📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 পটভূমি

📄 পটভূমি


"হে ঈমানদারগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র। সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মাসজিদুল হারামের কাছে না আসে। আর যদি তোমরা দারিদ্র্যের আশংকা করো, তবে আল্লাহ চাইলে নিজ করুণায় ভবিষ্যতে তোমাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (আত-তাওবাহ, ৯: ২৮)

শত বছর ধরে হজ্জ ও উমরাকে ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্য হতো। এটিই ছিল কুরাইশদের জীবিকার মাধ্যম। সারাবছরই হজ্জ আর উমরা উপলক্ষে অসংখ্য মানুষ মক্কায় প্রবেশ করতো। এর ওপরেই কুরাইশদের অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। কুরাইশদের কাছে তাই হজ্জ বা উমরা কেবল ধর্মীয় আচার ছিল না, বরং তারা ভালো করেই জানতো তাদের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে হজ্জ বা উমরাকে ঘিরে। কিন্তু ৯ম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করলেন যে, এই বছরের পর কোনো মুশরিক মাসজিদ আল হারাম অর্থাৎ মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না। সেসময় হিজাযের বাইরে আরবের তেমন কোনো গোত্রই ইসলাম গ্রহণ করেনি। এরকম অবস্থায় তাদের মক্কায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেওয়া মানে কুরাইশদের ব্যবসায় বিশাল ধ্বস। স্বাভাবিকভাবেই কুরাইশরা এই সিদ্ধান্ত সহজভাবে নিতে পারছিল না।

এই প্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়। মুশরিকদের মাসজিদ আল হারামে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল তাদের অপবিত্রতার কারণে। আর্থিক ক্ষতির ব্যাপারে কুরাইশদের মনে চাপা যে আশঙ্কার জন্ম নিয়েছিল সে ব্যাপারে তাদের আশ্বস্ত করতে আল্লাহ বলছেন,

'আর যদি তোমরা দারিদ্র্যের আশংকা করো, তবে আল্লাহ চাইলে নিজ করুণায় ভবিষ্যতে তোমাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'

এটাই তাওয়াক্কল। আয়ের কোনো উপায় যদি হারাম হয়, তাহলে মানুষের তা থেকে বিরত থাকা উচিত। আর যদি হালাল হয়, তবেই কেবল তা গ্রহণ করা উচিত। কোনটায় লাভ বেশি আর কোনটায় কম সেটা দেখার আগে দেখতে হবে উপায়টি আদৌ হালাল কি না, কেননা লাভ-ক্ষতির ব্যাপারটা আল্লাহর হাতে। এভাবেই ইসলাম আমাদের চিন্তাধারা বদলে দিতে এসেছিল। সাধারণত মানুষ প্রথমেই লাভ-ক্ষতিকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ইসলাম কুরাইশদেরকে অন্যভাবে চিন্তা করতে শেখালো। কুরাইশদের জন্য বিষয়টা মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। কারণ ব্যবসা ছাড়া আর কোনো কিছুতে তারা অভ্যস্ত ছিল না, না ছিল তাদের অন্যকিছুতে দক্ষতা বা জ্ঞান। আর মক্কাও এমন কোনো উর্বর ভূমি ছিল না যে, সেখানে কৃষিকাজ করে খাওয়া যাবে। পাথুরে ভূমি আর খুবই অল্প বৃষ্টিপাতের এই অঞ্চলের লোকগুলোকে যখন বলা হলো যে তাদের জীবিকার একমাত্র মাধ্যম বন্ধ হয়ে যাবে, তখন তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। আল্লাহ তখন তাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, আল্লাহই তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন।

আল্লাহর আদেশ পালন করলে আল্লাহ আমাদের বঞ্চিত করবেন না। এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই আছে যারা সুদ বা অন্যান্য হারাম পন্থায় জীবিকা অর্জন করে এবং ঐ হারাম পথ থেকে সরে আসতে চায় না। কারণ সেটা ছাড়া তাদের আর কোনো উপার্জনের উৎস নেই। হয়তো কেউ একজন হারাম পন্থায় অর্থ উপার্জন করছে। তাকে গিয়ে যদি বলা হয় এটা হারাম, আপনি এই কাজ ছেড়ে দিন। সে জবাব দেবে, 'তাহলে আমি কী খেয়ে বাঁচবো?' বাড়ি গাড়ি করতে ব্যাঙ্ক থেকে সুদে লোন নেওয়া কিংবা বেশি লাভের আশায় ফিক্সড ডিপোজিট রেখে উচ্চহারে সুদ নেওয়া এখন সমাজে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে সতর্ক করতে গেলে সবাই সমস্বরে বলে উঠে, "লোন না নিলে কীভাবে বাড়ি করবো? ফিক্সড ডিপোজিট না রাখলে খরচ চালাব কী দিয়ে?" তাদের জেনে রাখা উচিত আল্লাহ বলেন,

