📄 পারস্য সম্রাটের কাছে চিঠি
আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা আস-সাহমীকে পাঠানো হয় পারস্যের সম্রাটের কাছে। চিঠিটি দেওয়া হয় তৎকালীন বাহরাইনের রাজার কাছে। সে পারস্যের সম্রাটের কাছে চিঠিটি পৌঁছে দেয়।
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর নবী মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে পারস্যের মহান কিসরার প্রতি।
শান্তি বর্ষিত হোক তাদের প্রতি যারা সত্য পথের অনুসরণ করে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনে আর সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের আর কোনো যোগ্য সত্তা নেই এবং আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
আমি আপনার কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিচ্ছি। সকল মানবজাতির প্রতি প্রেরিত রাসূল হিসেবে জীবিত সকল মানুষকে আমি সতর্ক করছি: যারা আল্লাহ তাআলা উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না, তাদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য। আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করুন এবং ইসলাম গ্রহণ করুন। যদি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেন, তাহলে আপনি নিরাপদ হয়ে যাবেন। আর যদি এই আহবান প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে অগ্নিপূজারিদের (সমস্ত নাগরিক) দায়ভারও আপনার উপর বর্তাবে।'
কিসরা এই চিঠি পড়ে প্রচণ্ড ক্ষেপে যায়। সে বলে 'এত বড় সাহস! আমার দাস হয়ে আমাকে এমন চিঠি দেয়!' উদ্ধত কিসরা ইয়েমেনের গভর্নরকে আদেশ দেয় যেন সে দুইজন লোক পাঠিয়ে মুহাম্মাদকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে।
পারস্যরা আরবদের গোলাম মনে করতো। কারণ পারস্যের সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো শক্তিই আরবদের ছিল না। ইয়েমেন ছিল তখন পারস্যের আজ্ঞাবহ একটি দেশ। ইয়েমেনের তৎকালীন গভর্নর বাযান ইবন সাসান দুজন লোককে পাঠায় আল্লাহর রাসূলকে 'ধরে আনা'র জন্য।
বাযান কোনো সেনাবাহিনী পাঠানোর প্রয়োজনবোধ করলো না। পারস্যের সম্রাটের আদেশই ছিল যথেষ্ট, সেনা পাঠানোর দরকার নেই। তাইফে পৌঁছে তারা লোকদের সাথে কথাবার্তা বলে জানতে পারে আল্লাহর রাসূল মদীনায় আছেন। এই ঘটনা দেখে তায়েফবাসী এবং কুরাইশরা যারপরনাই খুশি হয়ে ওঠে। বলাবলি করতে থাকে, 'আহ! মুসলিমদের সময় শেষ হয়ে এল বলে!'
মদীনাতে গিয়ে তারা আল্লাহর রাসূলের সাথে দেখা করে। তাকে বলে, 'রাজাদের রাজা, শাহেনশাহ কিসরা, ইয়েমেনের রাজা বাযানকে এই মর্মে আদেশ করেছেন যেন আমরা আপনাকে এখান থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাই। যদি আপনি রাজি হন তাহলে বাযান আপনার পক্ষ হয়ে কিসরার সাথে কথা বলবে। আর আপনিও বড় বিপদ থেকে বাঁচবেন। আর আপনি যদি প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে কিসরার ক্ষমতা কেমন তা নিশ্চয়ই আপনার ভালোই জানা আছে। তিনি নিশ্চিতভাবে আপনার দেশ এবং জাতিকে ধ্বংস করে দেবেন।'
রাসূলুল্লাহ তাদেরকে পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করালেন। পরের দিন আল্লাহর রাসূল তাদের বললেন,
- গতরাতে আমার রব তোমাদের রবকে হত্যা করেছেন।
তারা হতভম্ভ হয়ে গেল, বললো,
- আপনি জানেন আপনি কী বলছেন! এর চাইতেও তুচ্ছ বিষয়ে আপনার জন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এরপরও কি আপনি চান যে রাজা বাযানকে আপনার এই কথাগুলো জানাই?
