📄 সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের ؓ সাথে নবীজির ﷽ বিয়ে
সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের সাথে আল্লাহর রাসূলের বিয়ের কাহিনী জানার আগে একটু পেছনে তাকানো যাক। এই সাফিয়া হচ্ছেন ইহুদি গোত্র বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের কন্যা। এ হচ্ছে সেই হুয়াই, যে আল্লাহর রাসূল মদীনায় আসার পর থেকেই তাঁর সাথে শত্রুতা করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞা করেছিল। এটি সাফিয়ার ছোটবেলার একটি ঘটনা। এই প্রতিজ্ঞার ঘটনাটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই হুয়াই-ই খন্দকের যুদ্ধের সময় বনু কুরায়যা গোত্রের বিদ্রোহের পেছনে অন্যতম হোতা। তাকে বনু কুরায়যার ঘটনায় হত্যা করা হয়। তার ভাইও খন্দকের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তাকেও হত্যা করা হয়। সাফিয়ার স্বামী ছিলেন কিনানা ইবন আর-রাবী। সে ছিল বনু নাযিরের কোষাধ্যক্ষ। তার কথা একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সাফিয়া যেনতেন কোনো পরিবারের কন্যা ছিলেন না। তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয় একটি পরিবারের মেয়ে। বলা যেতে পারে তাঁর গোত্রের 'ফার্স্ট লেডি'。
খাইবারের যুদ্ধে তাঁর বাবা, ভাই এবং স্বামী প্রত্যেকে মুসলিমদের হাতে মারা যায়। সাফিয়া দাসী হিসেবে বন্দী হলেন। গনিমতের সম্পদ ভাগাভাগি হওয়ার পর তিনি পড়লেন দাহিয়া আল-কালবির ভাগে। তখন কেউ একজন আল্লাহর রাসূলকে বললেন, 'সাফিয়া তো ইহুদিদের মধ্যে উঁচু বংশের সন্তান। তিনি দাহিয়া'র ভাগে পড়েছেন, কিন্তু সত্যি বলতে, তার জন্য উপযুক্ত পাত্র কেবল একজনই আছে। তিনি হচ্ছেন আপনি।'
রাসুলুল্লাহ তখন দাহিয়াকে ডেকে বললেন সাফিয়াকে ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে বেছে নিতে। দাহিয়া তাই করলেন। রাসুলুল্লাহ সাফিয়াকে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। সেক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল তাকে বিয়ে করে নেবেন এবং তার দাসমুক্তি হবে বিয়ের মোহর। দ্বিতীয় আরেকটি প্রস্তাব দিলেন, সাফিয়া চাইলে ইহুদি হিসেবে থেকে যেতে পারেন। সাফিয়া বেছে নিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে। আল্লাহর রাসূলের সাথে সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের বিয়ে হলো। এই বিয়ে হয়েছিল সাফিয়ার মাসিক সম্পন্ন হওয়ার পর। সে পর্যন্ত তারা খাইবারেই ছিলেন।
এবার খাইবার থেকে ফেরার পালা। সাফিয়াকে রাসূলুল্লাহ তাঁর উটের পেছনে বসালেন। ফিরতি পথে ছয় মাইল গিয়ে রাসূলুল্লাহ বিরতি নিতে চাইলেন যেন স্ত্রীর সাথে থেকে বিয়ে পূর্ণ করতে পারেন। কিন্তু সাফিয়া রাজি হলেন না। বিষয়টা রাসূলুল্লাহকে একটু অসুবিধায় ফেলে দিল, কিন্তু তিনি সাফিয়াকে কিছুই বললেন না। পরে তারা আস-সাহবায় থামলেন এবং সেখানেই ওয়ালিমা অনুষ্ঠিত হলো। বিয়ে পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হলো, এরপর রাসূলুল্লাহ সাফিয়ার কাছে জানতে চাইলেন কেন তিনি প্রথমবার থামতে রাজি হলেন না। তখন সাফিয়া ব্যাখ্যা করলেন, 'ঐ এলাকাটা ছিল ইহুদিদের কাছে, তাই আমি আপনার জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কা করছিলাম।' রাসূলুল্লাহ সাফিয়ার উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন। সাফিয়ার উত্তর সাফিয়ার অন্তরের কথাকে প্রকাশ করে। তিনি যদি আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ না করতেন, তাহলে আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তা নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন হতেন না。
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে নারীর স্বামী, ভাই, বাবা সবাই মুসলিমের হাতে মারা গিয়েছে, সেই নারী কীভাবে সেই মুসলিমদের নেতাকে ভালোবাসতে পারে? কীভাবে সে সেই ইসলামকে দ্বীন হিসেবে বেছে নেয়, যার অনুসারীরা তার সবচেয়ে আপনজনদের হত্যা করেছে? সেই প্রশ্নে একটু পরেই আসা যাক।
ওয়ালিমা শেষে যখন তারা ফিরে আসবেন, তখনকার ছোট্ট একটা ঘটনা রাসূলুল্লাহর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বড় একটা ধারণা দেয়। তারা মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন, সাফিয়া উটের পিঠে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর গায়ের চাদর খুলে সাফিয়ার বসার জন্য বালিশ বানিয়ে উটের পিঠে বসিয়ে দিলেন। এরপর নিজের হাঁটু উঁচু করে তুলে ধরলেন যেন সেই হাঁটুর উপর ভর করে সাফিয়া উটের পিঠে উঠতে পারেন।
ইহুদিদের চোখে যিনি আরবদের নেতা, মুসলিমদের কাছে যিনি আল্লাহর রাসূল, সদ্য যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আসা সেই বীর মানুষটি তাঁর স্ত্রীর জন্য মাটিতে বসে পড়েছেন। সবার সামনে স্ত্রীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করেননি। এত বিনয়, দয়া আর মমতা যে মানুষটির তাঁকে ভালো না বেসে কি থাকা যায়?
সাফিয়া ছোটবেলাতেই জেনেছিলেন মুহাম্মাদ হচ্ছেন আল্লাহর সত্য নবী। তার বাবার মুখেই তিনি তা জেনেছেন। কিন্তু এটাই ছিল তার জন্য দুঃখজনক বাস্তবতা যে তার বাবা, স্বামী, ভাই -- সবাই আল্লাহর রাসূলের বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। তার গোত্রের লোকদের আল্লাহর রাসূল মদীনা থেকে বের করে দিয়েছেন। এসব কিছুই ঘটেছে তার চোখের সামনে। তিনি তখন একজন কমবয়সী নারী। স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর রাসূলের প্রতি তার একটা ক্ষোভ কাজ করার কথা। আল্লাহর রাসূল কিন্তু বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি সাফিয়ার আবেগগুলোকে উপেক্ষা করেননি, বরং নিজের আবেগটাও প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফিয়ার কাছে তার বাবা আর স্বামীর মারা যাওয়ার বিষয়টা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতেন। তাকে বুঝিয়ে বলতেন তার বাবা হুয়াইয়ের কী অপরাধ ছিল। এভাবে বোঝাতে বোঝাতে একসময় সাফিয়ার মন থেকে সব রাগ-ক্ষোভ দূর হয়ে গেল। দুঃখের যে ভারী বোঝাটা তার মনে পাথরের মতো চেপে ছিল, সেটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে গেল। পিতা, স্বামী আর আপনজনদের হারালেন সত্যি, কিন্তু আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে সাফিয়ার নতুন জীবন শুরু হলো।
বিয়ের পরের ঘটনা, আল্লাহর রাসূল দেখলেন সাফিয়ার মুখে নীল দাগ। তিনি জানতে চাইলেন এই দাগ কীভাবে হলো। সাফিয়া বলতে শুরু করলেন, 'একদিন আমি ঘুমাচ্ছিলাম। আমার মাথা ছিল আমার স্বামীর কোলে, তখন আমি একটি স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার কোলের উপর চাঁদ এসে পড়লো। জেগে উঠে স্বামীকে স্বপ্নের কথা বললাম। আমার স্বামী আমাকে থাপ্পড় মেরে বললো, তুই আরবের বাদশাহকে পেতে চাস!'
