📄 হুনাইনের গনীমত: সম্পদ নাকি রাসূলুল্লাহ ﷽
রাসূলুল্লাহ হুনাইনের যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ দিয়েছিলেন কুরাইশ আর আরব গোত্রগুলোকে। হুনাইনের গনিমতের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। কেননা এই যুদ্ধে হাওয়াযিনের নেতা মালিক ইবন আউফ ও তার সৈনিকরা স্ত্রী-সন্তান, পশুপাল সবকিছু নিয়েই যুদ্ধে এসেছিল। রাসূলুল্লাহ কুরাইশ, গাতফান এবং তামিম গোত্রের নেতাদের বিপুল পরিমাণ গনিমতের সম্পদ দেন। প্রত্যেক নেতা একশোটি করে উট পায়। কুরাইশদের মধ্য থেকে আবু সুফিয়ান, সুহাইল ইবন আমর, হাকিম ইবন হিযাম, সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা এবং আল-আকরা ইবন হাবিস, উয়াইনা ইবন হিসন আল- ফিজারী, মুআবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান, ইয়াযিদ ইবন আবু সুফিয়ান, কাস ইবন আদী প্রমুখ অনেক গনিমত পান। কেউ কেউ একশো, দুইশো এমনকি তিনশো উটও পান! বনু সুলাইম গোত্রের প্রধান আব্বাস ইবন মিরদাসকেও অনেক সম্পদ দেওয়া হয়। শুধু বাকি রইলেন আনসার সাহাবিগণ। তাঁদের রাসূলুল্লাহ কিছুই দিলেন না।
বিপদের সময় যে লোকগুলো পালিয়ে গিয়েছিল, আল্লাহর রাসূল তাদের দুহাত ভরে দিলেন, অথচ যারা সামনে থেকে যুদ্ধ করেছে, তাদের হাত খালি পড়ে রইলো। স্বাভাবিকভাবেই আনসারদের কেউ কেউ এতে মনঃক্ষুণ হন, বিশেষ করে তরুণ আনসাররা বিষয়টা সহজভাবে নিতে পারলো না। কেউ কেউ বললো,
'আল্লাহর রাসূলকে আল্লাহ ক্ষমা করুন! আমাদের তলোয়ার এখনো রক্তে ভেজা, অথচ তিনি কুরাইশদের এত কিছু দিলেন, আর আমাদের কিছুই দিলেন না!'
আনসারদের নেতা সাদ ইবন উবাদা রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে বিষয়টা খুলে বললেন। বললেন,
- ইয়া রাসূলুল্লাহ! আনসাররা আপনার গনিমত বণ্টনে দুঃখ পেয়েছে। আপনি নিজের কওম আর আরব গোত্রপ্রধানদের অনেক বেশি পরিমাণে গনিমত দিয়েছেন। কিন্তু আনসাররা তো কিছুই পেল না।
- সাদ, এই বণ্টনের ব্যাপারে তোমার কী মত?
- রাসূলুল্লাহ! আমিও তো আনসারদেরই একজন।
সাদ ইবন উবাদা এভাবে খুব আদবের সাথে নিজের অনুভূতির কথাও ব্যক্ত করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সব আনসারদের ডাকলেন। সেই বৈঠকে অল্প কিছু মুহাজির সাহাবিও ছিলেন। বাকিদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ এবং আনসারদের একান্ত কথোপকথন। রাসূলুল্লাহ সবার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন।
বক্তব্যের শুরুতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আল্লাহর রাসূল তাঁর কথা শুরু করলেন,
- আনসার ভাইয়েরা! আমি কি তোমাদের কাছে এমন এক অবস্থায় আসিনি যখন তোমরা ছিলে পথভ্রষ্ট, আর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের পথ দেখান? তোমরা ছিলে দরিদ্র, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের সম্পদ দিয়েছেন। তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের অন্তরকে জুড়ে দিয়েছেন। বলো, এসব কি সত্য নয়?
