📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আব্দ-কাইসের প্রতিনিধিদল

📄 আব্দ-কাইসের প্রতিনিধিদল


আরবের একদম পূর্ব দিকের গোত্র বনু আব্দিল কাইস থেকে প্রতিনিধিদল আসে। রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, 'আমি তোমাদের চারটি জিনিসের আদেশ দিচ্ছি ও চারটি জিনিস হতে সতর্ক করছি। আমি তোমাদের আদেশ করছি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে। তোমরা কি জানো আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা বলতে কি বোঝায়? আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন বলতে বোঝায় এটা সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই, সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রামাদানে সাওম পালন করা এবং গনিমতের এক পঞ্চমাংশ দান করা।' জিহাদের ময়দানে যে গনিমত পাওয়া যায়, তার এক পঞ্চমাংশ আমীর অর্থাৎ নেতাকে দান করে দেওয়াটা ছিল নিয়ম। এরপর তিনি চারটি জিনিস থেকে দূরে থাকতে বললেন। সেগুলি ছিল চার রকমের পাত্র, যেগুলি দ্বারা মদ পান করা হতো। অর্থাৎ তিনি তাদের মদপান থেকেই শুধু নয়, বরং মদপানের জন্য ব্যবহৃত পাত্রগুলি ব্যবহার করা থেকেও দূরে থাকতে বললেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বনু হানীফার প্রতিনিধিদল

📄 বনু হানীফার প্রতিনিধিদল


বনু হানীফা গোত্র থেকে একটা প্রতিনিধিদল এসেছিল। বনু হানীফা গোত্রের কথা আগে আলোচনা করা হয়েছে, যারা ছিল আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে সবচাইতে শত্রুভাবাপন্ন এবং রূঢ়। সেই গোত্রে ছিল মুসাইলামা। মুসাইলামা ইসলামের ইতিহাসে পরিচিত মুসাইলামা আল-কাযযাব বা মিথ্যাবাদী মুসাইলামা নামে। কারণ আল্লাহর রাসূলের জীবদ্দশাতেই সে নবুওয়াতের মিথ্যে দাবি করেছিল।

মুসাইলামা আল কাযযাব এসে রাসূলুল্লাহর কাছে দাবি করলো যদি তাঁর মৃত্যুর পর মুসাইলামাকে নেতৃত্ব দেওয়া হয়, তবে সে রাসূলুল্লাহর অনুসারী হবে। রাসূলুল্লাহ তাকে এক টুকরো খেজুরের ডাল দেখিয়ে বললেন, 'তুই যদি আমার কাছে এই খেজুরের ডালটাও চাস, সেটাও পাবি না। আল্লাহ তোর জন্য যা রেখেছেন তার চাইতে এক বিন্দু বেশিও তুই পাবি না। তুই যদি ফিরে যাস, আল্লাহ তোকে ধ্বংস করবেন। আর আমার বিশ্বাস তুই-ই সে-ই, যাকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। আমার পক্ষ হয়ে সাবিত ইবন কাইস তোর সাথে কথা বলবে।' এই বলে আল্লাহর রাসূল চলে গেলেন।

যে স্বপ্নের কথা তিনি বলছিলেন সেটা অন্য বর্ণনায় এসেছে। স্বপ্নটা ছিল এমন: রাসূলুল্লাহ স্বপ্নে তাঁর দুই হাতে দুটো বালা দেখেছেন। তাঁকে বলা হলো যেন তিনি সেগুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ ফুঁ দিলেন আর সেগুলো উড়ে গেল। এই দুটো বালা হলো দুই মিথ্যা নবী আসওয়াদ আল আনসি এবং মুসাইলামা আল-কাযযাব।

এই মুসাইলামা পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। লিখেছিল হিজরি দশ বা এগারো সালে। সে লিখেছিল, 'আল্লাহর রাসূল মুসাইলামা থেকে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের প্রতি, আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি আপনার সাথে বিবাদে লিপ্ত ছিলাম। যাই হোক, গোটা রাজ্যের অর্ধেক ক্ষমতা আমাকে দেওয়া হয়েছে, আর বাকিটা কুরাইশদের। কিন্ত কুরাইশরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।'

সে আল্লাহর রাসূলের সাথে সমান-সমান ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে চাচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহ চিঠির জবাবে লিখলেন,

