📄 হিজরত এবং জিহাদ
বুখারীতে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ মক্কা বিজয়ের পর বলেন, 'আজ থেকে আর কোনো হিজরত নেই। শুধু জিহাদ ও নিয়্যত আছে। আর যদি তোমাদেরকে যুদ্ধ করার জন্য আহবান করা হয়, তাহলে তোমরা তাতে সাড়া দেবে।' ১০৯
মক্কা বিজয়ের আগে হিজরত করা ছিল বাধ্যতামূলক। সেসময়ে যে-ই মুসলিম হতো, তাকেই মক্কা থেকে মদীনা, বা আরবের অন্য যে অংশেই সে থাকুক না কেন, তাকে মদীনায় হিজরত করতে হতো। মক্কা বিজয়ের পরে কেউ কেউ রাসূলুল্লাহর কাছে হিজরত করার ইচ্ছা পোষণ করলে, রাসূলুল্লাহ তাদের বললেন, হিজরতের সময় শেষ। যারা যারা হিজরত করেছে, তারা এর আজর (সাওয়াব) পেয়ে গেছে। এখন আর হিজরতের সুযোগ নেই। হিজরতের বদলে এখন আছে জিহাদ। যে ইবাদাতের মাধ্যমে হিজরতের সাওয়াব লাভ করা যাবে, তা হলো জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ। তাবেঈ আতা ইবন রাবাহা বলেন,
'আমি আইশার কাছে গিয়ে হিজরত সম্পর্কে জানতে চাইলাম। আইশা বললেন, 'এখন আর কোনো হিজরত নেই। সে যুগে ফিতনা থেকে বাঁচতে মু'মিনরা তাদের দ্বীন নিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে পালিয়ে আসতে চাইত। কিন্তু এখন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল ইসলামকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন যে, একজন মুসলিম যেখানে ইচ্ছা আল্লাহর ইবাদাত করতে পারে। তবে তোমাদের জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ করা উচিত এবং জিহাদের নিয়্যত রাখা উচিত।'
আজ থেকে আর কোনো হিজরত নেই- এই কথার অর্থ এই নয় যে হিজরতের আদেশ রহিত হয়ে গেছে। বরং এ কথা দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, মক্কা থেকে মদীনায় আর হিজরত করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু জিহাদ করার উদ্দেশ্যে হিজরত করা অথবা ভালো নিয়ত, যেমন ভালোভাবে দ্বীন পালনের উদ্দেশ্যে হিজরত করা- এ দুটো আদেশ ক্বিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। ইবন কাসীর এই ব্যাপারে মন্তব্য করেন, '(সাধারণভাবে) এখন আর হিজরত নেই, তবে এমন কিছু পরিস্থিতি আছে যখন হিজরত করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। যেমন হারবিদের (মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত কুফফার দেশ বা গোষ্ঠী) কাছাকাছি থাকলে আর তাদের মাঝে প্রকাশ্যে দ্বীন পালনের সুযোগ না থাকলে সেখান থেকে হিজরত করা বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে আলিমরা একমত।'
অর্থাৎ, হিজরতের হুকুম এখনো আছে। পরিস্থিতিভেদে সেটা আবশ্যক অথবা ঐচ্ছিক হতে পারে। যদি কাফিরদেশে নিজের দ্বীন প্রকাশ করা বা পালন করা সম্ভব না হয়, তাহলে সেই ভূমি থেকে ইসলামের ভূমিতে অথবা এমন কোনো দেশে হিজরত করা উচিত যেখানে স্বাধীনভাবে ইসলাম পালন করতে কোনো বাধা নেই। প্রকাশ্যে দ্বীন পালন বলতে ব্যক্তিগত আহকামগুলো নয়, বরং ইসলামের সবগুলো আহকাম পালন করার সুযোগ থাকতে হবে।
বর্তমানে কোনটা কুফরের ভূমি ও কোনটা হারবি ভূমি সেটা স্পষ্ট। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো স্পষ্ট ইসলামের ভূমি নেই। তাই বর্তমান সময়ের জন্য হুকুম হলো একজন মুসলিমের সেখানেই হিজরত করা উচিত, যেখানে সবচেয়ে ভালোভাবে আল্লাহর ইবাদাত করা যাবে। বিষয়টা কিছুটা আপেক্ষিক। একজন মুসলিম যদি তার দেশে সঠিকভাবে আল্লাহর ইবাদাত করতে পারে, তাহলে সে সেখানে থাকতে পারে। কিন্তু যদি তা না হয়, তাহলে তার এমন কোনো জায়গা খুঁজে বের করা উচিত, যেখানে সে তার দ্বীন নিয়ে সবচেয়ে কম ভীত থাকবে। এখানে যেটা দেখতে হবে সেটা হলো দ্বীন, দুনিয়া নয়। হতে পারে, কোনো একটি দেশে তার দুনিয়া নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। কিন্তু সেখানে দ্বীন পালনে বাধা আসছে। আবার আরেকটি দেশে দ্বীন পালনে বাধা তুলনামূলক কম, কিন্তু দুনিয়াবি আরাম-আয়েশের বিবেচনায় সে জায়গাটি আরামদায়ক নয়। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় দেশে হিজরত করাটাই দ্বীনের দাবি।
টিকাঃ