- হ্যাঁ আল্লাহর রাসূল, এসবই সত্য। আমাদের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনেক মেহেরবানি।
- হ্যাঁ, তোমরা আমাকে এ কথা বলতেই পারো যে, যখন সবাই আপনাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল তখন আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি। যখন সবাই আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছিল, আমরা আপনার পাশে দাঁড়িয়েছি। যখন আপনি ছিলেন আশ্রয়হারা, আমরা আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি। আপনি ছিলেন নিঃস্ব, আমরা আপনাকে সাহায্য করেছি।
রাসূলুল্লাহ এরপর বললেন,
'আনসাররা শোনো! তোমরা দুনিয়ায় তুচ্ছ কিছু সম্পদের জন্য মনে মনে নাখোশ হয়েছো। অথচ এই সম্পদগুলোর মাধ্যমে আমি কিছু লোকের মন জয় করতে চেয়েছি যেন তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর তোমাদের ইসলামের ওপর আমার তো আস্থা আছেই। বলো, তোমরা কি এতে খুশি নও যে অন্যরা যখন উট, ভেড়া নিয়ে বাড়ি ফিরবে, তখন তোমরা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে? সেই সত্তার শপথ যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, ওরা যা কিছু নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে, তার চাইতে উত্তম কিছু নিয়ে তোমরা আজ বাড়ি ফিরবে। যদি হিজরত বলে কিছু না হতো, তাহলে আমিও হতাম আনসারদেরই একজন। যদি সব লোক এক পথে চলে আর আনসাররা অন্য পথে চলে, আমি তো আনসারদের পথেই চলবো। হে আল্লাহ, তুমি আনসারদের ওপর রহম করো, তাদের সন্তানদের ওপর রহম করো এবং তাদের সন্তানদের ওপরও রহম করো।'
এ কথাগুলো শুনে আনসাররা কাঁদতেই থাকলেন, কাঁদতেই থাকলেন। আর বললেন, 'আমরা আমাদের অংশে আল্লাহর রাসূলকে পেয়ে সন্তুষ্ট।'
আনসাররা ছিলেন বাকিদের চাইতে আলাদা। অন্যদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে আল্লাহর রাসূল এই অর্থসম্পদ তাদের দিয়েছিলেন। কিন্তু আনসারদের বেলায় এমনটা করা প্রয়োজন ছিল না। কারণ তারা এতদিন ধরে সুখে-দুঃখে আল্লাহর রাসূলের পাশে ছিলেন, তারা টাকা-পয়সার জন্য জিহাদ করেননি। প্রথম দিন থেকেই আখিরাত ছিল তাদের লক্ষ্য।
তারা ছিলেন পথহারা, তারা ছিলেন কাফির। একজন মানুষের জন্য কাফির হওয়ার চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে? কিন্তু আল্লাহ তাআলা নবী মুহাম্মাদকে তাদের কাছে পাঠানোর মাধ্যমে তাদের পথ দেখালেন। এটা ছিল আনসারদের সবচাইতে বড় অর্জন, সবচাইতে বড় পাওয়া। হিদায়াতের সাথে পৃথিবীর কোনো সম্পদের তুলনা চলে না। এজন্যই আমরা যে দুআটি সবচেয়ে বেশি করি তা হলো হিদায়াতের দুআ -- ইহদিনাস সিরাতুল মুস্তাক্বীম- সূরা ফাতিহার সেই আয়াত- আমাদেরকে সরল পথ দেখাও।
আল্লাহ শুধু আনসারদের হিদায়াত দিয়েছেন তা নয়, বরং তাঁর রাসূলের মাধ্যমে তাদের সম্পদশালী বানিয়েছেন। মদীনার অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। রাসূলুল্লাহর আগমনের পর একের পর এক যুদ্ধে এই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল, কিন্তু জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ থেকে প্রাপ্ত গনিমতের মাধ্যমে আনসাররা ধনী হয়েছিলেন।
