📄 যুদ্ধের ময়দানে
সেনাবাহিনী আশ-শামে পৌঁছালো, বর্তমান সময়ের জর্ডানে। মাআনের গভর্নরকে হত্যাস্থলে তারা ঘাঁটি গাড়লেন। সেখানে গিয়ে আবিষ্কার করলেন শত্রুপক্ষের এক বিশাল বাহিনী, দুই লক্ষ! আরবের লাখাম, জুদাম, বাহরা আর বালী গোত্র থেকে এসেছে পুরো এক লক্ষ সৈন্য আর হিরাক্লিয়াসের পক্ষ থেকে এসেছে আরও এক লক্ষ রোমান খ্রিস্টান সৈন্য। রোমান সৈনিকরা কিন্তু বেদুইনদের মতো নয়, তারা ছিল পেশাদার, প্রশিক্ষিত এবং অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত।
মুসলিমরা আশা করেনি শত্রুপক্ষের সৈনিক সংখ্যা এত বেশি হবে! মুসলিমরা ছিলেন মাত্র তিন হাজার। আর শত্রুসংখ্যা দুই লাখ, তুলনারও বাইরে! এক মুসলিম সৈনিকের বিপরীতে ৬৬ জন কাফির সৈনিক! এর আগে মুসলিমরা সর্বোচ্চ দশ হাজার সৈন্যের সেনাদলকে সামাল দিয়েছে। কিন্তু দুই লাখ সৈন্যের দলের মুখোমুখি হতে হবে এমনটা হয়তো তারা চিন্তাও করেননি।
তারা দু'দিন ধরে শূরা করলেন কী করা যায়। যা আছে তা দিয়ে লড়বেন নাকি রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে পরবর্তী নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করবেন। কেউ কেউ বললো, 'এক কাজ করি। রাসূলুল্লাহর কাছে একজন দূত পাঠাই। তাঁকে জিজ্ঞেস করি কী করা উচিত এবং অপেক্ষা করি। তিনি যদি চান অতিরিক্ত সৈন্য পাঠাবেন এবং তিনি চাইলে তখন আমরা যুদ্ধ করবো।' কেউ কেউ বললো, 'আমরা বরং চলে যাই, নিরাপত্তাই সবার আগে।'
দুই লক্ষ সৈনিকের খবর পেয়ে অনেকেই মুষড়ে পড়েছিলেন। উঠে দাঁড়ালেন আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। পর্বতসম ঈমান বুকে নিয়ে বলে উঠলেন, 'ভাইয়েরা! তোমরা সেই জিনিসকেই অপছন্দ করছো যেটার সন্ধানে তোমরা বেরিয়ে এসেছো। সেটা কী? শাহাদাহ! আমরা আমাদের সংখ্যা বা শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করছি না। আমাদের শক্তি হলো আমাদের দ্বীন! এগিয়ে চলো ভাইয়েরা, এগিয়ে চলো! আমাদের জন্য দুটো ভালো পরিণতিই অপেক্ষা করছে — হয় শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়, নয়তো শাহাদাহ!'
আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা খুব ভালো কবিতা লিখতেন। সেই কবির আবেগমাখা শব্দের ঝঙ্কারে সাহাবিরা যেন প্রাণ ফিরে পেলেন! বহুক্ষণ ধরে শুকনো তীরে পড়ে থাকা ম্রিয়মান মাছেরা হঠাৎ বৃষ্টির তোড়ে নদীর পানিতে গিয়ে পড়লে যেমন প্রাণ পেয়ে লাফিয়ে ওঠে, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার কথাগুলো ঠিক সেই বৃষ্টির পানির মতন সাহাবিদের হৃদয়ে প্রাণের সঞ্চার করলো। তারা প্রত্যেকে জিহাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠলেন! ক্লান্তি আর শঙ্কা নিমিষে দূর হয়ে গেল, ভর করলো সাহস আর অনুপ্রেরণা। আবার সবার মাঝে জিহাদের হারিয়ে যাওয়া মেজাজ ফিরে এল। মাত্র তিন হাজার সৈন্যের দল নিয়ে দুই লক্ষ বাহিনীর বিশাল শত্রুসেনার সাথে লড়াই করার মতো প্রায় অসাধ্য কাজটি সাধনের ব্যাপারে সাহাবিরা দৃঢ়চিত্ত হলেন।
মুসলিমরা দাঁড়িয়ে আছে মু'তার ময়দানে। আবু হুরায়রা তখন সবে মুসলিম হয়েছেন। সেই যুদ্ধে তিনি মুসলিম বাহিনীর একজন সৈনিক। ময়দানে দাঁড়িয়ে আবু হুরায়রা অবাক হয়ে দেখছিলেন দুই লক্ষ সৈন্যের শত্রুবাহিনীকে। তার চোখেমুখে বিস্ময় — এমন কিছু তার চোখের সামনে ঘটতে যাচ্ছে যা তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিন হাজার সৈন্য নিয়ে দুই লক্ষ সৈন্যের মুখোমুখি হওয়া মানে নিশ্চিত পরাজয়। মৃত্যু সেখানে অনিবার্য! সম্ভবত কোনো দেশ বা গোত্রের ঐতিহ্যে এমন নজির নেই। তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না এত বড় একটা বাহিনীর সাথে তারা লড়তে যাচ্ছেন! অস্ত্রের ঝনঝনানি, শক্তির প্রদর্শনী, সোনা-রূপার ঝলকানি দেখে আবু হুরায়রার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল!
বিষয়টা একজন প্রবীণ সাহাবির নজরে এল। সাবিত ইবন আরকাম আবু হুরায়রাকে জিজ্ঞেস করলেন, - মনে হচ্ছে, তুমি খুব বিশাল একটা বাহিনী দেখছ!
- হ্যাঁ, অবশ্যই! দেখুন না, আমরা কাদের সাথে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি!
- শোনো, বদরের যুদ্ধে তুমি আমাদের সাথে ছিলে না। সেদিন আমাদের বিজয় সংখ্যার জোরে আসেনি, কথাটা মনে রেখো।
সাবিত ইবন আরকাম অভিজ্ঞ এক সাহাবি। আর আবু হুরায়রা মাত্র কিছুদিন আগে জাহিলিয়াহ ছেড়ে ইসলামে এসেছেন। সাবিত তার অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে আবু হুরায়রাকে শিক্ষা দিচ্ছিলেন, জাহিলিয়াতের নিয়ম-কানুন ভুলে যাও। তুমি এখন মুসলিম। এটা এক নতুন পৃথিবী। আমরা দুনিয়াকে ভিন্ন চোখে দেখি। এখানে সংখ্যার উপর যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে না। বদরে তারা জয়ী হয়েছেন তাদের ঈমানের জোরে। আল্লাহ তাদের বিজয়ী করেছেন। জাহিলিয়াতের মানদণ্ডে সংখ্যা আর শক্তিমত্তাই সব। কিন্তু ঈমানের মানদণ্ডে সংখ্যাই শেষ কথা নয়, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সাহায্যই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারক।
📄 যুদ্ধ শুরু হলো
যাইদ ইবন হারিসা ছিলেন এই যুদ্ধের প্রথম আমীর। তাঁর হাতে মুসলিম বাহিনীর পতাকা পতপত করে উড়ছে। সবাই দেখলো, বীরের মতো যাইদ ইবন হারিসা সামনের দিকে ছুটে গেলেন। সেই চেহারায় কোনো ভয় নেই, কোনো শঙ্কা নেই। শত্রুপক্ষের ব্যুহ ভেদ করে তাদের বাহিনীতে ঢুকে পড়লেন অকুতোভয় এক যুবক। যুদ্ধ করতে করতে এক সময় শত্রুদের বর্শা আর বল্লমের মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তাকে আর দেখা গেল না।
