📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 প্রেক্ষাপট

📄 প্রেক্ষাপট


মক্কা বিজয় হলো। ইসলামের বিরুদ্ধে সবচাইতে শক্তিশালী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শক্তি ছিল কুরাইশরা। মক্কা বিজয়ের সাথে তাদের পতন ঘটে। কিন্তু আরও একটি শক্তি তখনও ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে কাজ করছিল। তাদের কথা কুরআনেও ইঙ্গিত করা হয়েছে।

"আর তারা বলে, এ কুরআন কেন দুই জনপদের মধ্যকার কোনো মহান ব্যক্তির উপর নাযিল করা হলো না?" (সূরা ফুসসিলাত, ৪১: ৩১)

এই দুই জনপদ হলো মক্কা আর তাইফ। আর অবশিষ্ট এই বিরোধী শক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল হাওয়াযিন, সাকিফ এবং আরও কিছু গোত্র। এরা হুনাইনের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। সাকিফ গোত্র তাইফে বসবাস করতো। এটি ছিল হাওয়াযিনের একটি শাখা। হাওয়াযিন ছিল কুরাইশের মতোই অন্য অনেকগুলো উপগোত্রের মূল গোত্র। হাওয়াযিনরা কুরাইশদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সেই জাহিলিয়াতের যুগ থেকেই। এই দ্বন্দ্ব ছিল পুরোপুরি গোত্রীয় চেতনা থেকে উদ্ভুত। আল্লাহর রাসূলের মক্কা বিজয়ে হাওয়াযিনরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়, কেননা তাদের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। কুরাইশ বংশের কেউ এসে তাদের ওপর ক্ষমতাবান হয়ে যাবে, এটা তারা মানতে পারছিল না। তারা স্পষ্টতই বুঝতে পারছিল যে, মক্কা বিজয়ের পর আল্লাহর রাসূলের পরবর্তী লক্ষ্য তাইফ। ভূ-রাজনৈতিক বিচারে সেটাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ তাইফ ছিল মক্কার নিকটবর্তী সবচেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী।

তাইফে এর আগে আল্লাহর রাসূল ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন তারা খুব বাজেভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদের আচরণ তৎকালীন জাহিলিয়াতের মানদণ্ডেও প্রচণ্ড আপত্তিকর ছিল। আরবদের মধ্যে সহজাত যে ঔদার্য আর মেহমানদারিতার প্রচলন ছিল, তার ছিটেফোঁটাও তারা দেখায়নি। যখন মানুষকে মিথ্যা মাবুদদের পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর দিকে আহবান করা হয়, তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক, ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ, স্বজাত্যবোধ গৌণ হয়ে যায়। তাওহীদ আর শিরকের দ্বন্দ্ব সবকিছুকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এটাই চিরন্তন বাস্তবতা।

তারা সিদ্ধান্ত নিল মুসলিমরা আক্রমণ করার আগে তারাই মুসলিমদের ওপর হামলা চালাবে। মালিক ইবন আউফ আল-নাসরির নেতৃত্বে হাওয়াযিন, সাকিফ, বনু হিলাল, বনু সাদ ইবন আবি বকরসহ বেশ কিছু গোত্র এক হলো। তবে কা'ব এবং কিলাব গোত্র তার ডাকে সাড়া দেয়নি। মালিক ইবন আউফ প্রায় বিশ হাজার যোদ্ধার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনী তৈরি করলো। রাসূলুল্লাহ তাদের এই সৈন্যসমাবেশের খবর শুনতে পেয়ে বারো হাজার সৈনিকের এক বাহিনী নিয়ে মক্কার বাইরে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। এই বারো হাজারের মধ্যে দশ হাজার সৈনিক মক্কা বিজয়ে অংশ নিয়েছিল। আর এরপর আত-তুলাকা থেকে আরও দুই হাজার সৈন্য যোগদান করে। মক্কা বিজয়ের পর ক্ষমা ও মুক্তিপ্রাপ্তদের আত-তুলাকা বলা হতো। অর্থাৎ, যেসব মক্কাবাসী মক্কা বিজয়ের পর মুসলিম হয়ে যায় তারা হলো আত-তুলাকা। এই অভিযান চলাকালীন সময়ে মদীনায় গভর্নর হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন আত্তাব ইবন উসাইদ।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 দুই শিবিরে যুদ্ধের প্রস্তুতি