- হ্যাঁ, জানাও। তাকে আমার পক্ষ থেকে এও জানিয়ে দাও যে আমার দ্বীন এবং রাজ্য কিসরার ধর্ম ও রাজ্যকে উৎখাত করবে এবং সবকিছুকে ধুলোয় মিশিয়ে দিবে। তাকে আরও বলে দাও, যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তবে আমি তাকে তার বর্তমান পদেই বহাল রাখবো এবং সেই অঞ্চলের শাসক বানাবো।
এরপর আল্লাহর রাসূল তাদের কিছু উপহার দিয়ে বিদায় করে দেন।
লোক দুটো বাযানের কাছে ফিরে গেল। সব শুনে বাযানের মনে হলো, যেনতেন লোকের পক্ষে এমন কথা বলা সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই মুহাম্মাদের মাঝে বিশেষ কিছু আছে। সে কিছুদিন অপেক্ষা করতে চাইলো। কিছু সময় পর তারা খবর পেল কিসরা সে রাতেই মারা গেছে যে রাতের কথা আল্লাহর রাসূল বলেছিলেন। এই ঘটনাই ছিল বাযানের জন্য যথেষ্ট। সে মুসলিম হয়ে গেল। আল্লাহর রাসূল তাকে ইয়েমেনের গভর্নর হিসেবে রেখে দেন। এভাবেই ইয়েমেনে ইসলামের দরজা খুলে যায়।
পারস্যের নতুন কিসরা ছিল আগের কিসরারই ছেলে। সে তার বাবাকে খুন করে শাসনক্ষমতা দখল করে। নতুন কিসরা বাযানের কাছে চিঠি লিখে বলে, 'আমি আমার বাবাকে খুন করেছি কারণ সে আমাদের সম্মানিত লোকদের সাথে বিরূপ আচরণ করেছে। আর যে লোককে আমার গ্রেপ্তার করতে আমার বাবা আদেশ করেছিলেন, তার ব্যাপারে আপনার আর কিছু করার প্রয়োজন নেই।'
কিসরা যখন আল্লাহর রাসূলের চিঠি পেয়েছিল, তখন সেই চিঠি সে রাগে ঔদ্ধত্যে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে। তখন রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন, 'আল্লাহ তাআলা তার রাজত্ব ছিন্ন ভিন্ন করে দেবেন।' শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়েছিল। অল্প ক'বছর পরেই মুসলিমরা পারস্য সাম্রাজ্য জয় করে নেয়।
📄 আল মুকাওকিসের নিকট চিঠি
পরবর্তী চিঠিটি পাঠানো হয় মিশরের শাসক আল মুকাওকিসের প্রতি, চিঠিটি পৌঁছে দেন হাতিব ইবন আবি বালতা।
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহর পক্ষ থেকে আল মুকাওকিসের উদ্দেশ্যে।
আমি আপনার কাছে ইসলামের বাণী নিয়ে এসেছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, আপনি নিরাপদ হয়ে যাবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন, আপনি দ্বিগুণ পুরস্কার পাবেন। আর আপনি যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে মিশরের খ্রিস্টানদের দায়ভারও আপনার উপর বর্তাবে।
বলো, 'হে আহলে কিতাব, এমন একটি বিষয়ের দিকে আসো-- যা আমাদের আর তোমাদের মধ্যে সমান-- আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করি না, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করি না এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে রব হিসাবে গ্রহণ করি না।' তারপর যদি তারা বিমুখ হয় তবে বলো, 'তোমরা সাক্ষী থাকো, নিশ্চয়ই আমরা মুসলিম।'
চিঠিটি পড়ে মুকাওকিস হাতিবকে বললেন,
- যিনি আপনাকে দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন, তিনি কি একজন রাসূল নন?
- অবশ্যই তিনি একজন রাসূল।
- যদি তা-ই হয়ে থাকে তবে যারা তাকে বের করে দিয়েছে, তাদের ধ্বংস চেয়ে তিনি কেন দুআ করলেন না?
- আপনি মারইয়ামের পুত্র ঈসার কথা ভাবুন। তিনিও একজন রাসূল ছিলেন। কিন্তু যখন তাঁর লোকেরা তাঁকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে সপ্তম আসমানে তুলে নিয়েছিলেন -- তখন কি তিনি তাদের ধ্বংসের জন্য দুআ করতে পারতেন না?