চারদিক থেকে তীর আর বর্শা ধেয়ে এল তার দিকে। তিনি যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন যতক্ষণ না বর্শার আঘাত তাকে থামিয়ে দেয়। শরীরে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, শত্রুদের বর্শা তাঁর রক্তে ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। যাইদ ইবন হারিসা আল্লাহর পথে শহীদ হলেন। বীরের মতো পতাকা তুলে নিলেন দ্বিতীয় আমীর জাফর ইবন আবি তালিব।
শত্রুরা এবার ঘিরে ধরলো জাফরকে। সাধারণত সৈনিকরা চেষ্টা করে প্রতিপক্ষের পতাকাবাহীকে আক্রমণ করতে। রোমান সৈনিকরা জাফরকে চারপাশ থেকে নিশ্ছিদ্রভাবে ঘেরাও করে ফেললো। জাফর এতটুকু ভয় পেলেন না। তিনি জানতেন কী হতে যাচ্ছে। ঘোড়ায় চড়ে থাকার কারণে তার যুদ্ধ করতে অসুবিধা হচ্ছিল তাই তিনি ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে নিজের ঘোড়াকে হত্যা করলেন যেন শত্রুরা সেই ঘোড়াকে কাজে লাগাতে না পারে। মুখে কবিতা পড়ছেন আর একের পর এক হামলা সামলে নিচ্ছেন অনায়াসে।
পতাকা ছিল তার ডান হাতে, শত্রুরা ডান হাত কেটে ফেললো। তিনি এবার বাম হাতে পতাকা নিলেন, শত্রুরা বাম হাতও কেটে ফেললো। দুই কাটা হাত দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে, সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই। সেই কাটা দুই হাত দিয়েই জাফর ইসলামের পতাকা বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছিল তার শরীর, শাহাদাত তাকেও হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। জাফর শহীদ হয়ে গেলেন। তাঁর রবের সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ হলো।
জাফরের শরীরের এখানে-সেখানে কম করে হলেও নব্বইটি জখমের চিহ্ন। সেই জখমগুলোর কোনোটিই তার শরীরের পেছনে না, সবগুলোই সামনে। তিনি পিছু হটার মানুষ ছিলেন না। একত্রিশ বছর বয়সী জাফর এই তো সেদিনই মাত্র আবিসিনিয়া থেকে মদীনায় ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূল তাকে নিজের কাছে আটকে রাখেননি। প্রিয় চাচাতো ভাইকে পাঠিয়ে দিয়েছেন এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে। জাফর আসলেন, আল্লাহর পথে যুদ্ধ করলেন আর শাহাদাহ বরণ করলেন।
যুদ্ধ তখনও চলছে। এবার নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন তৃতীয় আমীর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। পতাকা তুলে নিয়ে তিনি ঘোড়ায় চেপে বসলেন। কবিতার ভাষায় স্বগোতক্তি করলেন, 'হে আমার আত্মা! তুমি আজ আমার শরীর ছেড়ে চলে যাবে! যেতে তোমাকে হবেই, নয়তো জোর করে তোমাকে আমার শরীর ছাড়াবো!'
আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার এক ভাই তাকে এক টুকরো মাংস খেতে দিয়েছিল। খেলে শরীরটা একটু চাঙ্গা হবে। তিনি মাংসে কামড় দিলেন, কিন্তু খাওয়ার মাঝখানে যুদ্ধের কোলাহল শুনে যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন। নিজেই নিজেকে বলে উঠলেন, 'আরে, তুমি এখনো বেঁচে আছো!' এই বলে মাংসের টুকরোটা দূরে ছুঁড়ে মেরে ময়দানের দিকে ছুটে গেলেন। কিছুক্ষণ পরেই তার স্বপ্ন পূরণ হলো। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা হন্যে হয়ে শাহাদাতের সন্ধান করছিলেন। শাহাদাতও তাকে পরম মমতায় আলিঙ্গন করে নিলো। শত্রুরা তাকে হত্যা করলো। তিনি লাভ করলেন তার কাঙ্ক্ষিত সম্মান - শাহাদাহ!
