📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ হজ্জ
রাসূলুল্লাহ হিজরতের দশম বছরে হজ্জ করেছিলেন। এই হজ্জকেই বলা হয় বিদায় হজ্জ। এই হাজ্জেই রাসূলুল্লাহ মুসলিম উম্মতের উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত ভাষণ প্রদান করেন। সকল মুসলিম সম্মিলিতভাবে শেষবারের মতো রাসূলুল্লাহকে দেখার ও শোনার সুযোগ পায়। মদীনা থেকে তিনি এই একবারই হজ্জ করেছিলেন。
রাসূলুল্লাহ উটে চড়ে হজ্জ করেছিলেন। তাঁর এই হাজ্জে কোনো বিলাসিতা ছিল না, নিতান্তই সাদাসিধেভাবে তিনি হজ্জ সম্পন্ন করেছিলেন। সেই হজ্জ এখনকার মতো ভিআইপি হজ্জ ছিল না। আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের হজ্জের নিয়মকানুন ব্যাখ্যা করলেন, এরপর যখন তিনি আরাফাতের ময়দানে তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন,
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।” (সূরা মায়িদা, ৫: ৩)
এই আয়াত নাযিল হলে সাহাবিরা কাঁদতে শুরু করেন। তারা বুঝতে পারলেন আল্লাহর রাসূল আর বেশিদিন তাদের মাঝে থাকবেন না। উমারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি কেন কাঁদছেন। তিনি উত্তর দেন, 'যখন কোনো কিছুর উত্থান ঘটে আর সেটা পরিপূর্ণতা লাভ করে, এরপর তার কেবল পতনই সম্ভব।' উমার বলতে চাচ্ছিলেন, ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। মুসলিমরা এই শ্রেষ্ঠত্ব কিছুকাল ধরে রাখবে, এরপর আস্তে আস্তে তাদের পতন হবে। এজন্যই আমরা বিশ্বাস করি, সাহাবিদের যুগ ছিল শ্রেষ্ঠ সময়, সেই স্বর্ণযুগ আর কখনো ফিরে আসবে না।
মাসজিদ আল-হারামে এসেই আল্লাহর রাসূল কালো পাথর স্পর্শ করে চুমু খেলেন। এরপর তাওয়াফ শুরু করলেন। প্রথম তিনবারের তাওয়াফ ছিল দ্রুতগতির তাওয়াফ, আর পরের চারবার ছিল সাধারণ গতিতে। এরপর তিনি কুরআনের একটি আয়াত পাঠ করলেন,
"আর স্মরণ করো, যখন আমি কাবাকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ স্থান বানালাম এবং (আদেশ দিলাম যে,) তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ করো। আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকুকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো।” (সূরা বাকারাহ, ২: ১২৫)
এরপর তিনি মাকামে ইবরাহীমকে তাঁর আর কাবার মাঝে রেখে দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন। এরপর তিনি আবার কালো পাথর স্পর্শ করলেন, চুমু খেলেন। এরপর পাঠ করলেন সূরা বাক্বারাহ অন্য একটি আয়াত।
"নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে বাইতুল্লাহর হজ্জ করবে কিংবা উমরা করবে তার কোনো অপরাধ হবে্বা না যে, সে এগুলোর তাওয়াফ করবে। আর যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কল্যাণ করবে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ শোকরকারী, সর্বজ্ঞ।” (সূরা বাকারাহ, ২, ১৫৮)
এরপর আল্লাহর রাসূল সাফা ও মারওয়ার মাঝে 'সাঈ' করলেন সাতবার। আল্লাহর রাসূল উরানাহ উপত্যকায় এসে সবার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন, যেটা বিদায় হজ্জের ভাষণ নামে পরিচিত। তিনি বললেন,
'লোকেরা, তোমরা মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনো! হয়তো আজকের পর আমি আর কখনো এখানে তোমাদের সঙ্গে একত্রিত হতে পারবো না।
আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর যেমন পবিত্র; তোমাদের জান, মাল, ইজ্জত কিয়ামত পর্যন্ত তেমনই পবিত্র। কারো কাছে যদি কোনো আমানত রক্ষিত থাকে, তাহলে সে যেন তা আমানতকারীর কাছে পৌঁছে দেয়। তোমরা অন্যের ওপর অত্যাচার করবে না, নিজেরাও অত্যাচারিত হবে না।
