📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 খাইবারের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা

📄 খাইবারের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা


১) নেতৃত্বের প্রতি লোভের ভয়াবহতা

নেতৃত্বের প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণ থাকে। কিন্তু ইসলামে নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়ার ব্যাপারে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহর চাচা হওয়া সত্ত্বেও আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব যখন নেতৃস্থানীয় পদ চেয়েছিলেন রাসূল তাকে বলেছিলেন, 'আমরা তাকে এই পদ দেবো না, যে এই পদের জন্যে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে।' এটাই ইসলামের শিক্ষা। উমারের ঈমানের উচ্চতা নিয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই, নেতৃত্বের ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহই ছিল না। কিন্তু খাইবারের সেইদিন উমারের মতো মানুষের মনেও নেতৃত্ব পাবার ইচ্ছে কাজ করছিল। এর কারণ হলো সেদিন এমন এক লোককে নেতৃত্ব দেওয়া হবে যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন এবং সেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। নিঃসন্দেহে এত বড় সম্মান পেতে কার না ইচ্ছে করবে!

নেতৃত্বের প্রতি লোভ কতটা খারাপ সেটা আমরা বুঝতে পারি তিরমিযীর একটি হাদীসে, রাসূল বলেন 'যদি দুটি নেকড়েকে একপাল ভেড়ার নিকট পাঠানো হয় তাহলে নেকড়েদের দ্বারা ভেড়াগুলো যতটা না ক্ষতির সম্মুখীন হবে তার চেয়েও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয় একজন মানুষ যখন সে সম্পদ এবং নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা করে।' কাজেই নেতৃত্বের প্রতি অন্তরে ভালোবাসা নির্মূল করা চাই, কারণ এই নেতৃত্বের বোঝা একদিন আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

২) জিহাদের উদ্দেশ্য

আলীর হাতে যখন আল্লাহর রাসূল পতাকা তুলে দিচ্ছিলেন তখন তাকে বলে দিয়েছিলেন,

'... তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করবে। আল্লাহর যে হক্ব তাদের আদায় করতে হবে সে ব্যাপারে তাদের অবহিত করবে। আল্লাহর কসম! তোমার দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ যদি মাত্র একজন মানুষকেও হিদায়াত দেন তাহলে তা তোমার জন্য লাল উটের চাইতেও মূল্যবান।'

এই হাদীস থেকে আমরা শিক্ষা পাই, কাফিরদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক জিহাদের একটি উদ্দেশ্য হলো দাওয়াত দেওয়া। মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করা, ইসলামের ছায়াতলে মানুষকে প্রবেশ করানো। জিহাদের মাধ্যমে দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাহিলিয়াতের প্রভাব এবং কুফর শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যেন ইসলাম গ্রহণের পথে মানুষের কোনো বাধা না থাকে।

জিহাদের সাথে অন্য যেকোনো যুদ্ধের পার্থক্য এখানেই। অন্য যুদ্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পদ অর্জন, ক্ষুধার তাড়না, কিংবা ক্ষমতার লোভ। কিন্তু মুসলিমরা যুদ্ধ করে একটি পবিত্র উদ্দেশ্যে, তা হলো আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে দেওয়া। রাসূল বলেছেন 'আমি কিছু মানুষকে জান্নাতে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখেছি।' এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে যারা এক সময় মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং পরবর্তীতে মুসলিম হয়েছে। রাসূল আলীকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর উচিত হবে আগে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া। এই দাওয়াতের ফলে যদি একজন লোকও ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে সেটাই হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গনিমাহ।

৩) অন্তরের আন্তরিকতা

বেদুইন এবং আবিসিনিয়ান সেই রাখালের গল্প থেকে শিক্ষা হলো, কেউ যদি আল্লাহর পথে চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করেন। সেই বেদুইন যেমন মৃত্যু চেয়েছেন, আল্লাহ তাকে ঠিক সেভাবে মৃত্যু দিয়েছেন। এর কারণ হলো তিনি ছিলেন সৎ এবং আন্তরিক। জিহাদের নিয়ত তার এতটা বিশুদ্ধ ছিল যে তিনি গনিমাহ পর্যন্ত চাননি। রাসূল বলেছেন, 'আমাকে তরবারি সহ পাঠানো হয়েছে এবং আমার রিযিক তরবারির ছায়াতলে।' এ কারণে আলিমরা বলেন গনিমতের রিযিক হলো শ্রেষ্ঠ রিযিক। কিন্তু এই বেদুইন সাহাবি ঈমানের এমন উঁচু স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন যে তিনি জান্নাত ছাড়া আর কিছুই চাইতেন না। এবং তার এই চাওয়ার মাঝে কোনো খাদ ছিল না। তাই তিনি লাভ করেছিলেন এক বিরল সম্মান, আল্লাহর রাসূলের চাদর।

আল্লাহর রাসূলের ওযুর পানির জন্য সাহাবিরা কাড়াকাড়ি করতেন। আর এই বেদুইন সাহাবি কোনো কাড়াকাড়ি ছাড়াই শুধুমাত্র নিয়তের বিশুদ্ধতার জোরে আল্লাহর রাসূলের চাদর গায়ে জড়িয়ে কবরে গিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এ এক বিরল সম্মান।

৪) গনিমতের সম্পদ চুরির ভয়াবহতা

ঘটনাটি ঘটে খাইবার অথবা খাইবার পরবর্তী ওয়াদী আল-কুরা অভিযানে। রাসূলুল্লাহর এক সাহাবি ইহুদিদের তীরের আঘাতে মারা যান। একদল সাহাবি বলতে থাকেন, 'অমুক শহীদ হয়েছে! অমুক শহীদ হয়েছে!' কিন্তু আল্লাহর রাসূল বললেন, 'কিছুতেই না। গনিমতের মাল থেকে যে চাদর সে চুরি করেছে, আমি দেখেছি সেই চাদর তাকে আগুন হয়ে ঘিরে রেখেছে।' এই লোকটি ছিলেন একজন মুসলিম, একজন মুজাহিদ। কিন্তু গনিমতের সম্পদ চুরি করা এতই ভয়াবহ অপরাধ যে, এজন্য একজন মানুষকে জাহান্নামের আগুনে যেতে হয়।

টিকাঃ
৮৪. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ঈমান, হাদীস ২১৭।

১) নেতৃত্বের প্রতি লোভের ভয়াবহতা

নেতৃত্বের প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণ থাকে। কিন্তু ইসলামে নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়ার ব্যাপারে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহর চাচা হওয়া সত্ত্বেও আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব যখন নেতৃস্থানীয় পদ চেয়েছিলেন রাসূল তাকে বলেছিলেন, 'আমরা তাকে এই পদ দেবো না, যে এই পদের জন্যে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে।' এটাই ইসলামের শিক্ষা। উমারের ঈমানের উচ্চতা নিয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই, নেতৃত্বের ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহই ছিল না। কিন্তু খাইবারের সেইদিন উমারের মতো মানুষের মনেও নেতৃত্ব পাবার ইচ্ছে কাজ করছিল। এর কারণ হলো সেদিন এমন এক লোককে নেতৃত্ব দেওয়া হবে যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন এবং সেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। নিঃসন্দেহে এত বড় সম্মান পেতে কার না ইচ্ছে করবে!

নেতৃত্বের প্রতি লোভ কতটা খারাপ সেটা আমরা বুঝতে পারি তিরমিযীর একটি হাদীসে, রাসূল বলেন 'যদি দুটি নেকড়েকে একপাল ভেড়ার নিকট পাঠানো হয় তাহলে নেকড়েদের দ্বারা ভেড়াগুলো যতটা না ক্ষতির সম্মুখীন হবে তার চেয়েও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয় একজন মানুষ যখন সে সম্পদ এবং নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা করে।' কাজেই নেতৃত্বের প্রতি অন্তরে ভালোবাসা নির্মূল করা চাই, কারণ এই নেতৃত্বের বোঝা একদিন আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

২) জিহাদের উদ্দেশ্য

আলীর হাতে যখন আল্লাহর রাসূল পতাকা তুলে দিচ্ছিলেন তখন তাকে বলে দিয়েছিলেন,

'... তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করবে। আল্লাহর যে হক্ব তাদের আদায় করতে হবে সে ব্যাপারে তাদের অবহিত করবে। আল্লাহর কসম! তোমার দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ যদি মাত্র একজন মানুষকেও হিদায়াত দেন তাহলে তা তোমার জন্য লাল উটের চাইতেও মূল্যবান।'

এই হাদীস থেকে আমরা শিক্ষা পাই, কাফিরদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক জিহাদের একটি উদ্দেশ্য হলো দাওয়াত দেওয়া। মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করা, ইসলামের ছায়াতলে মানুষকে প্রবেশ করানো। জিহাদের মাধ্যমে দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাহিলিয়াতের প্রভাব এবং কুফর শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যেন ইসলাম গ্রহণের পথে মানুষের কোনো বাধা না থাকে।

জিহাদের সাথে অন্য যেকোনো যুদ্ধের পার্থক্য এখানেই। অন্য যুদ্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পদ অর্জন, ক্ষুধার তাড়না, কিংবা ক্ষমতার লোভ। কিন্তু মুসলিমরা যুদ্ধ করে একটি পবিত্র উদ্দেশ্যে, তা হলো আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে দেওয়া। রাসূল বলেছেন 'আমি কিছু মানুষকে জান্নাতে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখেছি।' এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে যারা এক সময় মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং পরবর্তীতে মুসলিম হয়েছে। রাসূল আলীকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর উচিত হবে আগে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া। এই দাওয়াতের ফলে যদি একজন লোকও ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে সেটাই হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গনিমাহ।

৩) অন্তরের আন্তরিকতা

বেদুইন এবং আবিসিনিয়ান সেই রাখালের গল্প থেকে শিক্ষা হলো, কেউ যদি আল্লাহর পথে চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করেন। সেই বেদুইন যেমন মৃত্যু চেয়েছেন, আল্লাহ তাকে ঠিক সেভাবে মৃত্যু দিয়েছেন। এর কারণ হলো তিনি ছিলেন সৎ এবং আন্তরিক। জিহাদের নিয়ত তার এতটা বিশুদ্ধ ছিল যে তিনি গনিমাহ পর্যন্ত চাননি। রাসূল বলেছেন, 'আমাকে তরবারি সহ পাঠানো হয়েছে এবং আমার রিযিক তরবারির ছায়াতলে।' এ কারণে আলিমরা বলেন গনিমতের রিযিক হলো শ্রেষ্ঠ রিযিক। কিন্তু এই বেদুইন সাহাবি ঈমানের এমন উঁচু স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন যে তিনি জান্নাত ছাড়া আর কিছুই চাইতেন না। এবং তার এই চাওয়ার মাঝে কোনো খাদ ছিল না। তাই তিনি লাভ করেছিলেন এক বিরল সম্মান, আল্লাহর রাসূলের চাদর।

আল্লাহর রাসূলের ওযুর পানির জন্য সাহাবিরা কাড়াকাড়ি করতেন। আর এই বেদুইন সাহাবি কোনো কাড়াকাড়ি ছাড়াই শুধুমাত্র নিয়তের বিশুদ্ধতার জোরে আল্লাহর রাসূলের চাদর গায়ে জড়িয়ে কবরে গিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এ এক বিরল সম্মান।