আনসারদের প্রতি আল্লাহ তাআলার আরেকটি বড় অনুগ্রহ হচ্ছে তাদের ঐক্য। আনসারদের আওস ও খাযরাজ গোত্র চিরশত্রু ছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহর মাধ্যমে আল্লাহ এই দুটি গোত্রের অন্তরকে এক করেন। আনসাররা তাদের দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চটা ঢেলে দিয়েছেন। তারা আল্লাহর রাসূলের কঠিন সময়ে তাঁর ওপর ঈমান এনেছেন, তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন, তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সেসব নিয়ে তারা কখনোই গর্ব করেননি, বরং এসবকিছুকে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত হিসেবেই মেনেছিলেন আর আল্লাহর প্রশংসাই করেছেন। তবু কেন তারা আল্লাহর রাসূলের সিদ্ধান্তে প্রথমে কিছুটা দুঃখ পেয়েছিলেন? সত্যি বলতে আনসারদের সবাই নয়, বরং কিছু সাহাবি দুঃখ পেয়েছিলেন। আল্লাহর রাসূল চেয়েছেন কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের নেতাদের মন থেকে ইসলামের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ দূর করে দিতে, যেন তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার একটি কথায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তিনি বলেছিলেন, 'রাসূলুল্লাহ আমাকে গনিমত থেকে দিতেই থাকলেন, দিতেই থাকলেন, যতক্ষণ না তিনি আমার চোখে পৃথিবীর সবচাইতে নিকৃষ্ট মানুষ থেকে সবচেয়ে ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হলেন।' এ প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ আল-গাযযালি একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন, তিনি বলেছেন,
'কিছু লোক সত্যের দিক ধাবিত হয় পেটের চাহিদায়, সত্যান্বেষী মন দিয়ে নয়। গবাদিপশুদের যেমন করে একগুচ্ছ পাতা দেখিয়ে গোলাঘরের দিকে টেনে আনা হয়, তেমনি কিছু লোককে সত্যের দিকে ধাবিত করতে চাইলে কিছু প্রলোভন দেখানোর প্রয়োজন পড়ে।'
আল্লাহর রাসূল জানতেন কাকে কতটুকু দিতে হয়, অথবা কাকে না দিলেও চলে। যেমন তিনি আল-আকরা ও উয়াইনাকে প্রথমে ১০০টা করে উট দিলেন কিন্তু আব্বাস ইবন মিরদাসকে দেন ৫০টি উট। আব্বাসও ছিল অন্যদের মতো গোত্রপ্রধান। স্বভাবতই তিনি মনঃক্ষুণ্ন হলেন। ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করে সে একটি কবিতা আবৃত্তি করে। কবিতার ভাষায় সে বলছিল যে, সে কম পেয়েছে অথচ তাঁর পূর্বপুরুষেরাও অন্য গোত্রগুলোর মতোই লড়াই করে এসেছে।
কবিতার কথাগুলো আল্লাহর রাসূলের কানে আসে। কবিতা শুনে তিনি বললেন, 'ওর জিহবা কেটে ফেলো।' নবীজির কথা শুনে কিছু লোক ভাবলো তিনি আক্ষরিক অর্থেই আব্বাসের জিহবা কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন! আসলে রাসূলুল্লাহ আব্বাসকে আরও ৫০টা উট দেওয়ার কথা বলেছিলেন যাতে তার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। শাফওয়ান ইবন উমাইয়্যাকে তিন দফায় একশো করে দেওয়া হয়েছিল তিনশো উট। হাকিম ইবন হিজামকে দেওয়া হয়েছিল দুইশো উট। আবু সুফিয়ান, তার দুই ছেলে মুআবিয়া এবং ইয়াযিদ -- তাদের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছিল একশো উট আর ছয় কেজি রুপা।
