📄 ময়দানে মুখোমুখি দুই দল
সেদিনের আবহাওয়া ছিল খুবই উত্তপ্ত আর শুষ্ক। মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী অগ্রসর হলো। তারা হুনাইনের উপত্যকা ধরে এগোতে লাগলেন। পাহাড় দিয়ে সোজা সামনে এগোনোর সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করে চারদিক থেকে শুরু হলো তীরবৃষ্টি। এরপর হাওয়াযিনের অশ্বারোহীরা মুসলিমদের ওপর হামলা চালায়। উপর্যুপরি অতর্কিত হামলায় মুসলিম সেনারা পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। দিশেহারা মুসলিম সেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে চারপাশে পালাতে থাকে। যুদ্ধের প্রথম ধাক্কায় মালিক ইবন আউফের পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়।
তার পরিকল্পনা ছিল প্রতিটি গিরিপথ, গোপন আর সংকীর্ণ স্থানে ওঁৎ পেতে থাকা আর মুসলিম বাহিনী সেই গিরিপথে এলেই তাদের ওপর আচমকা আক্রমণ করা। আক্রমণ পরিচালিত হবে দুটি ফ্রন্টে -- পাহাড়ের দুই পাশ থেকে তীর ছোঁড়া হবে আর এরপর মূল সেনাবাহিনী মুসলিমদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ হানবে। মুসলিমদের ধারণাই ছিল না হাওয়াযিনের সৈনিকরা এভাবে লুকিয়ে আছে। হাওয়াযিনের বাহিনী ছিল সুশৃঙ্খল। প্রথমে ছিল সওয়ারীদের সারি, তারপর পদাতিক সৈনিকদের সারি, তারপর মহিলাদের সারি, তার পেছনে ছিল পশুপাল। তাদের দক্ষ তীরন্দাজ ছিল। তার ওপর অশ্বারোহী হাওয়াযিন সেনারা মুসলিমদের ওপর কঠিন হামলা চালায়। মুসলিম সেনাবাহিনীর সামনের দিকে ছিল বনু সুলাইম গোত্রের সেনাদল। আকস্মিক হামলার তীব্রতা ও ভয়াবহতা সামাল দিতে না পেরে তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানো শুরু করল। তাদের পেছনে ছিল আত-তুলাকা। তারা মাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছে। তারাও যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পিছু হটতে লাগলো। উটগুলো পালাতে গিয়ে একটার পর আরেকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এই হামলা এতটাই আচমকা আর তীব্র ছিল যে মুসলিমদের সেরা পদাতিক সৈন্য সালামা ইবন আল-আকওয়াও ময়দান ছেড়ে পালাতে থাকেন। মুসলিম বাহিনী পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে গেল। এভাবে দেখতে দেখতে প্রায় সবাই উধাও হয়ে গেল। ময়দানে টিকে থাকলেন অল্প কিছু মানুষ। আল্লাহর রাসূল , কিছু মুহাজির, আনসার এবং আহলে বাইতের লোকেরা।
“অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু জায়গায় এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি। আর জমিন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।” (সূরা তাওবা, ৯: ২৫)
মুসলিম বাহিনীর এই বিপর্যয়ে দুর্বল ঈমানের মুসলিমরা যেন প্রায় ঈমানহারা হয়ে গেল। আবু সুফিয়ান এই অবস্থা দেখে বলে উঠলেন, 'এরা তো পালাতে পালাতে সমুদ্রের পাড় পর্যন্ত পৌঁছে যাবে!' সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার ভাই বলে ওঠে, 'জাদুর কেরামতি আজ শেষ! মুহাম্মদের জাদু আর কাজ করছে না!' এ কথা শুনে সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা ক্ষেপে গেল, 'থাম তুই! আল্লাহ তোর মুখ ভেঙে দিক! আল্লাহর কসম, আমি একজন কুরাইশের কর্তৃত্ব মেনে নিতে রাজি আছি, কিন্তু কোনো হাওয়াযিনের কর্তৃত্ব মানতে রাজি নই!'
এদিকে রাসূলুল্লাহ অবিচলভাবে ময়দানে দাঁড়িয়ে। তিনি সবাইকে ডাকছেন আর বলছেন, 'লোকেরা তোমরা কোথায় যাচ্ছো? আমার দিকে এসো, আমি মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ, আল্লাহর রাসূল!'
