📄 বিদায় হজ্জের ভাষণ থেকে শিক্ষা
১) রাসূলুল্লাহ সকল জাহিলিয়াতের শেকড় আনুষ্ঠানিকভাবে উপড়ে ফেলছেন। এটা ছিল নতুন যুগের শুরু এবং আগের যুগের সমাপ্তি। রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম নিজের ও নিজের পরিবারের হাতে জাহিলিয়াতের নিয়মগুলো বাতিল করছেন। এ কারণে জাহিলিয়াতের যুগে ঘটা রবিয়া ইবন হারিসের হত্যাকাণ্ডের জন্য রক্তপণের দাবি ছেড়ে দিচ্ছেন। তিনি ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়। রাসূলুল্লাহ যখন সুদকে নিষিদ্ধ করেছেন, তখন সর্বপ্রথমে আব্বাস ইবন মুত্তালিবের সুদ বাতিল করছেন। আব্বাস জাহিলিয়াতের যুগে লোকজনকে ধার দিতেন এবং এর ওপর সুদ ধার্য করছিলেন। নিজ চাচার সুদের দাবি বাতিল করে আল্লাহর রাসূল শুধু মূলধন ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। যে কোনো ব্যাপারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্য সবচেয়ে উত্তম হলো নিজের বা নিজের পরিবারের মাধ্যমে বিষয়টি শুরু করা।
২) আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের সতর্ক করছেন নিজেদের মধ্যকার অনৈক্যের ব্যাপারে। শয়তান কুফফারদের মধ্যে ঝগড়া-ফাসাদ বাঁধানোর ব্যাপারে তেমন পরোয়া করে না। কারণ তারা ইতিমধ্যেই কাফির হয়ে গেছে এবং তারা জাহান্নামের আগুনে যাবেই। কিন্তু সে মুসলিমদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, কারণ মুসলিমদের সে কাফির বানাতে পারে না, তাই সে তাদের মধ্যে বিভেদ আর অনৈক্য তৈরি করে, মুসলিমদের অন্তরে ওয়াসওয়াসা দিয়ে তাদের প্ররোচিত করে এবং ফিতনা বাঁধায়।
৩) আল্লাহর রাসূল বলছেন, কোনো বিকলাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ দাসকে যদি আমাদের ওপর নেতা হিসেবে নিযুক্ত করা হয় এবং সে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী বিচার করে তাহলে তার আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক। এ কথা থেকে আমরা বুঝতে পারি, শাসক যে-ই হোক, যেমনই হোক, তাদের চরিত্র যা-ই হোক, তাদের বংশপরিচয় যা-ই হোক, সে যদি আল্লাহর কিতাব দিয়ে শাসন করে, তাহলে তাকে মেনে চলা বাধ্যতামূলক। আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ দিয়ে শাসন করা একজন শাসকের বৈধ শাসক হবার মূল শর্ত।
৪) আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের বুক থেকে বর্ণ বা গোত্রভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের বোধকে মুছে ফেলতে চেয়েছেন। ইসলাম একটি সর্বজনীন দ্বীন, কোনো জাতি বা গোত্র বিশেষের দ্বীন নয়। এই দ্বীন যারা পালন করে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হবে তাক্বওয়ার মাধ্যমে, জাতি, বর্ণ অথবা গোত্রের মাধ্যমে নয়।
৫) আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের গুনাহের ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন। তিনি বলেছেন, শয়তান হয়তো মুসলিমদের দ্বারা কুফরি করাতে পারবে্বা না, কিন্তু মুসলিমদের গুনাহে লিপ্ত করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা চালাবে। আজকে আমরা মুসলিমদের মধ্যে এটাই দেখছি, তারা ইসলাম হয়তো ত্যাগ করছে না, কিন্তু গুনাহ এবং পাপ কাজের কারণে তারা নিজেদের ধ্বংস এবং অবমাননা ডেকে এনেছে।
