📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 অবরোধ প্রত্যাহার

📄 অবরোধ প্রত্যাহার


এই ধরনের হামলা চালানো সত্ত্বেও তাইফবাসী হাল ছেড়ে দেয়নি। তাদের তীরন্দাজরা দেওয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে তীর ছুঁড়ে যাচ্ছিল আর তাদের তীরের আঘাতে অনেক মুসলিম আহত হচ্ছিলেন। তাই মুসলিম বাহিনীকে তীরের সীমা থেকে বের হয়ে পেছনে চলে আসতে হয়। সাহাবিরা এই অবরোধে 'দাব্বাবাহ' ব্যবহার করলেন। এটা ছিল একটা কাঠের তৈরি কাঠামো। এর ভিতরে কয়েকজন সাহাবি প্রবেশ করতেন। এটা তীরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিত। এটাকে ব্যবহার করে তারা দেওয়ালের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাইফবাসী দাব্বাবার বিরুদ্ধে অপর একটি অস্ত্র ব্যবহার করল। তারা আগুনে উত্তপ্ত করা কাঁটাযুক্ত লোহার টুকরা দাব্বাবার দিকে ছুঁড়ে দেয় ফলে দাব্বাবার ভেতর থেকে সাহাবিরা বের হয়ে আসতে বাধ্য হন। দাব্বাবাহ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাইফবাসীর ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করার জন্য রাসূলুল্লাহ আঙ্গুরের গাছগুলো কেটে পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দেন। এই কৌশলে কাজ হয়। তাইফের লোকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এই গাছগুলো ছিল তাদের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। তখন তারা আল্লাহর রাসূলকে আত্মীয়তার সম্পর্কের দোহাই দিয়ে অনুরোধ করে যেন তিনি তাদের গাছ পোড়ানো বন্ধ করে। আল্লাহর রাসূল তাদের অনুরোধ রাখেন।

শত্রুদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য নবীজি আরও একটি কাজ করেন। তিনি তাইফের দাসদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেন, যদি তারা দুর্গ ছেড়ে বের হয়ে আসে, তাহলে তাদের স্বাধীন করে দেওয়া হবে। এই ঘোষণা শুনে তেইশ জন দাস বের হয়ে আসে। তাদের মুক্ত করে দেওয়া হয়।

অবরোধ পনেরো দিন পর্যন্ত স্থায়ী হলো। কিন্তু তাইফের অধিবাসীদের মধ্যে আত্মসমর্পণ করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। রাসূলুল্লাহ তখন নাওফাল ইবন মুওয়াবিয়াহ আদ-দাইলির সাথে পরামর্শ করলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'অবরোধ চালিয়ে যাবার ব্যাপারে তোমার মতামত কী?' নাওফাল বললেন, 'এদের অবস্থা এখন গর্তে লুকিয়ে থাকা শিয়ালের মতো। আপনি যদি অবরোধ চালিয়ে যান, আজ হোক, কাল হোক, আপনি জয়ী হবেন। তবে তাদের ছেড়ে দিলেও তারা আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।' কারণ, তাইফের চারপাশে প্রায় সবগোত্র ততদিনে ইসলাম গ্রহণ করে ফেলেছে। তাই তাইফ মুসলিমদের জন্য আর কোনো হুমকি নয়। নবীজি তার উপদেশ গ্রহণ করলেন। উমারকে বললেন যেন সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা ফিরে যাবেন।

