📄 আমর ইবন আল আসের ؓ ইসলাম গ্রহণ
'আমি বদরের যুদ্ধে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম এবং আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছিলেন। উহুদের যুদ্ধে আমি আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম এবং আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছিলেন। আমি খন্দকের যুদ্ধেও আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম এবং আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছিলেন।'
কথাগুলো আমর ইবন আল-আস বলেছিলেন মুসলিম হওয়ার পর। এই কথাগুলো বলে আমর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন এই ভেবে যে, আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তিনি কত বড় ভুলই না করেছিলেন কিন্তু আল্লাহ তবু তাকে সুযোগ দিয়েছেন। যদি আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তিনি মারা যেতেন তাহলে তার স্থান হতো নিশ্চিতভাবে জাহান্নামে, কিন্তু আজ তিনি ইসলামের ছায়ায় এসে নিরাপদ হয়েছেন।
আমর ছিলেন একজন কুশলী রাজনীতিক। তিনি বুঝতে পারছিলেন কুরাইশদের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। বিস্তীর্ণ পৃথিবী কুরাইশদের জন্য দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। যে ইসলামের বিরুদ্ধে জান বাজি রেখে এতদিন যুদ্ধ করে এসেছেন, আজ সে মুসলিমরাই কুরাইশদের দরজায় কড়া নাড়ছে। হতাশা আর গ্লানি বোধ আমরকে চেপে ধরে। ইসলামের বিজয় তার সহ্য হচ্ছিল না, তিনি সিদ্ধান্ত নেন সবকিছু ছেড়েছুড়ে আবিসিনিয়ায় চলে যাবেন। সত্যকে গ্রহণ করার মনোবল তার ছিল না। সত্য থেকে পালিয়ে বেড়ানোর জন্য অন্য কোথাও চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না。
'আমি মনে করি না মক্কায় থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বরং আমাদের উচিত আবিসিনিয়ায় নাজ্জাশীর কাছে চলে যাওয়া এবং সেখানেই থাকা। যদি মুহাম্মাদ বিজয়ী হয়, তাহলে আমরা নাজ্জাশীর অধীনেই থাকবো। মুহাম্মাদের রাজত্বে থাকার চাইতে নাজ্জাশীর রাজত্বে থাকা ঢের ভালো। আর যদি আমাদের লোকেরা জয়ী হয়, তাহলে তারা আমাদের প্রতি সদয় হবে বলে আমার বিশ্বাস। তারা তো আমাদের মান-মর্যাদা সম্পর্কে জানেই।'
আমর আবিসিনিয়ায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। নাজ্জাশীর সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। আমর আবিসিনিয়ার পথে তার লোকবল নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন, সাথে উপহার হিসেবে নিয়ে গেলেন একগাদা চামড়া। আবিসিনিয়ায় আরবের চামড়ার খুব কদর ছিল।
নাজ্জাশীর দরবারে গিয়ে আমরের মাথা খারাপ হয়ে গেল। তিনি দেখলেন নাজ্জাশীর দরবার থেকে বের হয়ে আসছেন আল্লাহর রাসূলের সাহাবি আমর ইবন উমাইয়্যা আদ-দামরী। রাসূলুল্লাহ তাকে বিশেষ কাজে আবিসিনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। বন্ধুদের পেছনে রেখে আমর একাই দরবারে ঢুকে পড়লেন। মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানালেন, তাকে সাদরে বরণ করা হলো। আন-নাজ্জাশী তাঁকে বললেন, 'স্বাগতম বন্ধু! তোমার দেশ থেকে আমার জন্য কী এনেছো?' আমর বললেন, 'আপনার জন্য কিছু চামড়া নিয়ে এসেছি।'
আমর নাজ্জাশীকে এরপর বললেন, 'হে সম্রাট! আমি একটা লোককে আপনার প্রাসাদ থেকে বের হয়ে যেতে দেখেছি। এই লোক হলো আমাদের শত্রুর বার্তাবাহক। এরা আমাদের অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। আপনি কি তাকে আমাদের হাতে তুলে দেবেন যেন আমরা তাকে হত্যা করতে পারি?' এই কথা শুনে আন-নাজ্জাশী প্রচণ্ড রেগে গেলেন। রেগে গিয়ে আমরের মুখে আঘাত করে বসলেন। বললেন,
