📄 কা'ব ইবন মালিকের ؓ ঘটনা থেকে শিক্ষা
১) আল্লাহর সাথে সততা
কাব ইবন মালিকের বর্ণনাই বলে দেয় যে, তাঁর বাচনভঙ্গি ছিল অসাধারণ। এক কথায় তার বর্ণনাটা চমৎকার, কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। তিনি নিজেও জানতেন আল্লাহ তাকে সুন্দর করে কথা বলার গুণ দিয়েছেন। তিনি চাইলে এই গুণকে কাজে লাগিয়ে তার জিহাদে না যাওয়ার পেছনে সুন্দর একটা অজুহাত তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহর এই নিআমতকে তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেননি।
কাব ইবন মালিক ছিলেন একজন কবি। ইসলাম ও আল্লাহর রাসূলের খেদমতে যারা নিজেদের কাব্যপ্রতিভাকে কাজে লাগিয়েছিলেন, কা'ব ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। মদীনার তিন প্রসিদ্ধ কবি ছিলেন হাসসান ইবন সাবিত, কা'ব ইবন মালিক এবং আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা । এজন্য তিনি রাসূলুল্লাহকে বলেছিলেন, আমাকে তর্ক-বিতর্ক করার গুণ দেওয়া হয়েছে। মানে তিনি চাইলেই মানুষকে কিছু একটা বুঝ দিতে পারতেন। অন্য কথায়, তিনি বলছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি খুব সহজেই এমন অজুহাত উপস্থাপন করতে পারতাম, যা শুনতে যৌক্তিক আর সঠিক মনে হবে। কিন্তু আমি অনুধাবন করতে পারলাম যে এমন করে আমি বেশি দূর যেতে পারবো না। আপনি আল্লাহর নবী। আল্লাহ নিশ্চয়ই ওয়াহীর মাধ্যমে আমার কুকর্ম ফাঁস করে দিবেন। এজন্য আমি সত্যটাই বলবো।
বর্তমানে ইসলাম ও মুসলিমরা কুফরি শক্তির ভয়াবহ আগ্রাসনের শিকার। এই আগ্রাসন সর্বাত্মক - সামরিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ানো মোটেও সহজ নয়। যারাই এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায়, তাদের বিরুদ্ধেই কুফরি শক্তি উঠে পড়ে লাগে। সত্য কথা বলার জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, মূল্য দিতে হয়। এই কঠিন দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা সবার থাকে না। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন অনেক আলিম ও দাঈ এই অক্ষমতার কথা স্বীকার করতে চায় না। উল্টো তারা নিজেদের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য অজুহাত পেশ করে। তারা কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই দলিল পেশ করে নিজেদের কাপুরুষতা, নিষ্ক্রিয়তা ও বসে-থাকাকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে। তাদের যুক্তি আকর্ষণীয়, তাদের উপস্থাপনা চমৎকার, তাদের অজুহাতগুলোও আপাতদৃষ্টিতে বেশ যৌক্তিক শোনায়।
মুসলিমরা মনস্তাত্বিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, উত্তরণের কোনো চেষ্টাই তারা করতে চায় না। নিজেদের এই দুর্বল ও লাঞ্ছিত অবস্থাকে তারা তাদের নিয়তি হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। একটি অজুহাত তাই মুসলিমদের মাঝে খুবই জনপ্রিয় - আমরা এখন মাক্কী যুগে আছি, তাই কিছুই করার নেই। মুসলিমরা লাখে লাখে মরুক, মুসলিম নারীদের ইজ্জত ভুলুণ্ঠিত হোক, আমাদের দ্বীনকে নিয়ে ইসলামের শত্রুরা হাসি-ঠাট্টা করুক, আমাদের কিছুই করার নেই।
