📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সাহাবিদের উপলব্ধি

📄 সাহাবিদের উপলব্ধি


"তোমরা হালকা ও ভারী উভয় অবস্থায় যুদ্ধে বের হও এবং তোমাদের মাল ও জান নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।” (সূরা আত-তাওবাহ ৯: ৪১)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিররা বলেন, কমবয়সী বা বেশি বয়সী, ব্যস্ত কিংবা বেকার, ধনী বা দরিদ্র সবাইকে জিহাদে যেতে হবে। এই আয়াত যখন নাযিল হয়, তখন সাহাবিরা এটাকে একটা অনেক বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ এতে করে কারো জন্য কোনো অজুহাত বাকি থাকেনি, সবাইকেই যেতে হবে। এরপরই আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন,

“দুর্বল, রুগ্ন, ব্যয়ভার বহনে অসমর্থ লোকদের জন্য কোনো অপরাধ নেই, যদি এই সব লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি নিষ্ঠা রাখে (এবং আন্তরিকতার সাথে আনুগত্য স্বীকার করে) তাহলে এ সব সৎ লোকের প্রতি কোনো প্রকার অভিযোগ নেই। আর আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৯১)

আল্লাহ তাআলা দুর্বল, অসুস্থ কিংবা ব্যয়ভার বহনে অক্ষম লোকদের জন্য যুদ্ধে না যাওয়ার সুযোগ রাখলেন। তারা ছাড়া বাকি সবাইকেই যেতে হবে। এ আয়াত শুনেও ইসলামের বীর যোদ্ধা আবু কাতাদাহ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে তাঁর ঘোড়ার ওপর বসেছিলেন, অথচ তিনি তখন এতটাই বৃদ্ধ ছিলেন যে, তাঁর ভুরু দিয়ে চোখ ঢাকা পড়ে গিয়েছিল, শরীরও ভারী হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে বলা হলো, আপনার জন্য তো যুদ্ধে না যাওয়ার অজুহাত আছে, তবু আপনি কেন এই বয়সে যুদ্ধে যাচ্ছেন? তিনি জবাব দিলেন, 'সূরা তাওবাহ তো আমাদের জন্য কোনো অজুহাত রাখলো না!' এমনটাই ছিল জিহাদের প্রতি সাহাবিদের উপলব্ধি।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুনাফিকদের নির্লিপ্ততা বনাম মু'মিনদের উদ্দীপনা

📄 মুনাফিকদের নির্লিপ্ততা বনাম মু'মিনদের উদ্দীপনা


মদীনাজুড়ে যখন জিহাদে যাওয়ার জন্য মু'মিনদের মাঝে উদ্দীপনা, তখন কিছু লোকের উপর ভর করেছিল নিষ্ক্রিয়তা। এই লোকগুলো জিহাদে যেতে চায় না, ঘরে বসে থাকতে চায়। তারা নিষ্ক্রিয় হলেও জিহাদের প্রতি মুসলিমদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভাটা দিতে তারা ছিল সক্রিয়। নানাভাবে তারা মুসলিমদের জিহাদে যেতে অনুৎসাহিত করছিল।

"আর যখন কোনো সূরা এ মর্মে নাযিল করা হয় যে, তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো এবং তাঁর রাসূলের সাথে জিহাদ করো, তখন তাদের সামর্থ্যবান লোকেরা তোমার কাছে অনুমতি চায় এবং বলে, আমাদেরকে ছেড়ে দাও, আমরা বসে-থাকা-লোকদের সাথে থাকবো।" (সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ৮৬)

এই লোকগুলোর সামর্থ্য ছিল না এমন নয়, তবু তারা জিহাদে না যাওয়ার অজুহাত খুঁজছিল। ধনসম্পদের ফিতনা অনেক কঠিন ফিতনা। ধনসম্পদ থাকা খারাপ কিছু না। কিন্তু সম্পদের প্রতি ভালোবাসা যদি আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি দায়িত্ব পালনের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে এই সম্পদই কাল হয়ে দাঁড়ায়。

"তারা পেছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথে থেকে যেতে পেরে আনন্দিত হয়েছে এবং মোহর এঁটে দেওয়া হয়েছে তাদের অন্তরসমূহের উপর। বস্তুতঃ তারা বোঝে না।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ৮৭)

এই আয়াতে যে লোকদের কথা বলা হচ্ছে তারা রাসূলুল্লাহকে দেখেছে, তাঁর সামনে বসে খুতবা শুনেছে। কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে তাদের সময়ে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের চাইতে এই লোকগুলোর জ্ঞানও বেশি। কিন্তু তবু তাদের সম্পর্কে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলছেন-- তারা বোঝে না। কারণ তারা বোঝে না দুনিয়া ও আখিরাতের বাস্তবতা, তারা বোঝে না আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের গুরুত্ব, তারা বোঝে না আত্মত্যাগের মর্যাদা। বর্তমান যুগেও এরকম অনেক মানুষ আছে যারা যথার্থভাবে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে জগতটাকে দেখে না, যারা দ্বীনের পথে ত্যাগস্বীকারের প্রয়োজনীয়তা বোঝে না।