'তুমি আমাকে সেই মানুষটির বার্তাবাহককে তোমার হাতে তুলে দিতে বলছো যার কাছে খোদ আন-নামূস আল-আকবর (জিবরীল) আসা-যাওয়া করেন? এই একই নামুস আল-আকবর আসতেন নবী মূসার কাছে! তুমি চাও তাঁর বার্তাবাহককে আমি তোমার কাছে তুলে দিই? তোমার জন্য দুর্ভোগ! এই আমি তোমাকে বলছি, আমার কথা শোনো আমর! তুমি এই মানুষটিকে মেনে নাও। যারা তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করবে, তাদের সবার বিরুদ্ধে তিনি জয়ী হবেন। যেভাবে মূসা বিজয়ী হয়েছিলেন ফিরআউন আর তার সেনাবিহিনির বিরুদ্ধে।'
লজ্জায়-অপমানে আমরের সেদিন মরে যেতে ইচ্ছে হলো। আর একই সাথে তার হৃদয়ে একটা বড় ধরনের পরিবর্তনও এল। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি অনুভব করলেন তিনি আসলে এতদিন ধরে একটা মিথ্যাকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে আছেন। বুঝতে পারলেন ইসলামই হলো সত্য দ্বীন। এই দ্বীন থেকে এভাবে পালিয়ে বেড়ানোর কোনো মানে হয় না। তৎক্ষণাৎ আমর সিদ্ধান্ত নিলেন মুসলিম হয়ে যাবেন। নাজ্জাশীকে বললেন, 'আপনি কি আল্লাহর রাসূলের হয়ে আমার কাছ থেকে ইসলামের বাইয়াত নেবেন?' নাজ্জাশী হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমর আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। জীবনে অনেক ভুল করেছেন। আর দেরি নয়। সঙ্গে সঙ্গে আমর কালিমা পড়ে মুসলিম হয়ে গেলেন।
পুরো ঘটনাটি ঘটেছিল গোপনে, আমর তার লোকদের কাছে তখনকার জন্য পুরো ব্যাপারটিই বেমালুম চেপে গেলেন।
বেশ কিছুদিন সেখানে থাকার পর একদিন তিনি আরবের দিকে রওনা হলেন। এবারের উদ্দেশ্য মক্কা নয়, মদীনা। পথিমধ্যে তার সাথে দেখা হলো আরও দু'জনের - খালিদ ইবন ওয়ালিদ এবং উসমান ইবন তালহা। তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় যাচ্ছ তোমরা?' খালিদ ইবন ওয়ালিদ উত্তর দিলেন, 'লে সত্য পথ আজ আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। ঐ মানুষটি আসলেই আল্লাহর একজন রাসূল। আমি তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করতে যাচ্ছি।' আমর বললেন, 'সেই একই কারণে আমিও আজ ইসলাম গ্রহণ করতে যাচ্ছি।'
তাঁরা মদীনার দিকে রওনা হলেন। তাদের আগমনের কথা রাসূলুল্লাহ আগেই টের পেয়েছিলেন। বিশাল মনের সেই মানুষটি হাসিমুখে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এই লোকগুলো কিছুদিন আগেও ছিল তাঁর শত্রু, তাঁকে তারা দেশ বের করে দিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু যখনই তারা ইসলাম গ্রহণ করতে এলেন, আল্লাহর রাসূল অতীতের সমস্ত কিছুকে ভুলে গিয়ে সাদরে তাদেরকে গ্রহণ করে নিলেন। কারণ এই বিরোধ কোনো ব্যক্তিগত রেষারেষি বা ক্ষোভের কারণে ছিল না। বরং এই বিরোধিতা ছিল আদর্শিক বিরোধিতা। তাই যখনই তারা মুসলিম হয়ে গেলেন, আল্লাহর রাসূল এই ভেবে খুশি হলেন যে, যারা এতদিন তাগুতের সৈনিক ছিল এখন থেকে সেই দুজনই হবে আল্লাহর সৈনিক।
প্রথমে মুসলিম হলেন খালিদ ইবন ওয়ালিদ। এরপরে এলেন আমর। তার ভাষায়,
'আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করালেন, আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে গিয়ে বললাম, আপনার হাত বাড়িয়ে দিন, আমি আপনার হাতে আনুগত্যের শপথ করতে চাই। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন, কিন্তু আমি বাড়ালাম না। তিনি জানতে চাইলেন, কী হয়েছে আমর? আমি বললাম, আমি এক শর্তে বাইয়াত করতে চাই। তিনি জানতে চাইলেন, কী শর্তে? আমি বললাম, আমার আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করুন এই শর্তে যে, আল্লাহ আমার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি তখন বললেন, আমর! তুমি কি জানো না, ইসলাম আগের সমস্ত গুনাহ মুছে দেয়, হিজরত আগের সমস্ত গুনাহ মুছে দেয় এবং হজ্জ আগের সমস্ত গুনাহকে মুছে দেয়?'
