📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 দ্বীন নিয়ে হাসি ঠাট্টা: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি কুফরি করার স্বাধীনতা

📄 দ্বীন নিয়ে হাসি ঠাট্টা: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি কুফরি করার স্বাধীনতা


জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় আল্লাহর রাসূল মদীনার দায়িত্বভার কারো কাছে অর্পণ করে যেতেন। তাবুকের যুদ্ধে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ মদীনার আমীর হিসেবে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহকে নিয়োগ করে যান। আর আলী ইবন আবু তালিবকে তাঁর নিজ পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যান। মুনাফিকরা সবসময়ই সবকিছুর মাঝে দোষ খুঁজে বেড়াত। এবার তারা বলাবলি করতে লাগলো, 'মুহাম্মাদ আলীকে রেখে গেছে কারণ জিহাদের ময়দানে সে একটা বোঝা।' অথচ আলী ছিলেন একজন বীরযোদ্ধা। স্বাভাবিকভাবেই এই কথাগুলো তাঁর খুব গায়ে লাগলো। আলী তাঁর অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য নবীজির কাছে চলে গেলেন। আল্লাহর রাসূল ইতিমধ্যে তাঁর বাহিনী নিয়ে আল-জুরফ ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন।

আলী নবীজিকে মুনাফিকদের মিথ্যাচারের কথা খুলে বললেন। রাসূলুল্লাহ আলীর মানসিক অবস্থা বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন,

'তারা তো মিথ্যে বলছে, আলী! আমিই তো তোমাকে আমার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে রেখে এসেছি। কাজেই তুমি ফিরে যাও, আমার এবং তোমার পরিবারের দেখাশোনা করো। তুমি কি এটা ভেবে খুশি হও না যে, মূসার কাছে হারুন যেমন, আমার কাছে তুমি তেমন? পার্থক্য তো শুধু এতটুকুই যে আমার পরে আর কোনো নবী আসবেন না।'

যখন মূসা আল্লাহ আযযা ওয়া জালের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলেন তখন বনী ইসরায়েলের তত্ত্বাবধান করার জন্য হারুনকে রেখে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহও ঠিক সেভাবেই আলীকে দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এই কথা ছিল সাহাবি হিসেবে আলীর জন্য এক বিশাল সম্মাননা। আল্লাহর রাসূল তাঁর ও আলীর সম্পর্ককে মূসা ও হারুনের সম্পর্কের সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু এই ঘটনাকে শিয়ারা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে টেনে নেয়। তারা বলতে চায়, এই হাদীস দিয়ে প্রমাণিত হয় আল্লাহর রাসূল তাঁর মৃত্যুর পর আলীকে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। স্পষ্টতই এমন কিছুর ইঙ্গিত এই হাদীসে নেই। আলীকে নবীজি একটি বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তা হলো তাঁর পরিবারকে দেখাশোনা করা। মদীনার অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা। শিয়াদের যুক্তি অনুসারে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাই নবীজির পরে খলিফা হওয়ার কথা! কিন্তু সে কথা কখনোই ওঠে না। শিয়ারা এই হাদীসের মনগড়া ব্যাখ্যা দেয় তাদের ভুল বিশ্বাসকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য। আহলুস সুন্নাহ এই ঘটনা থেকে সাহাবি হিসেবে আলী ইবন আবু তালিবের বিশেষ মর্যাদার ব্যাপারে শিক্ষা নেয়।

পুরো সীরাত জুড়েই জিহাদের ব্যাপারে মনোবল ভেঙে দেওয়া কথাবার্তা বলার অভ্যাস মুনাফিকদের মধ্যে দেখা যায়। তাবুকের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি। কিছু মুনাফিক্ব বলাবলি করতে লাগলো, 'তোমাদের কি মনে হয় রোমানদের সাথে যুদ্ধ করা আর আরবদের সাথে যুদ্ধ করা একই কথা? ওদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে তোমরা দড়িতে বাঁধা অবস্থায় ফিরে আসবে।'

