📄 তাবুকের যুদ্ধের অর্থায়ন
কুরআনে একটি আয়াত বাদে বাকি সবখানেই আগে সম্পদ এবং তারপর জানের কথা বলা হয়েছে। এর কারণ জিহাদে প্রচুর অর্থ-সম্পদ দরকার হয়। অতীত কিংবা বর্তমান, জিহাদ সবসময়ই অর্থ-সম্পদ গ্রাস করে ফেলে। এজন্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনের মাধ্যমে এবং রাসূলুল্লাহ হাদীসের মাধ্যমে জিহাদের ময়দানে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'সব সাদাকার সাওয়াব দশগুণ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু আল্লাহর পথে সাওয়াব বৃদ্ধি পায় সাতশোগুণ, কারণ সূরা বাকারায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশো করে দানা থাকে।' ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলছেন, 'ফী সাবিলিল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তা কথাটি সাধারণত জিহাদের ক্ষেত্রেই বলা হয়।' এজন্য আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়ের মাহাত্ম্য অনেক বেশি।
তাবুক যুদ্ধের জন্য রাসূলুল্লাহ অর্থ যোগাড় শুরু করলেন। কাজটা ছিল অনেক কঠিন, কেননা ফসল তোলার আগ মুহূর্তের ঐ সময়টায় মুসলিমদের হাতে তেমন কিছু ছিল না। তারপরও সাহাবিরা যার যা সামর্থ্য আছে সে অনুযায়ী সম্পদ ঢেলে দিচ্ছিলেন। আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা তাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব ছিল তা দিয়ে দিলেন। সেটা যথেষ্ট হলো না, তাই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু লাগাম ও অন্যান্য সরঞ্জামসহ যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত একশোটি উট এনে দিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ আরও অর্থায়ন চাইলেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু আরও একশোটি উট এনে দিলেন। রাসূলুল্লাহ আরও চাইলেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এবারও একশো উট দান করলেন! এরপর রাসুলুল্লাহ আবারও জিহাদের জন্য অর্থায়ন করার আহবান করলেন। এবারও এগিয়ে এলেন উসমান। কিছু স্বর্ণমুদ্রা এনে রাসূলুল্লাহর কোলে ফেলে দিলেন। নবীজির আঙুলগুলো তখন স্বর্ণমুদ্রার মাঝে ডুবে ছিল। তিনি বললেন, 'উসমান ভবিষ্যতে যা-ই করুক না কেন, তাঁর কোনো ক্ষতি হবে না!' তাবুকের সেই দিনে উসমান এত বেশি দান করেছিলেন যে পরবর্তী জীবনে তিনি যা-ই কিছু করুন না কেন, আল্লাহ তাআলার ক্ষমা তার জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়! এতেই বোঝা যায় আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার মাহাত্ম্য কত বেশি। আর উমার ইবন খাত্তাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘটনা তাঁর মুখেই শোনা যাক। তিনি বলেন,
'তাবুক অভিযানের একদিন আগের কথা। আল্লাহর রাসূল আমাদের আদেশ করলেন আমরা যেন জিহাদে সাদাকা করি। ভাগ্যক্রমে সে সময়ে আমার কাছে ভালোই টাকা-পয়সা ছিল। আমি ভাবলাম, আবু বকরকে যদি কোনোদিন হারাতে পারি, তবে সেটা আজই! এরপর আমার যত অর্থ-সম্পদ তার অর্ধেক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আল্লাহর রাসূল আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছো? আমি বললাম, যা এনেছি, তার সমপরিমাণ তাদের জন্য রেখে এসেছি। এরপর দেখলাম আবু বকর তার সমস্ত সম্পদ নিয়ে হাজির হয়েছে! আল্লাহর রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী রেখে এসেছো তোমার পরিবারের জন্য? আবু বকর উত্তর দিলেন, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি। আবু বকরকে আমি বললাম, নাহ, তোমার সাথে আমি কখনোই পেরে উঠবো না!'
