📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মক্কার অভিমুখে অগ্রযাত্রা

📄 মক্কার অভিমুখে অগ্রযাত্রা


বরকতময় রমাদান মাসে যাত্রা শুরু করে বরকতময় এই বিজয়ের কাফেলা। মাসের প্রথম দিকে তাঁরা সাওম রাখলেন কিন্তু মক্কার কাছাকাছি এসে রাসূলুল্লাহ মুসলিমদের সাওম ভাঙতে নির্দেশ দিলেন। এই সেনাবাহিনীতে দশহাজার সেনা ছিল। এ পর্যন্ত এটাই ছিল মুসলিমদের সবচাইতে বড় বাহিনী। এই বাহিনীতে সব মুহাজির আর আনসাররা ছিলেন। মদীনার আশপাশের অনেক গোত্র যেমন সুলাইম, আসলাম, গিফার ও যাইনা এতে যোগ দেয়।

রাসূলুল্লাহ দশ হাজার সৈনিক নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। আবু রুহম ইবন হুসাইন আল-গিফারীকে মদীনায় অস্থায়ী গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলো। দশ হাজার সৈনিক নিয়ে আল্লাহর রাসূল পৌঁছলেন যোহফায়। সেখানে পৌঁছে আল-আব্বাস ইবন আল-মুত্তালিবের সাথে দেখা হয়ে যায়। মক্কায় গোয়েন্দাগিরির দায়িত্ব ছিল তার উপর ছিল, তা শেষ করে তিনি সপরিবারে মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করছিলেন। এরপর আল্লাহর রাসূলের সাথে দেখা হলো দুই কুরাইশের, আবু সুফিয়ান ইবন আল-হারিস এবং আবদুল্লাহ ইবন উমাইয়্যা।

এই দুজনই ছিল ইসলামের দুই শত্রু। আবু সুফিয়ান আল-হারিস আল্লাহর রাসূলকে ব্যঙ্গ করে কবিতা লিখতো। আর আবদুল্লাহ ইবন উমাইয়্যা হলো সেই লোক যে মাক্কী জীবনে ব্যঙ্গ করে বলেছিল, 'আমি তোমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করবো না, যতক্ষণ না তুমি একটা মই নিয়ে আসো যেটা সরাসরি ঐ আকাশ পর্যন্ত যায়। তারপর সেখান থেকে তুমি আল্লাহর কাছ থেকে একটি চিঠি নিয়ে আসবে। আর সেই চিঠিতে চারজন ফেরেশতা তোমার নবুওয়্যাতের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে। তবে সত্যি বলতে কী, এসব করলেও আমি তোমাকে বিশ্বাস করবো বলে মনে হয় না।'

এই লোক পর্যন্ত ইসলাম কবুল করতে রাজি হয়ে গেল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই আবু সুফিয়ান মক্কার নেতা আবু সুফিয়ান নয়। আল্লাহর রাসূল প্রথমে তাদের ক্ষমা করতে রাজি হলেন না, কিন্তু তাদের কাকুতি মিনতিতে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন। ফলে তারা মুসলিম হয়ে গেল।

এগোতে এগোতে এরপর মুজাহিদ বাহিনী মার আদ-দাহরানে পৌঁছে গেল। সেখানে তাঁবু গাড়া হলো। জায়গাটি ছিল মক্কা থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু চারপাশের মরুভূমি বেশ খোলামেলা হওয়ার কারণে মক্কা থেকে পরিষ্কার তাদের উপস্থিতি বোঝা যাচ্ছিল। আল্লাহর রাসূল ইচ্ছাকৃতভাবেই তাঁর উপস্থিতি জানান দিতে চাচ্ছিলেন। সেদিন রাতে মুসলিম শিবিরে দশ হাজার আগুন জ্বালানো হলো। দশ হাজার আগুনের দপদপে আলোর রেখারা জানান দিচ্ছিলো বিশাল সেই বাহিনীর সমাগম।

বিষয়টা আবু সুফিয়ানের নজর এড়ালো না। সে বুদাইল ইবন ওয়ারকা এবং হাকিম ইবন হিযামকে সাথে নিয়ে পরিস্থিতি বোঝার জন্য বেরিয়ে পড়লো। পথে যেতে যেতে আবু সুফিয়ান প্রশ্ন করলো,

- কারা এরা? এত আগুন আর এত বড় শিবির তো আগে কখনো দেখিনি।

- এরা নিশ্চয়ই খুযাআ গোত্রের লোক হবে। হয়তো যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছে, বুদাইল জবাব দিলো।

- নাহ, এরা খুযাআ হতে পারে না। এদের শক্তি এত বেশি নয় যে এরকম বড় শিবির করে আগুন জ্বালাবে।

আবু সুফিয়ানের ভেতরকার উদ্বেগ চাপা থাকলো না। রাস্তায় আল-আব্বাসের সাথে তাদের দেখা হলো। আব্বাসকে আবু সুফিয়ান বললো,

- এই অবস্থায় কী করি বলো তো?

