📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সুহাইল ইবন আমর ؓ

📄 সুহাইল ইবন আমর ؓ


সুহাইল ইবন আমর ছিলেন ইসলামের একজন গোড়া শত্রু। বদর, উহুদ -- প্রতিটি যুদ্ধে কুরাইশদের পক্ষে সুহাইলের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় তিনি আল্লাহর রাসূলকে অসম্মান করে কিছু আপত্তিকর কথাও বলেছিলেন। স্বাভাবিকভাবে মক্কা বিজয়ের পরে সুহাইল নিজের জান বাঁচাতে পালিয়ে যায়। কারণ, মুসলিমদের বিরোধিতায় সে যা করেছে, তাতে তার মৃত্যুদণ্ড হওয়াই ছিল স্বাভাবিক।

পালিয়ে গেলেও তার মনে সূক্ষ্ম আশা ছিল হয়তো আল্লাহর রাসূল তাকে ক্ষমা করে দিতেও পারেন। তাই সুহাইল তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবন সুহাইলকে ক্ষমার আশায় আল্লাহর রাসূলের কাছে পাঠালেন। আল্লাহর রাসূল এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, 'আল্লাহর শপথ! সে নিরাপদ, তাকে আসতে বলো!'

আল্লাহর রাসূল শুধু সুহাইলকে ক্ষমাই করলেন না, বলা চলে তাকে স্বাগত জানালেন। সাহাবিদের বলে দিলেন, কেউ যেন রাগের দৃষ্টিতেও সুহাইলের দিকে না তাকায়। বললেন, 'সুহাইলের মতো একজন বুদ্ধিমান আর অভিজাত লোক ইসলাম সম্পর্কে জানবে না -- তা কী করে হয়!'

সুহাইল মক্কায় ফিরে এলেন। তিনি তখনই ইসলাম গ্রহণ করলেন না। তবে আল্লাহর রাসূলের প্রশংসা না করে তিনি পারলেন না। বললেন, 'তারুণ্যে আর বার্ধক্যে, তিনি ছিলেন সবসময়ই বিশ্বস্ত আর ভালো মানুষ।' আসলে আল্লাহর রাসূলের চরিত্র এমন ছিল যে শত্রুরাও তাঁর ব্যক্তিত্বকে সম্মান না দিয়ে পারতো না। এই ঘটনার পর সুহাইল কিছুদিন মুশরিক অবস্থাতেই থেকে যান। হুনাইনের যুদ্ধে তিনি আল্লাহর রাসূলের সাথে অভিযানে বের হন এবং মুসলিম হয়ে যান।

ইসলাম পরবর্তী জীবনে সুহাইল ইবন আমর কেমন মুসলিম ছিলেন? এ প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক যেহেতু এই সুহাইল বছরের পর বছর ছিলেন ইসলামের বিরুদ্ধে সক্রিয় শত্রু। আয-যুবাইর ইবন বাকর বলেছেন, 'ইসলাম গ্রহণের পর সুহাইল নিয়মিতভাবে সালাত, সিয়াম, যাকাত আদায় করতেন। এমনকি তিনি নিজের দল নিয়ে শামে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে বেরিয়ে পড়েন। তিনি এত বেশি সিয়াম আর কিয়াম পালন করতেন যে, তার মুখ শুকিয়ে যেত। কুরআন শুনলে তিনি কাঁদতেন। আর ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি ছিলেন কিরদূস ব্যাটালিয়নের কমান্ডার।'

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা ؓ

📄 সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা ؓ


সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার কথা এর আগেও এসেছে। সে ছিল ইসলামের একজন নামকরা শত্রু। বদরের পর আল্লাহর রাসূলকে গুপ্তহত্যার পরিকল্পনাকারী ছিল এই সাফওয়ান। মক্কা বিজয়ের পর সেও সুহাইলের মতো মৃত্যুভয়ে পালিয়ে যায়। জেদ্দার কাছে আশ-শুয়াইবায় আত্মগোপন করে।

তার পিছু নেয় তারই বন্ধু উমায়ের ইবন ওয়াহাব। এই উমায়ের ইবন ওয়াহাব-ই সাফওয়ানের পরিকল্পনামতো বদরের যুদ্ধের পর আল্লাহর রাসূলকে বিষ মাখানো তরবারি নিয়ে হত্যা করতে এসে মুসলিম হয়ে গিয়েছিল।