সেদিন হয়তো সাফিয়া সেই ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরবর্তীতে কত চমৎকারভাবে সাফিয়ার জীবনকে পাল্টে দিলো। এই স্বপ্ন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুসংবাদ যে আল্লাহর রাসূলের সাথে সাফিয়ার বিয়ে হবে। কিনানা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছিল যে সাফিয়া আল্লাহর রাসূলকে বিয়ে করতে চান। আসলে এটা তার চাওয়া ছিল না। এটা ছিল আল্লাহ আযযা ওয়াজালের পক্ষ থেকে একটি সত্য স্বপ্ন, ভবিষ্যতে কী হবে তার ব্যাপারে ইঙ্গিত।
আগের সেই প্রশ্নে ফিরে যাওয়া যাক, কীভাবে একজন নারীর পক্ষে তার স্বামী আর পিতার হত্যাকারীকে বিয়ে করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর এক শব্দেই দেওয়া সম্ভব, তা হচ্ছে ঈমান। সাফিয়া তাঁর স্বামী আর বাবার সাথে বন্ধন থেকে ঈমানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি ঈমানকে সবকছিুর ওপরে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আর তাই আল্লাহর রাসূল হয়ে যান তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ! রাসূলুল্লাহর নবুওয়াতের কথা তিনি সেই ছোটবেলা থেকেই জানতেন। আর যখন সেই প্রতীক্ষিত নবী তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, তিনি স্বেচ্ছায়, আগ্রহের সাথে এই বিয়েতে সম্মত হলেন। যার অন্তরে ঈমান নেই, সে কখনো সাফিয়ার এই সিদ্ধান্তকে কদর করতে পারবে না।
সত্যি বলতে এই বিয়ে ছিল সাফিয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। এই বিয়ের মাধ্যমে সাফিয়া জাহান্নাম থেকে রক্ষা পেয়ে শুধু যে জান্নাতী হলেন তা-ই না, তিনি হয়ে গেলেন সেরা নারীদের একজন- উম্মুল মুমিনীন। সাফিয়ার পরবর্তী জীবন থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি আল্লাহর রাসূলকে কতটা ভালোবাসতেন। তিনি আল্লাহর রাসূলকে নিজের জীবন থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। রাসূলুল্লাহ যখন মৃত্যুশয্যায় কষ্ট পাচ্ছেন, তখন সাফিয়া বলে উঠেন, 'ইশ! আজ যদি আপনার জায়গায় আমি থাকতাম!' ঈমান এভাবেই মানুষের অন্তরকে বদলে দেয়। আল্লাহ তাআলা উম্মুল মু'মিনীন সাফিয়ার ওপর সন্তুষ্ট হোন।
এ প্রসঙ্গে আবু আইয়ুব আল আনসারীর একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। সাফিয়ার সাথে বিয়ে হওয়ার পর যে রাতে আল্লাহর রাসূল তার সাথে থাকলেন, সে রাতে আবু আইয়ুব আল আনসারী সারা রাত সেই তাঁবুর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে নবীজিকে পাহারা দেন। সকাল বেলা উঠে আল্লাহর রাসূল আবু আইয়ুবকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার আবু আইয়ুব! তুমি এখানে কেন?' আবু আইয়ুব তখন উত্তর দিলেন, 'আমি এই মহিলাকে নিয়ে আপনার জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ করছিলাম আল্লাহর রাসূল। এই মহিলার বাবা, স্বামী আর আপনজনেরা নিহত হয়েছে। আর কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন একজন কাফির। আমি আশঙ্কা করছিলাম যদি প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে তিনি আপনার কোনো ক্ষতি করতে চান--তাই আমি সারারাত আপনাকে পাহারা দিয়েছি।' আবু আইয়ুবের এই সন্দেহ যদিও অমূলক ছিল, তবু তার দুশ্চিন্তা বলে দেয় তিনি আল্লাহর রাসূলকে কতটা ভালোবাসতেন। আল্লাহর রাসূল তার ওপর খুশি হয়ে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ আবু আইয়ুব, আমাকে সারারাত যেভাবে পাহারা দিয়েছে, আপনি সেভাবে তাকে রক্ষা করুন।'
টিকাঃ
৯০. সহীহ বুখারি, অধ্যায় ক্রয়-বিক্রয়, হাদীস ১৮১।
৯১. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৬।
সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের সাথে আল্লাহর রাসূলের বিয়ের কাহিনী জানার আগে একটু পেছনে তাকানো যাক। এই সাফিয়া হচ্ছেন ইহুদি গোত্র বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের কন্যা। এ হচ্ছে সেই হুয়াই, যে আল্লাহর রাসূল মদীনায় আসার পর থেকেই তাঁর সাথে শত্রুতা করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞা করেছিল। এটি সাফিয়ার ছোটবেলার একটি ঘটনা। এই প্রতিজ্ঞার ঘটনাটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই হুয়াই-ই খন্দকের যুদ্ধের সময় বনু কুরায়যা গোত্রের বিদ্রোহের পেছনে অন্যতম হোতা। তাকে বনু কুরায়যার ঘটনায় হত্যা করা হয়। তার ভাইও খন্দকের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তাকেও হত্যা করা হয়। সাফিয়ার স্বামী ছিলেন কিনানা ইবন আর-রাবী। সে ছিল বনু নাযিরের কোষাধ্যক্ষ। তার কথা একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সাফিয়া যেনতেন কোনো পরিবারের কন্যা ছিলেন না। তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয় একটি পরিবারের মেয়ে। বলা যেতে পারে তাঁর গোত্রের 'ফার্স্ট লেডি'。
খাইবারের যুদ্ধে তাঁর বাবা, ভাই এবং স্বামী প্রত্যেকে মুসলিমদের হাতে মারা যায়। সাফিয়া দাসী হিসেবে বন্দী হলেন। গনিমতের সম্পদ ভাগাভাগি হওয়ার পর তিনি পড়লেন দাহিয়া আল-কালবির ভাগে। তখন কেউ একজন আল্লাহর রাসূলকে বললেন, 'সাফিয়া তো ইহুদিদের মধ্যে উঁচু বংশের সন্তান। তিনি দাহিয়া'র ভাগে পড়েছেন, কিন্তু সত্যি বলতে, তার জন্য উপযুক্ত পাত্র কেবল একজনই আছে। তিনি হচ্ছেন আপনি।'
রাসুলুল্লাহ তখন দাহিয়াকে ডেকে বললেন সাফিয়াকে ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে বেছে নিতে। দাহিয়া তাই করলেন। রাসুলুল্লাহ সাফিয়াকে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। সেক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল তাকে বিয়ে করে নেবেন এবং তার দাসমুক্তি হবে বিয়ের মোহর। দ্বিতীয় আরেকটি প্রস্তাব দিলেন, সাফিয়া চাইলে ইহুদি হিসেবে থেকে যেতে পারেন। সাফিয়া বেছে নিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে। আল্লাহর রাসূলের সাথে সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের বিয়ে হলো। এই বিয়ে হয়েছিল সাফিয়ার মাসিক সম্পন্ন হওয়ার পর। সে পর্যন্ত তারা খাইবারেই ছিলেন।
এবার খাইবার থেকে ফেরার পালা। সাফিয়াকে রাসূলুল্লাহ তাঁর উটের পেছনে বসালেন। ফিরতি পথে ছয় মাইল গিয়ে রাসূলুল্লাহ বিরতি নিতে চাইলেন যেন স্ত্রীর সাথে থেকে বিয়ে পূর্ণ করতে পারেন। কিন্তু সাফিয়া রাজি হলেন না। বিষয়টা রাসূলুল্লাহকে একটু অসুবিধায় ফেলে দিল, কিন্তু তিনি সাফিয়াকে কিছুই বললেন না। পরে তারা আস-সাহবায় থামলেন এবং সেখানেই ওয়ালিমা অনুষ্ঠিত হলো। বিয়ে পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হলো, এরপর রাসূলুল্লাহ সাফিয়ার কাছে জানতে চাইলেন কেন তিনি প্রথমবার থামতে রাজি হলেন না। তখন সাফিয়া ব্যাখ্যা করলেন, 'ঐ এলাকাটা ছিল ইহুদিদের কাছে, তাই আমি আপনার জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কা করছিলাম।' রাসূলুল্লাহ সাফিয়ার উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন। সাফিয়ার উত্তর সাফিয়ার অন্তরের কথাকে প্রকাশ করে। তিনি যদি আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ না করতেন, তাহলে আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তা নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন হতেন না。
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে নারীর স্বামী, ভাই, বাবা সবাই মুসলিমের হাতে মারা গিয়েছে, সেই নারী কীভাবে সেই মুসলিমদের নেতাকে ভালোবাসতে পারে? কীভাবে সে সেই ইসলামকে দ্বীন হিসেবে বেছে নেয়, যার অনুসারীরা তার সবচেয়ে আপনজনদের হত্যা করেছে? সেই প্রশ্নে একটু পরেই আসা যাক।
ওয়ালিমা শেষে যখন তারা ফিরে আসবেন, তখনকার ছোট্ট একটা ঘটনা রাসূলুল্লাহর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বড় একটা ধারণা দেয়। তারা মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন, সাফিয়া উটের পিঠে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর গায়ের চাদর খুলে সাফিয়ার বসার জন্য বালিশ বানিয়ে উটের পিঠে বসিয়ে দিলেন। এরপর নিজের হাঁটু উঁচু করে তুলে ধরলেন যেন সেই হাঁটুর উপর ভর করে সাফিয়া উটের পিঠে উঠতে পারেন।
ইহুদিদের চোখে যিনি আরবদের নেতা, মুসলিমদের কাছে যিনি আল্লাহর রাসূল, সদ্য যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আসা সেই বীর মানুষটি তাঁর স্ত্রীর জন্য মাটিতে বসে পড়েছেন। সবার সামনে স্ত্রীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করেননি। এত বিনয়, দয়া আর মমতা যে মানুষটির তাঁকে ভালো না বেসে কি থাকা যায়?
সাফিয়া ছোটবেলাতেই জেনেছিলেন মুহাম্মাদ হচ্ছেন আল্লাহর সত্য নবী। তার বাবার মুখেই তিনি তা জেনেছেন। কিন্তু এটাই ছিল তার জন্য দুঃখজনক বাস্তবতা যে তার বাবা, স্বামী, ভাই -- সবাই আল্লাহর রাসূলের বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। তার গোত্রের লোকদের আল্লাহর রাসূল মদীনা থেকে বের করে দিয়েছেন। এসব কিছুই ঘটেছে তার চোখের সামনে। তিনি তখন একজন কমবয়সী নারী। স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর রাসূলের প্রতি তার একটা ক্ষোভ কাজ করার কথা। আল্লাহর রাসূল কিন্তু বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি সাফিয়ার আবেগগুলোকে উপেক্ষা করেননি, বরং নিজের আবেগটাও প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফিয়ার কাছে তার বাবা আর স্বামীর মারা যাওয়ার বিষয়টা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতেন। তাকে বুঝিয়ে বলতেন তার বাবা হুয়াইয়ের কী অপরাধ ছিল। এভাবে বোঝাতে বোঝাতে একসময় সাফিয়ার মন থেকে সব রাগ-ক্ষোভ দূর হয়ে গেল। দুঃখের যে ভারী বোঝাটা তার মনে পাথরের মতো চেপে ছিল, সেটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে গেল। পিতা, স্বামী আর আপনজনদের হারালেন সত্যি, কিন্তু আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে সাফিয়ার নতুন জীবন শুরু হলো।
বিয়ের পরের ঘটনা, আল্লাহর রাসূল দেখলেন সাফিয়ার মুখে নীল দাগ। তিনি জানতে চাইলেন এই দাগ কীভাবে হলো। সাফিয়া বলতে শুরু করলেন, 'একদিন আমি ঘুমাচ্ছিলাম। আমার মাথা ছিল আমার স্বামীর কোলে, তখন আমি একটি স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার কোলের উপর চাঁদ এসে পড়লো। জেগে উঠে স্বামীকে স্বপ্নের কথা বললাম। আমার স্বামী আমাকে থাপ্পড় মেরে বললো, তুই আরবের বাদশাহকে পেতে চাস!'