- আল্লাহর শপথ, আগামী সকাল হবে কুরাইশদের জন্য এক কঠিন সকাল। আল্লাহর রাসূল তোমাকে পেলে ছাড়বেন না। তুমি বরং এই গাধার পিঠে চড়ে বসো, আমার সাথে চলো। আল্লাহর রাসূলের কাছে তোমাকে নিয়ে যাই। দেখি তোমাকে কোনোভাবে বাঁচানো যায় কি না।

আবু সুফিয়ান রাজি হলো। অন্য একটি বর্ণনামতে, এই তিনজন মুসলিমদের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘটনা যা-ই হোক, তারা তিনজনই মুসলিমদের ক্যাম্পে এল। সবাই সন্দেহের দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু আব্বাসকে সাথে দেখতে পেয়ে পথ ছেড়ে দিচ্ছে।

সবাই ছেড়ে দিলেও একজন কিন্তু এত সহজে ছাড়তে চাইলেন না। তিনি আর কেউ নন, উমার ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু। উমার চাইলেন আবু সুফিয়ানকে সেখানেই মেরে ফেলবেন। এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করার পাত্র তিনি নন। বিষয়টা নিয়ে উমারের সাথে আব্বাসের তর্কাতর্কি লেগে গেল। শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তির জন্য তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে গেলেন।

আল আব্বাস চাচ্ছিলেন আল্লাহর রাসূল যেন আবু সুফিয়ানকে প্রাণ ভিক্ষা দেন। অন্যদিকে উমার ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু চাচ্ছিলেন আল্লাহর রাসূল তাকে যেন আবু সুফিয়ানকে হত্যা করার অনুমতি দেন। এক পর্যায়ে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, 'উমার! আজ যদি আবু সুফিয়ান তোমার গোত্র বনু আদীর লোক হতো তাহলে তুমি তাকে হত্যা করতে চাইতে না! সে বনু আব্দুল মানাফের লোক বলেই তুমি তাকে হত্যা করতে চাইছো।'

উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে আব্বাসের ধারণা ভুল ছিল। তিনি ভাবছিলেন ভিন্ন গোত্রের বলেই উমার আবু সুফিয়ানকে হত্যা করতে চাইছে। কিন্তু ছায়ার মতো আল্লাহর রাসূলের সাথে লেগে থাকতেন যিনি, হক আর বাতিলের মাঝে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে যেতেন যেই আল-ফারুক, সেই উমার নিঃসন্দেহে এমন ছিলেন না। উমার গম্ভীর স্বরে বললেন,

'শান্ত হও, আব্বাস, শান্ত হও! তোমার ইসলাম আমার কাছে আমার বাবা আল খাত্তাবের ইসলামের চাইতে বেশি প্রিয়। এটা শুধু এই কারণে যে আমার বাবা ইসলাম গ্রহণ করলে সে খবরে আল্লাহর রাসূল যত খুশি হতেন, তার চাইতে তোমার ইসলাম গ্রহণে আল্লাহর রাসূল বেশি খুশি হয়েছেন।'

আল্লাহর রাসূলকে কত ভালোবাসলে নিজের বাবার ইসলাম গ্রহণের চেয়েও প্রিয় হয়ে যায়, রাসূলের প্রিয় চাচার ইসলাম-গ্রহণ? উমারের কথা থেকে শিক্ষণীয় হলো, কারো জাতীয়তা বা পারিবারিক বংশ পরিচয়ের কারণে কাউকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। আন্তরিকতার বিচার হবে আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার মাপকাঠিতে। যদি কেউ আল্লাহ আযযা ওয়াজালের নিকটবর্তী হয় তাহলে সে-ই উম্মাহর জন্য বেশি আপন। আর যদি কেউ আল্লাহ আযযা ওয়াজালের সাথে বিদ্রোহ করে হয় তাহলে তার সাথে এই উম্মাহর কোনো সম্পর্ক নেই।

আল্লাহর রাসূল এই ঝগড়া সেখানেই থামিয়ে দিতে চাইলেন। তাই আব্বাসকে পরের দিন সকালে আসতে বললেন। পরদিন আল্লাহর রাসূল আবু সুফিয়ানকে বললেন,

- আবু সুফিয়ান! এখনও কি তুমি বুঝতে পারছো না যে এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই?

- আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান হোক। আপনি কতই না দয়াময়, উদার আর একজন বড় মাপের মানুষ। আত্মীয়দের প্রতি আপনি কতই না সদয়! যদি আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ সত্যিই থেকে থাকতো তাহলে সে নিশ্চয়ই রক্ষা করতো।

- আর আমি যে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল এটা কি বোঝো নি?

