📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হুনাইনের যুদ্ধে কিছু ঘটনা

📄 হুনাইনের যুদ্ধে কিছু ঘটনা


১) আবু কাতাদার ঘটনা

ঘটনাটি আবু কাতাদা নিজেই বর্ণনা করেছেন, 'হুনাইনের দিনে আমি দেখলাম দুই সৈনিক লড়াই করছে। একজন মুসলিম, একজন মুশরিক। সেই লড়াইয়ে আরেক মুশরিক তার মুশরিক বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য যোগ দিল। এই দৃশ্য দেখে আমি ছুটে গিয়ে তার হাত কেটে ফেললাম। তখন সে তার আরেক হাত দিয়ে আমার গলা চেপে ধরে। আল্লাহর কসম! সে এত জোরে আমার গলা চেপে ধরে যে, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাবার মতো অবস্থা! কিন্তু সে একসময় (রক্তক্ষরণের কারণে) সে ধপ করে পড়ে গেল। তখন আমি তাকে আরেকবার আঘাত করে হত্যা করলাম। আমি এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আমার জন্য সম্ভব ছিল না। এ অবস্থায় মক্কার কেউ এসে তার জিনিসপত্র তুলে নিল। যুদ্ধ যখন পুরোপুরি শেষ হলো, তখন রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করলেন, 'যুদ্ধের ময়দানে যে যাকে হত্যা করবে, সে-ই হবে তার জিনিসপত্রের মালিক।

তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি এক লোককে হত্যা করেছি। তার অনেক জিনিসপত্র ছিল। কিন্তু আমি তখন খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তাই কে তার জিনিসগুলো উঠিয়ে নিয়েছে তা বলতে পারবো না। তখন মক্কার সেই লোক এসে বললো, সে সত্য বলেছে রাসূলুল্লাহ। আমি-ই সেই জিনিসগুলো নিয়ে এসেছি। আপনি জিনিসগুলো আমাকে দিয়ে দিন। এ কথা শুনে আবু বকর গর্জে উঠে বললেন, 'আল্লাহর কসম! এটা কখনো হতে পারে না! আল্লাহর পথে লড়াই করা সিংহের সম্পদে তুমি ভাগ বসাতে চাও! কক্ষণো না! তার জিনিস তাকে ফিরিয়ে দাও।' তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, আবু বকর ঠিকই বলেছে। ওর প্রাপ্য জিনিস ওকে ফিরিয়ে দাও।

এরপর আমি সাথে সাথে তার কাছ থেকে সবকিছু নিয়ে নিলাম। এরপর সেটা বিক্রি করে খেজুর বাগান কিনলাম। সেটাই ছিল আমার মালিকানাধীন প্রথম সম্পত্তি।'

এ ঘটনা থেকে জানা যায় যে, কোনো মুসলিম যদি কোনো কাফিরকে যুদ্ধের ময়দানে হত্যা করে, তবে ঐ কাফিরের সাথে যা কিছু (ময়দানে) ছিল, সেগুলো সেই মুসলিম লাভ করবে।

২) উম্ম সুলাইমের সাহসিকতা

উম্ম সুলাইম ছিলেন আনসারী সাহাবি আবু তালহার স্ত্রী। যুদ্ধের ময়দানে উম্মু সুলাইমকে দেখা গেল একটা ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। স্বামী আবু তালহা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কী?' উম্ম সুলাইম উত্তর দিলেন, 'কোনো কাফির আমার কাছ দিয়ে গেলে আমি তার পেট চিরে নাড়ি-ভুঁড়ি বের করে ফেলব!' এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ হেসে ফেললেন। উম্ম সুলাইম এরপর বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনাকে ফেলে পালিয়ে যাওয়া তুলাকাদের আমি হত্যা করবো!' রাসূলুল্লাহ তখন তাকে শান্ত করে বললেন, 'মহান আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট।' অর্থাৎ, তুমি চিন্তা কোরো না, আল্লাহ আমাদের বিজয় দিয়েছেন, তাদের হত্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই।