জেনে রেখো, জাহিলী যুগের সকল অপসংস্কৃতি আমার পায়ের নিচে। শুধু কাবাঘরের তত্ত্বাবধান ও হাজীদের পানি পান করানো ছাড়া। জাহিলিয়াতের সকল রক্তপণের দাবি বাতিল করা হলো। প্রথম যে রক্তপণের দাবি বাতিল করছি, তা হলো রবিয়া ইবন হারিস ইবন আবদুল মুত্তালিবের রক্ত। সে শিশু অবস্থায় বনু সাদের দুগ্ধপোষ্য ছিল, তখন হুযায়ল গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে।
জাহেলী যুগের সুদের প্রথা বিলুপ্ত করা হলো। তোমাদের কেবল মূলধনের ওপর অধিকার থাকলো। সর্বপ্রথম যে সুদ বাতিল করছি, তা হলো আমাদের বংশের আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। তার সমস্ত সুদ বাতিল করা হলো।
নারীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নারীদের উপর যেমন পুরুষদের অধিকার রয়েছে, তেমনি পুরুষদের উপর রয়েছে নারীদের অধিকার। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর নির্ধারিত কালিমা বাক্যের মাধ্যমে তাদের লজ্জাস্থান নিজেদের জন্য হালাল করেছো। তাদের উপরে তোমাদের অধিকার এই যে, তোমরা অপছন্দ করো এমন কাউকে ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। যদি তারা এরূপ করে, তবে হালকাভাবে প্রহার কর। আর তোমাদের উপর তাদের অধিকার হলো, তোমরা তাদের ভরণ-পোষণ ও পোশাক-পরিচ্ছেদের ভার বহন করবে ন্যায়সঙ্গতভাবে।
আমার পর তোমরা পরস্পর খুনোখুনিতে জড়িয়ে কুফরে পতিত হয়ো না। যারা সালাত আদায় করবে, তারা (পুনরায়) শয়তানের ইবাদাত করবে, এটা শয়তান আশা করে না। কিন্তু সে তোমাদের মধ্যে বিবাদ করতে থাকবে।
তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে। যদি বিকলাঙ্গ কোনো দাসও তোমাদের উপর নেতা নিযুক্ত হয় এবং সে তোমাদের আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী নেতৃত্ব দেয়, তাহলে তাঁকে শুনবে ও মানবে।
সাবধান! অপরাধী তার অপরাধের জন্য নিজেই দায়ী। সাবধান! পিতার অপরাধ সন্তানের ওপর বর্তায় না, না বর্তায় সন্তানের অপরাধ পিতার ওপরে। জেনে রেখো, এ নগরে আর কখনো শয়তানের ইবাদাত হবে না, এ থেকে সে নিরাশ হয়ে গেছে। তবে তুচ্ছ ভেবে এমন অনেক কাজ তোমরা করবে, যা করলে সে খুশি হবে。
তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করবে, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, রামাদান মাসে সিয়াম পালন করবে, যাকাত আদায় করবে ও তোমাদের নেতার আদেশ মেনে চলবে, তবে তোমরা জান্নাত লাভ করবে।
তোমাদের গোলাম ও অধীনস্থদের বিষয়ে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। তোমরা যা খাবে, তাদেরকে তা খেতে দেবে। তোমরা যা পরবে তাদেরকেও সেভাবে পরতে দেবে।
জেনে রেখো, এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই। তোমাদের একের সম্পদ আরেকজনের জন্য বৈধ নয়। তবে কেউ স্বেচ্ছায়, খুশি মনে তার সম্পদ কাউকে দিয়ে দিলে সেটা ভিন্ন কথা। কাজেই নিজেরা নিজেদের ওপর জুলুম কোরো না।
আল্লাহ তাআলা তোমাদের সম্পদের মিরাস নির্দিষ্টভাবে বণ্টন করে দিয়েছেন। তার থেকে কম বেশি করবে না। সম্পদের তিন ভাগের এক ভাগের চেয়ে অতিরিক্ত কোনো অসিয়ত বৈধ নয়। সন্তান যার বিছানায় জন্ম গ্রহণ করবে, সে তারই হবে। ব্যভিচারের শাস্তি হচ্ছে প্রস্তরাঘাত। (অর্থাৎ সন্তানের জন্য শর্ত হলো তা বিবাহিত দম্পতির হতে হবে। ব্যভিচারীর সন্তানের অধিকার নেই)। যে সন্তান আপন পিতা ব্যতীত অন্যকে পিতা এবং যে দাস নিজের মালিক ব্যতীত অন্য কাউকে মালিক বলে স্বীকার করে, তাদের উপর আল্লাহ তাআলা, ফেরেশতাকুল এবং সমগ্র মানব জাতির অভিশাপ।