১০৯. বুখারী, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস নং ২৬৩১।
📄 বিজয়ের আগের ও পরের মুসলিমরা সমান নয়
আমর ইবন সালামা ছিলেন মক্কার বাইরে থেকে আসা একজন সাহাবি। তিনি তার ছোটবেলার কথা বর্ণনা করেন,
'আমাদের সামনে দিয়ে কোনো মুসাফির গেলেই আমরা তাকে মুহাম্মাদের কথা জিজ্ঞেস করতাম। তারা বলতো, তিনি দাবি করেছেন যে, আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন আর তাঁর কাছে আল্লাহর কাছ থেকে ওয়াহী আসে। আর তিনি মাত্রই অমুক-তমুক ব্যাপারে ওয়াহী লাভ করেছেন। আমি এমনভাবে এই শব্দগুলো (কুরআনের আয়াত) মুখস্থ করতাম যে তা আমার অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল।'
অর্থাৎ মুহাম্মাদ সম্পর্কে গোটা আরব অনেক আগে থেকেই খোঁজ খবর রাখত। যদিও তখনো তাদের বেশিরভাগ মুসলিম হয়নি। ইসলাম ছিল সেই সময়ের পত্রিকার হেডলাইন। আমর ইবন সালামা তখন একজন শিশু। কিন্তু মানুষের কথাবার্তা তার কানে আসতো আর এভাবে তিনি কুরআনের অনেক আয়াত মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। অথচ তার গোত্রের লোকেরা তখন কাফির ছিল।
আরবরা দলে দলে মুসলিম হয়েছে মক্কা বিজয়ের পরে। আসলে তারা দেখতে চাইছিল কুরাইশ বনাম মুহাম্মাদের এই দ্বন্দ্বে কে জয়ী হয়। গণমানুষ এভাবেই চিন্তা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তারা সত্যের সন্ধান করে না, বরং তারা জয়ী দলের সন্ধান করে। তারা দেখে কারা বিজয়ী হচ্ছে আর তারপর বিজয়ী দলের অনুসরণ করে। তাই সে যুগের আরবরা বলতো, 'মুহাম্মাদ যদি তাঁর নিজ গোত্রের বিপক্ষে হেরে যান তাহলে তাঁকে আর তাঁর গোত্রকে ছেড়ে দাও। আর যদি তিনি বিজয়ী হন, তাহলে তিনি একজন নবী ও তিনি সত্যবাদী।'
এই মানসিকতা ত্রুটিপূর্ণ। বিজয় সত্যের মানদণ্ড নয়। আমরা রাসূলুল্লাহর হাদীস থেকে জানি এমন কিছু নবী এই দুনিয়ায় ছিলেন, যাদের অনুসারী ছিল খুবই কম। দশ, পাঁচ, দুই বা একজন। এমন নবীও ছিলেন, যাদের কোনো অনুসারীই ছিল না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা ভুলের ওপরে ছিলেন বা তারা ব্যর্থ হয়েছেন। কেননা, হিদায়াত আল্লাহর হাতে, নবীর দায়িত্ব কেবল দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া। একজন নবী যদি সঠিকভাবে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, তাহলে তিনি সফল। ইসলাম এভাবেই সফলতাকে সংজ্ঞায়িত করে, জয়-পরাজয়ের ভিত্তিতে নয়।
সংখ্যাগরিষ্ঠ আরবজনতার বিপরীতে স্বল্পসংখ্যক মানুষই ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তারা জানতো, আল্লাহর রাসূল হচ্ছেন সত্য নবী। তাই তারা বিজয়ের অপেক্ষা করেনি। ইসলামকে সত্য জেনে মুসলিম হয়ে ইসলামের জন্য ত্যাগ স্বীকারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে তারা কখনো একই রকম (মর্যাদার অধিকারী) হবে না যারা (মক্কা) বিজয়ের আগে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে। তাদের মর্যাদা ওদের তুলনায় বেশি যারা (মক্কা) বিজয়ের পর (আল্লাহর পথে) ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে। (অবশ্য) আল্লাহ উভয়ের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তোমরা যা করো আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত।” (সূরা হাদীদ, ৫৭: ১০)
সুতরাং বিজয়ের আগে মুসলিম হওয়া আর পরে মুসলিম হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যারা মক্কা বিজয়ের আগে মুসলিম হয়েছে, হিজরত ও জিহাদ করেছে, তাদের মর্যাদা মক্কা বিজয়ের পরের মুসলিমদের চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে এই আয়াতটি মুসলিমদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। কারণ, বর্তমানে ইসলাম শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় নেই। কাজেই ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগে এই প্রতিকূল পরিবেশে যারা ইসলামকে আঁকড়ে ধরবে, ইসলামের জন্য ত্যাগ স্বীকার করবে, তাদের মর্যাদা ও পুরস্কার নিঃসন্দেহে সেসব লোকের চাইতে বেশি যারা ইসলামের বিজয় দেখার পর ইসলামের বাহিনীতে যোগ দেবে।