কিন্তু কেউ তাঁর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না। সবাই শত্রুদের আক্রমণের ধাক্কায় পড়িমড়ি করে ছুটছে। আল্লাহর রাসূল তবু সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে 'আমি আল্লাহর নবী! আমি মিথ্যাবাদী নই! আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান!' এ সময়টাতে তাঁর সাথে ছিলেন চাচা আব্বাস, আবু সুফিয়ান ইবন আল-হারিস এবং অল্প কিছু মুহাজির ও কুরাইশ। আল্লাহর রাসূল আব্বাসকে বললেন, 'আব্বাস, সামুরার লোকদের ডাক দাও!' সামুরাহ হচ্ছে বাইয়াতুর রিদওয়ানে উপস্থিত সাহাবিদের দল। আব্বাস চিৎকার করে বাইয়াতুর রিদওয়ানের সাহাবিদের ডাকলেন - সেরা সব সাহাবি। তার আহবানের সাথে সাথে তারা যেন তীরের বেগে ময়দানে ফিরে এল। আর বলতে লাগলেন, 'আমরা এসেছি! আমরা এসেছি!'
এরপর বিশেষভাবে আনসারদের আহবান করা হলো। এরপর বিশেষভাবে ডাকা হলো খাযরাজদের। ডাকা হলো হলো একে একে সবগুলো গোত্রকে। মুসলিমদের অনেকেই প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ময়দানে ফিরে এল। রাসূলুল্লাহর চারপাশে জড়ো হলেন প্রায় একশো সাহাবি। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হলো। আল্লাহর রাসূল এবার ময়দানের দিকে দৃষ্টি মেলে বললেন, 'এবার ঠিকই জ্বলেছে যুদ্ধের অগ্নিশিখা!'
আল্লাহর রাসূল এক মুঠো ধুলো তুলে মুশরিকদের দিকে নিক্ষেপ করলেন, বললেন, 'মুহাম্মাদের রবের শপথ! তোরা ধ্বংস হ!' এই ধুলো শত্রুবাহিনীর প্রত্যেকের চোখে গিয়ে পড়ে। এর পর তীরন্দাজরা আর মুসলিমদের ওপর তীর ছুঁড়তেই পারেনি। এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মু'জিযা। এরপরই যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে লাগলো।
"তারপর আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাযিল করলেন তাঁর রাসূলের ওপর ও মু'মিনদের ওপর এবং নাযিল করলেন এমন সৈন্যবাহিনী যাদেরকে তোমরা দেখনি, আর কাফিরদেরকে আযাব দিলেন। আর এটা কাফিরদের কর্মফল।” (সূরা তাওবা, ৯: ২৬)
আল্লাহর এই সৈন্য ছিল ফেরেশতা। জুবাইর ইবন মুতইম বলেন, 'আমরা আকাশে কালো মেঘ দেখতে পেলাম। এরপর যখন তা মাটিতে নেমে এল, আমরা দেখলাম অগণিত পিপড়া! এ যেন পিপড়ার গালিচা! আর আমরা মনে করলাম এটাই হলো আল্লাহর সৈন্য।' আল্লাহর রাসূল যখন মুশরিকদের ওপর ধুলো নিক্ষেপ করেছিলেন, তা তাদের অন্তরে প্রবল ত্রাস আর আতঙ্কের জন্ম দেয়। আর মু'মিনদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা ঢেলে দিলেন প্রশান্তি বা সাকিনাহ। বদরের যুদ্ধেও এমনটা হয়েছিল। আল্লাহ যদি চান, যুদ্ধক্ষেত্রের অস্থির পরিস্থিতিতেও তাঁর বান্দাদের মনে প্রশান্তি ঢেলে দিতে পারেন। এই প্রশান্তি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মু'মিনদের জন্য সাহায্য।
এই সাহায্য আসার পরেই যুদ্ধের পরিস্থিতি বদলে যায়। মুসলিমরা ময়দানে ফিরে আসলে হাওয়াযিনরা আর কোনো পাল্টা আক্রমণ করা দূরে থাক, কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি। বরং তারা ময়দান ছেড়ে পালাতে শুরু করে। সম্ভবত এর কারণ হলো অনভিজ্ঞ মালিক ইবন আউফের আর কোনো বিকল্প পরিকল্পনা ছিল না। একটিমাত্র কৌশলকে পুঁজি করে তার বাহিনী এই যুদ্ধে অংশ নেয়। প্রাথমিকভাবে তাদের এই কৌশল কাজে লাগলেও যখন মুসলিমরা ঘুরে দাঁড়ালো, তখন তাদের কৌশলগত দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যায়। ফলে তারা হেরে যেতে থাকে।