📄 দুই শিবিরে যুদ্ধের প্রস্তুতি


এই যুদ্ধে মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা ছিল আগের চাইতে বেশি। তাই কিছু সাহাবি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতে লাগলেন,

'সৈন্য সংখ্যার কমতির জন্য আজ আমরা পরাজিত হবো না, আমাদের সেনাসংখ্যা আজ অনেক!'

শত্রুপক্ষে একজন বিচক্ষণ বৃদ্ধ লোক ছিল। তার নাম দুরাইদ ইবন আস-সিমাহ। হাওয়াযিনদের মাঝে সে অনেক বিখ্যাত ছিল। বলা চলে একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। তার খ্যাতির কারণ বহুবিধ। সে ছিল সাহসী, নির্ভীক যোদ্ধা, দক্ষ রণকুশলী এবং বিচক্ষণ একজন ব্যক্তি। কিন্তু বার্ধক্যের কারণে এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই এ যুদ্ধে সে ছিল একজন উপদেষ্টা। মালিক ইবন আউফ ছিল এই যুদ্ধের কমান্ডার।

উট থেকে নেমে দুরাইদ জিজ্ঞেস করলো,

- আমরা কোথায় আছি এখন?

- এটা হলো আওতাস, কেউ একজন জবাব দিল।

- বাহ! অশ্বারোহী বাহিনীর জন্য বেশ ভালো জায়গা। পাথুরেও নয়, আবার নরম মাটিও নয়। আচ্ছা, এতসব হট্টগোল কীসের? মনে হচ্ছে যেন উটের চলার আওয়াজ! গাধার বিকট চিৎকার! শিশুদের কান্না! ছাগলের ভ্যাঁ-ভ্যাঁ! ঘটনা কী বলো তো?

মালিক ইবন আউফ তার বাহিনীর সাথে তাদের ধন-সম্পদ আর পরিবার- পরিজনকেও সাথে এনেছে। এগুলো পেছনের সেই কাফেলারই আওয়াজ।

- কোথায় সে?

মালিক ইবন আউফকে ডেকে আনা হলো। দুরাইদ তাকে প্রশ্ন করলো,

- মালিক ইবন আউফ! তুমি আজ তোমার গোত্রের নেতা। আজকের দিনে তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবে, অনাগত ভবিষ্যতের ওপরে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। এই যে আমি উটের শব্দ, গাধার বিকট চিৎকার, শিশুদের কান্না আর ছাগলের ভ্যাঁ-ভ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি, কাহিনীটা কী বলতো?

আমি আমার লোকজনের ধন-সম্পদ আর স্ত্রী-পুত্রকে সাথে করে নিয়ে এসেছি।

এই কাজটা তুমি কেন করলে?

তাহলে প্রত্যেক সৈনিকের পেছনে তাদের পরিবার আর ধনসম্পদ থাকবে। তাদের মায়ায়, তাদের বাঁচাবার জন্য তারা মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করবে।

ভেড়ার রাখাল কোথাকার! যদি যোদ্ধারা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়, তাহলে তাকে আটকাবার সাধ্য কার আছে! যুদ্ধ যদি তোমার অনুকূলে যায় তাহলে তো ঐ তলোয়ার আর বল্লমধারী লোকগুলোই তোমার কাজে আসবে। আর যদি প্রতিকূলে যায়, তাহলে তোমার স্ত্রী-পুত্র আর ধন-সম্পদ তোমার বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

দুরাইদ এরপর জিজ্ঞেস করলো,

- আচ্ছা, ভালো কথা, কা'ব আর কিলাব -- এ গোত্র দুটো কোথায়? ওদের দেখছি না যে?

