📄 সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধিদল
সাকীফ গোত্র রাসূলুল্লাহর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে তারা চেয়েছিল সমঝোতায় পৌঁছতে। তারা চাচ্ছিলো তারা ইসলাম গ্রহণ করবে ঠিকই কিন্তু তাদের প্রধান দেবতার মূর্তিকে যেন এক বছরের জন্য রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। তাদের ধারণা ছিল হঠাৎ করে এত বছরের পুরোনো দেবতাকে মাটির সাথে মিশে যেতে দেখলে গোত্রের সাধারণ জনগণ একটা বড় রকমের ধাক্কা খাবে, বিষয়টা মেনে নিতে পারবে না। তারা এও চাচ্ছিলো তাদের ওপর যেন ব্যভিচার, মদপান, সুদ খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া না হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাদের একটি দাবিও মানলেন না। এরপর তারা চাইলো অন্তত এক মাসের জন্য হলেও যেন ছাড় দেওয়া হয়। তবু রাসূলুল্লাহ রাজি হলেন না। যখন তারা বুঝলো আল্লাহর রাসূল এরকম কিছুর অনুমতি দেবেনই না, তখন তারা শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে বললো, 'ঠিক আছে, তবে আমরা আমাদের মূর্তি ভাঙবো না। আপনাদের মধ্যে কাউকে পাঠিয়ে এ কাজটি করতে হবে।'
এরপর রাসূলুল্লাহ আবু সুফিয়ান ও মুগীরাহ ইবন শু'বাহকে পাঠালেন। মুগীরাহ নিজেই ছিলেন সাকীফ গোত্রের। তারা যখন মূর্তি ভাঙতে গেলেন, তখন সাকীফরা তাকে অভিশাপ দিতে লাগলো এই বলে যে তাদের ওপর কুষ্ঠরোগসহ অন্যান্য রোগব্যাধি, বিভিন্ন দুঃখ দুর্দশা আপতিত হবে। তারা আসলেই বিশ্বাস করতো মূর্তি ভেঙে ফেললে তাদের ওপর গজব নেমে আসবে। তাদের এই কুসংস্কার ভুল প্রমাণ করার জন্য মুগীরাহ একটি ফন্দি আঁটলেন। তিনি মূর্তিতে আঘাত করার পর ভান করলেন তিনি জোরে একটা ধাক্কা খেয়েছেন আর সেই ধাক্কায় মাটিতে পড়ে গেলেন। সবাই এটা দেখে খুশি হয়ে গেল, ভাবলো, নিশ্চয়ই মুগীরাহর কর্মকাণ্ডে দেবতা ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে আঘাত করে ফেলে দিয়েছে। তারপর মুগীরাহ উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, 'আরে বোকার দল! এটা এক টুকরো পাথর ছাড়া কিছুই না।' এরপর তিনি সেটা টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেললেন।
📄 বনু তামীম থেকে আগত প্রতিনিধিদল
বনু তামীম থেকেও প্রতিনিধিদল আসে। রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, 'সুসংবাদ গ্রহণ করো, বনু তামীম!' তারা বললো, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, সুসংবাদ তো দিয়েছেন, এখন আমাদের কিছু দিন।' বনু তামীম আসলে রাসূলুল্লাহর সুসংবাদের চেয়েও হাতেনাতে দুনিয়াবী ফল পেতে বেশি আগ্রহী ছিল। তাদের এই মনোভাব রাসূলুল্লাহর পছন্দ হলো না। এরপর ইয়েমেন থেকে একটা প্রতিনিধিদল এল। রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, 'সুসংবাদ গ্রহণ করো, কেননা বনু তামীম তা গ্রহণ করেনি।' তারা জবাব দিলো, 'আমরা গ্রহণ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ।'
যখন কোনো প্রতিনিধিদল আসতো, তখন রাসূলুল্লাহ তাদের একজনের হাতে নেতৃত্ব অর্পণ করতেন। বনু তামীমের ছিল দুইজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি -- আকরা ইবন হাবিস ও কাকা ইবন মাবদ ইবন যুরারা। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রাসূলকে বললেন যেন কাকা ইবন মাবদকে নেতৃত্ব দেওয়া হয়। আর উমার ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন যেন আকরা ইবন হাবিসকে নেতৃত্ব দেওয়া হয়। আবু বকর শুনে রেগে গেলেন, বললেন, 'আমার বিপরীতে তোমাকে কিছু একটা বলতেই হবে, তাই তুমি এমনটা করেছো!' উমার এই অভিযোগ অস্বীকার করলেন এবং তারা দু'জন তর্কে লিপ্ত হলেন। তাদের কণ্ঠস্বর জোরালো হতে লাগলো। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তখন আয়াত নাযিল করলেন,
“মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন।” (সূরা হুজুরাত ৪৯: ১)
📄 আব্দ-কাইসের প্রতিনিধিদল