৪) গনিমতের সম্পদ চুরির ভয়াবহতা

ঘটনাটি ঘটে খাইবার অথবা খাইবার পরবর্তী ওয়াদী আল-কুরা অভিযানে। রাসূলুল্লাহর এক সাহাবি ইহুদিদের তীরের আঘাতে মারা যান। একদল সাহাবি বলতে থাকেন, 'অমুক শহীদ হয়েছে! অমুক শহীদ হয়েছে!' কিন্তু আল্লাহর রাসূল বললেন, 'কিছুতেই না। গনিমতের মাল থেকে যে চাদর সে চুরি করেছে, আমি দেখেছি সেই চাদর তাকে আগুন হয়ে ঘিরে রেখেছে।' এই লোকটি ছিলেন একজন মুসলিম, একজন মুজাহিদ। কিন্তু গনিমতের সম্পদ চুরি করা এতই ভয়াবহ অপরাধ যে, এজন্য একজন মানুষকে জাহান্নামের আগুনে যেতে হয়।

টিকাঃ
৮৪. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ঈমান, হাদীস ২১৭।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 খাইবার যুদ্ধের ফলাফল

📄 খাইবার যুদ্ধের ফলাফল


খাইবারের ইহুদিরা আত্মসমর্পণ করার পরে আল্লাহর রাসূলের সাথে তাদের এই মর্মে চুক্তি হয় যে, তারা পরনের কাপড় পরে খাইবার ছেড়ে চলে যাবে এবং যাবতীয় অর্থ-সম্পদ, জায়গা-জমি, সোনা-রুপা, ঘোড়া, বর্ম সবকিছু রেখে যাবে। রাসূল তাদেরকে বলে দিলেন যদি তারা কোনো অর্থ-সম্পদ লুকানোর চেষ্টা করে তাহলে এর জন্য উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। ইহুদিদের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা নতুন কিছু নয়। রাসূলুল্লাহর যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই জাতিটি মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আসছে।

চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে খাইবারের ইহুদিরা এবার কিছু সম্পদ লুকিয়ে ফেললো। এই সম্পদগুলো ছিল বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের। বনু কুরায়যার ঘটনায় তাকে হত্যা করা হয়েছিল। বনু নাযিরকে যখন বের করে দেওয়া হয়, তখন হুয়াই ইবন আখতাব বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার একটি চামড়ার মাঝে লুকিয়ে খাইবারে রেখে এসেছিল। তার সেই অঢেল সম্পদ তখনও খাইবারে ছিল। বিষয়টা আল্লাহর রাসূল জানতেন। কিনানা ইবন আর-রাবীকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হলো,
- হুয়াইয়ের সেই সম্পদ কোথায়?
- সেই সম্পদ তো যুদ্ধ আর আমাদের থাকা খাওয়ায় খরচ হয়ে গেছে।
- না, সেটা হতে পারে না। যুদ্ধ তো মাত্র সেদিন হলো। এই অল্প ক'দিনের মাঝে এই পরিমাণ সম্পদ খরচ হয়ে যাবার কথা না।

কিনানা তবু অস্বীকার করতে থাকলো। ইহুদিরা কত সাবলীলভাবে মিথ্যা বলতে পারে এই তার একটা নমুনা। পরে এক বুড়ো ইহুদি বললো, 'আমি হুয়াই ইবন আখতাবকে প্রায়ই অমুক জায়গায় ঘুরঘুর করতে দেখতাম।' সাহাবিরা তখন সে জায়গায় গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে সেই সম্পদের কিছু অংশের সন্ধান পেলেন। কিনানাকে জিজ্ঞেস করা হলো বাকি সম্পদ কোথায়। সে আবারও বললো সে কিছুই জানে না। তাকে আল যুবাইর ইবন আওয়্যামের হাতে তুলে দেওয়া হলো। সোজা আঙুলে যখন ঘি ওঠে না, তখন তাকে বাঁকা করতেই হয়। তিনি তাকে মারধোর করে বাকি সম্পদের ব্যাপারে তথ্য বের করলেন। এরপর কিনানাকে তুলে দেওয়া হয় মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার হাতে। এই সেই কিনানা যে তার ভাই মাহমুদ ইবন মাসলামাকে হত্যা করেছে। আজ সে তার হাতের মুঠোয়! তিনি কিনানাকে হত্যা করে ভাই হত্যার প্রতিশোধ নেন।

দুর্গ থেকে বের হয়ে ইহুদিরা রাসূলুল্লাহর কাছে অনুরোধ করলো যেন তাদেরকে খাইবারে থাকতে দেওয়া হয়। তারা বললো, 'আমরা আপনাদের চাইতে এই ভূমি চাষাবাদে বেশি দক্ষ।' এই কথা বলে আসলে তারা খাইবারে তাদের থাকতে দেওয়ার জন্য নবীজিকে মানানোর চেষ্টা করছিল। রাসূলুল্লাহ তাদের প্রস্তাবে রাজি হলেন। উৎপাদিত শস্যের অর্ধেক ইহুদিরা পাবে -- এই শর্তে ইহুদিরা খাইবারে থেকে যাওয়ার অনুমতি পেল। তবে রাসূলুল্লাহ একটি শর্ত আরোপ করে দিলেন। তা হলো -- মুসলিমরা যখন চাইবে, তখনই তাদেরকে খাইবার থেকে বের করে দেওয়ার অধিকার রাখে।

ইহুদিদের খাইবারে চাষাবাদ করতে দেওয়াটা মুসলিমদের জন্য লাভজনক ছিল। কেননা সাহাবিদের হাতে জমি দেখাশোনা করার সময় ছিল না। তারা ব্যস্ত ছিলেন ইলম, দাওয়াহ আর জিহাদ নিয়ে। উপরন্তু ইহুদিরা ছিল খাইবারের জমি চাষাবাদে দক্ষ।