- এই বিষয়ে আমার অন্তরে এখনো কিছু দ্বিধা আছে।

আল আব্বাস গর্জে উঠলেন, 'ধ্বংস হও তুমি! তোমার গর্দান কাটা যাবার আগেই মুসলিম হয়ে যাও!'

প্রাণের মায়া বড় মায়া। এই কথার পর আবু সুফিয়ান মুসলিম হয়ে গেল; সাক্ষ্য দিলো, 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।' যদিও সেই সাক্ষ্যদানে তেমন দৃঢ়তা ছিল না।

আবু সুফিয়ানের মানসিক অবস্থা রাসূলুল্লাহ বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি আবু সুফিয়ানকে পাহাড়ের গিরিপথে আরও কিছুক্ষণ আটকে রাখার জন্য আব্বাসকে নির্দেশ দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আবু সুফিয়ান যেন মুসলিম সেনাবাহিনীকে নিজ চোখে দেখতে পারে। রাসূলুল্লাহর সেনাবাহিনী গোত্র অনুসারে অনেকগুলো ব্যাটালিয়নে বিভক্ত ছিল। প্রত্যেক ব্যাটালিয়নের নিজস্ব পতাকা ছিল। একের পর এক ব্যাটালিয়ন মার্চ করে এগোচ্ছে আর আবু সুফিয়ান তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। একেকটি দল সামনে দিয়ে অতিক্রম করে, আর আবু সুফিয়ান আব্বাসের কাছে জিজ্ঞেস করে, 'এরা কারা?' আব্বাস উত্তর দেন, 'এরা সুলাইম' বা 'এরা গিফার' বা 'এরা হলো মুযাইনা।' এদের কারো সাথেই আবু সুফিয়ানের দ্বন্দু ছিল না। সে বলছিল, 'এদের সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই।'

একটি ব্যাটালিয়ন আবু সুফিয়ানের মনোযোগ কেড়ে নেয়। তাদের ঈমানী তেজ, তাদের ঋজু ভঙ্গিমা দেখে সে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে। সেই ব্যাটালিয়নে আর কেউ নন, ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সাথে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দুই দল -- মুহাজির এবং আনসার। সবুজ পতাকা নিয়ে এগোতে থাকা এই দলটিকে দেখে আবু সুফিয়ান বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে জানতে চায়, 'কারা এরা?' আল-আব্বাস বলেন, 'এরাই তো মুহাজির আর আনসার। এদের সাথে আছেন রাসূলুল্লাহ।' আবু সুফিয়ান যেন সম্মোহিতের মতো বলে ওঠে, 'নাহ! এদের সাথে পেরে ওঠার মতো শক্তি কারো নেই। আব্বাস, তোমার ভাতিজার রাজত্ব সত্যিই আজ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে।' আব্বাস তাকে শুধরে দিয়ে বলেন, 'এটা রাজত্ব নয়, এটা হলো নবুওয়াত।' আবু সুফিয়ান বললো, 'হুম, ঠিকই বলেছো।'

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 পরবর্তী গন্তব্যঃ মক্কা

📄 পরবর্তী গন্তব্যঃ মক্কা


রাসূলুল্লাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে যী-তুওয়ায় পৌঁছলেন। সেখানে তিনি বাহিনীর কোন অংশে কে নেতৃত্ব দেবে সেটা নির্ধারণ করে দিলেন এবং কীভাবে ও কখন মক্কায় প্রবেশ করা হবে সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়ে দিলেন। বাম পাশের বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ ইবন ওয়ালিদ। ডান পাশের বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আয-যুবাইর ইবন আল-আওয়্যাম। আর পদাতিক সৈনিকদের নেতৃত্বে ছিলেন আবু উবায়দা

কুরাইশরা কিছু ভাড়াটে সৈন্যদের দিয়ে প্রতিরোধ গড়ার পরিকল্পনা করেছিল। এদের বলা হতো 'আউবাশ'। আল্লাহর রাসূল আনসারদের এই আউবাশদের একেবারে গুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তাদেরকে আস-সাফায় অবস্থান নিতে বলেন। আয- যুবাইর মুহাজির ঘোড়সওয়ারদের নেতৃত্বে ছিলেন। তাকে মক্কার উপরিভাগে 'কিদা' নামক স্থানে পতাকা গেড়ে অবস্থান নিতে বলা হয়। খালিদের নেতৃত্বে ছিল কুদাআহ, সুলাইমসহ বেশ কিছু গোত্র। তারা অবস্থান নেন মক্কার নিচের দিকে। আনসারদের নেতৃত্বে ছিলেন সাদ ইবন উবাদাহ।

