📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুস‌লিম বাহিনীর প্রত্যাবর্তন

📄 মুস‌লিম বাহিনীর প্রত্যাবর্তন


মুসলিম বাহিনী যখন মদীনার কাছাকাছি, তাদের অভ্যর্থনা জানাতে আল্লাহর রাসূল ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে পড়লেন। আল্লাহর রাসূল বললেন, জাফর ইবন আবি তালিবের বাচ্চাকাচ্চাদের যেন তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জাফরের স্ত্রী আসমা বিনত উমাইস বাচ্চাদের গোসল করিয়ে, গায়ে তেল মেখে রাসূলুল্লাহর কাছে পাঠান। আল্লাহর রাসূল তাদের দেখে জড়িয়ে ধরেন, তাঁর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরতে থাকে। আসমা বুঝতে পারেন কিছু একটা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল তাকে বললেন, জাফর শহীদ হয়েছে। আসমা চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। রাসূলুল্লাহ তখন সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'এই দুনিয়া এবং আখিরাতে আমিই হবো জাফরের সন্তানদের ওয়ালি।' জাফরের সন্তানদের জন্য এটা ছিল একটা বিশেষ মর্যাদা।

যে তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী দুই লাখ সেনার বিপরীতে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে কৌশলগত কারণে মদীনায় ফিরে এল, সেই বাহিনীই যখন মদীনায় প্রবেশ করলো, মুসলিমরা তাদের দিকে মাটি ছুঁড়ে মারলো! 'ছি! তোমরা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে এসেছো!' আল্লাহর রাসূল তাদের ভুল শুধরে দিয়ে বললেন, 'না, তারা পালিয়ে আসেনি। তারা ফিরে এসেছে যেন তারা আবার যুদ্ধ করতে পারে, ইনশা আল্লাহ!'

এই যুদ্ধে নিজেদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনাটাই ছিল বিজয়। তাই যখন আল্লাহর রাসূল খবর পেয়েছিলেন খালিদের হাতে বাহিনীর নেতৃত্ব, তখন সবাইকে বলেছিলেন খালিদের হাতে বিজয় আসবে। এখানে লক্ষণীয় মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি, যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসাটা ছিল সাহাবিদের চোখে লজ্জাজনক পরাজয়। মু'তার যুদ্ধ পরাজয় ছিল না, কিন্তু তবু তারা প্রথমে মানতে পারছিলেন না কীভাবে মুসলিম বাহিনী ময়দান ছেড়ে আসে। আসলে সে যুগের মুসলিমরা অনেক ইতিবাচকভাবে জীবনটা দেখতেন, আর আমরা আমাদের পরাজিত অবস্থাকে মেনে নিয়ে জিহাদকেই পরিত্যাগ করে বসেছি।

স্বামীর শোকে শোকাহত আসমা অবশ্য খুব দ্রুতই নিজেকে সামলে নেন। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তিনি আবু বকর সিদ্দীকের কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পান এবং রাজি হন। তাদের বিয়ে হলো, ঘর আলো করে এল মুহাম্মাদ নামের এক পুত্র সন্তান। আবু বকর সিদ্দীকের মৃত্যুর পর আসমা বিনতে উমাইসকে বিয়ে করে নেন আলী ইবন আবু তালিব। মুহাম্মাদ ইবন আবু বকর আলী ইবন আবু তালিবের ঘরে বেড়ে ওঠেন। আগের ঘরের সন্তান হলেও আলী মুহাম্মাদকে খুবই ভালোবেসে বড় করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাদের এই ভালো সম্পর্ক বজায় ছিল।