এভাবে আমর মুসলিম হয়ে গেলেন। আল্লাহর রাসূল আমর ইবন আল আসকে অনেক কদর করতেন। তার প্রতি অনেক খেয়াল রাখতেন, অন্য অনেকের চাইতে তাকে বেশি প্রাধান্য দিতেন। আবু বকর আর উমারও তার ব্যতিক্রম করেননি।
'আমি বদরের যুদ্ধে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম এবং আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছিলেন। উহুদের যুদ্ধে আমি আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম এবং আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছিলেন। আমি খন্দকের যুদ্ধেও আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম এবং আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছিলেন।'
কথাগুলো আমর ইবন আল-আস বলেছিলেন মুসলিম হওয়ার পর। এই কথাগুলো বলে আমর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন এই ভেবে যে, আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তিনি কত বড় ভুলই না করেছিলেন কিন্তু আল্লাহ তবু তাকে সুযোগ দিয়েছেন। যদি আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তিনি মারা যেতেন তাহলে তার স্থান হতো নিশ্চিতভাবে জাহান্নামে, কিন্তু আজ তিনি ইসলামের ছায়ায় এসে নিরাপদ হয়েছেন।
আমর ছিলেন একজন কুশলী রাজনীতিক। তিনি বুঝতে পারছিলেন কুরাইশদের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। বিস্তীর্ণ পৃথিবী কুরাইশদের জন্য দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। যে ইসলামের বিরুদ্ধে জান বাজি রেখে এতদিন যুদ্ধ করে এসেছেন, আজ সে মুসলিমরাই কুরাইশদের দরজায় কড়া নাড়ছে। হতাশা আর গ্লানি বোধ আমরকে চেপে ধরে। ইসলামের বিজয় তার সহ্য হচ্ছিল না, তিনি সিদ্ধান্ত নেন সবকিছু ছেড়েছুড়ে আবিসিনিয়ায় চলে যাবেন। সত্যকে গ্রহণ করার মনোবল তার ছিল না। সত্য থেকে পালিয়ে বেড়ানোর জন্য অন্য কোথাও চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না。
'আমি মনে করি না মক্কায় থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বরং আমাদের উচিত আবিসিনিয়ায় নাজ্জাশীর কাছে চলে যাওয়া এবং সেখানেই থাকা। যদি মুহাম্মাদ বিজয়ী হয়, তাহলে আমরা নাজ্জাশীর অধীনেই থাকবো। মুহাম্মাদের রাজত্বে থাকার চাইতে নাজ্জাশীর রাজত্বে থাকা ঢের ভালো। আর যদি আমাদের লোকেরা জয়ী হয়, তাহলে তারা আমাদের প্রতি সদয় হবে বলে আমার বিশ্বাস। তারা তো আমাদের মান-মর্যাদা সম্পর্কে জানেই।'
আমর আবিসিনিয়ায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। নাজ্জাশীর সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। আমর আবিসিনিয়ার পথে তার লোকবল নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন, সাথে উপহার হিসেবে নিয়ে গেলেন একগাদা চামড়া। আবিসিনিয়ায় আরবের চামড়ার খুব কদর ছিল।
নাজ্জাশীর দরবারে গিয়ে আমরের মাথা খারাপ হয়ে গেল। তিনি দেখলেন নাজ্জাশীর দরবার থেকে বের হয়ে আসছেন আল্লাহর রাসূলের সাহাবি আমর ইবন উমাইয়্যা আদ-দামরী। রাসূলুল্লাহ তাকে বিশেষ কাজে আবিসিনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। বন্ধুদের পেছনে রেখে আমর একাই দরবারে ঢুকে পড়লেন। মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানালেন, তাকে সাদরে বরণ করা হলো। আন-নাজ্জাশী তাঁকে বললেন, 'স্বাগতম বন্ধু! তোমার দেশ থেকে আমার জন্য কী এনেছো?' আমর বললেন, 'আপনার জন্য কিছু চামড়া নিয়ে এসেছি।'
আমর নাজ্জাশীকে এরপর বললেন, 'হে সম্রাট! আমি একটা লোককে আপনার প্রাসাদ থেকে বের হয়ে যেতে দেখেছি। এই লোক হলো আমাদের শত্রুর বার্তাবাহক। এরা আমাদের অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। আপনি কি তাকে আমাদের হাতে তুলে দেবেন যেন আমরা তাকে হত্যা করতে পারি?' এই কথা শুনে আন-নাজ্জাশী প্রচণ্ড রেগে গেলেন। রেগে গিয়ে আমরের মুখে আঘাত করে বসলেন। বললেন,