জিহাদে রওনা হওয়া সেনাবাহিনী সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করা কখনোই ভালো অভ্যাস নয়। এ ধরনের কথা সৈনিকদের হৃদয়ে শত্রুদের ব্যাপারে আতঙ্ক জন্ম দেয়। তাদের এই গোপন কথাবার্তাগুলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল নবীজিকে জানিয়ে দেন। নবীজি তখন সেই লোকগুলোর ব্যাপারে আম্মার ইবন ইয়াসিরকে, বললেন, 'থামাও ওদের। ওরা যে কথা বলেছে, সেটা নিয়ে তাদের জিজ্ঞেস করো। তারা তো নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছে। যদি তারা অস্বীকার করে, তাহলে বলবে, তোমরা এই-এই কথা বলেছো।' আমর তাদের কাছে গিয়ে বললেন, 'তোমরা অমুক-তমুক কথা বলেছো, যাও আল্লাহর রাসূলের কাছে মাফ চেয়ে আসো।' তারা রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বললো, 'আমরা তো ঠাট্টা মশকরা করছিলাম মাত্র।' আল্লাহ তখন কুরআনের একটি আয়াত নাযিল করলেন,

"আর যদি আপনি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করেন, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা করো না, তোমরা তো কাফির হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। তোমাদের মধ্যে কোনো কোনো লোককে যদি আমি ক্ষমা করে দিইও, তবে অবশ্য কিছু লোককে আযাবও দেবো। কারণ, তারা ছিল গোনাহগার।" (সূরা তাওবা, ৯: ৬৫-৬৬)

এই আয়াতের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয় যে, দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা কুফর পর্যন্ত গড়াতে পারে। কেননা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলেছেন, "ছলনা কোরো না, ঈমান আনার পর তোমরা কাফির হয়ে গেছো।” এই মুনাফিক্বরা বলাবলি করছিল যে, মুসলিমরা রোমানদের সাথে লজ্জাজনকভাবে হেরে যাবে। তারা মুসলিমদের সামর্থ্য নিয়ে তামাশা করছিল। কুরআনের আয়াত বা হাদীস, আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ কিংবা সাহাবি অথবা ইসলামের কোনো নিদর্শন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা খুবই বিপজ্জনক এবং তা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটা নিফাকের চিহ্ন।

কাজেই কথার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া জরুরি। কিছু কৌতুক আছে যেগুলো কুরআনের আয়াত বা সূরা নিয়ে মজা করে, এগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ কৌতুক মনে হলেও এগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। কেননা এগুলো অনেকসময় ধর্মদ্রোহিতার দিকে ধাবিত করতে পারে। দ্বীন ইসলাম একটি পবিত্র বিষয়। এই দ্বীনকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন রাখা এবং এর প্রাপ্য সম্মান দেওয়া মুসলিমদের দায়িত্ব। নিজেরা যেমন নিজেদের দ্বীনকে হেয় করা যাবে না, তেমনি অন্য কাউকেও সেই সুযোগ দেওয়া যাবে না।

এই আয়াতের শিক্ষা বর্তমান সময়েও প্রযোজ্য। মুসলিমদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় এমন কিছু বলা বা প্রচার করা উচিত নয়। হতে পারে মুসলিমরা আসলেই দুর্বল, তাদের মাঝে অনৈক্য আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এমনভাবে কোনো কথা বলা বা রটানো উচিত নয় যা মুসলিমদের মনোবল ভেঙে দেয়। মুসলিমদের অন্তরে এই ধারণা প্রবেশ করানো উচিত নয় যে, তোমাদের শত্রুরা অজেয়, ওদের সাথে তোমরা কখনো পেরে উঠবে না, তোমাদের কোনো শক্তি নেই, তোমরা দুর্বল, তোমাদের কোনো আশা নেই, কোনো ভবিষ্যত নেই, ইত্যাদি। দায়িত্ব হচ্ছে আশার বাণী সঞ্চার করা, উম্মাহকে উৎসাহ দেওয়া। উম্মাহকে মনে করিয়ে দিতে হবে তারা হলো মানবজাতির মাঝে শ্রেষ্ঠ জাতি। উম্মাহকে তাদের গৌরবময় অতীত এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। কুফফারের সামর্থ্য, শক্তি ও ক্ষমতা নিয়ে এবং মুসলিমদের মধ্যকার অনৈক্য নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করা উচিত নয় যা মুসলিমদের মনোবলকে নষ্ট করে দেয়, তাদের হতোদ্যম করে দেয় এবং তাদের দুরবস্থাকে তাদের নিয়তি হিসেবে স্বীকার করিয়ে অলস বসিয়ে রাখে। কৌশলগত কারণে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে, তবে তা কখনোই যেন মুসলিমদের উদ্যমকে নষ্ট না করে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 যুদ্ধের ময়দানে