তাদের সমস্যা হচ্ছে তারা ত্যাগ-স্বীকার করতে চায় না। আর এই অনিচ্ছা ও অযোগ্যতাকে সরাসরি স্বীকার না করে তারা ইসলামের মোড়ক দিয়ে ঢেকে দেয়। হ্যাঁ, এটা সত্য যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও মক্কার মুসলিমরা ইসলামের প্রথম দিকে দুর্বল অবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কা থেকে বের হওয়ার জন্য সমর্থনের আশায় সব গোত্রের দুয়ারে কড়া নেড়েছেন। প্রত্যেক হজ্বের মৌসুমে বিভিন্ন গোত্রের নেতাদের সাথে বারবার সাক্ষাৎ করেছেন। সাধ্যে যতটুকু কুলায় তার সবটুকু দিয়েই মুসলিমরা চেষ্টা করেছিল। তাই যারা মনে করে যে, তারা মাক্কী জীবনের মতো দুর্বল অবস্থায় আছে, তাদের উচিত এ অপমানজনক জীবন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা। এটাই আল্লাহর রাসূলের ﷺ শিক্ষা।
কাজেই কা'ব ইবন মালিকের ঘটনা থেকে প্রথম শিক্ষা হলো, কথার পারদর্শিতা বা উপস্থাপনার ভেলকিবাজিতে প্রলুব্ধ না হওয়া, কথার চাকচিক্যে নিজেদের অন্তরের রোগ আড়াল করার চেষ্টা না করা বরং আল্লাহর প্রতি সৎ থাকা এবং নিজেদের অবস্থার উত্তরণে চেষ্টা করে যাওয়া।
২) সত্তার শত্রু: নফস
এমন নয় যে, কা'ব ইবন মালিক জিহাদে যেতে অনিচ্ছুক ছিলেন। প্রস্তুতি নেওয়ার নিয়ত তাঁর মনে ছিল। কিন্তু আলসেমির কারণে কিছুই করা হয়ে ওঠেনি। দৃঢ়তার অভাবেই মানুষকে ঢিলেমি পেয়ে বসে। এটা চিরাচরিত মানব বৈশিষ্ট্য। করছি, করবো -- এই করতে করতে সেই কাজটি আর করা হয়ে উঠে না। কা'ব ইবন মালিকের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল।
মানুষের নফস ধোঁকা দেয়। লাগাম পরিয়ে না রাখলে নফস মানুষকে অনেক নিচে নামিয়ে আনতে পারে। নিজের খেয়াল-খুশিকে নিয়ন্ত্রণে রাখাটা খুবই জরুরি। নিজের 'মুড' এর উপর সব কাজকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়। কা'ব ইবন মালিক নফসের সাথে পেরে উঠেননি। যাচ্ছি-যাবো বলে তাঁর আর যাওয়া হয়নি। নফস হলো অলস, ভীতু, দুর্বল। সে দুনিয়াকেই ভালোবাসে। তাই নফসকে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণে রাখাটা জরুরি।
কাব ইবন মালিক তাবুকের আগের বড় বড় প্রায় সব জিহাদে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু সামান্য ঢিলেমি দেওয়ার কারণে তিনি তাবুকের অভিযানে যোগ দিতে পারেননি। কাজেই নিজের ঈমানের ব্যাপারে কখনোই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে নিজের আমল- ইবাদাতে ঢিলেমি দেওয়া উচিত নয়। অতীতের আমল যতই ভালো আর ঈর্ষণীয় হোক না কেন। রাসূল বাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়ার পরও কা'ব ইবন মালিক ভাবছিলেন, আমি ঠিকই কাফেলা ধরে ফেলতে পারবো। অথচ, তখনো তার প্রস্তুতির কিছুই হয়নি।