কিন্তু কিছু মানুষকে আল্লাহর রাসূল কিছুই দিলেন না। এমন একজন হলেন আমর ইবন তাঘলিব। রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রশংসায় বলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি যাদেরকে দিচ্ছি না -- তারা আমার কাছে বেশি প্রিয়। কিছু লোককে আমি দিচ্ছি কারণ তাদের অন্তরে আমি সম্পদের লোভ দেখতে পাচ্ছি, আর যাদেরকে দিচ্ছি না তাদের ওপর আমার পুরো আস্থা আছে যে আল্লাহ তাদের যা দিয়েছেন তা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। আমর ইবন তাঘলিব তাদেরই একজন।'
এই কথা আমর ইবন তাঘলিবের মন ভরিয়ে দিল। তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহর এই কথাগুলোকে আমি লাল উটের চেয়ে বেশি পছন্দ করলাম।'
সে যুগে আরবে লাল উট মানে হলো বর্তমানের মার্সিডিজ বেঞ্জ! আমর বোঝালেন, যদি সমস্ত পৃথিবী পরিপূর্ণ করে লাল উট তাঁকে দেওয়া হয়, তবু তার চাইতে মহানবী তাঁকে যেভাবে সম্মানিত করলেন, সেটাই তাঁর কাছে অনেক বেশি দামি!
এভাবেই রাসূলুল্লাহ সাফওয়ানকে গনিমত দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর ভালোবাসা আদায় করলেন আর অন্যদিকে আমরা ইবন তাঘলিবকে না দেওয়ার মাধ্যমে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসা পেলেন। সাফওয়ানের কাছে গনিমতটাই ছিল কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু আমরের জন্য রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে ঈমানের স্বীকৃতিটাই বড়।
রাসূলুল্লাহর সীরাতের দিকে তাকালে দেখা যায় কাকে কী বলতে হবে, কার সাথে কেমন আচরণ করলে লাভ হবে -- এসবের ব্যবস্থাপনায় রাসূলুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে মানুষের মন জয় করার এই বিশেষ ক্ষমতাটি দান করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি মুসলিমদের একটা অভিন্ন উম্মাহ হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছেন।
"যদি আপনি দুনিয়ার সমস্ত সম্পদও ব্যয় করতে, তবু এ মানুষদের অন্তরগুলোর মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার বন্ধন স্থাপন করতে পারতেন না। বরং আল্লাহ তাআলাই এদের মাঝে প্রীতি সঞ্চার করেছেন।” (সূরা আনফাল, ৮:৬৩)
আল্লাহর রাসূল বিভিন্ন গোত্রের নেতাদের মন জয় করার চেষ্টা করেছেন, এর মানে এই নয় যে মুসলিমরা কাফিরদের ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য নিজেদের দ্বীন আর পরিচয় বিকিয়ে দেবে, যেটা এখন হচ্ছে। আজকে ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু ও মুসলিমদের ওপর সর্বাত্মক যুদ্ধ চালানো কাফির নেতৃবৃন্দদের নানাভাবে খুশি করার চেষ্টা করছে একদল মুসলিম। এটা হচ্ছে মূলত পশ্চিমা দেশগুলোতে। সেখানে কিছু মুসলিম ক্রমাগত তাদের ইসলামী মূল্যবোধের ব্যাপারে ছাড় দিয়ে চলেছে। সমাজে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য তারা পশ্চিমা কুফরি আদর্শ ও অনৈতিক মূল্যবোধগুলোকেও স্বীকৃতি দিচ্ছে। কাফিরদের খুশি করার জন্যই তাদের এত পরিশ্রম, তবে এর সবই পণ্ডশ্রম। কারণ, আল্লাহ বলছেন,
"আর ইহুদি ও নাসারারা কখনো আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না আপনি তাদের পথ অনুসরণ করেন।" (সূরা বাকারাহ, ২: ১২০)
