আর কোনো বংশধর ছিল না। তাই রাসূলুল্লাহ সবাইকে বলছিলেন, আমি যদি তোমাদের বন্ধু হই তবে আলীও তোমাদের বন্ধু। তোমরা যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আলীকেও ভালোবাসতে হবে। এ কথা থেকে সাহাবি হিসেবে আলীর উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে প্রথম খলিফা হওয়ার কোনো নির্দেশ বা ইঙ্গিত এখানে নেই।
📄 উসামা ইবন যায়িদের ؓ নেতৃত্বে অভিযান
হিজরতের একাদশ বছর। রাসূলুল্লাহ হজ শেষে মদীনায় ফিরে এসেছেন। মুহাররম মাস সেখানেই থাকলেন। সফর মাসে রাসূলুল্লাহ উসামা ইবন যায়িদ ইবন হারিসাকে একটি বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করলেন। এই সেনাবাহিনী যাবে আশ শামে, রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। এর আগে রোমানদের বিরুদ্ধে মুতার যুদ্ধ হয়েছিল, তখন আমীর ছিলেন উসামার বাবা--আল্লাহর রাসূলের ইসলাম পূর্বযুগের পালকপুত্র-- যাইদ ইবন হারিসা। সে যুদ্ধেই তিনি শহীদ হয়ে যান। এরপর তাবুকের যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল নিজে অংশ নেন কিন্তু রোমানরা সেবার যুদ্ধ করতে আসেনি।
সেই একই রোমানদের বিরুদ্ধে তৃতীয় বারের মতো বাহিনী পাঠানো হচ্ছে, মুসলিমদের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তারই আমীর নির্ধারিত হলেন তরুণ সাহাবি উসামা। এই অভিযানে উসামাকে আল্লাহর রাসূল তার বাবার শহীদ হওয়ার স্থানে যেতে নির্দেশ দেন।
উসামার বয়স তখন মোটে আঠারো কি বিশ। মুহাজির এবং আনসারদের মধ্যে তখন প্রবীণ অনেক সাহাবিই ছিলেন, যারা কেবল বয়সেই বড় নন, বরং, জিহাদ, নেতৃত্ব আর সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিষয় ব্যবস্থাপনায়ও অভিজ্ঞ। সেখানে রাসূলুল্লাহ কি না এমন একজন তরুণ সাহাবিকে আমীর হিসেবে নিয়োগ দিলেন, যার অধীনে আবু বকর ও উমারের মতো সাহাবিরা যুদ্ধ করবেন!
ফলে এটা নিয়ে কিছুটা কানাঘুষা শুরু হয়। মুসলিম সমাজের আকার তখন আগের চাইতে অনেক বড়, তাই অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা আর কানাঘুষার মাত্রাও বেড়ে গিয়েছিল। আর মুনাফিকরা তো ছিলই, যারা ছিদ্রান্বেষণ আর সমালোচনার সুযোগ হাতছাড়া করতো না।
কানাঘুষা হলো দুটো বিষয়কে ঘিরে। প্রথম অভিযোগ ছিল, উসামার বয়স কম, আর দ্বিতীয় অভিযোগ তিনি দাস শ্রেণির। উসামার বাবা যাইদ এক সময় দাস ছিলেন, তার মা উম্ম আয়মানও দাসী ছিলেন, দাসের সন্তান হয়ে উসামা কীভাবে স্বাধীন মানুষের ওপর নেতৃত্ব পেতে পারে কেউ কেউ এটা মানতেই পারছিল না। রাসূলুল্লাহর কানে সে সব কথা এলে তিনি বললেন, 'তোমরা উসামার নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক করছো? এর আগে তোমরা তার বাবার নিয়োগ পাওয়া নিয়েও বিতর্ক করেছিলে! আল্লাহর কসম করে বলছি, তার বাবা নেতা হিসেবে যোগ্য ব্যক্তি ছিল, সে ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন। আর তার ছেলে তার পরে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।'