- তারা যুদ্ধে আসেনি, লোকেরা উত্তর দিল।

- তাহলে ক্ষীপ্রতা আর বীরত্ব দেখাবে কারা! এই যুদ্ধ যদি মর্যাদার কিছু হতো, তাহলে ওরা এই যুদ্ধে অবশ্যই আসতো। তোমরাও যদি ওদের মতো আজ বিরত থাকতে, কতই না ভালো হতো! ওরা যদি না এসে থাকে, তাহলে এই যুদ্ধে এসেছে কারা? এসেছে আমর ইবন আমীর আর আওফ ইবন আমীর।

- এরা আসলেও কী আর না-আসলেও কী! না পারবে উপকার করতে, না পারবে ক্ষতি করতে!

মালিক ইবন আউফের যুদ্ধের প্রস্তুতি আর পরিকল্পনা দেখে দুরাইদ যারপরনাই হতাশ। তার কাছে মনে হচ্ছিল এই যুদ্ধে যাওয়াটা একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তবু সে মালিককে উপদেশ দিল,

- শোনো মালিক, হাওয়াযিনের দলকে অশ্বারোহীদের সামনে রেখো না। এদের পেছনে পাঠিয়ে দাও। শুধু অশ্বারোহীদের সাথে নিয়ে সাবিঈদের (মুসলিমদের) মোকাবেলা করো। যদি যুদ্ধ তোমার অনুকূলে যায়, তাহলে পেছনের লোকেরা তোমাদের সাথে মিলিত হবে। আর যদি প্রতিকূলে যায়, তাহলে অন্তত তোমার পরিবার আর ধন-সম্পদ বেঁচে যাবে।

মালিক ইবন আউফ এই উপদেশ কানেই তুললো না, উল্টো বললো, 'আল্লাহর কসম, আমি কখনো এমন করবো না। তুমি বুড়িয়ে গেছো, তোমার বুদ্ধি-বিবেচনাও বুড়িয়ে গেছে। হাওয়াযিনদের উদ্দেশ্যে বলছি, হয় তোমরা আমার আনুগত্য করবে অথবা আমি এই তরবারির ওপর ভরসা করবো। যোদ্ধারা, যখন তোমরা শত্রুদের দেখবে, তরবারি কোষমুক্ত করে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে।'

মালিক ইবন আউফ আসলে চাচ্ছিল না এই যুদ্ধে দুরাইদের কোনো সম্পৃক্ততা থাকুক। কারণ সে এই যুদ্ধের কৃতিত্ব পুরোটাই নিজের ঘাড়ে নিতে চাচ্ছিল। দুরাইদ মন খারাপ করে বললো, 'না পারলাম এই যুদ্ধে শামিল হতে, না পারলাম এই যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে।' এই আলোচনা থেকে নবীন আর প্রবীণের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য লক্ষণীয়। দুরাইদের মতো অভিজ্ঞতা আর বিচক্ষণতা মালিক ইবন আউফের ছিল না। সে ছিল কিছুটা হুজুগে প্রকৃতির। নিজের নাম কামানোর জন্য বিশাল এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে সে দ্বিধা করছে না। যুদ্ধের ময়দানে অভিজ্ঞতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। শুধু উৎসাহ-উদ্দীপনা আর আবেগ যথেষ্ট নয়।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 তথ্য ও অস্ত্র সংগ্রহ

