📄 তাবুকের যুদ্ধে কিছু টুকরো ঘটনা
১) আবদুর রাহমান ইবন আউফের ইমামতি
এই অভিযানে কোনো একটি ওয়াক্তে সালাত আদায় করতে আল্লাহর রাসূল দেরি করে ফেলেন। মুসলিমরা তাই সালাতের জন্য ইক্বামাত দেন। আবদুর রহমান ইবন আউফের ইমামতিতে সালাত আদায় শুরু হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ সালাতে যোগ দিলেন, আবদুর রহমান চাইলেন সালাত থামিয়ে দিতে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাঁকে চালিয়ে যাবার নির্দেশ দিলেন এবং তিনি আবদুর রহমান ইবন আওফের পেছনেই সালাত আদায় শেষ করলেন। এর ফলে আব্দুর রহমান ইবন আউফ হলেন একমাত্র সাহাবি যার পিছে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ সালাত আদায় করেছেন। এটি আব্দুর রহমান ইবন আউফের একটি বিরাট মর্যাদা।
২) আবদুল্লাহ যুল বিজাদাইনের মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহর সম্মাননা
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ থেকে বর্ণিত, 'তাবুকের যুদ্ধের সময় মাঝরাতে আমি একটি মশাল দেখতে পেলাম। তাই আমি সেটার পিছু নিলাম। কাছে গিয়ে আমি রাসূলুল্লাহ, আবু বাকর ও উমারকে দেখতে পেলাম। দেখলাম আবদুল্লাহ যুল বিজাদাইন আল মুজানী মৃত্যুবরণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ আবু বকর এবং উমারকে বলছিলেন, তোমাদের ভাইকে কাছে নিয়ে আসো। এরপর আল্লাহর রাসূল তাঁকে কবরে শায়িত করে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, এই রাতে আমি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। আপনিও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন।'
আবদুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র, সহজ সরল ও অপরিচিত একজন সাহাবি। কিন্তু তার জানাযায় ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল, আবু বকর এবং উমার। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ এই দৃশ্য দেখে বলেন, 'ইশ! এটা যদি আমার কবর হতো!' আল্লাহর রাসূল একজন শহীদকে এতটাই সম্মান দিয়েছিলেন যে অন্য সাহাবিরাও ঈর্ষান্বিত হতেন।
৩) 'সে একা এসেছে, একাই চলে যাবে, আর একাই উত্থিত হবে।'
মুসলিম সেনাবাহিনী সুনায়াতুল-ওয়াদা নামক স্থানে পৌঁছানোর পর আল্লাহর রাসূল পুরো বাহিনীর বিভিন্ন ভাগের জন্য কমান্ডার নিযুক্ত করে তাদের হাতে পতাকা তুলে দেন। এই অভিযানে গাইড ছিলেন ইলকিমাহ ইবন আল-ফাঘওয়াহ। আব্বাস ইবন বিশর ছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে।
তাবুকের যুদ্ধে মুসলিমদের জিহাদের দিকে গণ-আহবান করা হয়েছিল। 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'তে বিশ্বাস করে এমন প্রত্যেক মুসলিম এই আহবানে সাড়া দেয়। তবে অল্প কিছু লোক বাদে। সবার জন্য অপেক্ষা করাও যৌক্তিক ছিল না। যখনই রাসূলুল্লাহকে বলা হতো, 'অমুক যুদ্ধে আসেনি', তখন রাসূলুল্লাহ বলতেন, 'তার কথা বাদ দাও। তার মধ্যে যদি ভালো কিছু থেকে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাকে তোমাদের পথ অনুসরণ করাবেন। আর যদি ভালো কিছু না থাকে, তাহলে আল্লাহ তার হাত থেকে তোমাদের রেহাই দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহকে যখন বলা হলো, 'আবু যার আমাদের সাথে আসেননি,' তখনও তিনি একই কথা বললেন।