'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হতে মিথ্যাবাদী মুসাইলামার প্রতি, শান্তি বর্ষিত হোক তাদের প্রতি, যারা পথনির্দেশ অনুসরণ করে। এই জমিন আল্লাহর এবং তিনি এটা যাকে ইচ্ছা দান করেন। চূড়ান্ত সফলতা তাদের জন্য যারা ন্যায়নিষ্ঠ।'

যে দু'জন মুসাইলামার এই চিঠি বহন করেছিল রাসূলুল্লাহ তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে আমিই আল্লাহর রাসূল?' তারা বললো, 'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুসাইলামা আল্লাহর রাসূল।' রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, 'আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস করি। যদি আমি কখনো কোনো বার্তাবাহককে হত্যা করতাম, তবে আমি তোমাদের হত্যা করতাম।' অর্থাৎ, পত্রবাহককে হত্যা করা ইসলামে নিষিদ্ধ, যদিও তারা কাফির বা মুরতাদ বাহিনীর হয়। আল্লাহর রাসূল যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন মুসাইলামা অনেক বাগাড়ম্বর করলেও সরাসরি বিদ্রোহ করার সাহস দেখায়নি। তাকে দমন করা হয় আবু বকরের খিলাফতকালে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 নাজরান থেকে প্রতিনিধিদল

📄 নাজরান থেকে প্রতিনিধিদল


এরপর আসে নাজরানের প্রতিনিধিদল। এই দলটি ছিল খ্রিস্টান। আল্লাহর রাসূল এর একটি চিঠির জবাবে তারা দেখা করতে আসে। সে চিঠিতে আল্লাহর রাসূল তাদের ইসলাম গ্রহণের আহবান জানিয়েছিলেন। সেখানে বলা ছিল, যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে, তাহলে তাদের হাতে দুটো রাস্তা খোলা থাকবে হয় তারা জিযিয়া দেওয়ার মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে, অথবা মুসলিমরা তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে। এই চিঠি পেয়ে নাজরানের রাজা ১৪ জন সম্ভ্রান্ত খ্রিস্টান নেতাকে মদীনায় পাঠালো।

তারা মদীনায় এল খুব জমকালো পোশাকে। আল্লাহর রাসূল তাদের এই সাজপোশাক দেখে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। পরদিন তারা সাধারণ বেশে এল। এরপর আল্লাহর রাসূল তাদের সাথে দেখা করলেন, তাদের ইসলাম গ্রহণের আহবান জানালেন। তারা প্রত্যাখ্যান করলো এবং দাবি করলো তারাই হকের ওপরে আছে। বিষয়টা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলে সাব্যস্ত করতো। কিন্তু আল্লাহর রাসূল বললেন ঈসা আল্লাহর পুত্র নন, বরং তিনি আল্লাহর একজন রাসূল। তারা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র হিসেবে প্রমাণ করার জন্য বললো, 'ঠিক আছে তাহলে এমন একজনের উদাহরণ দিন যাকে পিতা ছাড়া সৃষ্টি করা হয়েছে।' তখন আল্লাহ তাআলা তাদের ভুল প্রমাণ করে আয়াত নাযিল করলেন,

"নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের মত, তিনি তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে বললেন, হও, ফলে সে হয়ে গেল। সত্য তোমার রবের পক্ষ থেকে, সুতরাং তুমি সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা আলে ইমরান, ৩: ৫৯-৬০)

এই আয়াতটিই তাদের থেমে যাবার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এরপরেও তারা তর্ক চালিয়ে গেল। তখন আল্লাহর রাসূল তাদের মুবাহালার আমন্ত্রণ জানালেন। মুবাহালা হলো দুই বিবাদমান পক্ষ কামনা করবে তাদের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী, তার ওপর যেন আল্লাহ তাআলার গজব নেমে আসে। কুরআনে এই মুবাহালার কথা এসেছে।

"অতঃপর তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর যে তোমার সাথে এ বিষয়ে ঝগড়া করে, তবে তুমি তাকে বলো, এসো আমরা ডেকে নেই আমাদের সন্তানদেরকে ও তোমাদের সন্তানদেরকে, আর আমাদের নারীদেরকে ও তোমাদের নারীদেরকে এবং আমাদের নিজদেরকে ও তোমাদের নিজদেরকে, তারপর আমরা বিনীত প্রার্থনা করি, মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহর লা'নত করি।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩: ৬১)

সূরা আলে ইমরানের প্রায় আশিটি আয়াত নাযিল হয়েছিল এই প্রেক্ষাপটে। মুবাহালার শর্ত অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল পরের দিন আলী ইবন আবি তালিব, হাসান, হুসাইন এবং ফাতিমাকে নিয়ে হাজির হলেন মুবাহালায় মোকাবেলা করার জন্য। কিন্তু খ্রিস্টানরা মুবাহালার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে রাজি হলো না। যদিও তারা অনেক তর্ক করছিল, কিন্তু তারা মুবাহালায় গেল না এই ভেবে যে যদি সত্যিই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল হন তবে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। তাই তারা তর্কে না গিয়ে রাসূলুল্লাহর বিচার মেনে নিতে রাজি হলো। রাসূলুল্লাহ তাদের থেকে কিছু সম্পদের বিনিময়ে শান্তিচুক্তি করলেন। চলে যাওয়ার সময় তারা বললো, 'আমাদের সাথে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে প্রেরণ করুন।' রাসূলুল্লাহ বললেন, "আমি তোমাদের সাথে এমন একজনকে প্রেরণ করবো যে, পরিপূর্ণভাবে বিশ্বস্ত।' তারপর তিনি পাঠালেন আবু উবাইদা ইবন আল-যাররাহকে। এই কারণেই আবু উবাইদা আমর ইবন আল-যাররাহকে বলা হয় এই উম্মাতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বনু সাদ ইবন বাকর গোত্র থেকে প্রতিনিধি

📄 বনু সাদ ইবন বাকর গোত্র থেকে প্রতিনিধি


বনু সা'দ ইবন বাকর গোত্র থেকে একজনই প্রতিনিধি হিসেবে এসেছিলেন, তার নাম দিলাম ইবন সালাবা। মুসনাদ আহমাদের বর্ণনায়, দিলাম আসলেন, উটকে বাইরে বেঁধে মসজিদে প্রবেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ তখন সাহাবিদের সাথে বসা। সে এসেই জিজ্ঞেস করলো,

- তোমাদের মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র কে?

- আমিই আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র, রাসূলুল্লাহ উত্তর দিলেন।

যদিও রাসূলুল্লাহ ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের নাতি। কিন্তু আবদুল্লাহ মুত্তালিব ছিলেন অনেক বিখ্যাত, তাই তার নামেই তার পরিবারকে সবাই চিনতো। আর পূর্বপুরুষদেরকে আরবরা পিতৃতুল্য মনে করতো。

- আচ্ছা, আপনিই কি মুহাম্মাদ?

- হ্যাঁ।

- আমি আপনাকে সোজাসাপ্টা কিছু প্রশ্ন করবো, আশা করি আপনি রেগে যাবেন না।

- না, আমি রাগবো না। তোমার যা বলার আছে বলতে পারো।

- আপনার ও আপনার পূর্ববর্তীদের রবের নামে আমি আপনাকে প্রশ্ন করছি, তিনি কি আপনাকে একজন রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন?

- হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ, তিনি আমাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন।

- আপনার ও আপনার পূর্ববর্তীদের রবের নামে আপনার কাছে জানতে চাই, তিনি কি আপনাকে আদেশ করেছেন আমরা যেন শুধু তারই ইবাদাত করি এবং এই দেবতাদের উপাসনা করা ছেড়ে দেই?

- হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ, তিনি বলেছেন।

- আপনার ও আপনার পূর্ববর্তীদের রবের নামে প্রশ্ন করছি, তিনি কি আপনাকে আদেশ করেছেন যেন আমরা এই দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি?

- হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ, তিনি তাই আদেশ করেছেন।

এভাবে দিমাম তাঁকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ নিয়েই একই প্রশ্ন করলেন ও রাসূলুল্লাহ একই উত্তর দিলেন। তারপর সে বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কেউই নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আমি সেসবের অনুসরণ করবো যা আপনি আদেশ করেছেন এবং সেসব থেকে বিরত থাকবো যেসব থেকে আপনি বিরত থাকতে বলেছেন। এর সাথে কিছুই যোগ করবো না বাদ দেবো না।'

দিমাম তার গোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তার বরকতময় দাওয়াতে সেই দিনেই তার গোত্রের সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন। ইবন আব্বাস তার ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন, 'আমরা আর কোনো প্রতিনিধিদলের কথা জানি না যেটা কিনা দিমাম ইবন সালাবার চাইতে চেয়ে বেশি বরকতময় ছিল।'

ফন্ট সাইজ
15px
17px