হুনাইনের এই যুদ্ধের সময় উম্ম সুলাইম ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তালহা তখন তার গর্ভে। দুঃখজনক বিষয় হলো, উম্মাহর স্বর্ণযুগে মুসলিম নারীরা যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, বর্তমান সময়ের মুসলিমরা পুরুষরাও সে ধরনের সাহস রাখে না।

৩) এক নারী হত্যার ঘটনা

যুদ্ধের পর দেখা গেল এক দল লোক জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাসূলুল্লাহ তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী হচ্ছে এখানে?' জবাব এল, 'এই মহিলাকে খালিদ ইবন ওয়ালিদ হত্যা করেছেন।' রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, 'এই মহিলা যোদ্ধাদের কেউ নয়। সে তো যুদ্ধ করেনি।' এরপর তিনি খালিদ ইবন ওয়ালিদকে নির্দেশনা দিয়ে পাঠালেন, যেন নারী এবং শিশুদের হত্যা করা না হয়। এই নির্দেশনা ইচ্ছাকৃত হামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

৪) দুরাইদ ইবন আস-সিমার মৃত্যু

রাবিয়া ইবন রুফাই নামে একজন মুসলিম দুরাইদকে পালাবার সময় ধরে ফেললেন। একটা উটের ওপর পালকির ভেতরে তাকে পাওয়া যায়। এসব পালকিতে সাধারণত মহিলারা থাকতো। তিনি দুরাইদকে টেনে বের করে আনেন। দুরাইদ জিজ্ঞেস করলো,

- কী চাস তুই?

- আমি তোকে হত্যা করবো, রাবিয়া উত্তর দিলেন।

- কে তুই?

- আমি রাবিয়া।

এই বলে তিনি তরবারি দিয়ে দুরাইদকে আঘাত করলেন। আঘাতটা তেমন মারাত্মক ছিল না। তাই দেখে দুরাইদ বললো,

- তোর মা মনে হয় তোকে শেখায়নি কীভাবে তলোয়ার চালাতে হয়! তুই যা, ঐ জিন থেকে আমার তরবারি নিয়ে এসে আমাকে আঘাত কর। ঠিক এখানে, এই আমার শিরদাঁড়ার ওপর খুলির নিচে মারবি। আমি এভাবেই মানুষ মারতাম। এরপর যখন তুই তোর মায়ের কাছে ফিরে যাবি, বলবি, আমি দুরাইদ ইবন আস-সিমাহকে হত্যা করেছি। আল্লাহর কসম করে বলছি, তোদের মায়েদেরকে আমি বহুবার যুদ্ধে বাঁচিয়েছি।

দুরাইদ রাবিয়াকে উদ্দেশ্য করে এই কথাগুলো বলার কারণ হলো, রাবিয়া নিজেও হাওয়াযিন গোত্রের সন্তান ছিল। কিন্তু পার্থক্য হলো তিনি ছিলেন মুসলিম আর দুরাইদ কাফির। যা-ই হোক, রাবিয়া এরপর তাকে দুরাইদের কথামতোই আঘাত করলেন। দুরাইদ মারা গেল।

দুরাইদ কেন এমন আচরণ করলো? এ ধরনের আচরণ আমাদের কিছুটা অবাক করতে পারে। তবে এটা ছিল সেই গোত্রীয় যুগের বাস্তবতা। দুরাইদের এ আচরণ এক প্রকারের ঔদ্ধত্য, গোত্রীয় ঔদ্ধত্য। দুরাইদের মতো লোকদের কাছে গোত্রের সম্মান আর গৌরবই ছিল সব। গোত্রের জন্য জীবন, গোত্রের জন্য মরণ। তাই মৃত্যুর আগেও সে বলছিল, আমার মতো লোককে মারতে পারাটা তোমার জন্য এক বিশাল ব্যাপার।