সেদিন হয়তো সাফিয়া সেই ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরবর্তীতে কত চমৎকারভাবে সাফিয়ার জীবনকে পাল্টে দিলো। এই স্বপ্ন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুসংবাদ যে আল্লাহর রাসূলের সাথে সাফিয়ার বিয়ে হবে। কিনানা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছিল যে সাফিয়া আল্লাহর রাসূলকে বিয়ে করতে চান। আসলে এটা তার চাওয়া ছিল না। এটা ছিল আল্লাহ আযযা ওয়াজালের পক্ষ থেকে একটি সত্য স্বপ্ন, ভবিষ্যতে কী হবে তার ব্যাপারে ইঙ্গিত।
আগের সেই প্রশ্নে ফিরে যাওয়া যাক, কীভাবে একজন নারীর পক্ষে তার স্বামী আর পিতার হত্যাকারীকে বিয়ে করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর এক শব্দেই দেওয়া সম্ভব, তা হচ্ছে ঈমান। সাফিয়া তাঁর স্বামী আর বাবার সাথে বন্ধন থেকে ঈমানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি ঈমানকে সবকছিুর ওপরে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আর তাই আল্লাহর রাসূল হয়ে যান তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ! রাসূলুল্লাহর নবুওয়াতের কথা তিনি সেই ছোটবেলা থেকেই জানতেন। আর যখন সেই প্রতীক্ষিত নবী তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, তিনি স্বেচ্ছায়, আগ্রহের সাথে এই বিয়েতে সম্মত হলেন। যার অন্তরে ঈমান নেই, সে কখনো সাফিয়ার এই সিদ্ধান্তকে কদর করতে পারবে না।
সত্যি বলতে এই বিয়ে ছিল সাফিয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। এই বিয়ের মাধ্যমে সাফিয়া জাহান্নাম থেকে রক্ষা পেয়ে শুধু যে জান্নাতী হলেন তা-ই না, তিনি হয়ে গেলেন সেরা নারীদের একজন- উম্মুল মুমিনীন। সাফিয়ার পরবর্তী জীবন থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি আল্লাহর রাসূলকে কতটা ভালোবাসতেন। তিনি আল্লাহর রাসূলকে নিজের জীবন থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। রাসূলুল্লাহ যখন মৃত্যুশয্যায় কষ্ট পাচ্ছেন, তখন সাফিয়া বলে উঠেন, 'ইশ! আজ যদি আপনার জায়গায় আমি থাকতাম!' ঈমান এভাবেই মানুষের অন্তরকে বদলে দেয়। আল্লাহ তাআলা উম্মুল মু'মিনীন সাফিয়ার ওপর সন্তুষ্ট হোন।
এ প্রসঙ্গে আবু আইয়ুব আল আনসারীর একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। সাফিয়ার সাথে বিয়ে হওয়ার পর যে রাতে আল্লাহর রাসূল তার সাথে থাকলেন, সে রাতে আবু আইয়ুব আল আনসারী সারা রাত সেই তাঁবুর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে নবীজিকে পাহারা দেন। সকাল বেলা উঠে আল্লাহর রাসূল আবু আইয়ুবকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার আবু আইয়ুব! তুমি এখানে কেন?' আবু আইয়ুব তখন উত্তর দিলেন, 'আমি এই মহিলাকে নিয়ে আপনার জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ করছিলাম আল্লাহর রাসূল। এই মহিলার বাবা, স্বামী আর আপনজনেরা নিহত হয়েছে। আর কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন একজন কাফির। আমি আশঙ্কা করছিলাম যদি প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে তিনি আপনার কোনো ক্ষতি করতে চান--তাই আমি সারারাত আপনাকে পাহারা দিয়েছি।' আবু আইয়ুবের এই সন্দেহ যদিও অমূলক ছিল, তবু তার দুশ্চিন্তা বলে দেয় তিনি আল্লাহর রাসূলকে কতটা ভালোবাসতেন। আল্লাহর রাসূল তার ওপর খুশি হয়ে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ আবু আইয়ুব, আমাকে সারারাত যেভাবে পাহারা দিয়েছে, আপনি সেভাবে তাকে রক্ষা করুন।'
টিকাঃ
৯০. সহীহ বুখারি, অধ্যায় ক্রয়-বিক্রয়, হাদীস ১৮১।
৯১. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৬।
📄 মুহাজিরদের প্রত্যাবর্তন
'আমি জানি না আজ আমি কেন এত খুশি ... খাইবার বিজয় নাকি জাফর ইবন আবি তালিবের ফিরে আসা...'
আবিসিনিয়ার মুহাজিররা যখন মদীনায় ফিরে আসলেন, তখন এভাবেই আল্লাহর রাসূল নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন। জাফর ইবন আবি তালিব ছিলেন আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই। দীর্ঘদিন পরে তাকে ফিরে পেয়ে রাসূলুল্লাহ তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দেন। জাফর ইবন আবি তালিবকে কাছে পাওয়া ছিল আল্লাহর রাসূলের জীবনে অত্যন্ত আনন্দের একটা ঘটনা। জাফর ইবন আবি তালিব ছিলেন আবিসিনিয়ার মুহাজিরদের আমীর। রাসূলুল্লাহ আমর ইবন উমাইয়্যা আদ-দামরীকে নাজাশির কাছে পাঠান যেন তিনি মুহাজিরদের মদীনায় পাঠিয়ে দেন। নাজাশি সানন্দে দুটো জাহাজে করে সবাইকে মদীনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেন। এই দলের সাথে আরও একটি দল ছিল। সেটি হচ্ছে আশআরী গোত্র থেকে আগত ৫৩ থেকে ৫৯ জনের একটি দল। সেই দলে ছিলেন রাসূলুল্লাহর সাহাবি আবু মূসা আল-আশআরী। তারা যখন আল্লাহর রাসূলের কথা শুনলেন, তারা সিদ্ধান্ত নিলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে হিজরত করে চলে আসবেন। তারা জাহাজে উঠে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে তাদের জাহাজ মদীনায় না পৌঁছে আবিসিনিয়ার তীরে ভিড়ে। তখন তারা জাফর ইবন আবি তালিবের সন্ধান পেলেন এবং সেখানেই থাকতে শুরু করলেন।
জাফর ইবন আবি তালিবের নেতৃত্বে মুসলিমরা আবিসিনিয়ায় ছিলেন প্রায় দশ বছর। এই দশ বছরে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটে যায়। আল্লাহর রাসূলের হিজরত, ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন, বদর, উহুদ, খন্দক ইত্যাদি। এ কারণে মদীনার কেউ কেউ মনে করেন তারা বুঝি আবিসিনিয়ার মুসলিমদের থেকে এগিয়ে আছেন। এই প্রসঙ্গে মদীনার মুসলিম উমার ইবন খাত্তাব এবং আবিসিনিয়া ফেরত সাহাবিয়াত আসমা বিনত উমাইসের একটি কথোপকথন আছে, যা প্রথম খণ্ডে ভিন্ন প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছিল। ঘটনাটি আবার উল্লেখ করা হলো।
আসমা ছিলেন জাফর ইবন আবি তালিবের স্ত্রী। তিনি একদিন উমারের বাসায় হাফসার সাথে দেখা করতে আসলেন। আসমাকে দেখে উমার বললেন, 'ইনি কি সেই আবিসিনিয়া থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে আসা মহিলা?' হাফসা বললেন, 'হ্যাঁ, ইনিই সেই।' উমার তখন আসমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'আমরা আপনাদের আগে হিজরত করেছি তাই আমরা রাসূলুল্লাহর ওপর আপনাদের থেকে বেশি হকদার।'
এই কথায় আসমা কিছুটা রেগে গেলেন। পাল্টা জবাব দিয়ে বললেন, 'না, তা হতে পারে না, আপনারা আমাদের চাইতে রাসূলের বেশি ঘনিষ্ঠ নন। আপনারা তো আল্লাহর রাসূলের সাথে থাকতেন। তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাইয়ে দিতেন, মূর্খদের শিক্ষা দিতেন। আর আমরা ছিলাম বহুদূরে, অপ্রিয় এক রাজ্যে। আমি রাসূলুল্লাহর কাছে যাচ্ছি। আপনি যে কথা বললেন, সেটা তাঁকে বলবো। বাড়িয়ে-চড়িয়ে কিছুই বলব না, এরপর দেখি উনি কী বলেন।'
আসমার অভিযোগ শুনে রাসূলুল্লাহ জানতে চাইলেন, 'তুমি উত্তরে কী বলেছো?' আসমা তাঁর দেওয়া উত্তরটি রাসূলুল্লাহকে শোনালেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছো আসমা, আমার প্রতি উমার আর তার সঙ্গীদের হক তোমাদের চেয়ে বেশি তো নয়। তারা একটি হিজরতের পুরস্কার পাবে আর তোমরা পাবে দুটি হিজরতের পুরস্কার।'
এ কথা শুনে আসমার মন খুশিতে ভরে উঠলো! এতদিন তারা আল্লাহর রাসূলের থেকে দূরে ছিলেন, সেই শূন্যতার যে নিদারুণ কষ্ট তা যেন এই অসামান্য প্রাপ্তির জন্য নিমিষেই মিলিয়ে গেল। এই হাদীস ছিল আবিসিনিয়া ফেরত সাহাবিদের প্রিয় হাদীস। তারা ঘুরেফিরে বারবার এই হাদীসটা শুনতে চাইতেন। দল বেঁধে আসমার কাছে আসতেন এই কথাগুলো শুনতে, এই হাদীস শুনে তাদের মন ভরে যেতো। আসমার ভাষায়, 'গোটা দুনিয়ায় এ হাদীসের চাইতে প্রিয় তাদের আর কিছু ছিল না।'
একই সময়ে আরও দুটো দল আল্লাহর রাসূলের কাছে আসে। এর মধ্যে একটি হলো শাম অঞ্চলের আদ-দারিঈন থেকে আগত আল-লাখাম গোত্রের লোক। সেখানে ছিলেন তামিম আদ-দারী। তিনি দাজ্জালের একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আরেকটি দলের আগমন ঘটে ইয়েমেন থেকে, তারা ছিল ইয়েমেনের দাউস গোত্রের। এই দলে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা। সেখান থেকে প্রায় পঞ্চাশটি পরিবার মদীনায় হিজরত করে। মদীনায় এসে তারা জানতে পারেন আল্লাহর রাসূল খাইবারে অবস্থান করছেন। তারা আল্লাহর রাসূলের সাথে মিলিত হতে এত আগ্রহী ছিলেন যে তারা মদীনায় অপেক্ষা না করে খাইবারে চলে যান। সেখানে আল্লাহর রাসূলের দেখা পান।
খাইবার থেকে ফিরে আসার পথে একটি ছোট্ট শিক্ষণীয় ঘটনা আছে। খাইবার থেকে ফেরার পথে, আল্লাহর রাসূল বিলালকে বলেন তিনি যেন ফজরের সময় সবাইকে জাগিয়ে দেন। কিন্তু বিলাল ঘুম থেকে উঠতে না পারায় সবারই ফজরের সালাত ছুটে যায়। সূর্যের তাপে সবার ঘুম ভাঙে। তখন আল্লাহর রাসূল বলেন, 'তোমরা যদি কখনো সালাতের কথা ভুলে যাও, তাহলে যখনই সালাতের কথা মনে পড়বে, সাথে সাথে আদায় করবে।' এই বিষয়টা অনেকেই ভুল করে। অনেককে দেখা যায়, ফজরের সালাত ছুটে গেলে সাথে সাথে আদায় না করে যুহরের ওয়াক্তের জন্য জমা করে রাখছে। এটা ঠিক নয়। ঘুমের কারণে বা ভুলে গিয়ে কোনো সালাত অনিচ্ছাকৃতভাবে ছুটে গেলে মনে পড়ার সাথে সাথে সেটা আদায় করে নিতে হবে, ফেলে রাখা যাবে না।
'আমি জানি না আজ আমি কেন এত খুশি ... খাইবার বিজয় নাকি জাফর ইবন আবি তালিবের ফিরে আসা...'