যাই হোক, উমায়ের জেদ্দায় সাফওয়ানের দেখা পায়। উমায়েরকে দেখে সাফওয়ান ভাবলো নিশ্চয়ই উমায়ের তাকে হত্যা করতে এসেছে। সাফওয়ানের বদ্ধমূল ধারণা ছিল আল্লাহর রাসূল নির্ঘাৎ তাকে হত্যা করবেন। কারণ ইসলামের শত্রুতায় সে যা করেছেন, তাতে তার ছাড়া পাবার কথা নয়। অবশ্য উমায়েরের সাথে কথা বলে একটু পরেই তার ভুল ভাঙলো। উমায়েরকে সে বললো,
- তুমি কেন এসেছো? তোমার সব ঋণের দায়ভার আমি নিয়েছিলাম। আর এখন সেই তুমি আমাকে হত্যা করতে এসেছ?
- সাফওয়ান! আমি তো এমন একজন মানুষের কাছ থেকে এসেছি যিনি সবচেয়ে মহৎ, দয়ালু আর সজ্জন ব্যক্তি।
- না! আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না! তোমার কথার প্রমাণ কী?

সাফওয়ানের বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে, আল্লাহর রাসূল তাকে নিরাপত্তা দিতে পারেন! আসলে উমায়ের ইবন ওয়াহাব আগেই আল্লাহর রাসূলের কাছে সাফওয়ানকে নিরাপত্তা দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। উমায়ের বলেছিলেন, 'আল্লাহর রাসূল, সাফওয়ান তার গোত্রের নেতা। তাকে আপনি নিরাপত্তা দান করুন।' তখন রাসূলুল্লাহ বলেন, 'ঠিক আছে, নিরাপত্তা দিলাম।' উমায়ের তখন নিরাপত্তার চিহ্নস্বরূপ কিছু চাইলে তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর পাগড়ী খুলে উমায়েরকে দেন।

সাফওয়ান প্রথমে মক্কায় ফিরে যেতে সাহস করছিল না। উমায়ের তাকে অভয় দিয়ে বললেন, 'আমি এমন একজন মানুষের কাছ থেকে এসেছি যিনি সবচেয়ে দয়ালু, সহানুভূতিশীল এবং ক্ষমাশীল। তিনি তোমার চাচা। তাঁর মর্যাদাই তোমার মর্যাদা। তাঁর রাজত্বই তোমার রাজত্ব।' শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর পাগড়ী দেখে সাফওয়ান আশ্বস্ত হয়ে মক্কায় ফিরে যায়। ফিরে এসে সাফওয়ান রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করল, 'এই লোকটি বলছে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন আর আমাকে নিরাপত্তা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেটা কি ঠিক?' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'হ্যাঁ, সে ঠিকই বলেছে।' সাফওয়ান বললো, 'ঠিক আছে, আমাকে দুই মাস সময় দিন।' মুসলিম হওয়ার ব্যাপারে ভাবনা-চিন্তা করতে এই সময়টুকু সে চাইলো। রাসুলুল্লাহ তাকে চার মাস সময় দিলেন। পরবর্তীতে হাওয়াজিনের যুদ্ধের সময়ে সাফওয়ান ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়ে যায়। সে সময় আল্লাহর রাসূল তাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ দান করে তার মন জয় করেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 ইকরিমা ইবন আবু জাহল ؓ

📄 ইকরিমা ইবন আবু জাহল ؓ


পিতা আবু জাহলের মৃত্যুর পর তার ছেলে ইকরিমা কুরাইশদের নেতৃত্বের আসনে আসীন হয়। তার ছিল একটাই চাওয়া। যেকোনোভাবে আল্লাহর রাসূল ও সাহাবিদের হত্যা করে পিতা হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া। কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী মক্কা বিজয়ের পর ইকরিমাও কালো তালিকাভুক্ত ছিল।

আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে ইকরিমা ইয়েমেনে পালিয়ে গেল। তার স্ত্রী উম্ম হাকিম ছুটে গেলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে। বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, ইকরিমা তো ইয়েমেন পালিয়ে গেছে। সে ভয় পাচ্ছে আপনি তাকে হত্যা করে ফেলবেন। আপনি দয়া করে তাকে নিরাপত্তা দান করুন।'

