📄 কুরআনের চোখে তাবুকের যুদ্ধ
রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর আগে তাবুকের যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। তাবুকের জিহাদ ছিল ইসলামের স্বর্ণশিখর, রাসূলের জীবনের জিহাদের অধ্যায়টি এর দ্বারা সমাপ্ত হয়। জিহাদ সম্পর্কিত চূড়ান্ত বিধানগুলো তাবুকের সময় নাযিল হয়। এই জিহাদ মু'মিন ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। বদর যুদ্ধের পরপরই মদীনায় নিফাকের উৎপাত দেখা যায়। তাবুকের সময় যে আয়াতগুলো নাযিল হয় তা মুনাফিকদের পুরোপুরি উন্মোচিত করে দেয়। নিফাক সম্পর্কিত বেশিরভাগ আয়াত এসেছে সূরা আত-তাওবায়। এই সূরাটি নাযিল হয়েছিল ৯ম হিজরিতে। এর অধিকাংশ আয়াতই তাবুক যুদ্ধ সম্পর্কিত।
📄 জিহাদের প্রতি অনীহা অন্তরের একটি রোগ
তাবুকে যদিও কোনো লড়াই হয়নি, তবুও শরীয়াহ, ঈমান ও সিয়াসাহ -- সবক্ষেত্রেই তাবুক থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে। তাই তাবুক যুদ্ধের ব্যবচ্ছেদের আগে এই যুদ্ধসংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর উপর আলোকপাত করা জরুরি।
“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের নিকটবর্তী কাফিরদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক আর জেনে রাখো, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।” (আত-তাওবাহ ৯: ১২৩)
তাবুকের জিহাদ ছিল একটি পরীক্ষা। আল্লাহর পক্ষ থেকে তখন পর্যন্ত আসা সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। তাই এই যুদ্ধের বাহিনীকে বলা হয় যাইশ আল 'উসরাহ বা 'প্রতিকূলতার বাহিনী'। উসরাহ অর্থ কঠিন, প্রতিকূল। এই বাহিনীর জন্য অর্থ যোগানো ছিল কষ্টকর, সৈন্যদের একত্র করা ছিল কষ্টসাধ্য, আবহাওয়া ছিল রূঢ়, পানি ছিল দুষ্প্রাপ্য। যে পথ পাড়ি দিয়ে যুদ্ধে যেতে হতো, তা ছিল প্রতিকূল। প্রতিপক্ষ হিসেবে রোমানরাও ছিল সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল কুরআনে এই সময়কে বলেছেন সা'আতুল উসরাহ বা 'প্রতিকূল সময়'।
নবীজি এই যুদ্ধের জন্য মক্কা, মদীনা ও এর আশেপাশের গোত্রগুলো থেকে যে যেখানে আছে তাদের সবাইকে ডাক দিয়েছিলেন। এর আগে কখনো এমনটা হয়নি। নবীজি চেয়েছেন প্রত্যেক সবল মুসলিম এই যুদ্ধে অংশ নিক।
কুরআন আমাদের অন্তরের রোগগুলোর কথা বলে। কুরআন নাযিল হয়েছে সেই আল্লাহর পক্ষ থেকে যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের ভেতরের ও বাইরের সব খবর জানেন। কুরআন আমাদের এমন কিছু দুর্বলতার কথা বলে দিতে পারে, যেগুলো অনেক সময় আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না বা বুঝলেও স্বীকার করি না। এজন্যই কুরআন অনন্য। তাবুকের বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল কুরআনে জানিয়ে দিয়েছেন কেন যুদ্ধে যেতে কিছু মানুষের এত অনীহা আর অনাগ্রহ ছিল।
এখনকার সময়েও জিহাদে যোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে অনেকে অনেক কথাই বলে। কেউ বলে যে ফিকহ অনুসারে এটা ঠিক নয়, কেউ বলে যে এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে, কেউ বলে যে এটা করা হিকমাহর পরিচয় নয়, কেউ বলে এসবের কোনো মানেই হয় না! কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেছেন এমন কথা যা কেউ সহজে স্বীকার করতে চায় না।
“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কী হলো? যখন আল্লাহর পথে বের হওয়ার জন্যে তোমাদের বলা হয়, তখন মাটি আঁকড়ে ধরো, তোমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের ভোগবিলাস তো অতি অল্প।” (আত-তাওবাহ ৯: ৩৮)
এই আয়াত আমাদের অন্তরের রোগ ও রোগের চিকিৎসাও বলে দিয়েছে। এই রোগ হচ্ছে দুনিয়ার প্রতি মায়া, ভালোবাসা। আমরা আমাদের জীবনকে অনেক বেশি ভালোবাসি, তাই সবকিছু ছেড়েছুড়ে জিহাদে যেতে চাই না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন — দুনিয়ার জীবন আখিরাতের তুলনায় কিছুই না। সুতরাং রোগের চিকিৎসা হচ্ছে বাস্তবতা উপলব্ধি করে আখিরাতের জন্য বাঁচা।
📄 জিহাদ পরিত্যাগের পরিণতি
“তোমাদের উপর জিহাদ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়।” (আল-বাকারাহ ২: ২১৬)
