📄 আল মুকাওকিসের নিকট চিঠি
পরবর্তী চিঠিটি পাঠানো হয় মিশরের শাসক আল মুকাওকিসের প্রতি, চিঠিটি পৌঁছে দেন হাতিব ইবন আবি বালতা।
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহর পক্ষ থেকে আল মুকাওকিসের উদ্দেশ্যে।
আমি আপনার কাছে ইসলামের বাণী নিয়ে এসেছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, আপনি নিরাপদ হয়ে যাবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন, আপনি দ্বিগুণ পুরস্কার পাবেন। আর আপনি যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে মিশরের খ্রিস্টানদের দায়ভারও আপনার উপর বর্তাবে।
বলো, 'হে আহলে কিতাব, এমন একটি বিষয়ের দিকে আসো-- যা আমাদের আর তোমাদের মধ্যে সমান-- আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করি না, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করি না এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে রব হিসাবে গ্রহণ করি না।' তারপর যদি তারা বিমুখ হয় তবে বলো, 'তোমরা সাক্ষী থাকো, নিশ্চয়ই আমরা মুসলিম।'
চিঠিটি পড়ে মুকাওকিস হাতিবকে বললেন,
- যিনি আপনাকে দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন, তিনি কি একজন রাসূল নন?
- অবশ্যই তিনি একজন রাসূল।
- যদি তা-ই হয়ে থাকে তবে যারা তাকে বের করে দিয়েছে, তাদের ধ্বংস চেয়ে তিনি কেন দুআ করলেন না?
- আপনি মারইয়ামের পুত্র ঈসার কথা ভাবুন। তিনিও একজন রাসূল ছিলেন। কিন্তু যখন তাঁর লোকেরা তাঁকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে সপ্তম আসমানে তুলে নিয়েছিলেন -- তখন কি তিনি তাদের ধ্বংসের জন্য দুআ করতে পারতেন না?
- হুম! নিশ্চয়ই আপনি একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যাকে আরেকজন জ্ঞানী ব্যক্তি পাঠিয়েছেন। আমি আপনার সাথে মুহাম্মাদের জন্য কিছু উপহার পাঠাচ্ছি।
মিশরের শাসকের প্রতিক্রিয়া ছিল ভদ্রোচিত, যদিও সে মুসলিম হয়নি। তিনি হাতিবের সাথে দুই বা তিনজন দাসী পাঠিয়ে দেন। এদের মধ্যে একজন ছিলেন মারিয়া। তাকে রাসূলুল্লাহ বিয়ে করে নেন এবং তাঁর গর্ভে রাসূলুল্লাহর পুত্র ইবরাহীমের জন্ম হয়। অল্প বয়সেই সে মারা যায়। অন্য দাসী দেওয়া হয় হাসান ইবন সাবিতকে। দুলদুল নামে একজন ভৃত্যও রাসূলুল্লাহকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়, আর সেই সাথে কিছু উপহার।
এগুলো ছাড়াও আরও কিছু চিঠি পাঠানো হয়েছিল আরবের রাজা-বাদশাহদের উদ্দেশ্যে। আন নাজাশীকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, পাঠানো হয়েছিল গাসসানের রাজাকে এবং বাহরাইনের শাসককেও। অবশ্য নাজাশীকে যে চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল সেটি কি মাক্কী জীবনে নাকি হুদাইবিয়ার পরে সেটি নিয়ে দ্বিমত আছে।
বনু হানীফা গোত্র থেকে একটা প্রতিনিধিদল এসেছিল। বনু হানীফা গোত্রের কথা আগে আলোচনা করা হয়েছে, যারা ছিল আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে সবচাইতে শত্রুভাবাপন্ন এবং রূঢ়। সেই গোত্রে ছিল মুসাইলামা। মুসাইলামা ইসলামের ইতিহাসে পরিচিত মুসাইলামা আল-কাযযাব বা মিথ্যাবাদী মুসাইলামা নামে। কারণ আল্লাহর রাসূলের জীবদ্দশাতেই সে নবুওয়াতের মিথ্যে দাবি করেছিল।
মুসাইলামা আল কাযযাব এসে রাসূলুল্লাহর কাছে দাবি করলো যদি তাঁর মৃত্যুর পর মুসাইলামাকে নেতৃত্ব দেওয়া হয়, তবে সে রাসূলুল্লাহর অনুসারী হবে। রাসূলুল্লাহ তাকে এক টুকরো খেজুরের ডাল দেখিয়ে বললেন, 'তুই যদি আমার কাছে এই খেজুরের ডালটাও চাস, সেটাও পাবি না। আল্লাহ তোর জন্য যা রেখেছেন তার চাইতে এক বিন্দু বেশিও তুই পাবি না। তুই যদি ফিরে যাস, আল্লাহ তোকে ধ্বংস করবেন। আর আমার বিশ্বাস তুই-ই সে-ই, যাকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। আমার পক্ষ হয়ে সাবিত ইবন কাইস তোর সাথে কথা বলবে।' এই বলে আল্লাহর রাসূল চলে গেলেন।
যে স্বপ্নের কথা তিনি বলছিলেন সেটা অন্য বর্ণনায় এসেছে। স্বপ্নটা ছিল এমন: রাসূলুল্লাহ স্বপ্নে তাঁর দুই হাতে দুটো বালা দেখেছেন। তাঁকে বলা হলো যেন তিনি সেগুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ ফুঁ দিলেন আর সেগুলো উড়ে গেল। এই দুটো বালা হলো দুই মিথ্যা নবী আসওয়াদ আল আনসি এবং মুসাইলামা আল-কাযযাব।
এই মুসাইলামা পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। লিখেছিল হিজরি দশ বা এগারো সালে। সে লিখেছিল, 'আল্লাহর রাসূল মুসাইলামা থেকে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের প্রতি, আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি আপনার সাথে বিবাদে লিপ্ত ছিলাম। যাই হোক, গোটা রাজ্যের অর্ধেক ক্ষমতা আমাকে দেওয়া হয়েছে, আর বাকিটা কুরাইশদের। কিন্ত কুরাইশরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।'
সে আল্লাহর রাসূলের সাথে সমান-সমান ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে চাচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহ চিঠির জবাবে লিখলেন, 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হতে মিথ্যাবাদী মুসাইলামার প্রতি, শান্তি বর্ষিত হোক তাদের প্রতি, যারা পথনির্দেশ অনুসরণ করে। এই জমিন আল্লাহর এবং তিনি এটা যাকে ইচ্ছা দান করেন। চূড়ান্ত সফলতা তাদের জন্য যারা ন্যায়নিষ্ঠ।'
যে দু'জন মুসাইলামার এই চিঠি বহন করেছিল রাসূলুল্লাহ তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে আমিই আল্লাহর রাসূল?' তারা বললো, 'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুসাইলামা আল্লাহর রাসূল।' রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, 'আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস করি। যদি আমি কখনো কোনো বার্তাবাহককে হত্যা করতাম, তবে আমি তোমাদের হত্যা করতাম।' অর্থাৎ, পত্রবাহককে হত্যা করা ইসলামে নিষিদ্ধ, যদিও তারা কাফির বা মুরতাদ বাহিনীর হয়। আল্লাহর রাসূল যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন মুসাইলামা অনেক বাগাড়ম্বর করলেও সরাসরি বিদ্রোহ করার সাহস দেখায়নি। তাকে দমন করা হয় আবু বকরের খিলাফতকালে।