কালকের জন্য কাজ ফেলে রাখলে জমতে জমতে তা এত বিশাল আকার ধারণ করে যে শেষ পর্যন্ত কাজ করার উৎসাহই হারিয়ে যায়। এটা আসলে নফসের একটা ধোঁকা। প্রথমে সে বোঝায় -- কাজটা তো একেবারেই সহজ, তুড়ি মেরে করে ফেলা যাবে! আর পরে যখন সব কাজ একসাথে জমে বিশাল আকার ধারণ করে, তখন সে বোঝায়, এত্তো কাজ করা কী করে সম্ভব! আর এভাবেই সে ভালো কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে। যদি কা'ব ইবন মালিকের মতো একজন সাহাবি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে এত বড় ভুল করতে পারেন, তাহলে এখনকার মুসলিমরা কীভাবে নিরাপদ থাকতে পারে? জিহাদ এমন একটি ইবাদাত যেটা সবসময় চলতে থাকে। যতই দেরি করা হয়, জিহাদে অংশ নেওয়া ততই কঠিন হয়ে পড়ে।
৩) ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা: জিহাদ ফি সাবীলিল্লাহ
তাবুকে পৌঁছার পর কা'ব ইবন মালিকের খোঁজ করা হলে সাহাবিরা অনেকে বলে বসেন, কা'ব দুনিয়ার মোহে জিহাদ পরিত্যাগ করেছে। নিঃসন্দেহে এটা খুবই অপমানজনক কথা। আল্লাহর রাসূলের সামনেই এমন কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কিছুই বলেননি। একজন মুসলিমের মর্যাদা ইসলামের দৃষ্টিতে অনেক দামি। কিন্তু সম্মানিত সাহাবি কা'ব ইবন মালিকের ব্যাপারে এমন অসম্মানজনক এবং তীর্যক মন্তব্য করার পরেও আল্লাহর রাসূল চুপ ছিলেন। অর্থাৎ তিনি তাতে সমাতি দিয়েছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, জিহাদে অংশ না নেওয়া কত বড় অপরাধ হতে পারে। শুধুমাত্র জিহাদে অংশ না নেওয়ার কারণে তিনজন সাহাবিকে পঞ্চাশ দিনের জন্য পুরো সমাজ বয়কট করেছিল। তাহলে তাদের অপরাধ কতটা ভয়াবহ যারা আজকে জিহাদে অংশ নেওয়া দূরে থাক, উল্টো জিহাদের বিরোধিতা করে?
৪) কুনু মা'আস সাদিক্বীন: সত্যবাদীদের সাথে থাকো
সৎসঙ্গে থাকা খুবই জরুরি। ভালো কাজে সাথী পেলে মানুষের মাঝে সাহস সঞ্চার হয়, উৎসাহ সৃষ্টি হয়। মানুষের প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কা'ব একটা মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করাবার জন্য প্রায় উদ্যত হয়েছিলেন। কিন্তু যখনই জানলেন তার মতো আরও দু'জন আছে, তখন তিনি এ থেকে সরে আসেন। সৎ ও জ্ঞানী মুসলিমদের সাথে উঠাবসা করা দ্বীনের পথে উন্নতির জন্য অপরিহার্য। এতে করে ভালো কাজে অংশ নেওয়া সহজ হয়, বন্ধুর পথে অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভর করেছে ফিতনা আর অবিশ্বাস। তাই এই পঁচে যাওয়া এই সমাজ ব্যবস্থায় সৎসঙ্গের গুরুত্ব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সুতরাং নিজেদের অবস্থার ব্যাপারে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়া যাবে না। স্বভাবগতভাবেই মানুষ দুর্বল। আল্লাহ বলেছেন, "মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল অবস্থায়।”
ফিতনার মোকাবেলায় মানুষ বরাবরই দুর্বল। তাই মুসলিমদের উচিত জামাতবদ্ধ থাকা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'দ্বীন হলো নাসীহা।' অর্থাৎ চারপাশে এমন মানুষ থাকা জরুরি, যারা সবসময় ভালো কাজের উপদেশ দিবে। খারাপ পরিবেশ ত্যাগ করে দ্রুত ভালো পরিবেশে চলে যাওয়া ঈমানের হেফাজতের জন্য খুবই জরুরি। আজকে ঈমান তেজোদ্দীপ্ত হলেও আগামীকাল অন্তরের অবস্থা একরকম না-ও থাকতে পারে। পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবকে কখনোই ছোট করে দেখা উচিত নয়।
৫) আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না
