📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর মৃত্যু

📄 মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর মৃত্যু


হিজরী ৯ম বর্ষ। সারাজীবন নিফাক, মুসলিমদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত, গোপন বিরোধিতা ও শত্রুতা পোষণের পর আবদুল্লাহ ইবন উবাই তখন মৃত্যুমুখে। উসামাহ ইবন যাইদকে সাথে নিয়ে আল্লাহর রাসূল তাকে তার সাথে দেখা করতে গেলেন। আল্লাহর রাসূল তাকে বললেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে সবসময় সতর্ক করতাম, ইহুদিদের ভালোবাসো না।' ইবন উবাই বললো, 'সাদ ইবন যুরায়রা তো তাদের ঘৃণা করতো। কিন্তু কী লাভ হয়েছে? সে তো মারা গেছে।'

ইবন উবাইয়ের চোখে মৃত্যুই ছিল পরাজয়। মৃত্যুর পরের জীবনই যে আসল জীবন-এই সত্য সে তার কুফরি আর একগুয়েমির কারণে বুঝতে পারেনি, বুঝতে চায়নি। মুসলিমদের প্রতি বাহ্যিক আনুগত্য দেখালেও জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার বিশ্বস্ততা ছিল কাফিরদের প্রতি। এটা মুনাফিকদের চরিত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। তারা কুফফারদের প্রতি অর্থাৎ ইহুদি-খ্রিস্টানদের প্রতি আনুগত্য পোষণ করে, অর্থাৎ, তারা তাদের সুখে সুখী হয়, তাদের দুঃখে দুখী হয়।

"বস্তুতঃ যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে।” (৫: ৫২)

মুনাফিকরা কাফিরদের নিজেদের আপন ভাবে, তাদের পক্ষ নেয়। তারা কখনোই মন থেকে মুসলিমদের মেনে নিতে পারে না, তাদের সাথে থেকে স্বস্তি পায় না।

আবদুল্লাহ ইবন উবাই মারা গেলে রাসূলুল্লাহ তার জানাজার সালাত আদায় করতে যাচ্ছিলেন। সামনে এসে দাঁড়ালেন উমার ইবন খাত্তাব রা.। আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়াতে যাদেরকে সত্য-মিথ্যার ফারাক বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন, সেই মুষ্টিমেয়দের একজন ছিলেন তিনি। মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের জানাজা পড়বেন আল্লাহর রাসূল -- এটা তিনি কোনোভাবেই মানতে পারলেন না। আবদুল্লাহ ইবন উবাই অতীতে যত কুকর্ম করেছে, তার সমস্ত ইতিহাস এক এক করে বলতে বলতে উমার প্রশ্ন করলেন, 'এমন এমন কাজ করার পরও আপনি কীভাবে তার জানাজার সালাত পড়াতে পারেন?' কিন্তু রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আমার পথ ছেড়ে দাও, উমার। আমি যদি জানতে পারি, আল্লাহর কাছে তার নাজাতের জন্য সত্তর বারের বেশি দুআ করলে আমার দুআ কবুল হবে, তবে আমি তা-ই করবো।'

“(হে নবী) এমন লোকদের জন্য আপনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন আর না-করেন (দুটোই সমান), যদি আপনি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমাপ্রার্থনা করেন, তারপরেও তাদেরকে আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করবেন না। কেননা এরা আল্লাহকে এবং তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে। বস্তুতঃ আল্লাহ নাফরমানদেরকে হিদায়াত করেননা।” (সূরা তাওবাহ, ৯: ৮০)