আল্লাহর রাসূল যে লোকগুলোর মন জয় করার চেষ্টা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আগে তিনি প্রায় বিশ বছর মতাদর্শিক ও সামরিক যুদ্ধ করে তাদের পরাস্ত করেছেন, কোণঠাসা করেছেন, সর্বস্বান্ত করে ছেড়েছেন। তিনি যতদিন তাদের সাথে যুদ্ধ করেছেন, ততদিন তাদেরকে টাকা দিয়ে বা ছাড় দিয়ে খুশি করার কোনো চেষ্টাই করেননি। কিন্তু যখন তিনি তাদের ওপর ক্ষমতা অর্জন করেছেন আর তারা ক্ষমা চেয়েছে বা পালিয়ে গেছে, তখন তিনি তাদের সুযোগ দিয়েছেন। তিনি চেয়েছেন তারা যেন ইসলামের ছায়াতলে আন্তরিকভাবে চলে আসে। ক্ষমতাসীন কাফিরদের হাতে টাকা-পয়সা তুলে দিয়ে বা তাদের পক্ষে ক্যাম্পেইন করে তাদের মন জয় করা যায় না। কারণ যতদিন তাদের হাতে ক্ষমতা আছে, তাদের ইসলামের কোনো প্রয়োজন নেই। এ অবস্থায় বরং তাদের সাথে দৃঢ়তা দেখানো ও অনমনীয় হওয়াটাই নবীজির পথ。
📄 খারিজিদের শেকড়
কিছু লোকের সম্পদের লোভ তাদেরকে রাসূলুল্লাহর বণ্টনের প্রতি অন্যায্যতার অভিযোগ তোলার দিকে ঠেলে দেয়। বনু তামীম গোত্রের যুলখুয়াইসিরাহ নামের এক লোক এসে বললো, 'এই মুহাম্মাদ, তুমি আল্লাহকে ভয় করো।' রাসূলুল্লাহ কাউকে কম, কাউকে বেশি দিচ্ছিলেন এটা তার পছন্দ হয়নি, সে তাই আল্লাহর রাসূলকে ন্যায়বিচার শিক্ষা দিতে চলে এসেছিল।
রাসূলুল্লাহ বললেন, 'জমিনের সমস্ত মানুষের ওপরে আল্লাহ আমাকে বিশ্বাস করেন, আমি যদি ন্যায়বিচার না করি তবে আর কে করবে?' উমার ইবন খাত্তাব স্বভাবতই খুব ক্ষেপে গেলেন, বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অনুমতি দিন, আমি এর গর্দানটা উড়িয়ে দিই'। রাসূলুল্লাহ বললেন,
'ওকে ছেড়ে দাও। এমন আরও অনেক লোক তুমি দেখবে। তাদের সালাতের তুলনায় তোমার সালাত কিছুই না। তাদের সিয়ামের তুলনায় তোমার সিয়াম কিছুই না। তারা কুরআন পড়বে কিন্তু কুরআন তাদের গলার নিচ দিয়ে নামবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তীর লক্ষ্যভেদ করে বেরিয়ে যায়।'
এখানে রাসূলুল্লাহ এই জাতীয় চরমপন্থী লোকদের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তুলনাটা এমন যে, একজন শক্তিশালী তীরন্দাজ যখন খুব জোরে তীর নিক্ষেপ করে তখন তা লক্ষ্যে আঘাত করে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়, তীরন্দাজ বুঝতেই পারে না আদৌ লক্ষ্যভেদ হয়েছে কি না। এই লোকগুলোর অবস্থা সেই তীরের মতো, তারা ইসলাম থেকে এত দ্রুতগতিতে বেরিয়ে যাবে যেভাবে করে তীরন্দাজের তীর লক্ষ্যভেদ করে বেরিয়ে যায়।
এই লোকগুলো সালাত আদায় করবে, সিয়াম পালন করবে, এবং এদের এসব ইবাদাত ও আমল বাহ্যিক দৃষ্টিতে খুব নজরকাড়া হবে। এমনকি সাহাবিদের আমল তাদের ধারেকাছে যাবে না। তারা কুরআন পড়বে কিন্তু কুরআন তাদের গলা দিয়ে নামবে না অর্থাৎ কুরআন তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে না। কুরআনের আয়াতগুলো তারা কেবল উচ্চারণ করবে মাত্র, জীবনে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করবে না।