'তুমি আমাকে সেই মানুষটির বার্তাবাহককে তোমার হাতে তুলে দিতে বলছো যার কাছে খোদ আন-নামূস আল-আকবর (জিবরীল) আসা-যাওয়া করেন? এই একই নামুস আল-আকবর আসতেন নবী মূসার কাছে! তুমি চাও তাঁর বার্তাবাহককে আমি তোমার কাছে তুলে দিই? তোমার জন্য দুর্ভোগ! এই আমি তোমাকে বলছি, আমার কথা শোনো আমর! তুমি এই মানুষটিকে মেনে নাও। যারা তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করবে, তাদের সবার বিরুদ্ধে তিনি জয়ী হবেন। যেভাবে মূসা বিজয়ী হয়েছিলেন ফিরআউন আর তার সেনাবিহিনির বিরুদ্ধে।'
লজ্জায়-অপমানে আমরের সেদিন মরে যেতে ইচ্ছে হলো। আর একই সাথে তার হৃদয়ে একটা বড় ধরনের পরিবর্তনও এল। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি অনুভব করলেন তিনি আসলে এতদিন ধরে একটা মিথ্যাকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে আছেন। বুঝতে পারলেন ইসলামই হলো সত্য দ্বীন। এই দ্বীন থেকে এভাবে পালিয়ে বেড়ানোর কোনো মানে হয় না। তৎক্ষণাৎ আমর সিদ্ধান্ত নিলেন মুসলিম হয়ে যাবেন। নাজ্জাশীকে বললেন, 'আপনি কি আল্লাহর রাসূলের হয়ে আমার কাছ থেকে ইসলামের বাইয়াত নেবেন?' নাজ্জাশী হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমর আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। জীবনে অনেক ভুল করেছেন। আর দেরি নয়। সঙ্গে সঙ্গে আমর কালিমা পড়ে মুসলিম হয়ে গেলেন।
পুরো ঘটনাটি ঘটেছিল গোপনে, আমর তার লোকদের কাছে তখনকার জন্য পুরো ব্যাপারটিই বেমালুম চেপে গেলেন।
বেশ কিছুদিন সেখানে থাকার পর একদিন তিনি আরবের দিকে রওনা হলেন। এবারের উদ্দেশ্য মক্কা নয়, মদীনা। পথিমধ্যে তার সাথে দেখা হলো আরও দু'জনের - খালিদ ইবন ওয়ালিদ এবং উসমান ইবন তালহা। তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় যাচ্ছ তোমরা?' খালিদ ইবন ওয়ালিদ উত্তর দিলেন, 'লে সত্য পথ আজ আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। ঐ মানুষটি আসলেই আল্লাহর একজন রাসূল। আমি তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করতে যাচ্ছি।' আমর বললেন, 'সেই একই কারণে আমিও আজ ইসলাম গ্রহণ করতে যাচ্ছি।'
তাঁরা মদীনার দিকে রওনা হলেন। তাদের আগমনের কথা রাসূলুল্লাহ আগেই টের পেয়েছিলেন। বিশাল মনের সেই মানুষটি হাসিমুখে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এই লোকগুলো কিছুদিন আগেও ছিল তাঁর শত্রু, তাঁকে তারা দেশ বের করে দিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু যখনই তারা ইসলাম গ্রহণ করতে এলেন, আল্লাহর রাসূল অতীতের সমস্ত কিছুকে ভুলে গিয়ে সাদরে তাদেরকে গ্রহণ করে নিলেন। কারণ এই বিরোধ কোনো ব্যক্তিগত রেষারেষি বা ক্ষোভের কারণে ছিল না। বরং এই বিরোধিতা ছিল আদর্শিক বিরোধিতা। তাই যখনই তারা মুসলিম হয়ে গেলেন, আল্লাহর রাসূল এই ভেবে খুশি হলেন যে, যারা এতদিন তাগুতের সৈনিক ছিল এখন থেকে সেই দুজনই হবে আল্লাহর সৈনিক।
প্রথমে মুসলিম হলেন খালিদ ইবন ওয়ালিদ। এরপরে এলেন আমর। তার ভাষায়,
'আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করালেন, আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে গিয়ে বললাম, আপনার হাত বাড়িয়ে দিন, আমি আপনার হাতে আনুগত্যের শপথ করতে চাই। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন, কিন্তু আমি বাড়ালাম না। তিনি জানতে চাইলেন, কী হয়েছে আমর? আমি বললাম, আমি এক শর্তে বাইয়াত করতে চাই। তিনি জানতে চাইলেন, কী শর্তে? আমি বললাম, আমার আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করুন এই শর্তে যে, আল্লাহ আমার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি তখন বললেন, আমর! তুমি কি জানো না, ইসলাম আগের সমস্ত গুনাহ মুছে দেয়, হিজরত আগের সমস্ত গুনাহ মুছে দেয় এবং হজ্জ আগের সমস্ত গুনাহকে মুছে দেয়?'