এই ঘোষণা সাহাবিদের অনেকের মনঃপূত হলো না। তারা তাইফ জয় না করে ফিরে যাবেন এটা মানতে পারছিলেন না। তারা বললো, 'রাসূলুল্লাহ! আমরা বিজয় ছাড়াই ফিরে যাবো?' রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, 'ঠিক আছে, তাহলে যুদ্ধ চালিয়ে যাও।' পরদিন তারা লড়াইয়ের জন্য বের হলেন। বেশ কিছু সাহাবি আহত হলেন। তারা বুঝতে পারলেন এই দুর্গ ভেদ করা সহজ হবে না, যেমনটা তারা ভেবেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সেদিন আবার বললেন, 'ইনশা আল্লাহ, আগামীকাল আমরা এখান থেকে ফিরে যাবো।' এবার আর সাহাবিরা প্রতিবাদ করলেন না, বরং তারা সেটাই চাচ্ছিলেন। তাদের নীরবতা দেখে রাসূলুল্লাহ কিছুই বললেন না, হাসলেন শুধু। তাইফ থেকে বের হয়ে এসে আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমরা বলো: আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদাতকারী এবং রবের প্রশংসাকারী।' সাহাবিদের কেউ বললেন, 'আপনি সাকিফদের বিরুদ্ধে দুআ করুন।' আল্লাহর রাসূল সাকিফদের বিরুদ্ধে বদদুআ না করে তাদের হিদায়াতের জন্য দুআ করলেন। বললেন, 'হে আল্লাহ! সাকিফকে পথ দেখাও, তাদের সত্যের পথে চালিত করো।' আল্লাহর রাসূলের এই দুআ কবুল হয়েছিল। হিজরী ৯ম বর্ষে তারা নিজ থেকে এসে ইসলাম গ্রহণ করে।

তাইফ ছিল আরবদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ গাযওয়া। এই যুদ্ধের পর মুসলিমদের সামনে নতুন এক প্রতিপক্ষ দাঁড়ায়। রোমান সাম্রাজ্য। রোমানদের বিরুদ্ধে এর পর তাবুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হুনাইনের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা

📄 হুনাইনের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা


১) যাত-আনওয়াতের ঘটনা

অভিযানে যাওয়ার পথে মুসলিমরা একটা বিশাল গাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। জাহিলিয়াতের যুগে মুশরিকরা এই গাছের উদ্দেশ্যে তীর্থযাত্রা করতো এবং বরকত ও মঙ্গল লাভের আশায় তাদের তরবারি এই গাছে ঝুলিয়ে রাখত। এই অভিযানে মুসলিম সেনাবাহিনীতে অনেক নতুন মুসলিম ছিল। সবার তাওহীদের সঠিক বুঝ ছিল না। তারা রাসূলুল্লাহকে অনুরোধ করলো, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাদেরকেও এরকম একটি গাছ নির্ধারণ করে দিন যেমনটা মুশরিকদের আছে।' রাসূলুল্লাহ বললেন,

'আল্লাহু আকবার! তোমরা এমন এক কথা বলেছো যা মূসার জাতি মূসাকে বলেছিল! তারা বলেছিল, হে মুসা, তাদের যেমন উপাস্য আছে আমাদের জন্য তেমনি উপাস্য নির্ধারণ করে দাও। সে বলেছিল, তোমরা একটি মূর্খ সম্প্রদায়। নিশ্চয়ই তোমরাও আগের জাতিগুলোকে একে একে অনুসরণ করবে।'

অর্থাৎ বনী ইসরাঈলের মতো এই উম্মতের মধ্যেও কিছু লোক কাফিরদের অনুসরণ করবে। তবে পার্থক্য হলো বনী ইসরাঈল জাতির পথভ্রষ্টতা ছিল ব্যাপক। তাদের ভালোর চাইতে খারাপটাই ছিল প্রকট। একারণে তাদের পুরো দ্বীনই একসময় বিকৃত হয়ে হারিয়ে যায়। কিন্তু নবী মুহাম্মাদের উম্মতে সবসময় কিছু হকপন্থী বান্দা থাকবে। তারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং দ্বীনের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত অটল ও অবিচল থাকবে।

এই ঘটনা থেকে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ আক্বীদাহ জিহাদে অংশ নেওয়ার পূর্বশর্ত নয়। এখানে নও মুসলিমরা খুবই অদ্ভুত এবং অগ্রহণযোগ্য একটা আবদার করেছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাদেরকে সেজন্য বের করে দেননি, বরং তিনি তাদের ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন। তারা ছিল নওমুসলিম, তাদের ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার অভাব ছিল। কিন্তু একারণে তাদের জিহাদে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়নি। কারণ জিহাদ একটা ইবাদাত, এর জন্য পুরস্কার আছে। আর জিহাদ শুধু যুদ্ধ করাই নয়, বরং তারবিয়াহ চর্চার জন্য একটি উপযুক্ত স্থানও হলো জিহাদ। এর মাধ্যমেও ইলম অর্জন, আত্মশুদ্ধির চর্চা হয়।