আল্লাহর রাসূল রাজি হলেন। উম্ম হাকিম এই সুসংবাদ নিয়ে তার স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে ছুটে গেল। ইকরিমা তখন তিহামায় এক নৌকায় বসে আছে। কিছুক্ষণ পরেই যাত্রা শুরু হবে। এ অবস্থায় উম্ম হাকিম ইকরিমাকে পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন,
- আমার সাথে মক্কায় ফিরে চলো। আমি আল্লাহর রাসূলের সাথে কথা বলেছি। তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দিতে রাজি হয়েছেন।
- সত্যি বলছো?
- হ্যাঁ, আমি তাঁর সাথে কথা বলেছি। তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।

ইকরিমা তার স্ত্রীর সাথে মক্কায় ফেরত আসলো। ইকরিমা তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে চাইল কিন্তু তার স্ত্রী রাজি হলো না। বললো, 'তুমি একজন কাফির আর আমি একজন মুসলিম!'

ইকরিমা একটা ধাক্কা খেলো। শুধুমাত্র অমুসলিম হওয়ার কারণে তার স্ত্রী তাকে এভাবে প্রত্যাখ্যান করবে এটা সে ভাবতেই পারেনি। ইসলামের প্রতি কতটা ভক্তি থাকলে তার স্ত্রী এমনটা করতে পারে? বিষয়টা ইকরিমাকে ইসলাম নিয়ে ভাবতে বাধ্য করল। কিছুক্ষণ পর সে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে আল্লাহর রাসূলের সাথে দেখা করতে আসলো। আল্লাহর রাসূল ইকরিমাকে দেখে খুব খুশি হলেন। কিন্তু ইকরিমা তখনো সন্দিহান। জানতে চাইলেন,
- আপনি কি সত্যিই আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন?
- হ্যাঁ, দিয়েছি। তুমি নিরাপদ।
- আপনি আমাকে কীসের প্রতি আহবান করেন?
- আমি তোমাকে এই সাক্ষ্য দিতে আহবান করি যে, এক আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের যোগ্য আর কোনো সত্তা নেই। আমি আহবান করি তুমি সাক্ষ্য দাও যে, আমি আল্লাহর রাসূল। আর তুমি সালাত ও যাকাত আদায় করবে।
- আল্লাহর শপথ! আপনি তো কেবল সত্য আর যা কিছু সুন্দর, তার প্রতি আহবান করছেন। সত্যি বলতে, এই আহবান করার আগেও আপনি ছিলেন আমাদের মাঝে সবচাইতে সত্যবাদী, বিশ্বস্ত আর মহৎ একজন মানুষ। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের যোগ্য আর কোনো সত্তা নেই আর আপনি হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল।

আল্লাহর রাসূল খুবই খুশি হলেন। এবার ইকরিমার ক্ষমা চাওয়ার পালা। সে বললো,
- আল্লাহর রাসূল! আমি যতবার আপনার সাথে শত্রুতা করেছি, যতবার যুদ্ধে আপনার মোকাবেলা করেছি, আপনার সামনে-পেছনে যতবার আপনার ব্যাপারে মিথ্যা বলেছি, আমি চাই আপনি প্রতিবারের জন্যই আল্লাহর কাছে আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

আল্লাহর রাসূল তার অনুরোধ রাখলেন। বললেন,
- হে আল্লাহ! তুমি ইকরিমাকে ক্ষমা করে দাও -- সে যতবার শত্রুতা করেছে, যতবার তোমার দ্বীনের আলো নিভিয়ে দিতে চেয়েছে- প্রতিবারের জন্যই তাকে ক্ষমা করে দাও। আমার সামনে-পেছনে সে যতবার নিন্দা করেছে, তাকে সেসবের জন্য ক্ষমা করে দাও!
- হে আল্লাহর রাসূল! আমি খুব খুশি! আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখতে আমি যত টাকা খরচ করেছি, কথা দিচ্ছি, আল্লাহর পথে আমি এবার দ্বিগুণ খরচ করবো! আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আমি যত কষ্ট করেছি, কথা দিচ্ছি, আমি এখন থেকে আল্লাহর দ্বীনের জন্য তার দ্বিগুণ কষ্ট করবো!

ইকরিমা তার কথা রেখেছিলেন। তিনি একজন ভালো মুসলিম এবং মুজাহিদ হিসেবে বাকি জীবন কাটিয়ে দেন। রিদ্দার যুদ্ধ, শামের যুদ্ধ-- এরকম অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ জিহাদে অংশ নিয়ে শেষ পর্যন্ত ইয়ারমুকের যুদ্ধে শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px