যে অল্প কয়েকজন সাহাবি রাসূলুল্লাহর সাথে থেকে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন আবু বকর, উমার ইবন খাত্তাব, আলী ইবন আবি তালিব, আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব, তাঁর ছেলে ফাযল ইবন আব্বাস, আবু সুফিয়ান ইবন হারিস, রাবিয়া ইবন হারিস, উম্ম আয়মানের ছেলে আয়মান ইবন আবদুল্লাহ প্রমুখ।
📄 হুনাইনের যুদ্ধে কিছু ঘটনা
১) আবু কাতাদার ঘটনা
ঘটনাটি আবু কাতাদা নিজেই বর্ণনা করেছেন, 'হুনাইনের দিনে আমি দেখলাম দুই সৈনিক লড়াই করছে। একজন মুসলিম, একজন মুশরিক। সেই লড়াইয়ে আরেক মুশরিক তার মুশরিক বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য যোগ দিল। এই দৃশ্য দেখে আমি ছুটে গিয়ে তার হাত কেটে ফেললাম। তখন সে তার আরেক হাত দিয়ে আমার গলা চেপে ধরে। আল্লাহর কসম! সে এত জোরে আমার গলা চেপে ধরে যে, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাবার মতো অবস্থা! কিন্তু সে একসময় (রক্তক্ষরণের কারণে) সে ধপ করে পড়ে গেল। তখন আমি তাকে আরেকবার আঘাত করে হত্যা করলাম। আমি এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আমার জন্য সম্ভব ছিল না। এ অবস্থায় মক্কার কেউ এসে তার জিনিসপত্র তুলে নিল। যুদ্ধ যখন পুরোপুরি শেষ হলো, তখন রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করলেন, 'যুদ্ধের ময়দানে যে যাকে হত্যা করবে, সে-ই হবে তার জিনিসপত্রের মালিক।
তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি এক লোককে হত্যা করেছি। তার অনেক জিনিসপত্র ছিল। কিন্তু আমি তখন খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তাই কে তার জিনিসগুলো উঠিয়ে নিয়েছে তা বলতে পারবো না। তখন মক্কার সেই লোক এসে বললো, সে সত্য বলেছে রাসূলুল্লাহ। আমি-ই সেই জিনিসগুলো নিয়ে এসেছি। আপনি জিনিসগুলো আমাকে দিয়ে দিন। এ কথা শুনে আবু বকর গর্জে উঠে বললেন, 'আল্লাহর কসম! এটা কখনো হতে পারে না! আল্লাহর পথে লড়াই করা সিংহের সম্পদে তুমি ভাগ বসাতে চাও! কক্ষণো না! তার জিনিস তাকে ফিরিয়ে দাও।' তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, আবু বকর ঠিকই বলেছে। ওর প্রাপ্য জিনিস ওকে ফিরিয়ে দাও।
এরপর আমি সাথে সাথে তার কাছ থেকে সবকিছু নিয়ে নিলাম। এরপর সেটা বিক্রি করে খেজুর বাগান কিনলাম। সেটাই ছিল আমার মালিকানাধীন প্রথম সম্পত্তি।'
এ ঘটনা থেকে জানা যায় যে, কোনো মুসলিম যদি কোনো কাফিরকে যুদ্ধের ময়দানে হত্যা করে, তবে ঐ কাফিরের সাথে যা কিছু (ময়দানে) ছিল, সেগুলো সেই মুসলিম লাভ করবে।
২) উম্ম সুলাইমের সাহসিকতা
উম্ম সুলাইম ছিলেন আনসারী সাহাবি আবু তালহার স্ত্রী। যুদ্ধের ময়দানে উম্মু সুলাইমকে দেখা গেল একটা ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। স্বামী আবু তালহা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কী?' উম্ম সুলাইম উত্তর দিলেন, 'কোনো কাফির আমার কাছ দিয়ে গেলে আমি তার পেট চিরে নাড়ি-ভুঁড়ি বের করে ফেলব!' এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ হেসে ফেললেন। উম্ম সুলাইম এরপর বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনাকে ফেলে পালিয়ে যাওয়া তুলাকাদের আমি হত্যা করবো!' রাসূলুল্লাহ তখন তাকে শান্ত করে বললেন, 'মহান আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট।' অর্থাৎ, তুমি চিন্তা কোরো না, আল্লাহ আমাদের বিজয় দিয়েছেন, তাদের হত্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