ইহুদিদের সাথে আল্লাহর রাসূলের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। এ পর্যন্ত প্রতিটি ইহুদি গোত্র মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করেছে। তাই যেকোনো মুহূর্তে তাদের খাইবার থেকে বের করে দেওয়ার শর্তারোপ করে তাদের সার্বক্ষণিক চাপের মুখে রাখলেন। এতকিছুর পরেও তাদের চরিত্র বদলায়নি। রাসূলুল্লাহ প্রতি বছর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে খাইবারের উৎপাদিত শস্যের পরিমাপ করে আনতে পাঠাতেন। প্রথমে তারা তার পরিমাপ করার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানায়, পরে তারা তাকে ঘুষ দিয়ে কিনে নিতে চায়। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা খুব রেগে যান। তাদের বলেন, 'আল্লাহর দুশমন কোথাকার! তোরা আমাকে ঘুষ দিতে চাস? তোরা জেনে রাখ, তোদের প্রতি ঘৃণা আর আল্লাহর রাসূলের প্রতি আমার ভালোবাসা আমাকে তোদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করার পথে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না!'

পরে অবশ্য তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তাদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণই করেছিলেন। পরবর্তীতে খাইবারের ইহুদিরা আবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। উমারের খিলাফতকালে তারা আবদুল্লাহ ইবন উমারকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে দুই হাত ভেঙে দেয়। এর আগে আল্লাহর রাসূলের যুগেই এক সাহাবিকে হত্যা করেছিল কিন্তু সেবার শক্ত প্রমাণ ছিল না। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবন উমারের সাথে তারা যা করেছিল সেটা ছিল সন্দেহাতীত। তাই উমার তাদেরকে আর সুযোগ দেননি, খাইবার থেকে বের করে দেন। এরপর তারা শামে চলে যায়।

খাইবার বিজয়ের মাধ্যমে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা বেশ সচল হয়। কারণ খাইবার থেকে মুসলিমরা বিপুল গনিমাহ অর্জন করে। আবদুল্লাহ ইবন উমারের একটি কথাতেই বোঝা যায় খাইবারের বিজয় তাদের জীবনে কতটা পরিবর্তন এনেছিল। তিনি বলেন, 'খাইবার বিজয়ের আগ পর্যন্ত আমাদের পেট ভরে এক বেলা খাওয়া হতো না।' মুহাজিররা খেজুর বাগানগুলো আনসারদের ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন। খাইবারের যখন পতন হচ্ছিল তখন ফাদাকের অধিবাসীরা আগেভাগেই আত্মসমর্পণ করে ফেলে। তাদের সাথেও অর্ধেক ফসল ভাগাভাগির চুক্তি হয়। তবে এই ফসলের মালিক হন কেবল আল্লাহর রাসূল কেননা, তাদের প্রাপ্ত সম্পদ ছিল ফাঈ, গনিমাহ নয়। কারণ ফাদাক সামরিক শক্তির জোরে বিজয় হয়নি। এর মাধ্যমে আল্লাহর রাসূলের আর্থিক অবস্থা সহজ হয়ে যায়।

খাইবারের সাথে আরও দুটি অঞ্চল বিজয় হয়। সেগুলো হলো ওয়াদী আল-কুরা এবং তাইমা। ওয়াদী আল-কুরার ইহুদিদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেই তাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং তারা আত্মসমর্পণ করে। তাদের সাথে খাইবারের অনুরূপ চুক্তি করা হয়। আর তাইমার অধিবাসীরা ফাদাকের মতো যুদ্ধ না করেই আত্মসমর্পণ করে।

মুসলিমদের হাতে খাইবার, ফাদাক, ওয়াদী আল-কুরা এবং তাইমার পতন নিয়ে গোটা আরব আলোচনায় মুখর হয়ে উঠলো। কুরাইশরা বিশ্বাসই করতে পারছিল না দুর্ভেদ্য দুর্গ, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা আর দীর্ঘকালীন রসদ সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও খাইবারের পতন হয়েছে। এই পরাজয়ের মাধ্যমে কুরাইশরা একটি বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকলো। আরব উপদ্বীপের দরজা ইসলামের জন্য আরও উন্মুক্ত হয়ে গেল।

টিকাঃ
৮৯. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৪।

খাইবারের ইহুদিরা আত্মসমর্পণ করার পরে আল্লাহর রাসূলের সাথে তাদের এই মর্মে চুক্তি হয় যে, তারা পরনের কাপড় পরে খাইবার ছেড়ে চলে যাবে এবং যাবতীয় অর্থ-সম্পদ, জায়গা-জমি, সোনা-রুপা, ঘোড়া, বর্ম সবকিছু রেখে যাবে। রাসূল তাদেরকে বলে দিলেন যদি তারা কোনো অর্থ-সম্পদ লুকানোর চেষ্টা করে তাহলে এর জন্য উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। ইহুদিদের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা নতুন কিছু নয়। রাসূলুল্লাহর যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই জাতিটি মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আসছে।

চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে খাইবারের ইহুদিরা এবার কিছু সম্পদ লুকিয়ে ফেললো। এই সম্পদগুলো ছিল বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের। বনু কুরায়যার ঘটনায় তাকে হত্যা করা হয়েছিল। বনু নাযিরকে যখন বের করে দেওয়া হয়, তখন হুয়াই ইবন আখতাব বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার একটি চামড়ার মাঝে লুকিয়ে খাইবারে রেখে এসেছিল। তার সেই অঢেল সম্পদ তখনও খাইবারে ছিল। বিষয়টা আল্লাহর রাসূল জানতেন। কিনানা ইবন আর-রাবীকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হলো,
- হুয়াইয়ের সেই সম্পদ কোথায়?
- সেই সম্পদ তো যুদ্ধ আর আমাদের থাকা খাওয়ায় খরচ হয়ে গেছে।
- না, সেটা হতে পারে না। যুদ্ধ তো মাত্র সেদিন হলো। এই অল্প ক'দিনের মাঝে এই পরিমাণ সম্পদ খরচ হয়ে যাবার কথা না।

