📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 কালো তালিকা

📄 কালো তালিকা


সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও কিছু জঘন্য অপরাধীর জন্য একটি কালো তালিকা তৈরি করা হয়। এদের ক্ষমা করা হয়নি। এই কালো তালিকায় ছিল নয় থেকে তেরো জন মানুষ। এরা হলো আব্দুল উযযাহ ইবন খাতাল এবং তার দুই দাসী, আব্দুল্লাহ ইবন সাদ আবি সারাহ, মাকিস ইবন সাবাবাহ, আল হুয়াইরিস ইবন নাকিস, হাব্বার ইবন আল-আসওয়াদ এবং সারাহ। ভিন্ন বর্ণনায় ভিন্ন ভিন্ন নামও এসেছে। এদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ বলেন, 'তাদেরকে হত্যা করো, যদি তারা আল কাবার গিলাফ (পর্দা) ধরে ঝুলে থাকে, তবুও!'

আব্দুল্লাহ ইবন খাতাল ছিল একজন মুহাজির মুসলিম। একবার রাসূলুল্লাহ তাকে কর সংগ্রহ করার কাজে পাঠান, তার দাস তার সাথে ছিল। পথিমধ্যে কোনো কারণে সে তার দাসের ওপর রেগে গিয়ে তাকে মেরে ফেলে। সে জানতো কাজটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাসূলুল্লাহ তাকে কোনো ছাড় দেবেন না। ইসলাম ন্যায়ের ধর্ম, চাকর হোক, মালিক হোক -- সবার জন্যই ন্যায় বিচার। আবদুল্লাহ ইবন খাতাল শাস্তির ভয়ে মক্কায় পালিয়ে যায় এবং ইসলাম ত্যাগ করে। হত্যার আদেশ জারি হওয়ার পর সে কাবাঘরের গিলাফ ধরে ঝুলে থাকে। তাকে সে অবস্থাতেই হত্যা করা হয়।

তার দুজন দাসী ছিল -- ফারতানা এবং আরনাব। আল্লাহর রাসূলের কুৎসামূলক গান গাওয়ার অপরাধে তাদের দুইজনকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে একজনকে হত্যা করা হয় এবং অপরজন মুসলিম হয়ে ছাড়া পেয়ে যায়।

আব্দুল্লাহ ইবন আবি সারাহ ছিল একজন মুসলিম এবং কুরআন সংরক্ষণকারী। কিন্তু পরবর্তীতে ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে সে মক্কায় পালিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে সে গলাবাজি করতে থাকে, 'আমি কুরআন পাল্টে ফেলবো! কুরআন লিখে তার অর্থ বদলে দেবো!' মক্কা বিজয়ের দিন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এলে সে তার দুধ ভাই উসমান ইবন আফফানের কাছে নিরাপত্তা চায়। উসমান তাকে নবীজির কাছে নিয়ে যান।

আবদুল্লাহ ইবন আবি সারাহ রাসূলুল্লাহকে বললেন, 'আমি আপনাকে বাইয়াত দিতে এসেছি।' নবীজি চুপ করে রইলেন, সে আবার বললো, 'আমি আপনাকে বাইয়াত দিতে এসেছি।' রাসূলুল্লাহ এবারও কোনো উত্তর দিলেন না। তৃতীয়বারে নবীজি তার বাইয়াত গ্রহণ করলেন।

সে চলে যাবার পর নবীজি উপস্থিত সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কি বুদ্ধিমান কেউ ছিল না? আমি তো এজন্য চুপ করেছিলাম যেন তোমাদের কেউ উঠে এসে তার গর্দানটা উড়িয়ে দেয়।' একজন সাহাবি বললেন, 'ইশ! আপনি যদি আমাদেরকে একটু ইশারা করতেন!' নবীজি উত্তর দিলেন, 'ইশারা দিয়ে হত্যা করা কোনো নবীর জন্য শোভা পায় না।

আব্দুল্লাহ ইবন আবি সারাহ অদ্ভুতভাবে বেঁচে গেল। তবে সে জীবনের শেষপর্যন্ত ভালো মুসলিম হয়ে বেঁচে ছিল। তার মৃত্যু ঘটে ফজরের নামাযে সিজদারত অবস্থায়। উমার ইবন খাত্তাব এবং উসমানের শাসনামলে তিনি বেশ ভালো পদে নিযুক্ত ছিলেন।