কেউ যদি সত্যবাদিতা অবলম্বন করে, তাহলে সে একদিন না একদিন এর উপযুক্ত পুরস্কার পাবেই -- এটাই কা'ব ইবন মালিকের ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল, কা'ব ইবন মালিক আর বাকি দুইজন যদি মুনাফিকদের মতো মিথ্যা অজুহাত দিতেন তাহলে তাদের বয়কট করা হতো না, কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মানুষের মনের খবর জানেন, তিনি ভালোকে মন্দের কাতার থেকে পৃথক করে দেন।
যারা কোনো অজুহাত না দিয়ে অকপটে নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিয়েছিল, তাদেরকে বর্জন করা হয়েছিল। আর যারা মিথ্যা কথা বলেছিল, তারা অব্যাহতি লাভ করে। কিন্তু এই অব্যাহতি ছিল সাময়িক। মিথ্যা বলে ক্ষণিকের জন্য পার পাওয়া বা কিছু অর্জন করা গেলেও সেটা চিরস্থায়ী হয় না। অপরদিকে আপাতদৃষ্টিতে সত্যকে অপ্রিয় বা কঠিন মনে হলেও, দিনশেষে সত্যের অর্জনটাই চিরস্থায়ী। আল্লাহ কা'ব ও তার দুই সাথীকে সরল পথে কায়েম রেখেছেন তাদের সততা ও সত্যবাদিতার কারণে।
৬) আল্লাহর রাসূলের প্রতি আনুগত্য
কা'ব ছিলেন মদীনার অধিবাসী। এই মদীনায় তার জন্ম, তার বেড়ে ওঠা। কিন্তু মুসলিমদের বয়কটে এই চিরচেনা মদীনা তার কাছে হয়ে গেছিল অচেনা, পর। একান্ত আপন লোকেরাই তাঁকে বয়কট করেছিল। যে আল্লাহর রাসূলের আদেশে সাহাবিরা কা'বকে বয়কট করেছিল, সেই আল্লাহর রাসূলের জন্মভূমি কিন্তু মদীনা ছিল না। এটা দেখিয়ে দেয়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতিই ছিল সাহাবিদের একনিষ্ঠ ও পরিপূর্ণ আনুগত্য। আল্লাহর রাসূলের নির্দেশ সবাই এক বাক্যে মেনে নিয়েছিল। কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি, দ্বিধাদ্বন্দ্ব করেনি। এটাই বলে দেয় যে, সে সময়ের সমাজব্যবস্থা কতটা মজবুত ছিল। বয়কটকারী সাহাবিরাই কেবল আনুগত্য করেননি, বরং যে তিনজনকে বয়কট করা হয়েছিল, তারাও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য ত্যাগ করেনি! এই পঞ্চাশটি দিন তারা আল্লাহর রাসূলের আদেশ মেনে চলেছেন।
৭) ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি বিশ্বস্ততা
গাসসানের রাজা ছিল চরম ইসলাম বিদ্বেষী। সে রাসূলুল্লাহ ও মুসলিমদের ঘৃণা করতো। সীরাহর বইগুলোতে এমন ঘটনা উল্লেখ আছে যে, সে সেনাবাহিনী নিয়ে মুসলিমদের আক্রমণ করতে চেয়েছিল আর এ কাজে সে হিরাক্লিয়াসের সহায়তা চেয়েছিল। কিন্তু হিরাক্লিয়াস তাকে থামিয়ে দেয়। রাজা হলেও সে ছিল মূলত হিরাক্লিয়াসের প্রতিনিধি। গাসসানের রাজার মতো শাসকদের নামের সাথে অনেক লম্বা লম্বা উপাধি থাকলেও বাস্তবে তারা অন্যের হুকুমের দাস, বলা যেতে পারে দালাল শাসক। সে বোকা হলেও হিরাক্লিয়াস ছিল দূরদর্শী। সে জানতো রাসূলুল্লাহ আল্লাহর সত্য নবী। এজন্য সে তখন মুসলিমদের সাথে সংঘাত এড়িয়ে চলতে চেয়েছিল। এখানে লক্ষণীয় বিষয় যে, গাসসানের রাজা ছিল একজন আরব। সে হিসেবে আল্লাহর রাসূলের প্রতি অপেক্ষাকৃত বেশি সহমর্মী হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু অনারব হিরাক্লিয়াসের থেকেও সে নিজেই ছিল আল্লাহর রাসূলের প্রতি বেশি আক্রমণাত্মক। মনিবের চেয়ে ভৃত্যের রাগ সাধারণত বেশি হয়। কথায় আছে, সূর্যের চেয়ে বালি গরম।