কিনানা তবু অস্বীকার করতে থাকলো। ইহুদিরা কত সাবলীলভাবে মিথ্যা বলতে পারে এই তার একটা নমুনা। পরে এক বুড়ো ইহুদি বললো, 'আমি হুয়াই ইবন আখতাবকে প্রায়ই অমুক জায়গায় ঘুরঘুর করতে দেখতাম।' সাহাবিরা তখন সে জায়গায় গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে সেই সম্পদের কিছু অংশের সন্ধান পেলেন। কিনানাকে জিজ্ঞেস করা হলো বাকি সম্পদ কোথায়। সে আবারও বললো সে কিছুই জানে না। তাকে আল যুবাইর ইবন আওয়্যামের হাতে তুলে দেওয়া হলো। সোজা আঙুলে যখন ঘি ওঠে না, তখন তাকে বাঁকা করতেই হয়। তিনি তাকে মারধোর করে বাকি সম্পদের ব্যাপারে তথ্য বের করলেন। এরপর কিনানাকে তুলে দেওয়া হয় মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার হাতে। এই সেই কিনানা যে তার ভাই মাহমুদ ইবন মাসলামাকে হত্যা করেছে। আজ সে তার হাতের মুঠোয়! তিনি কিনানাকে হত্যা করে ভাই হত্যার প্রতিশোধ নেন।

দুর্গ থেকে বের হয়ে ইহুদিরা রাসূলুল্লাহর কাছে অনুরোধ করলো যেন তাদেরকে খাইবারে থাকতে দেওয়া হয়। তারা বললো, 'আমরা আপনাদের চাইতে এই ভূমি চাষাবাদে বেশি দক্ষ।' এই কথা বলে আসলে তারা খাইবারে তাদের থাকতে দেওয়ার জন্য নবীজিকে মানানোর চেষ্টা করছিল। রাসূলুল্লাহ তাদের প্রস্তাবে রাজি হলেন। উৎপাদিত শস্যের অর্ধেক ইহুদিরা পাবে -- এই শর্তে ইহুদিরা খাইবারে থেকে যাওয়ার অনুমতি পেল। তবে রাসূলুল্লাহ একটি শর্ত আরোপ করে দিলেন। তা হলো -- মুসলিমরা যখন চাইবে, তখনই তাদেরকে খাইবার থেকে বের করে দেওয়ার অধিকার রাখে।

ইহুদিদের খাইবারে চাষাবাদ করতে দেওয়াটা মুসলিমদের জন্য লাভজনক ছিল। কেননা সাহাবিদের হাতে জমি দেখাশোনা করার সময় ছিল না। তারা ব্যস্ত ছিলেন ইলম, দাওয়াহ আর জিহাদ নিয়ে। উপরন্তু ইহুদিরা ছিল খাইবারের জমি চাষাবাদে দক্ষ।

ইহুদিদের সাথে আল্লাহর রাসূলের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। এ পর্যন্ত প্রতিটি ইহুদি গোত্র মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করেছে। তাই যেকোনো মুহূর্তে তাদের খাইবার থেকে বের করে দেওয়ার শর্তারোপ করে তাদের সার্বক্ষণিক চাপের মুখে রাখলেন। এতকিছুর পরেও তাদের চরিত্র বদলায়নি। রাসূলুল্লাহ প্রতি বছর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে খাইবারের উৎপাদিত শস্যের পরিমাপ করে আনতে পাঠাতেন। প্রথমে তারা তার পরিমাপ করার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানায়, পরে তারা তাকে ঘুষ দিয়ে কিনে নিতে চায়। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা খুব রেগে যান। তাদের বলেন, 'আল্লাহর দুশমন কোথাকার! তোরা আমাকে ঘুষ দিতে চাস? তোরা জেনে রাখ, তোদের প্রতি ঘৃণা আর আল্লাহর রাসূলের প্রতি আমার ভালোবাসা আমাকে তোদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করার পথে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না!'

পরে অবশ্য তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তাদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণই করেছিলেন। পরবর্তীতে খাইবারের ইহুদিরা আবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। উমারের খিলাফতকালে তারা আবদুল্লাহ ইবন উমারকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে দুই হাত ভেঙে দেয়। এর আগে আল্লাহর রাসূলের যুগেই এক সাহাবিকে হত্যা করেছিল কিন্তু সেবার শক্ত প্রমাণ ছিল না। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবন উমারের সাথে তারা যা করেছিল সেটা ছিল সন্দেহাতীত। তাই উমার তাদেরকে আর সুযোগ দেননি, খাইবার থেকে বের করে দেন। এরপর তারা শামে চলে যায়।

খাইবার বিজয়ের মাধ্যমে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা বেশ সচল হয়। কারণ খাইবার থেকে মুসলিমরা বিপুল গনিমাহ অর্জন করে। আবদুল্লাহ ইবন উমারের একটি কথাতেই বোঝা যায় খাইবারের বিজয় তাদের জীবনে কতটা পরিবর্তন এনেছিল। তিনি বলেন, 'খাইবার বিজয়ের আগ পর্যন্ত আমাদের পেট ভরে এক বেলা খাওয়া হতো না।' মুহাজিররা খেজুর বাগানগুলো আনসারদের ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন। খাইবারের যখন পতন হচ্ছিল তখন ফাদাকের অধিবাসীরা আগেভাগেই আত্মসমর্পণ করে ফেলে। তাদের সাথেও অর্ধেক ফসল ভাগাভাগির চুক্তি হয়। তবে এই ফসলের মালিক হন কেবল আল্লাহর রাসূল কেননা, তাদের প্রাপ্ত সম্পদ ছিল ফাঈ, গনিমাহ নয়। কারণ ফাদাক সামরিক শক্তির জোরে বিজয় হয়নি। এর মাধ্যমে আল্লাহর রাসূলের আর্থিক অবস্থা সহজ হয়ে যায়।