কুরআনের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ৭০ বারের কথা বলেছেন। রাসূলুল্লাহ এজন্য বলছেন যে, ৭০ বারের বেশি ইস্তিগফারে যদি কাজ হতো তবে তিনি তা-ই করতেন। এই ঘটনাটি রাসূলুল্লাহর চরিত্রের একটা অসাধারণ দিক তুলে ধরে। আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের শত্রুতা দেখতে দেখতে উমার পর্যন্ত প্রশ্ন করছিলেন, 'আপনি কীভাবে তার জন্য ক্ষমা চাইতে পারেন?' কিন্তু আল্লাহর রাসূল এর মনটা ছিল বিশাল। যে আবদুল্লাহ ইবন উবাই জীবনভর তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছে, শত্রুতা, মিথ্যাচার, ছলচাতুরী কিছুই বাদ রাখেনি, তাকেও তিনি শেষ সুযোগ দিতে চেয়েছেন। তার জানাযা পড়িয়ে তার নাজাতের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। জাহান্নামের আগুনের যে সীমাহীন কষ্ট, সে কষ্ট তিনি তাঁর শত্রুর জন্যেও চাননি। এই জানাযা পড়ার আরেকটি উদ্দেশ্য হতে পারে ইবন উবাইয়ের অনুসারীদের মন জয় করার চেষ্টা করা। তিনি আল্লাহর রাসূল হয়তো আশা করেছিলেন তাদের প্রতি নমনীয়তা দেখানো হলে তারা তাদের নিফাক ছেড়ে তওবা করে ফিরে আসবে। এই সিদ্ধান্তটি তখনো শরীয়াহগতভাবে বৈধ এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুকূল। কিন্তু এই জানাজা পড়ার পরেই মুনাফিকদের ওপর জানাজার সালাত আদায়ের বৈধতা তুলে নেওয়া হয়।

"আর তাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু হলে তার উপর কখনো নামায পড়বেন না এবং তার কবরে দাঁড়াবেন না। তারা তো আল্লাহর প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে এবং রাসূলের প্রতিও। বস্তুতঃ তারা নাফরমান অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে।” (সূরা তাওবাহ ৯: ৮৪)

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা ফায়সালা করে দিলেন যে, মুনাফিকদের ওপর আর কোনো জানাজার সালাত পড়া হবে না। এটিই ছিল চূড়ান্ত হুকুম। কুরআনে বেশ কিছু আয়াত আছে যেগুলো উমারের মতের সমর্থনে নাযিল হয়েছিল, এটি তেমনই একটি আয়াত।

আল্লাহর রাসূলের আগে আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর মৃত্যু ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি হিকমাহ। ইবন উবাইয়ের মনে আশা ছিল, আল্লাহর রাসূলের মৃত্যুর পরে সে পুনরায় মদীনার নেতৃত্ব ফিরে পাবে। আমরা আগেই আলোচনা করেছি, যখন ইবন উবাইয়ের হাতে মদীনার শাসনভার আসার কথা, ঠিক সেই মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ মদীনায় আসেন এবং আওস ও খাযরাজদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ফলে তার স্বপ্নভঙ্গ হয়। রাসূলুল্লাহর অধীনে পুরো সময়টাতে সে এবং তার দলবল জিহাদে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে, নিফাকের পথ অবলম্বন করেছে, রাসূলুল্লাহ ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাথে ষড়যন্ত্র করে উৎখাতের চেষ্টা করেছে। তারা ভেবেছিল, ইসলামের রাজত্ব সাময়িক, হঠাৎ করে এসেছে, আবার হঠাৎ করে চলেও যাবে, মদীনা আগে যেমন ছিল তেমন হয়ে যাবে। কিন্তু সেটা হয়নি, বরং মুনাফিকদের প্রভাব ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। ইবন উবাইয়ের মৃত্যুর মাধ্যমে মদীনার মুনাফিকদের কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ে। মুসলিমরা তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে না গেলেও জ্ঞান ও যুক্তির মাধ্যমে তাদের সাথে লড়াই করে। চিহ্নিত মুনাফিকদের ওপর জানাজা পড়তে মুসলিমরা অস্বীকৃতি জানায়। আল্লাহর রাসূল হুযাইফাকে জানিয়ে যান কারা কারা মুনাফিক। এভাবে মুনাফিকরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আর মদীনায় ইসলাম আরও সুসংহত হয়।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আল্লাহর রাসূল ﷽ ও তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে একটি ঘটনা

📄 আল্লাহর রাসূল ﷽ ও তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে একটি ঘটনা


আর দশজন সহজ স্বাভাবিক দম্পতির মতই আল্লাহর রাসূলের জীবনেও ছিল আনন্দ-বেদনার গল্প, ছিল বাদানুবাদ আর মান-অভিমানের উত্থান-পতন। একবার এমন হয়েছিল, স্ত্রীদের সাথে অভিমান করে আল্লাহর রাসূল দীর্ঘ এক মাস বাড়ির বাইরে কাটান। পুরো সময়ে তিনি তাঁর কোনো স্ত্রীর কাছেই যান-নি। ঘটনাটা নবম হিজরির।