📄 খালিদ ইবন ওয়ালিদের ؓ নেতৃত্বগ্রহণ
তিন আমীর একে একে শহীদ হয়ে গেলেন, কিন্তু মুসলিমরা ময়দানে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ততক্ষণে দিনের আলো নিভু নিভু। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার হাত থেকে পড়ে যাওয়া পতাকা হাতে তুলে নিলেন সাবিত ইবন আরকাম। পতাকা হাতে নিয়ে তিনি নিজেই নিজেকে আমীর ঘোষণা করেননি, বরং চাচ্ছিলেন একজন যোগ্য লোকের হাতে পতাকাটা তুলে দিতে। সাবিত ইবন আরকাম নিজেও একজন অভিজ্ঞ যোদ্ধা। তিনি বদরের যুদ্ধ করেছেন, সত্যি বলতে তিনি নিজেই আমীর হবার যোগ্য ছিলেন। কিন্তু তিনি এমন কারো হাতে দায়িত্ব দিতে চাইলেন যে মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে আনতে পারবে। পতাকা হাতে তুলে বললেন, 'ভাইয়েরা! আমাদের মধ্য থেকে একজন আমীর নির্বাচন করো।' সাহাবিরা বললেন, 'আপনিই এ দায়িত্ব পালন করুন।' সাবিত বললেন, 'না, আমি সেটা করবো না।'
সাহাবিরা এরপর খালিদ ইবন ওয়ালিদকে সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করলেন। খালিদ ইবন ওয়ালিদ, যার রণকৌশল নিয়ে নতুন করে কিছু বলাটাও বাহুল্য, তিনি এর আগে অসংখ্য যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সেরাদের সেরা এবার আমীর হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। আর এটাই ছিল মুসলিমদের পক্ষে লড়া তাঁর প্রথম যুদ্ধ। একজন নও-মুসলিম হিসেবে জিহাদে অংশ নিলেও তাঁর উৎসাহ ও উদ্দীপনার কমতি ছিল না। খাঁটি যোদ্ধার মতো লড়াই করলেন, লড়তে লড়তে নয়টা তলোয়ার ভেঙে গেল। একটা ইয়েমেনি তলোয়ার শুধু শেষমেশ রক্ষা পেল!
মু'তার ময়দানে কী হচ্ছে সেই খবর আল্লাহর রাসূলকে পৌঁছে দিচ্ছিলেন স্বয়ং জিবরীল। আর তাঁর কাছ থেকে শুনে সাহাবিদের কাছে সেই যুদ্ধের লাইভ বর্ণনা দিচ্ছিলেন আল্লাহর রাসূল। যাইদ, জাফর এবং আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার শাহাদতের খবর শুনে তিনি কাঁদতে থাকেন। কিন্তু যখনই জানতে পারলাম খালিদ ইবন ওয়ালিদের হাতে যুদ্ধের পতাকা, তখনই তিনি সবাইকে বিজয়ের সংবাদ দেন। বললেন, 'আল্লাহর তলোয়ারদের মধ্য থেকে একটি তলোয়ার সেই পতাকা তুলে নিল এবং আল্লাহ মুসলিমদের বিজয় দান করলেন।'
প্রথম তিনজন আমীরের শুহাদার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল বলেন, 'তারা এখন যেখানে আছে, সেখানেই বেশি সুখে আছে!' আর খালিদ ইবন ওয়ালিদকে সেইদিন আল্লাহর রাসূল একটা নতুন নাম দেন, সাইফুম মিন সুয়ফিল্লাহ -- আল্লাহর তলোয়ারদের মধ্যে একটি তলোয়ার! আল্লাহর রাসূল উপযুক্ত নামকরণই করেছিলেন। খালিদ ইবন ওয়ালিদ আর কোনো যুদ্ধে পরাজিত হননি।