আবিসিনিয়ার মুহাজিররা যখন মদীনায় ফিরে আসলেন, তখন এভাবেই আল্লাহর রাসূল নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন। জাফর ইবন আবি তালিব ছিলেন আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই। দীর্ঘদিন পরে তাকে ফিরে পেয়ে রাসূলুল্লাহ তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দেন। জাফর ইবন আবি তালিবকে কাছে পাওয়া ছিল আল্লাহর রাসূলের জীবনে অত্যন্ত আনন্দের একটা ঘটনা। জাফর ইবন আবি তালিব ছিলেন আবিসিনিয়ার মুহাজিরদের আমীর। রাসূলুল্লাহ আমর ইবন উমাইয়্যা আদ-দামরীকে নাজাশির কাছে পাঠান যেন তিনি মুহাজিরদের মদীনায় পাঠিয়ে দেন। নাজাশি সানন্দে দুটো জাহাজে করে সবাইকে মদীনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেন। এই দলের সাথে আরও একটি দল ছিল। সেটি হচ্ছে আশআরী গোত্র থেকে আগত ৫৩ থেকে ৫৯ জনের একটি দল। সেই দলে ছিলেন রাসূলুল্লাহর সাহাবি আবু মূসা আল-আশআরী। তারা যখন আল্লাহর রাসূলের কথা শুনলেন, তারা সিদ্ধান্ত নিলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে হিজরত করে চলে আসবেন। তারা জাহাজে উঠে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে তাদের জাহাজ মদীনায় না পৌঁছে আবিসিনিয়ার তীরে ভিড়ে। তখন তারা জাফর ইবন আবি তালিবের সন্ধান পেলেন এবং সেখানেই থাকতে শুরু করলেন।
জাফর ইবন আবি তালিবের নেতৃত্বে মুসলিমরা আবিসিনিয়ায় ছিলেন প্রায় দশ বছর। এই দশ বছরে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটে যায়। আল্লাহর রাসূলের হিজরত, ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন, বদর, উহুদ, খন্দক ইত্যাদি। এ কারণে মদীনার কেউ কেউ মনে করেন তারা বুঝি আবিসিনিয়ার মুসলিমদের থেকে এগিয়ে আছেন। এই প্রসঙ্গে মদীনার মুসলিম উমার ইবন খাত্তাব এবং আবিসিনিয়া ফেরত সাহাবিয়াত আসমা বিনত উমাইসের একটি কথোপকথন আছে, যা প্রথম খণ্ডে ভিন্ন প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছিল। ঘটনাটি আবার উল্লেখ করা হলো।
আসমা ছিলেন জাফর ইবন আবি তালিবের স্ত্রী। তিনি একদিন উমারের বাসায় হাফসার সাথে দেখা করতে আসলেন। আসমাকে দেখে উমার বললেন, 'ইনি কি সেই আবিসিনিয়া থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে আসা মহিলা?' হাফসা বললেন, 'হ্যাঁ, ইনিই সেই।' উমার তখন আসমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'আমরা আপনাদের আগে হিজরত করেছি তাই আমরা রাসূলুল্লাহর ওপর আপনাদের থেকে বেশি হকদার।'
এই কথায় আসমা কিছুটা রেগে গেলেন। পাল্টা জবাব দিয়ে বললেন, 'না, তা হতে পারে না, আপনারা আমাদের চাইতে রাসূলের বেশি ঘনিষ্ঠ নন। আপনারা তো আল্লাহর রাসূলের সাথে থাকতেন। তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাইয়ে দিতেন, মূর্খদের শিক্ষা দিতেন। আর আমরা ছিলাম বহুদূরে, অপ্রিয় এক রাজ্যে। আমি রাসূলুল্লাহর কাছে যাচ্ছি। আপনি যে কথা বললেন, সেটা তাঁকে বলবো। বাড়িয়ে-চড়িয়ে কিছুই বলব না, এরপর দেখি উনি কী বলেন।'
আসমার অভিযোগ শুনে রাসূলুল্লাহ জানতে চাইলেন, 'তুমি উত্তরে কী বলেছো?' আসমা তাঁর দেওয়া উত্তরটি রাসূলুল্লাহকে শোনালেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছো আসমা, আমার প্রতি উমার আর তার সঙ্গীদের হক তোমাদের চেয়ে বেশি তো নয়। তারা একটি হিজরতের পুরস্কার পাবে আর তোমরা পাবে দুটি হিজরতের পুরস্কার।'
এ কথা শুনে আসমার মন খুশিতে ভরে উঠলো! এতদিন তারা আল্লাহর রাসূলের থেকে দূরে ছিলেন, সেই শূন্যতার যে নিদারুণ কষ্ট তা যেন এই অসামান্য প্রাপ্তির জন্য নিমিষেই মিলিয়ে গেল। এই হাদীস ছিল আবিসিনিয়া ফেরত সাহাবিদের প্রিয় হাদীস। তারা ঘুরেফিরে বারবার এই হাদীসটা শুনতে চাইতেন। দল বেঁধে আসমার কাছে আসতেন এই কথাগুলো শুনতে, এই হাদীস শুনে তাদের মন ভরে যেতো। আসমার ভাষায়, 'গোটা দুনিয়ায় এ হাদীসের চাইতে প্রিয় তাদের আর কিছু ছিল না।'
একই সময়ে আরও দুটো দল আল্লাহর রাসূলের কাছে আসে। এর মধ্যে একটি হলো শাম অঞ্চলের আদ-দারিঈন থেকে আগত আল-লাখাম গোত্রের লোক। সেখানে ছিলেন তামিম আদ-দারী। তিনি দাজ্জালের একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আরেকটি দলের আগমন ঘটে ইয়েমেন থেকে, তারা ছিল ইয়েমেনের দাউস গোত্রের। এই দলে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা। সেখান থেকে প্রায় পঞ্চাশটি পরিবার মদীনায় হিজরত করে। মদীনায় এসে তারা জানতে পারেন আল্লাহর রাসূল খাইবারে অবস্থান করছেন। তারা আল্লাহর রাসূলের সাথে মিলিত হতে এত আগ্রহী ছিলেন যে তারা মদীনায় অপেক্ষা না করে খাইবারে চলে যান। সেখানে আল্লাহর রাসূলের দেখা পান।
খাইবার থেকে ফিরে আসার পথে একটি ছোট্ট শিক্ষণীয় ঘটনা আছে। খাইবার থেকে ফেরার পথে, আল্লাহর রাসূল বিলালকে বলেন তিনি যেন ফজরের সময় সবাইকে জাগিয়ে দেন। কিন্তু বিলাল ঘুম থেকে উঠতে না পারায় সবারই ফজরের সালাত ছুটে যায়। সূর্যের তাপে সবার ঘুম ভাঙে। তখন আল্লাহর রাসূল বলেন, 'তোমরা যদি কখনো সালাতের কথা ভুলে যাও, তাহলে যখনই সালাতের কথা মনে পড়বে, সাথে সাথে আদায় করবে।' এই বিষয়টা অনেকেই ভুল করে। অনেককে দেখা যায়, ফজরের সালাত ছুটে গেলে সাথে সাথে আদায় না করে যুহরের ওয়াক্তের জন্য জমা করে রাখছে। এটা ঠিক নয়। ঘুমের কারণে বা ভুলে গিয়ে কোনো সালাত অনিচ্ছাকৃতভাবে ছুটে গেলে মনে পড়ার সাথে সাথে সেটা আদায় করে নিতে হবে, ফেলে রাখা যাবে না।
📄 আল-হাজ্জাজ ইবন ইলাত আস-সালামির ؓ ঘটনা
আল-হাজ্জাজ ছিলেন বনু সুলাইম গোত্রের ধনী ব্যবসায়ী। মক্কায় তার অনেক সম্পত্তি ছিল। তার স্ত্রীও থাকতেন মক্কায়। তিনি মুসলিম হয়ে গেছেন এই খবর শুনলে কুরাইশরা তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে, এই আশঙ্কায় তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে গিয়ে বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আমার পরিবার আর সম্পদ মক্কায় ফেলে এসেছি। আমি এসব ফিরে পেতে চাই। এগুলো উদ্ধার করার জন্য কি আমি আপনার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি?' আল্লাহর রাসূল তাকে অনুমতি দিলেন। আল-হাজ্জাজের পরিকল্পনা ছিল কুরাইশদের কাছে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলে তাদের আস্থাভাজন হয়ে তাদের কাছ থেকে তার সম্পদ নিয়ে মদীনায় চলে আসা。
আল-হাজ্জাজ মক্কায় গিয়ে গুজব ছড়ালেন মুসলিমরা খাইবারে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। খাইবারের ইহুদিদের পরাজয়ের খবর তখনো কুরাইশদের কানে পৌঁছায়নি। আল-হাজ্জাজের এই গুজব দাবানলের মতো মক্কায় ছড়িয়ে পড়লো। কুরাইশরা খুশিতে আটখানা হয়ে গেল। আল-হাজ্জাজ সেই সুযোগে বললেন, 'আমি এসেছি আমার সম্পদ নিয়ে যেতে।' কুরাইশরা খুশি মনে তার সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দিলো। আল-হাজ্জাজ যে তাদের এভাবে বোকা বানাবে সেটা তারা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি।
এদিকে মক্কার মুসলিমদের যেন শোকের কালো ছায়া গ্রাস করলো। কষ্টে-দুঃখে তারা একেবারে ভেঙে পড়লেন। আল-আব্বাস এই গুজব শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও পাচ্ছিলেন না। তিনি আল-হাজ্জাজের কাছে তার দাসকে পাঠালেন। আল-হাজ্জাজ সেই দাসকে বললেন, 'আব্বাসকে বলবে সে যেন আমার সাথে গোপনে দেখা করে।' আব্বাস এই কথা শুনে সাথে সাথে বুঝে ফেললেন এই খবর আসলে একটা গুজব। খুশির চোটে তিনি তার সেই দাসটিকে আযাদ-ই করে দিলেন。