২) সংখ্যা বা শক্তি নয়, ভরসা কেবল আল্লাহর ওপর

"অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু জায়গায় এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি। আর যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।” (সূরা তাওবা, ৯: ২৫)

যদি মুসলিমরা মনে করে যে, সংখ্যাধিক্য তাদের বিজয় এনে দেবে, সামরিক শক্তি আর প্রযুক্তি তাদের বিজয় এনে দেবে, যদি তারা ভাবে যে, শুধু অস্ত্রের জোরে উম্মাহ বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবে, তাহলে মুসলিমরা ভুলের রাজ্যে আছে। এটাই হুনাইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিজয় আসে আল্লাহ আযযা ওয়াজালের পক্ষ থেকে। আর বাকি সবকিছুই উপকরণমাত্র। উপকরণ কখনো আমাদের বিজয় এনে দেয় না। এটাই হলো আল্লাহ আযযা ওয়াজালের ওপর আমাদের ঈমান, আমাদের ভরসা, আমাদের নির্ভরশীলতা।

৩) আল্লাহর রাস্তায় তীর ছোঁড়ার পুরস্কার

আল্লাহর রাস্তায় তীর ছোঁড়ার ফযিলতের ব্যাপারে একটি হাদীস আছে। এটি বর্ণনা করেছেন আবু নাজিহ আস-সুলামি। তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি যে, যদি কেউ আল্লাহর রাস্তায় তীর ছোঁড়ে আর সেই তীর লক্ষ্যভেদ করে, তাহলে জান্নাতে তার মর্যাদা এক স্তরে উঁচুতে উন্নীত হবে। সেদিন আমি ষোলোটা তীর ছুঁড়েছি। এর প্রত্যেকটা লক্ষ্যভেদ করেছিল। আল্লাহর রাসূলকে আমি এও বলতে শুনেছি, যে আল্লাহর রাস্তায় একটা তীর ছোঁড়ে, সে একটি দাস আযাদ করার পুরস্কার লাভ করবে। তীরের হাদীসটি তাইফের অবরোধের সাথে সম্পর্কিত হলেও আধুনিক যুগের জিহাদে তীরের সমতুল্য অস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

টিকাঃ
১১৩. সুনান আন-নাসাঈ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৫।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হুনাইনের গনীমত: সম্পদ নাকি রাসূলুল্লাহ ﷽

📄 হুনাইনের গনীমত: সম্পদ নাকি রাসূলুল্লাহ ﷽


রাসূলুল্লাহ হুনাইনের যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ দিয়েছিলেন কুরাইশ আর আরব গোত্রগুলোকে। হুনাইনের গনিমতের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। কেননা এই যুদ্ধে হাওয়াযিনের নেতা মালিক ইবন আউফ ও তার সৈনিকরা স্ত্রী-সন্তান, পশুপাল সবকিছু নিয়েই যুদ্ধে এসেছিল। রাসূলুল্লাহ কুরাইশ, গাতফান এবং তামিম গোত্রের নেতাদের বিপুল পরিমাণ গনিমতের সম্পদ দেন। প্রত্যেক নেতা একশোটি করে উট পায়। কুরাইশদের মধ্য থেকে আবু সুফিয়ান, সুহাইল ইবন আমর, হাকিম ইবন হিযাম, সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা এবং আল-আকরা ইবন হাবিস, উয়াইনা ইবন হিসন আল- ফিজারী, মুআবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান, ইয়াযিদ ইবন আবু সুফিয়ান, কাস ইবন আদী প্রমুখ অনেক গনিমত পান। কেউ কেউ একশো, দুইশো এমনকি তিনশো উটও পান! বনু সুলাইম গোত্রের প্রধান আব্বাস ইবন মিরদাসকেও অনেক সম্পদ দেওয়া হয়। শুধু বাকি রইলেন আনসার সাহাবিগণ। তাঁদের রাসূলুল্লাহ কিছুই দিলেন না।

বিপদের সময় যে লোকগুলো পালিয়ে গিয়েছিল, আল্লাহর রাসূল তাদের দুহাত ভরে দিলেন, অথচ যারা সামনে থেকে যুদ্ধ করেছে, তাদের হাত খালি পড়ে রইলো। স্বাভাবিকভাবেই আনসারদের কেউ কেউ এতে মনঃক্ষুণ হন, বিশেষ করে তরুণ আনসাররা বিষয়টা সহজভাবে নিতে পারলো না। কেউ কেউ বললো,

'আল্লাহর রাসূলকে আল্লাহ ক্ষমা করুন! আমাদের তলোয়ার এখনো রক্তে ভেজা, অথচ তিনি কুরাইশদের এত কিছু দিলেন, আর আমাদের কিছুই দিলেন না!'