এভাবে আমর মুসলিম হয়ে গেলেন। আল্লাহর রাসূল আমর ইবন আল আসকে অনেক কদর করতেন। তার প্রতি অনেক খেয়াল রাখতেন, অন্য অনেকের চাইতে তাকে বেশি প্রাধান্য দিতেন। আবু বকর আর উমারও তার ব্যতিক্রম করেননি।
📄 খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদের ؓ ইসলাম গ্রহণ
'আল্লাহ যখন আমার ভালো চাইলেন, তখন আমার অন্তরে ইসলামের জন্য ভালোবাসা তৈরি করে দিলেন এবং আমাকে বুঝ দান করলেন। তখন আমি নিজেই নিজেকে বলতাম, আমি মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে কতবার যুদ্ধ করলাম। কিন্তু প্রতিবারই মনে হতো খালি খালিই এত কষ্ট করছি, শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদই বিজয়ী হবেন। আল্লাহর রাসূল যখন হুদাইবিয়ায় আসলেন, তখন আমি দুইশো মুশরিকের একটি দল নিয়ে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করতে বেরিয়ে পড়লাম। আল্লাহর রাসূল আর তাঁর সাহাবিদের দেখা পেলাম উসফানে। আল্লাহর রাসূলকে একেবারে মুখোমুখি পেয়ে গেলাম। তখন তিনি সাহাবিদের নিয়ে যুহরের সালাতে ইমামতি করছিলেন। আমরা ঠিক করলাম তাঁকে আক্রমণ করবো। কিন্তু কেন যেন আর আক্রমণ করা হয়ে উঠলো না -- আসলে, এটার মাঝেই কল্যাণ ছিল। ওদিকে তিনি আমাদের পরিকল্পনা টের পেয়েছিলেন, তাই আসরের সময় সালাতুল খাওফ আদায় করলেন। বিষয়টা আমাকে খুব নাড়া দিল। আমার মনে হলো কোনো না কোনোভাবে তিনি আমাদের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবেনই, আমরা তাঁর কিছুই করতে পারবো না।'
এরপর হুদাইবিয়ার সন্ধি হলো। আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের নিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু খালিদ ইবন ওয়ালিদের মাথায় হাজির হলো এক ঝাঁক প্রশ্ন আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব -- 'আমার জীবনে আর কী আছে? আমি কোথায় যাবো? নাজ্জাশীর কাছে? না, সে তো নিজেই মুহাম্মাদের অনুসারী হয়ে পড়েছে। তার রাজ্যে মুসলিমরা নিরাপদ। তবে কি আমি হেরাক্লিয়াসের কাছে যাবো? কিন্তু সেখানে গেলে আমাকে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান বা ইহুদি হয়ে যেতে হবে। আমাকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে জীবন কাটাতে হবে। নাকি আমি নিজের দেশেই থেকে যাব?'
এভাবেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর হতাশার মধ্যে এক একটা দিন কাটতে লাগলো। উমরাতুল কাযার সময় এল। মুহাম্মাদ এবং তাঁর সঙ্গীরা উমরা পালন করবেন- এই দৃশ্য সহ্য করার মতো মানসিক শক্তি খালিদের ছিল না। তিনি মক্কা থেকে অনেক দূরে এক জায়গায় চলে গেলেন। সেবার উমরা করতে এসেছিলেন তারই ভাই আল-ওয়ালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ। তিনি যাওয়ার সময়ে ভাইয়ের জন্য একটা চিঠি রেখে গেলেন। চিঠিতে লেখা ছিল,
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। ইসলামের প্রতি তোমার বিদ্বেষ দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। তোমার মতো একটা বুদ্ধিমান লোক কী করে ইসলামের বিরোধিতা করে! মানুষ কেমন করে ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে-- আমার বুঝে আসে না। আল্লাহর রাসূল তোমার কথা জানতে চেয়েছেন, জিজ্ঞাসা করেছেন খালিদ কোথায়? আমি বলেছি, আল্লাহ তাঁকে নিয়ে আসবেন। এরপর তিনি বলেছেন, তার মতো মানুষ ইসলামকে উপেক্ষা করে কীভাবে! সে যদি তার শক্তি আর সাহসকে মুসলিমদের পক্ষে ঢেলে দিতো, তাহলে সেটাই তার জন্য উত্তম হতো আর আমরাও তাকে অন্যদের তুলনায় বেশি প্রাধান্য দিতাম। ভাই, নিজেকে তুমি অনেক বঞ্চিত করেছো, আর নিজেকে বঞ্চিত কোরো না।'
এরপর খালিদ বর্ণনা করেন,