রাত নেমে এল, যুদ্ধে বিরতি হলো। খালিদ ইবন ওয়ালিদ ভাবছেন কীভাবে মুসলিম বাহিনীকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা যায়। যদি তারা দ্রুত পিছু হটেন, তাহলে শত্রুরা তাদের ধাওয়া করে ধরে ফেলতে পারে। সামরিকবিদ্যায় খালিদ ছিলেন একজন মেধাবি সেনাপতি। তিনি এমন একটা কৌশল বের করলেন যাতে মুসলিমরা পশ্চাদপসরণ করবে ধীরে ধীরে কিন্তু শত্রুরা মুসলিমদের ধরতে পারবে না। তিনি সবাইকে বললেন সবাই যেন আরও খানিকক্ষণ ধৈর্য ধরে। রাতের অন্ধকারে তিনি ডান পাশের সৈনিকদলকে বাম পাশে, আর বাম পাশের সৈনিকদের ডান পাশে স্থানান্তর করলেন। সামনের সৈনিকদেরকে পাঠিয়ে দিলেন পেছনে, পতাকাগুলোর অবস্থানও বদলে দিলেন।
খালিদের এই কৌশল চমৎকারভাবে কাজ করলো। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রোমানরা মুসলিম বাহিনীর নতুন চেহারা দেখে ভাবলো নিশ্চয়ই মুসলিম বাহিনীতে অতিরিক্ত সৈন্য যোগ হয়েছে। তারা বলাবলি করতে লাগলো, মুসলিমরা যদি মাত্র তিন হাজার সৈন্য আগের দিন ময়দানে টিকে থাকতে পারে, তাহলে নতুন সৈন্য নিয়ে না জানি তারা কী করবে! এই ভয়ে রোমানরা বেশ মুষড়ে পড়লো এবং পিছিয়ে গেল। খালিদ ঠিক এটাই চাচ্ছিলেন। এই সুযোগে তিনি পুরো বাহিনী নিয়ে মদীনায় নিরাপদে ফিরে এলেন। পুরো মুসলিম বাহিনী ধ্বংস হতে পারতো, কিন্তু খালিদ ইবন ওয়ালিদের অসাধারণ কৌশলকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহ তাআলা সেই বাহিনীকে নিরাপদে মদীনায় ফিরিয়ে আনলেন। দুই লক্ষ সৈনিকের মোকাবেলায় এই যুদ্ধে মুসলিমদের মধ্যে মাত্র দশ জন শহীদ হন।
📄 মুসলিম বাহিনীর প্রত্যাবর্তন
মুসলিম বাহিনী যখন মদীনার কাছাকাছি, তাদের অভ্যর্থনা জানাতে আল্লাহর রাসূল ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে পড়লেন। আল্লাহর রাসূল বললেন, জাফর ইবন আবি তালিবের বাচ্চাকাচ্চাদের যেন তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জাফরের স্ত্রী আসমা বিনত উমাইস বাচ্চাদের গোসল করিয়ে, গায়ে তেল মেখে রাসূলুল্লাহর কাছে পাঠান। আল্লাহর রাসূল তাদের দেখে জড়িয়ে ধরেন, তাঁর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরতে থাকে। আসমা বুঝতে পারেন কিছু একটা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল তাকে বললেন, জাফর শহীদ হয়েছে। আসমা চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। রাসূলুল্লাহ তখন সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'এই দুনিয়া এবং আখিরাতে আমিই হবো জাফরের সন্তানদের ওয়ালি।' জাফরের সন্তানদের জন্য এটা ছিল একটা বিশেষ মর্যাদা।
যে তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী দুই লাখ সেনার বিপরীতে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে কৌশলগত কারণে মদীনায় ফিরে এল, সেই বাহিনীই যখন মদীনায় প্রবেশ করলো, মুসলিমরা তাদের দিকে মাটি ছুঁড়ে মারলো! 'ছি! তোমরা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে এসেছো!' আল্লাহর রাসূল তাদের ভুল শুধরে দিয়ে বললেন, 'না, তারা পালিয়ে আসেনি। তারা ফিরে এসেছে যেন তারা আবার যুদ্ধ করতে পারে, ইনশা আল্লাহ!'