নিশ্চয়ই তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক। আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সাদার উপর কালোর আর কালোর উপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হবে কেবল তাকওয়ার মাপকাঠিতে।
মনে রেখো, সকলকে একদিন আল্লাহ তাআলার সামনে হাজির হতে হবে। সে দিন তিনি প্রতিটি কাজের হিসাব গ্রহণ করবেন। তোমরা আমার পরে গোমরাহিতে লিপ্ত হবে না, পরস্পর হানাহানিতে মেতে উঠবে না। আমি শেষ নবী, আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না। আমার মাধ্যমে ওয়াহীর পরিসমাপ্তি হতে যাচ্ছে। আমি তোমাদের জন্য দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এই দুটি বস্তু আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা নিঃসন্দেহে পথভ্রষ্ট হবে না। একটি আল্লাহর কিতাব ও অপরটি রাসূলের সুন্নাহ।
প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে আমার কথাগুলো পৌঁছিয়ে দেয়। হতে পারে, যাদের কাছে পৌঁছানো হবে তাদের মধ্যে এমন অনেকে থাকবে যারা উপস্থিত শ্রোতার চাইতে আমার কথাগুলো ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবে।'
খুতবা শেষে আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদেরকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা তখন কী বলবে?'
সাহাবিরা উত্তর দিলেন, 'আমরা সাক্ষ্য দেবো, নিশ্চয়ই আপনি আপনার বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আমাদের আন্তরিক উপদেশ দিয়েছেন।' এরপর আল্লাহর রাসূল আকাশের দিকে আঙুল তুললেন, এরপর আবার মানুষের দিকে আঙুল দেখালেন, এরকম কয়েকবার করলেন আর বলতে থাকলেন, 'হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো! হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো! হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো!'
📄 বিদায় হজ্জের ভাষণ থেকে শিক্ষা
১) রাসূলুল্লাহ সকল জাহিলিয়াতের শেকড় আনুষ্ঠানিকভাবে উপড়ে ফেলছেন। এটা ছিল নতুন যুগের শুরু এবং আগের যুগের সমাপ্তি। রাসূলুল্লাহ সর্বপ্রথম নিজের ও নিজের পরিবারের হাতে জাহিলিয়াতের নিয়মগুলো বাতিল করছেন। এ কারণে জাহিলিয়াতের যুগে ঘটা রবিয়া ইবন হারিসের হত্যাকাণ্ডের জন্য রক্তপণের দাবি ছেড়ে দিচ্ছেন। তিনি ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়। রাসূলুল্লাহ যখন সুদকে নিষিদ্ধ করেছেন, তখন সর্বপ্রথমে আব্বাস ইবন মুত্তালিবের সুদ বাতিল করছেন। আব্বাস জাহিলিয়াতের যুগে লোকজনকে ধার দিতেন এবং এর ওপর সুদ ধার্য করছিলেন। নিজ চাচার সুদের দাবি বাতিল করে আল্লাহর রাসূল শুধু মূলধন ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। যে কোনো ব্যাপারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্য সবচেয়ে উত্তম হলো নিজের বা নিজের পরিবারের মাধ্যমে বিষয়টি শুরু করা।
২) আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের সতর্ক করছেন নিজেদের মধ্যকার অনৈক্যের ব্যাপারে। শয়তান কুফফারদের মধ্যে ঝগড়া-ফাসাদ বাঁধানোর ব্যাপারে তেমন পরোয়া করে না। কারণ তারা ইতিমধ্যেই কাফির হয়ে গেছে এবং তারা জাহান্নামের আগুনে যাবেই। কিন্তু সে মুসলিমদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, কারণ মুসলিমদের সে কাফির বানাতে পারে না, তাই সে তাদের মধ্যে বিভেদ আর অনৈক্য তৈরি করে, মুসলিমদের অন্তরে ওয়াসওয়াসা দিয়ে তাদের প্ররোচিত করে এবং ফিতনা বাঁধায়।