প্রথম যুগের মুসলিম সমাজে কোনো মুসলিম বোনই একা বা অবিবাহিত থাকতেন না। বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেলে সহজেই তার বিয়ে হয়ে যেতো। বিধবা হলেও সমস্যা ছিল না, কেউ না কেউ তাকে বিয়ে করে নিতো। এমনকি বয়স হয়ে গেলেও তাদের বিয়ে হতে কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু আমাদের সমাজে বিষয়টা একেবারে উল্টো। প্রথমত, বহুবিবাহকে বেশিরভাগ মানুষ সহ্য করতে পারে না। এটাকে রীতিমতো অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। নিজের চাইতে বয়সে বড় এমন কাউকে বিয়ে করতে অনেক ভাই পছন্দ করেন না। তালাকপ্রাপ্ত হওয়াটা যেন কলঙ্ক, আর বিধবা হওয়াটা যেন দোষ। তাদেরও সাধারণত বিয়ের বাজারে পরিহার করা হয়।

বহুবিবাহকে উৎসাহিত ও গ্রহণযোগ্য করা না হলে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। একটি পরিবারের অংশ হওয়াটা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক জীবনের সাজসজ্জার অংশ হলো পারিবারিক জীবন। সাহাবিরা সে যুগে এটা নিশ্চিত করেছেন যেন কোনো বোন সংসারজীবন থেকে বঞ্চিত না হয়। তারা বয়স্কা, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা -- কাউকেই অবহেলা করতেন না।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 তিন আমীরের মর্যাদা

📄 তিন আমীরের মর্যাদা


যাইনাবের সাথে আল্লাহর রাসূলের বিয়ে আলোচনার আলোচনায় যাইদ ইবন হারিসাকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কীভাবে তিনি তার বাবা-মায়ের ঘর থেকে খাদিজার হাতে আসেন, আল্লাহর রাসূলের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বড় হন আর জিহাদের ময়দানে তার অবদান কী, ইত্যাদি। তবে যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি সেটা হচ্ছে তিনি হলেন একমাত্র সাহাবি যার নাম কুরআনে আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন।

'এরপর যাইদ যখন তার (যাইনাবের) সাথে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করলো তখন আমি তাকে আপনার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করলাম, যাতে মু'মিনদের পোষ্য পুত্ররা নিজ স্ত্রীর সাথে বিবাহ সূত্র ছিন্ন করলে সেই সব নারীকে বিয়ে করায় মু'মিনদের জন্য কোনো বিঘ্ন না হয়... ' (সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৭)

কুরআনে অন্য সাহাবিদের কথা বলা হয়েছে, সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে আয়াত নাযিল হয়েছে, কিন্তু একমাত্র যাইদ ছাড়া নাম ধরে কারো কথা উল্লেখ করা হয়নি। এই সম্মান আবু বকর, উমার, উসমান বা আলীও লাভ করেননি।

জাফর ইবন আবি তালিব ছিলেন রাসূলুল্লাহর চাচাতো ভাই। তিনি আলী ইবন আবি তালিবের আপন বড় ভাই। তিনি ছিলেন আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলিম দলের আমীর। দীর্ঘ দশ বছর পর সেখান থেকে তারা মদীনায় ফিরে আসেন। এই পুরো সময়টায় তিনিই ছিলেন মুসলিম মুহাজিরদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তিনি আবিসিনিয়া ও মদীনা দুই দেশে হিজরতের সাওয়াব লাভ করেছেন।

জাফরের মর্যাদা হলো তার দুই ডানা। মু'তার যুদ্ধে জাফর তার দুটো হাত হারিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর বীরত্বের খেতাবস্বরুপ দুটো হাতের পরিবর্তে তাকে দিয়েছিলেন দুটো ডানা। এ ডানা মেলে তিনি জান্নাতের যেখানে খুশি সেখানে ঘুরে বেড়াবেন! ইবন উমার বলতেন, 'শান্তি বর্ষিত হোক তোমার উপর, হে দুই ডানাওয়ালা!'

আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ছিলেন আকাবার শপথে একজন নাকীব। বারো জনের একজন যারা তাদের গোত্রের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি শুধু মুজাহিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন কবি বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে, সেই যুগের মিডিয়াকর্মী। ইসলামের সমর্থনে এবং রাসূলুল্লাহর প্রশংসায় তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন।

একটি হাদীস থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার চোখে এই তিন আমীরের মর্যাদা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আবু উমামা আল বাহিলী বর্ণনা করেন,

'আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন,

একদিন আমি ঘুমাচ্ছিলাম। স্বপ্নে দেখি, দুজন লোক আমার কাছে আসলো আর আমার হাত দুটো শক্ত করে ধরলো। এরপর আমাকে একটি অসমতল পাহাড়ের কাছে নিয়ে বললো, এটায় চড়ুন! আমি বললাম, আমি এখানে চড়তে পারবো না। তারা বললো, আমরা আপনার জন্যে সহজ করে দেবো। আমি পাহাড়ে চড়লাম। পাহাড়ের মাঝামাঝি পৌঁছে বিকট চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলাম, বললাম, এগুলো কীসের চিৎকার? দুই ফেরেশতা বললো, এগুলো হচ্ছে জাহান্নামীদের আর্তনাদ। এরপর তারা আমাকে নিয়ে আরও এগিয়ে গেল, দেখলাম, একটি দলকে তাদের গ্রীবা ধমনী দ্বারা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, তাদের ক্ষতবিক্ষত চোয়াল দিয়ে রক্ত ঝরছে। বললাম, এরা কারা? তারা বললো, এরা তারা যারা সাওম ভঙ্গ করতো। তারপর তারা আমাকে আরও সামনে নিয়ে গেল। দেখলাম, একদল লোকের মৃত দেহ ফুলে গিয়ে ভীষণ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, সে দুর্গন্ধ বিষ্ঠার দুর্গন্ধের মতোই অস্বস্তিকর। জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা বললো, এরা তারা যারা কাফিরদের মধ্যে নিহত হয়েছে। তারপর তারা আমাকে আরও সামনে নিয়ে গেল। সেখানেও কিছু লোককে দেখলাম যাদের দেহ ফুলে গিয়ে বিষ্ঠার মতো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। জানতে চাইলাম, এরা কারা? ফেরেশতারা উত্তর দিলো, এরা ছিল ব্যভিচারী পুরুষ ও নারী।

আমাকে আরও সামনে নিয়ে গেল তারা। দেখলাম, কিছু মহিলার স্তনে সাপ দংশন করছে। জিজ্ঞেস করলাম, এদের অবস্থা এমন কেন? ফেরেশতারা উত্তর দিলো, এরা তাদের ছেলেমেয়েদের তাদের দুধ পান করতে দেয়নি। তারপর তারা আমাকে আরও সামনে নিয়ে চললো। দেখলাম, কিছু বালক যারা দুটো সাগরের মধ্যে খেলাধুলা করছে। বললাম, এরা কারা? ফেরেশতারা বললো, এরা মু'মিনদের নাবালক অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী সন্তান। এরপর তারা আমাকে নিয়ে গেল একটি উঁচু জায়গায়, সেখানে তিনজনের একটি দলকে দেখলাম যারা জান্নাতী সুরা পান করছে। জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা জবাব দিলো, এরা হচ্ছেন জাফর ইবন আবু তালিব, যাইদ ইবন হারিসা এবং আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। তারপর তারা আমাকে অন্য একটি উঁচু জায়গায় নিয়ে গেল, সেখানেও দেখলাম তিনজনের একটি দল। জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা?' তারা বলেন, এরা হচ্ছেন ইবরাহীম, মুসা এবং ঈসা; তারা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।'

টিকাঃ
১০২. ইবন হিব্বান, হাদীস ৭৪৯১।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 যাতুস সালাসিলের অভিযান

📄 যাতুস সালাসিলের অভিযান


এটি ছিল আমর ইবন আসের নেতৃত্বে প্রথম সারিয়াহ। মাত্র কিছুদিন আগেই তিনি খালিদ ইবন ওয়ালিদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাসূলুল্লাহ তাদের নেতৃত্বস্থানে বসালেন, কেননা এ দু'জনের মধ্যে জন্মগতভাবেই নেতৃত্বের গুণ ছিল। এই অভিযানের নাম ছিল যাতুস-সালাসিল, কেননা যাতুস-সালাসিল নামের একটি কূপ বা নদীর উৎসের কাছে এই অভিযান সংঘটিত হয়। অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল মু'তার যুদ্ধে রোমানদের পক্ষাবলম্বনকারী বনু কুদাআহ গোত্রকে শায়েস্তা করা। আমর ইবন আল আস তিনশো মুহাজির ও আনসার সাথে নিয়ে অভিযানে বের হলেন। শত্রুপক্ষের কাছাকাছি গিয়ে জানতে পারলেন তারা বিশাল বাহিনী নিয়ে লড়তে এসেছে। তখন আমর আল্লাহর রাসূলের কাছে অতিরিক্ত সৈন্য চেয়ে খবর পাঠালে আল্লাহর রাসূল আবু উবায়দা ইবন আল-যাররাহর নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনী পাঠান।