এই যুদ্ধে নিজেদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনাটাই ছিল বিজয়। তাই যখন আল্লাহর রাসূল খবর পেয়েছিলেন খালিদের হাতে বাহিনীর নেতৃত্ব, তখন সবাইকে বলেছিলেন খালিদের হাতে বিজয় আসবে। এখানে লক্ষণীয় মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি, যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসাটা ছিল সাহাবিদের চোখে লজ্জাজনক পরাজয়। মু'তার যুদ্ধ পরাজয় ছিল না, কিন্তু তবু তারা প্রথমে মানতে পারছিলেন না কীভাবে মুসলিম বাহিনী ময়দান ছেড়ে আসে। আসলে সে যুগের মুসলিমরা অনেক ইতিবাচকভাবে জীবনটা দেখতেন, আর আমরা আমাদের পরাজিত অবস্থাকে মেনে নিয়ে জিহাদকেই পরিত্যাগ করে বসেছি।
স্বামীর শোকে শোকাহত আসমা অবশ্য খুব দ্রুতই নিজেকে সামলে নেন। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তিনি আবু বকর সিদ্দীকের কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পান এবং রাজি হন। তাদের বিয়ে হলো, ঘর আলো করে এল মুহাম্মাদ নামের এক পুত্র সন্তান। আবু বকর সিদ্দীকের মৃত্যুর পর আসমা বিনতে উমাইসকে বিয়ে করে নেন আলী ইবন আবু তালিব। মুহাম্মাদ ইবন আবু বকর আলী ইবন আবু তালিবের ঘরে বেড়ে ওঠেন। আগের ঘরের সন্তান হলেও আলী মুহাম্মাদকে খুবই ভালোবেসে বড় করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাদের এই ভালো সম্পর্ক বজায় ছিল।
প্রথম যুগের মুসলিম সমাজে কোনো মুসলিম বোনই একা বা অবিবাহিত থাকতেন না। বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেলে সহজেই তার বিয়ে হয়ে যেতো। বিধবা হলেও সমস্যা ছিল না, কেউ না কেউ তাকে বিয়ে করে নিতো। এমনকি বয়স হয়ে গেলেও তাদের বিয়ে হতে কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু আমাদের সমাজে বিষয়টা একেবারে উল্টো। প্রথমত, বহুবিবাহকে বেশিরভাগ মানুষ সহ্য করতে পারে না। এটাকে রীতিমতো অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। নিজের চাইতে বয়সে বড় এমন কাউকে বিয়ে করতে অনেক ভাই পছন্দ করেন না। তালাকপ্রাপ্ত হওয়াটা যেন কলঙ্ক, আর বিধবা হওয়াটা যেন দোষ। তাদেরও সাধারণত বিয়ের বাজারে পরিহার করা হয়।
বহুবিবাহকে উৎসাহিত ও গ্রহণযোগ্য করা না হলে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। একটি পরিবারের অংশ হওয়াটা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক জীবনের সাজসজ্জার অংশ হলো পারিবারিক জীবন। সাহাবিরা সে যুগে এটা নিশ্চিত করেছেন যেন কোনো বোন সংসারজীবন থেকে বঞ্চিত না হয়। তারা বয়স্কা, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা -- কাউকেই অবহেলা করতেন না।