হুনাইনের এই যুদ্ধের সময় উম্ম সুলাইম ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তালহা তখন তার গর্ভে। দুঃখজনক বিষয় হলো, উম্মাহর স্বর্ণযুগে মুসলিম নারীরা যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, বর্তমান সময়ের মুসলিমরা পুরুষরাও সে ধরনের সাহস রাখে না।
৩) এক নারী হত্যার ঘটনা
যুদ্ধের পর দেখা গেল এক দল লোক জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাসূলুল্লাহ তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী হচ্ছে এখানে?' জবাব এল, 'এই মহিলাকে খালিদ ইবন ওয়ালিদ হত্যা করেছেন।' রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, 'এই মহিলা যোদ্ধাদের কেউ নয়। সে তো যুদ্ধ করেনি।' এরপর তিনি খালিদ ইবন ওয়ালিদকে নির্দেশনা দিয়ে পাঠালেন, যেন নারী এবং শিশুদের হত্যা করা না হয়। এই নির্দেশনা ইচ্ছাকৃত হামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
৪) দুরাইদ ইবন আস-সিমার মৃত্যু
রাবিয়া ইবন রুফাই নামে একজন মুসলিম দুরাইদকে পালাবার সময় ধরে ফেললেন। একটা উটের ওপর পালকির ভেতরে তাকে পাওয়া যায়। এসব পালকিতে সাধারণত মহিলারা থাকতো। তিনি দুরাইদকে টেনে বের করে আনেন। দুরাইদ জিজ্ঞেস করলো,
- কী চাস তুই?
- আমি তোকে হত্যা করবো, রাবিয়া উত্তর দিলেন।
- কে তুই?
- আমি রাবিয়া।
এই বলে তিনি তরবারি দিয়ে দুরাইদকে আঘাত করলেন। আঘাতটা তেমন মারাত্মক ছিল না। তাই দেখে দুরাইদ বললো,
- তোর মা মনে হয় তোকে শেখায়নি কীভাবে তলোয়ার চালাতে হয়! তুই যা, ঐ জিন থেকে আমার তরবারি নিয়ে এসে আমাকে আঘাত কর। ঠিক এখানে, এই আমার শিরদাঁড়ার ওপর খুলির নিচে মারবি। আমি এভাবেই মানুষ মারতাম। এরপর যখন তুই তোর মায়ের কাছে ফিরে যাবি, বলবি, আমি দুরাইদ ইবন আস-সিমাহকে হত্যা করেছি। আল্লাহর কসম করে বলছি, তোদের মায়েদেরকে আমি বহুবার যুদ্ধে বাঁচিয়েছি।
দুরাইদ রাবিয়াকে উদ্দেশ্য করে এই কথাগুলো বলার কারণ হলো, রাবিয়া নিজেও হাওয়াযিন গোত্রের সন্তান ছিল। কিন্তু পার্থক্য হলো তিনি ছিলেন মুসলিম আর দুরাইদ কাফির। যা-ই হোক, রাবিয়া এরপর তাকে দুরাইদের কথামতোই আঘাত করলেন। দুরাইদ মারা গেল।
দুরাইদ কেন এমন আচরণ করলো? এ ধরনের আচরণ আমাদের কিছুটা অবাক করতে পারে। তবে এটা ছিল সেই গোত্রীয় যুগের বাস্তবতা। দুরাইদের এ আচরণ এক প্রকারের ঔদ্ধত্য, গোত্রীয় ঔদ্ধত্য। দুরাইদের মতো লোকদের কাছে গোত্রের সম্মান আর গৌরবই ছিল সব। গোত্রের জন্য জীবন, গোত্রের জন্য মরণ। তাই মৃত্যুর আগেও সে বলছিল, আমার মতো লোককে মারতে পারাটা তোমার জন্য এক বিশাল ব্যাপার।
কার তাকদীরে কী আছে তা একমাত্র আল্লাহ আযযা ওয়া জাল ছাড়া কেউই জানে না। কাজেই মুসলিমদের উচিত নিজেদের ঈমানের ব্যাপারে তুষ্ট না হয়ে পড়া, আল্লাহর কাছে সবসময় দ্বীনের উপর অবিচল থাকার জন্য সাহায্য চাওয়া। যে আবু তালিব সারা জীবন আল্লাহর রাসূলকে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন, আগলে রেখেছেন, সে-ই আবু তালিব কাফির হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আবু সুফিয়ান শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে। হুনাইনের যুদ্ধে, হাওয়াযিন গোত্রের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ছিল মালিক ইবন আউফ একাই। সে অভিজ্ঞ দুরাইদের মতকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে নিজের অপরিণত সিদ্ধান্তের উপর অটল ছিল। কিন্তু এই মালিক ইবন আউফ শেষ পর্যন্ত মুসলিম হয়ে যায় আর বিজ্ঞ পরামর্শদাতা দুরাইদ ইবন আস-সিমাহ কাফির হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