কুফফাররা সবসময় মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি তৈরি করতে চায়। এটি কুফফারদের অতি প্রাচীন কৌশল। তারা মুসলিমদের মধ্যে থেকে এমন কাউকে টার্গেট করে যারা কিছুটা বিপদে আছে, পরিস্থিতির চাপে হয়তো তারা শত্রুদের সাথে হাত মেলাবে। তারা এ ধরনের নড়বড়ে মুসলিমদের 'কিনে' নিতে চায়। গাসসানের রাজা কা'ব ইবন মালিককে ভালোবাসত -- বিষয়টা মোটেও এমন নয়। বরং কা'বকে ব্যবহার করে তারা তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল।
আজকের দিনেও এই স্ট্র্যাটেজি কার্যকর। অনেক মুসলিম সংস্থা বা মুসলিম দাঈদের সাথে কাফিরদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের বেশ দহরম-মহরম। এই মুসলিমরা কাফির সরকারের মন জুগিয়ে চলে, ইসলামের যে বিষয়গুলো কাফিররা পছন্দ করে না, সে-সব কথা বলা থেকে বিরত থাকে অথবা সেসব বিষয়ে চিনি মিশিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপন করে। মূলত, তারা দাওয়াহর নামে কাফিরদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। তারা ততটুকুই বলে, যতটুকু কাফিররা অনুমোদন দেয়।
কাফিররা আজকে সরাসরি ইসলামকে পরিবর্তন, সংস্করণ ও কাটছাঁট করার কথা বলছে। এজন্য তারা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। তারা এমন সব আলিম ও দাঈদের জন্ম দিতে কাজ করছে, যারা এই নতুন ভার্সনের ইসলাম মানুষের কাছে প্রচার করবে। এই বিষয়গুলো তারা খোলাখুলিভাবেই উল্লেখ করেছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের র্যান্ড কর্পোরেশন এমনই একটি প্রতিষ্ঠান। র্যান্ড সমর্থিত এই আলিম ও দাঈদের শয়তান এই বলে ধোঁকা দেয় -- আমরা তো দাওয়াহ করছি, মসজিদ আর স্কুল নির্মাণ করছি, ইসলামকে ছড়িয়ে দিচ্ছি। আসলে কাফিরদের অর্থায়ন আর প্রযোজনায় কখনো ইসলামের দাওয়াহ হয় না। এটা দাওয়াহর নামে অন্য কিছু। কাফিররা যদি ইসলামী দাওয়াতের পেছনে অর্থ খরচ করে, সেটা নিজেদের স্বার্থে। মূলত তারা এভাবে ইসলামকে বদলে দিতে চায়।
কাব ইবন মালিক গাসসানের রাজার চিঠি ছিঁড়ে আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। গাসসানের রাজা বেশ সহানুভূতি আর দরদ নিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল। কিন্তু কা'ব জানতেন, এই সহানুভূতির ভাষা ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়। কা'ব ইবন মালিকের মতো একজন মুসলিমকে নিজেদের পক্ষে টেনে বিভেদ তৈরি করাই ছিল তার লক্ষ্য। দরদ দেখানো তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। কা'ব চাইলে সেই চিঠিকে স্মারক হিসেবে রাখতে পারতেন, রাজার চিঠি বলে কথা! কিন্তু তিনি সেটা করেননি। বরং একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছেন, যেন এই প্রলোভন দ্বিতীয়বার তার মাথায় উঁকি দিতে না পারে। মুসলিমদের বয়কট সত্ত্বেও কা'ব ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। অন্যদিকে কাফিরদের থেকে পাওয়া নাগরিকত্বের অফার তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার নাম হলো আল ওয়ালা ওয়াল বারা। বিষয়টি পৃথকভাবে বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। প্রত্যেক মুসলিমের উচিত এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে শেখা ও অনুশীলন করা।