কার তাকদীরে কী আছে তা একমাত্র আল্লাহ আযযা ওয়া জাল ছাড়া কেউই জানে না। কাজেই মুসলিমদের উচিত নিজেদের ঈমানের ব্যাপারে তুষ্ট না হয়ে পড়া, আল্লাহর কাছে সবসময় দ্বীনের উপর অবিচল থাকার জন্য সাহায্য চাওয়া। যে আবু তালিব সারা জীবন আল্লাহর রাসূলকে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন, আগলে রেখেছেন, সে-ই আবু তালিব কাফির হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আবু সুফিয়ান শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে। হুনাইনের যুদ্ধে, হাওয়াযিন গোত্রের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ছিল মালিক ইবন আউফ একাই। সে অভিজ্ঞ দুরাইদের মতকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে নিজের অপরিণত সিদ্ধান্তের উপর অটল ছিল। কিন্তু এই মালিক ইবন আউফ শেষ পর্যন্ত মুসলিম হয়ে যায় আর বিজ্ঞ পরামর্শদাতা দুরাইদ ইবন আস-সিমাহ কাফির হয়ে মৃত্যুবরণ করে।

৫) আনাস ইবন আবি মারসাদের কাহিনী

হুনাইনের যুদ্ধ। হুনাইনের যুদ্ধের আগের রাতের কথা। রাসূলুল্লাহ রাতের বেলা পাহারা দেওয়ার জন্য কাউকে খুঁজছিলেন। আনাস ইবন আবি মারসাদ উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ তাকে পাহারা দেওয়ার জায়গা দেখিয়ে বললেন, 'তোমার অংশ থেকে যেন কোনো আক্রমণ না আসে, সেটা দেখার দায়িত্ব তোমার।' আনাস ইবন আবি মারসাদ তার বাহনে করে পাহাড়ের পাশ ধরে পাহারার স্থানে চলে গেলেন। পরদিন ভোরবেলা, রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কি তোমাদের সওয়ারীকে দেখেছো?' সাহাবিরা বললেন আনাস ইবন আবি মারসাদ এখনো ফিরে আসেননি। ফজরের সালাত শেষ হওয়ার পর দেখা গেল আনাস পাহাড় থেকে নেমে আসছেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি সালাত আদায় আর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া ছাড়া আমার জায়গা থেকে নড়িনি।' আল্লাহর রাসূল খুব খুশি হলেন। তাকে বললেন, 'তুমি তো জান্নাতকে নিজের জন্য অবধারিত করে ফেলেছো। আজকের পর আর কোনো (অতিরিক্ত) ভালো কাজ না করলেও তোমরা চলবে।'

এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে "মহান আল্লাহর পথে যুদ্ধক্ষেত্রে পাহারা দেওয়ার ফযিলত” শিরোনামে। আনাস ইবন আবি মারসাদ আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এজন্য আল্লাহর রাসূল তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। এটা বলে দেয় যে, আল্লাহর পথে পাহারা দেওয়া কত বড় একটি ইবাদাত। এই ঘটনা থেকে আরেকটি শিক্ষা হলো, প্রত্যেক সাহাবিকে আল্লাহর রাসূল আলাদা আলাদাভাবে কদর করতেন। ফজরের সালাতের সময়ে তিনি আনাসের খোঁজ নিয়েছেন। ফিরে এসেছেন কি না জানতে চেয়েছেন এবং সবশেষে তার গুরুত্বপূর্ণ আমলের জন্য তাকে আখিরাতে পুরষ্কারের সুসংবাদ দিয়েছেন।

৬) রাসূলুল্লাহর দুধ বোন শায়মার কাহিনী

আশ-শায়মা বিনত আল-হারিস ছিলেন রাসূলুল্লাহর দুধ মা হালিমা আস- সাদিয়্যার কন্যা। সে হিসেবে শায়মা ছিলেন আল্লাহর রাসূলের দুধ বোন। বনু সাদ ইবন বকর হুনাইনের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। শায়মা ছিলেন সেই গোত্রের। যুদ্ধের পর তিনি বন্দী হলেন। তাকে বাজারে নেওয়ার পথে তিনি বললেন, 'তোমরা কি জানো না আমি তোমাদের সাথীর (আল্লাহর রাসূলের) দুধবোন?' সাহাবিরা ঠিক নিশ্চিত ছিলেন না শায়মা সত্য বলছেন কি না। তাই তারা শায়মাকে আল্লাহর রাসূলের কাছে নিয়ে গেলেন।

স্বাভাবিকভাবে আল্লাহর রাসূল নিজেও শায়মাকে চিনতে পারছিলেন না। কারণ শায়মার সাথে তিনি একসাথে বড় হয়েছেন প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। তিনি শায়মাকে তার দাবি প্রমাণ করতে বললেন। শায়মা বললেন, 'তুমি যখন ছোট ছিলে, একবার আমি তোমাকে কোলে নিয়েছিলাম আর তুমি আমার পিঠে কামড় দিয়েছিলে। সেই দাগ এখনো আছে।' রাসূলুল্লাহ তখন নিশ্চিত হলেন এটা আসলেই তার বোন। তিনি দুধবোনের সম্মানে নিজের গায়ের চাদর খুলে বিছিয়ে দিলেন, শায়মাকে সেখানে বসতে বললেন। তারপর বললেন, 'তুমি চাইলে ইসলাম গ্রহণ করে এখানে থেকে যেতে পারো। তাহলে অনেক আদর আর ভালোবাসা পাবে। অথবা তুমি চাইলে তোমরা গোত্রের কাছেও ফিরে যেতে পারো।' শায়মা নিজ গোত্রের কাছেই ফিরে যেতে চাইলেন। আল্লাহর রাসূল তার দুধবোনকে একজন দাসী, তিনজন দাস এবং বেশকিছু উট আর ভেড়া উপহার দিলেন। শায়মা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তবে তিনি তার গোত্রের সাথেই থেকে যান।

টিকাঃ
১১০. সুনান আবু দাউদ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৫।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 তায়েফের অবরোধ

📄 তায়েফের অবরোধ


যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে হাওয়াযিনের সৈন্যরা তাইফে পালিয়ে যায়। তাদের কেউ চলে যায় নাখলায়, কেউ চলে যায় আওতাসে। আল্লাহর রাসূল এদের ধাওয়া করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তাঁর সেনাবাহিনীকে কয়েকভাগে বিভক্ত করে বিভিন্ন দিকে পাঠান। মূল অংশ রওনা হয় তাইফের উদ্দেশ্যে। মালিক ইবন আউফ আন নাসরি তার সৈনিকদেরসহ সেখানে আশ্রয় নিয়ে তাইফের দুর্গগুলোর প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। আরেকটি দল অগ্রসর হয় আওতাসের দিকে। সে দলের নেতৃত্বে ছিলেন আবু মূসা আল আশআরীর চাচা আবু আমীর আল আশআরী। এগুলো ছিল একেকটি সারিয়াহ।

আওতাসে অভিযানের এক পর্যায়ে আবু আমীর হাঁটুতে আঘাত পান। ভাতিজা আবু মূসা আল আশআরী এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'চাচাজান! কে আপনার ওপর তীর ছুঁড়েছে?' আবু আমীর ইশারার মাধ্যমে এক লোককে দেখিয়ে বললেন, 'ঐ লোকটা আমার দিকে তীর মেরেছে।' আবু মূসা তার পিছু নিলেন। আবু মূসাকে দেখে সে লোকটা পালাতে লাগলো। আবু মূসা তাকে বলছিলেন, 'লজ্জা হয় না তোর? তুই কি লড়বি না? পালাবি নাকি? তোর মধ্যে কি পুরুষত্ব নেই?' কথাগুলো তার খুব গায়ে লাগলো। সে লড়াই করার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। আবু মূসা লড়াইয়ে তাকে হারিয়ে দিলেন এবং তাকে হত্যা করলেন। এরপর আবু মূসা তার চাচার দিকে ফিরে বললেন, 'চাচাজান! আমি আপনার আঘাতকারীকে হত্যা করেছি।' তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, এবার তুমি আমার হাঁটু থেকে তীরটা বের করে দাও。'