"যার তাকওয়া আছে তার জন্য আল্লাহ উপায় সৃষ্টি করে দেবেন এবং এমন সব উৎস থেকে তাদের (রিযক) দিবেন যা তারা কখনো কল্পনা করেনি।” (সূরা তালাক, ৬৫: ২-৩)

এটা আল্লাহর ওয়াদা। কারো যদি তাকওয়া থাকে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা থাকে, তাহলে রিযক নিয়ে তার ভাবতে হবে না, রিযক আল্লাহই যোগাবেন। সূরা তাওবার পরের আয়াতে আল্লাহ বলছেন,

"আহলে কিতাবের মধ্যে যারা যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকো, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে।” (সূরা আত-তাওবাহ ৯: ২৯)

ইবন কাসীর (রহ) এই দুই আয়াতের সংক্ষিপ্ত তাফসীরের মাধ্যমে ৯ম হিজরি ও এতে তাবুক যুদ্ধের পটভূমি সম্পর্কে বর্ণনা শুরু করেন।

"হে মু'মিনগণ! ঐ কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করো যারা তোমাদের আশেপাশে অবস্থান করছে, যেন তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা খুঁজে পায়; আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।” (আত-তাওবাহ ৯: ১২৩)

আশেপাশের কাফির বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে রোমানদের। কারণ পুরো হিজায তখন ইসলাম গ্রহণ করেছে। এর সংলগ্ন অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল। ইবন কাসিরের মতে, তাবুকের জিহাদের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের সম্প্রসারণ। ইসলামকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার শরীয়তসম্মত পদ্ধতি হলো জিহাদ। তাবুকের যুদ্ধ এই কারণেই সংঘটিত হয়েছিল। কারণ আরবের পরেই ছিল রোমান সাম্রাজ্য আর রোমান সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের প্রসারের পথে বড় বাধা।

এছাড়া তখন মুহাম্মাদ ইসলামের তখনকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সৈন্যবাহিনী গঠন করা শুরু করেছেন। সাধারণত রাসূলুল্লাহ কোনো জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করলে সেটি গোপন রাখতেন যেন শত্রুবাহিনীকে অতর্কিতে আক্রমণ করে চমকে দেওয়া যায়। কিন্তু তাবুক যুদ্ধের ক্ষেত্রে নবীজি বিষয়টি গোপন না রেখে প্রথম দিন থেকেই পুরো বিষয়টি প্রকাশ করে দেন। এর কিছু কারণ ছিল:

প্রথমত, মুসলিমরা নতুন এক ধরনের সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করতে যাচ্ছে। এবারের প্রতিপক্ষ কোনো আরব গোত্র বা চেনাজানা কেউ নয়। প্রবল পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্য সম্বন্ধে আরবের মুসলিমদের তেমন ধারণাই ছিল না। তারা এমন এক সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হতে যাচ্ছিল, যারা তাদের ক্ষমতা ও সামরিক শক্তিমত্তার জন্য কয়েক শতাব্দী জুড়ে বিখ্যাত ছিল।

দ্বিতীয়ত, রোমানদের বিরুদ্ধে জিহাদের অর্থ হলো অনেক বড় একটা দূরত্ব অতিক্রম করে ময়দানে যেতে হবে। এজন্য তিনি চেয়েছিলেন সবাই যেন এটা মাথায় রেখে আগে থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে।

তৃতীয়ত, সময়টা ছিল ভ্রমণের জন্য খুবই প্রতিকূল গ্রীষ্মের মাঝামাঝি, প্রচণ্ড গরম আর শুষ্ক। অন্যদিকে এটা হলো খেজুর পাকার সময়। আরববাসীর জন্য এটা খুব লোভনীয় সময়, কেননা মদীনার অর্থনীতি কৃষিপ্রধান আর তাদের ফসল হচ্ছে মূলত খেজুর। এই সময়ের জন্য তারা সারা বছর অপেক্ষা করে। কিন্তু এই লোভনীয় সময়ে এল জিহাদের ডাক!