৮) অপরাধবোধ ও অনুশোচনা
তিনজন মুসলিম তাবুকের অভিযানে অংশ নেননি। কিন্তু এটা নিয়ে তাদের তীব্র অপরাধবোধ কাজ করেছে। কিন্তু মুনাফিকদের মনে এ নিয়ে কোনো উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠার উদ্রেক হয়নি, কোনো ভাবান্তরও হয়নি। তারা একদম গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তাদের কাছে এটা কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু মু'মিনদের মনে তীব্র মনস্তাপের জন্ম হয়, জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। একজন ঈমানদার যদি কোনো গুনাহ বা অপরাধ করে ফেলে, তার অন্তর আফসোসে ভরে ওঠে, অনুশোচনা হয়। এটা এমন একটা গুণ যা মুনাফিক্বদের থেকে মু'মিনদের আলাদা করে দেয়।
৯) ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহর কিছু মন্তব্য
পরিশেষে ইমাম ইবনুল কায়্যিমের রাহিমাহুল্লাহ যাদুল মাআদ গ্রন্থ থেকে তাবুকের অভিযান বিষয়ক কিছু শিক্ষা জেনে নেওয়া যাক।
১) নিজের দুর্বলতা বা অক্ষমতার কথা সাধারণত প্রকাশ করা জায়েয, যদি তাতে কোনো উপকার থাকে। সাধারণভাবে, নিজের গুনাহের কথা প্রকাশ করা উচিত নয়। কিন্তু যদি এর মধ্যে শিক্ষণীয় কিছু থেকে থাকে, তবে সেটা প্রকাশ করায় বাধা নেই। যেমন এই ঘটনায় কা'ব ইবন মালিক নিজেই নিজের অপরাধের কথা বর্ণনা করছেন যেটা মুসলিমদের জন্য একটি অত্যন্ত শিক্ষণীয় ঘটনা।
২) নিজ মুখে নিজের প্রশংসা করা ও নিজের কিছু ভালো কাজের কথা প্রকাশ করা ক্ষেত্রবিশেষে ঠিক আছে। তবে নিঃশর্তভাবে নিজের প্রশংসায় মেতে ওঠা ঠিক নয়। এই ঘটনায় কা'ব ইবন মালিক বলেছেন তিনি বদর ছাড়া বাকি সব যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সাথে ছিলেন আর আকাবার ঘটনার সময়ও উপস্থিত ছিলেন। অহংকারের বশে কিংবা মানুষের চোখে নিজের মর্যাদা বাড়ানো যদি উদ্দেশ্য না হয়, তাহলে নিজের ব্যাপারে ভালো কথা বলা বৈধ।
৩) আল্লাহ কোনো ভালো কাজের সুযোগ করে দিলে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত। জীবনের বিভিন্ন সময়ে আল্লাহ আমাদের জন্য ভালো কাজের দরজা খুলে দেন। এই সুযোগগুলো হয়তো জীবনে একবারই আসে। একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে তা চিরতরে হাতছাড়া হয়। তাই ভালো কাজের সুযোগ 'পরে করবো' ভেবে হাতছাড়া করা উচিত নয়। কা'ব ইবন মালিক তাবুকের অভিযানে অংশ নিতে না পেরে আফসোস করে বলেছেন, 'হায়! আমি যদি যেতে পারতাম!' সুযোগ অবহেলা করার পরিণাম কখনো খুব ভয়াবহ হতে পারে।
“হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সেই ডাকে সাড়া দাও যা তোমাদের মাঝে প্রাণের সঞ্চার করে। জেনে রেখো আল্লাহ তাআলা মানুষ ও তার অন্তরের মাঝখানে অবস্থান করেন, তোমাদের সবাইকে তাঁর কাছেই জড়ো করা হবে।” (সূরা আনফাল, ৮: ২৪)
