📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 যাতুস সালাসিলের অভিযান

📄 যাতুস সালাসিলের অভিযান


এটি ছিল আমর ইবন আসের নেতৃত্বে প্রথম সারিয়াহ। মাত্র কিছুদিন আগেই তিনি খালিদ ইবন ওয়ালিদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাসূলুল্লাহ তাদের নেতৃত্বস্থানে বসালেন, কেননা এ দু'জনের মধ্যে জন্মগতভাবেই নেতৃত্বের গুণ ছিল। এই অভিযানের নাম ছিল যাতুস-সালাসিল, কেননা যাতুস-সালাসিল নামের একটি কূপ বা নদীর উৎসের কাছে এই অভিযান সংঘটিত হয়। অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল মু'তার যুদ্ধে রোমানদের পক্ষাবলম্বনকারী বনু কুদাআহ গোত্রকে শায়েস্তা করা। আমর ইবন আল আস তিনশো মুহাজির ও আনসার সাথে নিয়ে অভিযানে বের হলেন। শত্রুপক্ষের কাছাকাছি গিয়ে জানতে পারলেন তারা বিশাল বাহিনী নিয়ে লড়তে এসেছে। তখন আমর আল্লাহর রাসূলের কাছে অতিরিক্ত সৈন্য চেয়ে খবর পাঠালে আল্লাহর রাসূল আবু উবায়দা ইবন আল-যাররাহর নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনী পাঠান।

অভিযানের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। কারণ শত্রুপক্ষ প্রতিরোধ গড়ার পরিবর্তে পালিয়ে যায়। আরবের উত্তরে মুসলিমদের কর্তৃত্ব সুসংহত হয়। কিছু গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে আর কিছু গোত্র মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়।

শিক্ষা
১) এই অভিযানের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ঐক্য। রাসূলুল্লাহ যখন আবু উবায়দাকে আমীর নিযুক্ত করে অতিরিক্ত সৈন্য পাঠান, তখন সালাতে ইমামতি কে করাবেন সেটা নিয়ে তাদের মধ্যে বিতর্ক হয়। আমর ইবন আল আস বললেন, 'আমি তোমাদের সবার আমীর, কারণ তোমরা এসেছো অতিরিক্ত সৈন্য হিসেবে।' মুহাজিররা প্রতিবাদ করলেন, বললেন, 'আপনি আপনার দলের লোকদের আমীর, আর আবু উবায়দা তার দলের আমীর।'

বিষয়টা গুরুতর হয়ে যাচ্ছে দেখে আবু উবায়দা আমরকে বললেন, 'রাসূলুল্লাহ আমাকে সর্বশেষ নির্দেশে বলেছেন, তোমরা মিলেমিশে থাকবে, একে অপরের সাথে বিরোধ করবে না। কাজেই আমর, তুমি যদি আমাকে মানতে না চাও, তাহলে আমি তোমাকে মানবো।' এরপর আবু উবায়দা আমর ইবন আল-আসের নেতৃত্ব মেনে নিলেন এবং সবাই এক আমীরের অধীনে সালাত আদায় করলো।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় হলো ঐক্য বজায় রাখা। আবু উবায়দা এখানে আমরের অধীনস্থ ছিলেন না, চাইলেই তিনি নিজের মতের ওপরে অটল থাকতে পারতেন। কিন্তু ঐক্যের স্বার্থে, বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে তিনি নিজের নেতৃত্ব ছেড়ে দিলেন। আবু উবায়দা ছিলেন খুবই শান্ত মেজাজের সরল মনের মানুষ, তাই বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাননি। নিজের ক্ষমতার ওপর ঐক্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

২) আমর ইবন আল-আস ছিলেন নও-মুসলিম, কিন্তু ইসলামের শিক্ষা রপ্ত করতে এবং নিজের যোগ্যতা ইসলামের কাজে লাগাতে সময় নেননি।