ইসলামী পরিভাষায় এদের বলা হয় খারিজী। এরা চরমপন্থা অবলম্বন করে এবং বাড়াবাড়ি করে। আল্লাহর রাসূল অন্য একটি হাদীসে বলেছেন, খারিজীরা হবে মু'মিনদের প্রতি কঠোর আর কাফিরদের প্রতি নমনীয়। এটি খারিজী চিহ্নিত করার মূল সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি যুগের খারিজীদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য ঘুরেফিরে থাকবে। মুসলিমদের জান-মালের কোনো মূল্য তাদের নেই। বরং মুসলিমদের ওপর তারা কুফরির অপবাদ দিয়ে তাদের দেদারসে হত্যা করে। তবে একটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, ইসলামের দৃষ্টিতে চরমপন্থা আর বর্তমান সেকুলার দৃষ্টিতে চরমপন্থা - দুটোর সংজ্ঞা এক নয়। চরমপন্থার সংজ্ঞা আসলে কী -- সেটা মুসলিম আলিমদের থেকে শিখতে হবে, পশ্চিমা বা সেকুলার মিডিয়া থেকে নয়। কারণ ইসলামের যা কিছুতে সেকুলারদের আপত্তি, তার সবকিছুকেই তারা চরমপন্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।
আলীর খিলাফতের যুগে খারিজীদের উত্থানের সময় এমন একটি ঘটনা ঘটে। খাব্বাব ইবন আরাতের ছেলে ইবন খাব্বাব তার স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বের হয়েছেন। পথিমধ্যে খারিজীরা তার পথরোধ করে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো। তার উত্তর তাদের পছন্দ না হওয়ায় তারা তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তার গর্ভবতী স্ত্রীকে মেরে পেট কেটে বাচ্চা বের করে ফেলে। তার কিছু পরেই তারা কিছু খ্রিস্টানদের সম্পদ লুট করলো। কিন্তু যখনই শুনলো সেগুলো খ্রিস্টানদের, সেগুলো তারা সাথে সাথে ফেরত দিয়ে দিলো। ইবন খাব্বাবকে হত্যার পরই আলী ইবন আবি তালিব খারিজীদের সাথে যুদ্ধ শুরু করেন। যেহেতু মুসলিমদের জান-মাল খারিজীদের হাতে নিরাপদ থাকে না, তাই খারিজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কাফিরদের সাথে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ থেকেও প্রাধান্য পায়। খারিজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে মূলধন রক্ষা করার মতো। আর কাফিরদের ভূমিতে আক্রমণ করার উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন। নিশ্চিতভাবেই মুনাফা অর্জনের চেয়ে মূলধন রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই একই নীতি মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদেও প্রযোজ্য, কেননা তারা উম্মাহর অভ্যন্তরীণ শত্রু। কাফিরদের আগ্রাসন প্রতিরোধ করা, মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও খারিজীদের দমন করা -- এদের প্রতিটিই জরুরি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
খারিজীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য তারা ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তবে অত্যাচারী মুসলিম শাসকের যুলুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ইসলামী শরীয়াতে খুরুজ হিসেবে গণ্য করা হয় না। জিহাদ ও খুরুজ-- এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। বর্তমানে যেকোনো প্রকার জিহাদকে খুরুজ তকমা দেওয়ার একটি রেওয়াজ চালু হয়েছে যা নিঃসন্দেহে উম্মাহর জন্য বিভ্রান্তিকর।
📄 হাওয়াযিন গোত্রের ইসলাম গ্রহণ