মক্কার চারদিকে মুসলিমদের চারটি বাহিনী এমনভাবে অবস্থান নিলো যে, প্রতিরোধ গড়ার মতো কোনো অবস্থাই কুরাইশদের ছিল না। তারা একেবারেই হাল ছেড়ে দিল। বিনা বাধায় মুসলিমরা মক্কায় প্রবেশ করতে লাগলো। শুধুমাত্র খালিদ ইবন ওয়ালিদ যেদিকে অবস্থান নিয়েছিলেন সেদিকে বনু বকর এবং হুদাইল বাধা প্রদান করার চেষ্টা করে। কিন্তু খালিদ ইবন ওয়ালিদ তাদের পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দেন। অল্পসময়েই তারা কোনোরকমে পালিয়ে বাঁচে। এটাই ছিল মক্কার কুরাইশদের পক্ষ থেকে একমাত্র নামে মাত্র প্রতিরোধ।

কতটা সহজে মুসলিমরা মক্কা জয় করে সেটা একটা ছোট্ট ঘটনা থেকে বুঝা যায়। হিমাস ইবন কাইস নামের এক যোদ্ধা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তলোয়ারে শান দিচ্ছিল। তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করলো,

- এই, এসব কেন করছো তুমি?

- মুহাম্মাদ আর তার সঙ্গীদের সাথে যুদ্ধ আছে!

- তাই নাকি! কয়েকটাকে ধরে এনো তো, তোমার দাস বানিয়ে রেখো!

হিমাস কিংবা তার স্ত্রী - কারোই ধারণা ছিল না তারা কীসের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আবু জাহেলের ছেলে ইকরিমার বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে হিমাস দেখলো মুশরিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়িমড়ি করে পালাচ্ছে। হিমাস কোনোমতে নিজেকে অক্ষত রেখে ময়দান ছেড়ে পালিয়ে বাড়ি চলে আসলো। তার স্ত্রী তাকে দেখেই বলে উঠলো,

- কী ব্যাপার, তুমি না বললে ওদের হারানো তোমার জন্য ডালভাত?

- ইয়ে মানে, সাফওয়ান আর ইকরিমার মতো যোদ্ধাই যদি পালিয়ে যায়, আমার কী করার আছে বলো!

এদিকে আবু সুফিয়ান মক্কায় চলে এসেছে, চিৎকার করে বলছে, 'কুরাইশরা শোনো! মুহাম্মাদ যে বাহিনী নিয়ে এসেছে তার সাথে মোকাবেলা করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। কাজেই যে আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকবে সে নিরাপদ!'

মক্কার পতন হবে -- এটা মুশরিকরা মানতেই পারছিল না। আবু সুফিয়ানের মুখে এ কথা শুনে খোদ তার স্ত্রী হিন্দ ক্ষেপে গিয়ে তার গোঁফ ধরে বললো, 'এই বুড়োর মৃত্যু হোক! মেরে ফেলো একে!' আবু সুফিয়ান স্বপক্ষ নিয়ে বলতে লাগলো, 'এই মহিলার কথায় বিভ্রান্ত হয়ো না। যে বাহিনী তোমাদের সাথে লড়তে এসেছে তাদের সাথে তোমরা পেরে উঠবে না। কাজেই আমার কথা শোনো, আজ আবু সুফিয়ানের ঘরে যে থাকবে সে নিরাপদ!'

লোকেরা এ কথায় বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো, 'ধ্বংস হও তুমি! তোমার ঐ ছোট্ট ঘরে আমরা এতগুলো মানুষ আঁটবো কী করে?' আবু সুফিয়ান তখন জানিয়ে দিলো, 'কেউ যদি নিজের ঘরে অবস্থান নেয়, সে নিরাপদ। কেউ যদি মসজিদে অবস্থান নেয়, সে নিরাপদ।' এ কথা শুনে লোকেদের ভিড় দ্রুতই হালকা হয়ে গেল। সবার যার যার বাসায় অথবা মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নিল।

আল্লাহর রাসূল সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন যেন কোনো প্রকার রক্তপাত ছাড়াই মক্কা বিজয় সম্ভব হয়। সেটাই হয়েছিল। তবে আনসার নেতা সাদ ইবন উবাদা উত্তেজনার বশে আবু সুফিয়ানকে দেখে বলে ওঠেন, 'আজ হলো মহান যুদ্ধের দিন! আজ কাবার পবিত্রতা লঙ্ঘিত হবে!'