খাইবারের সাথে আরও দুটি অঞ্চল বিজয় হয়। সেগুলো হলো ওয়াদী আল-কুরা এবং তাইমা। ওয়াদী আল-কুরার ইহুদিদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেই তাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং তারা আত্মসমর্পণ করে। তাদের সাথে খাইবারের অনুরূপ চুক্তি করা হয়। আর তাইমার অধিবাসীরা ফাদাকের মতো যুদ্ধ না করেই আত্মসমর্পণ করে।

মুসলিমদের হাতে খাইবার, ফাদাক, ওয়াদী আল-কুরা এবং তাইমার পতন নিয়ে গোটা আরব আলোচনায় মুখর হয়ে উঠলো। কুরাইশরা বিশ্বাসই করতে পারছিল না দুর্ভেদ্য দুর্গ, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা আর দীর্ঘকালীন রসদ সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও খাইবারের পতন হয়েছে। এই পরাজয়ের মাধ্যমে কুরাইশরা একটি বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকলো। আরব উপদ্বীপের দরজা ইসলামের জন্য আরও উন্মুক্ত হয়ে গেল।

টিকাঃ
৮৯. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৪।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের ؓ সাথে নবীজির ﷽ বিয়ে

📄 সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের ؓ সাথে নবীজির ﷽ বিয়ে


সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের সাথে আল্লাহর রাসূলের বিয়ের কাহিনী জানার আগে একটু পেছনে তাকানো যাক। এই সাফিয়া হচ্ছেন ইহুদি গোত্র বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের কন্যা। এ হচ্ছে সেই হুয়াই, যে আল্লাহর রাসূল মদীনায় আসার পর থেকেই তাঁর সাথে শত্রুতা করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞা করেছিল। এটি সাফিয়ার ছোটবেলার একটি ঘটনা। এই প্রতিজ্ঞার ঘটনাটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই হুয়াই-ই খন্দকের যুদ্ধের সময় বনু কুরায়যা গোত্রের বিদ্রোহের পেছনে অন্যতম হোতা। তাকে বনু কুরায়যার ঘটনায় হত্যা করা হয়। তার ভাইও খন্দকের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তাকেও হত্যা করা হয়। সাফিয়ার স্বামী ছিলেন কিনানা ইবন আর-রাবী। সে ছিল বনু নাযিরের কোষাধ্যক্ষ। তার কথা একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সাফিয়া যেনতেন কোনো পরিবারের কন্যা ছিলেন না। তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয় একটি পরিবারের মেয়ে। বলা যেতে পারে তাঁর গোত্রের 'ফার্স্ট লেডি'。

খাইবারের যুদ্ধে তাঁর বাবা, ভাই এবং স্বামী প্রত্যেকে মুসলিমদের হাতে মারা যায়। সাফিয়া দাসী হিসেবে বন্দী হলেন। গনিমতের সম্পদ ভাগাভাগি হওয়ার পর তিনি পড়লেন দাহিয়া আল-কালবির ভাগে। তখন কেউ একজন আল্লাহর রাসূলকে বললেন, 'সাফিয়া তো ইহুদিদের মধ্যে উঁচু বংশের সন্তান। তিনি দাহিয়া'র ভাগে পড়েছেন, কিন্তু সত্যি বলতে, তার জন্য উপযুক্ত পাত্র কেবল একজনই আছে। তিনি হচ্ছেন আপনি।'

রাসুলুল্লাহ তখন দাহিয়াকে ডেকে বললেন সাফিয়াকে ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে বেছে নিতে। দাহিয়া তাই করলেন। রাসুলুল্লাহ সাফিয়াকে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। সেক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল তাকে বিয়ে করে নেবেন এবং তার দাসমুক্তি হবে বিয়ের মোহর। দ্বিতীয় আরেকটি প্রস্তাব দিলেন, সাফিয়া চাইলে ইহুদি হিসেবে থেকে যেতে পারেন। সাফিয়া বেছে নিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে। আল্লাহর রাসূলের সাথে সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের বিয়ে হলো। এই বিয়ে হয়েছিল সাফিয়ার মাসিক সম্পন্ন হওয়ার পর। সে পর্যন্ত তারা খাইবারেই ছিলেন।

এবার খাইবার থেকে ফেরার পালা। সাফিয়াকে রাসূলুল্লাহ তাঁর উটের পেছনে বসালেন। ফিরতি পথে ছয় মাইল গিয়ে রাসূলুল্লাহ বিরতি নিতে চাইলেন যেন স্ত্রীর সাথে থেকে বিয়ে পূর্ণ করতে পারেন। কিন্তু সাফিয়া রাজি হলেন না। বিষয়টা রাসূলুল্লাহকে একটু অসুবিধায় ফেলে দিল, কিন্তু তিনি সাফিয়াকে কিছুই বললেন না। পরে তারা আস-সাহবায় থামলেন এবং সেখানেই ওয়ালিমা অনুষ্ঠিত হলো। বিয়ে পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হলো, এরপর রাসূলুল্লাহ সাফিয়ার কাছে জানতে চাইলেন কেন তিনি প্রথমবার থামতে রাজি হলেন না। তখন সাফিয়া ব্যাখ্যা করলেন, 'ঐ এলাকাটা ছিল ইহুদিদের কাছে, তাই আমি আপনার জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কা করছিলাম।' রাসূলুল্লাহ সাফিয়ার উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন। সাফিয়ার উত্তর সাফিয়ার অন্তরের কথাকে প্রকাশ করে। তিনি যদি আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ না করতেন, তাহলে আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তা নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন হতেন না。