হুনাইনের যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্র নারী, শিশু, সম্পদ--সবকিছু হারায়। এসব নিয়ে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছিল তাই এগুলোকে গনিমত হিসেবে মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়। তারা যখন রাসূলুল্লাহর কাছে প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে নিজেদের ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়, ততক্ষণে যাবতীয় গনিমত ভাগাভাগি হয়ে গেছে। ফলে তাদের গোত্রে শুধু কিছু পুরুষ ছাড়া কিছুই রইলো না। বিষয়টা কষ্টকর, তারা মুসলিম হয়ে এসেছে কিন্তু তাদের পরিবার তাদের সাথে নেই। তারা আল্লাহর রাসূলকে খুব সম্মান করলো, তাঁর প্রশংসা করলো এবং অনুরোধ করলো যেন তাদের সম্পত্তি তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আল্লাহর রাসূল বিষয়টা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করলেন, কিন্তু যেহেতু তিনি ইতিমধ্যেই সবকিছু বণ্টন করে দিয়েছেন, তাই সেগুলো মুসলিমদের থেকে ফেরত নেওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু আল্লাহর রাসূল চাচ্ছিলেন তাদেরকে যতটুকু সম্ভব ফিরিয়ে দিতে। তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কোনটা চাও আমাকে বলো, তোমাদের পরিবার নাকি সম্পদ? কোনটা ফিরে পেতে তোমরা আগ্রহী?'
তারা বললো, 'আমরা অবশ্যই আমাদের পরিবারকে ফিরে পেতে চাই। ওরাই তো আমাদের সম্মান।' রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, 'ঠিক আছে, আমার আর বনু মুত্তালিবের হাতে যা আছে, আমি তোমাদের সেগুলো ফিরিয়ে দেবো। তোমরা একটা কাজ করবে, আমি যখন সালাতে ইমামতি করবো, তোমরা উঠে দাঁড়াবে এবং বলবে, আমরা আল্লাহর রাসূলকে অনুরোধ করি যেন তিনি আমাদের হয়ে মুসলিমদের এবং মুসলিমদের অনুরোধ করি তারা যেন আমাদের হয়ে আল্লাহর রাসূলকে অনুরোধ করে আমাদের পরিবার-পরিজনকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে। তোমরা যখন এ অনুরোধ করবে, তখন আমি আমার ও বনু মুত্তালিবের হাতে যা আছে তা তোমাদের কাছে ফিরিয়ে দেবো আর বাকিদেরকেও তা-ই করতে বলবো।'
যুহরের ওয়াক্তে আল্লাহ রাসূল মসজিদে সালাত আদায় করলেন। সালাতের পর হাওয়াযিনের নও মুসলিমরা উঠে দাঁড়িয়ে আল্লাহর রাসূলের কথামতো ওপরের কথাগুলো বললেন। এরপর রাসূলুল্লাহ মুসলিমদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমাদের ভাইয়েরা অনুতপ্ত হয়ে ফিরে এসেছে। তারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, এখন আমি তাদের পরিবার-পরিজনকে তাদের হাতে ফিরিয়ে দিতে চাই।' এরপর আল্লাহর রাসূল তাঁর ও তাঁর পরিবার বনু মুত্তালিবের হাতে গনিমত হিসাবে যেসকল নারী শিশু ছিল, তাদের হাওয়াযিন গোত্রের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহর উদারতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুহাজিররা বললেন, 'আমাদের যা আছে, আমরাও সেসব সবই ফিরিয়ে দেবো।' আনসাররাও একই কথা বললেন।
কিন্তু এই উৎসাহে ভাটা পড়ে যখন আকরা ইবন হাবিস বললো, 'আমাদের গনিমত ফেরত দেবো না।' উয়াইনাও একই কথা বললো, একই কথা বললো বনু সুলাইমের নেতা আব্বাস ইবন মিরদাস। কিন্তু তার গোত্রের লোকেরা দাঁড়িয়ে বললো, 'কিন্তু আমরা আল্লাহর রাসূলকে আমাদের সব গনিমত ফিরিয়ে দিতে চাই!' আব্বাস রেগে গিয়ে বললো, 'তোমরা আমাকে অপমান করলে!'