📄 যুদ্ধের ময়দানে


তাবুকের যুদ্ধ ছিল রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। কিন্তু কোনো রোমান ব্যাটালিয়ন বা স্থানীয় আরব খ্রিস্টান কোনো বাহিনীর চিহ্নই দেখা গেল না। কোনো যুদ্ধই হলো না। কারণ রাসূলুল্লাহর আগমনের খবর রোমানদের অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। তাই তাদের আধুনিক সমরাস্ত্র আর বিরাট সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও তারা যুদ্ধের জন্য বের হয়নি। সম্মুখ সমরে মুখোমুখি হতে তারা ভয় পেল। রাসূলুল্লাহ সেখানে অবস্থান করে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন কিন্তু কেউই এল না। সে সময়ে রাসূলুল্লাহ শাম ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কয়েকটি শহর দখল করে তাদের সাথে চুক্তি করেন ও জিযিয়া গ্রহণ করেন।

রাসূলুল্লাহ দাউমাতুল জান্দালের রাজা উকাইদকে বন্দী করে আনার জন্য খালিদ ইবন ওয়ালিদকে পাঠান। রাসূলুল্লাহ খালিদকে বলেই দিয়েছিলেন, 'তুমি দেখবে উকাইদ গাভী শিকারে ব্যস্ত।' হলোও তাই। সেদিন ছিল এক পূর্ণিমার রাত। উকাইদ দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসেছিল গাভী শিকারের জন্য। খালিদ ইবন ওয়ালিদ তাকে আক্রমণ করে বন্দী করলেন। উকাইদ জিযিয়া দিতে রাজি হলো। জারবা, আযরা, মাকুনা -- এই অঞ্চলের খ্রিস্টানরা জিযিয়া দিতে রাজি হয় এবং ইসলামী শাসনের অধীনে চলে আসে। এই ছোট ছোট রাজ্যগুলো ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করে নেওয়ায় ইসলামী সাম্রাজ্যের উত্তর সীমা সুরক্ষিত হয় এবং এই অঞ্চলটি রোমান ও মুসলিমদের মাঝে 'বাফার জোন' হিসেবে কাজ করে। এই রাজ্যগুলো যদিও ইতিপূর্বে রোমানদের অধীনস্থ ছিল, কিন্তু রোমানদের প্রতি তারা খুশি ছিল না। যে কারণে তারা বেশ সহজেই ইসলামের অধীনে চলে আসে। পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশিদার সময়ে এই অঞ্চলগুলো থেকে রোমান সাম্রাজ্যের ওপর সামরিক হামলাগুলো পরিচালনা করা হয়।

তাবুকের যুদ্ধ ছিল আল্লাহর রাসূলের জীবনের সর্বশেষ বড় অভিযান। এই যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের জন্য একটি পরীক্ষা।

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করেছেন নবীর ওপর, অনুগ্রহ করেছেন মুহাজির ও আনসারদের ওপর, যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে ছিল। (এমনকি) যখন তাদের একটি দলের অন্তর বাঁকা পথে ঝুঁকে পড়ার উপক্রম হয়ে পড়েছিল, অতঃপর আল্লাহ এদের সবার ওপর দয়া করলেন। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়।” (সূরা তাওবা, ৯: ১১৭)

এই আয়াত আল্লাহর রাসূলের জীবনের সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়। কেননা ক্ষমা হলো এমন একটি ব্যাপার, যা সমাপ্তির দিকেই আসে। ইবাদাতের শেষ দিকেই আমরা সাধারণত ইস্তিগফার করি। তাই রাসূলুল্লাহ ও অন্যান্য মুসলিমদেরকে জানানো হচ্ছে যে, আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, আরও ক্ষমা করে দিয়েছেন সেই সব আনসার ও মুহাজিরদের যারা কঠিন সময়ে তাঁর সাথে ছিলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 ধ্বংসপ্রাপ্ত কাফির জাতিগুলোর প্রতি মুগ্ধতা নয়, করুণা

📄 ধ্বংসপ্রাপ্ত কাফির জাতিগুলোর প্রতি মুগ্ধতা নয়, করুণা


তাবুকের অভিযানে যাওয়ার পথে মুসলিমরা সামূদ জাতির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়। সামূদ জাতি ছিল স্থাপত্যবিদ্যায় পারদর্শী এক জাতি। পাথর কেটে তারা বাসা বানাতো। নবী সালিহকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেন। তাদের রেখে যাওয়া সভ্যতার ধ্বংসাবশেষগুলো দেখে মুগ্ধ হয়ে মুসলিমরা সে দিকে ছুটে যায়। সেখানের কূপগুলো থেকে পানি পান করতে থাকে। বিষয়টা জানতে পেরে আল্লাহর রাসূল মোটেই পছন্দ করলেন না, বললেন,