ভালো কাজে সাহাবিরা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতেন। তাবুকের অর্থায়নে ভূমিকা রেখেছেন আবদুর রাহমান ইবন আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি এই জিহাদে দুই হাজার দিরহাম দান করেন। এটা ছিল তার সম্পদের অর্ধেক। এছাড়াও নিজেদের সম্পদ নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন আব্বাস ইবন আবু মুত্তালিব, তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ এবং আসীম ইবন আদী।
কিছু মানুষের কিছুই ছিল না, তবু তাদের যা আছে তা দিতে চেষ্টা করেছেন। এমন একজন ছিলেন আবু উকাইল, তিনি হাজির হয়েছিলেন কেবল চারমুঠো খেজুর নিয়ে। মুনাফিক্বরা তাকে নিয়ে বললো, 'আরে! এই ক'টা খেজুর দিয়ে হবেটা কী! এই লোকের দান আল্লাহর কোনো দরকার নেই!' আর অন্যদিকে আবদুর রাহমান ইবন আউফকে নিয়ে তারা বললো, 'আরে সে তো লোক দেখানোর জন্য এত দান করে বেড়াচ্ছে!' অন্যদিকে কিছু মানুষ ছিল যারা জিহাদে না যাওয়ার অজুহাত খুঁজছিল। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“পেছনে থাকা লোকগুলো আল্লাহর রাসূলের বিপক্ষে বসে থাকতে পেরে খুশি হলো, আর তারা অপছন্দ করলো তাদের মাল ও জান নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে এবং তারা বললো, তোমরা গরমের মধ্যে বের হয়ো না। বলুন, জাহান্নামের আগুন অধিকতর গরম, যদি তারা বুঝতো! অতএব, তারা সামান্য হেসে নিক এবং তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য অনেক বেশি কাঁদবে।” (সূরা তাওবা, ৯: ৮১, ৮২)
📄 দ্বীন নিয়ে হাসি ঠাট্টা: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি কুফরি করার স্বাধীনতা
জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় আল্লাহর রাসূল মদীনার দায়িত্বভার কারো কাছে অর্পণ করে যেতেন। তাবুকের যুদ্ধে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ মদীনার আমীর হিসেবে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহকে নিয়োগ করে যান। আর আলী ইবন আবু তালিবকে তাঁর নিজ পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যান। মুনাফিকরা সবসময়ই সবকিছুর মাঝে দোষ খুঁজে বেড়াত। এবার তারা বলাবলি করতে লাগলো, 'মুহাম্মাদ আলীকে রেখে গেছে কারণ জিহাদের ময়দানে সে একটা বোঝা।' অথচ আলী ছিলেন একজন বীরযোদ্ধা। স্বাভাবিকভাবেই এই কথাগুলো তাঁর খুব গায়ে লাগলো। আলী তাঁর অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য নবীজির কাছে চলে গেলেন। আল্লাহর রাসূল ইতিমধ্যে তাঁর বাহিনী নিয়ে আল-জুরফ ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন।
আলী নবীজিকে মুনাফিকদের মিথ্যাচারের কথা খুলে বললেন। রাসূলুল্লাহ আলীর মানসিক অবস্থা বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন,
'তারা তো মিথ্যে বলছে, আলী! আমিই তো তোমাকে আমার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে রেখে এসেছি। কাজেই তুমি ফিরে যাও, আমার এবং তোমার পরিবারের দেখাশোনা করো। তুমি কি এটা ভেবে খুশি হও না যে, মূসার কাছে হারুন যেমন, আমার কাছে তুমি তেমন? পার্থক্য তো শুধু এতটুকুই যে আমার পরে আর কোনো নবী আসবেন না।'
যখন মূসা আল্লাহ আযযা ওয়া জালের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলেন তখন বনী ইসরায়েলের তত্ত্বাবধান করার জন্য হারুনকে রেখে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহও ঠিক সেভাবেই আলীকে দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এই কথা ছিল সাহাবি হিসেবে আলীর জন্য এক বিশাল সম্মাননা। আল্লাহর রাসূল তাঁর ও আলীর সম্পর্ককে মূসা ও হারুনের সম্পর্কের সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু এই ঘটনাকে শিয়ারা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে টেনে নেয়। তারা বলতে চায়, এই হাদীস দিয়ে প্রমাণিত হয় আল্লাহর রাসূল তাঁর মৃত্যুর পর আলীকে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। স্পষ্টতই এমন কিছুর ইঙ্গিত এই হাদীসে নেই। আলীকে নবীজি একটি বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তা হলো তাঁর পরিবারকে দেখাশোনা করা। মদীনার অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা। শিয়াদের যুক্তি অনুসারে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাই নবীজির পরে খলিফা হওয়ার কথা! কিন্তু সে কথা কখনোই ওঠে না। শিয়ারা এই হাদীসের মনগড়া ব্যাখ্যা দেয় তাদের ভুল বিশ্বাসকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য। আহলুস সুন্নাহ এই ঘটনা থেকে সাহাবি হিসেবে আলী ইবন আবু তালিবের বিশেষ মর্যাদার ব্যাপারে শিক্ষা নেয়।
পুরো সীরাত জুড়েই জিহাদের ব্যাপারে মনোবল ভেঙে দেওয়া কথাবার্তা বলার অভ্যাস মুনাফিকদের মধ্যে দেখা যায়। তাবুকের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি। কিছু মুনাফিক্ব বলাবলি করতে লাগলো, 'তোমাদের কি মনে হয় রোমানদের সাথে যুদ্ধ করা আর আরবদের সাথে যুদ্ধ করা একই কথা? ওদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে তোমরা দড়িতে বাঁধা অবস্থায় ফিরে আসবে।'
জিহাদে রওনা হওয়া সেনাবাহিনী সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করা কখনোই ভালো অভ্যাস নয়। এ ধরনের কথা সৈনিকদের হৃদয়ে শত্রুদের ব্যাপারে আতঙ্ক জন্ম দেয়। তাদের এই গোপন কথাবার্তাগুলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল নবীজিকে জানিয়ে দেন। নবীজি তখন সেই লোকগুলোর ব্যাপারে আম্মার ইবন ইয়াসিরকে, বললেন, 'থামাও ওদের। ওরা যে কথা বলেছে, সেটা নিয়ে তাদের জিজ্ঞেস করো। তারা তো নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছে। যদি তারা অস্বীকার করে, তাহলে বলবে, তোমরা এই-এই কথা বলেছো।' আমর তাদের কাছে গিয়ে বললেন, 'তোমরা অমুক-তমুক কথা বলেছো, যাও আল্লাহর রাসূলের কাছে মাফ চেয়ে আসো।' তারা রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বললো, 'আমরা তো ঠাট্টা মশকরা করছিলাম মাত্র।' আল্লাহ তখন কুরআনের একটি আয়াত নাযিল করলেন,
"আর যদি আপনি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করেন, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা করো না, তোমরা তো কাফির হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। তোমাদের মধ্যে কোনো কোনো লোককে যদি আমি ক্ষমা করে দিইও, তবে অবশ্য কিছু লোককে আযাবও দেবো। কারণ, তারা ছিল গোনাহগার।" (সূরা তাওবা, ৯: ৬৫-৬৬)
এই আয়াতের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয় যে, দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা কুফর পর্যন্ত গড়াতে পারে। কেননা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলেছেন, "ছলনা কোরো না, ঈমান আনার পর তোমরা কাফির হয়ে গেছো।” এই মুনাফিক্বরা বলাবলি করছিল যে, মুসলিমরা রোমানদের সাথে লজ্জাজনকভাবে হেরে যাবে। তারা মুসলিমদের সামর্থ্য নিয়ে তামাশা করছিল। কুরআনের আয়াত বা হাদীস, আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ কিংবা সাহাবি অথবা ইসলামের কোনো নিদর্শন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা খুবই বিপজ্জনক এবং তা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটা নিফাকের চিহ্ন।
কাজেই কথার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া জরুরি। কিছু কৌতুক আছে যেগুলো কুরআনের আয়াত বা সূরা নিয়ে মজা করে, এগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ কৌতুক মনে হলেও এগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। কেননা এগুলো অনেকসময় ধর্মদ্রোহিতার দিকে ধাবিত করতে পারে। দ্বীন ইসলাম একটি পবিত্র বিষয়। এই দ্বীনকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন রাখা এবং এর প্রাপ্য সম্মান দেওয়া মুসলিমদের দায়িত্ব। নিজেরা যেমন নিজেদের দ্বীনকে হেয় করা যাবে না, তেমনি অন্য কাউকেও সেই সুযোগ দেওয়া যাবে না।
এই আয়াতের শিক্ষা বর্তমান সময়েও প্রযোজ্য। মুসলিমদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় এমন কিছু বলা বা প্রচার করা উচিত নয়। হতে পারে মুসলিমরা আসলেই দুর্বল, তাদের মাঝে অনৈক্য আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এমনভাবে কোনো কথা বলা বা রটানো উচিত নয় যা মুসলিমদের মনোবল ভেঙে দেয়। মুসলিমদের অন্তরে এই ধারণা প্রবেশ করানো উচিত নয় যে, তোমাদের শত্রুরা অজেয়, ওদের সাথে তোমরা কখনো পেরে উঠবে না, তোমাদের কোনো শক্তি নেই, তোমরা দুর্বল, তোমাদের কোনো আশা নেই, কোনো ভবিষ্যত নেই, ইত্যাদি। দায়িত্ব হচ্ছে আশার বাণী সঞ্চার করা, উম্মাহকে উৎসাহ দেওয়া। উম্মাহকে মনে করিয়ে দিতে হবে তারা হলো মানবজাতির মাঝে শ্রেষ্ঠ জাতি। উম্মাহকে তাদের গৌরবময় অতীত এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। কুফফারের সামর্থ্য, শক্তি ও ক্ষমতা নিয়ে এবং মুসলিমদের মধ্যকার অনৈক্য নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করা উচিত নয় যা মুসলিমদের মনোবলকে নষ্ট করে দেয়, তাদের হতোদ্যম করে দেয় এবং তাদের দুরবস্থাকে তাদের নিয়তি হিসেবে স্বীকার করিয়ে অলস বসিয়ে রাখে। কৌশলগত কারণে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে, তবে তা কখনোই যেন মুসলিমদের উদ্যমকে নষ্ট না করে।
📄 যুদ্ধের ময়দানে
