📄 বনু জাদীমার অভিযানে খালিদ ইবন ওয়ালিদের ؓ ভুল ও প্রাপ্ত শিক্ষা
অষ্টম হিজরীর শাওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ খালিদ ইবন ওয়ালিদকে বনু জাদীমাহ গোত্রের কাছে পাঠালেন। তারা প্রথমে যুদ্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু খালিদকে দেখে দমে গেল। খালিদ তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করতে রাজি হলো। কিন্তু সরাসরি 'আমরা মুসলিম হয়েছি' না বলে তারা বললো, 'সাবা'আনা।'
যখন কেউ মুসলিম হতো, তখন কুরাইশরা তাচ্ছিল্য করে বলতো, 'সে সাবেঈ হয়ে গেছে।' যেহেতু অন্যেরা এই শব্দটি ব্যবহার করে, তাই তারাও তাই বললো। কিন্তু আসলে তারা মুসলিমই হতে চাচ্ছিল কিন্তু 'আসলামনা' বলার মতো জ্ঞান তাদের ছিল না।
খালিদ ইবন ওয়ালিদের কাছে সেটি গ্রহণযোগ্য হলো না। তিনি তাদের কথা বুঝতে ভুল করে কাফির ভেবে তাদের হত্যা করা শুরু করলেন। কিন্তু কিছু মুসলিম সৈনিকের প্রবল প্রতিবাদের মুখে খালিদ থেমে গেলেন এবং ঐ গোত্রের বাকিদের বন্দী করে প্রত্যেক বন্দীকে একজন করে সৈনিকের হাতে অর্পণ করলেন।
পরদিন সবাইকে নিজেদের বন্দীকে হত্যা করতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবন উমার এবং আরও কয়েকজন এই আদেশ প্রত্যাখ্যান করলেন। বিষয়টি পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহর কাছে উত্থাপন করা হলো। রাসূলুল্লাহ খুবই রেগে গেলেন। বললেন, 'হে আল্লাহ, আমি ঘোষণা দিচ্ছি যে খালিদ যা করেছে তা থেকে আমি মুক্ত।'
আবদুল্লাহ ইবন উমার ঠিকই বুঝতে পারছিলেন খালিদ ভুল করছেন। এই লোকগুলো ইসলাম গ্রহণ করার পরেও তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে ও বন্দী করা হয়েছে। বিষয়টি এমন নয় যে, আমীরের আনুগত্য করার বাধ্যবাককতা সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবন উমার জানতেন না। তিনি জানতেন। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন যে, আমীরের আনুগত্য ততক্ষণ পর্যন্তই করতে হবে যতক্ষণ তিনি যা নির্দেশ দিচ্ছেন তা হালাল। হারাম কাজের আদেশ দিলে আমীরের আনুগত্য করা যাবে না। সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ একটি বিপজ্জনক ব্যাপার। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবন উমার এবং তার বন্ধুরা জেনেশুনেই আমীরের নির্দেশ অমান্য করেছেন। আর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটাই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত।
এই সারিয়াহর সময় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। গ্রেপ্তারকৃত লোকদের মধ্যে একজন লোক ছিল বহিরাগত। সে জাদীমাহ গোত্রের ছিল না। সে এসেছিল এক মহিলাকে ভালোবেসে। হাত বাঁধা অবস্থায় সে তার পাহারায় থাকা মুসলিম সৈন্যকে অনুরোধ করলো, 'আমাকে একবার ঐ মহিলার কাছে যেতে দাও। এরপর তোমাদের যা ইচ্ছা হয়, তা-ই করো।'
তাকে যেতে দেওয়া হলো। সে ঐ মহিলার কাছে গিয়ে বললো, 'হুবাইশ, জীবনের ইতি হওয়ার আগেই ইসলাম গ্রহণ করো!' মহিলাটি বললো, 'আমি তো তোমার জন্য নিজেকে বিসর্জন দিয়েছি।' এতটুকুই তাদের মধ্যে কথা হলো। এরপর লোকটিকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা হলো। মহিলাটি সেই দৃশ্য দেখে লোকটির কাছে এল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হঠাৎ নিজেও তার পাশে পড়ে গিয়ে মারা গেল।
এই ঘটনাটি জানতে পেরে রাসূলুল্লাহর খুব খারাপ লাগলো। তিনি বললেন, 'তোমাদের কারো মনে কি একটুও দয়া হলো না?'