অভিযানের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। কারণ শত্রুপক্ষ প্রতিরোধ গড়ার পরিবর্তে পালিয়ে যায়। আরবের উত্তরে মুসলিমদের কর্তৃত্ব সুসংহত হয়। কিছু গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে আর কিছু গোত্র মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়।

শিক্ষা
১) এই অভিযানের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ঐক্য। রাসূলুল্লাহ যখন আবু উবায়দাকে আমীর নিযুক্ত করে অতিরিক্ত সৈন্য পাঠান, তখন সালাতে ইমামতি কে করাবেন সেটা নিয়ে তাদের মধ্যে বিতর্ক হয়। আমর ইবন আল আস বললেন, 'আমি তোমাদের সবার আমীর, কারণ তোমরা এসেছো অতিরিক্ত সৈন্য হিসেবে।' মুহাজিররা প্রতিবাদ করলেন, বললেন, 'আপনি আপনার দলের লোকদের আমীর, আর আবু উবায়দা তার দলের আমীর।'

বিষয়টা গুরুতর হয়ে যাচ্ছে দেখে আবু উবায়দা আমরকে বললেন, 'রাসূলুল্লাহ আমাকে সর্বশেষ নির্দেশে বলেছেন, তোমরা মিলেমিশে থাকবে, একে অপরের সাথে বিরোধ করবে না। কাজেই আমর, তুমি যদি আমাকে মানতে না চাও, তাহলে আমি তোমাকে মানবো।' এরপর আবু উবায়দা আমর ইবন আল-আসের নেতৃত্ব মেনে নিলেন এবং সবাই এক আমীরের অধীনে সালাত আদায় করলো।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় হলো ঐক্য বজায় রাখা। আবু উবায়দা এখানে আমরের অধীনস্থ ছিলেন না, চাইলেই তিনি নিজের মতের ওপরে অটল থাকতে পারতেন। কিন্তু ঐক্যের স্বার্থে, বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে তিনি নিজের নেতৃত্ব ছেড়ে দিলেন। আবু উবায়দা ছিলেন খুবই শান্ত মেজাজের সরল মনের মানুষ, তাই বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাননি। নিজের ক্ষমতার ওপর ঐক্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

২) আমর ইবন আল-আস ছিলেন নও-মুসলিম, কিন্তু ইসলামের শিক্ষা রপ্ত করতে এবং নিজের যোগ্যতা ইসলামের কাজে লাগাতে সময় নেননি।

ক) অভিযান প্রেরণের সময় আল্লাহর রাসূল আমর ইবন আল-আসকে বলেন, 'তোমাকে আমি একটি বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নির্ধারণ করেছি। আল্লাহ যেন তোমাকে নিরাপদ রাখেন এবং তোমাকে গনিমতের সম্পদ দান করেন।' জবাবে আমর বলেন, 'আল্লাহর রাসূল, আমি তো গনিমতের আশায় ইসলাম গ্রহণ করিনি।' রাসূলুল্লাহ তখন তাকে বললেন, 'শোনো, নেককার লোকের হাতে হালাল সম্পদ হলো বরকতময়।' এ হাদীস থেকে দুটো জিনিস বোঝা যায়, এক, আমর ইবন আল-আস আন্তরিকভাবেই ইসলামের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। গনিমতের উদ্দেশ্যে তিনি মুসলিম হননি এবং দুই, টাকা পয়সা থাকাটা খারাপ কোনো ব্যাপার নয়, সে টাকা কীভাবে কামানো হচ্ছে বা কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে সেটাই আসল কথা। রাসূলুল্লাহ বলছিলেন, যারা ভালো লোক, তারা যদি বিত্তশালী হয় তাতে খারাপ কিছু নেই কারণ তারা তাদের সম্পদ হালাল উপায়ে আয় করে এবং ভালো কাজে খরচ করে।