- হুম! নিশ্চয়ই আপনি একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যাকে আরেকজন জ্ঞানী ব্যক্তি পাঠিয়েছেন। আমি আপনার সাথে মুহাম্মাদের জন্য কিছু উপহার পাঠাচ্ছি।
মিশরের শাসকের প্রতিক্রিয়া ছিল ভদ্রোচিত, যদিও সে মুসলিম হয়নি। তিনি হাতিবের সাথে দুই বা তিনজন দাসী পাঠিয়ে দেন। এদের মধ্যে একজন ছিলেন মারিয়া। তাকে রাসূলুল্লাহ বিয়ে করে নেন এবং তাঁর গর্ভে রাসূলুল্লাহর পুত্র ইবরাহীমের জন্ম হয়। অল্প বয়সেই সে মারা যায়। অন্য দাসী দেওয়া হয় হাসান ইবন সাবিতকে। দুলদুল নামে একজন ভৃত্যও রাসূলুল্লাহকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়, আর সেই সাথে কিছু উপহার।
এগুলো ছাড়াও আরও কিছু চিঠি পাঠানো হয়েছিল আরবের রাজা-বাদশাহদের উদ্দেশ্যে। আন নাজাশীকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, পাঠানো হয়েছিল গাসসানের রাজাকে এবং বাহরাইনের শাসককেও। অবশ্য নাজাশীকে যে চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল সেটি কি মাক্কী জীবনে নাকি হুদাইবিয়ার পরে সেটি নিয়ে দ্বিমত আছে।
বনু হানীফা গোত্র থেকে একটা প্রতিনিধিদল এসেছিল। বনু হানীফা গোত্রের কথা আগে আলোচনা করা হয়েছে, যারা ছিল আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে সবচাইতে শত্রুভাবাপন্ন এবং রূঢ়। সেই গোত্রে ছিল মুসাইলামা। মুসাইলামা ইসলামের ইতিহাসে পরিচিত মুসাইলামা আল-কাযযাব বা মিথ্যাবাদী মুসাইলামা নামে। কারণ আল্লাহর রাসূলের জীবদ্দশাতেই সে নবুওয়াতের মিথ্যে দাবি করেছিল।
মুসাইলামা আল কাযযাব এসে রাসূলুল্লাহর কাছে দাবি করলো যদি তাঁর মৃত্যুর পর মুসাইলামাকে নেতৃত্ব দেওয়া হয়, তবে সে রাসূলুল্লাহর অনুসারী হবে। রাসূলুল্লাহ তাকে এক টুকরো খেজুরের ডাল দেখিয়ে বললেন, 'তুই যদি আমার কাছে এই খেজুরের ডালটাও চাস, সেটাও পাবি না। আল্লাহ তোর জন্য যা রেখেছেন তার চাইতে এক বিন্দু বেশিও তুই পাবি না। তুই যদি ফিরে যাস, আল্লাহ তোকে ধ্বংস করবেন। আর আমার বিশ্বাস তুই-ই সে-ই, যাকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। আমার পক্ষ হয়ে সাবিত ইবন কাইস তোর সাথে কথা বলবে।' এই বলে আল্লাহর রাসূল চলে গেলেন।
যে স্বপ্নের কথা তিনি বলছিলেন সেটা অন্য বর্ণনায় এসেছে। স্বপ্নটা ছিল এমন: রাসূলুল্লাহ স্বপ্নে তাঁর দুই হাতে দুটো বালা দেখেছেন। তাঁকে বলা হলো যেন তিনি সেগুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ ফুঁ দিলেন আর সেগুলো উড়ে গেল। এই দুটো বালা হলো দুই মিথ্যা নবী আসওয়াদ আল আনসি এবং মুসাইলামা আল-কাযযাব।
এই মুসাইলামা পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। লিখেছিল হিজরি দশ বা এগারো সালে। সে লিখেছিল, 'আল্লাহর রাসূল মুসাইলামা থেকে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের প্রতি, আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি আপনার সাথে বিবাদে লিপ্ত ছিলাম। যাই হোক, গোটা রাজ্যের অর্ধেক ক্ষমতা আমাকে দেওয়া হয়েছে, আর বাকিটা কুরাইশদের। কিন্ত কুরাইশরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।'
সে আল্লাহর রাসূলের সাথে সমান-সমান ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে চাচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহ চিঠির জবাবে লিখলেন, 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হতে মিথ্যাবাদী মুসাইলামার প্রতি, শান্তি বর্ষিত হোক তাদের প্রতি, যারা পথনির্দেশ অনুসরণ করে। এই জমিন আল্লাহর এবং তিনি এটা যাকে ইচ্ছা দান করেন। চূড়ান্ত সফলতা তাদের জন্য যারা ন্যায়নিষ্ঠ।'
যে দু'জন মুসাইলামার এই চিঠি বহন করেছিল রাসূলুল্লাহ তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে আমিই আল্লাহর রাসূল?' তারা বললো, 'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুসাইলামা আল্লাহর রাসূল।' রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, 'আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস করি। যদি আমি কখনো কোনো বার্তাবাহককে হত্যা করতাম, তবে আমি তোমাদের হত্যা করতাম।' অর্থাৎ, পত্রবাহককে হত্যা করা ইসলামে নিষিদ্ধ, যদিও তারা কাফির বা মুরতাদ বাহিনীর হয়। আল্লাহর রাসূল যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন মুসাইলামা অনেক বাগাড়ম্বর করলেও সরাসরি বিদ্রোহ করার সাহস দেখায়নি। তাকে দমন করা হয় আবু বকরের খিলাফতকালে।