'তোমরা এ সকল আযাবপ্রাপ্ত জাতির বাসস্থান থেকে পানি পান করো না এবং এখানকার রুটি নিজেরা খেয়ো না, বরং তা উটদের খাওয়াও কারণ এগুলো অভিশপ্ত। তোমরা এ সকল স্থানে যদি প্রবেশ করতেই চাও তবে কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করো। যদি না কাঁদতে পার, তাহলে তাদের স্থানে প্রবেশ করো না। যেন তাদের মতো তোমাদের উপরেও শাস্তি না পৌঁছে যায়।

রাসূলুল্লাহ সেই এলাকার পানি ফেলে দিতে আদেশ দিলেন। ঐ পানি দিয়ে প্রস্তুত করা রুটির মণ্ড উটদের খাইয়ে দিতে বললেন। রাসূলুল্লাহ চাননি যে সামূদ বা তাদের ভূমি বা তাদের পানির সাথে সাহাবিদের কোনো সম্পৃক্ততা হোক।

প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন রাসূলুল্লাহ কাঁদার কথা বলছেন। এর কারণ, এককালের প্রবল পরাক্রমশালী জাতিগুলোর নির্মম পরিণতি দেখে একজন মানুষের অন্তরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ভয় জেগে ওঠা উচিত। আল্লাহর গযবের ভয় এবং নিজের অসহায়ত্বের উপলব্ধি তাকে কাঁদতে উদ্বুদ্ধ করবে। তাদের সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখে যদি কেউ বিমোহিত হয়, তাহলে সেসব স্থানে যাওয়াই উচিত নয়। কাফির সভ্যতাগুলোর এত প্রাচুর্য আর শক্তিসামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের কী পরিণতি হয়েছে -- শুধু সেই শিক্ষা আর উপলব্ধি নেওয়ার জন্যই এসব স্থানে যাওয়া যেতে পারে, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকবার জন্য নয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির সভ্যতার ব্যাপারে আমাদের সে রীতিই অবলম্বন করা উচিত যা রাসূল শিখিয়ে দিয়েছেন, সেটি হলো তাদেরকে মুগ্ধতা নয়, করুণার চোখে দেখা।

আদিকালের মুশরিকদের ও আল্লাহর গযবপ্রাপ্ত লোকদের এসব তথাকথিত সভ্যতার ব্যাপারে আমাদের গর্বিত হবার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাবিলন, ফিরআউন কিংবা অন্যান্য কাফির সভ্যতাগুলো ছিল আল্লাহর শত্রু। মুসলিমরা এসব নিয়ে গর্ব করতে পারে না। ইসলাম-পূর্ব জাহিলিয়াতের ইতিহাস ও সভ্যতা নিয়ে মুসলিমদের গর্ব করাটা খুবই দুঃখজনক একটি ব্যাপার। ইসলাম তাদের পরিচয়কে বদলে দিয়েছে এবং সম্মানিত করেছে। কাফিররা এটা অনেকক্ষেত্রে খোলাখুলিভাবেই উল্লেখ করেছে যে, তারা চায় মুসলিমদের মধ্যে ইসলাম-পূর্ব ইতিহাস পুনর্জীবিত হোক। এর ফলে ইসলামী ইতিহাসের সাথে তাদের দূরত্ব বৃদ্ধি পাবে আর সেটাই হচ্ছে। এখন মুসলিমরা মমি বা ফিরআউনের পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলছে, পিকনিক করছে এবং পুরো বিষয়টা উপভোগ করছে। কিন্তু বিষয়টা মোটেও হালকাভাবে দেখার মতো নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই ধ্বংসাবশেষগুলোকে রেখে দিয়েছেন, যেন মুসলিমরা সতর্ক হতে পারে। এই বাস্তবিক উপস্থাপনা এজন্যই যেন পবিত্র কুরআনে যা বর্ণনা করা হয়েছে তার সচিত্র রূপ চাক্ষুষ সচেতন চোখ খুঁজে পায়।

টিকাঃ
১১৪. সহীহ বুখারি, অধ্যায় নবীদের কাহিনী, হাদীস ২৩। সহীহ মুসলিম, অধ্যায় যুহদ এবং অন্তর কোমলকারী বিষয়, হাদীস ৪৭।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 তাবুকের যুদ্ধে কিছু টুকরো ঘটনা