সেখানে হত্যা করা তো ভুল ছিলই, তার ওপর লোকটিকে এভাবে হত্যা করা ছিল খুবই দুঃখজনক। পুরো ঘটনাটা রাসূলুল্লাহকে কষ্ট দেয়। তিনি দিয়্যাহ বা রক্তপণ পরিশোধ করার জন্য আলী ইবন আবি তালিবকে পাঠালেন। কেননা লোকগুলো ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাদেরকে সমস্ত কিছুর জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলো। রক্তপণ ছাড়াও যা কিছু হারানো গিয়েছিল, যা কিছু তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল তার সবকিছুর জন্য আলী ক্ষতিপূরণ দিলেন। এরপরেও কিছু অর্থ বেঁচে গিয়েছিল। যদি তাদের কোনো কাজে লাগে এই ভেবে আলী সেটাও তাদেরকে দিয়ে দিলেন।
ইবনে কাসীর এই ঘটনা নিয়ে একটি মন্তব্য করেছেন, তিনি বলছেন,
'খালিদ ইবন ওয়ালিদ ঐ গোত্রের অনেকজনকে হত্যা করেছিলেন। আর প্রায় সব বন্দীকে মেরে ফেলেছিলেন। কিন্তু এরপরেও রাসূলুল্লাহ খালিদকে বরখাস্ত করেননি। সেনাবাহিনীর আমীর পদে তাকে বহাল রাখেন। যদিও রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, খালিদ যা করেছে তার দায় থেকে তিনি মুক্ত। কিন্তু খালিদ হত্যা ও সম্পদ কেড়ে নিয়ে যে ভুল করেছিলেন সেই ভুলের মাশুলস্বরূপ রাসূলুল্লাহ ক্ষতিপূরণও দিয়েছিলেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আলিমরা মত দিয়েছেন যে, ইমাম যদি কোনো ভুল করেন তখন সেটার ক্ষতিপূরণ ইমামের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে নয়, বরং মুসলিমদের কোষাগার থেকে দেওয়া হবে। আল্লাহই ভালো জানেন।'
আর এই কারণে আবু বকর আস সিদ্দীকও তাকে তার পদে বহাল রেখেছিলেন। আবু বকর সিদ্দীক বলেছিলেন, 'আমি সেই তলোয়ারকে কোষবদ্ধ করতে চাই না, যে তলোয়ারকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল মুশরিকদের উপরে কোষমুক্ত করেছেন।' তবে উমার ইবন খাত্তাবের সময়ে খালিদকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
জিহাদের সময়ে মুসলিমদের দ্বারা ভুলত্রুটিগুলোকে কীভাবে সুন্নাহ অনুসারে সামলানো যায়, সে ব্যাপারে এই ঘটনার মাঝে শিক্ষা রয়েছে। খালিদ ইবন ওয়ালিদ কিছু মুসলিমকে হত্যা করেছিলেন কিন্তু সেজন্যে তাকে কারাবন্দী করা হয়নি বা তার পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়নি। রাসূলুল্লাহ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে, এই কাজের সাথে তিনি একমত নন। তিনি খালিদকে শাস্তি দিলেন না। কারণ, যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতিকে দ্রুত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই ক্ষেত্রবিশেষে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। তবে আমীর হিসাবে রাসূলুল্লাহ নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দিলেন।
একজন মুসলিমকে কখনোই কাফিরদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। একজন মুসলিমের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'মুসলিমরা একে অপরের ভাই। সে তাকে শত্রুর হাতে তুলে দেয় না। তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে না এবং তার উপর অত্যাচার করে না।' বর্তমান সময়ে বিষয়টিকে ঘিরে বেশ কিছু বিভ্রান্তি আছে। দুর্ভাগ্যবশত কিছু মুসলিম কাফিরদের রক্তকে মুসলিম রক্তের চেয়ে বেশি মূল্য দেয়। তারা তাদের মুসলিম ভাইদেরকে কাফিরদের হাতে তুলে দিতে চায় এবং কাফিরদের সাথে এক হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকেও জায়েয মনে করে। এর কারণ মানুষের মধ্যে আল ওয়ালা ওয়াল বারার জ্ঞানের অভাব। এই বিষয়ের ওপর মুসলিমদের আরও মনোযোগ দেওয়া জরুরি। তাদের জানা দরকার যে, মুসলিমরা কাদের প্রতি অনুগত এবং কাদের ব্যাপারে দায়মুক্ত।
টিকাঃ
১০৭. সহীহ বুখারি, অধ্যায় বিচার, হাদীস ৫১।