আসলে আয়াত মুখস্থ করা আর বুঝতে পারা এক নয়, বরং বুঝতে পারা বা অনুধাবন করতে পারাটা অন্তরের বিষয়। কুরআন-হাদীস অনেকেই পড়তে পারে, একজন অমুসলিমও পারে। পাশ্চাত্যে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজে অনেক অমুসলিম শিক্ষার্থী আছে, তারা ভালো ফলাফলও করে। কিন্তু এগুলো ইসলাম বোঝার মাপকাঠি হতে পারে না। কতগুলো কিতাব পড়া হয়েছে সেটা প্রকৃত জ্ঞান নয়, প্রকৃত জ্ঞান হলো কতটুকু অনুধাবন করা হয়েছে ও সে অনুসারে আমল করা হচ্ছে। কেউ যদি কুরআনের অসংখ্য আয়াত আর হাদীস মুখস্থ করে, কিন্তু সেগুলো মেনে না চলে তাহলে কিয়ামতের দিন এই জ্ঞান তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। তাই ইলমের সাথে আমল সমভাবে জরুরি। কেউ যদি অনেক আয়াত ও হাদীস জানে কিন্তু সে অনুযায়ী আমল না করে, তবে তার জ্ঞানের বাহার বা মিষ্টি কথায় বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না।

এরপর আল্লাহ বলছেন তাদের কথা, যারা সঠিক পথে আছে। এরা আল্লাহর রাসূলের ডাকে জিহাদে অংশ নিয়েছে।

"...রাসূল এবং সেসব লোক যারা ঈমান এনেছে, তারা সবাই নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে। (কাজেই) এদেরই জন্য নির্ধারিত রয়েছে কল্যাণসমূহ এবং তারাই মুক্তির লক্ষ্যে উপনীত হয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য তৈরি করেছেন জান্নাতসমূহ, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ, তাতে তারা চিরদিন থাকবে, এটিই মহাসফলতা।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ৮৮-৮৯)

তাবুকের যুদ্ধে এমন কিছু লোক ছিল যাদের জিহাদে অংশ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছে ছিল, কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। এদের কথা আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন কেবল তাদের আন্তরিকতার কারণে। কিছু লোক এসে জিহাদে যাওয়ার জন্য আল্লাহর রাসূলের কাছে আর্থিক সাহায্য চান। তাদের কোনো সহায়-সম্পত্তি ছিল না, ঘোড়া বা উট না থাকায় তাদের যাতায়াতের খরচ নবীজিকে বহন করার অনুরোধ করেন। এই সাহাবিরা ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র, কিন্তু জিহাদে অংশ নেওয়ার ইচ্ছে ছিল অদম্য। কিন্তু তাদের অর্থায়ন করার মতো যথেষ্ট অর্থ রাসূলুল্লাহর ছিল না। জিহাদে যোগদান করতে না পারার কষ্ট নিয়ে সেই সাহাবিরা অশ্রুসিক্ত হয়ে কষ্ট পেয়ে ফিরে গেলেন।

"আর তাদের উপরও কোনো দোষ নেই, যারা আপনার কাছে আসে, যাতে আপনি তাদের বাহন জোগাতে পারেন। আপনি বললেন, আমি তোমাদেরকে বহন করানোর জন্য কিছু পাচ্ছি না, তখন তারা ফিরে গেল। তাদের চোখ অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছিল এ দুঃখে যে, তারা ব্যয় করার মতো কিছু পাচ্ছে না।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ৯২)

অদ্ভুত এক দৃশ্য কুরআন আমাদের সামনে তুলে ধরে। কিছু লোকের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা জিহাদে না গিয়ে ঘরে বসে থাকলো। এমন নয় যে তারা জিহাদে যেতে ভয় করছিল, বরং জিহাদে মহিলা আর শিশুদের মতো ঘরে বসে থেকেই আনন্দ পাচ্ছিল! অন্যদিকে কিছু গরিব সাহাবি মনেপ্রাণে চাচ্ছিলেন জিহাদে যেতে, কিন্তু অপারগতার দুঃখে তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল।

ওয়াসিলা ইবন কাইস ছিলেন জিহাদে যাওয়ার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর! তার নিজের কোনো বাহন ছিল না। মুসলিম বাহিনী যখন অভিযানে যেতে প্রস্তুত, তিনি তখন রাস্তায় গিয়ে বললেন, 'কেউ কি আছে যে আমাকে তার বাহনে চড়তে দেবে? বিনিময়ে আমি তাকে আমার ভাগের গনিমাহ দিয়ে দেবো!' আনসারদের মধ্যে এক বৃদ্ধ মুজাহিদ রাজি হলো, বললো, 'আমি তোমার ভাগ নিব, তবে তোমাকে পালা করে বাহন চড়তে হবে। আমি তোমাকে খাবারও দিব।' ওয়াসিলা রাজি হলেন। এই ঘটনার পরে ওয়াসিলা একটি অভিযানে গনিমাহ হিসেবে কিছু উট পান। চুক্তিমতে, সেগুলো তিনি বৃদ্ধ আনসারকে দিয়ে আসতে গেলেন, কিন্তু বৃদ্ধ আনসার সেগুলো নিতে রাজি হলেন না, বললেন, 'ভাতিজা, ওগুলো তোমার। আমি ওগুলো চাই না।'