কথাগুলো আল্লাহর রাসূলের কানে পৌঁছলে তিনি বলেন, 'সাদ ভুল বলেছে। এটা তো সেই দিন যেদিন আল্লাহ কাবাকে মহিমান্বিত করবেন!' রাসূলুল্লাহ সাদ ইবন উবাদার কাছ থেকে ব্যানার নিয়ে নেন। পাছে তিনি মক্কায় কোনো রক্তপাত না করে বসেন! কিন্তু এত বড় একজন সাহাবি, যিনি আল্লাহর রাসূলকে নুসরাহ দিয়েছেন, জীবন-মরণ আল্লাহর দ্বীনের জন্য বিলিয়ে দেওয়ার শপথ করেছেন, তার থেকে ব্যানার ফিরিয়ে নিয়ে তাকে কষ্ট দিতে চাচ্ছিলেন না আল্লাহর রাসূল। তাই সে ব্যানার তুলে দেন তাঁরই ছেলে কাইস ইবন সাদের হাতে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 নিজের দেশে বিজয়ীর বেশে

📄 নিজের দেশে বিজয়ীর বেশে


অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত, স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত। যে মানুষটি আজ থেকে আট বছর আগে এই শহর ছেড়ে রাতের আঁধারে চুপিসারে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, তিনি আজ ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেছেন সেই আজীবন পরিচিত জন্মভূমির মাটিতে। যে মানুষগুলো তাঁকে লাঞ্ছিত করে তাড়িয়ে দিয়েছিল, তারা আজ ভক্তি-শ্রদ্ধাভরে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে!

আজ থেকে বিশ বছর আগে তিনি আস-সুবহা ডাক দিয়ে মক্কার লোকগুলোকে জড়ো করেছিলেন। তাদের বলেছিলেন, তোমরা আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নাও। তারা তাঁকে তাচ্ছিল্য করেছে, অবজ্ঞা করেছে, বয়কট করেছে। কিন্তু আজ তারাই তাঁর কথা শুনার জন্য আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করছে। এই মক্কার মাটিতে একদিন তাঁর শরীরের ওপর নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল স্রেফ মজা করার জন্য। আজ তাঁর গায়ে আঁচড় দেওয়ার সাহসটুকুও কারো নেই। হুমকি আর মৃত্যুভয় তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে বছরের পর বছর। কিন্তু আজ সেই হুমকিদাতার দল নিজেদের মৃত্যুভয়ে কম্পমান!

তারা বিলালকে তপ্ত মরুভূমির বুকে পাথর চাপা দিয়েছিল, উসমানকে কার্পেটে মুড়ে তার গায়ের ওপর লাফিয়ে পাশবিক অত্যাচার করেছিল। তারা খাব্বাবকে ছুঁড়ে ফেলেছিল জ্বলন্ত পাথরে, আম্মারকে পিটিয়ে অজ্ঞান করে নিথর ফেলে রেখেছিল। সেই বিলাল, উসমান, খাব্বাব আর আম্মাররা আজ বিজয়ী বাহিনীর একেকজন বীর সৈনিক!

যাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর রাসূল বদদুআ করেছিলেন, তাদের কেউ আজ বেঁচে নেই। তাঁর কথার একচুল বিরোধিতা করার মতো কেউ নেই। তারা না পেরেছে প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে কিনে নিতে আর না পেরেছে যুদ্ধের ময়দানে তাঁকে হত্যা করতে। বরং মক্কার লোকেরা আজ হার মানতে বাধ্য হয়েছে তাদের চোখের সামনে বড় হয়ে ওঠা সেই চেনা মুখ 'আল-আমীন' এর কাছে। একদিন তারা বলেছিল এ তো কবি, পাগল, জাদুকর -- আরও কত কী! কিন্তু আজ তারা ঠিকই জানে, ইনিই হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

আল্লাহর রাসূল মক্কায় প্রবেশ করছেন। তাঁর মাথায় কালো পাগড়ি। আল্লাহ তাঁকে এক মহাসম্মান দান করেছেন। এই সম্মানের কৃতজ্ঞতায় তিনি মাথা নুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করছেন। একমনে পাঠ করছেন আল্লাহর বাণী, সূরা ফাতহের সেই আয়াতগুলো, 'নিশ্চয়ই আমি তোমাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়...'