৩) আল্লাহর রাসূল বলছেন, কোনো বিকলাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ দাসকে যদি আমাদের ওপর নেতা হিসেবে নিযুক্ত করা হয় এবং সে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী বিচার করে তাহলে তার আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক। এ কথা থেকে আমরা বুঝতে পারি, শাসক যে-ই হোক, যেমনই হোক, তাদের চরিত্র যা-ই হোক, তাদের বংশপরিচয় যা-ই হোক, সে যদি আল্লাহর কিতাব দিয়ে শাসন করে, তাহলে তাকে মেনে চলা বাধ্যতামূলক। আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ দিয়ে শাসন করা একজন শাসকের বৈধ শাসক হবার মূল শর্ত।
৪) আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের বুক থেকে বর্ণ বা গোত্রভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের বোধকে মুছে ফেলতে চেয়েছেন। ইসলাম একটি সর্বজনীন দ্বীন, কোনো জাতি বা গোত্র বিশেষের দ্বীন নয়। এই দ্বীন যারা পালন করে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হবে তাক্বওয়ার মাধ্যমে, জাতি, বর্ণ অথবা গোত্রের মাধ্যমে নয়।
৫) আল্লাহর রাসূল মুসলিমদের গুনাহের ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন। তিনি বলেছেন, শয়তান হয়তো মুসলিমদের দ্বারা কুফরি করাতে পারবে্বা না, কিন্তু মুসলিমদের গুনাহে লিপ্ত করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা চালাবে। আজকে আমরা মুসলিমদের মধ্যে এটাই দেখছি, তারা ইসলাম হয়তো ত্যাগ করছে না, কিন্তু গুনাহ এবং পাপ কাজের কারণে তারা নিজেদের ধ্বংস এবং অবমাননা ডেকে এনেছে।
৬) এই খুতবায় আল্লাহর রাসূল একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলে গেছেন, তা হলো, মুসলিমরা যদি দুটো জিনিসকে আঁকড়ে ধরে, তা হলে তারা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। এ দুটো হলো কুরআন এবং সুন্নাহ। এই আদেশ শুধু সেই যুগের মানুষদের ওপর প্রযোজ্য নয়, বরং সকল যুগের সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। সভ্যতার গতিবিধি যেদিকেই গড়াক, প্রযুক্তি যতই উৎকর্ষ লাভ করুক, বিশ্বব্যবস্থা যা-ই হোক, মুসলিমদের জন্য চিরন্তন জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম, যার উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। আর কিয়ামত পর্যন্ত এর কোনো পরিবর্তন হবে না। পৃথিবীর সকল যুগের, সকল স্থানের যেকোনো সমস্যার সমাধান কুরআন ও সুন্নাহ এর নির্দেশিত পথেই হবে, এর কোনো নড়চড় হবে না।
📄 আল্লাহর রাসূলের ﷽ দুআ
বিদায় হজ্জের আলোচনার উপসংহার হিসাবে যোগ্য আল্লাহর রাসূলের এই দু'আটি। শাইখ আবুল হাসান আন-নাদভী তাঁর আস-সীরাহ আন-নববী গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন,
'হে আল্লাহ! তুমি নিশ্চয়ই আমার কথাগুলো শুনেছো, দেখেছো আমি কোথায় আছি। তুমি আমার অন্তরের খবর জানো, তুমি আমার বাহ্যিক অবস্থাও জানো, আমার কিছুই তোমার কাছে গোপন নয়। আমি অসহায়, দুর্বল। আমি তোমার কাছে সাহায্য চাই, তোমার কাছে আশ্রয় চাই। আমি তোমার শাস্তির আশঙ্কা করি, ভয় করি। আমি নিজের সমস্ত দোষ তোমার কাছে স্বীকার করে নিচ্ছি। এক অসহায় বান্দা হিসেবে আমি তোমার কাছে সাহায্য চাই, গুনাহগার হিসেবে আমি তোমার কাছে তাওবা করি। একজন ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ হয়ে আমি তোমার কাছে মিনতি করছি, নিজেকে সঁপে দিয়ে তোমার কাছে মিনতি করছি, অঝোরে কেঁদে তোমার কাছে মিনতি করছি, বিনম্র হয়ে তোমার কাছে মিনতি করছি। ও আল্লাহ! ও আমার রব! তুমি আমার এই মিনতি কবুল করে আমাকে সন্তুষ্ট করো। আমার প্রতি দয়া করো, করুণা করো! তুমিই তো শ্রেষ্ঠ দুআ শ্রবণকারী, তুমিই তো শ্রেষ্ঠ দাতা!'