📄 তথ্য ও অস্ত্র সংগ্রহ


রাসূলুল্লাহ শত্রু পক্ষের উপর গোয়েন্দাগিরি করার জন্য আবদুল্লাহ ইবন আবি হাদরাদকে পাঠালেন। আবদুল্লাহ ইবন আবি হাদরাদ সফলভাবে শত্রুসেনার সংখ্যা এবং তাদের পরিবার ও সম্পদের উপস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে রাসূলুল্লাহকে জানালেন। কিন্তু উমার ইবন খাত্তাব তার কথা বিশ্বাস করতে পারলেন না। তার দেওয়া তথ্যকে নাকচ করে দিলেন। আবদুল্লাহ পাল্টা জবাব দিলেন, 'আপনি আমার কথা বিশ্বাস না করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ আপনি নিজেই একসময় সত্য দ্বীনকে অস্বীকার করেছেন। আমার চাইতেও শতগুণ পবিত্র সত্তা আল্লাহর রাসূলকে আপনি অস্বীকার করেছিলেন!' উমার রাসূলুল্লাহকে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি শুনেছেন সে কী বলছে!' রাসূলুল্লাহ তখন হেসে উমারকে বললেন, 'তুমি যে পথহারা ছিলে তা নিয়ে তো সন্দেহ নেই উমার। এরপর আল্লাহ তোমাকে সত্য পথে পরিচালিত করেছেন।'

এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর অতিরিক্ত অস্ত্রের প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন মেটাতে রাসূলুল্লাহ সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার সাথে কথা বলেন। সাফওয়ান তখনো মুশরিক। কুরাইশ নেতা হিসেবে তার ভালোই সম্পদ ছিল। অনেক অস্ত্রশস্ত্রও ছিল। রাসূলুল্লাহ তার কাছে বর্শা আর ঢাল ধার হিসেবে চাইলেন। সাফওয়ান রাজি হলো। রাসূলুল্লাহ চাইলেই জোর করে অস্ত্রগুলো নিতে পারতেন কিন্তু সেটা তিনি করেননি। অস্ত্রগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার সময় হলে দেখা গেল কিছু অস্ত্র হারিয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সে সবের ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিতে চাইলেন, কিন্তু সাফওয়ান রাজি হলো না। ততদিনে তার মন পরিবর্তন হয়ে গেছে এবং সে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী সামনে আসবে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 ময়দানে মুখোমুখি দুই দল

📄 ময়দানে মুখোমুখি দুই দল


সেদিনের আবহাওয়া ছিল খুবই উত্তপ্ত আর শুষ্ক। মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী অগ্রসর হলো। তারা হুনাইনের উপত্যকা ধরে এগোতে লাগলেন। পাহাড় দিয়ে সোজা সামনে এগোনোর সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করে চারদিক থেকে শুরু হলো তীরবৃষ্টি। এরপর হাওয়াযিনের অশ্বারোহীরা মুসলিমদের ওপর হামলা চালায়। উপর্যুপরি অতর্কিত হামলায় মুসলিম সেনারা পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। দিশেহারা মুসলিম সেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে চারপাশে পালাতে থাকে। যুদ্ধের প্রথম ধাক্কায় মালিক ইবন আউফের পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়।