৫) আনাস ইবন আবি মারসাদের কাহিনী
হুনাইনের যুদ্ধ। হুনাইনের যুদ্ধের আগের রাতের কথা। রাসূলুল্লাহ রাতের বেলা পাহারা দেওয়ার জন্য কাউকে খুঁজছিলেন। আনাস ইবন আবি মারসাদ উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ তাকে পাহারা দেওয়ার জায়গা দেখিয়ে বললেন, 'তোমার অংশ থেকে যেন কোনো আক্রমণ না আসে, সেটা দেখার দায়িত্ব তোমার।' আনাস ইবন আবি মারসাদ তার বাহনে করে পাহাড়ের পাশ ধরে পাহারার স্থানে চলে গেলেন। পরদিন ভোরবেলা, রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কি তোমাদের সওয়ারীকে দেখেছো?' সাহাবিরা বললেন আনাস ইবন আবি মারসাদ এখনো ফিরে আসেননি। ফজরের সালাত শেষ হওয়ার পর দেখা গেল আনাস পাহাড় থেকে নেমে আসছেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি সালাত আদায় আর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া ছাড়া আমার জায়গা থেকে নড়িনি।' আল্লাহর রাসূল খুব খুশি হলেন। তাকে বললেন, 'তুমি তো জান্নাতকে নিজের জন্য অবধারিত করে ফেলেছো। আজকের পর আর কোনো (অতিরিক্ত) ভালো কাজ না করলেও তোমরা চলবে।'
এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে "মহান আল্লাহর পথে যুদ্ধক্ষেত্রে পাহারা দেওয়ার ফযিলত” শিরোনামে। আনাস ইবন আবি মারসাদ আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এজন্য আল্লাহর রাসূল তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। এটা বলে দেয় যে, আল্লাহর পথে পাহারা দেওয়া কত বড় একটি ইবাদাত। এই ঘটনা থেকে আরেকটি শিক্ষা হলো, প্রত্যেক সাহাবিকে আল্লাহর রাসূল আলাদা আলাদাভাবে কদর করতেন। ফজরের সালাতের সময়ে তিনি আনাসের খোঁজ নিয়েছেন। ফিরে এসেছেন কি না জানতে চেয়েছেন এবং সবশেষে তার গুরুত্বপূর্ণ আমলের জন্য তাকে আখিরাতে পুরষ্কারের সুসংবাদ দিয়েছেন।
৬) রাসূলুল্লাহর দুধ বোন শায়মার কাহিনী
আশ-শায়মা বিনত আল-হারিস ছিলেন রাসূলুল্লাহর দুধ মা হালিমা আস- সাদিয়্যার কন্যা। সে হিসেবে শায়মা ছিলেন আল্লাহর রাসূলের দুধ বোন। বনু সাদ ইবন বকর হুনাইনের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। শায়মা ছিলেন সেই গোত্রের। যুদ্ধের পর তিনি বন্দী হলেন। তাকে বাজারে নেওয়ার পথে তিনি বললেন, 'তোমরা কি জানো না আমি তোমাদের সাথীর (আল্লাহর রাসূলের) দুধবোন?' সাহাবিরা ঠিক নিশ্চিত ছিলেন না শায়মা সত্য বলছেন কি না। তাই তারা শায়মাকে আল্লাহর রাসূলের কাছে নিয়ে গেলেন।
স্বাভাবিকভাবে আল্লাহর রাসূল নিজেও শায়মাকে চিনতে পারছিলেন না। কারণ শায়মার সাথে তিনি একসাথে বড় হয়েছেন প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। তিনি শায়মাকে তার দাবি প্রমাণ করতে বললেন। শায়মা বললেন, 'তুমি যখন ছোট ছিলে, একবার আমি তোমাকে কোলে নিয়েছিলাম আর তুমি আমার পিঠে কামড় দিয়েছিলে। সেই দাগ এখনো আছে।' রাসূলুল্লাহ তখন নিশ্চিত হলেন এটা আসলেই তার বোন। তিনি দুধবোনের সম্মানে নিজের গায়ের চাদর খুলে বিছিয়ে দিলেন, শায়মাকে সেখানে বসতে বললেন। তারপর বললেন, 'তুমি চাইলে ইসলাম গ্রহণ করে এখানে থেকে যেতে পারো। তাহলে অনেক আদর আর ভালোবাসা পাবে। অথবা তুমি চাইলে তোমরা গোত্রের কাছেও ফিরে যেতে পারো।' শায়মা নিজ গোত্রের কাছেই ফিরে যেতে চাইলেন। আল্লাহর রাসূল তার দুধবোনকে একজন দাসী, তিনজন দাস এবং বেশকিছু উট আর ভেড়া উপহার দিলেন। শায়মা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তবে তিনি তার গোত্রের সাথেই থেকে যান।