মহান আল্লাহই অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী। ক্ষণিকের অবহেলা আর নিফাকের কারণে তিনি মানুষের অন্তরকে অভিশপ্ত করে দিতে পারেন, পরবর্তীতে ভালো কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে পারেন। তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে সুযোগের কোনো দরজা খোলা হলে তার সদ্ব্যবহার করা উচিত। প্রথমবারেই মুখ ফিরিয়ে নিলে আল্লাহ অন্তর ও দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন। ফলে দ্বিতীয় কোনো সুযোগ আর না-ও পাওয়া যেতে পারে।
"আমি (শীঘ্রই) তাদের অন্তর ও দৃষ্টিকে (অন্যদিকে) ঘুরিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবারেই এর (কোরআনের) ওপর ঈমান আনেনি এবং আমি তাদেরকে অবাধ্যতার আবর্তে ঘুরপাক খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেবো।” (সূরা আনআম, ৬: ১১০)
৪) আল্লাহর রাস্তায় না গিয়ে ঘরে বসে থাকা নিফাকের লক্ষণ। কেউ যদি আল্লাহর রাস্তায় আবশ্যিক জিহাদে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সমালোচনা করা বৈধ, এটা গীবত হিসেবে গণ্য হবে না। যেমন হাদীসের আলিমরা হাদীস বর্ণনাকারীদের সমালোচনা করেন, যেন আল্লাহর রাসূলের কথা ও শিক্ষাকে বিশুদ্ধ রাখা যায়। এ কারণে বনু সালামার সেই ব্যক্তি যখন কা'ব ইবন মালিকের সমালোচনা করেন, তখন রাসূলুল্লাহ নিশ্চুপ ছিলেন। ঠিক তেমনিভাবে আমরা যদি কাউকে ভালো হিসেবে জানি, তাহলে তার অনুপস্থিতিতে তার সম্মান রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য, যেমনটা করেছিলেন মুআয ইবন ইবন জাবাল।
যদি কেউ অনেক বড় অপরাধ করে, তাহলে তার সালামের উত্তর না দেওয়া বৈধ, যাতে সে তার ভুল বুঝতে পারে। তবে তার মানে এই নয় যে, কারো সাথে মতপার্থক্য হলেই খুঁজে খুঁজে তার ভুল বের করে তার সাথে সালাম বিনিময় ও কথাবার্তা বন্ধ করে দিতে হবে। এটা ইসলামের আদবের মধ্যে পড়ে না। কোনো ব্যক্তিকে বয়কট করা জায়েয হতে পারে, যদি এই বয়কটের মাধ্যমে সেই ব্যক্তিকে কোনো গুনাহের কাজ ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে নাসীহা দেওয়া সম্ভব হয়। বয়কটের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তির সংশোধন।
৫) বন্ধুর ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা উচিত নয়। তবে যদি সে কিছু মনে না করে, তাহলে সমস্যা নেই। যেমন কা'ব তাঁর ভাই ও বন্ধু আবু কাতাদাহর বাড়িতে দেয়াল টপকে প্রবেশ করেছিলেন। তবে যদি হারাম কিছু চোখে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, বা মহিলাদের পর্দা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেটা কোনোভাবেই জায়েয নয়।
৬) সাহাবিরা কোনো সুসংবাদ শুনলে শুকরিয়া স্বরূপ সিজদায় পড়ে যেতেন। এটা ভালো একটি অভ্যাস।
৭) কোনো কিছুর ব্যাপারে যদি এমন আশঙ্কা হয় যে, নিজের দ্বীনের ক্ষতির কারণ হতে পারে, তাহলে সেটা ধ্বংস বা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া উচিত। যেমন কা'ব গাসসানের রাজার চিঠি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন।
৮) তাওবাহ করার সাথে সাথে আমাদের উচিত আল্লাহর রাস্তায় কিছু সাদাকাহ করা। কোনো ভুল করে ফেললে, তাওবাহ করার সাথে কিছু সাদাকাহও করা উত্তম। কা'ব ইবন মালিকও এমনটা করেছিলেন।