📄 সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং বাইয়াত গ্রহণ
মক্কায় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা হলো। তাদের বাড়িঘর তাদেরই থাকলো, কোনো করও আরোপ করা হলো না। বলা হলো, কেউ যদি তার নিজ বাড়িতে অবস্থান করে তাহলে সে নিরাপদ। যদি সে আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেয় সে নিরাপদ। যদি কেউ মসজিদে অবস্থান করে তাহলে সে নিরাপদ।
বিজিত শত্রুর প্রতি এই অভাবনীয় দয়া, একজন নবী ছাড়া আর কে-ই বা করতে পারেন? মক্কার লোকেরা উপলব্ধি করলো, যে দেবতাদের তারা এতকাল উপাসনা করে এসেছে, তারা আসলে মিথ্যা মাবুদ। ইসলামের সত্য উপলব্ধি করে তারা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলো।
"যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার রবের প্রশংসা করবেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী।” (সূরা নাসর, ১১০)
সাফা পাহাড়ে বসে আল্লাহর রাসূল তাদের বাইয়াত গ্রহণ করলেন। লোকেরা এসে তাঁর কাছে এই মর্মে বাইয়াতবদ্ধ হলো যে, তারা সাধ্যমতো তাঁর কথা শুনবে ও মানবে। মহিলাদের থেকেও আল্লাহর রাসূল সেদিন বাইয়াত নিয়েছিলেন। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দও বাইয়াত দিতে হাজির হলো। তবে সে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাইলো পাছে আল্লাহর রাসূল তাকে চিনে ফেলেন। বিশেষ করে আল্লাহর রাসূলের চাচা হামযার সাথে হিন্দ যা করেছিল, তাতে তার নিজেকে আড়াল করতে চাওয়াই ছিল স্বাভাবিক। আল্লাহর রাসূল বাইয়াতের শর্তগুলো এক এক করে উল্লেখ করছিলেন, আর উমার সেসব মহিলাদের সামনে পুনরাবৃত্তি করছিলেন। যেমন- শিরক না করা, সন্তান হত্যা না করা, মিথ্যা শপথ না করা ইত্যাদি। যখন আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমরা চুরি করবে না...' তখন হিন্দ নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে বলে ফেলে, 'আচ্ছা আল্লাহর রাসূল, আবু সুফিয়ান তো খুব কৃপণ স্বভাবের। সে যা খরচাপাতি দেয়, তাতে আমার আর আমার সন্তানদের চলে না। এখন যদি আমি তার থেকে কিছু না বলে নিই, সেটা কি গুনাহ হবে?' আল্লাহর রাসূল হেসে বললেন, 'যতটুকু না নিলেই নয়, ততটুকু তুমি তার থেকে নিতে পারো, সমস্যা নেই。'
এরপর আল্লাহর রাসূল আরেকটি শর্ত উল্লেখ করলেন, 'তোমরা যিনা করবে না।' হিন্দ এ কথা শুনে অবাক হয়ে বললো, 'একজন স্বাধীন নারী কী করে যিনা করতে পারে!' হিন্দের বিস্ময় বলে দেয় তৎকালীন মুশরিক সমাজেও যিনা-ব্যভিচারকে কতটা খারাপভাবে দেখা হতো। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান মুসলিম সমাজে শহুরে জীবনে যিনা-ব্যভিচারের প্রতি মুসলিমদের এক ধরনের সহনশীলতা তৈরি হয়েছে।
হিন্দের কণ্ঠ শুনে আল্লাহর রাসূল তাকে চিনে ফেলেন। জিজ্ঞেস করেন, 'আচ্ছা তুমিই কি হিন্দ?' হিন্দ উত্তর দেয়, 'জ্বী আল্লাহর রাসূল, আমিই হিন্দ। যা কিছু হয়ে গেছে তার জন্য আমাকে মাফ করে দিন।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আল্লাহ তোমাকে মাফ করে দিন।' শেষ পর্যন্ত হিন্দ সব শত্রুতা ভুলে একজন আন্তরিক মুসলিমাহ হিসেবে বাকি জীবন কাটিয়ে দেন।