একদিন আবু বকর রাসূলুল্লাহর সাথে দেখা করতে গিয়ে দেখলেন আরও অনেকেই রাসূলের ঘরের দরজায় অপেক্ষমান। কাউকেই ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। আবু বকর ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেওয়া হলো। এরপর উমার এলেন, তাকেও অনুমতি দেওয়া হলো। আল্লাহর রাসূল নিচে বসে আছেন আর চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে উনার স্ত্রীরা। সবার মধ্যে বিষাদের ছাপ। পুরো পরিবেশ থমথমে হয়ে আছে। গুমোট ভাবটাকে হালকা করার জন্য উমার মজা করে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার টাকা-পয়সা নেই জেনেও যদি আমার বউ তার পেছনে খরচ করার জন্য আমাকে পীড়াপীড়ি করতো, তাহলে আমি তার ঘাড় ভেঙে দিতাম!' উমারের কথা শুনে রাসূলুল্লাহ হেসে দিলেন, বললেন, 'এখানেও তা-ই হয়েছে! আমার চারপাশে যাদের দেখতে পাচ্ছো তারাও আমার কাছে ধন-সম্পদ চাইতে শুরু করেছে!'

এ কথা শুনেই আবু বকর নিজ কন্যা আইশার দিকে এগিয়ে গেলেন আর উমার এগিয়ে গেলেন নিজ কন্যা হাফসার দিকে। দুজনেই আল্লাহর রাসূলের দুই স্ত্রীর বাবা! উমার বললেন, 'তোমরা নবীজির কাছে এমন কিছু দাবি করছো, যা তাঁর কাছে নেই!' তারা উত্তর দিলেন, 'আমরা কখনো এমন কিছু দাবি করবো না যা আল্লাহর রাসূলের কাছে নেই।' এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাসূল স্ত্রীদের থেকে এক মাস আলাদা ছিলেন। আর সেই সময়ে আল্লাহ তাআলা কুরআনের এই আয়াত নাযিল করেন।

"হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলে দিন, তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ ও এর বিলাসিতা কামনা করো, তাহলে এসো, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দিই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদের বিদায় করি। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালকে কামনা করো তাহলে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল, আল্লাহ তাদের জন্য মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ২৮-২৯)

আল্লাহর রাসূলের লাইফস্টাইল আর দশজনের মতো সহজ আর স্বাচ্ছন্দ্যময় ছিল না, আরাম কী জিনিস তিনি জানতেন না। তিনি ছিলেন আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা- - নেতৃত্ব, খ্যাতি, ধন-সম্পদ তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে। কিন্তু সেই ডাককে তিনি কোনো পাত্তাই দেননি, এমনভাবে জীবন কাটিয়েছেন যেন দুনিয়ার চেয়ে সস্তা আর অর্থহীন বস্তু আর দ্বিতীয়টি নেই। মদীনায় আসার পর মসজিদে নববীর পাশে আল্লাহর রাসূল আর উম্মুল মুমিনীনদের জন্য ঘর তৈরি করা হয়। সে ঘর ছিল নিতান্তই সাধারণ। রাজা-বাদশাদের প্রাসাদের মতো প্রকাণ্ড কিছু তো ছিলই না, বরং কাদামাটি আর পাথর দিয়ে তৈরি ছোট কয়েকটা মাথা গোঁজার ঠাই। সেগুলোকে বড়জোর কুঁড়েঘর বলা চলে। আরবের মরুভূমিতে সবচেয়ে সহজলভ্য খেজুরের ডাল ছিল সেই ঘরের চালা। ঘরের ছাদগুলো এত নিচু ছিল যে ছোটখাট লোকও নিমিষে হাত দিয়ে ছুঁতে পারতো। ইমাম হাসান আল বসরী বলেন, 'আমি আল্লাহর রাসূলের ঘর দেখেছি। হাত বাড়ালেই এর ছাদ ধরা যায়।'

