📄 বিজয়ের আগের ও পরের মুসলিমরা সমান নয়
আমর ইবন সালামা ছিলেন মক্কার বাইরে থেকে আসা একজন সাহাবি। তিনি তার ছোটবেলার কথা বর্ণনা করেন,
'আমাদের সামনে দিয়ে কোনো মুসাফির গেলেই আমরা তাকে মুহাম্মাদের কথা জিজ্ঞেস করতাম। তারা বলতো, তিনি দাবি করেছেন যে, আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন আর তাঁর কাছে আল্লাহর কাছ থেকে ওয়াহী আসে। আর তিনি মাত্রই অমুক-তমুক ব্যাপারে ওয়াহী লাভ করেছেন। আমি এমনভাবে এই শব্দগুলো (কুরআনের আয়াত) মুখস্থ করতাম যে তা আমার অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল।'
অর্থাৎ মুহাম্মাদ সম্পর্কে গোটা আরব অনেক আগে থেকেই খোঁজ খবর রাখত। যদিও তখনো তাদের বেশিরভাগ মুসলিম হয়নি। ইসলাম ছিল সেই সময়ের পত্রিকার হেডলাইন। আমর ইবন সালামা তখন একজন শিশু। কিন্তু মানুষের কথাবার্তা তার কানে আসতো আর এভাবে তিনি কুরআনের অনেক আয়াত মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। অথচ তার গোত্রের লোকেরা তখন কাফির ছিল।
আরবরা দলে দলে মুসলিম হয়েছে মক্কা বিজয়ের পরে। আসলে তারা দেখতে চাইছিল কুরাইশ বনাম মুহাম্মাদের এই দ্বন্দ্বে কে জয়ী হয়। গণমানুষ এভাবেই চিন্তা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তারা সত্যের সন্ধান করে না, বরং তারা জয়ী দলের সন্ধান করে। তারা দেখে কারা বিজয়ী হচ্ছে আর তারপর বিজয়ী দলের অনুসরণ করে। তাই সে যুগের আরবরা বলতো, 'মুহাম্মাদ যদি তাঁর নিজ গোত্রের বিপক্ষে হেরে যান তাহলে তাঁকে আর তাঁর গোত্রকে ছেড়ে দাও। আর যদি তিনি বিজয়ী হন, তাহলে তিনি একজন নবী ও তিনি সত্যবাদী।'
এই মানসিকতা ত্রুটিপূর্ণ। বিজয় সত্যের মানদণ্ড নয়। আমরা রাসূলুল্লাহর হাদীস থেকে জানি এমন কিছু নবী এই দুনিয়ায় ছিলেন, যাদের অনুসারী ছিল খুবই কম। দশ, পাঁচ, দুই বা একজন। এমন নবীও ছিলেন, যাদের কোনো অনুসারীই ছিল না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা ভুলের ওপরে ছিলেন বা তারা ব্যর্থ হয়েছেন। কেননা, হিদায়াত আল্লাহর হাতে, নবীর দায়িত্ব কেবল দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া। একজন নবী যদি সঠিকভাবে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, তাহলে তিনি সফল। ইসলাম এভাবেই সফলতাকে সংজ্ঞায়িত করে, জয়-পরাজয়ের ভিত্তিতে নয়।
সংখ্যাগরিষ্ঠ আরবজনতার বিপরীতে স্বল্পসংখ্যক মানুষই ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তারা জানতো, আল্লাহর রাসূল হচ্ছেন সত্য নবী। তাই তারা বিজয়ের অপেক্ষা করেনি। ইসলামকে সত্য জেনে মুসলিম হয়ে ইসলামের জন্য ত্যাগ স্বীকারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে তারা কখনো একই রকম (মর্যাদার অধিকারী) হবে না যারা (মক্কা) বিজয়ের আগে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে। তাদের মর্যাদা ওদের তুলনায় বেশি যারা (মক্কা) বিজয়ের পর (আল্লাহর পথে) ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে। (অবশ্য) আল্লাহ উভয়ের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তোমরা যা করো আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত।” (সূরা হাদীদ, ৫৭: ১০)
সুতরাং বিজয়ের আগে মুসলিম হওয়া আর পরে মুসলিম হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যারা মক্কা বিজয়ের আগে মুসলিম হয়েছে, হিজরত ও জিহাদ করেছে, তাদের মর্যাদা মক্কা বিজয়ের পরের মুসলিমদের চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে এই আয়াতটি মুসলিমদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। কারণ, বর্তমানে ইসলাম শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় নেই। কাজেই ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগে এই প্রতিকূল পরিবেশে যারা ইসলামকে আঁকড়ে ধরবে, ইসলামের জন্য ত্যাগ স্বীকার করবে, তাদের মর্যাদা ও পুরস্কার নিঃসন্দেহে সেসব লোকের চাইতে বেশি যারা ইসলামের বিজয় দেখার পর ইসলামের বাহিনীতে যোগ দেবে।