📄 তাবুকের যুদ্ধে কিছু টুকরো ঘটনা


১) আবদুর রাহমান ইবন আউফের ইমামতি
এই অভিযানে কোনো একটি ওয়াক্তে সালাত আদায় করতে আল্লাহর রাসূল দেরি করে ফেলেন। মুসলিমরা তাই সালাতের জন্য ইক্বামাত দেন। আবদুর রহমান ইবন আউফের ইমামতিতে সালাত আদায় শুরু হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ সালাতে যোগ দিলেন, আবদুর রহমান চাইলেন সালাত থামিয়ে দিতে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাঁকে চালিয়ে যাবার নির্দেশ দিলেন এবং তিনি আবদুর রহমান ইবন আওফের পেছনেই সালাত আদায় শেষ করলেন। এর ফলে আব্দুর রহমান ইবন আউফ হলেন একমাত্র সাহাবি যার পিছে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ সালাত আদায় করেছেন। এটি আব্দুর রহমান ইবন আউফের একটি বিরাট মর্যাদা।

২) আবদুল্লাহ যুল বিজাদাইনের মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহর সম্মাননা
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ থেকে বর্ণিত, 'তাবুকের যুদ্ধের সময় মাঝরাতে আমি একটি মশাল দেখতে পেলাম। তাই আমি সেটার পিছু নিলাম। কাছে গিয়ে আমি রাসূলুল্লাহ, আবু বাকর ও উমারকে দেখতে পেলাম। দেখলাম আবদুল্লাহ যুল বিজাদাইন আল মুজানী মৃত্যুবরণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ আবু বকর এবং উমারকে বলছিলেন, তোমাদের ভাইকে কাছে নিয়ে আসো। এরপর আল্লাহর রাসূল তাঁকে কবরে শায়িত করে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, এই রাতে আমি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। আপনিও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন।'

আবদুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র, সহজ সরল ও অপরিচিত একজন সাহাবি। কিন্তু তার জানাযায় ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল, আবু বকর এবং উমার। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ এই দৃশ্য দেখে বলেন, 'ইশ! এটা যদি আমার কবর হতো!' আল্লাহর রাসূল একজন শহীদকে এতটাই সম্মান দিয়েছিলেন যে অন্য সাহাবিরাও ঈর্ষান্বিত হতেন।

৩) 'সে একা এসেছে, একাই চলে যাবে, আর একাই উত্থিত হবে।'
মুসলিম সেনাবাহিনী সুনায়াতুল-ওয়াদা নামক স্থানে পৌঁছানোর পর আল্লাহর রাসূল পুরো বাহিনীর বিভিন্ন ভাগের জন্য কমান্ডার নিযুক্ত করে তাদের হাতে পতাকা তুলে দেন। এই অভিযানে গাইড ছিলেন ইলকিমাহ ইবন আল-ফাঘওয়াহ। আব্বাস ইবন বিশর ছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে।

তাবুকের যুদ্ধে মুসলিমদের জিহাদের দিকে গণ-আহবান করা হয়েছিল। 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'তে বিশ্বাস করে এমন প্রত্যেক মুসলিম এই আহবানে সাড়া দেয়। তবে অল্প কিছু লোক বাদে। সবার জন্য অপেক্ষা করাও যৌক্তিক ছিল না। যখনই রাসূলুল্লাহকে বলা হতো, 'অমুক যুদ্ধে আসেনি', তখন রাসূলুল্লাহ বলতেন, 'তার কথা বাদ দাও। তার মধ্যে যদি ভালো কিছু থেকে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাকে তোমাদের পথ অনুসরণ করাবেন। আর যদি ভালো কিছু না থাকে, তাহলে আল্লাহ তার হাত থেকে তোমাদের রেহাই দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহকে যখন বলা হলো, 'আবু যার আমাদের সাথে আসেননি,' তখনও তিনি একই কথা বললেন।

আবু যার হচ্ছেন আবু যার আল-গিফারী। তাঁর কথা এর আগেও আলোচনা হয়েছে। তিনি বেশ প্রথমদিকের একজন মুসলিম। ইসলাম গ্রহণ করে তিনি গিফার গোত্রে ফিরে যান এবং তাঁর দাওয়াহর বদৌলতে গিফার গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। হিজরতের পর তিনি আর তাঁর গোত্র মদীনায় চলে আসেন।

অগ্রগামী মুসলিম হিসেবে আবু যার তাবুকে অংশ নেবেন, এটাই ছিল কাম্য। কিন্তু তাকে দেখা গেল না। আসলে আবু যার মূল বাহিনীর পেছনেই ছিলেন, কিন্তু তাঁর উটটি ছিল ধীরগতির। তাই তিনি পিছিয়ে পড়েন। অনেকটা পিছিয়ে যাওয়ায় তিনি তাঁর জিনিসপত্র নিয়ে উট থেকে নেমে গিয়ে তপ্ত মরুভূমির বুকে হেঁটেই রওনা দেন। মুসলিমরা দেখতে পেল, দূর দিগন্তে একজন মানুষ, একা হেঁটে আসছে! তারা রাসূলুল্লাহকে জানালেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'এটা যেন আবু যার হয়!' আসলেই তা-ই! সে মানুষটি কাছে এলে দেখা গেল তিনি আর কেউ নন, আবু যার। আবু যারের আগমনের কথা রাসূলুল্লাহকে জানালো হলো। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আল্লাহ আবু যারের উপর রহমত বর্ষণ করুন। সে একা এসেছে, একাই চলে যাবে, আর কিয়ামতের দিনে তাঁকে একাই উত্থিত করা হবে।'

আল্লাহর রাসূলের এই ভবিষ্যতবাণী আক্ষরিক অর্থেই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল বেশ কিছু বছর পর। তখন উসমান ইবন আফফানের খিলাফতকাল। মুসলিম সাম্রাজ্য অঢেল বিত্ত-বৈভব অর্জন করেছে। আবু যার ছিলেন খুব সাদাসিধে একজন মানুষ। বড় হয়েছিলেন কঠিন মরু এলাকায়। স্বভাবে তিনি ছিলেন কিছুটা রাগী এবং কঠোর প্রকৃতির। তিনি ছিলেন একজন যাহিদ-দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি, কঠোরভাবে যুহদ করতেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, মুসলিমদের প্রয়োজনের বেশি সম্পদ জমা করা হালাল নয়। তিনি মনে করতেন যা কিছু প্রয়োজনের চাইতে বেশি তা দরিদ্রদের দান করা ও অন্যান্য ভালো কাজ ব্যয় করতে হবে। যদিও শক্তিশালী অভিমত হলো, একজন ব্যক্তি তার সম্পদের উপর যাকাত দেওয়ার পর বাকি সম্পদ তার জন্য হালাল হবে এবং সে চাইলে এটা জমা করতে ও রেখে যেতে পারে -- এটাই অধিকাংশ আলেমের মত। সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার অনুমোদন যদি ইসলামে না-ই থাকতো, তাহলে মীরাস বা উত্তরাধিকারের বিধানগুলো থাকার কোনো অর্থই নেই।

যা-ই হোক, আবু যারের যুহদ ছিল এতটাই কঠোর যে জনগণ ও শাসন কর্তৃপক্ষের সাথে তার ঠিকমতো বনিবনা হচ্ছিলো না। উসমানের খিলাফতকালে আবু যার শামে ছিলেন। তখন মুআবিয়া ছিলেন শামের গভর্নর। রোমানদের সাথে তখন জিহাদ চলছিল, তাই শাম হয়ে উঠে গনিমতের আধার। আর শাম এমনিও বেশ বরকতময় একটি জায়গা। প্রবল বিত্ত-বৈভবের প্রবাহে আবু যার খুশি ছিলেন না। তিনি জনগণকে বকাঝকা করতেন। তারা সম্পদ জমা করতো, সে কারণে তাদের তিরস্কার করতেন। বিষয়টা জনমনে অসন্তোষের জন্ম দেয়। তাই গভর্নর মুআবিয়া খলিফা উসমানকে চিঠি দিয়ে আবু যারের ব্যাপারে অভিযোগ করে জানালেন তার জন্য শামের স্বাভাবিক জীবনে বিঘ্ন ঘটছে。

উসমান তখন আবু যারকে মদীনায় ফিরে আসতে বলেন। কেননা শাম আসলে আবু যারের জন্য উপযুক্ত জায়গা ছিল না। আবু যার শাম ত্যাগ করে মদীনায় ফিরে এলেন। উসমান ইবন আফফান বললেন তিনি চাইলে মদীনায় থাকতে পারেন। কিন্তু আবু যার বললেন, 'আপনাদের দুনিয়ার সাথে আমি কোনো সম্পর্কই রাখতে চাই না। আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। আমাকে আর-রাবদাতে যেতে দিন।'