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে নারীর স্বামী, ভাই, বাবা সবাই মুসলিমের হাতে মারা গিয়েছে, সেই নারী কীভাবে সেই মুসলিমদের নেতাকে ভালোবাসতে পারে? কীভাবে সে সেই ইসলামকে দ্বীন হিসেবে বেছে নেয়, যার অনুসারীরা তার সবচেয়ে আপনজনদের হত্যা করেছে? সেই প্রশ্নে একটু পরেই আসা যাক।

ওয়ালিমা শেষে যখন তারা ফিরে আসবেন, তখনকার ছোট্ট একটা ঘটনা রাসূলুল্লাহর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বড় একটা ধারণা দেয়। তারা মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন, সাফিয়া উটের পিঠে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর গায়ের চাদর খুলে সাফিয়ার বসার জন্য বালিশ বানিয়ে উটের পিঠে বসিয়ে দিলেন। এরপর নিজের হাঁটু উঁচু করে তুলে ধরলেন যেন সেই হাঁটুর উপর ভর করে সাফিয়া উটের পিঠে উঠতে পারেন।

ইহুদিদের চোখে যিনি আরবদের নেতা, মুসলিমদের কাছে যিনি আল্লাহর রাসূল, সদ্য যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আসা সেই বীর মানুষটি তাঁর স্ত্রীর জন্য মাটিতে বসে পড়েছেন। সবার সামনে স্ত্রীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করেননি। এত বিনয়, দয়া আর মমতা যে মানুষটির তাঁকে ভালো না বেসে কি থাকা যায়?

সাফিয়া ছোটবেলাতেই জেনেছিলেন মুহাম্মাদ হচ্ছেন আল্লাহর সত্য নবী। তার বাবার মুখেই তিনি তা জেনেছেন। কিন্তু এটাই ছিল তার জন্য দুঃখজনক বাস্তবতা যে তার বাবা, স্বামী, ভাই -- সবাই আল্লাহর রাসূলের বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। তার গোত্রের লোকদের আল্লাহর রাসূল মদীনা থেকে বের করে দিয়েছেন। এসব কিছুই ঘটেছে তার চোখের সামনে। তিনি তখন একজন কমবয়সী নারী। স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর রাসূলের প্রতি তার একটা ক্ষোভ কাজ করার কথা। আল্লাহর রাসূল কিন্তু বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি সাফিয়ার আবেগগুলোকে উপেক্ষা করেননি, বরং নিজের আবেগটাও প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফিয়ার কাছে তার বাবা আর স্বামীর মারা যাওয়ার বিষয়টা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতেন। তাকে বুঝিয়ে বলতেন তার বাবা হুয়াইয়ের কী অপরাধ ছিল। এভাবে বোঝাতে বোঝাতে একসময় সাফিয়ার মন থেকে সব রাগ-ক্ষোভ দূর হয়ে গেল। দুঃখের যে ভারী বোঝাটা তার মনে পাথরের মতো চেপে ছিল, সেটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে গেল। পিতা, স্বামী আর আপনজনদের হারালেন সত্যি, কিন্তু আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে সাফিয়ার নতুন জীবন শুরু হলো।

বিয়ের পরের ঘটনা, আল্লাহর রাসূল দেখলেন সাফিয়ার মুখে নীল দাগ। তিনি জানতে চাইলেন এই দাগ কীভাবে হলো। সাফিয়া বলতে শুরু করলেন, 'একদিন আমি ঘুমাচ্ছিলাম। আমার মাথা ছিল আমার স্বামীর কোলে, তখন আমি একটি স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার কোলের উপর চাঁদ এসে পড়লো। জেগে উঠে স্বামীকে স্বপ্নের কথা বললাম। আমার স্বামী আমাকে থাপ্পড় মেরে বললো, তুই আরবের বাদশাহকে পেতে চাস!'

সেদিন হয়তো সাফিয়া সেই ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরবর্তীতে কত চমৎকারভাবে সাফিয়ার জীবনকে পাল্টে দিলো। এই স্বপ্ন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুসংবাদ যে আল্লাহর রাসূলের সাথে সাফিয়ার বিয়ে হবে। কিনানা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছিল যে সাফিয়া আল্লাহর রাসূলকে বিয়ে করতে চান। আসলে এটা তার চাওয়া ছিল না। এটা ছিল আল্লাহ আযযা ওয়াজালের পক্ষ থেকে একটি সত্য স্বপ্ন, ভবিষ্যতে কী হবে তার ব্যাপারে ইঙ্গিত।

আগের সেই প্রশ্নে ফিরে যাওয়া যাক, কীভাবে একজন নারীর পক্ষে তার স্বামী আর পিতার হত্যাকারীকে বিয়ে করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর এক শব্দেই দেওয়া সম্ভব, তা হচ্ছে ঈমান। সাফিয়া তাঁর স্বামী আর বাবার সাথে বন্ধন থেকে ঈমানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি ঈমানকে সবকছিুর ওপরে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আর তাই আল্লাহর রাসূল হয়ে যান তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ! রাসূলুল্লাহর নবুওয়াতের কথা তিনি সেই ছোটবেলা থেকেই জানতেন। আর যখন সেই প্রতীক্ষিত নবী তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, তিনি স্বেচ্ছায়, আগ্রহের সাথে এই বিয়েতে সম্মত হলেন। যার অন্তরে ঈমান নেই, সে কখনো সাফিয়ার এই সিদ্ধান্তকে কদর করতে পারবে না।