আল-হাজ্জাজ এরপর আল-আব্বাসের সাথে সরাসরি দেখা করলেন। বললেন, 'শোনো, তুমি যেটা শুনেছো, সেটা সত্য নয়। আসল খবর হচ্ছে, মুহাম্মাদ ইহুদিদের পরাজিত করেছেন। তাদের জায়গা দখল করেছেন এবং তাদের গনিমত বণ্টন করেছেন। আর তাদের রাজার মেয়েকে মুহাম্মাদ বিয়ে করে নিয়েছেন। আমি গুজব ছড়িয়েছি যেন আমি আমার সম্পদ উদ্ধার করে নিতে পারি। আমি মুসলিম হয়েছি জানলে কুরাইশরা আমার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রেখে দিতে পারে। আব্বাস, তুমি আমাকে তিন দিন সময় দাও। এই কথাগুলো তুমি তিন দিনের জন্য গোপন রাখবে, এরপর যা খুশি তা করো।'
তিন দিন পর আব্বাস গেলেন আল-হাজ্জাজের স্ত্রীর কাছে। আল-হাজ্জাজ ততক্ষণে চলে গেছেন। আল-হাজ্জাজ তার স্ত্রীকেও জানাননি তার আসল উদ্দেশ্য কী ছিল। আল-হাজ্জাজের স্ত্রী তাই আব্বাসকে মুসলিমদের পরাজয়ের ব্যাপারে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। আব্বাস তখন আসল কথা জানালেন, বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, সেই ঘটনাই ঘটেছে যা আমরা শুনতে ভালোবাসি! আল্লাহ নবীজিকে খাইবারের বিজয়ের বরকত দিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল সাফিয়াকে নিজের জন্য বেছে নিয়েছেন। তুমি যদি তোমার স্বামীকে চাও, তাহলে তুমি বরং তার সাথে যোগ দাও।' আল-হাজ্জাজের স্ত্রী তখন স্বামীর কাছে চলে গেলেন。
এরপর আল-আব্বাস ভালো পোশাক পরে কুরাইশদের আড্ডাখানায় গেলেন। আব্বাসের কুনিয়া নাম ছিল আবুল ফাদল। কুরাইশরা তাকে দেখে বললো, 'তোমার কল্যাণ হোক আবুল ফাদল!' আব্বাস উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ, আমার উপর কল্যাণ বর্ষিত হয়েছে। হাজ্জাজ আমাকে জানিয়েছে আল্লাহ মুহাম্মাদকে খাইবারের বিজয় দিয়েছেন। মুসলিমরা খাইবার জয় করেছে আর আল্লাহর রাসূল সাফিয়াকে বিয়ে করেছেন। সে আমাকে বলেছে এই খবর যেন আমি তিন দিন গোপন রাখি। কারণ সে এসেছে কেবল তার সম্পদ ফিরিয়ে নিতে এবং সেটা সে করে চলে গেছে।'
মক্কার আবহাওয়া মুহূর্তের মাঝে একশো আশি ডিগ্রী মোড় নিল। মুসলিমদের তিনদিনের কষ্ট উবে গিয়ে উচ্ছ্বাসের জোয়ার বয়ে গেল! আর কুরাইশদের ছেঁকে ধরলো হতাশা আর গ্লানি।
শিক্ষা
মক্কার মুসলিমরা মক্কায় থাকতেন ঠিকই, কিন্তু তারা নিজেদের মুসলিমদের মূলধারার অংশ হিসেবে দেখতেন এবং তারা বিশ্বস্ত ছিলেন মদীনার প্রতি। তারা নিজেদেরকে “মক্কার নাগরিক” হিসেবে নয়, বরং একজন মুসলিম হিসেবে দেখতেন। তারা নিজের দেশের স্বার্থ দেখতেন না, তারা দেখতেন মুসলিমদের স্বার্থ। মদীনার মুসলিমদের কষ্টে তারা কষ্ট পেতেন, তাদের আনন্দে খুশি হতেন। তারা মক্কার অধিবাসী ছিলেন সত্য, কিন্তু মক্কার কুরাইশদের প্রতি তাদের কোনো সমর্থন ছিল না। তাদের অন্তর ছিল আল্লাহর রাসূল আর মুসলিমদের সাথে একাত্ম। কুরাইশদের চাপ থাকা সত্ত্বেও তারা মদীনাকে সমর্থন করে গেছেন। তারা আত্মপরিচয় সংকটে ভোগেননি, যেমনটা আজ কিছু পশ্চিমা মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। মক্কার মুসলিমদের উপর অনেক জুলুম-নির্যাতন হয়েছিল। কিন্তু সবার কথা ভেবে তারা সেসব সয়ে নিয়েছেন, সেজন্য তারা জিহাদের বিরোধিতা করেননি, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এর বিপরীতটা দেখা যায়।
টিকাঃ
৯২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮০।
আল-হাজ্জাজ ছিলেন বনু সুলাইম গোত্রের ধনী ব্যবসায়ী। মক্কায় তার অনেক সম্পত্তি ছিল। তার স্ত্রীও থাকতেন মক্কায়। তিনি মুসলিম হয়ে গেছেন এই খবর শুনলে কুরাইশরা তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে, এই আশঙ্কায় তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে গিয়ে বললেন, 'আল্লাহর রাসূল, আমার পরিবার আর সম্পদ মক্কায় ফেলে এসেছি। আমি এসব ফিরে পেতে চাই। এগুলো উদ্ধার করার জন্য কি আমি আপনার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি?' আল্লাহর রাসূল তাকে অনুমতি দিলেন। আল-হাজ্জাজের পরিকল্পনা ছিল কুরাইশদের কাছে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলে তাদের আস্থাভাজন হয়ে তাদের কাছ থেকে তার সম্পদ নিয়ে মদীনায় চলে আসা。
আল-হাজ্জাজ মক্কায় গিয়ে গুজব ছড়ালেন মুসলিমরা খাইবারে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। খাইবারের ইহুদিদের পরাজয়ের খবর তখনো কুরাইশদের কানে পৌঁছায়নি। আল-হাজ্জাজের এই গুজব দাবানলের মতো মক্কায় ছড়িয়ে পড়লো। কুরাইশরা খুশিতে আটখানা হয়ে গেল। আল-হাজ্জাজ সেই সুযোগে বললেন, 'আমি এসেছি আমার সম্পদ নিয়ে যেতে।' কুরাইশরা খুশি মনে তার সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দিলো। আল-হাজ্জাজ যে তাদের এভাবে বোকা বানাবে সেটা তারা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি।
এদিকে মক্কার মুসলিমদের যেন শোকের কালো ছায়া গ্রাস করলো। কষ্টে-দুঃখে তারা একেবারে ভেঙে পড়লেন। আল-আব্বাস এই গুজব শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও পাচ্ছিলেন না। তিনি আল-হাজ্জাজের কাছে তার দাসকে পাঠালেন। আল-হাজ্জাজ সেই দাসকে বললেন, 'আব্বাসকে বলবে সে যেন আমার সাথে গোপনে দেখা করে।' আব্বাস এই কথা শুনে সাথে সাথে বুঝে ফেললেন এই খবর আসলে একটা গুজব। খুশির চোটে তিনি তার সেই দাসটিকে আযাদ-ই করে দিলেন。
আল-হাজ্জাজ এরপর আল-আব্বাসের সাথে সরাসরি দেখা করলেন। বললেন, 'শোনো, তুমি যেটা শুনেছো, সেটা সত্য নয়। আসল খবর হচ্ছে, মুহাম্মাদ ইহুদিদের পরাজিত করেছেন। তাদের জায়গা দখল করেছেন এবং তাদের গনিমত বণ্টন করেছেন। আর তাদের রাজার মেয়েকে মুহাম্মাদ বিয়ে করে নিয়েছেন। আমি গুজব ছড়িয়েছি যেন আমি আমার সম্পদ উদ্ধার করে নিতে পারি। আমি মুসলিম হয়েছি জানলে কুরাইশরা আমার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রেখে দিতে পারে। আব্বাস, তুমি আমাকে তিন দিন সময় দাও। এই কথাগুলো তুমি তিন দিনের জন্য গোপন রাখবে, এরপর যা খুশি তা করো।'
তিন দিন পর আব্বাস গেলেন আল-হাজ্জাজের স্ত্রীর কাছে। আল-হাজ্জাজ ততক্ষণে চলে গেছেন। আল-হাজ্জাজ তার স্ত্রীকেও জানাননি তার আসল উদ্দেশ্য কী ছিল। আল-হাজ্জাজের স্ত্রী তাই আব্বাসকে মুসলিমদের পরাজয়ের ব্যাপারে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। আব্বাস তখন আসল কথা জানালেন, বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, সেই ঘটনাই ঘটেছে যা আমরা শুনতে ভালোবাসি! আল্লাহ নবীজিকে খাইবারের বিজয়ের বরকত দিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল সাফিয়াকে নিজের জন্য বেছে নিয়েছেন। তুমি যদি তোমার স্বামীকে চাও, তাহলে তুমি বরং তার সাথে যোগ দাও।' আল-হাজ্জাজের স্ত্রী তখন স্বামীর কাছে চলে গেলেন。
এরপর আল-আব্বাস ভালো পোশাক পরে কুরাইশদের আড্ডাখানায় গেলেন। আব্বাসের কুনিয়া নাম ছিল আবুল ফাদল। কুরাইশরা তাকে দেখে বললো, 'তোমার কল্যাণ হোক আবুল ফাদল!' আব্বাস উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ, আমার উপর কল্যাণ বর্ষিত হয়েছে। হাজ্জাজ আমাকে জানিয়েছে আল্লাহ মুহাম্মাদকে খাইবারের বিজয় দিয়েছেন। মুসলিমরা খাইবার জয় করেছে আর আল্লাহর রাসূল সাফিয়াকে বিয়ে করেছেন। সে আমাকে বলেছে এই খবর যেন আমি তিন দিন গোপন রাখি। কারণ সে এসেছে কেবল তার সম্পদ ফিরিয়ে নিতে এবং সেটা সে করে চলে গেছে।'