তীরটি বের করা হলো কিন্তু রক্তক্ষরণ বেড়ে গেল। আবু আমীরের মনে হলো তিনি হয়তো আর বাঁচবেন না। আবু মূসাকে বললেন, 'ভাতিজা, তুমি নবীজিকে আমার সালাম জানাবে আর আমার মাগফিরাতের জন্য দুআ করতে বলবে।' আবু মূসা আল আশআরী রাসূলুল্লাহর কাছে পুরো ঘটনাটি বললেন। সব শুনে রাসূলুল্লাহ অযু করলেন। তারপর দু'হাত উঁচু করে দুআ করলেন,

'হে আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দা আবু আমীরকে ক্ষমা করো। হে আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দা আবু আমীরের গুনাহগুলো মাফ করে দাও। ক্বিয়ামত দিবসে তোমার মাখলুকের মধ্যে অনেক মানুষের উপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করো।'

এটা ছিল একজন শহীদ মুজাহিদের জন্য আল্লাহর রাসূলের দুআ। এই দুআ শুনে আবু মূসা আল-আশআরী অভিভূত হয়ে যান। তিনি আল্লাহর রাসূলকে তার নিজের জন্যও দুআ করার অনুরোধ করেন। আল্লাহর রাসূল তখন আবু মূসার জন্য দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! আবদুল্লাহ ইবনু কায়সের (আবু মূসা) গুনাহ ক্ষমা করে দাও এবং কিয়ামাত দিবসে তুমি তাঁকে সম্মানিত স্থানে প্রবেশ করাও।'

আবু আমীরের জন্য আল্লাহর রাসূল যে দুআটি করেছিলেন সেই দুআ একজন মানুষের জীবনে শ্রেষ্ঠ পাওয়া। তা হলো ক্বিয়ামত দিবসে উচ্চ মর্যাদা লাভ করা। বেশিরভাগ মানুষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচার দিবসের কথা ভুলে যায় আর দুনিয়ায় নিজের অবস্থান পাবার জন্য মরিয়া হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে সেই বেদুইনের দুআটি উল্লেখ না করলেই না নয়। এই দুআটি স্বয়ং আল্লাহর রাসূল খুব পছন্দ করেছিলেন। দুআটি হলো,

'ইয়া আল্লাহ! আমার জীবনের উত্তম অংশটি যেন জীবনের শেষ অংশ হয়। আমার শেষ আমলটি যেন আমার জীবনের সর্বোত্তম আমল হয়। আর আমার জীবনের সর্বোত্তম দিন যেন আপনার সাথে আমার দেখা হওয়ার দিনটি হয়।'

মূল বাহিনী অগ্রসর হয় তাইফের দিকে। আল্লাহর রাসূল তাইফ অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই অবরোধে ইসলামের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো 'মিনযানিক' নিক্ষেপ করা হয়। এই মিনযানিক ছিল এক প্রকারের গুলতি। এটি দিয়ে তাইফের দেওয়ালে সজোরে পাথর নিক্ষেপ করা হতো। এই গুলতি যখন আঘাত হানতো, তখন সেটা দুর্গের ভেতর ঠিক কোথায় আঘাত হানছে সেটা বোঝার উপায় ছিল না। তখনকার দুর্গগুলো ছিল বিশাল। দুর্গের দেওয়ালের ভেতরে পুরো একটা শহর। কাজেই এই গুলতিগুলো শহরের ভেতরে বাজার, রাস্তা কিংবা ঘর-বাড়ি যে কোনো স্থানে পতিত হবার সম্ভাবনা ছিল।