বিজয়ীর বেশে আজ মক্কার রাজপথ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন আল্লাহর রাসূল। কিন্তু কোথাও কোনো কুচকাওয়াজ নেই, নেই কামানের শব্দের মিথ্যে জৌলুস। জাতীয় সঙ্গীতের বাজনা নেই, উন্মত্ত-উল্লাসধ্বনি নেই, কোনো লাল গালিচাও পাতা নেই। পরাক্রমশালী এই বাহিনীর মাঝে নেই কোনো অহংকারের ছাপ। বুক উঁচু করে, অবনত মস্তকে, আল্লাহর প্রতি বিনম্র চিত্তে বিজয়ী রাসূলুল্লাহ প্রবেশ করছেন। তিনি উটের পিঠে বসা। শহরে ঢোকার সময় তিনি আল্লাহর কাছে সিজদা দিয়ে আছেন। এতটাই নিচু হয়ে আছেন যে তাঁর দাড়ি উটের সাথে লেগে আছে। তাঁর মধ্যে ঔদ্ধত্য নেই, আছে নম্রতা। উত্তেজনা নেই, আছে সাকিনাহ।

আল্লাহর রাসূল কাবার চারিদিকে তাওয়াফ করলেন। তাঁর হাতে একটি বর্শা ছিল। সেই বর্শা দিয়ে কাবাকে ঘিরে রাখা ৩৬০টি মূর্তিকে একে একে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে লাগলেন। মুশরিকদের দেবতারা একে একে ভূপাতিত হতে লাগলো। আল্লাহর রাসূল তিলাওয়াত করছেন কুরআনের সেই দুটো আয়াত,

"আর বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; মিথ্যা তো বিলুপ্ত হয়েই থাকে।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭: ৮১)

"বলুন, সত্য এসেছে এবং বাতিল কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, আর কিছু পুনরাবৃত্তিও করতে পারে না।” (সূরা সাবা, ৩৪: ৪৯)

একে একে সমস্ত মূর্তিকে ধ্বংস করা হলো। উসমান ইবন তালহা থেকে কাবার চাবি আনা হলো। রাসূলুল্লাহ কাবার দরজা খুললেন। ঢুকেই সেখানে দেখতে পেলেন কাঠের তৈরি একটা কবুতরের মূর্তি। সেটা ছুঁড়ে ভেঙে ফেললেন। আল কাবার ভেতরে আরও অনেক ছবি আর মূর্তি ছিল। সমস্ত মূর্তি ভেঙে টুকরো টুকরো করা হলো। সবগুলো ছবি মুছে ফেলা হলো। কাবার ভেতরে একটা ছবিকে মুশরিকরা নবী ইবরাহিমের ছবি বলে দাবি করতো। সেই ছবিতে ইসমাঈলের হাতে ছিল আল- আযলাম। আল-আযলাম হলো এক প্রকার লটারি। পৌত্তলিকরা কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এই লটারি ব্যবহার করতো। এই ছবি চোখে পড়ায় রাসূলুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ ওদের ধ্বংস করুন। এই মুশরিকরা ঠিকই জানতো ইবরাহীম বা তাঁর পুত্র কেউই আল-আযলাম ব্যবহার করতেন না।'

সবগুলো প্রতিকৃতি ও ছবি সরিয়ে ফেলার পর রাসূলুল্লাহ কাবার ভেতর প্রবেশ করলেন। কাবা এখন শিরকের কলুষতা ও নোংরামি থেকে পবিত্র। আল্লাহর রাসূল কাবার প্রতিটি কোণে গিয়ে পাঠ করলেন ‘আল্লাহু আকবর’। তারপর সেখানেই সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষে আল্লাহর রাসূল কাবা থেকে বের হয়ে কাবার দরজার সামনে দাঁড়ালেন। উৎসুক জনতা তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে আছে। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ করছে। তাদের উদ্দেশ্যে তিনি ছোট্ট একটি ভাষণ দিলেন।

‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আজ তিনি তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন। একাই সমগ্র শত্রুকে পরাজিত করেছেন।

তোমরা জেনে রাখো, জাহিলিয়াতের সকল আভিজাত্যের অহমিকা আর সম্পদের প্রতিশোধের দাবি আমার পায়ের নিচে। তবে বাইতুল্লাহর সেবা এবং হাজীদের পানি পান করানোর বিষয়টি আগের মতোই থাকবে।

জেনে রাখো, যে কোনো রকমের হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব বা ক্ষতিপূরণ একশত উট, এর মধ্যে চল্লিশটি উট হতে হবে গর্ভবতী।

কুরাইশরা! তোমরা জেনে রাখো, আল্লাহ তাআলা তোমাদের মধ্য থেকে জাহিলিয়াতের অহংকার এবং বংশগৌরবের অবসান ঘটিয়েছেন। সকল মানুষ আদমের সন্তান আর আদমের সৃষ্টি মাটি থেকে।'

এরপর তিনি পাঠ করলেন সূরা হুজুরাতের একটি আয়াত।

“হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী। আল্লাহ সব কিছু জানেন, সব কিছুর খবর রাখেন।” (সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১৩)

রাসূলুল্লাহ কাবাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। চারিদিকে অসংখ্য মানুষ। মক্কার জনতার চোখেমুখে বিস্ময়, ভয়, কৌতূহল! তাদের ভাগ্য নির্ভর করছে একটি মানুষের সিদ্ধান্তের উপর -- সেই মুহাম্মাদ, যাকে তারা অপমান করেছে, দিনের পর দিন অভুক্ত রেখেছে, দেশছাড়া করে ছেড়েছে আজ তিনিই বীরের বেশে নেতা হয়ে ফিরে এসেছেন নিজের ঘরে। কুরাইশের লোকেদের বুকের রক্ত হিম হয়ে আসার কথা। তারা আজ তাঁরই তরবারীর নিচে। রাসূলুল্লাহ তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন,

- তোমাদের কী ধারণা? আজ তোমাদের সাথে আমি কেমন ব্যবহার করবো?