৬) এই খুতবায় আল্লাহর রাসূল একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলে গেছেন, তা হলো, মুসলিমরা যদি দুটো জিনিসকে আঁকড়ে ধরে, তা হলে তারা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। এ দুটো হলো কুরআন এবং সুন্নাহ। এই আদেশ শুধু সেই যুগের মানুষদের ওপর প্রযোজ্য নয়, বরং সকল যুগের সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। সভ্যতার গতিবিধি যেদিকেই গড়াক, প্রযুক্তি যতই উৎকর্ষ লাভ করুক, বিশ্বব্যবস্থা যা-ই হোক, মুসলিমদের জন্য চিরন্তন জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম, যার উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। আর কিয়ামত পর্যন্ত এর কোনো পরিবর্তন হবে না। পৃথিবীর সকল যুগের, সকল স্থানের যেকোনো সমস্যার সমাধান কুরআন ও সুন্নাহ এর নির্দেশিত পথেই হবে, এর কোনো নড়চড় হবে না।
📄 আল্লাহর রাসূলের ﷽ দুআ
বিদায় হজ্জের আলোচনার উপসংহার হিসাবে যোগ্য আল্লাহর রাসূলের এই দু'আটি। শাইখ আবুল হাসান আন-নাদভী তাঁর আস-সীরাহ আন-নববী গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন,
'হে আল্লাহ! তুমি নিশ্চয়ই আমার কথাগুলো শুনেছো, দেখেছো আমি কোথায় আছি। তুমি আমার অন্তরের খবর জানো, তুমি আমার বাহ্যিক অবস্থাও জানো, আমার কিছুই তোমার কাছে গোপন নয়। আমি অসহায়, দুর্বল। আমি তোমার কাছে সাহায্য চাই, তোমার কাছে আশ্রয় চাই। আমি তোমার শাস্তির আশঙ্কা করি, ভয় করি। আমি নিজের সমস্ত দোষ তোমার কাছে স্বীকার করে নিচ্ছি। এক অসহায় বান্দা হিসেবে আমি তোমার কাছে সাহায্য চাই, গুনাহগার হিসেবে আমি তোমার কাছে তাওবা করি। একজন ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ হয়ে আমি তোমার কাছে মিনতি করছি, নিজেকে সঁপে দিয়ে তোমার কাছে মিনতি করছি, অঝোরে কেঁদে তোমার কাছে মিনতি করছি, বিনম্র হয়ে তোমার কাছে মিনতি করছি। ও আল্লাহ! ও আমার রব! তুমি আমার এই মিনতি কবুল করে আমাকে সন্তুষ্ট করো। আমার প্রতি দয়া করো, করুণা করো! তুমিই তো শ্রেষ্ঠ দুআ শ্রবণকারী, তুমিই তো শ্রেষ্ঠ দাতা!'
📄 'আমি যার মাওলা, আলী ؓ তার মাওলা'
আলী ইবন আবি তালিব তখন ইয়েমেনের আমীর। সে সময় তার কর্তৃত্ব নিয়ে কিছু গুঞ্জন ওঠে। আলীর সাথে সাদাকার কিছু উট ছিল, তার সৈন্যরা উটগুলোকে ব্যবহার করতে চাচ্ছিল। কিন্তু আলী রাজি হলেন না। তার অবর্তমানে সৈনিকরা সেই উটগুলো ব্যবহার করা শুরু করে। বিষয়টা জানতে পেরে আলী খুব রেগে গেলেন。
কিছু লোকের কাছে আলীর এই আচরণ পছন্দ হলো না। ফলে তার বিরুদ্ধে গুজব রটে গেল। অভিযোগগুলো একসময় আল্লাহর রাসূলের কান পর্যন্ত পৌঁছলো। একজন সাহাবি এই অভিযোগগুলোকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। তার হাঁটুতে হাত রেখে আল্লাহর রাসূল প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা, বলো তো, তুমি কি আলীকে অপছন্দ করো?' সাহাবির সোজাসাপ্টা উত্তর, 'হ্যাঁ, করি।' রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, 'তোমার উচিত তাকে ভালোবাসা।' সেই সাহাবি বলেন, 'এরপর থেকে আলী ইবন আবি তালিব হয়ে গেলেন আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন।'
বিদায় হজ থেকে ফিরে আসার সময় আল্লাহর রাসূল গাদিরখুম নামক এক জায়গায় এসে মানুষদের জড়ো করেন। আলীর ব্যাপারে সেই বিখ্যাত উক্তিটি তিনি সেখানেই করেন। কথাটা ছিল, 'মান কুনতু মাওলা, ফা 'আলীউ মাওলা -- আমি যদি কারো মাওলা হই, তবে আলীও তার মাওলা। মাওলা মানে বন্ধু। রক্ষাকারী। ঘনিষ্ঠ সহচর।
এই সবগুলো অর্থই আলীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু শিয়ারা এই ঘটনা আর এই উক্তিকে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করে। তারা এই উক্তিটি দেখিয়ে দাবি করে, আল্লাহর রাসূল এ কথার মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর পর আলীকে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