আর-রাবদাহ মদীনার কাছেই মরুভূমিতে ছোট্ট একটি গ্রামের মতো। উসমান আবু যারকে ছেড়ে দিলেন, জোরাজুরি করলেন না। তিনি এতটাই দুনিয়াবিমুখ ছিলেন যে মুসলিমদের দুনিয়াবী সমৃদ্ধি হবে -- এই দৃশ্য তার একেবারেই ভালো লাগছিল না। উসমান তাকে বললেন, 'আমি আপনাকে কিছু উট দিতে চাই।' আবু যার বললেন, 'না আমি এসব চাই না। আমি নিজে নিজের মতো চলতে পারবো।' আবু যার আর-রাবদায় চলে গেলেন এবং সেখানেই বাস করতে লাগলেন।

আবু যার একা একা জীবন কাটাতে লাগলেন, আল্লাহর ইবাদাতে ডুবে থাকলেন। একসময় তার মৃত্যুর মুহূর্ত ঘনিয়ে এল। মৃত্যুশয্যায় তখন মরুভূমির মাঝখানে তাঁর সাথে ছিলেন শুধুমাত্র তাঁর স্ত্রী এবং সেবক। কোনো প্রতিবেশী বা বন্ধুবান্ধব ছিল না। যে মহান সাহাবি একসময়ে ছিলেন আল্লাহর রাসূলের সঙ্গী, আবু বাকর, উমার ও উসমানের সময়ে তিনি ছিলেন একজন আলিম, একজন মুফতি -- অথচ দুনিয়া ত্যাগ করার সময় তিনি আজ সম্পূর্ণ একা। কোনো ছাত্র বা বন্ধু কেউই নেই। তাঁর স্ত্রী কাঁদতে লাগলেন। আবু যার জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কাঁদছো কেন?' স্ত্রী উত্তর দিলেন, 'তুমি কীভাবে আশা করো আমি কাঁদবো না? তুমি মারা যাচ্ছো আর তোমাকে দাফন করার মতো কিছুই আমার নেই। তোমাকে একা দাফন করার মতো শক্তিও আমার নেই।'

আবু যার তার স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বললেন, 'কেঁদো না, আমি এক জমায়েতে রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে একজন এক শূন্য ভূমিতে মৃত্যুবরণ করবে এবং তাঁর দাফন প্রত্যক্ষ করবে মু'মিনদের একটি দল। সেই জমায়েতের আমি ছাড়া সবাই মারা গেছে। তারা সকলেই দলবদ্ধ ছিলেন। কাজেই আমিই সেই ব্যক্তি যে একা একা মৃত্যুবরণ করে হাদীসটিকে সত্য প্রমাণ করবো। তুমি বরং বাইরে যাও আর গিয়ে রাস্তার দিকে চোখ রাখো। যখন আমি মারা যাবো, আমাকে গোসল দিও, কাফনে ঢেকে দিও। আর আমাকে রাস্তার ওপাশে রেখে এসো। যে মুসাফির দলের সাক্ষাৎ তুমি পাবে, তাদেরকে বলবে, এ হচ্ছে আবু যার...'

আবু যর একদিন দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। তার স্ত্রী এবং সেবক তার কথামতো সবকিছু করলেন। তার স্ত্রী রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন একটি কাফেলা আসবে এবং তার স্বামীকে দাফন করবে। অবশেষে একটি কাফেলা এল। সেই কাফেলাটি আসছিল কুফা থেকে, সেখানে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ যখন জানলেন, এটা আবু যরের লাশ, তখনি তার মনে পড়ে গেল আল্লাহর রাসূলের সেই হাদীস। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'আল্লাহর রাসূল সত্যই বলেছিলেন: আবু যর একা এসেছে, একাই যাবে আর একাই পুনরুত্থিত হবে।' এরপর আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ আবু যরের জানাযায় ইমামতি করলেন। আবু যরের দাফন সম্পন্ন হলো।

আবু যর ক্ষমতা আর নেতৃত্বকে তীব্রভাবে অপছন্দ করতেন। একবার আবু মূসা আল-আশআরী তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। আবু যর তখন ঘরের কাজ করছিলেন। ভাই হিসেবে তাকে সাহায্য করতে গেলে আবু যর তাকে বলেন, 'আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।' আবু মূসা বললেন, 'আমি তো তোমার ভাই!' আবু যর উত্তর দিয়েছিলেন, 'না! নেতৃত্বের পদ গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত তুমি আমার ভাই ছিলে!' আমীর হিসেবে নিযুক্ত বা সরকারি কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তি থেকে আবু যর দূরত্ব বজায় রাখতেন।