- আপনি আমাদের ভাই, আমাদের ভাতিজা। আপনার কাছে থেকে মহৎ আচরণের আশা করি।

রাসূল বললেন, আমি তোমাদের সেটাই বলব যা ইউসুফ তাঁর ভাইদের বলেছিলেন। লা তাসরীবা আলাইকুমুল ইয়াওম-- আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। তোমরা মুক্ত, স্বাধীন।'

মক্কায় শুরু হলো এক নতুন যুগের সূচনা। জাহিলিয়াতের আদর্শ, আইন-কানুন, রীতি-প্রথা সবকিছু প্রতিস্থাপিত হলো ইসলাম দিয়ে। আরবের সে সমাজে গোত্রীয় গর্ব বা বংশমর্যাদাই ছিল গোটা সমাজব্যবস্থার মূল ভিত্তি। আল্লাহর রাসূল এই ভিত্তিকে বাতিল করে দিলেন। নতুন এই সমাজের ভিত্তি হবে ইসলামী আদর্শ। আর এটি পরিচালিত হবে ইসলামী আইন ও মূল্যবোধে। মক্কার কুরাইশরা তাদের বাপ-দাদার অর্থহীন ঐতিহ্য আর সামাজিক পদমর্যাদা টিকিয়ে রাখতে সুদীর্ঘ বিশ বছর ইসলামের সাথে শত্রুতা করে এসেছে। কিন্তু তারপরও এদের মন জয় করার জন্য আল্লাহর রাসূল তাদের কোনো নিয়ম-কানুন বা আচার-প্রথা গ্রহণ করেননি।

বিলালের আজান

আল্লাহর রাসূল বিলালকে আজান দেওয়ার জন্য ডাকলেন। আজ থেকে আট বছর আগে বিলাল কথা বলতেন চুপিচুপি, কিন্তু আজ বিলাল দাঁড়িয়ে আছেন কাবাঘরের ওপরে উন্মুক্ত কণ্ঠে আজান দেবেন বলে। আজ তিনি মক্কার কাউকে ভয় পান না। বিলাল ছিলেন মুশরিকদের চোখে নীচুশ্রেণি। তাকে দেখে অনেকেরই সহ্য হলো না। তারা কানাঘুষা করতে লাগলো, 'এই কালো কাকটা এখানে কী করছে?'

কাউকে পাত্তা না দিয়ে বিলাল তার সুমধুর কন্ঠে আজান দিলেন। সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল। আজানের ধ্বনি যেন সবাইকে তন্ময় করে দিলো। এই একই আজানের ধ্বনিতে কারো অন্তরের দরাজ ভেঙে ইসলাম প্রবেশ করলো, আর কারো অন্তরে দাউদাউ করে বিদ্বেষের আগুন জ্বলতে লাগলো। কাবাঘর হলো আল্লাহর ঘর। শিরকের অত্যাচারে এতদিন এই ঘরটা যেন খা-খা করছিল, দীর্ঘদিন পর বিলালের আযানের মাধ্যমে তাওহীদ ফিরে এল। বিলাল ছিলেন একজন দাস। কাবায় তার আজান ছিল মক্কায় গোত্রভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্যের প্রতীকি সমাপ্তি। বিলালকে দিয়ে আজান দেওয়ানোর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ বুঝাতে চাচ্ছিলেন যে, ইসলাম দ্বারা যে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে তাতে জাহিলিয়াতের শ্রেণীবৈষম্যের আর কোনো স্থান নেই। একজন মানুষের মর্যাদা বা হীনতা নির্ধারিত হবে তাক্বওয়ার মাধ্যমে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং বাইয়াত গ্রহণ

📄 সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং বাইয়াত গ্রহণ


মক্কায় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা হলো। তাদের বাড়িঘর তাদেরই থাকলো, কোনো করও আরোপ করা হলো না। বলা হলো, কেউ যদি তার নিজ বাড়িতে অবস্থান করে তাহলে সে নিরাপদ। যদি সে আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেয় সে নিরাপদ। যদি কেউ মসজিদে অবস্থান করে তাহলে সে নিরাপদ।