আবু যার হচ্ছেন আবু যার আল-গিফারী। তাঁর কথা এর আগেও আলোচনা হয়েছে। তিনি বেশ প্রথমদিকের একজন মুসলিম। ইসলাম গ্রহণ করে তিনি গিফার গোত্রে ফিরে যান এবং তাঁর দাওয়াহর বদৌলতে গিফার গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। হিজরতের পর তিনি আর তাঁর গোত্র মদীনায় চলে আসেন।
অগ্রগামী মুসলিম হিসেবে আবু যার তাবুকে অংশ নেবেন, এটাই ছিল কাম্য। কিন্তু তাকে দেখা গেল না। আসলে আবু যার মূল বাহিনীর পেছনেই ছিলেন, কিন্তু তাঁর উটটি ছিল ধীরগতির। তাই তিনি পিছিয়ে পড়েন। অনেকটা পিছিয়ে যাওয়ায় তিনি তাঁর জিনিসপত্র নিয়ে উট থেকে নেমে গিয়ে তপ্ত মরুভূমির বুকে হেঁটেই রওনা দেন। মুসলিমরা দেখতে পেল, দূর দিগন্তে একজন মানুষ, একা হেঁটে আসছে! তারা রাসূলুল্লাহকে জানালেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'এটা যেন আবু যার হয়!' আসলেই তা-ই! সে মানুষটি কাছে এলে দেখা গেল তিনি আর কেউ নন, আবু যার। আবু যারের আগমনের কথা রাসূলুল্লাহকে জানালো হলো। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আল্লাহ আবু যারের উপর রহমত বর্ষণ করুন। সে একা এসেছে, একাই চলে যাবে, আর কিয়ামতের দিনে তাঁকে একাই উত্থিত করা হবে।'
আল্লাহর রাসূলের এই ভবিষ্যতবাণী আক্ষরিক অর্থেই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল বেশ কিছু বছর পর। তখন উসমান ইবন আফফানের খিলাফতকাল। মুসলিম সাম্রাজ্য অঢেল বিত্ত-বৈভব অর্জন করেছে। আবু যার ছিলেন খুব সাদাসিধে একজন মানুষ। বড় হয়েছিলেন কঠিন মরু এলাকায়। স্বভাবে তিনি ছিলেন কিছুটা রাগী এবং কঠোর প্রকৃতির। তিনি ছিলেন একজন যাহিদ-দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি, কঠোরভাবে যুহদ করতেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, মুসলিমদের প্রয়োজনের বেশি সম্পদ জমা করা হালাল নয়। তিনি মনে করতেন যা কিছু প্রয়োজনের চাইতে বেশি তা দরিদ্রদের দান করা ও অন্যান্য ভালো কাজ ব্যয় করতে হবে। যদিও শক্তিশালী অভিমত হলো, একজন ব্যক্তি তার সম্পদের উপর যাকাত দেওয়ার পর বাকি সম্পদ তার জন্য হালাল হবে এবং সে চাইলে এটা জমা করতে ও রেখে যেতে পারে -- এটাই অধিকাংশ আলেমের মত। সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার অনুমোদন যদি ইসলামে না-ই থাকতো, তাহলে মীরাস বা উত্তরাধিকারের বিধানগুলো থাকার কোনো অর্থই নেই।
যা-ই হোক, আবু যারের যুহদ ছিল এতটাই কঠোর যে জনগণ ও শাসন কর্তৃপক্ষের সাথে তার ঠিকমতো বনিবনা হচ্ছিলো না। উসমানের খিলাফতকালে আবু যার শামে ছিলেন। তখন মুআবিয়া ছিলেন শামের গভর্নর। রোমানদের সাথে তখন জিহাদ চলছিল, তাই শাম হয়ে উঠে গনিমতের আধার। আর শাম এমনিও বেশ বরকতময় একটি জায়গা। প্রবল বিত্ত-বৈভবের প্রবাহে আবু যার খুশি ছিলেন না। তিনি জনগণকে বকাঝকা করতেন। তারা সম্পদ জমা করতো, সে কারণে তাদের তিরস্কার করতেন। বিষয়টা জনমনে অসন্তোষের জন্ম দেয়। তাই গভর্নর মুআবিয়া খলিফা উসমানকে চিঠি দিয়ে আবু যারের ব্যাপারে অভিযোগ করে জানালেন তার জন্য শামের স্বাভাবিক জীবনে বিঘ্ন ঘটছে。
উসমান তখন আবু যারকে মদীনায় ফিরে আসতে বলেন। কেননা শাম আসলে আবু যারের জন্য উপযুক্ত জায়গা ছিল না। আবু যার শাম ত্যাগ করে মদীনায় ফিরে এলেন। উসমান ইবন আফফান বললেন তিনি চাইলে মদীনায় থাকতে পারেন। কিন্তু আবু যার বললেন, 'আপনাদের দুনিয়ার সাথে আমি কোনো সম্পর্কই রাখতে চাই না। আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। আমাকে আর-রাবদাতে যেতে দিন।'
আর-রাবদাহ মদীনার কাছেই মরুভূমিতে ছোট্ট একটি গ্রামের মতো। উসমান আবু যারকে ছেড়ে দিলেন, জোরাজুরি করলেন না। তিনি এতটাই দুনিয়াবিমুখ ছিলেন যে মুসলিমদের দুনিয়াবী সমৃদ্ধি হবে -- এই দৃশ্য তার একেবারেই ভালো লাগছিল না। উসমান তাকে বললেন, 'আমি আপনাকে কিছু উট দিতে চাই।' আবু যার বললেন, 'না আমি এসব চাই না। আমি নিজে নিজের মতো চলতে পারবো।' আবু যার আর-রাবদায় চলে গেলেন এবং সেখানেই বাস করতে লাগলেন।
আবু যার একা একা জীবন কাটাতে লাগলেন, আল্লাহর ইবাদাতে ডুবে থাকলেন। একসময় তার মৃত্যুর মুহূর্ত ঘনিয়ে এল। মৃত্যুশয্যায় তখন মরুভূমির মাঝখানে তাঁর সাথে ছিলেন শুধুমাত্র তাঁর স্ত্রী এবং সেবক। কোনো প্রতিবেশী বা বন্ধুবান্ধব ছিল না। যে মহান সাহাবি একসময়ে ছিলেন আল্লাহর রাসূলের সঙ্গী, আবু বাকর, উমার ও উসমানের সময়ে তিনি ছিলেন একজন আলিম, একজন মুফতি -- অথচ দুনিয়া ত্যাগ করার সময় তিনি আজ সম্পূর্ণ একা। কোনো ছাত্র বা বন্ধু কেউই নেই। তাঁর স্ত্রী কাঁদতে লাগলেন। আবু যার জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কাঁদছো কেন?' স্ত্রী উত্তর দিলেন, 'তুমি কীভাবে আশা করো আমি কাঁদবো না? তুমি মারা যাচ্ছো আর তোমাকে দাফন করার মতো কিছুই আমার নেই। তোমাকে একা দাফন করার মতো শক্তিও আমার নেই।'
আবু যার তার স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বললেন, 'কেঁদো না, আমি এক জমায়েতে রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে একজন এক শূন্য ভূমিতে মৃত্যুবরণ করবে এবং তাঁর দাফন প্রত্যক্ষ করবে মু'মিনদের একটি দল। সেই জমায়েতের আমি ছাড়া সবাই মারা গেছে। তারা সকলেই দলবদ্ধ ছিলেন। কাজেই আমিই সেই ব্যক্তি যে একা একা মৃত্যুবরণ করে হাদীসটিকে সত্য প্রমাণ করবো। তুমি বরং বাইরে যাও আর গিয়ে রাস্তার দিকে চোখ রাখো। যখন আমি মারা যাবো, আমাকে গোসল দিও, কাফনে ঢেকে দিও। আর আমাকে রাস্তার ওপাশে রেখে এসো। যে মুসাফির দলের সাক্ষাৎ তুমি পাবে, তাদেরকে বলবে, এ হচ্ছে আবু যার...'
আবু যর একদিন দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। তার স্ত্রী এবং সেবক তার কথামতো সবকিছু করলেন। তার স্ত্রী রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন একটি কাফেলা আসবে এবং তার স্বামীকে দাফন করবে। অবশেষে একটি কাফেলা এল। সেই কাফেলাটি আসছিল কুফা থেকে, সেখানে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ যখন জানলেন, এটা আবু যরের লাশ, তখনি তার মনে পড়ে গেল আল্লাহর রাসূলের সেই হাদীস। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'আল্লাহর রাসূল সত্যই বলেছিলেন: আবু যর একা এসেছে, একাই যাবে আর একাই পুনরুত্থিত হবে।' এরপর আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ আবু যরের জানাযায় ইমামতি করলেন। আবু যরের দাফন সম্পন্ন হলো।
আবু যর ক্ষমতা আর নেতৃত্বকে তীব্রভাবে অপছন্দ করতেন। একবার আবু মূসা আল-আশআরী তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। আবু যর তখন ঘরের কাজ করছিলেন। ভাই হিসেবে তাকে সাহায্য করতে গেলে আবু যর তাকে বলেন, 'আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।' আবু মূসা বললেন, 'আমি তো তোমার ভাই!' আবু যর উত্তর দিয়েছিলেন, 'না! নেতৃত্বের পদ গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত তুমি আমার ভাই ছিলে!' আমীর হিসেবে নিযুক্ত বা সরকারি কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তি থেকে আবু যর দূরত্ব বজায় রাখতেন।
আবু যরের মতো জীবনযাপন করা হয়তো এখন সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেদের অবস্থাকে আবু যরের জীবনের সাথে অন্তত তুলনা করে দেখা সম্ভব। এখন মুসলিমদের জীবনে প্রাচুর্য আছে, জীবনের নিরাপত্তা আছে, আছে সম্পদ আর স্বাচ্ছন্দ্য। আবু যরের সেসব কিছুই ছিল না। কাফনের জন্য একটুকরো ভালো কাপড়ও ছিল না। কিন্তু ছিল তাকওয়া, যা এখন দুর্লভ। তাই মুসলিমদের আজ সব থেকেও নেই।
৪) আবু খাইসামার কাহিনী
পিছিয়ে থাকা সাহাবিদের মধ্যে আরও একজন ছিলেন আবু খাইসামা আল-আনসারী। রাসূলুল্লাহ ও অন্য মুসলিমরা যখন অভিযানে, আবু খাইসামা তখন বসে আছেন 'আরিশে'। আরিশ গাছের ডাল দিয়ে বানানো একধরনের বিশেষ কুঁড়েঘর। গরমকালে সেই ঘরের উপরে পানি ঢালা হলে তা শীতল ও আরামদায়ক হয়ে যেত। বলা যেতে পারে আরিশ ছিল প্রাকৃতিক এয়ারকন্ডিশনার। তাঁর দুই ঘরে ছিল দুইজন স্ত্রী। আবু খাইসামা ঘরে ঢুকে দেখলেন তাঁর স্ত্রীরা তাঁর জন্য খাবার পানীয় প্রস্তুত করে রেখেছেন।
হঠাৎ তার মনে হলো আল্লাহর রাসূলের কথা। তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাসূল তপ্ত সূর্য আর গরম বাতাসে বসে আছেন আর আবু খাইসামা বসে আছে সুশীতল ছায়ায়, সুস্বাদু খাবার আর সুন্দরী স্ত্রীদের সাথে! এ হতে পারে না। আল্লাহর কসম, আমি এই দুই ঘরের একটিতেও প্রবেশ করবো না যতক্ষণ না আমি আল্লাহর রাসূলের অনুসরণ করি। কাজেই তোমার আমার জন্য আমার রসদ প্রস্তুত করো।'
তার স্ত্রীরা তার জন্য সবকিছু প্রস্তুত করে দিলেন। আবু খাইসামা উটের পিঠে চড়ে তাবুকের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। যাত্রাপথে উমায়ের ইবন ওয়াহাবকে সঙ্গী হিসাবে পেয়ে যান। উমায়ের সম্ভবত মক্কা থেকে আসছিলেন বা অন্য কোনো কারণে তার দেরি হয়। তাবুক গিয়েই তারা রাসূলুল্লাহর কাফেলার দেখা পান। আবু খাইসামা উমায়েরকে অনুরোধ করলেন যেন তিনি একা গিয়ে প্রথমে আল্লাহর রাসূলের সাথে কথা বলতে পারেন। উমায়ের তার অনুরোধ রাখলেন।
দূর থেকে সাহাবিরা দেখলেন, কেউ একজন আসছে! আল্লাহর রাসূল বললেন, 'এটা যেন আবু খাইসামাই হয়!' আবু খাইসামা কাছে এলে আল্লাহর রাসূল তাঁকে বললেন, 'তুমি তো নিজেকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিলে, আবু খাইসামা!' আবু খাইসামা এরপর রাসূলুল্লাহকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন এবং রাসূলুল্লাহ তার জন্য দুআ করলেন। একজন আদর্শ নেতা হিসেবে তাঁকে সাবধান করলেন এবং তাঁর প্রতি দয়াও করলেন।
আবু খাইসামার কাহিনী থেকে শিক্ষা হলো, একজন মুসলিম হোঁচট খায়, কিন্তু হোঁচট খেয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। একজন মুসলিম ভুল করে, কিন্তু তার বিবেক তাকে শোধরাতে বাধ্য করে। একজন মুসলিম দ্বীনের মধ্যে পিছিয়ে পড়ে, কিন্তু সে অনুশোচনা করে আর সেই অনুশোচনা তাকে দ্বিগুণ উৎসাহে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায়।
"আল্লাহ তাআলাকে যারা ভয় করে, যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা কখনো তাদের স্পর্শ করে, তবে সাথে সাথে তারা আত্মসচেতন হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাদের চোখ খুলে যায়।" (সূরা আরাফ, ৭: ২০১)
📄 তাবুকের অভিযান থেকে শিক্ষা
যাদ আল মাআদ কিতাবে ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ তাবুকের অভিযান থেকে কিছু কল্যাণকর শিক্ষার কথা তুলে ধরেন। ১) যদি ইমাম (খলিফা) যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেন তাহলে তাতে সাড়া দেওয়া প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক। ইমাম অনুমতি দিলেই পেছনে বসে থাকার অনুমতি আছে। যে তিনটি ক্ষেত্রে জিহাদ করা ফরয হয়, এর মধ্যে এটি একটি। বাকি দুটো ক্ষেত্র হলো যখন শত্রুরা মুসলিম ভূমি দখল করে আর যখন দুটি সৈন্যদল ময়দানে মুখোমুখি হয়।
২) জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহর ক্ষেত্রে জান ও মাল দুটো দিয়েই সমর্থন করা বাধ্যতামূলক। কারণ, কুরআনে যখনই জিহাদের কথা এসেছে, জান ও মাল দুটোর কথাই এসেছে এবং শুধুমাত্র একটি আয়াত ছাড়া প্রতিবারই মালের কথা জানের আগে এসেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'যে ব্যক্তি একজন যোদ্ধাকে অর্থায়ন করে, সে যেন নিজেই যুদ্ধ করলো।' যাদেরই আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে তাদেরই জিহাদের পেছনে অর্থায়ন করা বাধ্যতামূলক, যেভাবে জান দিয়ে জিহাদ করা বাধ্যতামূলক। কারণ জিহাদ তখনই সফল হয়, যখন যথেষ্ট পরিমাণে সৈন্যবাহিনী ও অর্থায়ন মজুদ থাকে। কেউ যদি যুদ্ধ করতে অসমর্থ হয়, তার জন্য সম্পদ দিয়ে জিহাদে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক। তার কোনো অজুহাতই প্রযোজ্য হবে না যতক্ষণ না সে প্রমাণ করেছে সে সম্পদ দিয়ে জিহাদ করতে অসমর্থ।
৩) সামূদের কূপের পানি পান করা, সে পানি ব্যবহার করে রান্না করা, রুটির মণ্ড তৈরি করা বা তাতে অযু করা জায়েজ নয়। কারণ হলো এদের ওপর আল্লাহ তাআলার গজব আপতিত হয়েছে। কেউ যখন আল্লাহর শাস্তিপ্রাপ্ত জনপদের স্থান বা বাসস্থানের পাশ দিয়ে যায় তখন তাতে প্রবেশ করা উচিৎ নয় বা সেখানে অবস্থান করা উচিৎ নয়। যত দ্রুত সম্ভব সেটা পার হয়ে যেতে হবে এবং যতক্ষণ না সেই স্থান পার হচ্ছে ততক্ষণ মুখ ঢেকে রাখা উচিৎ। মূল কথা হলো, এরকম স্থান যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উচিৎ, অথবা কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করা উচিত। শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য ছাড়া এ ধরনের স্থানে প্রবেশ করা উচিৎ নয়।