তার পরিকল্পনা ছিল প্রতিটি গিরিপথ, গোপন আর সংকীর্ণ স্থানে ওঁৎ পেতে থাকা আর মুসলিম বাহিনী সেই গিরিপথে এলেই তাদের ওপর আচমকা আক্রমণ করা। আক্রমণ পরিচালিত হবে দুটি ফ্রন্টে -- পাহাড়ের দুই পাশ থেকে তীর ছোঁড়া হবে আর এরপর মূল সেনাবাহিনী মুসলিমদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ হানবে। মুসলিমদের ধারণাই ছিল না হাওয়াযিনের সৈনিকরা এভাবে লুকিয়ে আছে। হাওয়াযিনের বাহিনী ছিল সুশৃঙ্খল। প্রথমে ছিল সওয়ারীদের সারি, তারপর পদাতিক সৈনিকদের সারি, তারপর মহিলাদের সারি, তার পেছনে ছিল পশুপাল। তাদের দক্ষ তীরন্দাজ ছিল। তার ওপর অশ্বারোহী হাওয়াযিন সেনারা মুসলিমদের ওপর কঠিন হামলা চালায়। মুসলিম সেনাবাহিনীর সামনের দিকে ছিল বনু সুলাইম গোত্রের সেনাদল। আকস্মিক হামলার তীব্রতা ও ভয়াবহতা সামাল দিতে না পেরে তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানো শুরু করল। তাদের পেছনে ছিল আত-তুলাকা। তারা মাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছে। তারাও যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পিছু হটতে লাগলো। উটগুলো পালাতে গিয়ে একটার পর আরেকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এই হামলা এতটাই আচমকা আর তীব্র ছিল যে মুসলিমদের সেরা পদাতিক সৈন্য সালামা ইবন আল-আকওয়াও ময়দান ছেড়ে পালাতে থাকেন। মুসলিম বাহিনী পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে গেল। এভাবে দেখতে দেখতে প্রায় সবাই উধাও হয়ে গেল। ময়দানে টিকে থাকলেন অল্প কিছু মানুষ। আল্লাহর রাসূল , কিছু মুহাজির, আনসার এবং আহলে বাইতের লোকেরা।

“অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু জায়গায় এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি। আর জমিন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।” (সূরা তাওবা, ৯: ২৫)

মুসলিম বাহিনীর এই বিপর্যয়ে দুর্বল ঈমানের মুসলিমরা যেন প্রায় ঈমানহারা হয়ে গেল। আবু সুফিয়ান এই অবস্থা দেখে বলে উঠলেন, 'এরা তো পালাতে পালাতে সমুদ্রের পাড় পর্যন্ত পৌঁছে যাবে!' সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার ভাই বলে ওঠে, 'জাদুর কেরামতি আজ শেষ! মুহাম্মদের জাদু আর কাজ করছে না!' এ কথা শুনে সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা ক্ষেপে গেল, 'থাম তুই! আল্লাহ তোর মুখ ভেঙে দিক! আল্লাহর কসম, আমি একজন কুরাইশের কর্তৃত্ব মেনে নিতে রাজি আছি, কিন্তু কোনো হাওয়াযিনের কর্তৃত্ব মানতে রাজি নই!'

এদিকে রাসূলুল্লাহ অবিচলভাবে ময়দানে দাঁড়িয়ে। তিনি সবাইকে ডাকছেন আর বলছেন, 'লোকেরা তোমরা কোথায় যাচ্ছো? আমার দিকে এসো, আমি মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ, আল্লাহর রাসূল!'

কিন্তু কেউ তাঁর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না। সবাই শত্রুদের আক্রমণের ধাক্কায় পড়িমড়ি করে ছুটছে। আল্লাহর রাসূল তবু সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে 'আমি আল্লাহর নবী! আমি মিথ্যাবাদী নই! আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান!' এ সময়টাতে তাঁর সাথে ছিলেন চাচা আব্বাস, আবু সুফিয়ান ইবন আল-হারিস এবং অল্প কিছু মুহাজির ও কুরাইশ। আল্লাহর রাসূল আব্বাসকে বললেন, 'আব্বাস, সামুরার লোকদের ডাক দাও!' সামুরাহ হচ্ছে বাইয়াতুর রিদওয়ানে উপস্থিত সাহাবিদের দল। আব্বাস চিৎকার করে বাইয়াতুর রিদওয়ানের সাহাবিদের ডাকলেন - সেরা সব সাহাবি। তার আহবানের সাথে সাথে তারা যেন তীরের বেগে ময়দানে ফিরে এল। আর বলতে লাগলেন, 'আমরা এসেছি! আমরা এসেছি!'

