📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আদী ইবন হাতিমের ؓ কাহিন

📄 আদী ইবন হাতিমের ؓ কাহিন


আদী ইবন হাতিম ছিলেন বিখ্যাত দানবীর হাতিম তাঈয়ের সন্তান। তিনি ছিলেন খ্রিস্টান। আরবের ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়ার বদৌলতে রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে তার তেমন মোটেও উচ্চ ধারণা ছিল না। আদী ইবন হাতিমের মূল বর্ণনাকে কিছুটা সংক্ষিপ্ত ও অনুলিখিত আকারে জানা যাক,

'আমি রাসূলুল্লাহকে যতটা ঘৃণা করতাম, আরবের কেউ তাকে এতটা ঘৃণা করতো না। আমি নিজে ছিলাম অভিজাত বংশের লোক, খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী। গনিমতের এক-চতুর্থাংশ আমি লাভ করতাম। নিজ গোত্রে রাজার হালে থাকতাম। রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে যখন শুনলাম, প্রচণ্ড ঘৃণা হলো। এক আরবি গোলামকে বললাম, কিছু বেগবান আর হৃষ্টপুষ্ট উটকে কাছাকাছি বেঁধে রাখিস তো। মুহাম্মাদের বাহিনী যদি আক্রমণ করে, আমাকে খবর দিস। একদিন সকালে সে এসে আমাকে জানালো, মুহাম্মাদের বাহিনী এসে পড়েছে, কী করতে চান করে ফেলুন। বললাম, উটগুলো নিয়ে আয়।

আমি আমার পরিবার আর সন্তানদের নিয়ে শামে খ্রিস্টানদের কাছে চলে এলাম, ফেলে আসলাম আমার বোনকে। রাসূলুল্লাহর বাহিনীর হাতে অনেকের সাথে আমার বোনও বন্দী হলো। তাকে রাখা হলো মসজিদের সামনে খোঁয়াড়ের মতো একটি স্থানে। বন্দীদের সেখানেই রাখা হতো। আমার বোন বেশ বুদ্ধিমতী, স্পষ্টভাষী ছিল। সে আল্লাহর রাসূলকে অনুরোধ করলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার বাবা মারা গেছেন। আর আমাকে যিনি দেখাশোনা করতেন, তিনি আমাকে ফেলে গেছেন। আপনি আমার প্রতি সদয় হোন।

এভাবে তিন দিন সে অনুরোধ করলো। রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, তোমার প্রতি সদয় হয়েছি। তুমি তাড়াহুড়া কোরো না। যদি তোমার গোত্রের নির্ভরযোগ্য এমন কাউকে পাও যে তোমাকে দেশে পৌঁছে দেবে, আমাকে জানিও।

এরপরে আমার বোন একটি কাফেলার সন্ধান পেল। রাসূলুল্লাহ তখন তাকে কাপড়চোপড়, বাহন আর পথখরচ দিলেন। আমার বোন সেই কাফেলার সাথে করে শামে চলে এল। আমি আমার পরিবারের সাথে বসে আছি, এমন মুহূর্তে আমার বোন কাফেলা থেকে নামলো। আমাকে দেখেই তিরস্কার করতে লাগলো, জালিম! সম্পর্কচ্ছেদকারী! কীভাবে পারলে তুমি নিজের বৌ-বাচ্চাকে নিয়ে যেতে আর নিজের বাবার মেয়েকে ফেলে আসতে?

আমি নিজের অপরাধ স্বীকার করে মাফ চাইলাম। আমার বোনের কাছে জানতে চাইলাম রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে। সে বললো, তোমার উচিত তার সাথে দেখা করা। তিনি যদি নবী হয়ে থাকেন, তাহলে তার সাথে যারা আগে দেখা করবে, তাদের প্রতি তিনি সদয় হবেন। আর যদি রাজা হয়ে থাকেন, তবে তার মহত্ত্বের সামনে তোমার ছোট হবার কিছু নেই, তুমি তুমিই থাকবে।