এই ধরনের হামলার কারণে 'কোল্যাটারাল ড্যামেজ' বা অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা থেকে যায়। যেমন, এই ধরনের হামলায় নিক্ষিপ্ত গোলা নারী ও শিশুদের ওপর আঘাত হানতে পারে। যদিও তাদের হত্যা করা নিক্ষেপকারীর লক্ষ্য ছিল না। কারণ এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ঠিক কোথায় গিয়ে আঘাত হানবে এটা জানা সম্ভব হয় না। এটা ঠিক তীরের মতো নয় যেখানে তীর কোন লক্ষ্যে আঘাত হানবে সেটা তীরন্দাজ জানে। নির্বিচারে গোলা নিক্ষেপের এই পদ্ধতি বায়াত নামে পরিচিত। তাইফে যখন রাতের অন্ধকারে বায়াত হামলা করা হচ্ছিল, তখন মুশরিকদের নারী ও শিশুরা মারা পড়ছিল। তখন আল্লাহর রাসূলকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাব দিলেন, 'তারা তাদের মধ্য থেকেই।' অর্থাৎ, এই ব্যাপারে মুশরিক নারী ও শিশুদের ব্যাপারে হুকুম পুরুষদের মতোই প্রযোজ্য হবে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে নিশানা করে জিহাদে কাফির নারী ও শিশু হত্যা করা যাবে না, এটাই সাধারণ হুকুম।

টিকাঃ
১১১. ইবন মাজাহ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৯৪৭ (আরবি রেফারেন্স)।
১১২. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস, ৩০,৩১।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 অবরোধ প্রত্যাহার

📄 অবরোধ প্রত্যাহার


এই ধরনের হামলা চালানো সত্ত্বেও তাইফবাসী হাল ছেড়ে দেয়নি। তাদের তীরন্দাজরা দেওয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে তীর ছুঁড়ে যাচ্ছিল আর তাদের তীরের আঘাতে অনেক মুসলিম আহত হচ্ছিলেন। তাই মুসলিম বাহিনীকে তীরের সীমা থেকে বের হয়ে পেছনে চলে আসতে হয়। সাহাবিরা এই অবরোধে 'দাব্বাবাহ' ব্যবহার করলেন। এটা ছিল একটা কাঠের তৈরি কাঠামো। এর ভিতরে কয়েকজন সাহাবি প্রবেশ করতেন। এটা তীরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিত। এটাকে ব্যবহার করে তারা দেওয়ালের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাইফবাসী দাব্বাবার বিরুদ্ধে অপর একটি অস্ত্র ব্যবহার করল। তারা আগুনে উত্তপ্ত করা কাঁটাযুক্ত লোহার টুকরা দাব্বাবার দিকে ছুঁড়ে দেয় ফলে দাব্বাবার ভেতর থেকে সাহাবিরা বের হয়ে আসতে বাধ্য হন। দাব্বাবাহ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাইফবাসীর ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করার জন্য রাসূলুল্লাহ আঙ্গুরের গাছগুলো কেটে পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দেন। এই কৌশলে কাজ হয়। তাইফের লোকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এই গাছগুলো ছিল তাদের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। তখন তারা আল্লাহর রাসূলকে আত্মীয়তার সম্পর্কের দোহাই দিয়ে অনুরোধ করে যেন তিনি তাদের গাছ পোড়ানো বন্ধ করে। আল্লাহর রাসূল তাদের অনুরোধ রাখেন।

শত্রুদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য নবীজি আরও একটি কাজ করেন। তিনি তাইফের দাসদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেন, যদি তারা দুর্গ ছেড়ে বের হয়ে আসে, তাহলে তাদের স্বাধীন করে দেওয়া হবে। এই ঘোষণা শুনে তেইশ জন দাস বের হয়ে আসে। তাদের মুক্ত করে দেওয়া হয়।