আসলে, আল্লাহর রাসূল কেন গাদিরখুমে এই কথাটি বলেছিলেন? আলীর বিরুদ্ধে মানুষের ভুল ধারণা আর বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য। আলীর নামে গুজব সৃষ্টি হয়েছিল, তাই রাসূলুল্লাহ সবার সামনে আলীকে সম্মানিত করলেন যেন সবাই বুঝতে পারে আলীর মর্যাদা কত ওপরে। আলী ছিলেন রাসূলুল্লাহর চাচাতো ভাই, তাঁর মেয়ে ফাতিমার স্বামী, তাঁর রেখে যাওয়া একমাত্র বংশধরদের বাবা। আমরা জানি, নাতি হাসান এবং হুসাইন ছাড়া রাসূলুল্লাহর আর কোনো বংশধর ছিল না। তাই রাসূলুল্লাহ সবাইকে বলছিলেন, আমি যদি তোমাদের বন্ধু হই তবে আলীও তোমাদের বন্ধু। তোমরা যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আলীকেও ভালোবাসতে হবে। এ কথা থেকে সাহাবি হিসেবে আলীর উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে প্রথম খলিফা হওয়ার কোনো নির্দেশ বা ইঙ্গিত এখানে নেই।
📄 উসামা ইবন যায়িদের ؓ নেতৃত্বে অভিযান
হিজরতের একাদশ বছর। রাসূলুল্লাহ হজ শেষে মদীনায় ফিরে এসেছেন। মুহাররম মাস সেখানেই থাকলেন। সফর মাসে রাসূলুল্লাহ উসামা ইবন যায়িদ ইবন হারিসাকে একটি বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করলেন। এই সেনাবাহিনী যাবে আশ শামে, রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। এর আগে রোমানদের বিরুদ্ধে মুতার যুদ্ধ হয়েছিল, তখন আমীর ছিলেন উসামার বাবা--আল্লাহর রাসূলের ইসলাম পূর্বযুগের পালকপুত্র-- যাইদ ইবন হারিসা। সে যুদ্ধেই তিনি শহীদ হয়ে যান। এরপর তাবুকের যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল নিজে অংশ নেন কিন্তু রোমানরা সেবার যুদ্ধ করতে আসেনি।
সেই একই রোমানদের বিরুদ্ধে তৃতীয় বারের মতো বাহিনী পাঠানো হচ্ছে, মুসলিমদের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তারই আমীর নির্ধারিত হলেন তরুণ সাহাবি উসামা। এই অভিযানে উসামাকে আল্লাহর রাসূল তার বাবার শহীদ হওয়ার স্থানে যেতে নির্দেশ দেন।
উসামার বয়স তখন মোটে আঠারো কি বিশ। মুহাজির এবং আনসারদের মধ্যে তখন প্রবীণ অনেক সাহাবিই ছিলেন, যারা কেবল বয়সেই বড় নন, বরং, জিহাদ, নেতৃত্ব আর সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিষয় ব্যবস্থাপনায়ও অভিজ্ঞ। সেখানে রাসূলুল্লাহ কি না এমন একজন তরুণ সাহাবিকে আমীর হিসেবে নিয়োগ দিলেন, যার অধীনে আবু বকর ও উমারের মতো সাহাবিরা যুদ্ধ করবেন!
ফলে এটা নিয়ে কিছুটা কানাঘুষা শুরু হয়। মুসলিম সমাজের আকার তখন আগের চাইতে অনেক বড়, তাই অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা আর কানাঘুষার মাত্রাও বেড়ে গিয়েছিল। আর মুনাফিকরা তো ছিলই, যারা ছিদ্রান্বেষণ আর সমালোচনার সুযোগ হাতছাড়া করতো না।
কানাঘুষা হলো দুটো বিষয়কে ঘিরে। প্রথম অভিযোগ ছিল, উসামার বয়স কম, আর দ্বিতীয় অভিযোগ তিনি দাস শ্রেণির। উসামার বাবা যাইদ এক সময় দাস ছিলেন, তার মা উম্ম আয়মানও দাসী ছিলেন, দাসের সন্তান হয়ে উসামা কীভাবে স্বাধীন মানুষের ওপর নেতৃত্ব পেতে পারে কেউ কেউ এটা মানতেই পারছিল না। রাসূলুল্লাহর কানে সে সব কথা এলে তিনি বললেন, 'তোমরা উসামার নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক করছো? এর আগে তোমরা তার বাবার নিয়োগ পাওয়া নিয়েও বিতর্ক করেছিলে! আল্লাহর কসম করে বলছি, তার বাবা নেতা হিসেবে যোগ্য ব্যক্তি ছিল, সে ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন। আর তার ছেলে তার পরে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।'