আনসারদের নেতা সাদ ইবন উবাদা রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে বিষয়টা খুলে বললেন। বললেন,

- ইয়া রাসূলুল্লাহ! আনসাররা আপনার গনিমত বণ্টনে দুঃখ পেয়েছে। আপনি নিজের কওম আর আরব গোত্রপ্রধানদের অনেক বেশি পরিমাণে গনিমত দিয়েছেন। কিন্তু আনসাররা তো কিছুই পেল না।

- সাদ, এই বণ্টনের ব্যাপারে তোমার কী মত?

- রাসূলুল্লাহ! আমিও তো আনসারদেরই একজন।

সাদ ইবন উবাদা এভাবে খুব আদবের সাথে নিজের অনুভূতির কথাও ব্যক্ত করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সব আনসারদের ডাকলেন। সেই বৈঠকে অল্প কিছু মুহাজির সাহাবিও ছিলেন। বাকিদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ এবং আনসারদের একান্ত কথোপকথন। রাসূলুল্লাহ সবার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন।

বক্তব্যের শুরুতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আল্লাহর রাসূল তাঁর কথা শুরু করলেন,

- আনসার ভাইয়েরা! আমি কি তোমাদের কাছে এমন এক অবস্থায় আসিনি যখন তোমরা ছিলে পথভ্রষ্ট, আর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের পথ দেখান? তোমরা ছিলে দরিদ্র, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের সম্পদ দিয়েছেন। তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের অন্তরকে জুড়ে দিয়েছেন। বলো, এসব কি সত্য নয়?

- হ্যাঁ আল্লাহর রাসূল, এসবই সত্য। আমাদের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনেক মেহেরবানি।

- হ্যাঁ, তোমরা আমাকে এ কথা বলতেই পারো যে, যখন সবাই আপনাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল তখন আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি। যখন সবাই আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছিল, আমরা আপনার পাশে দাঁড়িয়েছি। যখন আপনি ছিলেন আশ্রয়হারা, আমরা আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি। আপনি ছিলেন নিঃস্ব, আমরা আপনাকে সাহায্য করেছি।

রাসূলুল্লাহ এরপর বললেন,

'আনসাররা শোনো! তোমরা দুনিয়ায় তুচ্ছ কিছু সম্পদের জন্য মনে মনে নাখোশ হয়েছো। অথচ এই সম্পদগুলোর মাধ্যমে আমি কিছু লোকের মন জয় করতে চেয়েছি যেন তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর তোমাদের ইসলামের ওপর আমার তো আস্থা আছেই। বলো, তোমরা কি এতে খুশি নও যে অন্যরা যখন উট, ভেড়া নিয়ে বাড়ি ফিরবে, তখন তোমরা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে? সেই সত্তার শপথ যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, ওরা যা কিছু নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে, তার চাইতে উত্তম কিছু নিয়ে তোমরা আজ বাড়ি ফিরবে। যদি হিজরত বলে কিছু না হতো, তাহলে আমিও হতাম আনসারদেরই একজন। যদি সব লোক এক পথে চলে আর আনসাররা অন্য পথে চলে, আমি তো আনসারদের পথেই চলবো। হে আল্লাহ, তুমি আনসারদের ওপর রহম করো, তাদের সন্তানদের ওপর রহম করো এবং তাদের সন্তানদের ওপরও রহম করো।'

এ কথাগুলো শুনে আনসাররা কাঁদতেই থাকলেন, কাঁদতেই থাকলেন। আর বললেন, 'আমরা আমাদের অংশে আল্লাহর রাসূলকে পেয়ে সন্তুষ্ট।'

আনসাররা ছিলেন বাকিদের চাইতে আলাদা। অন্যদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে আল্লাহর রাসূল এই অর্থসম্পদ তাদের দিয়েছিলেন। কিন্তু আনসারদের বেলায় এমনটা করা প্রয়োজন ছিল না। কারণ তারা এতদিন ধরে সুখে-দুঃখে আল্লাহর রাসূলের পাশে ছিলেন, তারা টাকা-পয়সার জন্য জিহাদ করেননি। প্রথম দিন থেকেই আখিরাত ছিল তাদের লক্ষ্য।