খ) অভিযানের পুরো সময় জুড়ে আমর সৈনিকদের নিরাপত্তার দিকে লক্ষ রেখেছেন। দিনের বেলা ভ্রমণ না করে রাতের অন্ধকারে পথ চলেছেন। নিশ্চিত করেছেন কেউ যেন আলো না জ্বালায়। শত্রুরা পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের পিছু নেননি, কারণ শত্রুরা অতিরিক্ত সৈন্য নিয়ে হাজির হলে তিনি তার সীমিত সংখ্যক সৈনিক নিয়ে তাদের সাথে পেরে উঠবেন না, তাই তিনি মদীনায় চলে আসেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন।

গ) অভিযানের এক রাতে আমর ইবন আসের স্বপ্নদোষ হয়। সে রাতে ছিল প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তাই তিনি গোসল না করে শুধুমাত্র তায়াম্মুম করেন এবং সে অবস্থায় অন্যদের ইমামতি করেন। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহকে বিষয়টি জানানো হয়। আমর ইবন আল আস বললেন, 'আমি নিজেকে নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম। যদি আমি সেদিন গোসল করতাম তাহলে নির্ঘাৎ মারা যেতাম! তখন অসম্ভব ঠাণ্ডা ছিল তাই সতর্কতাবশত শুধু তায়াম্মুম করেছি।' রাসূলুল্লাহ শুনে হাসলেন, কিছুই বললেন না। অর্থাৎ আমরের এই কাজে রাসূলুল্লাহ সম্মতি প্রকাশ করেছেন। অনেক আলিম এই ঘটনার ওপরে মত দিয়েছেন, যদি আবহাওয়া অত্যন্ত ঠাণ্ডা হয় এবং পানি খুব ঠাণ্ডা হয় তবে ফরজ গোসলের পরিবর্তে ওযু বা তায়াম্মুম যথেষ্ট হবে। কুরআনের যে আয়াতের ওপর ভিত্তি করে আমর ইবন আল-আস ইজতিহাদটি করেন সেটি হলো,

“...এবং তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল।” (সূরা নিসা, ৪: ২৯)

এ ঘটনা থেকে প্রমাণ হয় আল্লাহর রাসূলের যুগে ইজতিহাদের অনুমোদন ছিল। আর আমর নও-মুসলিম হয়েও এই ইজতিহাদটি করেছেন। এটা প্রমাণ করে আমর কুরআনের জ্ঞান রাখতেন।

৩) আমীরের আনুগত্য তখনই করা উচিত যখন তিনি ভালো কাজের আদেশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু যদি তিনি খারাপ কাজের আদেশ করেন তাহলে তাঁকে অনুসরণ করা যাবে না। এটা শুধু সামরিক অভিযানের আমীরের ক্ষেত্রে নয়, বরং সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন কারো বাবা-মা যদি মেয়েকে বলেন হিজাব পরা যাবে না-- সেক্ষেত্রে বাবা-মায়ের আনুগত্য করা যাবে না। যদি পেশাগত জীবনে কর্তৃপক্ষ কোনো হারাম কাজের আদেশ দেয় সেক্ষেত্রে তার কথা শোনা যাবে না। রাষ্ট্রীয় জীবনে শাসক যদি জিহাদ ফী-সাবিলিল্লাহ নিষিদ্ধ করে দেয় অথবা মুসলিমদেরকে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের অনুগত বানিয়ে রাখতে চায়-- তাহলে তার আনুগত্য করা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। বর্তমান সময়ে ইসলাম পালনের ব্যাপারে সর্বদিক থেকে বাধা আসছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে- কারো আদেশ মান্য করতে গিয়ে আল্লাহর আদেশকে অমান্য করা যাবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px