কাবার চাবি রাখা এবং হাজীদের পানি সরবরাহ করা ছিল কুরাইশদের জন্যে বেশ গৌরবের একটি বিষয়। আলী ইবন আবি তালিব এই দায়িত্ব পেতে চাইলেন। আল্লাহর রাসূলের গোত্র বনু হাশিমের অনেকেই এই সম্মান লাভ করতে চাইলো। কিন্তু আল্লাহর রাসূল এই চাবি দিলেন উসমান ইবন তালহাকে। এই উসমান ইবন তালহা যখন মুশরিক ছিলেন তখনো তার গোত্র বনু শাইবার কাছেই কাবার চাবি গচ্ছিত থাকতো। মক্কা বিজয়ের পরে আল্লাহর রাসূল সেই নিয়মটি পরিবর্তন করলেন না। উসমান ইবন তালহাকে চাবি রাখার দায়িত্ব দিয়ে বললেন, 'এটা চিরদিনের জন্য রেখে দাও। তোমাদের কাছ থেকে যে এই চাবি কেড়ে নেবে সে জালিম।' বংশ পরম্পরায় এখনো সেই চাবি বনু শাইবার অধিকারে আছে।
📄 কালো তালিকা
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও কিছু জঘন্য অপরাধীর জন্য একটি কালো তালিকা তৈরি করা হয়। এদের ক্ষমা করা হয়নি। এই কালো তালিকায় ছিল নয় থেকে তেরো জন মানুষ। এরা হলো আব্দুল উযযাহ ইবন খাতাল এবং তার দুই দাসী, আব্দুল্লাহ ইবন সাদ আবি সারাহ, মাকিস ইবন সাবাবাহ, আল হুয়াইরিস ইবন নাকিস, হাব্বার ইবন আল-আসওয়াদ এবং সারাহ। ভিন্ন বর্ণনায় ভিন্ন ভিন্ন নামও এসেছে। এদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ বলেন, 'তাদেরকে হত্যা করো, যদি তারা আল কাবার গিলাফ (পর্দা) ধরে ঝুলে থাকে, তবুও!'
আব্দুল্লাহ ইবন খাতাল ছিল একজন মুহাজির মুসলিম। একবার রাসূলুল্লাহ তাকে কর সংগ্রহ করার কাজে পাঠান, তার দাস তার সাথে ছিল। পথিমধ্যে কোনো কারণে সে তার দাসের ওপর রেগে গিয়ে তাকে মেরে ফেলে। সে জানতো কাজটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাসূলুল্লাহ তাকে কোনো ছাড় দেবেন না। ইসলাম ন্যায়ের ধর্ম, চাকর হোক, মালিক হোক -- সবার জন্যই ন্যায় বিচার। আবদুল্লাহ ইবন খাতাল শাস্তির ভয়ে মক্কায় পালিয়ে যায় এবং ইসলাম ত্যাগ করে। হত্যার আদেশ জারি হওয়ার পর সে কাবাঘরের গিলাফ ধরে ঝুলে থাকে। তাকে সে অবস্থাতেই হত্যা করা হয়।
তার দুজন দাসী ছিল -- ফারতানা এবং আরনাব। আল্লাহর রাসূলের কুৎসামূলক গান গাওয়ার অপরাধে তাদের দুইজনকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে একজনকে হত্যা করা হয় এবং অপরজন মুসলিম হয়ে ছাড়া পেয়ে যায়।
আব্দুল্লাহ ইবন আবি সারাহ ছিল একজন মুসলিম এবং কুরআন সংরক্ষণকারী। কিন্তু পরবর্তীতে ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে সে মক্কায় পালিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে সে গলাবাজি করতে থাকে, 'আমি কুরআন পাল্টে ফেলবো! কুরআন লিখে তার অর্থ বদলে দেবো!' মক্কা বিজয়ের দিন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এলে সে তার দুধ ভাই উসমান ইবন আফফানের কাছে নিরাপত্তা চায়। উসমান তাকে নবীজির কাছে নিয়ে যান।