আমি মদীনায় চলে গেলাম, রাসূলুল্লাহর নিকট পৌঁছলাম। তিনি তখন মসজিদে বসা। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমি কে। আমি বললাম, আমি আদী ইবন হাতিম। তিনি তখন আমাকে তাঁর ঘরে নিয়ে গেলেন। পথিমধ্যে এক জীর্ণ-শীর্ণ বৃদ্ধার সাথে তাঁর দেখা। বৃদ্ধা তাঁকে দাঁড়াতে বললো, দীর্ঘক্ষণ ধরে তার প্রয়োজনের কথা খুলে বললো। এই দৃশ্য দেখে মনে মনে বললাম, আল্লাহর কসম, এই মানুষটা কিছুতেই রাজা হতে পারে না।

এরপর তিনি আমাকে নিয়ে সামনের দিকে এগোলেন। ঘরে ঢুকে আমাকে একটা বালিশ দিয়ে বললেন, এর উপরে বসো। সেই বালিশের বাহিরে চামড়া, ভেতরে খেজুরের বাকল। তিনি নিজে বসলেন মাটিতে। আমি মনে মনে ভাবলাম, নাহ, আল্লাহর কসম, কোনো রাজা এমন আচরণ করে না।

এরপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা তুমি কি রাকুসি উপদলের? আমি বললাম, জ্বী। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তোমার গোত্রের গনিমতের চার ভাগের এক ভাগ ভোগ করো, তাই না? আমি বললাম, হ্যাঁ। এরপর তিনি বললেন, কিন্তু তোমার ধর্ম অনুযায়ী এটা তো তোমার জন্য বৈধ না, তাই না? আমি স্বীকার করলাম, হ্যাঁ।

এতক্ষণে আমার আর বুঝতে বাকি থাকলো না, তিনি আল্লাহর নবী। যা বলা হয় না, তাও তিনি জানেন। এরপর তিনি আমাকে বললেন, শোনো আদী, চারপাশের অভাব- পীড়িত মানুষদের দেখে হয়তো তুমি এই দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছো, কিন্তু আল্লাহর কসম, সেই দিন খুব দূরে নয়, যেদিন ধন দৌলত এসে উপচে পড়বে আর সেগুলো নেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। হয়তো শত্রুর সংখ্যাধিক্য আর এই মানুষগুলোর দুর্বলতা তোমাকে এই দ্বীন গ্রহণ থেকে পিছপা করে রেখেছে। কিন্তু আল্লাহর কসম, সেই দিন খুব দূরে নয় যেদিন দেখবে একজন নারী সুদূর কাদিসিয়া থেকে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে বায়তুল্লাহ যিয়ারত করবে। আদী, হয়তো এই জিনিস দেখে তোমাকে ইসলাম গ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে যে তুমি দেখছো রাজত্ব আর বাদশাহী অন্যদের মাঝে। কিন্তু আল্লাহর কসম, সেই দিন খুব দূরে নয়, যখন শুনতে পাবে বাবেলের শ্বেত পাথরগুলো মুসলিমদের হাতে বিজিত হয়েছে।

আল্লাহর রাসূলের এ কথাগুলো শোনার পর আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।'

আদী ইবন হাতিমের ঘটনা থেকে বেশ কিছু শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।

প্রথমত, জনপ্রিয় মিডিয়া বা লোকের কথায় কান না দিয়ে নিজে যাচাই করা। আরবের মুশরিকরা রাসূলুল্লাহর ব্যাপারে অনেক মিথ্যা গুজব শুনে ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতো। কিন্তু তাদেরই পরিচিত ও বিশ্বস্ত কারো থেকে যখন রাসূলুল্লাহর ব্যাপারে জানতো, তখন তাঁর সাথে দেখা করার সাহস ও আগ্রহ পেত। আদী ইবন হাতিমের ক্ষেত্রেও আমরা তা দেখতে পাই।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহর রাসূল আর দশটা রাজা-বাদশার মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন মদীনার শাসক, এক বিশাল রাজ্যের অধিপতি। কিন্তু ক্ষমতার অধিকারী মানুষটি দীর্ঘক্ষণ ধরে জীর্ণ-শীর্ণ, দরিদ্র বৃদ্ধ মানুষদের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলতেন, মন দিয়ে তাদের কষ্ট আর অভিযোগের কথা শুনতেন। অতিথিকে ভালো বালিশ দিয়ে নিজে মাটিতে বসে কথা বলতে দ্বিধা করতেন না। এ দুটো দৃশ্য আদী ইবন হাতিমের মনে দাগ কাটে। তিনি বুঝতে পারেন, একজন রাজা কখনো এতটা মাটির মানুষ হতে পারেন না।

তৃতীয়ত, আল্লাহর রাসূল মানুষের মনের কথা পড়তে পারতেন। তিনি আদী সম্পর্কে জানতেন। মদীনার সাদামাটা পরিস্থিতি দেখে রাজার হালে বড় হওয়া আদী ইবন হাতিম যে কিছুটা অস্বস্তি আর সংকোচবোধ করছিলেন সেটা রাসূলুল্লাহ বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তাকে অভয় দিয়েই বললেন, এই অবস্থা সাময়িক, শীঘ্রই পরিস্থিতি বদলে যাবে। একজন দাঈর মধ্যে এই গুণ থাকা খুব জরুরি। মানুষের মন-মানসিকতা ভেদে দাওয়াহর ভাষা ও ধরন উপযোগী হওয়া জরুরি।

চতুর্থত, আদী ইবন হাতিমের গলায় ক্রুশ দেখে রাসূলুল্লাহ তাকে বলেছিলেন, 'তারা তাদের যাজকদের আল্লাহর পাশে শরীক করেছে।' আদী তখন বললেন, 'আমরা আমাদের যাজকদের আল্লাহর পাশে উপাস্য হিসেবে শরীক করি না।' রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, 'কেন? তারা কি হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল করেনি?' আদী জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ।' রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, 'এটাই তাদের উপাসনা করার শামিল।' রাসূলুল্লাহ এখানে শিরকের একটি প্রকার নিয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন। যখন কোনো সরকার বা কর্তৃপক্ষ হালালকে হারাম ঘোষণা করে বা হারামকে হালাল করে, তখন সেই কর্তৃপক্ষের আনুগত্য করাটা শিরক হয়ে যায়, কারণ এর এখতিয়ার শুধুমাত্র আল্লাহর। আইন প্রণয়ন বা বিধান দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর কারো এই অধিকার নেই।

পঞ্চমত, বাহ্যিক চাকচিক্য আর বস্তুগত সাফল্যের ভিত্তিতে কোনো আদর্শ বা ধর্মকে বিচার করা উচিত নয়। আদী দেখতে পাচ্ছিলেন মুসলিমরা দরিদ্র। তাদের তেমন সহায়-সম্বল নেই, ভালো ঘরবাড়ি, উন্নত রাস্তাঘাট বা যাতায়াতব্যবস্থা নেই, জীবনযাত্রার উন্নত মান নেই, যেটা রোমানদের ছিল। কিন্তু তার মানে এই নয়, যে ইসলাম ভুল আর রোমানরাই সঠিক! রাসূলুল্লাহ তখন তাকে বললেন, মুসলিমদের অবস্থাও একসময় বদলে যাবে, উন্নত হয়ে যাবে। আর সেটাই হয়েছিল। আদী ইবন হাতিম নিজের চোখে মুসলিমদের অবস্থা বদলে যেতে দেখেছিলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 ইয়েমেনের আজদ থেকে আগত প্রতিনিধিদল

📄 ইয়েমেনের আজদ থেকে আগত প্রতিনিধিদল


আরবের দক্ষিণে ইয়েমেনের আজদ থেকে সাতজনের একটি প্রতিনিধিদল আসে। তাদের সাথে মদীনার আনসারদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চরিত্র, আচার-ব্যবহারে রাসূলুল্লাহ বেশ মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কারা?' তারা বললো, 'আমরা বিশ্বাসী।' রাসূলুল্লাহ হেসে বললেন, 'সব কথার পেছনে একটা বাস্তবতা থাকে। তোমাদের এই কথার পেছনে বাস্তবতা কী?' তারা বললো, 'আমাদের পনেরটা বৈশিষ্ট্য আছে। তাদের পাঁচটি আপনার দূতদের মাধ্যমে আমরা আদিষ্ট হয়েছি, পাঁচটি আপনি আমাদের পালন করার আদেশ দিয়েছেন এবং পাঁচটি আমরা জাহেলিয়াত থেকে আমরা পালন করে আসছি, যদি না সেগুলিকে আপনি ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দেন।' রাসূলুল্লাহ বললেন, "আমার দূতরা যে আদেশ দিয়েছেন সেগুলি কী কী?' তারা জবাব দিলো, 'আমরা আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাসমূহ, তাঁর নবী-রাসূলগণ, তাঁর কিতাবসমূহ ও মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানে বিশ্বাস স্থাপন করতে আদিষ্ট হয়েছি।' রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, 'আমি যে আদেশগুলো দিয়েছি সেগুলো কী কী?' তারা বললো, 'আপনি আদেশ দিয়েছেন আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নাই এই সাক্ষ্য দিতে, সালাত কায়েম করতে, যাকাত প্রদান করতে, রামাদানে সাওম পালন করতে ও যাদের পক্ষে সম্ভব তাদের হজ্জ সম্পাদন করতে।' রাসূলুল্লাহ এরপর জিজ্ঞেস করলেন, 'আর জাহিলিয়াতের যে পাঁচটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তোমরা ধরে রেখেছ সেগুলো কী?' তারা বললো, 'স্বাচ্ছন্দ্যের সময় কৃতজ্ঞ থাকা, কঠিন সময়ে ধৈর্যশীল থাকা, ভাগ্যে যা আছে তা মেনে নেয়া, যখন পরস্পর প্রতিপক্ষরা একত্র হয় তখন সত্যবাদী থাকা এবং প্রতিপক্ষের বিপদে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ উদযাপন না করা।'

রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তোমরা জ্ঞানী ও বিচক্ষণ এবং তোমাদের জ্ঞানের বদৌলতে তোমরা প্রায় নবীদের সমকক্ষতা অর্জন করেছো।' তাদের কথায় রাসূলুল্লাহ রীতিমতো মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি বললেন, 'তোমরা যা কিছু বললে তা যদি পছন্দ করে থাকো, তবে আমি তোমাদের আরও পাঁচটি দেবো যার কারণে তোমরা বিশটি বৈশিষ্ট্য লাভ করবে। সেগুলো হলো- যা তোমরা খাবে না তা জমা কোরো না, যেখানে তোমরা বাস করবে না সেখানে কিছু নির্মাণ করবে না, এমন কিছু নিয়ে প্রতিযোগিতা করবে না যা তোমরা আগামীকাল পরিত্যাগ করবে, আল্লাহকে ভয় করবে যার প্রতি তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে ও যার সামনে তোমাদের প্রকাশিত হতে হবে এবং তোমাদের সামনে যা আছে যেখানে তোমাদের চিরকাল বাস করতে হবে (অর্থাৎ আখিরাত) তার জন্য সংগ্রাম করো।' এ শুনে তারা ফিরে গেল এবং রাসূলুল্লাহ এর উপদেশ মেনে চলল।

এগুলো ছিল রাসূলুল্লাহর কাছে আসা প্রতিনিধিদলগুলির মধ্যে কয়েকটির বর্ণনা। এটা তাঁর জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত একটা বছর ছিল। তাঁর জীবনসায়াহ্নের এই দিনগুলোতে আরবের সব প্রান্ত থেকে দলে দলে লোকেরা এসে ইসলাম গ্রহণ করছিল। মূলত তাঁর দাওয়াতী জীবনে যা কিছু তিনি করেছিলেন, তার ফসল এই সময়ে পাচ্ছিলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 ইয়েমেনের অধিবাসীদের প্রতি দাওয়াহ

📄 ইয়েমেনের অধিবাসীদের প্রতি দাওয়াহ


আরবের গোত্রগুলো এক এক করে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করতে লাগলো। নতুন এই গোত্রগুলোকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য আল্লাহর রাসূল অভিজ্ঞ এবং আলিম সাহাবিদেরকে তাদের কাছে পাঠালেন। মুআয ইবন জাবাল এবং আবু মূসা আল আশআরী ছিলেন সাহাবিদের মধ্যে বিশেষভাবে তাদের ইলম এবং দাওয়ার জন্য পরিচিত। তাদেরকে পাঠানো হলো ইয়েমেনের দুটো ভিন্ন প্রদেশে।

মুআয ইবন জাবালকে পাঠানো হয়েছিল ইয়েমেনের উত্তরভাগে। তিনি ছিলেন একাধারে তাদের শাসক, বিচারক, শিক্ষক এবং যাকাত সংগ্রাহক। মুআযকে যখন ইয়েমেনের উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছিল, আল্লাহর রাসূল তাঁকে বিদায় দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলেন। মুআয বসে আছেন সওয়ারীর পিঠে, আর আর আল্লাহর রাসূল তাঁর সাথে হেঁটে হেঁটে কথা বলছেন। মুআযকে তিনি বললেন,

'তুমি আহলে কিতাবদের একটি কওমের কাছে যাচ্ছো। তাদের প্রতি তোমার প্রথম আহবান হবে, তারা যেন আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নেয়। তারা তা মেনে নিলে তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ দিনে রাতে তাদের প্রতি পাঁচ বার সালাত ফরজ করে দিয়েছেন। তারা সালাত আদায় করা শুরু করলে তাদেরকে জানিয়ে দিও যে, তাদের ধন-সম্পদে আল্লাহ তাদের প্রতি যাকাত ফরজ করেছেন। এই যাকাত গ্রহণ করা হবে তাদের ধনী লোকদের থেকে, আর এই যাকাত বণ্টন করা হবে তাদেরই গরীবদের মধ্যে। তারা যদি সেটা মেনে নেয়, তাহলে তাদের থেকে যাকাত গ্রহণ করো। তবে লোকজনের ধন- সম্পদের উত্তম অংশ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকো। সাবধান! মযলুমের দুআকে ভয় করবে। কারণ তার দুআ আর আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।

রাসূলুল্লাহ মুআযকে আরও বললেন, 'মুআয, এর পর হয়তো তোমার সাথে আর দেখা হবে না। তুমি হয়তো কেবল আমার মসজিদ এবং কবরটাই দেখবে।' এ কথা শুনে মুআয কেঁদে ওঠেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন এটা ছিল আল্লাহর রাসূলের সাথে তার শেষ সাক্ষাৎ।

আল্লাহর রাসূল আবু মূসা আল-আশআরীকে পাঠালেন ইয়েমেনের দক্ষিণে। তার ভূমিকা ছিল মুআয ইবন জাবালের মতোই -- শাসক, বিচারক, শিক্ষক এবং যাকাত সংগ্রাহক। তাদের দু'জনকেই আল্লাহর রাসূল উপদেশ দিলেন,

'(লোকেদের কাছে দ্বীনকে) সহজ করে দাও, কঠিন কোরো না। সুসংবাদ দাও, মানুষকে তাড়িয়ে দিও না।'

আবু মূসা আল-আশআরী এবং মুয়ায ইবন জাবালের প্রতি আল্লাহর রাসূলের দেওয়া উপদেশ থেকে বেশ কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।

১) সাধারণভাবে যে অঞ্চল থেকে যাকাত আদায় করা হয়, সেটা সেই অঞ্চলেই খরচ করা হবে। তবে যদি অন্য কোনো অঞ্চলে প্রয়োজন থাকে, সেক্ষেত্রে সেই অঞ্চলে যাকাত খরচ করা যাবে।

২) যাকাতের সম্পদ গ্রহণ করার সময় ভালো বা খারাপ মানের সম্পদ না নিয়ে মাঝারি বা গড়পড়তা মানের সম্পদ যাকাত হিসেবে নেওয়া উচিত।

৩) আল্লাহর রাসূল মুআযকে সাবধান করছেন যেন তার দ্বারা মানুষের ওপর জুলুম না হয়। শাসকের হাতে ক্ষমতা থাকে, আর তার দ্বারা জুলুম সংঘটিত হওয়া সবচেয়ে সহজ। কিন্তু মানুষের প্রতি জুলুম করার ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হতে হবে। কারণ মজলুমের দুআ এবং আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।