মক্কার আবহাওয়া মুহূর্তের মাঝে একশো আশি ডিগ্রী মোড় নিল। মুসলিমদের তিনদিনের কষ্ট উবে গিয়ে উচ্ছ্বাসের জোয়ার বয়ে গেল! আর কুরাইশদের ছেঁকে ধরলো হতাশা আর গ্লানি।
শিক্ষা
মক্কার মুসলিমরা মক্কায় থাকতেন ঠিকই, কিন্তু তারা নিজেদের মুসলিমদের মূলধারার অংশ হিসেবে দেখতেন এবং তারা বিশ্বস্ত ছিলেন মদীনার প্রতি। তারা নিজেদেরকে “মক্কার নাগরিক” হিসেবে নয়, বরং একজন মুসলিম হিসেবে দেখতেন। তারা নিজের দেশের স্বার্থ দেখতেন না, তারা দেখতেন মুসলিমদের স্বার্থ। মদীনার মুসলিমদের কষ্টে তারা কষ্ট পেতেন, তাদের আনন্দে খুশি হতেন। তারা মক্কার অধিবাসী ছিলেন সত্য, কিন্তু মক্কার কুরাইশদের প্রতি তাদের কোনো সমর্থন ছিল না। তাদের অন্তর ছিল আল্লাহর রাসূল আর মুসলিমদের সাথে একাত্ম। কুরাইশদের চাপ থাকা সত্ত্বেও তারা মদীনাকে সমর্থন করে গেছেন। তারা আত্মপরিচয় সংকটে ভোগেননি, যেমনটা আজ কিছু পশ্চিমা মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। মক্কার মুসলিমদের উপর অনেক জুলুম-নির্যাতন হয়েছিল। কিন্তু সবার কথা ভেবে তারা সেসব সয়ে নিয়েছেন, সেজন্য তারা জিহাদের বিরোধিতা করেননি, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এর বিপরীতটা দেখা যায়।
টিকাঃ
৯২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮০।
📄 খাইবার পরবর্তী সামরিক অভিযান
১) বনু ফাজারার বিরুদ্ধে সারিয়া
এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন আবু বকর আস-সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু। মুসলিমদের আক্রমণের মুখে তারা তাদের নারী-শিশু সহ পাহাড়ের দিকে পালাতে থাকে। তাদের পিছু নেন সালামাহ ইবন আল-আকওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু, তিনি তাদের পালাবার পথে এমনভাবে তীর ছুঁড়তে থাকেন যে তারা থামতে বাধ্য হয়। এরপর তিনি তাদের বন্দী করে আবু বকরের কাছে নিয়ে আসেন। বন্দীদের মধ্যে একজন নারীকে সালামাহর খুব পছন্দ হয়ে যায়। তিনি তাকে দাসী হিসেবে রাখতে চাইলেন। আবু বকর সেই সুন্দরী নারীকে দাসী হিসেবে সালামাহকে দিয়ে দিলেন। কিন্তু এরপর আল্লাহর রাসূল সালামাহকে বলেন যেন তিনি এই নারীকে ফিরিয়ে দেন। সালামাহ কিছুটা অনিচ্ছার সাথে সেই নারীকে আল্লাহর রাসূলের হাতে ফিরিয়ে দেন। আল্লাহর রাসূল তখন সেই নারীকে কুরাইশদের কাছে পাঠিয়ে দেন যেন তার বিনিময়ে কুরাইশদের হাত থেকে কিছু বন্দী মুসলিমদের ছাড়িয়ে আনা যায়।
এই সারিয়া থেকে শিক্ষা হলো মুসলিম বন্দীদের মুক্ত করার গুরুত্ব। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'বন্দীকে মুক্ত করো।' মুসলিম বন্দীদের কাফিরদের হাত থেকে মুক্ত করা একটি ওয়াজিব দায়িত্ব। এই ঘটনায় আমরা দেখি একজন নারীকে একজন সাহাবির পছন্দ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর রাসূল তাকে ফিরিয়ে নিয়ে কুরাইশদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন যেন তার বিনিময়ে কিছু মুসলিমদের ছাড়িয়ে আনা যায়。
২) গালিব ইবন আবদুল্লাহর সারিয়া
ত্রিশ জন মুসলিমকে পাঠানো হয় বনু মুলাউয়ি গোত্রের বিরুদ্ধে। এরা ছিল গাতফানের একটি গোত্র। অভিযান করতে গিয়ে তারা শত্রুদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পড়েন এবং তাদের প্রায় সবাই শহীদ হয়ে যান। অভিযানের নেতা বাশির ইবন সাদ আহত হন, জান নিয়ে কোনোরকমে মদীনায় ফেরত আসেন। এই আক্রমণের জবাব দিতে আল্লাহর রাসূল আরেকটি সারিয়া প্রেরণ করেন। এই সারিয়ার কমান্ডার ছিলেন গালিব ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। যাত্রাপথে বনু মুলাউয়ির এক লোককে গুপ্তচর মনে করে গ্রেপ্তার করেন। লোকটির নাম হারিস ইবন মালিক। সে বললো, 'আমাকে তোমরা কেন গ্রেপ্তার করলে? আমি তো মুসলিম হতে এসেছি।' গালিব তাকে বললেন, 'তুমি যদি সত্য বলে থাকো, তাহলে একদিন একরাত বন্দী হয়ে থাকলে এমন কিছু যায় আসে না।' গালিব তাকে একদিনের জন্য বন্দী রাখতে চাচ্ছিলেন কারণ সে যদি গুপ্তচর হয়ে থাকে তাহলে সে শত্রুদের কাছে মুসলিম বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য ফাঁস করে দিতে পারে। সমস্যা হচ্ছে লোকটি দাবি করেছে সে মুসলিম হতে চেয়েছে আর একজন মুসলিমকে বন্দী করে রাখা যায় না। কিন্তু এখানে পরিস্থিতি এমন ছিল যে তাকে একদিনের জন্য বন্দী না রাখলে পুরো বাহিনীই বিপদের মুখে পড়তে পারে।
যা-ই হোক, শত্রুপক্ষের উপর নজরদারি করার জন্য জুনদুব ইবন মাকিস একটা পাহাড়ে ওঠেন। পাহাড়ে উঠে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লেন যেন শত্রুরা তাকে দেখতে না পায়। কিন্তু তবুও কীভাবে কীভাবে যেন শত্রুপক্ষের একজন তাকে দেখে ফেলে, তাকে লক্ষ্য করে একটা তীর ছুঁড়ে মারে। সেই তীর এসে জুনদুবের শরীরে বিদ্ধ হয়। প্রচণ্ড ব্যথায় তার শরীর যেন বিষিয়ে উঠলো। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ার উপর পুরো বাহিনীর নিরাপত্তা নির্ভর করছে। টু শব্দটি করলেও মুসলিমদের অবস্থান শত্রুদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। সমস্ত প্রস্তুতি আর পরিকল্পনা মাঠে মারা যাবে।
জুনদুব সেই ভয়ঙ্কর ব্যথা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নিলেন। শত্রুরা যেন তার উপস্থিতি টের না পায়, তার জন্য যেন মুসলিমদের অভিযান ভণ্ডুল না হয়ে যায়। এরপর আস্তে করে তীরটি খুলে ফেলেন। এই কঠিন মুহূর্তে কীভাবে একটা মানুষ এতটা সবর করতে পারে? যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, তবু জুনদুব নিজের শরীরকে স্থির ধরে রেখেছেন। এই অধ্যবসায়, এই ধৈর্য কোথা থেকে এল? এটা ছিল তাদের ঈমানের ফল। আল্লাহর ওপর তাদের বিশ্বাস কতটা জোরালো ছিল আর জিহাদের ব্যাপারে তারা কতটা নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন -- এই ঘটনা তার একটি চমৎকার উদাহরণ।
এরপর আরও একটি তীর জুনদুবের গায়ে বিঁধে। এবারো তিনি নড়াচড়া না করে তীরটি আস্তে করে খুলে ফেলেন। কোনোকিছুর নড়াচড়া না দেখে সেই তীর নিক্ষেপকারী লোকটি চলে যায়। সে ভাবলো কেউ বুঝি নেই। পরবর্তীতে মুসলিম বাহিনী শত্রুপক্ষের উপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে কিছু লোককে হত্যা করে তাদের উট এবং অন্য সম্পদ দখল করে নেন। শত্রুরাও তাদের বিরাট বাহিনী নিয়ে মুসলিমদের ধাওয়া করা শুরু করে। এই পর্যায়ে তাদের মোকাবেলা করার মতো অবস্থা মুসলিম বাহিনীর ছিল না। তারা পিছু হটতে থাকেন। তখন আল্লাহ তাআলা সেই স্থানে বৃষ্টিবর্ষণ করে প্লাবন ঘটান যার মাধ্যমে মুসলিম বাহিনী নিরাপদে ফিরে আসে।
গালিব ইবন আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন আরেকটি সারিয়া ছিল বনু আউয়াল এবং বনু আবদ ইবন সালাবার উদ্দেশ্যে। এই অভিযানে উসামা ইবন যাইদের একটি বিখ্যাত ঘটনা আছে। তিনি এই অভিযানে এক লোককে গ্রেপ্তার করেন। সে তখন বলে উঠে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।' কিন্তু উসামা তাকে হত্যা করে ফেলেন। তার যুক্তি ছিল নিশ্চয়ই লোকটা জান বাঁচানোর জন্য কালিমা পড়েছে। আল্লাহর রাসূল এই ঘটনা শুনে প্রচণ্ড অসন্তোষ প্রকাশ করেন। উসামাকে বললেন, 'তুমি কি লোকটার বুক চিরে দেখেছো সে সত্যি বলছে না মিথ্যা? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছো?'