আরবের একদম পূর্ব দিকের গোত্র বনু আব্দিল কাইস থেকে প্রতিনিধিদল আসে। রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, 'আমি তোমাদের চারটি জিনিসের আদেশ দিচ্ছি ও চারটি জিনিস হতে সতর্ক করছি। আমি তোমাদের আদেশ করছি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে। তোমরা কি জানো আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা বলতে কি বোঝায়? আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন বলতে বোঝায় এটা সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই, সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রামাদানে সাওম পালন করা এবং গনিমতের এক পঞ্চমাংশ দান করা।' জিহাদের ময়দানে যে গনিমত পাওয়া যায়, তার এক পঞ্চমাংশ আমীর অর্থাৎ নেতাকে দান করে দেওয়াটা ছিল নিয়ম। এরপর তিনি চারটি জিনিস থেকে দূরে থাকতে বললেন। সেগুলি ছিল চার রকমের পাত্র, যেগুলি দ্বারা মদ পান করা হতো। অর্থাৎ তিনি তাদের মদপান থেকেই শুধু নয়, বরং মদপানের জন্য ব্যবহৃত পাত্রগুলি ব্যবহার করা থেকেও দূরে থাকতে বললেন।
📄 বনু হানীফার প্রতিনিধিদল
বনু হানীফা গোত্র থেকে একটা প্রতিনিধিদল এসেছিল। বনু হানীফা গোত্রের কথা আগে আলোচনা করা হয়েছে, যারা ছিল আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে সবচাইতে শত্রুভাবাপন্ন এবং রূঢ়। সেই গোত্রে ছিল মুসাইলামা। মুসাইলামা ইসলামের ইতিহাসে পরিচিত মুসাইলামা আল-কাযযাব বা মিথ্যাবাদী মুসাইলামা নামে। কারণ আল্লাহর রাসূলের জীবদ্দশাতেই সে নবুওয়াতের মিথ্যে দাবি করেছিল।
মুসাইলামা আল কাযযাব এসে রাসূলুল্লাহর কাছে দাবি করলো যদি তাঁর মৃত্যুর পর মুসাইলামাকে নেতৃত্ব দেওয়া হয়, তবে সে রাসূলুল্লাহর অনুসারী হবে। রাসূলুল্লাহ তাকে এক টুকরো খেজুরের ডাল দেখিয়ে বললেন, 'তুই যদি আমার কাছে এই খেজুরের ডালটাও চাস, সেটাও পাবি না। আল্লাহ তোর জন্য যা রেখেছেন তার চাইতে এক বিন্দু বেশিও তুই পাবি না। তুই যদি ফিরে যাস, আল্লাহ তোকে ধ্বংস করবেন। আর আমার বিশ্বাস তুই-ই সে-ই, যাকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। আমার পক্ষ হয়ে সাবিত ইবন কাইস তোর সাথে কথা বলবে।' এই বলে আল্লাহর রাসূল চলে গেলেন।
যে স্বপ্নের কথা তিনি বলছিলেন সেটা অন্য বর্ণনায় এসেছে। স্বপ্নটা ছিল এমন: রাসূলুল্লাহ স্বপ্নে তাঁর দুই হাতে দুটো বালা দেখেছেন। তাঁকে বলা হলো যেন তিনি সেগুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ ফুঁ দিলেন আর সেগুলো উড়ে গেল। এই দুটো বালা হলো দুই মিথ্যা নবী আসওয়াদ আল আনসি এবং মুসাইলামা আল-কাযযাব।
এই মুসাইলামা পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। লিখেছিল হিজরি দশ বা এগারো সালে। সে লিখেছিল, 'আল্লাহর রাসূল মুসাইলামা থেকে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের প্রতি, আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি আপনার সাথে বিবাদে লিপ্ত ছিলাম। যাই হোক, গোটা রাজ্যের অর্ধেক ক্ষমতা আমাকে দেওয়া হয়েছে, আর বাকিটা কুরাইশদের। কিন্ত কুরাইশরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।'
সে আল্লাহর রাসূলের সাথে সমান-সমান ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে চাচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহ চিঠির জবাবে লিখলেন,
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হতে মিথ্যাবাদী মুসাইলামার প্রতি, শান্তি বর্ষিত হোক তাদের প্রতি, যারা পথনির্দেশ অনুসরণ করে। এই জমিন আল্লাহর এবং তিনি এটা যাকে ইচ্ছা দান করেন। চূড়ান্ত সফলতা তাদের জন্য যারা ন্যায়নিষ্ঠ।'
যে দু'জন মুসাইলামার এই চিঠি বহন করেছিল রাসূলুল্লাহ তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে আমিই আল্লাহর রাসূল?' তারা বললো, 'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুসাইলামা আল্লাহর রাসূল।' রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, 'আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস করি। যদি আমি কখনো কোনো বার্তাবাহককে হত্যা করতাম, তবে আমি তোমাদের হত্যা করতাম।' অর্থাৎ, পত্রবাহককে হত্যা করা ইসলামে নিষিদ্ধ, যদিও তারা কাফির বা মুরতাদ বাহিনীর হয়। আল্লাহর রাসূল যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন মুসাইলামা অনেক বাগাড়ম্বর করলেও সরাসরি বিদ্রোহ করার সাহস দেখায়নি। তাকে দমন করা হয় আবু বকরের খিলাফতকালে।