এটা হলো ভ্রাতৃত্ব। এমন ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন আর কোনো যুগে কোনো কালে পাওয়া যাবে না। ওয়াসিলা তার নিজের গনিমতের ভাগ ছেড়ে দিয়ে হলেও জিহাদে যেতে উন্মুখ হয়ে ছিলেন! আর সেই বৃদ্ধ নিজের আরাম-আয়েশ ছেড়ে দিয়ে ওয়াসিলাকে সাথে নিতে রাজি হয়েছেন সাওয়াবের আশায়, গনিমতের আশায় নয়। এমনই ছিল সাহাবিদের মানসিকতা, আখিরাতের পুরস্কারকেই তারা জীবনের সাফল্য হিসেবে দেখতেন।

আল্লাহ তাআলা মুনাফিক্বদের সম্পর্কে বলছেন, "যদি আশু লাভের সম্ভাবনা থাকতো এবং যাত্রাপথও সংক্ষিপ্ত হতো, তবে তারা অবশ্যই আপনার সহযাত্রী হতো, কিন্তু তাদের নিকট যাত্রাপথ সুদীর্ঘ মনে হলো। আর তারা এমনই শপথ করে বলবে, আমাদের সাধ্য থাকলে অবশ্যই তোমাদের সাথে বের হতাম, এরা নিজেরাই নিজেদের বিনষ্ট করছে, আর আল্লাহ জানেন যে, এরা মিথ্যাবাদী।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ৪২)

যদি যাত্রাপথ ছোট হতো এবং যুদ্ধে গনিমত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকতো, তাহলে মুনাফিক্বরা ঠিকই দুনিয়াবী লাভের আশায় জিহাদে যোগ দিত। কিন্তু তাবুকের পথ ছিল অনেক দুর্গম, তাই তারা নানা অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধে যোগ দিলো না। কিন্তু তাদের অজুহাতগুলো ছিল মিথ্যা অজুহাত।

“আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, আপনি কেন তাদের অব্যাহতি দিলেন, যে পর্যন্ত না আপনার কাছে পরিষ্কার হয়ে যেতো সত্যবাদীরা এবং জেনে নিতেন মিথ্যাবাদীদের।” (আত-তাওবাহ ৯:৪৩)

তাবুকের যুদ্ধে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এটা ছিল একটা পরীক্ষা এবং আল্লাহ তাআলা রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলছেন যে মুনাফিকদের কোনোরকম ছাড় দেওয়াটা তাঁর উচিত হয়নি।

"আল্লাহ ও রোজ কিয়ামতের প্রতি যাদের ঈমান রয়েছে তারা মাল ও জান দ্বারা জিহাদ করা থেকে আপনার কাছে অব্যাহতি কামনা করবে না, আর আল্লাহ সাবধানীদের ভাল জানেন। নিঃসন্দেহে তারাই আপনার কাছে অব্যাহতি চায়, যারা আল্লাহ ও রোজ কেয়ামতে ঈমান রাখে না এবং তাদের অন্তর সন্দেহগ্রস্থ হয়ে পড়েছে, সুতরাং সন্দেহের আবর্তে তারা ঘুরপাক খেয়ে চলেছে।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ৪৪, ৪৫)

অর্থাৎ, যারা সত্যিকারের মু'মিন তারা কোনো অজুহাত না খুঁজে স্বেচ্ছায় জিহাদে যোগ দিতে আসবে। অন্যদিকে ঈমানের দুর্বলতার কারণে যারা জিহাদের প্রকৃত ধারণাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে চায় তারা সবসময়ই দ্বিধাদ্বন্দ্ব, অস্বচ্ছতা এবং স্ব-বিরোধিতার মাঝে ঘুরপাক খায়। একদিকে তারা দাবি করে যে তারা দ্বীনের খেদমত করতে চায়, অন্যদিকে তারা তাদের দায়িত্বগুলো অস্বীকার করে তা থেকে দূরে থাকতে চায়, নানা অজুহাতে গা বাঁচানোর চেষ্টা করে। এদের সম্পর্কে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলছেন, আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের ওপর আসলে এদের ঈমান নেই। যার আল্লাহর প্রতি ঈমান আছে, সে আল্লাহকে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি ভয় করে তার দায়িত্বগুলো পালনে সচেষ্ট হবে। অন্যদিকে কিয়ামতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থাকার কারণে দুনিয়ার প্রতি তার বিশেষ আসক্তি থাকবে না।