অবরোধ পনেরো দিন পর্যন্ত স্থায়ী হলো। কিন্তু তাইফের অধিবাসীদের মধ্যে আত্মসমর্পণ করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। রাসূলুল্লাহ তখন নাওফাল ইবন মুওয়াবিয়াহ আদ-দাইলির সাথে পরামর্শ করলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'অবরোধ চালিয়ে যাবার ব্যাপারে তোমার মতামত কী?' নাওফাল বললেন, 'এদের অবস্থা এখন গর্তে লুকিয়ে থাকা শিয়ালের মতো। আপনি যদি অবরোধ চালিয়ে যান, আজ হোক, কাল হোক, আপনি জয়ী হবেন। তবে তাদের ছেড়ে দিলেও তারা আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।' কারণ, তাইফের চারপাশে প্রায় সবগোত্র ততদিনে ইসলাম গ্রহণ করে ফেলেছে। তাই তাইফ মুসলিমদের জন্য আর কোনো হুমকি নয়। নবীজি তার উপদেশ গ্রহণ করলেন। উমারকে বললেন যেন সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা ফিরে যাবেন।

এই ঘোষণা সাহাবিদের অনেকের মনঃপূত হলো না। তারা তাইফ জয় না করে ফিরে যাবেন এটা মানতে পারছিলেন না। তারা বললো, 'রাসূলুল্লাহ! আমরা বিজয় ছাড়াই ফিরে যাবো?' রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, 'ঠিক আছে, তাহলে যুদ্ধ চালিয়ে যাও।' পরদিন তারা লড়াইয়ের জন্য বের হলেন। বেশ কিছু সাহাবি আহত হলেন। তারা বুঝতে পারলেন এই দুর্গ ভেদ করা সহজ হবে না, যেমনটা তারা ভেবেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সেদিন আবার বললেন, 'ইনশা আল্লাহ, আগামীকাল আমরা এখান থেকে ফিরে যাবো।' এবার আর সাহাবিরা প্রতিবাদ করলেন না, বরং তারা সেটাই চাচ্ছিলেন। তাদের নীরবতা দেখে রাসূলুল্লাহ কিছুই বললেন না, হাসলেন শুধু। তাইফ থেকে বের হয়ে এসে আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমরা বলো: আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদাতকারী এবং রবের প্রশংসাকারী।' সাহাবিদের কেউ বললেন, 'আপনি সাকিফদের বিরুদ্ধে দুআ করুন।' আল্লাহর রাসূল সাকিফদের বিরুদ্ধে বদদুআ না করে তাদের হিদায়াতের জন্য দুআ করলেন। বললেন, 'হে আল্লাহ! সাকিফকে পথ দেখাও, তাদের সত্যের পথে চালিত করো।' আল্লাহর রাসূলের এই দুআ কবুল হয়েছিল। হিজরী ৯ম বর্ষে তারা নিজ থেকে এসে ইসলাম গ্রহণ করে।

তাইফ ছিল আরবদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ গাযওয়া। এই যুদ্ধের পর মুসলিমদের সামনে নতুন এক প্রতিপক্ষ দাঁড়ায়। রোমান সাম্রাজ্য। রোমানদের বিরুদ্ধে এর পর তাবুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হুনাইনের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা

📄 হুনাইনের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা


১) যাত-আনওয়াতের ঘটনা

অভিযানে যাওয়ার পথে মুসলিমরা একটা বিশাল গাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। জাহিলিয়াতের যুগে মুশরিকরা এই গাছের উদ্দেশ্যে তীর্থযাত্রা করতো এবং বরকত ও মঙ্গল লাভের আশায় তাদের তরবারি এই গাছে ঝুলিয়ে রাখত। এই অভিযানে মুসলিম সেনাবাহিনীতে অনেক নতুন মুসলিম ছিল। সবার তাওহীদের সঠিক বুঝ ছিল না। তারা রাসূলুল্লাহকে অনুরোধ করলো, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাদেরকেও এরকম একটি গাছ নির্ধারণ করে দিন যেমনটা মুশরিকদের আছে।' রাসূলুল্লাহ বললেন,

'আল্লাহু আকবার! তোমরা এমন এক কথা বলেছো যা মূসার জাতি মূসাকে বলেছিল! তারা বলেছিল, হে মুসা, তাদের যেমন উপাস্য আছে আমাদের জন্য তেমনি উপাস্য নির্ধারণ করে দাও। সে বলেছিল, তোমরা একটি মূর্খ সম্প্রদায়। নিশ্চয়ই তোমরাও আগের জাতিগুলোকে একে একে অনুসরণ করবে।'