আবদুল্লাহ ইবন আবি সারাহ রাসূলুল্লাহকে বললেন, 'আমি আপনাকে বাইয়াত দিতে এসেছি।' নবীজি চুপ করে রইলেন, সে আবার বললো, 'আমি আপনাকে বাইয়াত দিতে এসেছি।' রাসূলুল্লাহ এবারও কোনো উত্তর দিলেন না। তৃতীয়বারে নবীজি তার বাইয়াত গ্রহণ করলেন।
সে চলে যাবার পর নবীজি উপস্থিত সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কি বুদ্ধিমান কেউ ছিল না? আমি তো এজন্য চুপ করেছিলাম যেন তোমাদের কেউ উঠে এসে তার গর্দানটা উড়িয়ে দেয়।' একজন সাহাবি বললেন, 'ইশ! আপনি যদি আমাদেরকে একটু ইশারা করতেন!' নবীজি উত্তর দিলেন, 'ইশারা দিয়ে হত্যা করা কোনো নবীর জন্য শোভা পায় না।
আব্দুল্লাহ ইবন আবি সারাহ অদ্ভুতভাবে বেঁচে গেল। তবে সে জীবনের শেষপর্যন্ত ভালো মুসলিম হয়ে বেঁচে ছিল। তার মৃত্যু ঘটে ফজরের নামাযে সিজদারত অবস্থায়। উমার ইবন খাত্তাব এবং উসমানের শাসনামলে তিনি বেশ ভালো পদে নিযুক্ত ছিলেন।
মাকিস ইবন হুবাবার ভাই ছিলেন একজন মুসলিম। বনু মুসতালিকের যুদ্ধে তার ভাই এক আনসারী মুসলিমের হাতে ভুলক্রমে নিহত হন। মাকিস তখন হিজরত করে মদীনায় আসেন শুধুমাত্র তার ভাইয়ের মৃত্যুর ক্ষতি পূরণের টাকার লোভে। ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়ে সে পালিয়ে মক্কায় ফিরে আসে এবং মুরতাদ হয়ে যায়।
হুয়াইরিস ইবন নাকিসের অপরাধ ছিল সে মক্কায় আল্লাহর রাসূলকে নানাভাবে কষ্ট দিতো। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় সে আল্লাহর রাসূলের দুই কন্যা ফাতিমা এবং উম্ম কুলসুমকে উত্ত্যক্ত করে। একই রকম অপরাধ করেছিল হাব্বাব ইবন আসওয়াদ। সে হিজরতের সময় আল্লাহর রাসূলের কন্যা যাইনাবকে বর্শা উঁচিয়ে ভয় দেখায়। তখন যাইনাব ছিলেন গর্ভবতী। এ ঘটনায় যাইনাবের গর্ভপাত হয়ে যায়। হুয়াইরিসকে হত্যা করা হয় কিন্তু হাব্বাব পরবর্তীতে মুসলিম হয়ে ফিরে আসে এবং তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর সারাহ ছিল হাতিব ইবন আবি বালতার পত্রবাহিকা, মাক্কী যুগে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে গান গাইতো। তার জন্য নিরাপত্তা চাওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত সে বেঁচে যায়।
কালো তালিকায় আরও কিছু ব্যক্তির নাম ভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। এখানে উল্লেখ্য, যাদের নাম কালো তালিকাভুক্ত ছিল এদের প্রায় সবার অপরাধ ছিল হয় রিদ্দা নয়তো আল্লাহর রাসূলের নিন্দা করা। তীব্রতার মাত্রায় এই দুটো অপরাধ ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ। যে কারণে মক্কার সাধারণ কাফিরদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও এ দুটি অপরাধের সাথে যুক্তদের ক্ষমা করা হয়নি। এ দুটি অপরাধের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। একজন কাফির যুদ্ধবন্দী হলে তাকে হত্যা করা, মুক্ত করে দেয়া, দাস হিসেবে রাখা বা তার থেকে মুক্তিপণ আদায় করা কিংবা তাকে বন্দী বিনিময়ে ব্যবহার করা - এর যেকোনোটির সিদ্ধান্ত ইমাম নিতে পারেন। কিন্তু মুরতাদের ক্ষেত্রে একটিই বিধান। তা হলো মৃত্যুদণ্ড। শুধুমাত্র সে যদি পুনরায় মুসলিম হয়ে যায়, সেক্ষেত্রেই তাকে ছেড়ে দেওয়া যাবে।