"আর যদি তারা বের হবার সংকল্প নিতো, তবে অবশ্যই কিছু সরঞ্জাম প্রস্তুত করতো। কিন্তু তাদের উত্থান আল্লাহর পছন্দ নয়, তাই তাদের নিবৃত রাখলেন এবং আদেশ হলো বসা লোকদের সাথে তোমরা বসে থাকো।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৪৬)

কোনো কাজের সংকল্প থাকলে এর জন্য প্রস্তুতিও থাকা চাই। কেউ ডাক্তার হতে চাইলে তাকে সেভাবে প্রস্তুত হতে হবে। কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইলে তাকে ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পড়তে হবে, বছরের পর বছর এজন্য পরিশ্রম করতে হবে। দুনিয়ার যেকোনো কাজ বা পেশার জন্য যেমন প্রস্তুতি নিতে হয় ইসলামেও ঠিক তেমন। কেউ যদি বলে যে সে হিজরত করবে কিংবা যদি বলে সে জিহাদে যোগ দেবে, তবে তার সেইভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। প্রস্তুতি শব্দটা এখানে মুখ্য। যেকোনো ইবাদাতের জন্য যা যা দরকার, তার সবই এতে অন্তর্ভুক্ত।

এরপর আল্লাহ মন্তব্য করছেন, এই লোকগুলো জিহাদে না যাওয়ায় বরং ভালোই হয়েছে! এর কারণ হলো,

"যদি তোমাদের সাথে তারা বের হতো, তবে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছু বৃদ্ধি করতো না, আর ঘোড়া ছোটাতো তোমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। আর তোমাদের মাঝে (উন্মুখ হয়ে) তাদের কথা শুনবার লোক রয়েছে। বস্তুতঃ আল্লাহ জালিমদের ভালোভাবেই জানেন।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ৪৭)

অর্থাৎ তারা যুদ্ধে গেলে কোনো উপকার তো হতোই না, বরং অন্যদের মনে সন্দেহ আর অনৈক্যের বীজ বপন করার মাধ্যমে আরও ক্ষতি করতো। তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে মু'মিনদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতো। এরপর আল্লাহ বলছেন-- তোমাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা তাদের কথা উন্মুখ হয়ে শোনে! এখানে বলা হচ্ছে সাহাবিদের কথা, কিছু সাহাবি মুনাফিকদের প্রোপাগান্ডায় কান দিতেন। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের সতর্ক করে দিচ্ছেন, কারণ কে মুনাফিক আর কে নয়- এটা বোঝা সহজ নয়। হতে পারে তারা অনেক মিষ্টভাষী, জ্ঞানী, বাকপটু কিংবা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। যে কেউ তাদের কথায় আকৃষ্ট হয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে।

আল্লাহর রাসূলের যুগেই এই সমস্যা ছিল। সে তুলনায় এখনকার পরিস্থিতি আরও জটিল। এ কারণে জিহাদের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিভ্রান্তি ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব অনেক বেশি। সে কারণে সূরা তাওবাহ পাঠ করা আমাদের সময়ে গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ হলো, প্রথমত, আমরা নিজেরা যেন মুনাফিক না হয়ে পড়ি আর দ্বিতীয়ত, মুনাফিক্বদের প্রোপাগান্ডায় যেন বিভ্রান্তিতে না পড়ি। নিফাক এমনই একটি স্পর্শকাতর বিষয়, যা যে কাউকে স্পর্শ করতে পারে। একজন আলিম বা একজন মুজাহিদের মাঝেও নিফাক্বী থাকতে পারে। উমারের মতো সাহাবি নিজের ঈমানে নিফাকের আশঙ্কা করতেন। হুযায়ফার কাছে রাসূল মুনাফিকদের পরিচয় প্রকাশ করতেন এবং তিনি সেই তথ্যগুলো গোপন রাখতেন। উমার হুযায়ফার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে রাসূল মুনাফিক্ব হিসেবে উমারের নাম উল্লেখ করেছেন কিনা। হুযায়ফা তাঁকে জবাব দিয়েছিলেন, 'না। আপনি ছাড়া আর কাউকে আমি এই প্রশ্নের উত্তরও দিতাম না।'

আল্লাহ তাআলা চান মুনাফিকরা জিহাদের ময়দান থেকে দূরে থাকুক। কারণ তারা আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের জন্য যুদ্ধে যেত না, তারা যেত নিজেদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য, মু'মিনদের মাঝে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ফিতনা তৈরি করার জন্য।

"তারা এর আগেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল এবং তোমার পরিকল্পনা নস্যাৎ করার চক্রান্ত করতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ন্যায় ও ইনসাফ তাদের কাছে হাজির হলো এবং আল্লাহর ফায়সালাই চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হলো, যদিও তারা হচ্ছে (এ বিজয়ের) অপছন্দকারী। আর তাদের কেউ বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং পথভ্রষ্ট করবেন না। শুনে রাখো, তারা তো আগে থেকেই পথভ্রষ্ট এবং নিঃসন্দেহে জাহান্নাম এই কাফিরদের পরিবেষ্টন করে রয়েছে।" (সূরা আত-তাওবাহ ৯: ৪৮, ৪৯)

আবদুল্লাহ ইবন উবাই ছিল মুনাফিকদের নেতা। তাকে বলা হতো সায়্যিদুল খাযরাজ - খাযরাজদের নেতা। জুমুআর দিনে সে উঠে দাঁড়াতো, সবার উদ্দেশ্যে বলতো, 'ইনি হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল। তোমরা তাঁর কথা শোনো, তাঁকে মানো।' অথচ এই লোকটাই ছিল মুনাফিকদের নেতা, কিন্তু বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। উমার একবার রাসূলুল্লাহর কাছে ইবন উবাইকে হত্যা করার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ অনুমতি দেননি। কারণ হিসেবে একটি বর্ণনায় এসেছে যে, ইবন উবাইকে হত্যা করা হলে তার অনুসারীরা তার পক্ষে লড়াই করার জন্য দাঁড়িয়ে যেত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই লোকটির আসল চেহারা আল্লাহ তাআলা এমনভাবে উন্মোচন করে দিলেন যে, তার অনুসারীরাই তাকে পরিত্যাগ করতে লাগলো।

মুনাফিকদের এক নেতা, নাম তার যাদ ইবন কাইস। তাবুকের সময়ে রাসূলুল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি রোমানদের সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত?' যাদ ইবন কাইস জবাব দিলো, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমার ভয় হয় জিহাদে গেলে রোমান নারীদের ফিতনায় পড়ে যাবো।'

এটা ছিল মুনাফিকদের জিহাদে না যাওয়ার অজুহাতের নমুনা! তারা হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকার দোহাই দিয়ে জিহাদ পরিত্যাগ করতো। এই যুগেও যারা জিহাদকে পরিত্যাগ করে, তারা শরীয়াহর কোনো যুক্তি দেখিয়েই তা পরিত্যাগ করে। ফিতনার দোহাই দিয়ে অনেকে জিহাদে যেতে চাইছিলো না, কিন্তু আল্লাহ বলছেন, জিহাদে না যাওয়াটাই তাদের জন্য আসল ফিতনাহ। জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহতে অংশ নিলেই বরং ফিতনা থেকে মুক্ত হওয়া যায়। তাই যারা বলে যে, আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত না, আত্মিকভাবে প্রস্তুত না-- দেখা যায় কখনোই তাদের প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে ওঠে না। তারা সর্বদা দুনিয়ার ফিতনায় পড়ে থাকে। কিন্তু সাহস করে যুদ্ধে যোগ দিলেই তারা সঠিক পথ পেত। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলছেন, 'যারা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে, আল্লাহ তাদের পথের দিকনির্দেশনা দিবেন।'

"আপনার কোনো কল্যাণ হলে তাদের খারাপ লাগে এবং কোনো বিপদ উপস্থিত হলে তারা বলে, আমরা আগে থেকেই নিজেদের কাজ সামলে নিয়েছি এবং ফিরে যায় উল্লসিত মনে।” (সূরা আত-তাওবাহ ৯: ৫০)

এটা মুনাফিক্বদের আরেকটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। মুসলিমদের ভালো কিছু দেখলে তাদের গা জ্বলে, মুসলিমদের বিপদে তারা আনন্দিত হয়। মুসলিমদের বিপদে তারা বলে, 'বলেছিলাম না তোমাদেরকে? কেন তোমরা বের হয়েছিলে?' তারা মনে করে 'ঝামেলা' থেকে দূরে থেকে তারা খুব বিচক্ষণের মতো কাজ করেছে, কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা উল্টো, তারা নিজেদের আরও ফিতনার মাঝে ফেলে দেয়।

"আপনি বলুন, তোমরা তো আমাদের জন্যে দুটি কল্যাণের একটি প্রত্যাশা করো; আর আমরা প্রত্যাশায় আছি তোমাদের জন্যে যে, আল্লাহ তোমাদের আযাব দান করুন নিজের পক্ষ থেকে অথবা আমাদের হাতে। সুতরাং তোমরা অপেক্ষা করো, আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষমান।” (আত-তাওবাহ ৯: ৫২)

দুটি কল্যাণ বলতে বোঝানো হচ্ছে হয় শাহাদাত কিংবা বিজয়লাভ। মুসলিমরা মুনাফিকদের যেন এরকম বলে দেয় যে যদি আমরা হেরে যাই, আমাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয় আর জিহাদের ময়দান থেকে দূরে থেকেছো বলে আপাতদৃষ্টিতে তোমাদের কোনো ক্ষতি হয়নি বলে ভেবো না তোমরা বিচক্ষণের মতো কাজ করেছো। আমাদের কপালে আছে দুটো জিনিস, হয়তো বিজয়লাভ কিংবা শাহাদাত কোনোটাতেই আমাদের ক্ষতি নেই। কিন্তু তোমাদের কপালে কী আছে? তোমাদের কপালেও আছে দুটো জিনিস হয়তো আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি কিংবা আমাদের হাতেই তোমাদের কঠিন শাস্তি। কাজেই তোমরা অপেক্ষা করো, আমরাও করছি।

তাবুক যুদ্ধে অংশ না নিয়ে পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের সম্পর্কে এসব আয়াত নাযিল হয়েছিল।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 তাবুকের যুদ্ধের অর্থায়ন

📄 তাবুকের যুদ্ধের অর্থায়ন


কুরআনে একটি আয়াত বাদে বাকি সবখানেই আগে সম্পদ এবং তারপর জানের কথা বলা হয়েছে। এর কারণ জিহাদে প্রচুর অর্থ-সম্পদ দরকার হয়। অতীত কিংবা বর্তমান, জিহাদ সবসময়ই অর্থ-সম্পদ গ্রাস করে ফেলে। এজন্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনের মাধ্যমে এবং রাসূলুল্লাহ হাদীসের মাধ্যমে জিহাদের ময়দানে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'সব সাদাকার সাওয়াব দশগুণ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু আল্লাহর পথে সাওয়াব বৃদ্ধি পায় সাতশোগুণ, কারণ সূরা বাকারায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশো করে দানা থাকে।' ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলছেন, 'ফী সাবিলিল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তা কথাটি সাধারণত জিহাদের ক্ষেত্রেই বলা হয়।' এজন্য আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়ের মাহাত্ম্য অনেক বেশি।

তাবুক যুদ্ধের জন্য রাসূলুল্লাহ অর্থ যোগাড় শুরু করলেন। কাজটা ছিল অনেক কঠিন, কেননা ফসল তোলার আগ মুহূর্তের ঐ সময়টায় মুসলিমদের হাতে তেমন কিছু ছিল না। তারপরও সাহাবিরা যার যা সামর্থ্য আছে সে অনুযায়ী সম্পদ ঢেলে দিচ্ছিলেন। আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা তাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব ছিল তা দিয়ে দিলেন। সেটা যথেষ্ট হলো না, তাই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু লাগাম ও অন্যান্য সরঞ্জামসহ যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত একশোটি উট এনে দিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ আরও অর্থায়ন চাইলেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু আরও একশোটি উট এনে দিলেন। রাসূলুল্লাহ আরও চাইলেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এবারও একশো উট দান করলেন! এরপর রাসুলুল্লাহ আবারও জিহাদের জন্য অর্থায়ন করার আহবান করলেন। এবারও এগিয়ে এলেন উসমান। কিছু স্বর্ণমুদ্রা এনে রাসূলুল্লাহর কোলে ফেলে দিলেন। নবীজির আঙুলগুলো তখন স্বর্ণমুদ্রার মাঝে ডুবে ছিল। তিনি বললেন, 'উসমান ভবিষ্যতে যা-ই করুক না কেন, তাঁর কোনো ক্ষতি হবে না!' তাবুকের সেই দিনে উসমান এত বেশি দান করেছিলেন যে পরবর্তী জীবনে তিনি যা-ই কিছু করুন না কেন, আল্লাহ তাআলার ক্ষমা তার জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়! এতেই বোঝা যায় আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার মাহাত্ম্য কত বেশি। আর উমার ইবন খাত্তাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘটনা তাঁর মুখেই শোনা যাক। তিনি বলেন,

'তাবুক অভিযানের একদিন আগের কথা। আল্লাহর রাসূল আমাদের আদেশ করলেন আমরা যেন জিহাদে সাদাকা করি। ভাগ্যক্রমে সে সময়ে আমার কাছে ভালোই টাকা-পয়সা ছিল। আমি ভাবলাম, আবু বকরকে যদি কোনোদিন হারাতে পারি, তবে সেটা আজই! এরপর আমার যত অর্থ-সম্পদ তার অর্ধেক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আল্লাহর রাসূল আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছো? আমি বললাম, যা এনেছি, তার সমপরিমাণ তাদের জন্য রেখে এসেছি। এরপর দেখলাম আবু বকর তার সমস্ত সম্পদ নিয়ে হাজির হয়েছে! আল্লাহর রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী রেখে এসেছো তোমার পরিবারের জন্য? আবু বকর উত্তর দিলেন, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি। আবু বকরকে আমি বললাম, নাহ, তোমার সাথে আমি কখনোই পেরে উঠবো না!'

ভালো কাজে সাহাবিরা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতেন। তাবুকের অর্থায়নে ভূমিকা রেখেছেন আবদুর রাহমান ইবন আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি এই জিহাদে দুই হাজার দিরহাম দান করেন। এটা ছিল তার সম্পদের অর্ধেক। এছাড়াও নিজেদের সম্পদ নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন আব্বাস ইবন আবু মুত্তালিব, তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ এবং আসীম ইবন আদী।

কিছু মানুষের কিছুই ছিল না, তবু তাদের যা আছে তা দিতে চেষ্টা করেছেন। এমন একজন ছিলেন আবু উকাইল, তিনি হাজির হয়েছিলেন কেবল চারমুঠো খেজুর নিয়ে। মুনাফিক্বরা তাকে নিয়ে বললো, 'আরে! এই ক'টা খেজুর দিয়ে হবেটা কী! এই লোকের দান আল্লাহর কোনো দরকার নেই!' আর অন্যদিকে আবদুর রাহমান ইবন আউফকে নিয়ে তারা বললো, 'আরে সে তো লোক দেখানোর জন্য এত দান করে বেড়াচ্ছে!' অন্যদিকে কিছু মানুষ ছিল যারা জিহাদে না যাওয়ার অজুহাত খুঁজছিল। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“পেছনে থাকা লোকগুলো আল্লাহর রাসূলের বিপক্ষে বসে থাকতে পেরে খুশি হলো, আর তারা অপছন্দ করলো তাদের মাল ও জান নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে এবং তারা বললো, তোমরা গরমের মধ্যে বের হয়ো না। বলুন, জাহান্নামের আগুন অধিকতর গরম, যদি তারা বুঝতো! অতএব, তারা সামান্য হেসে নিক এবং তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য অনেক বেশি কাঁদবে।” (সূরা তাওবা, ৯: ৮১, ৮২)

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 দ্বীন নিয়ে হাসি ঠাট্টা: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি কুফরি করার স্বাধীনতা

📄 দ্বীন নিয়ে হাসি ঠাট্টা: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি কুফরি করার স্বাধীনতা


জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় আল্লাহর রাসূল মদীনার দায়িত্বভার কারো কাছে অর্পণ করে যেতেন। তাবুকের যুদ্ধে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ মদীনার আমীর হিসেবে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহকে নিয়োগ করে যান। আর আলী ইবন আবু তালিবকে তাঁর নিজ পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যান। মুনাফিকরা সবসময়ই সবকিছুর মাঝে দোষ খুঁজে বেড়াত। এবার তারা বলাবলি করতে লাগলো, 'মুহাম্মাদ আলীকে রেখে গেছে কারণ জিহাদের ময়দানে সে একটা বোঝা।' অথচ আলী ছিলেন একজন বীরযোদ্ধা। স্বাভাবিকভাবেই এই কথাগুলো তাঁর খুব গায়ে লাগলো। আলী তাঁর অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য নবীজির কাছে চলে গেলেন। আল্লাহর রাসূল ইতিমধ্যে তাঁর বাহিনী নিয়ে আল-জুরফ ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন।

আলী নবীজিকে মুনাফিকদের মিথ্যাচারের কথা খুলে বললেন। রাসূলুল্লাহ আলীর মানসিক অবস্থা বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন,

'তারা তো মিথ্যে বলছে, আলী! আমিই তো তোমাকে আমার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে রেখে এসেছি। কাজেই তুমি ফিরে যাও, আমার এবং তোমার পরিবারের দেখাশোনা করো। তুমি কি এটা ভেবে খুশি হও না যে, মূসার কাছে হারুন যেমন, আমার কাছে তুমি তেমন? পার্থক্য তো শুধু এতটুকুই যে আমার পরে আর কোনো নবী আসবেন না।'

যখন মূসা আল্লাহ আযযা ওয়া জালের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলেন তখন বনী ইসরায়েলের তত্ত্বাবধান করার জন্য হারুনকে রেখে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহও ঠিক সেভাবেই আলীকে দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এই কথা ছিল সাহাবি হিসেবে আলীর জন্য এক বিশাল সম্মাননা। আল্লাহর রাসূল তাঁর ও আলীর সম্পর্ককে মূসা ও হারুনের সম্পর্কের সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু এই ঘটনাকে শিয়ারা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে টেনে নেয়। তারা বলতে চায়, এই হাদীস দিয়ে প্রমাণিত হয় আল্লাহর রাসূল তাঁর মৃত্যুর পর আলীকে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। স্পষ্টতই এমন কিছুর ইঙ্গিত এই হাদীসে নেই। আলীকে নবীজি একটি বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তা হলো তাঁর পরিবারকে দেখাশোনা করা। মদীনার অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা। শিয়াদের যুক্তি অনুসারে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাই নবীজির পরে খলিফা হওয়ার কথা! কিন্তু সে কথা কখনোই ওঠে না। শিয়ারা এই হাদীসের মনগড়া ব্যাখ্যা দেয় তাদের ভুল বিশ্বাসকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য। আহলুস সুন্নাহ এই ঘটনা থেকে সাহাবি হিসেবে আলী ইবন আবু তালিবের বিশেষ মর্যাদার ব্যাপারে শিক্ষা নেয়।

পুরো সীরাত জুড়েই জিহাদের ব্যাপারে মনোবল ভেঙে দেওয়া কথাবার্তা বলার অভ্যাস মুনাফিকদের মধ্যে দেখা যায়। তাবুকের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি। কিছু মুনাফিক্ব বলাবলি করতে লাগলো, 'তোমাদের কি মনে হয় রোমানদের সাথে যুদ্ধ করা আর আরবদের সাথে যুদ্ধ করা একই কথা? ওদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে তোমরা দড়িতে বাঁধা অবস্থায় ফিরে আসবে।'