ক) অভিযান প্রেরণের সময় আল্লাহর রাসূল আমর ইবন আল-আসকে বলেন, 'তোমাকে আমি একটি বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নির্ধারণ করেছি। আল্লাহ যেন তোমাকে নিরাপদ রাখেন এবং তোমাকে গনিমতের সম্পদ দান করেন।' জবাবে আমর বলেন, 'আল্লাহর রাসূল, আমি তো গনিমতের আশায় ইসলাম গ্রহণ করিনি।' রাসূলুল্লাহ তখন তাকে বললেন, 'শোনো, নেককার লোকের হাতে হালাল সম্পদ হলো বরকতময়।' এ হাদীস থেকে দুটো জিনিস বোঝা যায়, এক, আমর ইবন আল-আস আন্তরিকভাবেই ইসলামের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। গনিমতের উদ্দেশ্যে তিনি মুসলিম হননি এবং দুই, টাকা পয়সা থাকাটা খারাপ কোনো ব্যাপার নয়, সে টাকা কীভাবে কামানো হচ্ছে বা কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে সেটাই আসল কথা। রাসূলুল্লাহ বলছিলেন, যারা ভালো লোক, তারা যদি বিত্তশালী হয় তাতে খারাপ কিছু নেই কারণ তারা তাদের সম্পদ হালাল উপায়ে আয় করে এবং ভালো কাজে খরচ করে।

খ) অভিযানের পুরো সময় জুড়ে আমর সৈনিকদের নিরাপত্তার দিকে লক্ষ রেখেছেন। দিনের বেলা ভ্রমণ না করে রাতের অন্ধকারে পথ চলেছেন। নিশ্চিত করেছেন কেউ যেন আলো না জ্বালায়। শত্রুরা পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের পিছু নেননি, কারণ শত্রুরা অতিরিক্ত সৈন্য নিয়ে হাজির হলে তিনি তার সীমিত সংখ্যক সৈনিক নিয়ে তাদের সাথে পেরে উঠবেন না, তাই তিনি মদীনায় চলে আসেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন।

গ) অভিযানের এক রাতে আমর ইবন আসের স্বপ্নদোষ হয়। সে রাতে ছিল প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তাই তিনি গোসল না করে শুধুমাত্র তায়াম্মুম করেন এবং সে অবস্থায় অন্যদের ইমামতি করেন। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহকে বিষয়টি জানানো হয়। আমর ইবন আল আস বললেন, 'আমি নিজেকে নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম। যদি আমি সেদিন গোসল করতাম তাহলে নির্ঘাৎ মারা যেতাম! তখন অসম্ভব ঠাণ্ডা ছিল তাই সতর্কতাবশত শুধু তায়াম্মুম করেছি।' রাসূলুল্লাহ শুনে হাসলেন, কিছুই বললেন না। অর্থাৎ আমরের এই কাজে রাসূলুল্লাহ সম্মতি প্রকাশ করেছেন। অনেক আলিম এই ঘটনার ওপরে মত দিয়েছেন, যদি আবহাওয়া অত্যন্ত ঠাণ্ডা হয় এবং পানি খুব ঠাণ্ডা হয় তবে ফরজ গোসলের পরিবর্তে ওযু বা তায়াম্মুম যথেষ্ট হবে। কুরআনের যে আয়াতের ওপর ভিত্তি করে আমর ইবন আল-আস ইজতিহাদটি করেন সেটি হলো,

“...এবং তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল।” (সূরা নিসা, ৪: ২৯)

এ ঘটনা থেকে প্রমাণ হয় আল্লাহর রাসূলের যুগে ইজতিহাদের অনুমোদন ছিল। আর আমর নও-মুসলিম হয়েও এই ইজতিহাদটি করেছেন। এটা প্রমাণ করে আমর কুরআনের জ্ঞান রাখতেন।

৩) আমীরের আনুগত্য তখনই করা উচিত যখন তিনি ভালো কাজের আদেশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু যদি তিনি খারাপ কাজের আদেশ করেন তাহলে তাঁকে অনুসরণ করা যাবে না। এটা শুধু সামরিক অভিযানের আমীরের ক্ষেত্রে নয়, বরং সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন কারো বাবা-মা যদি মেয়েকে বলেন হিজাব পরা যাবে না-- সেক্ষেত্রে বাবা-মায়ের আনুগত্য করা যাবে না। যদি পেশাগত জীবনে কর্তৃপক্ষ কোনো হারাম কাজের আদেশ দেয় সেক্ষেত্রে তার কথা শোনা যাবে না। রাষ্ট্রীয় জীবনে শাসক যদি জিহাদ ফী-সাবিলিল্লাহ নিষিদ্ধ করে দেয় অথবা মুসলিমদেরকে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের অনুগত বানিয়ে রাখতে চায়-- তাহলে তার আনুগত্য করা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। বর্তমান সময়ে ইসলাম পালনের ব্যাপারে সর্বদিক থেকে বাধা আসছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে- কারো আদেশ মান্য করতে গিয়ে আল্লাহর আদেশকে অমান্য করা যাবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px