৪) জিহাদে প্রয়োজন কঠোরতা, আর দাওয়াতে প্রয়োজন বিনয়। আল্লাহর রাসূল মুআয এবং আবু মূসাকে উপদেশ দিচ্ছেন, তারা যেন মানুষের সাথে বিনয়ী হন, দ্বীনকে সহজভাবে তাদের সামনে তুলে ধরেন। অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা অবলম্বন থেকে দূরে থাকেন এবং মানুষের সাথে রূঢ় আচরণ না করেন।

এরপর রাসূলুল্লাহ মদীনার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'মুত্তাক্বী ব্যক্তিরাই আমার আপনজন, তারা যে-ই হোক, তারা যেখানেই থাকুক।' এর মানে হলো, রাসূলুল্লাহর আপন মানুষ হলো তাকওয়ায় অগ্রগামী মানুষেরা। তারা কোথা থেকে এসেছে, তাদের পরিচয় কী সেটা মুখ্য নয়। রাসূলুল্লাহ মুআয ইবন জাবালকে আরও বলেন, 'বিলাসিতা সম্পর্কে সাবধান হও, কারণ আল্লাহর বান্দারা বিলাসিতায় লিপ্ত হয় না।'

টিকাঃ
১১৫. সহীহ বুখারি, অধ্যায় তাওহীদ, হাদীস ২। সুনান ইবন মাজাহ, অধ্যায় যাকাত, হাদীস ১।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হামদান গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

📄 হামদান গোত্রের ইসলাম গ্রহণ


রাসূলুল্লাহ খালিদ ইবন ওয়ালিদকে ইয়েমেনের হামদান গোত্রের কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ছয় মাসের মতো সেখানে অবস্থান করার পরও সেখানকার মানুষজন তার দাওয়াতে তেমন সাড়া দিলো না। এরপর রাসূলুল্লাহ তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে তার বদলে আলীকে পাঠালেন। আলীকে বলে দিলেন, সৈনিকদের মধ্যে কেউ চাইলে খালিদের সাথে ফেরত আসতে পারে অথবা আলীর সাথেও থেকে যেতে পারে। সেখানে পৌছে আলী তার অধীনস্থ সব মুসলিমদের কাতারবন্দী করে জামাতে সলাত আদায় করলেন।

এরপর তিনি হামদান গোত্রকে একত্র করে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহর চিঠি পড়ে শুনালেন। সেই চিঠি পড়ে পুরো হামদান গোত্র মুসলিম হয়ে গেল। আলী রাসূলুল্লাহকে এই সুসংবাদ চিঠি লিখে জানালেন। রাসূলুল্লাহ খুব খুশি হলেন, সিজদায় পড়ে গেলেন আর বললেন, 'হামদানের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। হামদানের উপর শান্তি বর্ষিত হোক!'

আলী এই গুরু দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না সেটা নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিলেন। তিনি আল্লাহর রাসূলকে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাকে এমন লোকদের উপর আসীন করে পাঠাচ্ছেন যারা আমার চেয়ে বড়। আমার বয়স কম এবং বিচারক হিসেবে আমার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।' রাসূলুল্লাহ তখন আলীর বুকে হাতে রেখে বললেন,

'হে আল্লাহ, তার জবানকে সুদৃঢ় করে দিন, তার অন্তরকে হিদায়েতের উপর রাখুন। আলী, যখন দুই ব্যক্তি বিবাদ করবে এবং তোমার কাছে এসে উপস্থিত হবে তখন তাদের উভয়ের সাক্ষ্য আগে শুনবে। তারপর রায় দেবে। যদি তুমি এভাবে চল, তাহলে বিচার ফায়সালা করা তোমার জন্য সহজ হবে।'

আলী বলেন, 'এরপর থেকে আমি আর কখনোই বিচার করতে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হইনি।'

বিচারক হিসেবে আলী কতটা বিচক্ষণ ছিলেন ইতিহাসই সেটার সাক্ষী। তিনি উমার এবং উসমানের সময় বিচারক ছিলেন। তারা দু'জনেই আলীর বিচারের ওপর খুব আস্থাশীল ছিলেন, ইসলামী রাষ্ট্রের সূক্ষ্ম ও নাজুক বিষয়ের ফায়সালার ভার তার উপর অর্পণ করতেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px