তাবুকের যুদ্ধ ছিল রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। কিন্তু কোনো রোমান ব্যাটালিয়ন বা স্থানীয় আরব খ্রিস্টান কোনো বাহিনীর চিহ্নই দেখা গেল না। কোনো যুদ্ধই হলো না। কারণ রাসূলুল্লাহর আগমনের খবর রোমানদের অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। তাই তাদের আধুনিক সমরাস্ত্র আর বিরাট সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও তারা যুদ্ধের জন্য বের হয়নি। সম্মুখ সমরে মুখোমুখি হতে তারা ভয় পেল। রাসূলুল্লাহ সেখানে অবস্থান করে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন কিন্তু কেউই এল না। সে সময়ে রাসূলুল্লাহ শাম ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কয়েকটি শহর দখল করে তাদের সাথে চুক্তি করেন ও জিযিয়া গ্রহণ করেন।
রাসূলুল্লাহ দাউমাতুল জান্দালের রাজা উকাইদকে বন্দী করে আনার জন্য খালিদ ইবন ওয়ালিদকে পাঠান। রাসূলুল্লাহ খালিদকে বলেই দিয়েছিলেন, 'তুমি দেখবে উকাইদ গাভী শিকারে ব্যস্ত।' হলোও তাই। সেদিন ছিল এক পূর্ণিমার রাত। উকাইদ দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসেছিল গাভী শিকারের জন্য। খালিদ ইবন ওয়ালিদ তাকে আক্রমণ করে বন্দী করলেন। উকাইদ জিযিয়া দিতে রাজি হলো। জারবা, আযরা, মাকুনা -- এই অঞ্চলের খ্রিস্টানরা জিযিয়া দিতে রাজি হয় এবং ইসলামী শাসনের অধীনে চলে আসে। এই ছোট ছোট রাজ্যগুলো ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করে নেওয়ায় ইসলামী সাম্রাজ্যের উত্তর সীমা সুরক্ষিত হয় এবং এই অঞ্চলটি রোমান ও মুসলিমদের মাঝে 'বাফার জোন' হিসেবে কাজ করে। এই রাজ্যগুলো যদিও ইতিপূর্বে রোমানদের অধীনস্থ ছিল, কিন্তু রোমানদের প্রতি তারা খুশি ছিল না। যে কারণে তারা বেশ সহজেই ইসলামের অধীনে চলে আসে। পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশিদার সময়ে এই অঞ্চলগুলো থেকে রোমান সাম্রাজ্যের ওপর সামরিক হামলাগুলো পরিচালনা করা হয়।
তাবুকের যুদ্ধ ছিল আল্লাহর রাসূলের জীবনের সর্বশেষ বড় অভিযান। এই যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের জন্য একটি পরীক্ষা।
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করেছেন নবীর ওপর, অনুগ্রহ করেছেন মুহাজির ও আনসারদের ওপর, যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে ছিল। (এমনকি) যখন তাদের একটি দলের অন্তর বাঁকা পথে ঝুঁকে পড়ার উপক্রম হয়ে পড়েছিল, অতঃপর আল্লাহ এদের সবার ওপর দয়া করলেন। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়।” (সূরা তাওবা, ৯: ১১৭)
এই আয়াত আল্লাহর রাসূলের জীবনের সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়। কেননা ক্ষমা হলো এমন একটি ব্যাপার, যা সমাপ্তির দিকেই আসে। ইবাদাতের শেষ দিকেই আমরা সাধারণত ইস্তিগফার করি। তাই রাসূলুল্লাহ ও অন্যান্য মুসলিমদেরকে জানানো হচ্ছে যে, আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, আরও ক্ষমা করে দিয়েছেন সেই সব আনসার ও মুহাজিরদের যারা কঠিন সময়ে তাঁর সাথে ছিলেন।
📄 ধ্বংসপ্রাপ্ত কাফির জাতিগুলোর প্রতি মুগ্ধতা নয়, করুণা
তাবুকের অভিযানে যাওয়ার পথে মুসলিমরা সামূদ জাতির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়। সামূদ জাতি ছিল স্থাপত্যবিদ্যায় পারদর্শী এক জাতি। পাথর কেটে তারা বাসা বানাতো। নবী সালিহকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেন। তাদের রেখে যাওয়া সভ্যতার ধ্বংসাবশেষগুলো দেখে মুগ্ধ হয়ে মুসলিমরা সে দিকে ছুটে যায়। সেখানের কূপগুলো থেকে পানি পান করতে থাকে। বিষয়টা জানতে পেরে আল্লাহর রাসূল মোটেই পছন্দ করলেন না, বললেন,