এরপর বিশেষভাবে আনসারদের আহবান করা হলো। এরপর বিশেষভাবে ডাকা হলো খাযরাজদের। ডাকা হলো হলো একে একে সবগুলো গোত্রকে। মুসলিমদের অনেকেই প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ময়দানে ফিরে এল। রাসূলুল্লাহর চারপাশে জড়ো হলেন প্রায় একশো সাহাবি। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হলো। আল্লাহর রাসূল এবার ময়দানের দিকে দৃষ্টি মেলে বললেন, 'এবার ঠিকই জ্বলেছে যুদ্ধের অগ্নিশিখা!'

আল্লাহর রাসূল এক মুঠো ধুলো তুলে মুশরিকদের দিকে নিক্ষেপ করলেন, বললেন, 'মুহাম্মাদের রবের শপথ! তোরা ধ্বংস হ!' এই ধুলো শত্রুবাহিনীর প্রত্যেকের চোখে গিয়ে পড়ে। এর পর তীরন্দাজরা আর মুসলিমদের ওপর তীর ছুঁড়তেই পারেনি। এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মু'জিযা। এরপরই যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে লাগলো।

"তারপর আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাযিল করলেন তাঁর রাসূলের ওপর ও মু'মিনদের ওপর এবং নাযিল করলেন এমন সৈন্যবাহিনী যাদেরকে তোমরা দেখনি, আর কাফিরদেরকে আযাব দিলেন। আর এটা কাফিরদের কর্মফল।” (সূরা তাওবা, ৯: ২৬)

আল্লাহর এই সৈন্য ছিল ফেরেশতা। জুবাইর ইবন মুতইম বলেন, 'আমরা আকাশে কালো মেঘ দেখতে পেলাম। এরপর যখন তা মাটিতে নেমে এল, আমরা দেখলাম অগণিত পিপড়া! এ যেন পিপড়ার গালিচা! আর আমরা মনে করলাম এটাই হলো আল্লাহর সৈন্য।' আল্লাহর রাসূল যখন মুশরিকদের ওপর ধুলো নিক্ষেপ করেছিলেন, তা তাদের অন্তরে প্রবল ত্রাস আর আতঙ্কের জন্ম দেয়। আর মু'মিনদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা ঢেলে দিলেন প্রশান্তি বা সাকিনাহ। বদরের যুদ্ধেও এমনটা হয়েছিল। আল্লাহ যদি চান, যুদ্ধক্ষেত্রের অস্থির পরিস্থিতিতেও তাঁর বান্দাদের মনে প্রশান্তি ঢেলে দিতে পারেন। এই প্রশান্তি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মু'মিনদের জন্য সাহায্য।

এই সাহায্য আসার পরেই যুদ্ধের পরিস্থিতি বদলে যায়। মুসলিমরা ময়দানে ফিরে আসলে হাওয়াযিনরা আর কোনো পাল্টা আক্রমণ করা দূরে থাক, কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি। বরং তারা ময়দান ছেড়ে পালাতে শুরু করে। সম্ভবত এর কারণ হলো অনভিজ্ঞ মালিক ইবন আউফের আর কোনো বিকল্প পরিকল্পনা ছিল না। একটিমাত্র কৌশলকে পুঁজি করে তার বাহিনী এই যুদ্ধে অংশ নেয়। প্রাথমিকভাবে তাদের এই কৌশল কাজে লাগলেও যখন মুসলিমরা ঘুরে দাঁড়ালো, তখন তাদের কৌশলগত দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যায়। ফলে তারা হেরে যেতে থাকে।

যে অল্প কয়েকজন সাহাবি রাসূলুল্লাহর সাথে থেকে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন আবু বকর, উমার ইবন খাত্তাব, আলী ইবন আবি তালিব, আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব, তাঁর ছেলে ফাযল ইবন আব্বাস, আবু সুফিয়ান ইবন হারিস, রাবিয়া ইবন হারিস, উম্ম আয়মানের ছেলে আয়মান ইবন আবদুল্লাহ প্রমুখ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px