এই ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, বাহ্যিক অবস্থার উপর একজন মানুষকে বিচার করতে হবে। এই কারণে রাসূলুল্লাহ বলছিলেন, তুমি কি তার বুক চিরে দেখেছো যে সত্যি বলছে নাকি মিথ্যা? একজন মানুষ যদি নিজেকে মুসলিম দাবি করে, তখন তাকে ঈমানদার ধরতে হবে, নিছক সন্দেহের কারণে তাকে কাফির ভাবা যাবে না। তবে ঈমান আনার দাবি করার পরেও যদি তার কাছ থেকে স্পষ্ট কুফরি প্রকাশ পায়, সেক্ষেত্রে প্রকাশ্য কুফরির দিকটাই নিতে হবে। অন্তর ফেঁড়ে দেখা আমাদের দায়িত্ব নয়।
দ্বিতীয় শিক্ষা হলো মুসলিম রক্তের পবিত্রতা। বিনা কারণে একজন মুসলিমকে হত্যা করা ভয়াবহ একটি পাপ। আল্লাহর রাসূলের প্রতিক্রিয়া দেখেই বোঝা যায় এটা মারাত্মক পর্যায়ের গুনাহ। একজন মুসলিমের রক্ত পবিত্র, এবং হাদীসে এসেছে কাবাঘর থেকেও মুসলিমদের রক্ত দামি।
৩) আবু হাদরাদের সারিয়াহ
আবু হাদরাদ দুইশো দিরহাম মোহরের বিনিময়ে এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন কিন্তু মোহর আদায় করার সামর্থ্য তার ছিল না। তখন তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে আসলেন। এত মোটা অংকের মোহর রাসূলুল্লাহর পছন্দ হলো না। তিনি বললেন, 'সুবহানআল্লাহ! টাকা যদি স্রোতের মতো ভেসে আসতো তবুও তো এত মোহর ধরা ঠিক হতো না। তোমাকে সাহায্য করার মতো কিছুই আমার কাছে নেই।'
যাই হোক, রাসূলুল্লাহ আবু হাদরাদ সহ আরও দুজনকে পাঠালেন কায়েস নামের এক লোককে শায়েস্তা করার জন্য। সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য লোক সংগ্রহ করছিল। এই অভিযানে দেওয়ার মতো রাসূলুল্লাহর হাতে ছিল একটি দুবলা পাতলা উট। সেই উটকে সম্বল করে তারা তিনজন বের হলেন। তারা সেই লোককে হত্যা করতে সমর্থ হন। এরপর আল্লাহর রাসূল আবু হাদরাদকে তেরোটি উট দেন। এই উট দিয়ে তিনি মোহর পরিশোধ করেন।
৪) আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার সারিয়াহ
ইয়াসির ইবন রাজাম নামের এক ইহুদি গাতফানের লোকদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য এক করার চেষ্টা করছিল। তার কাছে ত্রিশ সৈনিক সহ আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে পাঠানো হয়। তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয় যে, তাকে খাইবারের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করা হবে। তখন ইয়াসির তার ত্রিশ সঙ্গীসহ মদীনায় যেতে রাজি হয়। কিন্তু পথিমধ্যে সে তার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আফসোস করতে থাকে। তখন সে আবদুল্লাহ ইবন উনাইসকে হত্যা করার চেষ্টা করে। আবদুল্লাহ ইবন উনাইস আহত হন কিন্তু নিজেকে সামলে নেন। দুই দলের মধ্যে মারামারি শুরু হয় এবং ইহুদিদের একজন ছাড়া সবাই মারা পড়ে।
৫) বাতনু ইদামের সারিয়াহ
এই অভিযান প্রেরিত হয়েছিল ইদামে, নেতৃত্বে ছিলেন আবু হাদরাদ অথবা আবু কাতাদা। এই অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অভিযানে অংশ নেওয়া মুহাল্লিম ইবন জাসসামার কাহিনী। অভিযান চলাকালীন সময়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আমর ইবন ইদবাত আশযায়ী। তিনি ছিলেন একজন মুসলিম। মুসলিম হিসেবে তিনি সেই বাহিনীকে সালাম দেন। বলেন, 'আসসালামু আলাইকুম।' সেই সুযোগে মুহাল্লিম ইবন জাসসামা তাকে সেখানেই খুন করে ফেলে। জাহিলিয়াতের সময় মুহাল্লিমের সাথে সেই লোকের কোনোকিছু নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। তার জের ধরে মুহাল্লিম তাকে মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও হত্যা করে।
এই ঘটনার পরে হুনাইনের সময়ে গাতফানের নেতা উয়াইনা ইবন হিসন রাসূলুল্লাহর কাছে এসে এই হত্যার প্রতিশোধস্বরূপ রক্তের বদলে রক্ত দাবি করলো। আর মুহাল্লিমের পক্ষের লোকেরা রক্তপণ দিতে অস্বীকার করলো। ফিতনা এড়ানোর জন্য আল্লাহর রাসূল তাদেরকে রক্তপণ হিসেবে একশোটি উট দিতে চাইলেন। উয়াইনা তখন বললো, 'আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি তাকে ছাড়বো না, যতক্ষণ না তার পরিবার সেই কষ্ট পাবে, যে কষ্ট আমার পরিবার পেয়েছে।' রাসূলুল্লাহ দ্বিতীয়বারের মতো রক্তপণ নিতে প্রস্তাব করলেন। শেষপর্যন্ত তারা রাজি হলো এবং রক্তপণ গ্রহণ করলো।
মুহাল্লিমের লোকেরা মুহাল্লিমকে বললো, 'তুমি রাসূলুল্লাহর কাছে যাও এবং তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলো। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও।' লম্বা সুঠামদেহী মুহাল্লিম আল্লাহর রাসূলের কাছে আসলো। পরনে ছিল মৃত্যুর পোশাক। বললো, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুহাল্লিম, আল্লাহর কাছে আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'হে আল্লাহ! আপনি মুহাল্লিমকে ক্ষমা করবেন না।' মুহাল্লিম চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল।
এই ঘটনার পর মুহাল্লিম আর এক মাস বেঁচে ছিল। তাকে দাফন করা হয়, কিন্তু কবরের মাটি তাকে গ্রহণ করেনি। তাকে ছুঁড়ে ফেলে, বারবার। এরপর তার লাশ দুই পাহাড়ের মাঝে পাথরচাপা দিয়ে দাফন করা হয়। এই ঘটনা শুনে আল্লাহর রাসূল মন্তব্য করেন, 'আল্লাহর কসম! মুহাল্লিমের চাইতে নিকৃষ্ট লোককেও মাটি গ্রহণ করে নেয়। কিন্তু আল্লাহ এই ঘটনার মাধ্যমে তোমাদের পারস্পরিক জানমালের নিষিদ্ধতার ব্যাপারে সতর্ক করতে চেয়েছেন।' মুসলিমের রক্তের পবিত্রতার বিষয়ে এই ঘটনা আরেকটি শিক্ষা।
৬) আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা আস-সাহমীর সারিয়ার কাহিনী
এই সারিয়াহর নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা। অভিযান চলাকালীন সময়ে তার অধীনস্থ সৈনিকরা এমন কিছু একটা করে বসে যে কারণে তিনি খুব রেগে যান। রেগে গিয়ে তাদের বলেন, 'তোমরা আগুনে ঝাঁপ দাও।' সৈনিকরা উত্তর দিল, 'এই আগুন থেকে রক্ষা পেতেই তো আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি!' তখন আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা বললেন, 'আমি হচ্ছি আমীর এবং আমীরকে মান্য করা ওয়াজিব!' সৈনিকরা তবুও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। পরে তার রাগ পড়ে গেল, আগুনও নিভে গেল। তারা ফিরে এলেন। এ ঘটনা শুনে রাসূলুল্লাহ মন্তব্য করলেন, 'যদি তারা তাদের আমীরের কথামতো আগুনে ঝাঁপ দিতো, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত সেই আগুনেই থেকে যেত। আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো আনুগত্য চলে না। আনুগত্য কেবল ভালো কাজে।'
টিকাঃ
৯৩. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৫৪।
৯৪. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ঈমান, হাদীস ১৮৩।
৯৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৮।
৯৬. ইবন মাজাহ, অধ্যায় রক্তপণ, হাদীস ২৭২৬ (আরবি রেফারেন্স)।
৯৭. সুনান আবু দাউদ, অধ্যায় রক্তপণ, হাদীস ৪৫০৩ (আরবি রেফারেন্স)।
৯৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৭।
১) বনু ফাজারার বিরুদ্ধে সারিয়া
এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন আবু বকর আস-সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু। মুসলিমদের আক্রমণের মুখে তারা তাদের নারী-শিশু সহ পাহাড়ের দিকে পালাতে থাকে। তাদের পিছু নেন সালামাহ ইবন আল-আকওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু, তিনি তাদের পালাবার পথে এমনভাবে তীর ছুঁড়তে থাকেন যে তারা থামতে বাধ্য হয়। এরপর তিনি তাদের বন্দী করে আবু বকরের কাছে নিয়ে আসেন। বন্দীদের মধ্যে একজন নারীকে সালামাহর খুব পছন্দ হয়ে যায়। তিনি তাকে দাসী হিসেবে রাখতে চাইলেন। আবু বকর সেই সুন্দরী নারীকে দাসী হিসেবে সালামাহকে দিয়ে দিলেন। কিন্তু এরপর আল্লাহর রাসূল সালামাহকে বলেন যেন তিনি এই নারীকে ফিরিয়ে দেন। সালামাহ কিছুটা অনিচ্ছার সাথে সেই নারীকে আল্লাহর রাসূলের হাতে ফিরিয়ে দেন। আল্লাহর রাসূল তখন সেই নারীকে কুরাইশদের কাছে পাঠিয়ে দেন যেন তার বিনিময়ে কুরাইশদের হাত থেকে কিছু বন্দী মুসলিমদের ছাড়িয়ে আনা যায়।
এই সারিয়া থেকে শিক্ষা হলো মুসলিম বন্দীদের মুক্ত করার গুরুত্ব। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'বন্দীকে মুক্ত করো।' মুসলিম বন্দীদের কাফিরদের হাত থেকে মুক্ত করা একটি ওয়াজিব দায়িত্ব। এই ঘটনায় আমরা দেখি একজন নারীকে একজন সাহাবির পছন্দ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর রাসূল তাকে ফিরিয়ে নিয়ে কুরাইশদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন যেন তার বিনিময়ে কিছু মুসলিমদের ছাড়িয়ে আনা যায়。
২) গালিব ইবন আবদুল্লাহর সারিয়া
ত্রিশ জন মুসলিমকে পাঠানো হয় বনু মুলাউয়ি গোত্রের বিরুদ্ধে। এরা ছিল গাতফানের একটি গোত্র। অভিযান করতে গিয়ে তারা শত্রুদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পড়েন এবং তাদের প্রায় সবাই শহীদ হয়ে যান। অভিযানের নেতা বাশির ইবন সাদ আহত হন, জান নিয়ে কোনোরকমে মদীনায় ফেরত আসেন। এই আক্রমণের জবাব দিতে আল্লাহর রাসূল আরেকটি সারিয়া প্রেরণ করেন। এই সারিয়ার কমান্ডার ছিলেন গালিব ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। যাত্রাপথে বনু মুলাউয়ির এক লোককে গুপ্তচর মনে করে গ্রেপ্তার করেন। লোকটির নাম হারিস ইবন মালিক। সে বললো, 'আমাকে তোমরা কেন গ্রেপ্তার করলে? আমি তো মুসলিম হতে এসেছি।' গালিব তাকে বললেন, 'তুমি যদি সত্য বলে থাকো, তাহলে একদিন একরাত বন্দী হয়ে থাকলে এমন কিছু যায় আসে না।' গালিব তাকে একদিনের জন্য বন্দী রাখতে চাচ্ছিলেন কারণ সে যদি গুপ্তচর হয়ে থাকে তাহলে সে শত্রুদের কাছে মুসলিম বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য ফাঁস করে দিতে পারে। সমস্যা হচ্ছে লোকটি দাবি করেছে সে মুসলিম হতে চেয়েছে আর একজন মুসলিমকে বন্দী করে রাখা যায় না। কিন্তু এখানে পরিস্থিতি এমন ছিল যে তাকে একদিনের জন্য বন্দী না রাখলে পুরো বাহিনীই বিপদের মুখে পড়তে পারে।
যা-ই হোক, শত্রুপক্ষের উপর নজরদারি করার জন্য জুনদুব ইবন মাকিস একটা পাহাড়ে ওঠেন। পাহাড়ে উঠে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লেন যেন শত্রুরা তাকে দেখতে না পায়। কিন্তু তবুও কীভাবে কীভাবে যেন শত্রুপক্ষের একজন তাকে দেখে ফেলে, তাকে লক্ষ্য করে একটা তীর ছুঁড়ে মারে। সেই তীর এসে জুনদুবের শরীরে বিদ্ধ হয়। প্রচণ্ড ব্যথায় তার শরীর যেন বিষিয়ে উঠলো। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ার উপর পুরো বাহিনীর নিরাপত্তা নির্ভর করছে। টু শব্দটি করলেও মুসলিমদের অবস্থান শত্রুদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। সমস্ত প্রস্তুতি আর পরিকল্পনা মাঠে মারা যাবে।
জুনদুব সেই ভয়ঙ্কর ব্যথা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নিলেন। শত্রুরা যেন তার উপস্থিতি টের না পায়, তার জন্য যেন মুসলিমদের অভিযান ভণ্ডুল না হয়ে যায়। এরপর আস্তে করে তীরটি খুলে ফেলেন। এই কঠিন মুহূর্তে কীভাবে একটা মানুষ এতটা সবর করতে পারে? যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, তবু জুনদুব নিজের শরীরকে স্থির ধরে রেখেছেন। এই অধ্যবসায়, এই ধৈর্য কোথা থেকে এল? এটা ছিল তাদের ঈমানের ফল। আল্লাহর ওপর তাদের বিশ্বাস কতটা জোরালো ছিল আর জিহাদের ব্যাপারে তারা কতটা নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন -- এই ঘটনা তার একটি চমৎকার উদাহরণ।
এরপর আরও একটি তীর জুনদুবের গায়ে বিঁধে। এবারো তিনি নড়াচড়া না করে তীরটি আস্তে করে খুলে ফেলেন। কোনোকিছুর নড়াচড়া না দেখে সেই তীর নিক্ষেপকারী লোকটি চলে যায়। সে ভাবলো কেউ বুঝি নেই। পরবর্তীতে মুসলিম বাহিনী শত্রুপক্ষের উপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে কিছু লোককে হত্যা করে তাদের উট এবং অন্য সম্পদ দখল করে নেন। শত্রুরাও তাদের বিরাট বাহিনী নিয়ে মুসলিমদের ধাওয়া করা শুরু করে। এই পর্যায়ে তাদের মোকাবেলা করার মতো অবস্থা মুসলিম বাহিনীর ছিল না। তারা পিছু হটতে থাকেন। তখন আল্লাহ তাআলা সেই স্থানে বৃষ্টিবর্ষণ করে প্লাবন ঘটান যার মাধ্যমে মুসলিম বাহিনী নিরাপদে ফিরে আসে।
গালিব ইবন আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন আরেকটি সারিয়া ছিল বনু আউয়াল এবং বনু আবদ ইবন সালাবার উদ্দেশ্যে। এই অভিযানে উসামা ইবন যাইদের একটি বিখ্যাত ঘটনা আছে। তিনি এই অভিযানে এক লোককে গ্রেপ্তার করেন। সে তখন বলে উঠে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।' কিন্তু উসামা তাকে হত্যা করে ফেলেন। তার যুক্তি ছিল নিশ্চয়ই লোকটা জান বাঁচানোর জন্য কালিমা পড়েছে। আল্লাহর রাসূল এই ঘটনা শুনে প্রচণ্ড অসন্তোষ প্রকাশ করেন। উসামাকে বললেন, 'তুমি কি লোকটার বুক চিরে দেখেছো সে সত্যি বলছে না মিথ্যা? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছো?'