তারা ছিলেন পথহারা, তারা ছিলেন কাফির। একজন মানুষের জন্য কাফির হওয়ার চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে? কিন্তু আল্লাহ তাআলা নবী মুহাম্মাদকে তাদের কাছে পাঠানোর মাধ্যমে তাদের পথ দেখালেন। এটা ছিল আনসারদের সবচাইতে বড় অর্জন, সবচাইতে বড় পাওয়া। হিদায়াতের সাথে পৃথিবীর কোনো সম্পদের তুলনা চলে না। এজন্যই আমরা যে দুআটি সবচেয়ে বেশি করি তা হলো হিদায়াতের দুআ -- ইহদিনাস সিরাতুল মুস্তাক্বীম- সূরা ফাতিহার সেই আয়াত- আমাদেরকে সরল পথ দেখাও।

আল্লাহ শুধু আনসারদের হিদায়াত দিয়েছেন তা নয়, বরং তাঁর রাসূলের মাধ্যমে তাদের সম্পদশালী বানিয়েছেন। মদীনার অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। রাসূলুল্লাহর আগমনের পর একের পর এক যুদ্ধে এই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল, কিন্তু জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ থেকে প্রাপ্ত গনিমতের মাধ্যমে আনসাররা ধনী হয়েছিলেন।

আনসারদের প্রতি আল্লাহ তাআলার আরেকটি বড় অনুগ্রহ হচ্ছে তাদের ঐক্য। আনসারদের আওস ও খাযরাজ গোত্র চিরশত্রু ছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহর মাধ্যমে আল্লাহ এই দুটি গোত্রের অন্তরকে এক করেন। আনসাররা তাদের দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চটা ঢেলে দিয়েছেন। তারা আল্লাহর রাসূলের কঠিন সময়ে তাঁর ওপর ঈমান এনেছেন, তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন, তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সেসব নিয়ে তারা কখনোই গর্ব করেননি, বরং এসবকিছুকে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত হিসেবেই মেনেছিলেন আর আল্লাহর প্রশংসাই করেছেন। তবু কেন তারা আল্লাহর রাসূলের সিদ্ধান্তে প্রথমে কিছুটা দুঃখ পেয়েছিলেন? সত্যি বলতে আনসারদের সবাই নয়, বরং কিছু সাহাবি দুঃখ পেয়েছিলেন। আল্লাহর রাসূল চেয়েছেন কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের নেতাদের মন থেকে ইসলামের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ দূর করে দিতে, যেন তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার একটি কথায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তিনি বলেছিলেন, 'রাসূলুল্লাহ আমাকে গনিমত থেকে দিতেই থাকলেন, দিতেই থাকলেন, যতক্ষণ না তিনি আমার চোখে পৃথিবীর সবচাইতে নিকৃষ্ট মানুষ থেকে সবচেয়ে ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হলেন।' এ প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ আল-গাযযালি একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন, তিনি বলেছেন,

'কিছু লোক সত্যের দিক ধাবিত হয় পেটের চাহিদায়, সত্যান্বেষী মন দিয়ে নয়। গবাদিপশুদের যেমন করে একগুচ্ছ পাতা দেখিয়ে গোলাঘরের দিকে টেনে আনা হয়, তেমনি কিছু লোককে সত্যের দিকে ধাবিত করতে চাইলে কিছু প্রলোভন দেখানোর প্রয়োজন পড়ে।'

আল্লাহর রাসূল জানতেন কাকে কতটুকু দিতে হয়, অথবা কাকে না দিলেও চলে। যেমন তিনি আল-আকরা ও উয়াইনাকে প্রথমে ১০০টা করে উট দিলেন কিন্তু আব্বাস ইবন মিরদাসকে দেন ৫০টি উট। আব্বাসও ছিল অন্যদের মতো গোত্রপ্রধান। স্বভাবতই তিনি মনঃক্ষুণ্ন হলেন। ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করে সে একটি কবিতা আবৃত্তি করে। কবিতার ভাষায় সে বলছিল যে, সে কম পেয়েছে অথচ তাঁর পূর্বপুরুষেরাও অন্য গোত্রগুলোর মতোই লড়াই করে এসেছে।