মাকিস ইবন হুবাবার ভাই ছিলেন একজন মুসলিম। বনু মুসতালিকের যুদ্ধে তার ভাই এক আনসারী মুসলিমের হাতে ভুলক্রমে নিহত হন। মাকিস তখন হিজরত করে মদীনায় আসেন শুধুমাত্র তার ভাইয়ের মৃত্যুর ক্ষতি পূরণের টাকার লোভে। ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়ে সে পালিয়ে মক্কায় ফিরে আসে এবং মুরতাদ হয়ে যায়।

হুয়াইরিস ইবন নাকিসের অপরাধ ছিল সে মক্কায় আল্লাহর রাসূলকে নানাভাবে কষ্ট দিতো। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় সে আল্লাহর রাসূলের দুই কন্যা ফাতিমা এবং উম্ম কুলসুমকে উত্ত্যক্ত করে। একই রকম অপরাধ করেছিল হাব্বাব ইবন আসওয়াদ। সে হিজরতের সময় আল্লাহর রাসূলের কন্যা যাইনাবকে বর্শা উঁচিয়ে ভয় দেখায়। তখন যাইনাব ছিলেন গর্ভবতী। এ ঘটনায় যাইনাবের গর্ভপাত হয়ে যায়। হুয়াইরিসকে হত্যা করা হয় কিন্তু হাব্বাব পরবর্তীতে মুসলিম হয়ে ফিরে আসে এবং তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর সারাহ ছিল হাতিব ইবন আবি বালতার পত্রবাহিকা, মাক্কী যুগে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে গান গাইতো। তার জন্য নিরাপত্তা চাওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত সে বেঁচে যায়।

কালো তালিকায় আরও কিছু ব্যক্তির নাম ভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। এখানে উল্লেখ্য, যাদের নাম কালো তালিকাভুক্ত ছিল এদের প্রায় সবার অপরাধ ছিল হয় রিদ্দা নয়তো আল্লাহর রাসূলের নিন্দা করা। তীব্রতার মাত্রায় এই দুটো অপরাধ ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ। যে কারণে মক্কার সাধারণ কাফিরদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও এ দুটি অপরাধের সাথে যুক্তদের ক্ষমা করা হয়নি। এ দুটি অপরাধের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। একজন কাফির যুদ্ধবন্দী হলে তাকে হত্যা করা, মুক্ত করে দেয়া, দাস হিসেবে রাখা বা তার থেকে মুক্তিপণ আদায় করা কিংবা তাকে বন্দী বিনিময়ে ব্যবহার করা - এর যেকোনোটির সিদ্ধান্ত ইমাম নিতে পারেন। কিন্তু মুরতাদের ক্ষেত্রে একটিই বিধান। তা হলো মৃত্যুদণ্ড। শুধুমাত্র সে যদি পুনরায় মুসলিম হয়ে যায়, সেক্ষেত্রেই তাকে ছেড়ে দেওয়া যাবে।

উম্ম হানি ছিলেন আলী ইবন আবি তালিবের বোন। মক্কা বিজয়ের দিন তার শ্বশুর বাড়ির দুই আত্মীয় তার কাছে আশ্রয় চাইলে তিনি তাদের আশ্রয় দেন। কিন্তু আলী বিষয়টি পছন্দ করলেন না। তিনি তাদের হত্যা করতে চাইলেন। উম্ম হানি তখন রাসূলুল্লাহর শরণাপন্ন হলেন। রাসূলুল্লাহ খুব খুশি হয়ে তাকে স্বাগত জানালেন, জানতে চাইলেন কী হয়েছে। উম্ম হানি সবকিছু খুলে বলার পর সব শুনে রাসূলুল্লাহ বললেন, 'সমস্যা নেই, তুমি যাদের নিরাপত্তা দিয়েছো আমিও তাদের নিরাপত্তা দিলাম।'

টিকাঃ
১০৩. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৫০।
১০৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০৭।
১০৫. সুনান আন-নাসাই, অধ্যায় রক্তপাত নিষিদ্ধকরণ, হাদীস ১০২।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মক্কার পবিত্রতা ঘোষণা

