📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুশরিকদের সাথে বারাহ ঘোষণা এবং জিহাদের চূড়ান্ত পর্যায়

📄 মুশরিকদের সাথে বারাহ ঘোষণা এবং জিহাদের চূড়ান্ত পর্যায়


রাসূলুল্লাহ হিজরী ৯ম সনে আবু বকর সিদ্দীককে হাজ্জের আমীর হিসেবে মনোনীত করলেন। সে সময় মক্কার কর্তৃত্ব মুসলিমদের হাতে ছিল। কিন্তু তখনও মূর্তিপূজারীরা তাওয়াফ করার জন্য কাবাঘরে আসতো। নগ্ন হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করার ঐতিহ্য তারা তখনো বজায় রেখেছে। তারা বিশ্বাস করতো যে তাদের অপবিত্রতা ও পাপের কারণে তাদের পোশাক পরিধান করে তাওয়াফ করাটা অনুচিত। তাই তারা কুরাইশদের পোশাক ধার করে তাওয়াফ করতো। কুরাইশদের ব্যবহার্য পোশাককে পবিত্র মনে করা হতো। কিন্তু কাপড় ধার করার মতো সচ্ছলতাও সবার ছিল না, তারা তাই নগ্ন হয়েই তাওয়াফ করতো। শিরক ও নগ্নতার এই পরিবেশে আল্লাহর রাসূল হাজ্জ করতে চাইলেন না।

আবু বকর আস-সিদ্দীক কয়েকশো সাহাবিকে নিয়ে হজ্জ করতে গেলেন। তখন নাযিল হলো সূরা বারাহ অর্থাৎ তাওবার প্রথম দিকের কিছু আয়াত। কিন্তু ততক্ষণে আবু বকরের নেতৃত্বে সাহাবিরা মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে ফেলেছেন। রাসূলুল্লাহ তখন এই আয়াতগুলোকে আবু বকরের কাছে পৌছে দিতে আলী ইবন আবি তালিবকে পাঠান। তিনি আলীকে বললেন, 'সূরা তাওবার এই আয়াতগুলি নিয়ে যাও। সবাই মীনায় জড়ো হওয়ার পর এই আয়াতগুলো পড়ে শুনাবে। তাদের বলে দাও, কোনো কাফির ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কোনো মুশরিক এই বছরের পর হজ্জ পালন করতে পারবে না। আর কোনো নগ্ন ব্যক্তি আল্লাহর ঘরের চারপাশে তাওয়াফ করতে পারবে না। তবে যারা আল্লাহর রাসূলের সাথে চুক্তিবদ্ধ আছে, তাদের চুক্তি নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্তই বহাল থাকবে।

“সম্পর্কচ্ছেদ করা হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে। অতঃপর তোমরা পরিভ্রমণ করো এ দেশে চার মাসকাল। আর জেনে রেখো, তোমরা আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবে না, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফিরদের লাঞ্ছিত করে থাকেন। আর মহান হজ্জের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা করে দেওয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রাসূলও। অবশ্য যদি তোমরা তওবা করো, তবে তা, তোমাদের জন্যেও কল্যাণকর, আর যদি মুখ ফেরাও, তবে জেনে রেখো, আল্লাহকে তোমরা পরাভূত করতে পারবে না。

আর কাফিরদেরকে মর্মান্তিক শাস্তির সুসংবাদ দাও। তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি-বদ্ধ, তারা চুক্তিরক্ষায় কোনো ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেওয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ করো। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন। অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা করো যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী করো এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাকো। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা তাওবাহ ৯: ১-৫)

এটা একমাত্র সূরা যেটা বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দ্বারা শুরু হয় না। কারণ এই সূরাটি শুরু হয় সরাসরি কাফিরদের সাথে সম্পর্কছেদের ঘোষণার মাধ্যমে। অবশ্য এর অন্যান্য ব্যাখ্যাও রয়েছে। এই সূরার প্রথম শব্দ বারাআ, এর অর্থ সম্পর্কছেদ। এই আয়াতগুলি সহ আরও কিছু আয়াত আলী ইবন আবি তালিব হিজরি ৯ম শতকের হাজ্জে বর্ণনা করেন। মক্কায় মুশরিকদের বিভিন্ন আচার-প্রথা ও উপাসনা দেখা যাওয়ার এটাই ছিল শেষ বছর। এরপর মক্কায় সবরকম শিরক নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

এই ঘোষণার মাধ্যমে আরব উপদ্বীপের ইতিহাসে তাওহীদের অধ্যায় সূচিত হয়। এই ঘোষণা ছিল কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জিহাদের ঘোষণা। এর ফলে, আরবের মুশরিকদের জন্য দুটো পথ খোলা থাকলো -- হয় তারা মুসলিম হবে, ইসলামের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেবে, অথবা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। যারা ইতিমধ্যেই আল্লাহর রাসূলের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল, তারা নিরাপদ থাকবে চুক্তির সময়সীমা পর্যন্ত, এরপরে আর চুক্তি নবায়ন করা হবে না। আর যাদের সাথে কোনো চুক্তি ছিল না, তাদের চারমাসের সময় দেওয়া হলো। এরপর হয় তারা ইসলাম গ্রহণ করবে না হয় তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হবে। এভাবে আরবে শিরকের সমাপ্তি হলো এবং মুশরিকদের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করা হলো।

ফন্ট সাইজ
15px
17px