কবিতার কথাগুলো আল্লাহর রাসূলের কানে আসে। কবিতা শুনে তিনি বললেন, 'ওর জিহবা কেটে ফেলো।' নবীজির কথা শুনে কিছু লোক ভাবলো তিনি আক্ষরিক অর্থেই আব্বাসের জিহবা কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন! আসলে রাসূলুল্লাহ আব্বাসকে আরও ৫০টা উট দেওয়ার কথা বলেছিলেন যাতে তার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। শাফওয়ান ইবন উমাইয়্যাকে তিন দফায় একশো করে দেওয়া হয়েছিল তিনশো উট। হাকিম ইবন হিজামকে দেওয়া হয়েছিল দুইশো উট। আবু সুফিয়ান, তার দুই ছেলে মুআবিয়া এবং ইয়াযিদ -- তাদের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছিল একশো উট আর ছয় কেজি রুপা।

কিন্তু কিছু মানুষকে আল্লাহর রাসূল কিছুই দিলেন না। এমন একজন হলেন আমর ইবন তাঘলিব। রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রশংসায় বলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি যাদেরকে দিচ্ছি না -- তারা আমার কাছে বেশি প্রিয়। কিছু লোককে আমি দিচ্ছি কারণ তাদের অন্তরে আমি সম্পদের লোভ দেখতে পাচ্ছি, আর যাদেরকে দিচ্ছি না তাদের ওপর আমার পুরো আস্থা আছে যে আল্লাহ তাদের যা দিয়েছেন তা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। আমর ইবন তাঘলিব তাদেরই একজন।'

এই কথা আমর ইবন তাঘলিবের মন ভরিয়ে দিল। তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহর এই কথাগুলোকে আমি লাল উটের চেয়ে বেশি পছন্দ করলাম।'

সে যুগে আরবে লাল উট মানে হলো বর্তমানের মার্সিডিজ বেঞ্জ! আমর বোঝালেন, যদি সমস্ত পৃথিবী পরিপূর্ণ করে লাল উট তাঁকে দেওয়া হয়, তবু তার চাইতে মহানবী তাঁকে যেভাবে সম্মানিত করলেন, সেটাই তাঁর কাছে অনেক বেশি দামি!

এভাবেই রাসূলুল্লাহ সাফওয়ানকে গনিমত দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর ভালোবাসা আদায় করলেন আর অন্যদিকে আমরা ইবন তাঘলিবকে না দেওয়ার মাধ্যমে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসা পেলেন। সাফওয়ানের কাছে গনিমতটাই ছিল কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু আমরের জন্য রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে ঈমানের স্বীকৃতিটাই বড়।

রাসূলুল্লাহর সীরাতের দিকে তাকালে দেখা যায় কাকে কী বলতে হবে, কার সাথে কেমন আচরণ করলে লাভ হবে -- এসবের ব্যবস্থাপনায় রাসূলুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে মানুষের মন জয় করার এই বিশেষ ক্ষমতাটি দান করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি মুসলিমদের একটা অভিন্ন উম্মাহ হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছেন।

"যদি আপনি দুনিয়ার সমস্ত সম্পদও ব্যয় করতে, তবু এ মানুষদের অন্তরগুলোর মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার বন্ধন স্থাপন করতে পারতেন না। বরং আল্লাহ তাআলাই এদের মাঝে প্রীতি সঞ্চার করেছেন।” (সূরা আনফাল, ৮:৬৩)

আল্লাহর রাসূল বিভিন্ন গোত্রের নেতাদের মন জয় করার চেষ্টা করেছেন, এর মানে এই নয় যে মুসলিমরা কাফিরদের ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য নিজেদের দ্বীন আর পরিচয় বিকিয়ে দেবে, যেটা এখন হচ্ছে। আজকে ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু ও মুসলিমদের ওপর সর্বাত্মক যুদ্ধ চালানো কাফির নেতৃবৃন্দদের নানাভাবে খুশি করার চেষ্টা করছে একদল মুসলিম। এটা হচ্ছে মূলত পশ্চিমা দেশগুলোতে। সেখানে কিছু মুসলিম ক্রমাগত তাদের ইসলামী মূল্যবোধের ব্যাপারে ছাড় দিয়ে চলেছে। সমাজে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য তারা পশ্চিমা কুফরি আদর্শ ও অনৈতিক মূল্যবোধগুলোকেও স্বীকৃতি দিচ্ছে। কাফিরদের খুশি করার জন্যই তাদের এত পরিশ্রম, তবে এর সবই পণ্ডশ্রম। কারণ, আল্লাহ বলছেন,