চতুর্থত, এই যুদ্ধের লক্ষ্যস্থল সম্পর্কে গোপনীয়তা বজায় রাখার তেমন প্রয়োজন ছিল না। কারণ, এর আগে মুসলিম সেনাবাহিনী মদীনা ছেড়ে চলে গেলে আশেপাশের শত্রুদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু আশেপাশের বেশিরভাগ গোত্রই মুসলিমদের রাজনৈতিক শক্তির সামনে বশ্যতা স্বীকার করায় তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে সেই ভয় আর ছিল না।

পঞ্চমত, এই যুদ্ধ ছিল সে পর্যন্ত সবচাইতে বড় অভিযান। এর জন্য অর্থায়ন প্রয়োজন ছিল প্রচুর। তাই এই জিহাদ অর্থায়ন করার জন্য প্রকাশ্যে আহবান করা হয়। এটি আরেকটি কারণ।

এসব কারণে রাসূল আগে থেকে স্পষ্ট জানিয়ে রাখলেন যে রোমানদের বিরুদ্ধে জিহাদে যাওয়া হবে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 কুরআনের চোখে তাবুকের যুদ্ধ

📄 কুরআনের চোখে তাবুকের যুদ্ধ


রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর আগে তাবুকের যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। তাবুকের জিহাদ ছিল ইসলামের স্বর্ণশিখর, রাসূলের জীবনের জিহাদের অধ্যায়টি এর দ্বারা সমাপ্ত হয়। জিহাদ সম্পর্কিত চূড়ান্ত বিধানগুলো তাবুকের সময় নাযিল হয়। এই জিহাদ মু'মিন ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। বদর যুদ্ধের পরপরই মদীনায় নিফাকের উৎপাত দেখা যায়। তাবুকের সময় যে আয়াতগুলো নাযিল হয় তা মুনাফিকদের পুরোপুরি উন্মোচিত করে দেয়। নিফাক সম্পর্কিত বেশিরভাগ আয়াত এসেছে সূরা আত-তাওবায়। এই সূরাটি নাযিল হয়েছিল ৯ম হিজরিতে। এর অধিকাংশ আয়াতই তাবুক যুদ্ধ সম্পর্কিত।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 জিহাদের প্রতি অনীহা অন্তরের একটি রোগ

📄 জিহাদের প্রতি অনীহা অন্তরের একটি রোগ


তাবুকে যদিও কোনো লড়াই হয়নি, তবুও শরীয়াহ, ঈমান ও সিয়াসাহ -- সবক্ষেত্রেই তাবুক থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে। তাই তাবুক যুদ্ধের ব্যবচ্ছেদের আগে এই যুদ্ধসংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর উপর আলোকপাত করা জরুরি।

“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের নিকটবর্তী কাফিরদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক আর জেনে রাখো, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।” (আত-তাওবাহ ৯: ১২৩)

তাবুকের জিহাদ ছিল একটি পরীক্ষা। আল্লাহর পক্ষ থেকে তখন পর্যন্ত আসা সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। তাই এই যুদ্ধের বাহিনীকে বলা হয় যাইশ আল 'উসরাহ বা 'প্রতিকূলতার বাহিনী'। উসরাহ অর্থ কঠিন, প্রতিকূল। এই বাহিনীর জন্য অর্থ যোগানো ছিল কষ্টকর, সৈন্যদের একত্র করা ছিল কষ্টসাধ্য, আবহাওয়া ছিল রূঢ়, পানি ছিল দুষ্প্রাপ্য। যে পথ পাড়ি দিয়ে যুদ্ধে যেতে হতো, তা ছিল প্রতিকূল। প্রতিপক্ষ হিসেবে রোমানরাও ছিল সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল কুরআনে এই সময়কে বলেছেন সা'আতুল উসরাহ বা 'প্রতিকূল সময়'।

নবীজি এই যুদ্ধের জন্য মক্কা, মদীনা ও এর আশেপাশের গোত্রগুলো থেকে যে যেখানে আছে তাদের সবাইকে ডাক দিয়েছিলেন। এর আগে কখনো এমনটা হয়নি। নবীজি চেয়েছেন প্রত্যেক সবল মুসলিম এই যুদ্ধে অংশ নিক।

কুরআন আমাদের অন্তরের রোগগুলোর কথা বলে। কুরআন নাযিল হয়েছে সেই আল্লাহর পক্ষ থেকে যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের ভেতরের ও বাইরের সব খবর জানেন। কুরআন আমাদের এমন কিছু দুর্বলতার কথা বলে দিতে পারে, যেগুলো অনেক সময় আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না বা বুঝলেও স্বীকার করি না। এজন্যই কুরআন অনন্য। তাবুকের বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল কুরআনে জানিয়ে দিয়েছেন কেন যুদ্ধে যেতে কিছু মানুষের এত অনীহা আর অনাগ্রহ ছিল।