আল্লাহর রাসূলের সেই ঘরে আলো জ্বালানোর মতো কুপিও ছিল না। মা আইশা বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহর সালাতের স্থানের সামনে ঘুমাতাম। রাতে যখন তিনি তাহাজ্জুদে দাঁড়াতেন, ঘরে আলো না থাকায় সিজদার সময় তাঁর কপাল আমার মাথায় এসে লাগতো। সিজদায় যাওয়ার সময় আল্লাহর রাসূল আমার পায়ে খোঁচা দিতেন। তখন আমি পা ভাঁজ করে নিতাম, যখন তিনি সিজদা থেকে উঠতেন আমি আবারো পা বিছিয়ে দিতাম।'

ঘরে কার্পেট বলে কিছু ছিল না। মেঝে বলতে ছিল বালি আর খেজুরের ছোবলা। আল্লাহর রাসূল সেখানেই ঘুমোতেন। তাঁর গায়ে এবড়ো-খেবড়ো ছোবলার দাগ পড়ে যেত। রকমারি আসবাবও ছিল না। মাথার নিচে দেওয়ার মতো একটা চামড়ার গদি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়তো না ঘরে। তাঁর জীবন দেখলে মনে হতো প্রাচুর্য বলে এই পৃথিবীতে কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। এই দৃশ্য দেখে একদিন উমার নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, কেঁদেই ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি এই উম্মতকে প্রাচুর্য দান করেন। পারস্য আর রোমের সম্রাটদের দেখুন, তারা তো আল্লাহর ইবাদত করে না অথচ তারাই আজ ভোগবিলাসে আছে।' তিনি বললেন, 'উমার! এটাই কি উত্তম নয় যে তারা দুনিয়ার ভোগবিলাস পেলো আর আমরা আখিরাতের অনন্ত জীবন পেলাম!'

আমরা জীবনের প্রাচুর্য দেখে দেখে আক্ষেপ করি কেন অন্য অনেকের সমান কিংবা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ নিআমত আমার হলো না, কিন্তু আল্লাহর রাসূলকে যেন এসব কিছু স্পর্শই করত না। দুনিয়ার ভোগবিলাস, আরাম-আয়েশ আর প্রাচুর্য ছিল তার কাছে একটা মশা কিংবা মাছির চেয়েও তুচ্ছ, কাছে আসলেই হাত দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার মতোই তিনি বরাবর একে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছেন।

দারিদ্র্য ছিল আল্লাহর রাসূলের নিত্যসঙ্গী। মা আইশা বলেন, 'এমনও হয়েছে পরপর তিন চন্দ্রমাস অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু আল্লাহর রাসূলের ঘরে চুলায় আগুন জ্বলেনি।' এ কথা শুনে তার ভাগ্নে উরওয়া ইবনে আয যুবাইর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে সে সময় আপনারা কী খেতেন?' আইশা জবাব দিলেন, 'আমরা শুধু পানি আর খেজুর খেয়ে থাকতাম!' আনাস ইবনে মালিক বলেন, 'মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আল্লাহর রাসূলকে কোনোদিন ভুনা গোশত দিয়ে পেট ভরে এক টুকরো রুটি খেতে দেখি-নি।'

এমন নয় যে, উম্মুল মুমিনীনরা আল্লাহর রাসূলের এই কঠোর আর অনাড়ম্বর জীবনের সাথে অভ্যস্ত ছিলেন না। কিন্তু হিজরি ৯ম বর্ষে এসে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল উম্মাহকে খায়বার, মক্কা বিজয়ের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিজয় দান করেন। কুরআনের কিছু আয়াতও নাযিল হয়, যা সীমার মধ্যে থেকে দুনিয়ার নিয়ামত ভোগ করার অনুমতি প্রদান করে। আল্লাহ বলেন,

"আপনি বলুন, আল্লাহর সাজ-সজ্জাকে, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্যবস্তুসমূহকে কে হারাম করেছে? আপনি বলুন, এসব নিআমত আসলে পার্থিব জীবনে মু'মিনদের জন্যে এবং কিয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্যে। এমনিভাবে আমি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের জন্যে যারা বোঝে।" (সূরা আরাফ, ৭: ৩২)

আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পর উম্মুল মুমিনীনরা মনে করলেন, আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে আল্লাহ দুনিয়ায় মু'মিনদের জন্য যা হালাল করেছেন, সেই নিয়ামত ভোগ করায় দোষের কিছু নেই। আদতে এই আয়াতগুলো ছিল মূলত সাধারণ মানুষদের জন্য। আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন তাঁর রাসূল দুনিয়ার উপকরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন, বাকিদের মতো তিনি দুনিয়া উপভোগ করবেন না।

"আপনি (কাফিরদের) মাঝে কিছু লোককে ভোগ বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি আপনি চোখ তুলে তাকাবেন না। তাদের ব্যাপারে চিন্তিত হবেন না, বরং মু'মিনদের প্রতিই ঝুঁকে থাকবেন।” (সূরা আল হিজর, ১৫: ৮৮)

অনন্ত আখিরাত জীবনের উল্টো পিঠে অতি তুচ্ছ এই নশ্বর পৃথিবীর মায়ায় জড়িয়ে যাওয়া আল্লাহর রাসূলের জন্য কোনোভাবেই শোভনীয় নয়। সূরা আহযাবের উপরোল্লিখিত আয়াত নাযিল হবার পর আল্লাহর রাসূল স্ত্রীদের দুটো রাস্তা খুলে দিলেন হয় তারা দুনিয়ার ভোগবিলাস উপভোগ করবেন, অথবা তারা আল্লাহর রাসূলের জীবনসঙ্গী হিসেবে থাকবেন। তারা যদি আল্লাহর রাসূলের সাথে সংসার করেন, তবে বিনিময়ে কষ্ট হলেও লাভ করবেন সবচেয়ে মহান প্রাপ্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি আর আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অসামান্য পুরস্কার। যে নারীরা এতদিন ভরণ-পোষণ বাড়ানোর জন্য চাপাচাপি করতে করতে নবীজিকে প্রায় বিরক্ত করে তুলেছিলেন, এই আয়াত শোনার পর, সেই তারাই প্রত্যেকে একবাক্যে বললেন, 'আমরা আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল এবং আখিরাতের আবাসকেই বেছে নিলাম।' আল্লাহ তাদের প্রত্যেকের ওপর সন্তুষ্ট হোন।

খুলাফায়ে রাশেদীনরাও এই ঘটনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন সমগ্র মুসলিম জাহানের ভার যার কাঁধে, তার জন্য দুনিয়ার চাকচিক্যে মোহাবিষ্ট হওয়া কী করে শোভনীয় হয়? তাদের ভোগবিলাসের জায়গা হলো আখিরাহ। নিজের অধীনস্থ মানুষের দেখভালের জন্য তারা রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করে যাবে, দুনিয়াকে পিষে ফেলবে পায়ের তলায়। বাস্তবে সেটাই হয়েছে। আমরা দেখেছি, উম্মাহর সোনালী যুগের খলিফারা আল্লাহর রাসূলের রেখে যাওয়া সেই সুন্নাহর অনুসরণ করেছেন। দুনিয়ার ভোগবিলাসের সমস্ত উপকরণকে পায়ে ঠেলে এই উম্মাহকে আগলে রেখেছেন নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে। আল্লাহ তাদের ওপরও সন্তুষ্ট হোন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুশরিকদের সাথে বারাহ ঘোষণা এবং জিহাদের চূড়ান্ত পর্যায়

📄 মুশরিকদের সাথে বারাহ ঘোষণা এবং জিহাদের চূড়ান্ত পর্যায়


রাসূলুল্লাহ হিজরী ৯ম সনে আবু বকর সিদ্দীককে হাজ্জের আমীর হিসেবে মনোনীত করলেন। সে সময় মক্কার কর্তৃত্ব মুসলিমদের হাতে ছিল। কিন্তু তখনও মূর্তিপূজারীরা তাওয়াফ করার জন্য কাবাঘরে আসতো। নগ্ন হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করার ঐতিহ্য তারা তখনো বজায় রেখেছে। তারা বিশ্বাস করতো যে তাদের অপবিত্রতা ও পাপের কারণে তাদের পোশাক পরিধান করে তাওয়াফ করাটা অনুচিত। তাই তারা কুরাইশদের পোশাক ধার করে তাওয়াফ করতো। কুরাইশদের ব্যবহার্য পোশাককে পবিত্র মনে করা হতো। কিন্তু কাপড় ধার করার মতো সচ্ছলতাও সবার ছিল না, তারা তাই নগ্ন হয়েই তাওয়াফ করতো। শিরক ও নগ্নতার এই পরিবেশে আল্লাহর রাসূল হাজ্জ করতে চাইলেন না।