"আর ইহুদি ও নাসারারা কখনো আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না আপনি তাদের পথ অনুসরণ করেন।" (সূরা বাকারাহ, ২: ১২০)

আল্লাহর রাসূল যে লোকগুলোর মন জয় করার চেষ্টা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আগে তিনি প্রায় বিশ বছর মতাদর্শিক ও সামরিক যুদ্ধ করে তাদের পরাস্ত করেছেন, কোণঠাসা করেছেন, সর্বস্বান্ত করে ছেড়েছেন। তিনি যতদিন তাদের সাথে যুদ্ধ করেছেন, ততদিন তাদেরকে টাকা দিয়ে বা ছাড় দিয়ে খুশি করার কোনো চেষ্টাই করেননি। কিন্তু যখন তিনি তাদের ওপর ক্ষমতা অর্জন করেছেন আর তারা ক্ষমা চেয়েছে বা পালিয়ে গেছে, তখন তিনি তাদের সুযোগ দিয়েছেন। তিনি চেয়েছেন তারা যেন ইসলামের ছায়াতলে আন্তরিকভাবে চলে আসে। ক্ষমতাসীন কাফিরদের হাতে টাকা-পয়সা তুলে দিয়ে বা তাদের পক্ষে ক্যাম্পেইন করে তাদের মন জয় করা যায় না। কারণ যতদিন তাদের হাতে ক্ষমতা আছে, তাদের ইসলামের কোনো প্রয়োজন নেই। এ অবস্থায় বরং তাদের সাথে দৃঢ়তা দেখানো ও অনমনীয় হওয়াটাই নবীজির পথ。

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 খারিজিদের শেকড়

📄 খারিজিদের শেকড়


কিছু লোকের সম্পদের লোভ তাদেরকে রাসূলুল্লাহর বণ্টনের প্রতি অন্যায্যতার অভিযোগ তোলার দিকে ঠেলে দেয়। বনু তামীম গোত্রের যুলখুয়াইসিরাহ নামের এক লোক এসে বললো, 'এই মুহাম্মাদ, তুমি আল্লাহকে ভয় করো।' রাসূলুল্লাহ কাউকে কম, কাউকে বেশি দিচ্ছিলেন এটা তার পছন্দ হয়নি, সে তাই আল্লাহর রাসূলকে ন্যায়বিচার শিক্ষা দিতে চলে এসেছিল।

রাসূলুল্লাহ বললেন, 'জমিনের সমস্ত মানুষের ওপরে আল্লাহ আমাকে বিশ্বাস করেন, আমি যদি ন্যায়বিচার না করি তবে আর কে করবে?' উমার ইবন খাত্তাব স্বভাবতই খুব ক্ষেপে গেলেন, বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অনুমতি দিন, আমি এর গর্দানটা উড়িয়ে দিই'। রাসূলুল্লাহ বললেন,

'ওকে ছেড়ে দাও। এমন আরও অনেক লোক তুমি দেখবে। তাদের সালাতের তুলনায় তোমার সালাত কিছুই না। তাদের সিয়ামের তুলনায় তোমার সিয়াম কিছুই না। তারা কুরআন পড়বে কিন্তু কুরআন তাদের গলার নিচ দিয়ে নামবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তীর লক্ষ্যভেদ করে বেরিয়ে যায়।'

এখানে রাসূলুল্লাহ এই জাতীয় চরমপন্থী লোকদের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তুলনাটা এমন যে, একজন শক্তিশালী তীরন্দাজ যখন খুব জোরে তীর নিক্ষেপ করে তখন তা লক্ষ্যে আঘাত করে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়, তীরন্দাজ বুঝতেই পারে না আদৌ লক্ষ্যভেদ হয়েছে কি না। এই লোকগুলোর অবস্থা সেই তীরের মতো, তারা ইসলাম থেকে এত দ্রুতগতিতে বেরিয়ে যাবে যেভাবে করে তীরন্দাজের তীর লক্ষ্যভেদ করে বেরিয়ে যায়।