📄 'আমি যার মাওলা, আলী ؓ তার মাওলা'
আলী ইবন আবি তালিব তখন ইয়েমেনের আমীর। সে সময় তার কর্তৃত্ব নিয়ে কিছু গুঞ্জন ওঠে। আলীর সাথে সাদাকার কিছু উট ছিল, তার সৈন্যরা উটগুলোকে ব্যবহার করতে চাচ্ছিল। কিন্তু আলী রাজি হলেন না। তার অবর্তমানে সৈনিকরা সেই উটগুলো ব্যবহার করা শুরু করে। বিষয়টা জানতে পেরে আলী খুব রেগে গেলেন。
কিছু লোকের কাছে আলীর এই আচরণ পছন্দ হলো না। ফলে তার বিরুদ্ধে গুজব রটে গেল। অভিযোগগুলো একসময় আল্লাহর রাসূলের কান পর্যন্ত পৌঁছলো। একজন সাহাবি এই অভিযোগগুলোকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। তার হাঁটুতে হাত রেখে আল্লাহর রাসূল প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা, বলো তো, তুমি কি আলীকে অপছন্দ করো?' সাহাবির সোজাসাপ্টা উত্তর, 'হ্যাঁ, করি।' রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, 'তোমার উচিত তাকে ভালোবাসা।' সেই সাহাবি বলেন, 'এরপর থেকে আলী ইবন আবি তালিব হয়ে গেলেন আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন।'
বিদায় হজ থেকে ফিরে আসার সময় আল্লাহর রাসূল গাদিরখুম নামক এক জায়গায় এসে মানুষদের জড়ো করেন। আলীর ব্যাপারে সেই বিখ্যাত উক্তিটি তিনি সেখানেই করেন। কথাটা ছিল, 'মান কুনতু মাওলা, ফা 'আলীউ মাওলা -- আমি যদি কারো মাওলা হই, তবে আলীও তার মাওলা। মাওলা মানে বন্ধু। রক্ষাকারী। ঘনিষ্ঠ সহচর।
এই সবগুলো অর্থই আলীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু শিয়ারা এই ঘটনা আর এই উক্তিকে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করে। তারা এই উক্তিটি দেখিয়ে দাবি করে, আল্লাহর রাসূল এ কথার মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর পর আলীকে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
আসলে, আল্লাহর রাসূল কেন গাদিরখুমে এই কথাটি বলেছিলেন? আলীর বিরুদ্ধে মানুষের ভুল ধারণা আর বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য। আলীর নামে গুজব সৃষ্টি হয়েছিল, তাই রাসূলুল্লাহ সবার সামনে আলীকে সম্মানিত করলেন যেন সবাই বুঝতে পারে আলীর মর্যাদা কত ওপরে। আলী ছিলেন রাসূলুল্লাহর চাচাতো ভাই, তাঁর মেয়ে ফাতিমার স্বামী, তাঁর রেখে যাওয়া একমাত্র বংশধরদের বাবা। আমরা জানি, নাতি হাসান এবং হুসাইন ছাড়া রাসূলুল্লাহর আর কোনো বংশধর ছিল না। তাই রাসূলুল্লাহ সবাইকে বলছিলেন, আমি যদি তোমাদের বন্ধু হই তবে আলীও তোমাদের বন্ধু। তোমরা যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আলীকেও ভালোবাসতে হবে। এ কথা থেকে সাহাবি হিসেবে আলীর উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে প্রথম খলিফা হওয়ার কোনো নির্দেশ বা ইঙ্গিত এখানে নেই।