'তোমরা এ সকল আযাবপ্রাপ্ত জাতির বাসস্থান থেকে পানি পান করো না এবং এখানকার রুটি নিজেরা খেয়ো না, বরং তা উটদের খাওয়াও কারণ এগুলো অভিশপ্ত। তোমরা এ সকল স্থানে যদি প্রবেশ করতেই চাও তবে কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করো। যদি না কাঁদতে পার, তাহলে তাদের স্থানে প্রবেশ করো না। যেন তাদের মতো তোমাদের উপরেও শাস্তি না পৌঁছে যায়।
রাসূলুল্লাহ সেই এলাকার পানি ফেলে দিতে আদেশ দিলেন। ঐ পানি দিয়ে প্রস্তুত করা রুটির মণ্ড উটদের খাইয়ে দিতে বললেন। রাসূলুল্লাহ চাননি যে সামূদ বা তাদের ভূমি বা তাদের পানির সাথে সাহাবিদের কোনো সম্পৃক্ততা হোক।
প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন রাসূলুল্লাহ কাঁদার কথা বলছেন। এর কারণ, এককালের প্রবল পরাক্রমশালী জাতিগুলোর নির্মম পরিণতি দেখে একজন মানুষের অন্তরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ভয় জেগে ওঠা উচিত। আল্লাহর গযবের ভয় এবং নিজের অসহায়ত্বের উপলব্ধি তাকে কাঁদতে উদ্বুদ্ধ করবে। তাদের সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখে যদি কেউ বিমোহিত হয়, তাহলে সেসব স্থানে যাওয়াই উচিত নয়। কাফির সভ্যতাগুলোর এত প্রাচুর্য আর শক্তিসামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের কী পরিণতি হয়েছে -- শুধু সেই শিক্ষা আর উপলব্ধি নেওয়ার জন্যই এসব স্থানে যাওয়া যেতে পারে, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকবার জন্য নয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির সভ্যতার ব্যাপারে আমাদের সে রীতিই অবলম্বন করা উচিত যা রাসূল শিখিয়ে দিয়েছেন, সেটি হলো তাদেরকে মুগ্ধতা নয়, করুণার চোখে দেখা।
আদিকালের মুশরিকদের ও আল্লাহর গযবপ্রাপ্ত লোকদের এসব তথাকথিত সভ্যতার ব্যাপারে আমাদের গর্বিত হবার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাবিলন, ফিরআউন কিংবা অন্যান্য কাফির সভ্যতাগুলো ছিল আল্লাহর শত্রু। মুসলিমরা এসব নিয়ে গর্ব করতে পারে না। ইসলাম-পূর্ব জাহিলিয়াতের ইতিহাস ও সভ্যতা নিয়ে মুসলিমদের গর্ব করাটা খুবই দুঃখজনক একটি ব্যাপার। ইসলাম তাদের পরিচয়কে বদলে দিয়েছে এবং সম্মানিত করেছে। কাফিররা এটা অনেকক্ষেত্রে খোলাখুলিভাবেই উল্লেখ করেছে যে, তারা চায় মুসলিমদের মধ্যে ইসলাম-পূর্ব ইতিহাস পুনর্জীবিত হোক। এর ফলে ইসলামী ইতিহাসের সাথে তাদের দূরত্ব বৃদ্ধি পাবে আর সেটাই হচ্ছে। এখন মুসলিমরা মমি বা ফিরআউনের পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলছে, পিকনিক করছে এবং পুরো বিষয়টা উপভোগ করছে। কিন্তু বিষয়টা মোটেও হালকাভাবে দেখার মতো নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই ধ্বংসাবশেষগুলোকে রেখে দিয়েছেন, যেন মুসলিমরা সতর্ক হতে পারে। এই বাস্তবিক উপস্থাপনা এজন্যই যেন পবিত্র কুরআনে যা বর্ণনা করা হয়েছে তার সচিত্র রূপ চাক্ষুষ সচেতন চোখ খুঁজে পায়।
টিকাঃ
১১৪. সহীহ বুখারি, অধ্যায় নবীদের কাহিনী, হাদীস ২৩। সহীহ মুসলিম, অধ্যায় যুহদ এবং অন্তর কোমলকারী বিষয়, হাদীস ৪৭।