এখনকার সময়েও জিহাদে যোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে অনেকে অনেক কথাই বলে। কেউ বলে যে ফিকহ অনুসারে এটা ঠিক নয়, কেউ বলে যে এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে, কেউ বলে যে এটা করা হিকমাহর পরিচয় নয়, কেউ বলে এসবের কোনো মানেই হয় না! কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেছেন এমন কথা যা কেউ সহজে স্বীকার করতে চায় না।

“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কী হলো? যখন আল্লাহর পথে বের হওয়ার জন্যে তোমাদের বলা হয়, তখন মাটি আঁকড়ে ধরো, তোমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের ভোগবিলাস তো অতি অল্প।” (আত-তাওবাহ ৯: ৩৮)

এই আয়াত আমাদের অন্তরের রোগ ও রোগের চিকিৎসাও বলে দিয়েছে। এই রোগ হচ্ছে দুনিয়ার প্রতি মায়া, ভালোবাসা। আমরা আমাদের জীবনকে অনেক বেশি ভালোবাসি, তাই সবকিছু ছেড়েছুড়ে জিহাদে যেতে চাই না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন — দুনিয়ার জীবন আখিরাতের তুলনায় কিছুই না। সুতরাং রোগের চিকিৎসা হচ্ছে বাস্তবতা উপলব্ধি করে আখিরাতের জন্য বাঁচা।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 জিহাদ পরিত্যাগের পরিণতি

📄 জিহাদ পরিত্যাগের পরিণতি


“তোমাদের উপর জিহাদ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়।” (আল-বাকারাহ ২: ২১৬)

জিহাদ আমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে, কিন্তু তবুও আমরা তা অপছন্দ করি। আমরা কেবল অপছন্দ করি তা-ই না, এটা নিয়ে কথা বলাও আমরা অপছন্দ করি! জিহাদ একটি ফরয ইবাদাত, কুরআনে এ বিষয়ে অসংখ্য আয়াত আছে, অগণিত হাদীস রয়েছে, তবুও মানুষের মধ্যে জিহাদের আলোচনাকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কাজ করে। এই রোগ এবং রোগের চিকিৎসা দুটোই আল্লাহ বলে দিয়েছেন। আরও বলে দিয়েছেন যদি আমরা এই দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাই তবে আমাদের পরিণাম কী হবে।

“যদি (জিহাদের জন্য) বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদের মর্মন্তুদ আযাব দেবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। তোমরা তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।” (আত-তাওবাহ ৯: ৩৯)

আল্লাহ বলছেন জিহাদ পরিত্যাগ করার পরিণাম হলো কঠিন শাস্তি, আযাব। আমাদের বর্তমান অবস্থাই এর সবচাইতে বড় প্রমাণ। আজকে আমরা বঞ্চিত, অপমানিত ও নির্যাতিত হচ্ছি! আমাদের অঢেল সম্পদ থাকার পরেও সবচেয়ে দরিদ্র। যমীনের উপরে ও নিচে আমাদের যা কিছু আছে তা সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও দামি হওয়ার পরও সেগুলো আজ অন্যদের হাতে। আমাদের একতাবদ্ধ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমরাই আজ সবচেয়ে বেশি বিভক্ত। আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী উম্মাহ হওয়ার কথা, কিন্তু আমরাই আজ সবচেয়ে দুর্বল। এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি, কারণ আমরা তাঁর দ্বীন থেকে দূরে সরে গিয়েছি।

"যদি তোমরা তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্য না করো, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, যখন তাঁকে কাফিররা বহিষ্কার করেছিল, গুহার মধ্যে তিনি ছিলেন দু'জনের একজন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষণ্ণ হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্ত্বনা নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখোনি। বস্তুতঃ আল্লাহ কাফিরদের মাথা নিচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (আত-তাওবাহ ৯: ৪০)

পরের আয়াতে আল্লাহ সেই সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যখন রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করছিলেন আর আল্লাহ তাঁর রাসূলকে রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সবসময় সাহায্য করেছেন, যখন কেউ সাহায্যের জন্য ছিল না, তখনও করেছেন। অর্থাৎ, আমরা যদি দ্বীনের স্বার্থে এগিয়ে না আসি তবে তাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কোনো ক্ষতি হবে না। আল্লাহর আদেশগুলো আমাদের নিজেদের স্বার্থেই মানতে হবে, কেননা এর মাঝে আমাদেরই কল্যাণ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px