টিকাঃ
১১০. সুনান আবু দাউদ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৫।
📄 তায়েফের অবরোধ
যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে হাওয়াযিনের সৈন্যরা তাইফে পালিয়ে যায়। তাদের কেউ চলে যায় নাখলায়, কেউ চলে যায় আওতাসে। আল্লাহর রাসূল এদের ধাওয়া করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তাঁর সেনাবাহিনীকে কয়েকভাগে বিভক্ত করে বিভিন্ন দিকে পাঠান। মূল অংশ রওনা হয় তাইফের উদ্দেশ্যে। মালিক ইবন আউফ আন নাসরি তার সৈনিকদেরসহ সেখানে আশ্রয় নিয়ে তাইফের দুর্গগুলোর প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। আরেকটি দল অগ্রসর হয় আওতাসের দিকে। সে দলের নেতৃত্বে ছিলেন আবু মূসা আল আশআরীর চাচা আবু আমীর আল আশআরী। এগুলো ছিল একেকটি সারিয়াহ।
আওতাসে অভিযানের এক পর্যায়ে আবু আমীর হাঁটুতে আঘাত পান। ভাতিজা আবু মূসা আল আশআরী এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'চাচাজান! কে আপনার ওপর তীর ছুঁড়েছে?' আবু আমীর ইশারার মাধ্যমে এক লোককে দেখিয়ে বললেন, 'ঐ লোকটা আমার দিকে তীর মেরেছে।' আবু মূসা তার পিছু নিলেন। আবু মূসাকে দেখে সে লোকটা পালাতে লাগলো। আবু মূসা তাকে বলছিলেন, 'লজ্জা হয় না তোর? তুই কি লড়বি না? পালাবি নাকি? তোর মধ্যে কি পুরুষত্ব নেই?' কথাগুলো তার খুব গায়ে লাগলো। সে লড়াই করার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। আবু মূসা লড়াইয়ে তাকে হারিয়ে দিলেন এবং তাকে হত্যা করলেন। এরপর আবু মূসা তার চাচার দিকে ফিরে বললেন, 'চাচাজান! আমি আপনার আঘাতকারীকে হত্যা করেছি।' তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, এবার তুমি আমার হাঁটু থেকে তীরটা বের করে দাও。'
তীরটি বের করা হলো কিন্তু রক্তক্ষরণ বেড়ে গেল। আবু আমীরের মনে হলো তিনি হয়তো আর বাঁচবেন না। আবু মূসাকে বললেন, 'ভাতিজা, তুমি নবীজিকে আমার সালাম জানাবে আর আমার মাগফিরাতের জন্য দুআ করতে বলবে।' আবু মূসা আল আশআরী রাসূলুল্লাহর কাছে পুরো ঘটনাটি বললেন। সব শুনে রাসূলুল্লাহ অযু করলেন। তারপর দু'হাত উঁচু করে দুআ করলেন,
'হে আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দা আবু আমীরকে ক্ষমা করো। হে আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দা আবু আমীরের গুনাহগুলো মাফ করে দাও। ক্বিয়ামত দিবসে তোমার মাখলুকের মধ্যে অনেক মানুষের উপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করো।'
এটা ছিল একজন শহীদ মুজাহিদের জন্য আল্লাহর রাসূলের দুআ। এই দুআ শুনে আবু মূসা আল-আশআরী অভিভূত হয়ে যান। তিনি আল্লাহর রাসূলকে তার নিজের জন্যও দুআ করার অনুরোধ করেন। আল্লাহর রাসূল তখন আবু মূসার জন্য দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! আবদুল্লাহ ইবনু কায়সের (আবু মূসা) গুনাহ ক্ষমা করে দাও এবং কিয়ামাত দিবসে তুমি তাঁকে সম্মানিত স্থানে প্রবেশ করাও।'
