📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুনাফিকদের মাসজিদ

📄 মুনাফিকদের মাসজিদ


মদীনা থেকে রওনা হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহকে একটি নবনির্মিত মসজিদে সালাত পড়ার জন্য আহবান করা হয়েছিল। মদীনার পাশের কিছু লোক মসজিদটি নির্মাণ করেছিল। তারা নবীজিকে বললো, 'আমরা চাই এই মসজিদে সালাত আদায় করে আপনি একে বরকতময় করে তুলুন।' রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, 'এখন তো আমরা সফরে আছি। যখন আমি ফিরে আসবো, ইনশাআল্লাহ তখন সালাত আদায় করবো।'

এই মসজিদের কাহিনী সম্পর্কে জানার আগে আবু আমীর সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। সে ছিল খাযরাজ গোত্রের এক বিশিষ্ট নেতা। জাহিলিয়াতের সময়ে তার নাম ছিল আবু আমীর আর-রাহীব। রাহীব মানে পাদ্রী, কারণ সে ছিল আল্লাহর একনিষ্ঠ উপাসক। সে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিল। খাযরাজের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করলেও সে তার ধর্মেই অটল থাকে। শুরু থেকেই তার ছিল প্রবল ইসলামবিদ্বেষ। উহুদের যুদ্ধে সে ছিল কুরাইশ পক্ষের শক্তি। তার খনন করা গর্তে পড়েই আল্লাহর রাসূলের দাঁত ভেঙে গিয়েছিল এবং শিরস্ত্রাণ থেকে কিছু লোহার টুকরা উনার গালের ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল। কুরাইশরা রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারছিল না। এই অবস্থায় সে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হিরাক্লিয়াসের সাথে দেখা করতে যায় এবং মদীনা দখল করার জন্য তাকে সেনাবাহিনী পাঠাতে আহবান করে। হিরাক্লিয়াস তাকে সাহায্য করার ব্যাপারে কথা দেয়।

আবু আমীর প্রায়ই মদীনায় তার বন্ধু মুনাফিকদের চিঠি লিখে আশ্বাস দিতো যে ইসলামী রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য সে সেনাবাহিনী নিয়ে হাজির হবে। সে তাদেরকে অনুরোধ করলো তারা যেন নিজস্ব একটি ঘাঁটি তৈরি করে যেখানে বসে তারা নিজেদের এজেন্ডা ছড়িয়ে দিতে পারবে, ষড়যন্ত্রের নীলনকশা তৈরি করবে, নিজেদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ ও যোগাযোগ রক্ষা করবে। তার চিঠির সূত্র ধরে মুনাফিকরা মসজিদে কুবার পাশে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণ করে। এই মসজিদে সালাত আদায় করতেই নবীজিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাদের যুক্তি ছিল শীতের দিনে দুর্বল ও অসুস্থ লোকেরা যেন ঘরের কাছে সালাত আদায় করতে পারে সেজন্য তারা মসজিদটি নির্মাণ করেছে। এ মসজিদ নিয়ে যেন কোনো সন্দেহ সৃষ্টি না হয় এজন্য তারা আল্লাহর রাসূলকে সেখানে সালাত আদায় করতে অনুরোধ করে। কারণ আল্লাহর রাসূলের সালাত আদায় করার অর্থ সেই মসজিদকে বৈধতা দেওয়া। নতুন নির্মাণকৃত মসজিদটি ছিল মুনাফিকদের একটি ঘাঁটি।

কিন্তু আল্লাহর রাসূল সেখানে কখনোই সালাত আদায় করেননি। তাবুক থেকে মদীনায় ফেরার পথে রাসূলুল্লাহর কাছে ওয়াহীর মাধ্যমে মুনাফিকদের এই পরিকল্পনা প্রকাশ করে দেওয়া হয়।

"(মুনাফিকদের মধ্যে) যারা (তোমাদের ক্ষতি সাধন করার জন্য) মাসজিদ দ্বিরার নির্মাণ করেছে, তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তাআলার বিরোধিতা করা, মু'মিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং আগে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে, তাদের জন্য ঘাঁটি প্রস্তুত করা। তারা তোমাদের কাছে কসম খেয়ে বলবে যে, আমরা সৎ উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে (এটা) করিনি। আল্লাহ তাআলা নিজে সাক্ষ্য দিচ্ছেন, এরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।

তুমি (ইবাদাতের উদ্দেশ্যে) কখনো সেখানে দাঁড়াবে না। তোমার তো দাঁড়ানো উচিত সেখানে, যে মসজিদ প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে রয়েছে এমন কিছু লোক, যারা পবিত্রতাকে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন।” (সূরা তাওবা, ৯: ১০৭-১০৮)

আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে এই মসজিদে সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। বরং এমন মসজিদে সালাত আদায় করতে বলেছেন যেটা প্রথম থেকেই তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যেখানে মু'মিনরা থাকে, যারা পবিত্র হতে চায়। রাসূলুল্লাহ এরপর এই মসজিদকে আগুনে পুড়িয়ে মাটির সাথে সম্পূর্ণ মিশিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন।

"যে ব্যক্তি তার ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছে আল্লাহর ভয় ও সন্তুষ্টির ওপর -- সে ব্যক্তি উত্তম, নাকি সেই ব্যক্তি, যে তার ঘরের ভিত্তি দাঁড়া করিয়েছে কোনো গহবরের কিনারায়, যা ধ্বসে পড়ার উপক্রম এবং যা তাকে সহ অচিরেই জাহান্নামের গিয়ে পড়বে? আর আল্লাহ জালিমদের পথ দেখান না। তাদের নির্মিত ঘরটি তাদের অন্তরে সদা সন্দেহের উদ্রেক করে যাবে যে পর্যন্ত না তাদের অন্তরগুলো চৌচির হয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাওবা, ৯: ১০৯-১১০)

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মসজিদ আল-দ্বিরারের ঘটনা থেকে শিক্ষা

📄 মসজিদ আল-দ্বিরারের ঘটনা থেকে শিক্ষা


১) মসজিদ আদ-দ্বিরার প্রতিষ্ঠা করেছিল মুনাফিকরা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এই মসজিদের মাধ্যমে তাদের ইসলামবিদ্বেষী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। তারা আল্লাহর রাসূলকে দিয়ে সেখানে সালাত আদায় করিয়ে তাদের এই কার্যক্রমের বৈধতা আদায় করতে চেয়েছিল। আল্লাহ তাআলা এই মসজিদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন -- দুররান ওয়া কুফরান ওয়া তাফরিকান। অর্থাৎ এটা এমন এক মসজিদ যা ক্ষতিসাধন করে, কুফরি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে এবং মু'মিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।

খোদ আল্লাহর রাসূলের যুগেই যদি মুনাফিকরা এমন কাজ করার সাহস করে, তাহলে বর্তমান যুগে এই ফিতনার স্বরূপ কী হতে পারে তা অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে সরকার ও রাজনীতিবিদরা নিজেদের প্রভাব খাটানোর জন্য মসজিদগুলোকে ব্যবহার করছে। নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য আলিমদের ব্যবহার করে ফতোয়া প্রদান করাচ্ছে। কাজেই, বর্তমান সময়ের কোনো মসজিদ যদি কাফিরদের এজেন্ডা প্রচার করে, তাহলে সেটিও মসজিদ আল-দ্বিরারের সমতুল্য। দ্বীনের শত্রুদের এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে মুসলিমদের সতর্ক হতে হবে।

২) আল কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহিদা-- অর্থাৎ, কাফিররা এক মিল্লাত বা এক জাতি। আবু আমীর ছিল একজন খ্রিস্টান। আক্বীদার বিচারে খ্রিস্টধর্ম ইসলামের কাছাকাছি, কারণ খ্রিস্টধর্ম মূলত তাওহীদবাদী একটি ধর্ম। যদিও খ্রিস্টানরা তাওহীদের বিশুদ্ধতা বজায় রাখেনি। সে তুলনায় মুশরিকদের আক্বীদা মৌলিকভাবে শিরকের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু একজন খ্রিস্টান হয়েও আবু আমীর মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করেছে এবং মুশরিকদের আপন করে নিয়েছে। আল্লাহর রাসূল তার নাম বদলে রেখেছিলেন আবু আমীর আল-ফাসিক, কারণ সে ছিল নীতিহীন, পথভ্রষ্ট একটি লোক।

ফন্ট সাইজ
15px
17px