'চিঠিটি পড়ে আমি এখান থেকে পালাবার শক্তি ফিরে পেলাম। আর ইসলাম গ্রহণের প্রতি ইচ্ছেও বেড়ে গেল। আমার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের মন্তব্য শুনে খুশি খুশি লাগছিল। আরও একটা ব্যাপার ছিল। একটা স্বপ্ন। আমি একদিন স্বপ্ন দেখলাম, আমি একটা সংকীর্ণ, আবদ্ধ, খরাপীড়িত দেশে ছিলাম। সেখান থেকে সবুজ, উর্বর আর বিস্তীর্ণ এক দেশে চলে এসেছি। আমার মনে হলো, নিশ্চয়ই এই স্বপ্নের কোনো গূঢ় অর্থ আছে।'
মদীনায় যাওয়ার পর খালিদ আবু বকরের কাছে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। আবু বকর তাকে বলেন, 'এই স্বপ্নের অর্থ হচ্ছে তুমি শিরক থেকে বের হয়ে ইসলামে প্রবেশ করেছো।'
খালিদ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি মুসলিম হয়ে যাবেন এবং মদীনায় হিজরত করবেন। তার ইচ্ছে হলো হিজরতের যাত্রাপথে ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক সমমনা কাউকে সাথে নিতে। প্রথমে গেলেন সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার কাছে। সাফওয়ানের কাছে নিজের মুসলিম হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। বললেন, 'আমাদের অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছো। অল্প কিছু লোকই আমাদের ধর্মের উপরে আছে। নিশ্চয়ই মুহাম্মাদের সম্মানই আরবদের সম্মান।' সাফওয়ান তখন সাফ জানিয়ে দিলো, 'সবাই মুসলিম হয়ে গেলেও আমি কোনোদিন মুসলিম হবো না।'
এরপর গেলেন আবু জাহলের ছেলে ইকরিমার কাছে। তাকেও একই কথা বললেন। ইকরিমাও মুসলিম হতে প্রত্যাখ্যান করলো। এরপর তার সাথে দেখা হলো উসমান ইবন তালহার সাথে। খালিদ প্রথমে ভাবলেন উসমানের সাথে এই বিষয় নিয়ে কোনো আলাপ করবেন না। কারণ এই উসমান পরিবারের সাত সদস্য উহুদে মুসলিমদের হাতে নিহত হয়েছে। কিন্তু তারপরেই ভাবলেন, 'আচ্ছা, কী-ই আর এমন হবে এ কথা বললে? আমি তো চলেই যাচ্ছি, কথা বলেই যাই।' কত বিস্ময়কর ঘটনাই তো দুনিয়াতে ঘটে। উসমান ইবন তালহা, যার পরিবারের সাত সাত জন ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছে, সেই তালহাকেই দেখা গেল ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহী। তারা দুজনে এবার একসাথে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পথিমধ্যে দেখা হলো আমর ইবন আল-আসের সাথে। তিনজন মিলে একসাথে মদীনায় গেলেন।
মদীনার সীমান্তে এসে খালিদ কাপড় বদলে ভালো পোশাক পরে নিলেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তের জন্য সুন্দর করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সবাই। রাসূলুল্লাহর সাথে দেখা হলো। খালিদকে সেই দূর থেকে দেখার পর থেকেই রাসূলুল্লাহর মুখে এক চিলতে হাসি ঝুলেই আছে। খালিদ কাছে আসলেন, বাইয়াত দিলেন। আল্লাহর রাসূল তাকে বললেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি তোমাকে পথ দেখিয়েছেন। আমি তোমার মাঝে বুদ্ধির ছাপ দেখেছি, আর আশা করেছি তোমার বুদ্ধিমত্তা তোমাকে ভালো পথে নিয়ে আসবে।' খালিদ ইবন ওয়ালিদ বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি তো জানেন যে, আমি আপনার বিরোধিতা করেছি। গোঁয়ারের মতো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছি। তাই আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি আমাকে ক্ষমা করে দেন।'
নবীজি বললেন, 'ইসলাম তো আগের সমস্ত গুনাহকে মুছে দেয়।' খালিদ বললেন, 'তবুও আপনি আমার জন্য দুআ করে দিন। নবীজি তখন দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! তোমার পথ থেকে মানুষকে বিরত রাখতে খালিদ যা কিছু করেছে, তার জন্য আপনি খালিদকে ক্ষমা করে দিন।'