আবু বকর আস-সিদ্দীক কয়েকশো সাহাবিকে নিয়ে হজ্জ করতে গেলেন। তখন নাযিল হলো সূরা বারাহ অর্থাৎ তাওবার প্রথম দিকের কিছু আয়াত। কিন্তু ততক্ষণে আবু বকরের নেতৃত্বে সাহাবিরা মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে ফেলেছেন। রাসূলুল্লাহ তখন এই আয়াতগুলোকে আবু বকরের কাছে পৌছে দিতে আলী ইবন আবি তালিবকে পাঠান। তিনি আলীকে বললেন, 'সূরা তাওবার এই আয়াতগুলি নিয়ে যাও। সবাই মীনায় জড়ো হওয়ার পর এই আয়াতগুলো পড়ে শুনাবে। তাদের বলে দাও, কোনো কাফির ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কোনো মুশরিক এই বছরের পর হজ্জ পালন করতে পারবে না। আর কোনো নগ্ন ব্যক্তি আল্লাহর ঘরের চারপাশে তাওয়াফ করতে পারবে না। তবে যারা আল্লাহর রাসূলের সাথে চুক্তিবদ্ধ আছে, তাদের চুক্তি নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্তই বহাল থাকবে।

“সম্পর্কচ্ছেদ করা হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে। অতঃপর তোমরা পরিভ্রমণ করো এ দেশে চার মাসকাল। আর জেনে রেখো, তোমরা আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবে না, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফিরদের লাঞ্ছিত করে থাকেন। আর মহান হজ্জের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা করে দেওয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রাসূলও। অবশ্য যদি তোমরা তওবা করো, তবে তা, তোমাদের জন্যেও কল্যাণকর, আর যদি মুখ ফেরাও, তবে জেনে রেখো, আল্লাহকে তোমরা পরাভূত করতে পারবে না。

আর কাফিরদেরকে মর্মান্তিক শাস্তির সুসংবাদ দাও। তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি-বদ্ধ, তারা চুক্তিরক্ষায় কোনো ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেওয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ করো। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন। অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা করো যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী করো এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাকো। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা তাওবাহ ৯: ১-৫)

এটা একমাত্র সূরা যেটা বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দ্বারা শুরু হয় না। কারণ এই সূরাটি শুরু হয় সরাসরি কাফিরদের সাথে সম্পর্কছেদের ঘোষণার মাধ্যমে। অবশ্য এর অন্যান্য ব্যাখ্যাও রয়েছে। এই সূরার প্রথম শব্দ বারাআ, এর অর্থ সম্পর্কছেদ। এই আয়াতগুলি সহ আরও কিছু আয়াত আলী ইবন আবি তালিব হিজরি ৯ম শতকের হাজ্জে বর্ণনা করেন। মক্কায় মুশরিকদের বিভিন্ন আচার-প্রথা ও উপাসনা দেখা যাওয়ার এটাই ছিল শেষ বছর। এরপর মক্কায় সবরকম শিরক নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

এই ঘোষণার মাধ্যমে আরব উপদ্বীপের ইতিহাসে তাওহীদের অধ্যায় সূচিত হয়। এই ঘোষণা ছিল কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জিহাদের ঘোষণা। এর ফলে, আরবের মুশরিকদের জন্য দুটো পথ খোলা থাকলো -- হয় তারা মুসলিম হবে, ইসলামের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেবে, অথবা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। যারা ইতিমধ্যেই আল্লাহর রাসূলের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল, তারা নিরাপদ থাকবে চুক্তির সময়সীমা পর্যন্ত, এরপরে আর চুক্তি নবায়ন করা হবে না। আর যাদের সাথে কোনো চুক্তি ছিল না, তাদের চারমাসের সময় দেওয়া হলো। এরপর হয় তারা ইসলাম গ্রহণ করবে না হয় তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হবে। এভাবে আরবে শিরকের সমাপ্তি হলো এবং মুশরিকদের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করা হলো।

ফন্ট সাইজ
15px
17px