আল্লাহর রাসূল খুব করে চাচ্ছিলেন হাওয়াযিনের নারী-শিশুরা যেন পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারে। কিন্তু যখন দেখলেন কিছু লোক স্বেচ্ছায় তাদের গনিমত ফিরিয়ে দিতে চাইছে না, তখন তিনি তাদের প্রস্তাব দিলেন, 'ঠিক আছে, তোমরা যারা গনিমত ছেড়ে দিতে চাইছো না, তোমাদের বলছি, তোমরা যদি এবার এই গনিমত ছেড়ে দাও, তাহলে পরবর্তী জিহাদে তোমাদের ছয়গুণ করে বাড়িয়ে দেওয়া হবে।'
অন্য একটি বর্ণনা অনুসারে, আল্লাহর রাসূল তাদেরকে এর বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা দেন। এই কথা শুনে সবাই তাদের গনিমত ছেড়ে দিল। এভাবেই রাসূলুল্লাহর চমৎকার ব্যবস্থাপনায় হাওয়াযিন গোত্রের নারী-শিশুরা তাদের গোত্রে ফিরে গেল, আর অর্থসম্পদ মুসলিমদের কাছে থেকে গেল। মুসলিমদের প্রত্যেকে পেয়েছিল ৪০টি করে ভেড়া।
মালিক ইবন আউফকে বলা হলো, 'তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ করো, তাহলে তোমার সম্পত্তি আর পরিবার তো ফিরিয়ে দেওয়া হবেই, তার সাথে আরও ১০০ উট তোমাকে দেওয়া হবে।' এ খবর শুনে মালিক ইবন আউফ তাইফ থেকে চলে এসে ইসলাম গ্রহণ করলো। আল্লাহর রাসূল তাঁর কথামতো সবকিছু ফিরিয়ে দিলেন এবং মালিককে সেই এলাকার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিলেন। মালিক ইবন আউফ মহাখুশি হয়ে আল্লাহর রাসূলের প্রশংসায় কবিতাও লিখে ফেললো। শুধু তা-ই নয়, সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেই একটি বাহিনী গঠন করে তাইফ অবরোধ করলো। যে লোকটি কিছুদিন আগেও রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছিল, সে এখন রাসূলুল্লাহর পক্ষ হয়ে জিহাদ শুরু করল। যাদের সে কিছুদিন আগে রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে উৎসাহিত করেছিল, এখন সে তাদের বিরুদ্ধেই জিহাদ শুরু করলো। এভাবেই রাসূলুল্লাহ ইসলামের ঘোরশত্রুদেরও মন জয় করেন।
📄 কা'ব ইবন যুহাইরের ؓ ইসলাম গ্রহণ
কাব ইবন যুহাইর নবীজির বিরুদ্ধে কবিতা লিখতো। তার ভাই তাকে জানালো রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে যারা কবিতা লিখেছে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। এ কথা শুনে কা'ব খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সে সিদ্ধান্ত নিল রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে। রাসূলুল্লাহ তাকে চিনতেন না। সে রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে বললো, 'কাব ইবন যুহাইর আপনার কাছে এসেছে। সে মুসলিম হতে চায়। আপনি কি তার ইসলাম গ্রহণ করবেন?' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'হ্যাঁ, তাকে আসতে দাও।' তখন কা'ব বললেন, 'আমিই কা'ব ইবন যুহাইর।' এরপর সে রাসূলুল্লাহর কাছে বায়াত দিলো এবং রাসূলুল্লাহর প্রশংসা করে চমৎকার একটি কবিতা আবৃত্তি করলো। রাসূলুল্লাহ তার কবিতা শুনে খুব খুশি হলেন এবং তাঁর শরীর থেকে চাদর খুলে কাবকে দিয়ে দিলেন।