খালিদের পর একে একে আমর ইবন আল আস এবং উসমান ইবন তালহা বাইয়াত করলেন। কুরাইশদের তিন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ইসলামের ছায়াতলে চলে এল। তাদের ইসলাম গ্রহণ ছিল মুসলিমদের বিজয় আর মুশরিকদের পরাজয়।
'আল্লাহ যখন আমার ভালো চাইলেন, তখন আমার অন্তরে ইসলামের জন্য ভালোবাসা তৈরি করে দিলেন এবং আমাকে বুঝ দান করলেন। তখন আমি নিজেই নিজেকে বলতাম, আমি মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে কতবার যুদ্ধ করলাম। কিন্তু প্রতিবারই মনে হতো খালি খালিই এত কষ্ট করছি, শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদই বিজয়ী হবেন। আল্লাহর রাসূল যখন হুদাইবিয়ায় আসলেন, তখন আমি দুইশো মুশরিকের একটি দল নিয়ে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করতে বেরিয়ে পড়লাম। আল্লাহর রাসূল আর তাঁর সাহাবিদের দেখা পেলাম উসফানে। আল্লাহর রাসূলকে একেবারে মুখোমুখি পেয়ে গেলাম। তখন তিনি সাহাবিদের নিয়ে যুহরের সালাতে ইমামতি করছিলেন। আমরা ঠিক করলাম তাঁকে আক্রমণ করবো। কিন্তু কেন যেন আর আক্রমণ করা হয়ে উঠলো না -- আসলে, এটার মাঝেই কল্যাণ ছিল। ওদিকে তিনি আমাদের পরিকল্পনা টের পেয়েছিলেন, তাই আসরের সময় সালাতুল খাওফ আদায় করলেন। বিষয়টা আমাকে খুব নাড়া দিল। আমার মনে হলো কোনো না কোনোভাবে তিনি আমাদের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবেনই, আমরা তাঁর কিছুই করতে পারবো না।'
এরপর হুদাইবিয়ার সন্ধি হলো। আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের নিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু খালিদ ইবন ওয়ালিদের মাথায় হাজির হলো এক ঝাঁক প্রশ্ন আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব -- 'আমার জীবনে আর কী আছে? আমি কোথায় যাবো? নাজ্জাশীর কাছে? না, সে তো নিজেই মুহাম্মাদের অনুসারী হয়ে পড়েছে। তার রাজ্যে মুসলিমরা নিরাপদ। তবে কি আমি হেরাক্লিয়াসের কাছে যাবো? কিন্তু সেখানে গেলে আমাকে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান বা ইহুদি হয়ে যেতে হবে। আমাকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে জীবন কাটাতে হবে। নাকি আমি নিজের দেশেই থেকে যাব?'
এভাবেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর হতাশার মধ্যে এক একটা দিন কাটতে লাগলো। উমরাতুল কাযার সময় এল। মুহাম্মাদ এবং তাঁর সঙ্গীরা উমরা পালন করবেন- এই দৃশ্য সহ্য করার মতো মানসিক শক্তি খালিদের ছিল না। তিনি মক্কা থেকে অনেক দূরে এক জায়গায় চলে গেলেন। সেবার উমরা করতে এসেছিলেন তারই ভাই আল-ওয়ালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ। তিনি যাওয়ার সময়ে ভাইয়ের জন্য একটা চিঠি রেখে গেলেন। চিঠিতে লেখা ছিল,
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। ইসলামের প্রতি তোমার বিদ্বেষ দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। তোমার মতো একটা বুদ্ধিমান লোক কী করে ইসলামের বিরোধিতা করে! মানুষ কেমন করে ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে-- আমার বুঝে আসে না। আল্লাহর রাসূল তোমার কথা জানতে চেয়েছেন, জিজ্ঞাসা করেছেন খালিদ কোথায়? আমি বলেছি, আল্লাহ তাঁকে নিয়ে আসবেন। এরপর তিনি বলেছেন, তার মতো মানুষ ইসলামকে উপেক্ষা করে কীভাবে! সে যদি তার শক্তি আর সাহসকে মুসলিমদের পক্ষে ঢেলে দিতো, তাহলে সেটাই তার জন্য উত্তম হতো আর আমরাও তাকে অন্যদের তুলনায় বেশি প্রাধান্য দিতাম। ভাই, নিজেকে তুমি অনেক বঞ্চিত করেছো, আর নিজেকে বঞ্চিত কোরো না।'
এরপর খালিদ বর্ণনা করেন,