উম্ম হানি ছিলেন আলী ইবন আবি তালিবের বোন। মক্কা বিজয়ের দিন তার শ্বশুর বাড়ির দুই আত্মীয় তার কাছে আশ্রয় চাইলে তিনি তাদের আশ্রয় দেন। কিন্তু আলী বিষয়টি পছন্দ করলেন না। তিনি তাদের হত্যা করতে চাইলেন। উম্ম হানি তখন রাসূলুল্লাহর শরণাপন্ন হলেন। রাসূলুল্লাহ খুব খুশি হয়ে তাকে স্বাগত জানালেন, জানতে চাইলেন কী হয়েছে। উম্ম হানি সবকিছু খুলে বলার পর সব শুনে রাসূলুল্লাহ বললেন, 'সমস্যা নেই, তুমি যাদের নিরাপত্তা দিয়েছো আমিও তাদের নিরাপত্তা দিলাম।'
টিকাঃ
১০৩. সহীহ বুখারি, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৫০।
১০৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০৭।
১০৫. সুনান আন-নাসাই, অধ্যায় রক্তপাত নিষিদ্ধকরণ, হাদীস ১০২।
📄 মক্কার পবিত্রতা ঘোষণা
মক্কা বিজয়ের পরদিন আল্লাহর রাসূল সবার উদ্দেশ্যে বললেন :
'আল্লাহ তাআলা যেদিন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেই একই দিন তিনি মক্কাকে পবিত্র স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। আর ক্বিয়ামত পর্যন্ত এই পবিত্রতা বলবৎ থাকবে। আল্লাহ এবং শেষ বিচার দিবসে বিশ্বাসী কারো জন্য মক্কায় রক্তপাত করা কিংবা গাছ কাটা বৈধ নয়। আমার আগেও এমনটা করা বৈধ ছিল না। আমার পরেও তা কারো জন্য বৈধ হবে না। যদি কেউ প্রশ্ন তোলে, তাহলে আল্লাহর রাসূল কেন এখানে রক্তপাত করেছেন? তবে তাকে বলবে, আল্লাহ তাঁকে সেই অনুমতি দিয়েছেন। এই অনুমতি তোমাদের দেওয়া হয়নি। আর আমার ক্ষেত্রে এটা কিছু সময়ের জন্যই বৈধ করা হয়েছে। আগে এখানে খুনখারাবি রক্তপাত নিষিদ্ধ ছিল। ভবিষ্যতেও তা-ই থাকবে।'
টিকাঃ
১০৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২২।
📄 বিশৃঙ্খলা দমন
বনু হুযায়ল গোত্রের সাথে বনু খুযাআর একটি বিরোধ ছিল। জাহিলিয়াতের যুগে বনু হুযাইলের ইবন আসওয়া বনু খুযাআর এক লোককে হত্যা করে। মক্কা বিজয়ের পর তারা এই হত্যার প্রতিশোধ নেয়। খুযাআর লোকেরা ইবন আসওয়াকে মেরে ফেলে। বনু খুযাআ ছিল মুসলিম গোত্র। হুদাইবিয়ার চুক্তিতে তারা ছিল মুসলিমদের মিত্র। এই ঘটনার পর আল্লাহর রাসূল খুযাআকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
'খুযাআর লোকেরা, তোমরা হানাহানি থেকে তোমাদের হাত গুটিয়ে নাও। যে লোককে তোমরা হত্যা করেছো, আমি তার রক্তপণ আদায় করে দেবো। কিন্তু জেনে রাখো, এরপর থেকে যদি কেউ এমন কাজ করে, তাহলে নিহত ব্যক্তির পরিবার চাইলে এর প্রতিশোধে হত্যা করতে পারে, অথবা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।'
রাসূলুল্লাহ সেই নিহত লোকের জন্য রক্তপণ আদায় করলেন। এভাবে বিষয়টি বেশি দূর গড়ানোর আগেই নিষ্পত্তি হয়ে গেল।