জিহাদ আমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে, কিন্তু তবুও আমরা তা অপছন্দ করি। আমরা কেবল অপছন্দ করি তা-ই না, এটা নিয়ে কথা বলাও আমরা অপছন্দ করি! জিহাদ একটি ফরয ইবাদাত, কুরআনে এ বিষয়ে অসংখ্য আয়াত আছে, অগণিত হাদীস রয়েছে, তবুও মানুষের মধ্যে জিহাদের আলোচনাকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কাজ করে। এই রোগ এবং রোগের চিকিৎসা দুটোই আল্লাহ বলে দিয়েছেন। আরও বলে দিয়েছেন যদি আমরা এই দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাই তবে আমাদের পরিণাম কী হবে।
“যদি (জিহাদের জন্য) বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদের মর্মন্তুদ আযাব দেবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। তোমরা তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।” (আত-তাওবাহ ৯: ৩৯)
আল্লাহ বলছেন জিহাদ পরিত্যাগ করার পরিণাম হলো কঠিন শাস্তি, আযাব। আমাদের বর্তমান অবস্থাই এর সবচাইতে বড় প্রমাণ। আজকে আমরা বঞ্চিত, অপমানিত ও নির্যাতিত হচ্ছি! আমাদের অঢেল সম্পদ থাকার পরেও সবচেয়ে দরিদ্র। যমীনের উপরে ও নিচে আমাদের যা কিছু আছে তা সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও দামি হওয়ার পরও সেগুলো আজ অন্যদের হাতে। আমাদের একতাবদ্ধ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমরাই আজ সবচেয়ে বেশি বিভক্ত। আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী উম্মাহ হওয়ার কথা, কিন্তু আমরাই আজ সবচেয়ে দুর্বল। এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি, কারণ আমরা তাঁর দ্বীন থেকে দূরে সরে গিয়েছি।
"যদি তোমরা তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্য না করো, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, যখন তাঁকে কাফিররা বহিষ্কার করেছিল, গুহার মধ্যে তিনি ছিলেন দু'জনের একজন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষণ্ণ হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্ত্বনা নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখোনি। বস্তুতঃ আল্লাহ কাফিরদের মাথা নিচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (আত-তাওবাহ ৯: ৪০)
পরের আয়াতে আল্লাহ সেই সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যখন রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করছিলেন আর আল্লাহ তাঁর রাসূলকে রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সবসময় সাহায্য করেছেন, যখন কেউ সাহায্যের জন্য ছিল না, তখনও করেছেন। অর্থাৎ, আমরা যদি দ্বীনের স্বার্থে এগিয়ে না আসি তবে তাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কোনো ক্ষতি হবে না। আল্লাহর আদেশগুলো আমাদের নিজেদের স্বার্থেই মানতে হবে, কেননা এর মাঝে আমাদেরই কল্যাণ।
📄 সাহাবিদের উপলব্ধি
"তোমরা হালকা ও ভারী উভয় অবস্থায় যুদ্ধে বের হও এবং তোমাদের মাল ও জান নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।” (সূরা আত-তাওবাহ ৯: ৪১)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিররা বলেন, কমবয়সী বা বেশি বয়সী, ব্যস্ত কিংবা বেকার, ধনী বা দরিদ্র সবাইকে জিহাদে যেতে হবে। এই আয়াত যখন নাযিল হয়, তখন সাহাবিরা এটাকে একটা অনেক বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ এতে করে কারো জন্য কোনো অজুহাত বাকি থাকেনি, সবাইকেই যেতে হবে। এরপরই আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন,
“দুর্বল, রুগ্ন, ব্যয়ভার বহনে অসমর্থ লোকদের জন্য কোনো অপরাধ নেই, যদি এই সব লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি নিষ্ঠা রাখে (এবং আন্তরিকতার সাথে আনুগত্য স্বীকার করে) তাহলে এ সব সৎ লোকের প্রতি কোনো প্রকার অভিযোগ নেই। আর আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৯১)
আল্লাহ তাআলা দুর্বল, অসুস্থ কিংবা ব্যয়ভার বহনে অক্ষম লোকদের জন্য যুদ্ধে না যাওয়ার সুযোগ রাখলেন। তারা ছাড়া বাকি সবাইকেই যেতে হবে। এ আয়াত শুনেও ইসলামের বীর যোদ্ধা আবু কাতাদাহ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে তাঁর ঘোড়ার ওপর বসেছিলেন, অথচ তিনি তখন এতটাই বৃদ্ধ ছিলেন যে, তাঁর ভুরু দিয়ে চোখ ঢাকা পড়ে গিয়েছিল, শরীরও ভারী হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে বলা হলো, আপনার জন্য তো যুদ্ধে না যাওয়ার অজুহাত আছে, তবু আপনি কেন এই বয়সে যুদ্ধে যাচ্ছেন? তিনি জবাব দিলেন, 'সূরা তাওবাহ তো আমাদের জন্য কোনো অজুহাত রাখলো না!' এমনটাই ছিল জিহাদের প্রতি সাহাবিদের উপলব্ধি।