📄 মক্কার পবিত্রতা ঘোষণা


মক্কা বিজয়ের পরদিন আল্লাহর রাসূল সবার উদ্দেশ্যে বললেন :
'আল্লাহ তাআলা যেদিন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেই একই দিন তিনি মক্কাকে পবিত্র স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। আর ক্বিয়ামত পর্যন্ত এই পবিত্রতা বলবৎ থাকবে। আল্লাহ এবং শেষ বিচার দিবসে বিশ্বাসী কারো জন্য মক্কায় রক্তপাত করা কিংবা গাছ কাটা বৈধ নয়। আমার আগেও এমনটা করা বৈধ ছিল না। আমার পরেও তা কারো জন্য বৈধ হবে না। যদি কেউ প্রশ্ন তোলে, তাহলে আল্লাহর রাসূল কেন এখানে রক্তপাত করেছেন? তবে তাকে বলবে, আল্লাহ তাঁকে সেই অনুমতি দিয়েছেন। এই অনুমতি তোমাদের দেওয়া হয়নি। আর আমার ক্ষেত্রে এটা কিছু সময়ের জন্যই বৈধ করা হয়েছে। আগে এখানে খুনখারাবি রক্তপাত নিষিদ্ধ ছিল। ভবিষ্যতেও তা-ই থাকবে।'

টিকাঃ
১০৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২২।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বিশৃঙ্খলা দমন

📄 বিশৃঙ্খলা দমন


বনু হুযায়ল গোত্রের সাথে বনু খুযাআর একটি বিরোধ ছিল। জাহিলিয়াতের যুগে বনু হুযাইলের ইবন আসওয়া বনু খুযাআর এক লোককে হত্যা করে। মক্কা বিজয়ের পর তারা এই হত্যার প্রতিশোধ নেয়। খুযাআর লোকেরা ইবন আসওয়াকে মেরে ফেলে। বনু খুযাআ ছিল মুসলিম গোত্র। হুদাইবিয়ার চুক্তিতে তারা ছিল মুসলিমদের মিত্র। এই ঘটনার পর আল্লাহর রাসূল খুযাআকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
'খুযাআর লোকেরা, তোমরা হানাহানি থেকে তোমাদের হাত গুটিয়ে নাও। যে লোককে তোমরা হত্যা করেছো, আমি তার রক্তপণ আদায় করে দেবো। কিন্তু জেনে রাখো, এরপর থেকে যদি কেউ এমন কাজ করে, তাহলে নিহত ব্যক্তির পরিবার চাইলে এর প্রতিশোধে হত্যা করতে পারে, অথবা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।'

রাসূলুল্লাহ সেই নিহত লোকের জন্য রক্তপণ আদায় করলেন। এভাবে বিষয়টি বেশি দূর গড়ানোর আগেই নিষ্পত্তি হয়ে গেল।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আনসারদের সংশয়ঃ কোথায় থাকবেন আল্লাহর রাসূল ﷽

📄 আনসারদের সংশয়ঃ কোথায় থাকবেন আল্লাহর রাসূল ﷽


মক্কা বিজয় হলো, চারিদিকে আনন্দ, কিন্তু আনসারদের মনে ভয় কাজ করছিল, প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়। মক্কা বিজয়ের পর আল্লাহর রাসূল সাফা পাহাড়ে উঠে আল্লাহর কাছে দুআ করেন। এই দৃশ্য দেখে আনসাররা ভাবলেন, মক্কা তো বিজয় হয়েই গেছে, আল্লাহর রাসূল নিজ শহরে ফিরে এসেছেন। তিনি নিশ্চয়ই এখানেই থেকে যাবেন। এই ভাবনাটাই ছিল ভীষণ কষ্টের। মক্কা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর গত আট বছর ধরে তারা আল্লাহর রাসূলকে আগলে রাখতে চেয়েছেন। একসাথে থেকে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেছেন। আর এখন আল্লাহর রাসূল তাদের ছেড়ে মক্কায় থেকে যাবেন? তারা তাদের মনকে মানাতেই পারছিল না।

এই কথাবার্তাগুলো আল্লাহর রাসূলের কানে গেল। তিনি আনসারদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কি এ কথা বলেছো?' তারা প্রথমে স্বীকার করতে চাইলেন না, পরে স্বীকার করলেন। আল্লাহর রাসূল তখন বললেন, 'আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আমি আল্লাহর দিকে ও তোমাদের দিকে হিজরত করেছি। আমার জীবন তোমাদের সাথে, আর মৃত্যুও তোমাদের সাথে।'

গভীর আবেগে আনসারদের চোখ ভিজে গেল। এই অশ্রু আনন্দের। তারা কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, 'আপনাকে কাছে পাওয়ার আকুলতা আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা থেকে আমরা এ কথা বলেছি ইয়া রাসূলাল্লাহ!' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমাদের কথায় বিশ্বাস করেন।'

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية