📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 যুদ্ধ শুরু হলো

📄 যুদ্ধ শুরু হলো


যাইদ ইবন হারিসা ছিলেন এই যুদ্ধের প্রথম আমীর। তাঁর হাতে মুসলিম বাহিনীর পতাকা পতপত করে উড়ছে। সবাই দেখলো, বীরের মতো যাইদ ইবন হারিসা সামনের দিকে ছুটে গেলেন। সেই চেহারায় কোনো ভয় নেই, কোনো শঙ্কা নেই। শত্রুপক্ষের ব্যুহ ভেদ করে তাদের বাহিনীতে ঢুকে পড়লেন অকুতোভয় এক যুবক। যুদ্ধ করতে করতে এক সময় শত্রুদের বর্শা আর বল্লমের মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তাকে আর দেখা গেল না।
চারদিক থেকে তীর আর বর্শা ধেয়ে এল তার দিকে। তিনি যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন যতক্ষণ না বর্শার আঘাত তাকে থামিয়ে দেয়। শরীরে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, শত্রুদের বর্শা তাঁর রক্তে ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। যাইদ ইবন হারিসা আল্লাহর পথে শহীদ হলেন। বীরের মতো পতাকা তুলে নিলেন দ্বিতীয় আমীর জাফর ইবন আবি তালিব।
শত্রুরা এবার ঘিরে ধরলো জাফরকে। সাধারণত সৈনিকরা চেষ্টা করে প্রতিপক্ষের পতাকাবাহীকে আক্রমণ করতে। রোমান সৈনিকরা জাফরকে চারপাশ থেকে নিশ্ছিদ্রভাবে ঘেরাও করে ফেললো। জাফর এতটুকু ভয় পেলেন না। তিনি জানতেন কী হতে যাচ্ছে। ঘোড়ায় চড়ে থাকার কারণে তার যুদ্ধ করতে অসুবিধা হচ্ছিল তাই তিনি ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে নিজের ঘোড়াকে হত্যা করলেন যেন শত্রুরা সেই ঘোড়াকে কাজে লাগাতে না পারে। মুখে কবিতা পড়ছেন আর একের পর এক হামলা সামলে নিচ্ছেন অনায়াসে।
পতাকা ছিল তার ডান হাতে, শত্রুরা ডান হাত কেটে ফেললো। তিনি এবার বাম হাতে পতাকা নিলেন, শত্রুরা বাম হাতও কেটে ফেললো। দুই কাটা হাত দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে, সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই। সেই কাটা দুই হাত দিয়েই জাফর ইসলামের পতাকা বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছিল তার শরীর, শাহাদাত তাকেও হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। জাফর শহীদ হয়ে গেলেন। তাঁর রবের সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ হলো।
জাফরের শরীরের এখানে-সেখানে কম করে হলেও নব্বইটি জখমের চিহ্ন। সেই জখমগুলোর কোনোটিই তার শরীরের পেছনে না, সবগুলোই সামনে। তিনি পিছু হটার মানুষ ছিলেন না। একত্রিশ বছর বয়সী জাফর এই তো সেদিনই মাত্র আবিসিনিয়া থেকে মদীনায় ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূল তাকে নিজের কাছে আটকে রাখেননি। প্রিয় চাচাতো ভাইকে পাঠিয়ে দিয়েছেন এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে। জাফর আসলেন, আল্লাহর পথে যুদ্ধ করলেন আর শাহাদাহ বরণ করলেন।
যুদ্ধ তখনও চলছে। এবার নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন তৃতীয় আমীর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। পতাকা তুলে নিয়ে তিনি ঘোড়ায় চেপে বসলেন। কবিতার ভাষায় স্বগোতক্তি করলেন, 'হে আমার আত্মা! তুমি আজ আমার শরীর ছেড়ে চলে যাবে! যেতে তোমাকে হবেই, নয়তো জোর করে তোমাকে আমার শরীর ছাড়াবো!'
আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার এক ভাই তাকে এক টুকরো মাংস খেতে দিয়েছিল। খেলে শরীরটা একটু চাঙ্গা হবে। তিনি মাংসে কামড় দিলেন, কিন্তু খাওয়ার মাঝখানে যুদ্ধের কোলাহল শুনে যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন। নিজেই নিজেকে বলে উঠলেন, 'আরে, তুমি এখনো বেঁচে আছো!' এই বলে মাংসের টুকরোটা দূরে ছুঁড়ে মেরে ময়দানের দিকে ছুটে গেলেন। কিছুক্ষণ পরেই তার স্বপ্ন পূরণ হলো। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা হন্যে হয়ে শাহাদাতের সন্ধান করছিলেন। শাহাদাতও তাকে পরম মমতায় আলিঙ্গন করে নিলো। শত্রুরা তাকে হত্যা করলো। তিনি লাভ করলেন তার কাঙ্ক্ষিত সম্মান - শাহাদাহ!

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 খালিদ ইবন ওয়ালিদের ؓ নেতৃত্বগ্রহণ

📄 খালিদ ইবন ওয়ালিদের ؓ নেতৃত্বগ্রহণ


তিন আমীর একে একে শহীদ হয়ে গেলেন, কিন্তু মুসলিমরা ময়দানে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ততক্ষণে দিনের আলো নিভু নিভু। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার হাত থেকে পড়ে যাওয়া পতাকা হাতে তুলে নিলেন সাবিত ইবন আরকাম। পতাকা হাতে নিয়ে তিনি নিজেই নিজেকে আমীর ঘোষণা করেননি, বরং চাচ্ছিলেন একজন যোগ্য লোকের হাতে পতাকাটা তুলে দিতে। সাবিত ইবন আরকাম নিজেও একজন অভিজ্ঞ যোদ্ধা। তিনি বদরের যুদ্ধ করেছেন, সত্যি বলতে তিনি নিজেই আমীর হবার যোগ্য ছিলেন। কিন্তু তিনি এমন কারো হাতে দায়িত্ব দিতে চাইলেন যে মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে আনতে পারবে। পতাকা হাতে তুলে বললেন, 'ভাইয়েরা! আমাদের মধ্য থেকে একজন আমীর নির্বাচন করো।' সাহাবিরা বললেন, 'আপনিই এ দায়িত্ব পালন করুন।' সাবিত বললেন, 'না, আমি সেটা করবো না।'

সাহাবিরা এরপর খালিদ ইবন ওয়ালিদকে সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করলেন। খালিদ ইবন ওয়ালিদ, যার রণকৌশল নিয়ে নতুন করে কিছু বলাটাও বাহুল্য, তিনি এর আগে অসংখ্য যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সেরাদের সেরা এবার আমীর হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। আর এটাই ছিল মুসলিমদের পক্ষে লড়া তাঁর প্রথম যুদ্ধ। একজন নও-মুসলিম হিসেবে জিহাদে অংশ নিলেও তাঁর উৎসাহ ও উদ্দীপনার কমতি ছিল না। খাঁটি যোদ্ধার মতো লড়াই করলেন, লড়তে লড়তে নয়টা তলোয়ার ভেঙে গেল। একটা ইয়েমেনি তলোয়ার শুধু শেষমেশ রক্ষা পেল!

মু'তার ময়দানে কী হচ্ছে সেই খবর আল্লাহর রাসূলকে পৌঁছে দিচ্ছিলেন স্বয়ং জিবরীল। আর তাঁর কাছ থেকে শুনে সাহাবিদের কাছে সেই যুদ্ধের লাইভ বর্ণনা দিচ্ছিলেন আল্লাহর রাসূল। যাইদ, জাফর এবং আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার শাহাদতের খবর শুনে তিনি কাঁদতে থাকেন। কিন্তু যখনই জানতে পারলাম খালিদ ইবন ওয়ালিদের হাতে যুদ্ধের পতাকা, তখনই তিনি সবাইকে বিজয়ের সংবাদ দেন। বললেন, 'আল্লাহর তলোয়ারদের মধ্য থেকে একটি তলোয়ার সেই পতাকা তুলে নিল এবং আল্লাহ মুসলিমদের বিজয় দান করলেন।'

প্রথম তিনজন আমীরের শুহাদার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল বলেন, 'তারা এখন যেখানে আছে, সেখানেই বেশি সুখে আছে!' আর খালিদ ইবন ওয়ালিদকে সেইদিন আল্লাহর রাসূল একটা নতুন নাম দেন, সাইফুম মিন সুয়ফিল্লাহ -- আল্লাহর তলোয়ারদের মধ্যে একটি তলোয়ার! আল্লাহর রাসূল উপযুক্ত নামকরণই করেছিলেন। খালিদ ইবন ওয়ালিদ আর কোনো যুদ্ধে পরাজিত হননি।

রাত নেমে এল, যুদ্ধে বিরতি হলো। খালিদ ইবন ওয়ালিদ ভাবছেন কীভাবে মুসলিম বাহিনীকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা যায়। যদি তারা দ্রুত পিছু হটেন, তাহলে শত্রুরা তাদের ধাওয়া করে ধরে ফেলতে পারে। সামরিকবিদ্যায় খালিদ ছিলেন একজন মেধাবি সেনাপতি। তিনি এমন একটা কৌশল বের করলেন যাতে মুসলিমরা পশ্চাদপসরণ করবে ধীরে ধীরে কিন্তু শত্রুরা মুসলিমদের ধরতে পারবে না। তিনি সবাইকে বললেন সবাই যেন আরও খানিকক্ষণ ধৈর্য ধরে। রাতের অন্ধকারে তিনি ডান পাশের সৈনিকদলকে বাম পাশে, আর বাম পাশের সৈনিকদের ডান পাশে স্থানান্তর করলেন। সামনের সৈনিকদেরকে পাঠিয়ে দিলেন পেছনে, পতাকাগুলোর অবস্থানও বদলে দিলেন।

খালিদের এই কৌশল চমৎকারভাবে কাজ করলো। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রোমানরা মুসলিম বাহিনীর নতুন চেহারা দেখে ভাবলো নিশ্চয়ই মুসলিম বাহিনীতে অতিরিক্ত সৈন্য যোগ হয়েছে। তারা বলাবলি করতে লাগলো, মুসলিমরা যদি মাত্র তিন হাজার সৈন্য আগের দিন ময়দানে টিকে থাকতে পারে, তাহলে নতুন সৈন্য নিয়ে না জানি তারা কী করবে! এই ভয়ে রোমানরা বেশ মুষড়ে পড়লো এবং পিছিয়ে গেল। খালিদ ঠিক এটাই চাচ্ছিলেন। এই সুযোগে তিনি পুরো বাহিনী নিয়ে মদীনায় নিরাপদে ফিরে এলেন। পুরো মুসলিম বাহিনী ধ্বংস হতে পারতো, কিন্তু খালিদ ইবন ওয়ালিদের অসাধারণ কৌশলকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহ তাআলা সেই বাহিনীকে নিরাপদে মদীনায় ফিরিয়ে আনলেন। দুই লক্ষ সৈনিকের মোকাবেলায় এই যুদ্ধে মুসলিমদের মধ্যে মাত্র দশ জন শহীদ হন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুস‌লিম বাহিনীর প্রত্যাবর্তন

📄 মুস‌লিম বাহিনীর প্রত্যাবর্তন


মুসলিম বাহিনী যখন মদীনার কাছাকাছি, তাদের অভ্যর্থনা জানাতে আল্লাহর রাসূল ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে পড়লেন। আল্লাহর রাসূল বললেন, জাফর ইবন আবি তালিবের বাচ্চাকাচ্চাদের যেন তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জাফরের স্ত্রী আসমা বিনত উমাইস বাচ্চাদের গোসল করিয়ে, গায়ে তেল মেখে রাসূলুল্লাহর কাছে পাঠান। আল্লাহর রাসূল তাদের দেখে জড়িয়ে ধরেন, তাঁর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরতে থাকে। আসমা বুঝতে পারেন কিছু একটা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল তাকে বললেন, জাফর শহীদ হয়েছে। আসমা চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। রাসূলুল্লাহ তখন সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'এই দুনিয়া এবং আখিরাতে আমিই হবো জাফরের সন্তানদের ওয়ালি।' জাফরের সন্তানদের জন্য এটা ছিল একটা বিশেষ মর্যাদা।

যে তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী দুই লাখ সেনার বিপরীতে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে কৌশলগত কারণে মদীনায় ফিরে এল, সেই বাহিনীই যখন মদীনায় প্রবেশ করলো, মুসলিমরা তাদের দিকে মাটি ছুঁড়ে মারলো! 'ছি! তোমরা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে এসেছো!' আল্লাহর রাসূল তাদের ভুল শুধরে দিয়ে বললেন, 'না, তারা পালিয়ে আসেনি। তারা ফিরে এসেছে যেন তারা আবার যুদ্ধ করতে পারে, ইনশা আল্লাহ!'

এই যুদ্ধে নিজেদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনাটাই ছিল বিজয়। তাই যখন আল্লাহর রাসূল খবর পেয়েছিলেন খালিদের হাতে বাহিনীর নেতৃত্ব, তখন সবাইকে বলেছিলেন খালিদের হাতে বিজয় আসবে। এখানে লক্ষণীয় মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি, যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসাটা ছিল সাহাবিদের চোখে লজ্জাজনক পরাজয়। মু'তার যুদ্ধ পরাজয় ছিল না, কিন্তু তবু তারা প্রথমে মানতে পারছিলেন না কীভাবে মুসলিম বাহিনী ময়দান ছেড়ে আসে। আসলে সে যুগের মুসলিমরা অনেক ইতিবাচকভাবে জীবনটা দেখতেন, আর আমরা আমাদের পরাজিত অবস্থাকে মেনে নিয়ে জিহাদকেই পরিত্যাগ করে বসেছি।

স্বামীর শোকে শোকাহত আসমা অবশ্য খুব দ্রুতই নিজেকে সামলে নেন। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তিনি আবু বকর সিদ্দীকের কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পান এবং রাজি হন। তাদের বিয়ে হলো, ঘর আলো করে এল মুহাম্মাদ নামের এক পুত্র সন্তান। আবু বকর সিদ্দীকের মৃত্যুর পর আসমা বিনতে উমাইসকে বিয়ে করে নেন আলী ইবন আবু তালিব। মুহাম্মাদ ইবন আবু বকর আলী ইবন আবু তালিবের ঘরে বেড়ে ওঠেন। আগের ঘরের সন্তান হলেও আলী মুহাম্মাদকে খুবই ভালোবেসে বড় করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাদের এই ভালো সম্পর্ক বজায় ছিল।

প্রথম যুগের মুসলিম সমাজে কোনো মুসলিম বোনই একা বা অবিবাহিত থাকতেন না। বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেলে সহজেই তার বিয়ে হয়ে যেতো। বিধবা হলেও সমস্যা ছিল না, কেউ না কেউ তাকে বিয়ে করে নিতো। এমনকি বয়স হয়ে গেলেও তাদের বিয়ে হতে কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু আমাদের সমাজে বিষয়টা একেবারে উল্টো। প্রথমত, বহুবিবাহকে বেশিরভাগ মানুষ সহ্য করতে পারে না। এটাকে রীতিমতো অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। নিজের চাইতে বয়সে বড় এমন কাউকে বিয়ে করতে অনেক ভাই পছন্দ করেন না। তালাকপ্রাপ্ত হওয়াটা যেন কলঙ্ক, আর বিধবা হওয়াটা যেন দোষ। তাদেরও সাধারণত বিয়ের বাজারে পরিহার করা হয়।

বহুবিবাহকে উৎসাহিত ও গ্রহণযোগ্য করা না হলে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। একটি পরিবারের অংশ হওয়াটা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক জীবনের সাজসজ্জার অংশ হলো পারিবারিক জীবন। সাহাবিরা সে যুগে এটা নিশ্চিত করেছেন যেন কোনো বোন সংসারজীবন থেকে বঞ্চিত না হয়। তারা বয়স্কা, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা -- কাউকেই অবহেলা করতেন না।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 তিন আমীরের মর্যাদা

📄 তিন আমীরের মর্যাদা


যাইনাবের সাথে আল্লাহর রাসূলের বিয়ে আলোচনার আলোচনায় যাইদ ইবন হারিসাকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কীভাবে তিনি তার বাবা-মায়ের ঘর থেকে খাদিজার হাতে আসেন, আল্লাহর রাসূলের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বড় হন আর জিহাদের ময়দানে তার অবদান কী, ইত্যাদি। তবে যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি সেটা হচ্ছে তিনি হলেন একমাত্র সাহাবি যার নাম কুরআনে আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন।

'এরপর যাইদ যখন তার (যাইনাবের) সাথে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করলো তখন আমি তাকে আপনার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করলাম, যাতে মু'মিনদের পোষ্য পুত্ররা নিজ স্ত্রীর সাথে বিবাহ সূত্র ছিন্ন করলে সেই সব নারীকে বিয়ে করায় মু'মিনদের জন্য কোনো বিঘ্ন না হয়... ' (সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৭)

কুরআনে অন্য সাহাবিদের কথা বলা হয়েছে, সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে আয়াত নাযিল হয়েছে, কিন্তু একমাত্র যাইদ ছাড়া নাম ধরে কারো কথা উল্লেখ করা হয়নি। এই সম্মান আবু বকর, উমার, উসমান বা আলীও লাভ করেননি।

জাফর ইবন আবি তালিব ছিলেন রাসূলুল্লাহর চাচাতো ভাই। তিনি আলী ইবন আবি তালিবের আপন বড় ভাই। তিনি ছিলেন আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলিম দলের আমীর। দীর্ঘ দশ বছর পর সেখান থেকে তারা মদীনায় ফিরে আসেন। এই পুরো সময়টায় তিনিই ছিলেন মুসলিম মুহাজিরদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তিনি আবিসিনিয়া ও মদীনা দুই দেশে হিজরতের সাওয়াব লাভ করেছেন।

জাফরের মর্যাদা হলো তার দুই ডানা। মু'তার যুদ্ধে জাফর তার দুটো হাত হারিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর বীরত্বের খেতাবস্বরুপ দুটো হাতের পরিবর্তে তাকে দিয়েছিলেন দুটো ডানা। এ ডানা মেলে তিনি জান্নাতের যেখানে খুশি সেখানে ঘুরে বেড়াবেন! ইবন উমার বলতেন, 'শান্তি বর্ষিত হোক তোমার উপর, হে দুই ডানাওয়ালা!'

আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ছিলেন আকাবার শপথে একজন নাকীব। বারো জনের একজন যারা তাদের গোত্রের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি শুধু মুজাহিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন কবি বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে, সেই যুগের মিডিয়াকর্মী। ইসলামের সমর্থনে এবং রাসূলুল্লাহর প্রশংসায় তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন।

একটি হাদীস থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার চোখে এই তিন আমীরের মর্যাদা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আবু উমামা আল বাহিলী বর্ণনা করেন,

'আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন,

একদিন আমি ঘুমাচ্ছিলাম। স্বপ্নে দেখি, দুজন লোক আমার কাছে আসলো আর আমার হাত দুটো শক্ত করে ধরলো। এরপর আমাকে একটি অসমতল পাহাড়ের কাছে নিয়ে বললো, এটায় চড়ুন! আমি বললাম, আমি এখানে চড়তে পারবো না। তারা বললো, আমরা আপনার জন্যে সহজ করে দেবো। আমি পাহাড়ে চড়লাম। পাহাড়ের মাঝামাঝি পৌঁছে বিকট চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলাম, বললাম, এগুলো কীসের চিৎকার? দুই ফেরেশতা বললো, এগুলো হচ্ছে জাহান্নামীদের আর্তনাদ। এরপর তারা আমাকে নিয়ে আরও এগিয়ে গেল, দেখলাম, একটি দলকে তাদের গ্রীবা ধমনী দ্বারা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, তাদের ক্ষতবিক্ষত চোয়াল দিয়ে রক্ত ঝরছে। বললাম, এরা কারা? তারা বললো, এরা তারা যারা সাওম ভঙ্গ করতো। তারপর তারা আমাকে আরও সামনে নিয়ে গেল। দেখলাম, একদল লোকের মৃত দেহ ফুলে গিয়ে ভীষণ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, সে দুর্গন্ধ বিষ্ঠার দুর্গন্ধের মতোই অস্বস্তিকর। জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা বললো, এরা তারা যারা কাফিরদের মধ্যে নিহত হয়েছে। তারপর তারা আমাকে আরও সামনে নিয়ে গেল। সেখানেও কিছু লোককে দেখলাম যাদের দেহ ফুলে গিয়ে বিষ্ঠার মতো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। জানতে চাইলাম, এরা কারা? ফেরেশতারা উত্তর দিলো, এরা ছিল ব্যভিচারী পুরুষ ও নারী।

আমাকে আরও সামনে নিয়ে গেল তারা। দেখলাম, কিছু মহিলার স্তনে সাপ দংশন করছে। জিজ্ঞেস করলাম, এদের অবস্থা এমন কেন? ফেরেশতারা উত্তর দিলো, এরা তাদের ছেলেমেয়েদের তাদের দুধ পান করতে দেয়নি। তারপর তারা আমাকে আরও সামনে নিয়ে চললো। দেখলাম, কিছু বালক যারা দুটো সাগরের মধ্যে খেলাধুলা করছে। বললাম, এরা কারা? ফেরেশতারা বললো, এরা মু'মিনদের নাবালক অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী সন্তান। এরপর তারা আমাকে নিয়ে গেল একটি উঁচু জায়গায়, সেখানে তিনজনের একটি দলকে দেখলাম যারা জান্নাতী সুরা পান করছে। জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা জবাব দিলো, এরা হচ্ছেন জাফর ইবন আবু তালিব, যাইদ ইবন হারিসা এবং আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। তারপর তারা আমাকে অন্য একটি উঁচু জায়গায় নিয়ে গেল, সেখানেও দেখলাম তিনজনের একটি দল। জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা?' তারা বলেন, এরা হচ্ছেন ইবরাহীম, মুসা এবং ঈসা; তারা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।'

টিকাঃ
১০২. ইবন হিব্বান, হাদীস ৭৪৯১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px