আবু আমীরের জন্য আল্লাহর রাসূল যে দুআটি করেছিলেন সেই দুআ একজন মানুষের জীবনে শ্রেষ্ঠ পাওয়া। তা হলো ক্বিয়ামত দিবসে উচ্চ মর্যাদা লাভ করা। বেশিরভাগ মানুষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচার দিবসের কথা ভুলে যায় আর দুনিয়ায় নিজের অবস্থান পাবার জন্য মরিয়া হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে সেই বেদুইনের দুআটি উল্লেখ না করলেই না নয়। এই দুআটি স্বয়ং আল্লাহর রাসূল খুব পছন্দ করেছিলেন। দুআটি হলো,
'ইয়া আল্লাহ! আমার জীবনের উত্তম অংশটি যেন জীবনের শেষ অংশ হয়। আমার শেষ আমলটি যেন আমার জীবনের সর্বোত্তম আমল হয়। আর আমার জীবনের সর্বোত্তম দিন যেন আপনার সাথে আমার দেখা হওয়ার দিনটি হয়।'
মূল বাহিনী অগ্রসর হয় তাইফের দিকে। আল্লাহর রাসূল তাইফ অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই অবরোধে ইসলামের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো 'মিনযানিক' নিক্ষেপ করা হয়। এই মিনযানিক ছিল এক প্রকারের গুলতি। এটি দিয়ে তাইফের দেওয়ালে সজোরে পাথর নিক্ষেপ করা হতো। এই গুলতি যখন আঘাত হানতো, তখন সেটা দুর্গের ভেতর ঠিক কোথায় আঘাত হানছে সেটা বোঝার উপায় ছিল না। তখনকার দুর্গগুলো ছিল বিশাল। দুর্গের দেওয়ালের ভেতরে পুরো একটা শহর। কাজেই এই গুলতিগুলো শহরের ভেতরে বাজার, রাস্তা কিংবা ঘর-বাড়ি যে কোনো স্থানে পতিত হবার সম্ভাবনা ছিল।
এই ধরনের হামলার কারণে 'কোল্যাটারাল ড্যামেজ' বা অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা থেকে যায়। যেমন, এই ধরনের হামলায় নিক্ষিপ্ত গোলা নারী ও শিশুদের ওপর আঘাত হানতে পারে। যদিও তাদের হত্যা করা নিক্ষেপকারীর লক্ষ্য ছিল না। কারণ এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ঠিক কোথায় গিয়ে আঘাত হানবে এটা জানা সম্ভব হয় না। এটা ঠিক তীরের মতো নয় যেখানে তীর কোন লক্ষ্যে আঘাত হানবে সেটা তীরন্দাজ জানে। নির্বিচারে গোলা নিক্ষেপের এই পদ্ধতি বায়াত নামে পরিচিত। তাইফে যখন রাতের অন্ধকারে বায়াত হামলা করা হচ্ছিল, তখন মুশরিকদের নারী ও শিশুরা মারা পড়ছিল। তখন আল্লাহর রাসূলকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাব দিলেন, 'তারা তাদের মধ্য থেকেই।' অর্থাৎ, এই ব্যাপারে মুশরিক নারী ও শিশুদের ব্যাপারে হুকুম পুরুষদের মতোই প্রযোজ্য হবে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে নিশানা করে জিহাদে কাফির নারী ও শিশু হত্যা করা যাবে না, এটাই সাধারণ হুকুম।
টিকাঃ
১১১. ইবন মাজাহ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৯৪৭ (আরবি রেফারেন্স)।
১১২. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস, ৩০,৩১।
📄 অবরোধ প্রত্যাহার
এই ধরনের হামলা চালানো সত্ত্বেও তাইফবাসী হাল ছেড়ে দেয়নি। তাদের তীরন্দাজরা দেওয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে তীর ছুঁড়ে যাচ্ছিল আর তাদের তীরের আঘাতে অনেক মুসলিম আহত হচ্ছিলেন। তাই মুসলিম বাহিনীকে তীরের সীমা থেকে বের হয়ে পেছনে চলে আসতে হয়। সাহাবিরা এই অবরোধে 'দাব্বাবাহ' ব্যবহার করলেন। এটা ছিল একটা কাঠের তৈরি কাঠামো। এর ভিতরে কয়েকজন সাহাবি প্রবেশ করতেন। এটা তীরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিত। এটাকে ব্যবহার করে তারা দেওয়ালের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাইফবাসী দাব্বাবার বিরুদ্ধে অপর একটি অস্ত্র ব্যবহার করল। তারা আগুনে উত্তপ্ত করা কাঁটাযুক্ত লোহার টুকরা দাব্বাবার দিকে ছুঁড়ে দেয় ফলে দাব্বাবার ভেতর থেকে সাহাবিরা বের হয়ে আসতে বাধ্য হন। দাব্বাবাহ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাইফবাসীর ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করার জন্য রাসূলুল্লাহ আঙ্গুরের গাছগুলো কেটে পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দেন। এই কৌশলে কাজ হয়। তাইফের লোকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এই গাছগুলো ছিল তাদের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। তখন তারা আল্লাহর রাসূলকে আত্মীয়তার সম্পর্কের দোহাই দিয়ে অনুরোধ করে যেন তিনি তাদের গাছ পোড়ানো বন্ধ করে। আল্লাহর রাসূল তাদের অনুরোধ রাখেন।
শত্রুদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য নবীজি আরও একটি কাজ করেন। তিনি তাইফের দাসদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেন, যদি তারা দুর্গ ছেড়ে বের হয়ে আসে, তাহলে তাদের স্বাধীন করে দেওয়া হবে। এই ঘোষণা শুনে তেইশ জন দাস বের হয়ে আসে। তাদের মুক্ত করে দেওয়া হয়।
অবরোধ পনেরো দিন পর্যন্ত স্থায়ী হলো। কিন্তু তাইফের অধিবাসীদের মধ্যে আত্মসমর্পণ করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। রাসূলুল্লাহ তখন নাওফাল ইবন মুওয়াবিয়াহ আদ-দাইলির সাথে পরামর্শ করলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'অবরোধ চালিয়ে যাবার ব্যাপারে তোমার মতামত কী?' নাওফাল বললেন, 'এদের অবস্থা এখন গর্তে লুকিয়ে থাকা শিয়ালের মতো। আপনি যদি অবরোধ চালিয়ে যান, আজ হোক, কাল হোক, আপনি জয়ী হবেন। তবে তাদের ছেড়ে দিলেও তারা আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।' কারণ, তাইফের চারপাশে প্রায় সবগোত্র ততদিনে ইসলাম গ্রহণ করে ফেলেছে। তাই তাইফ মুসলিমদের জন্য আর কোনো হুমকি নয়। নবীজি তার উপদেশ গ্রহণ করলেন। উমারকে বললেন যেন সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা ফিরে যাবেন।
এই ঘোষণা সাহাবিদের অনেকের মনঃপূত হলো না। তারা তাইফ জয় না করে ফিরে যাবেন এটা মানতে পারছিলেন না। তারা বললো, 'রাসূলুল্লাহ! আমরা বিজয় ছাড়াই ফিরে যাবো?' রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, 'ঠিক আছে, তাহলে যুদ্ধ চালিয়ে যাও।' পরদিন তারা লড়াইয়ের জন্য বের হলেন। বেশ কিছু সাহাবি আহত হলেন। তারা বুঝতে পারলেন এই দুর্গ ভেদ করা সহজ হবে না, যেমনটা তারা ভেবেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সেদিন আবার বললেন, 'ইনশা আল্লাহ, আগামীকাল আমরা এখান থেকে ফিরে যাবো।' এবার আর সাহাবিরা প্রতিবাদ করলেন না, বরং তারা সেটাই চাচ্ছিলেন। তাদের নীরবতা দেখে রাসূলুল্লাহ কিছুই বললেন না, হাসলেন শুধু। তাইফ থেকে বের হয়ে এসে আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমরা বলো: আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদাতকারী এবং রবের প্রশংসাকারী।' সাহাবিদের কেউ বললেন, 'আপনি সাকিফদের বিরুদ্ধে দুআ করুন।' আল্লাহর রাসূল সাকিফদের বিরুদ্ধে বদদুআ না করে তাদের হিদায়াতের জন্য দুআ করলেন। বললেন, 'হে আল্লাহ! সাকিফকে পথ দেখাও, তাদের সত্যের পথে চালিত করো।' আল্লাহর রাসূলের এই দুআ কবুল হয়েছিল। হিজরী ৯ম বর্ষে তারা নিজ থেকে এসে ইসলাম গ্রহণ করে।
তাইফ ছিল আরবদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ গাযওয়া। এই যুদ্ধের পর মুসলিমদের সামনে নতুন এক প্রতিপক্ষ দাঁড়ায়। রোমান সাম্রাজ্য। রোমানদের বিরুদ্ধে এর পর তাবুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।