'চিঠিটি পড়ে আমি এখান থেকে পালাবার শক্তি ফিরে পেলাম। আর ইসলাম গ্রহণের প্রতি ইচ্ছেও বেড়ে গেল। আমার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের মন্তব্য শুনে খুশি খুশি লাগছিল। আরও একটা ব্যাপার ছিল। একটা স্বপ্ন। আমি একদিন স্বপ্ন দেখলাম, আমি একটা সংকীর্ণ, আবদ্ধ, খরাপীড়িত দেশে ছিলাম। সেখান থেকে সবুজ, উর্বর আর বিস্তীর্ণ এক দেশে চলে এসেছি। আমার মনে হলো, নিশ্চয়ই এই স্বপ্নের কোনো গূঢ় অর্থ আছে।'
মদীনায় যাওয়ার পর খালিদ আবু বকরের কাছে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। আবু বকর তাকে বলেন, 'এই স্বপ্নের অর্থ হচ্ছে তুমি শিরক থেকে বের হয়ে ইসলামে প্রবেশ করেছো।'
খালিদ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি মুসলিম হয়ে যাবেন এবং মদীনায় হিজরত করবেন। তার ইচ্ছে হলো হিজরতের যাত্রাপথে ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক সমমনা কাউকে সাথে নিতে। প্রথমে গেলেন সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার কাছে। সাফওয়ানের কাছে নিজের মুসলিম হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। বললেন, 'আমাদের অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছো। অল্প কিছু লোকই আমাদের ধর্মের উপরে আছে। নিশ্চয়ই মুহাম্মাদের সম্মানই আরবদের সম্মান।' সাফওয়ান তখন সাফ জানিয়ে দিলো, 'সবাই মুসলিম হয়ে গেলেও আমি কোনোদিন মুসলিম হবো না।'
এরপর গেলেন আবু জাহলের ছেলে ইকরিমার কাছে। তাকেও একই কথা বললেন। ইকরিমাও মুসলিম হতে প্রত্যাখ্যান করলো। এরপর তার সাথে দেখা হলো উসমান ইবন তালহার সাথে। খালিদ প্রথমে ভাবলেন উসমানের সাথে এই বিষয় নিয়ে কোনো আলাপ করবেন না। কারণ এই উসমান পরিবারের সাত সদস্য উহুদে মুসলিমদের হাতে নিহত হয়েছে। কিন্তু তারপরেই ভাবলেন, 'আচ্ছা, কী-ই আর এমন হবে এ কথা বললে? আমি তো চলেই যাচ্ছি, কথা বলেই যাই।' কত বিস্ময়কর ঘটনাই তো দুনিয়াতে ঘটে। উসমান ইবন তালহা, যার পরিবারের সাত সাত জন ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছে, সেই তালহাকেই দেখা গেল ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহী। তারা দুজনে এবার একসাথে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পথিমধ্যে দেখা হলো আমর ইবন আল-আসের সাথে। তিনজন মিলে একসাথে মদীনায় গেলেন।
মদীনার সীমান্তে এসে খালিদ কাপড় বদলে ভালো পোশাক পরে নিলেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তের জন্য সুন্দর করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সবাই। রাসূলুল্লাহর সাথে দেখা হলো। খালিদকে সেই দূর থেকে দেখার পর থেকেই রাসূলুল্লাহর মুখে এক চিলতে হাসি ঝুলেই আছে। খালিদ কাছে আসলেন, বাইয়াত দিলেন। আল্লাহর রাসূল তাকে বললেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি তোমাকে পথ দেখিয়েছেন। আমি তোমার মাঝে বুদ্ধির ছাপ দেখেছি, আর আশা করেছি তোমার বুদ্ধিমত্তা তোমাকে ভালো পথে নিয়ে আসবে।' খালিদ ইবন ওয়ালিদ বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আপনি তো জানেন যে, আমি আপনার বিরোধিতা করেছি। গোঁয়ারের মতো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছি। তাই আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি আমাকে ক্ষমা করে দেন।'
নবীজি বললেন, 'ইসলাম তো আগের সমস্ত গুনাহকে মুছে দেয়।' খালিদ বললেন, 'তবুও আপনি আমার জন্য দুআ করে দিন। নবীজি তখন দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! তোমার পথ থেকে মানুষকে বিরত রাখতে খালিদ যা কিছু করেছে, তার জন্য আপনি খালিদকে ক্ষমা করে দিন।'
খালিদের পর একে একে আমর ইবন আল আস এবং উসমান ইবন তালহা বাইয়াত করলেন। কুরাইশদের তিন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ইসলামের ছায়াতলে চলে এল। তাদের ইসলাম গ্রহণ ছিল মুসলিমদের বিজয় আর মুশরিকদের পরাজয়।