বিজিত শত্রুর প্রতি এই অভাবনীয় দয়া, একজন নবী ছাড়া আর কে-ই বা করতে পারেন? মক্কার লোকেরা উপলব্ধি করলো, যে দেবতাদের তারা এতকাল উপাসনা করে এসেছে, তারা আসলে মিথ্যা মাবুদ। ইসলামের সত্য উপলব্ধি করে তারা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলো।

"যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার রবের প্রশংসা করবেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী।” (সূরা নাসর, ১১০)

সাফা পাহাড়ে বসে আল্লাহর রাসূল তাদের বাইয়াত গ্রহণ করলেন। লোকেরা এসে তাঁর কাছে এই মর্মে বাইয়াতবদ্ধ হলো যে, তারা সাধ্যমতো তাঁর কথা শুনবে ও মানবে। মহিলাদের থেকেও আল্লাহর রাসূল সেদিন বাইয়াত নিয়েছিলেন। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দও বাইয়াত দিতে হাজির হলো। তবে সে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাইলো পাছে আল্লাহর রাসূল তাকে চিনে ফেলেন। বিশেষ করে আল্লাহর রাসূলের চাচা হামযার সাথে হিন্দ যা করেছিল, তাতে তার নিজেকে আড়াল করতে চাওয়াই ছিল স্বাভাবিক। আল্লাহর রাসূল বাইয়াতের শর্তগুলো এক এক করে উল্লেখ করছিলেন, আর উমার সেসব মহিলাদের সামনে পুনরাবৃত্তি করছিলেন। যেমন- শিরক না করা, সন্তান হত্যা না করা, মিথ্যা শপথ না করা ইত্যাদি। যখন আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমরা চুরি করবে না...' তখন হিন্দ নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে বলে ফেলে, 'আচ্ছা আল্লাহর রাসূল, আবু সুফিয়ান তো খুব কৃপণ স্বভাবের। সে যা খরচাপাতি দেয়, তাতে আমার আর আমার সন্তানদের চলে না। এখন যদি আমি তার থেকে কিছু না বলে নিই, সেটা কি গুনাহ হবে?' আল্লাহর রাসূল হেসে বললেন, 'যতটুকু না নিলেই নয়, ততটুকু তুমি তার থেকে নিতে পারো, সমস্যা নেই。'

এরপর আল্লাহর রাসূল আরেকটি শর্ত উল্লেখ করলেন, 'তোমরা যিনা করবে না।' হিন্দ এ কথা শুনে অবাক হয়ে বললো, 'একজন স্বাধীন নারী কী করে যিনা করতে পারে!' হিন্দের বিস্ময় বলে দেয় তৎকালীন মুশরিক সমাজেও যিনা-ব্যভিচারকে কতটা খারাপভাবে দেখা হতো। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান মুসলিম সমাজে শহুরে জীবনে যিনা-ব্যভিচারের প্রতি মুসলিমদের এক ধরনের সহনশীলতা তৈরি হয়েছে।

হিন্দের কণ্ঠ শুনে আল্লাহর রাসূল তাকে চিনে ফেলেন। জিজ্ঞেস করেন, 'আচ্ছা তুমিই কি হিন্দ?' হিন্দ উত্তর দেয়, 'জ্বী আল্লাহর রাসূল, আমিই হিন্দ। যা কিছু হয়ে গেছে তার জন্য আমাকে মাফ করে দিন।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আল্লাহ তোমাকে মাফ করে দিন।' শেষ পর্যন্ত হিন্দ সব শত্রুতা ভুলে একজন আন্তরিক মুসলিমাহ হিসেবে বাকি জীবন কাটিয়ে দেন।

কাবার চাবি রাখা এবং হাজীদের পানি সরবরাহ করা ছিল কুরাইশদের জন্যে বেশ গৌরবের একটি বিষয়। আলী ইবন আবি তালিব এই দায়িত্ব পেতে চাইলেন। আল্লাহর রাসূলের গোত্র বনু হাশিমের অনেকেই এই সম্মান লাভ করতে চাইলো। কিন্তু আল্লাহর রাসূল এই চাবি দিলেন উসমান ইবন তালহাকে। এই উসমান ইবন তালহা যখন মুশরিক ছিলেন তখনো তার গোত্র বনু শাইবার কাছেই কাবার চাবি গচ্ছিত থাকতো। মক্কা বিজয়ের পরে আল্লাহর রাসূল সেই নিয়মটি পরিবর্তন করলেন না। উসমান ইবন তালহাকে চাবি রাখার দায়িত্ব দিয়ে বললেন, 'এটা চিরদিনের জন্য রেখে দাও। তোমাদের কাছ থেকে যে এই চাবি কেড়ে নেবে সে জালিম।' বংশ পরম্পরায় এখনো সেই চাবি বনু শাইবার অধিকারে আছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px