আবু যরের মতো জীবনযাপন করা হয়তো এখন সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেদের অবস্থাকে আবু যরের জীবনের সাথে অন্তত তুলনা করে দেখা সম্ভব। এখন মুসলিমদের জীবনে প্রাচুর্য আছে, জীবনের নিরাপত্তা আছে, আছে সম্পদ আর স্বাচ্ছন্দ্য। আবু যরের সেসব কিছুই ছিল না। কাফনের জন্য একটুকরো ভালো কাপড়ও ছিল না। কিন্তু ছিল তাকওয়া, যা এখন দুর্লভ। তাই মুসলিমদের আজ সব থেকেও নেই।

৪) আবু খাইসামার কাহিনী
পিছিয়ে থাকা সাহাবিদের মধ্যে আরও একজন ছিলেন আবু খাইসামা আল-আনসারী। রাসূলুল্লাহ ও অন্য মুসলিমরা যখন অভিযানে, আবু খাইসামা তখন বসে আছেন 'আরিশে'। আরিশ গাছের ডাল দিয়ে বানানো একধরনের বিশেষ কুঁড়েঘর। গরমকালে সেই ঘরের উপরে পানি ঢালা হলে তা শীতল ও আরামদায়ক হয়ে যেত। বলা যেতে পারে আরিশ ছিল প্রাকৃতিক এয়ারকন্ডিশনার। তাঁর দুই ঘরে ছিল দুইজন স্ত্রী। আবু খাইসামা ঘরে ঢুকে দেখলেন তাঁর স্ত্রীরা তাঁর জন্য খাবার পানীয় প্রস্তুত করে রেখেছেন।

হঠাৎ তার মনে হলো আল্লাহর রাসূলের কথা। তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাসূল তপ্ত সূর্য আর গরম বাতাসে বসে আছেন আর আবু খাইসামা বসে আছে সুশীতল ছায়ায়, সুস্বাদু খাবার আর সুন্দরী স্ত্রীদের সাথে! এ হতে পারে না। আল্লাহর কসম, আমি এই দুই ঘরের একটিতেও প্রবেশ করবো না যতক্ষণ না আমি আল্লাহর রাসূলের অনুসরণ করি। কাজেই তোমার আমার জন্য আমার রসদ প্রস্তুত করো।'

তার স্ত্রীরা তার জন্য সবকিছু প্রস্তুত করে দিলেন। আবু খাইসামা উটের পিঠে চড়ে তাবুকের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। যাত্রাপথে উমায়ের ইবন ওয়াহাবকে সঙ্গী হিসাবে পেয়ে যান। উমায়ের সম্ভবত মক্কা থেকে আসছিলেন বা অন্য কোনো কারণে তার দেরি হয়। তাবুক গিয়েই তারা রাসূলুল্লাহর কাফেলার দেখা পান। আবু খাইসামা উমায়েরকে অনুরোধ করলেন যেন তিনি একা গিয়ে প্রথমে আল্লাহর রাসূলের সাথে কথা বলতে পারেন। উমায়ের তার অনুরোধ রাখলেন।

দূর থেকে সাহাবিরা দেখলেন, কেউ একজন আসছে! আল্লাহর রাসূল বললেন, 'এটা যেন আবু খাইসামাই হয়!' আবু খাইসামা কাছে এলে আল্লাহর রাসূল তাঁকে বললেন, 'তুমি তো নিজেকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিলে, আবু খাইসামা!' আবু খাইসামা এরপর রাসূলুল্লাহকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন এবং রাসূলুল্লাহ তার জন্য দুআ করলেন। একজন আদর্শ নেতা হিসেবে তাঁকে সাবধান করলেন এবং তাঁর প্রতি দয়াও করলেন।

আবু খাইসামার কাহিনী থেকে শিক্ষা হলো, একজন মুসলিম হোঁচট খায়, কিন্তু হোঁচট খেয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। একজন মুসলিম ভুল করে, কিন্তু তার বিবেক তাকে শোধরাতে বাধ্য করে। একজন মুসলিম দ্বীনের মধ্যে পিছিয়ে পড়ে, কিন্তু সে অনুশোচনা করে আর সেই অনুশোচনা তাকে দ্বিগুণ উৎসাহে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায়।

"আল্লাহ তাআলাকে যারা ভয় করে, যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা কখনো তাদের স্পর্শ করে, তবে সাথে সাথে তারা আত্মসচেতন হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাদের চোখ খুলে যায়।" (সূরা আরাফ, ৭: ২০১)

ফন্ট সাইজ
15px
17px