এই লোকগুলো সালাত আদায় করবে, সিয়াম পালন করবে, এবং এদের এসব ইবাদাত ও আমল বাহ্যিক দৃষ্টিতে খুব নজরকাড়া হবে। এমনকি সাহাবিদের আমল তাদের ধারেকাছে যাবে না। তারা কুরআন পড়বে কিন্তু কুরআন তাদের গলা দিয়ে নামবে না অর্থাৎ কুরআন তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে না। কুরআনের আয়াতগুলো তারা কেবল উচ্চারণ করবে মাত্র, জীবনে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করবে না।

ইসলামী পরিভাষায় এদের বলা হয় খারিজী। এরা চরমপন্থা অবলম্বন করে এবং বাড়াবাড়ি করে। আল্লাহর রাসূল অন্য একটি হাদীসে বলেছেন, খারিজীরা হবে মু'মিনদের প্রতি কঠোর আর কাফিরদের প্রতি নমনীয়। এটি খারিজী চিহ্নিত করার মূল সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি যুগের খারিজীদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য ঘুরেফিরে থাকবে। মুসলিমদের জান-মালের কোনো মূল্য তাদের নেই। বরং মুসলিমদের ওপর তারা কুফরির অপবাদ দিয়ে তাদের দেদারসে হত্যা করে। তবে একটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, ইসলামের দৃষ্টিতে চরমপন্থা আর বর্তমান সেকুলার দৃষ্টিতে চরমপন্থা - দুটোর সংজ্ঞা এক নয়। চরমপন্থার সংজ্ঞা আসলে কী -- সেটা মুসলিম আলিমদের থেকে শিখতে হবে, পশ্চিমা বা সেকুলার মিডিয়া থেকে নয়। কারণ ইসলামের যা কিছুতে সেকুলারদের আপত্তি, তার সবকিছুকেই তারা চরমপন্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।

আলীর খিলাফতের যুগে খারিজীদের উত্থানের সময় এমন একটি ঘটনা ঘটে। খাব্বাব ইবন আরাতের ছেলে ইবন খাব্বাব তার স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বের হয়েছেন। পথিমধ্যে খারিজীরা তার পথরোধ করে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো। তার উত্তর তাদের পছন্দ না হওয়ায় তারা তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তার গর্ভবতী স্ত্রীকে মেরে পেট কেটে বাচ্চা বের করে ফেলে। তার কিছু পরেই তারা কিছু খ্রিস্টানদের সম্পদ লুট করলো। কিন্তু যখনই শুনলো সেগুলো খ্রিস্টানদের, সেগুলো তারা সাথে সাথে ফেরত দিয়ে দিলো। ইবন খাব্বাবকে হত্যার পরই আলী ইবন আবি তালিব খারিজীদের সাথে যুদ্ধ শুরু করেন। যেহেতু মুসলিমদের জান-মাল খারিজীদের হাতে নিরাপদ থাকে না, তাই খারিজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কাফিরদের সাথে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ থেকেও প্রাধান্য পায়। খারিজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে মূলধন রক্ষা করার মতো। আর কাফিরদের ভূমিতে আক্রমণ করার উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন। নিশ্চিতভাবেই মুনাফা অর্জনের চেয়ে মূলধন রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই একই নীতি মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদেও প্রযোজ্য, কেননা তারা উম্মাহর অভ্যন্তরীণ শত্রু। কাফিরদের আগ্রাসন প্রতিরোধ করা, মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও খারিজীদের দমন করা -- এদের প্রতিটিই জরুরি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

খারিজীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য তারা ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তবে অত্যাচারী মুসলিম শাসকের যুলুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ইসলামী শরীয়াতে খুরুজ হিসেবে গণ্য করা হয় না। জিহাদ ও খুরুজ-- এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। বর্তমানে যেকোনো প্রকার জিহাদকে খুরুজ তকমা দেওয়ার একটি রেওয়াজ চালু হয়েছে যা নিঃসন্দেহে উম্মাহর জন্য বিভ্রান্তিকর।

ফন্ট সাইজ
15px
17px