এই ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, বাহ্যিক অবস্থার উপর একজন মানুষকে বিচার করতে হবে। এই কারণে রাসূলুল্লাহ বলছিলেন, তুমি কি তার বুক চিরে দেখেছো যে সত্যি বলছে নাকি মিথ্যা? একজন মানুষ যদি নিজেকে মুসলিম দাবি করে, তখন তাকে ঈমানদার ধরতে হবে, নিছক সন্দেহের কারণে তাকে কাফির ভাবা যাবে না। তবে ঈমান আনার দাবি করার পরেও যদি তার কাছ থেকে স্পষ্ট কুফরি প্রকাশ পায়, সেক্ষেত্রে প্রকাশ্য কুফরির দিকটাই নিতে হবে। অন্তর ফেঁড়ে দেখা আমাদের দায়িত্ব নয়।
দ্বিতীয় শিক্ষা হলো মুসলিম রক্তের পবিত্রতা। বিনা কারণে একজন মুসলিমকে হত্যা করা ভয়াবহ একটি পাপ। আল্লাহর রাসূলের প্রতিক্রিয়া দেখেই বোঝা যায় এটা মারাত্মক পর্যায়ের গুনাহ। একজন মুসলিমের রক্ত পবিত্র, এবং হাদীসে এসেছে কাবাঘর থেকেও মুসলিমদের রক্ত দামি।
৩) আবু হাদরাদের সারিয়াহ
আবু হাদরাদ দুইশো দিরহাম মোহরের বিনিময়ে এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন কিন্তু মোহর আদায় করার সামর্থ্য তার ছিল না। তখন তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে আসলেন। এত মোটা অংকের মোহর রাসূলুল্লাহর পছন্দ হলো না। তিনি বললেন, 'সুবহানআল্লাহ! টাকা যদি স্রোতের মতো ভেসে আসতো তবুও তো এত মোহর ধরা ঠিক হতো না। তোমাকে সাহায্য করার মতো কিছুই আমার কাছে নেই।'
যাই হোক, রাসূলুল্লাহ আবু হাদরাদ সহ আরও দুজনকে পাঠালেন কায়েস নামের এক লোককে শায়েস্তা করার জন্য। সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য লোক সংগ্রহ করছিল। এই অভিযানে দেওয়ার মতো রাসূলুল্লাহর হাতে ছিল একটি দুবলা পাতলা উট। সেই উটকে সম্বল করে তারা তিনজন বের হলেন। তারা সেই লোককে হত্যা করতে সমর্থ হন। এরপর আল্লাহর রাসূল আবু হাদরাদকে তেরোটি উট দেন। এই উট দিয়ে তিনি মোহর পরিশোধ করেন।
৪) আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার সারিয়াহ
ইয়াসির ইবন রাজাম নামের এক ইহুদি গাতফানের লোকদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য এক করার চেষ্টা করছিল। তার কাছে ত্রিশ সৈনিক সহ আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে পাঠানো হয়। তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয় যে, তাকে খাইবারের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করা হবে। তখন ইয়াসির তার ত্রিশ সঙ্গীসহ মদীনায় যেতে রাজি হয়। কিন্তু পথিমধ্যে সে তার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আফসোস করতে থাকে। তখন সে আবদুল্লাহ ইবন উনাইসকে হত্যা করার চেষ্টা করে। আবদুল্লাহ ইবন উনাইস আহত হন কিন্তু নিজেকে সামলে নেন। দুই দলের মধ্যে মারামারি শুরু হয় এবং ইহুদিদের একজন ছাড়া সবাই মারা পড়ে।
৫) বাতনু ইদামের সারিয়াহ
এই অভিযান প্রেরিত হয়েছিল ইদামে, নেতৃত্বে ছিলেন আবু হাদরাদ অথবা আবু কাতাদা। এই অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অভিযানে অংশ নেওয়া মুহাল্লিম ইবন জাসসামার কাহিনী। অভিযান চলাকালীন সময়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আমর ইবন ইদবাত আশযায়ী। তিনি ছিলেন একজন মুসলিম। মুসলিম হিসেবে তিনি সেই বাহিনীকে সালাম দেন। বলেন, 'আসসালামু আলাইকুম।' সেই সুযোগে মুহাল্লিম ইবন জাসসামা তাকে সেখানেই খুন করে ফেলে। জাহিলিয়াতের সময় মুহাল্লিমের সাথে সেই লোকের কোনোকিছু নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। তার জের ধরে মুহাল্লিম তাকে মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও হত্যা করে।
এই ঘটনার পরে হুনাইনের সময়ে গাতফানের নেতা উয়াইনা ইবন হিসন রাসূলুল্লাহর কাছে এসে এই হত্যার প্রতিশোধস্বরূপ রক্তের বদলে রক্ত দাবি করলো। আর মুহাল্লিমের পক্ষের লোকেরা রক্তপণ দিতে অস্বীকার করলো। ফিতনা এড়ানোর জন্য আল্লাহর রাসূল তাদেরকে রক্তপণ হিসেবে একশোটি উট দিতে চাইলেন। উয়াইনা তখন বললো, 'আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি তাকে ছাড়বো না, যতক্ষণ না তার পরিবার সেই কষ্ট পাবে, যে কষ্ট আমার পরিবার পেয়েছে।' রাসূলুল্লাহ দ্বিতীয়বারের মতো রক্তপণ নিতে প্রস্তাব করলেন। শেষপর্যন্ত তারা রাজি হলো এবং রক্তপণ গ্রহণ করলো।
মুহাল্লিমের লোকেরা মুহাল্লিমকে বললো, 'তুমি রাসূলুল্লাহর কাছে যাও এবং তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলো। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও।' লম্বা সুঠামদেহী মুহাল্লিম আল্লাহর রাসূলের কাছে আসলো। পরনে ছিল মৃত্যুর পোশাক। বললো, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুহাল্লিম, আল্লাহর কাছে আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'হে আল্লাহ! আপনি মুহাল্লিমকে ক্ষমা করবেন না।' মুহাল্লিম চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল।
এই ঘটনার পর মুহাল্লিম আর এক মাস বেঁচে ছিল। তাকে দাফন করা হয়, কিন্তু কবরের মাটি তাকে গ্রহণ করেনি। তাকে ছুঁড়ে ফেলে, বারবার। এরপর তার লাশ দুই পাহাড়ের মাঝে পাথরচাপা দিয়ে দাফন করা হয়। এই ঘটনা শুনে আল্লাহর রাসূল মন্তব্য করেন, 'আল্লাহর কসম! মুহাল্লিমের চাইতে নিকৃষ্ট লোককেও মাটি গ্রহণ করে নেয়। কিন্তু আল্লাহ এই ঘটনার মাধ্যমে তোমাদের পারস্পরিক জানমালের নিষিদ্ধতার ব্যাপারে সতর্ক করতে চেয়েছেন।' মুসলিমের রক্তের পবিত্রতার বিষয়ে এই ঘটনা আরেকটি শিক্ষা।
৬) আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা আস-সাহমীর সারিয়ার কাহিনী
এই সারিয়াহর নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা। অভিযান চলাকালীন সময়ে তার অধীনস্থ সৈনিকরা এমন কিছু একটা করে বসে যে কারণে তিনি খুব রেগে যান। রেগে গিয়ে তাদের বলেন, 'তোমরা আগুনে ঝাঁপ দাও।' সৈনিকরা উত্তর দিল, 'এই আগুন থেকে রক্ষা পেতেই তো আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি!' তখন আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা বললেন, 'আমি হচ্ছি আমীর এবং আমীরকে মান্য করা ওয়াজিব!' সৈনিকরা তবুও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। পরে তার রাগ পড়ে গেল, আগুনও নিভে গেল। তারা ফিরে এলেন। এ ঘটনা শুনে রাসূলুল্লাহ মন্তব্য করলেন, 'যদি তারা তাদের আমীরের কথামতো আগুনে ঝাঁপ দিতো, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত সেই আগুনেই থেকে যেত। আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো আনুগত্য চলে না। আনুগত্য কেবল ভালো কাজে।'
টিকাঃ
৯৩. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ৫৪।
৯৪. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ঈমান, হাদীস ১৮৩।
৯৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৮।
৯৬. ইবন মাজাহ, অধ্যায় রক্তপণ, হাদীস ২৭২৬ (আরবি রেফারেন্স)।
৯৭. সুনান আবু দাউদ, অধ্যায় রক্তপণ, হাদীস ৪৫০৩ (আরবি রেফারেন্স)।
৯৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৭।