অর্থাৎ বনী ইসরাঈলের মতো এই উম্মতের মধ্যেও কিছু লোক কাফিরদের অনুসরণ করবে। তবে পার্থক্য হলো বনী ইসরাঈল জাতির পথভ্রষ্টতা ছিল ব্যাপক। তাদের ভালোর চাইতে খারাপটাই ছিল প্রকট। একারণে তাদের পুরো দ্বীনই একসময় বিকৃত হয়ে হারিয়ে যায়। কিন্তু নবী মুহাম্মাদের উম্মতে সবসময় কিছু হকপন্থী বান্দা থাকবে। তারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং দ্বীনের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত অটল ও অবিচল থাকবে।

এই ঘটনা থেকে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ আক্বীদাহ জিহাদে অংশ নেওয়ার পূর্বশর্ত নয়। এখানে নও মুসলিমরা খুবই অদ্ভুত এবং অগ্রহণযোগ্য একটা আবদার করেছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাদেরকে সেজন্য বের করে দেননি, বরং তিনি তাদের ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন। তারা ছিল নওমুসলিম, তাদের ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার অভাব ছিল। কিন্তু একারণে তাদের জিহাদে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়নি। কারণ জিহাদ একটা ইবাদাত, এর জন্য পুরস্কার আছে। আর জিহাদ শুধু যুদ্ধ করাই নয়, বরং তারবিয়াহ চর্চার জন্য একটি উপযুক্ত স্থানও হলো জিহাদ। এর মাধ্যমেও ইলম অর্জন, আত্মশুদ্ধির চর্চা হয়।

২) সংখ্যা বা শক্তি নয়, ভরসা কেবল আল্লাহর ওপর

"অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু জায়গায় এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি। আর যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।” (সূরা তাওবা, ৯: ২৫)

যদি মুসলিমরা মনে করে যে, সংখ্যাধিক্য তাদের বিজয় এনে দেবে, সামরিক শক্তি আর প্রযুক্তি তাদের বিজয় এনে দেবে, যদি তারা ভাবে যে, শুধু অস্ত্রের জোরে উম্মাহ বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবে, তাহলে মুসলিমরা ভুলের রাজ্যে আছে। এটাই হুনাইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিজয় আসে আল্লাহ আযযা ওয়াজালের পক্ষ থেকে। আর বাকি সবকিছুই উপকরণমাত্র। উপকরণ কখনো আমাদের বিজয় এনে দেয় না। এটাই হলো আল্লাহ আযযা ওয়াজালের ওপর আমাদের ঈমান, আমাদের ভরসা, আমাদের নির্ভরশীলতা।

৩) আল্লাহর রাস্তায় তীর ছোঁড়ার পুরস্কার

আল্লাহর রাস্তায় তীর ছোঁড়ার ফযিলতের ব্যাপারে একটি হাদীস আছে। এটি বর্ণনা করেছেন আবু নাজিহ আস-সুলামি। তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি যে, যদি কেউ আল্লাহর রাস্তায় তীর ছোঁড়ে আর সেই তীর লক্ষ্যভেদ করে, তাহলে জান্নাতে তার মর্যাদা এক স্তরে উঁচুতে উন্নীত হবে। সেদিন আমি ষোলোটা তীর ছুঁড়েছি। এর প্রত্যেকটা লক্ষ্যভেদ করেছিল। আল্লাহর রাসূলকে আমি এও বলতে শুনেছি, যে আল্লাহর রাস্তায় একটা তীর ছোঁড়ে, সে একটি দাস আযাদ করার পুরস্কার লাভ করবে। তীরের হাদীসটি তাইফের অবরোধের সাথে সম্পর্কিত হলেও আধুনিক যুগের জিহাদে তীরের সমতুল্য অস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

টিকাঃ
১১৩. সুনান আন-নাসাঈ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px