জিহাদে রওনা হওয়া সেনাবাহিনী সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করা কখনোই ভালো অভ্যাস নয়। এ ধরনের কথা সৈনিকদের হৃদয়ে শত্রুদের ব্যাপারে আতঙ্ক জন্ম দেয়। তাদের এই গোপন কথাবার্তাগুলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল নবীজিকে জানিয়ে দেন। নবীজি তখন সেই লোকগুলোর ব্যাপারে আম্মার ইবন ইয়াসিরকে, বললেন, 'থামাও ওদের। ওরা যে কথা বলেছে, সেটা নিয়ে তাদের জিজ্ঞেস করো। তারা তো নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছে। যদি তারা অস্বীকার করে, তাহলে বলবে, তোমরা এই-এই কথা বলেছো।' আমর তাদের কাছে গিয়ে বললেন, 'তোমরা অমুক-তমুক কথা বলেছো, যাও আল্লাহর রাসূলের কাছে মাফ চেয়ে আসো।' তারা রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বললো, 'আমরা তো ঠাট্টা মশকরা করছিলাম মাত্র।' আল্লাহ তখন কুরআনের একটি আয়াত নাযিল করলেন,

"আর যদি আপনি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করেন, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা করো না, তোমরা তো কাফির হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। তোমাদের মধ্যে কোনো কোনো লোককে যদি আমি ক্ষমা করে দিইও, তবে অবশ্য কিছু লোককে আযাবও দেবো। কারণ, তারা ছিল গোনাহগার।" (সূরা তাওবা, ৯: ৬৫-৬৬)

এই আয়াতের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয় যে, দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা কুফর পর্যন্ত গড়াতে পারে। কেননা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলেছেন, "ছলনা কোরো না, ঈমান আনার পর তোমরা কাফির হয়ে গেছো।” এই মুনাফিক্বরা বলাবলি করছিল যে, মুসলিমরা রোমানদের সাথে লজ্জাজনকভাবে হেরে যাবে। তারা মুসলিমদের সামর্থ্য নিয়ে তামাশা করছিল। কুরআনের আয়াত বা হাদীস, আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ কিংবা সাহাবি অথবা ইসলামের কোনো নিদর্শন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা খুবই বিপজ্জনক এবং তা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটা নিফাকের চিহ্ন।

কাজেই কথার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া জরুরি। কিছু কৌতুক আছে যেগুলো কুরআনের আয়াত বা সূরা নিয়ে মজা করে, এগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ কৌতুক মনে হলেও এগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। কেননা এগুলো অনেকসময় ধর্মদ্রোহিতার দিকে ধাবিত করতে পারে। দ্বীন ইসলাম একটি পবিত্র বিষয়। এই দ্বীনকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন রাখা এবং এর প্রাপ্য সম্মান দেওয়া মুসলিমদের দায়িত্ব। নিজেরা যেমন নিজেদের দ্বীনকে হেয় করা যাবে না, তেমনি অন্য কাউকেও সেই সুযোগ দেওয়া যাবে না।

এই আয়াতের শিক্ষা বর্তমান সময়েও প্রযোজ্য। মুসলিমদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় এমন কিছু বলা বা প্রচার করা উচিত নয়। হতে পারে মুসলিমরা আসলেই দুর্বল, তাদের মাঝে অনৈক্য আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এমনভাবে কোনো কথা বলা বা রটানো উচিত নয় যা মুসলিমদের মনোবল ভেঙে দেয়। মুসলিমদের অন্তরে এই ধারণা প্রবেশ করানো উচিত নয় যে, তোমাদের শত্রুরা অজেয়, ওদের সাথে তোমরা কখনো পেরে উঠবে না, তোমাদের কোনো শক্তি নেই, তোমরা দুর্বল, তোমাদের কোনো আশা নেই, কোনো ভবিষ্যত নেই, ইত্যাদি। দায়িত্ব হচ্ছে আশার বাণী সঞ্চার করা, উম্মাহকে উৎসাহ দেওয়া। উম্মাহকে মনে করিয়ে দিতে হবে তারা হলো মানবজাতির মাঝে শ্রেষ্ঠ জাতি। উম্মাহকে তাদের গৌরবময় অতীত এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। কুফফারের সামর্থ্য, শক্তি ও ক্ষমতা নিয়ে এবং মুসলিমদের মধ্যকার অনৈক্য নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করা উচিত নয় যা মুসলিমদের মনোবলকে নষ্ট করে দেয়, তাদের হতোদ্যম করে দেয় এবং তাদের দুরবস্থাকে তাদের নিয়তি হিসেবে স্বীকার করিয়ে অলস বসিয়ে রাখে। কৌশলগত কারণে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে, তবে তা কখনোই যেন মুসলিমদের উদ্যমকে নষ্ট না করে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px