সত্যি বলতে এই বিয়ে ছিল সাফিয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। এই বিয়ের মাধ্যমে সাফিয়া জাহান্নাম থেকে রক্ষা পেয়ে শুধু যে জান্নাতী হলেন তা-ই না, তিনি হয়ে গেলেন সেরা নারীদের একজন- উম্মুল মুমিনীন। সাফিয়ার পরবর্তী জীবন থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি আল্লাহর রাসূলকে কতটা ভালোবাসতেন। তিনি আল্লাহর রাসূলকে নিজের জীবন থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। রাসূলুল্লাহ যখন মৃত্যুশয্যায় কষ্ট পাচ্ছেন, তখন সাফিয়া বলে উঠেন, 'ইশ! আজ যদি আপনার জায়গায় আমি থাকতাম!' ঈমান এভাবেই মানুষের অন্তরকে বদলে দেয়। আল্লাহ তাআলা উম্মুল মু'মিনীন সাফিয়ার ওপর সন্তুষ্ট হোন।

এ প্রসঙ্গে আবু আইয়ুব আল আনসারীর একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। সাফিয়ার সাথে বিয়ে হওয়ার পর যে রাতে আল্লাহর রাসূল তার সাথে থাকলেন, সে রাতে আবু আইয়ুব আল আনসারী সারা রাত সেই তাঁবুর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে নবীজিকে পাহারা দেন। সকাল বেলা উঠে আল্লাহর রাসূল আবু আইয়ুবকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার আবু আইয়ুব! তুমি এখানে কেন?' আবু আইয়ুব তখন উত্তর দিলেন, 'আমি এই মহিলাকে নিয়ে আপনার জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ করছিলাম আল্লাহর রাসূল। এই মহিলার বাবা, স্বামী আর আপনজনেরা নিহত হয়েছে। আর কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন একজন কাফির। আমি আশঙ্কা করছিলাম যদি প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে তিনি আপনার কোনো ক্ষতি করতে চান--তাই আমি সারারাত আপনাকে পাহারা দিয়েছি।' আবু আইয়ুবের এই সন্দেহ যদিও অমূলক ছিল, তবু তার দুশ্চিন্তা বলে দেয় তিনি আল্লাহর রাসূলকে কতটা ভালোবাসতেন। আল্লাহর রাসূল তার ওপর খুশি হয়ে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ আবু আইয়ুব, আমাকে সারারাত যেভাবে পাহারা দিয়েছে, আপনি সেভাবে তাকে রক্ষা করুন।'

টিকাঃ
৯০. সহীহ বুখারি, অধ্যায় ক্রয়-বিক্রয়, হাদীস ১৮১।
৯১. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৬।

সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের সাথে আল্লাহর রাসূলের বিয়ের কাহিনী জানার আগে একটু পেছনে তাকানো যাক। এই সাফিয়া হচ্ছেন ইহুদি গোত্র বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের কন্যা। এ হচ্ছে সেই হুয়াই, যে আল্লাহর রাসূল মদীনায় আসার পর থেকেই তাঁর সাথে শত্রুতা করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞা করেছিল। এটি সাফিয়ার ছোটবেলার একটি ঘটনা। এই প্রতিজ্ঞার ঘটনাটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই হুয়াই-ই খন্দকের যুদ্ধের সময় বনু কুরায়যা গোত্রের বিদ্রোহের পেছনে অন্যতম হোতা। তাকে বনু কুরায়যার ঘটনায় হত্যা করা হয়। তার ভাইও খন্দকের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তাকেও হত্যা করা হয়। সাফিয়ার স্বামী ছিলেন কিনানা ইবন আর-রাবী। সে ছিল বনু নাযিরের কোষাধ্যক্ষ। তার কথা একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সাফিয়া যেনতেন কোনো পরিবারের কন্যা ছিলেন না। তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয় একটি পরিবারের মেয়ে। বলা যেতে পারে তাঁর গোত্রের 'ফার্স্ট লেডি'。

খাইবারের যুদ্ধে তাঁর বাবা, ভাই এবং স্বামী প্রত্যেকে মুসলিমদের হাতে মারা যায়। সাফিয়া দাসী হিসেবে বন্দী হলেন। গনিমতের সম্পদ ভাগাভাগি হওয়ার পর তিনি পড়লেন দাহিয়া আল-কালবির ভাগে। তখন কেউ একজন আল্লাহর রাসূলকে বললেন, 'সাফিয়া তো ইহুদিদের মধ্যে উঁচু বংশের সন্তান। তিনি দাহিয়া'র ভাগে পড়েছেন, কিন্তু সত্যি বলতে, তার জন্য উপযুক্ত পাত্র কেবল একজনই আছে। তিনি হচ্ছেন আপনি।'

রাসুলুল্লাহ তখন দাহিয়াকে ডেকে বললেন সাফিয়াকে ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে বেছে নিতে। দাহিয়া তাই করলেন। রাসুলুল্লাহ সাফিয়াকে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। সেক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল তাকে বিয়ে করে নেবেন এবং তার দাসমুক্তি হবে বিয়ের মোহর। দ্বিতীয় আরেকটি প্রস্তাব দিলেন, সাফিয়া চাইলে ইহুদি হিসেবে থেকে যেতে পারেন। সাফিয়া বেছে নিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে। আল্লাহর রাসূলের সাথে সাফিয়া বিনত হুয়াইয়ের বিয়ে হলো। এই বিয়ে হয়েছিল সাফিয়ার মাসিক সম্পন্ন হওয়ার পর। সে পর্যন্ত তারা খাইবারেই ছিলেন।

এবার খাইবার থেকে ফেরার পালা। সাফিয়াকে রাসূলুল্লাহ তাঁর উটের পেছনে বসালেন। ফিরতি পথে ছয় মাইল গিয়ে রাসূলুল্লাহ বিরতি নিতে চাইলেন যেন স্ত্রীর সাথে থেকে বিয়ে পূর্ণ করতে পারেন। কিন্তু সাফিয়া রাজি হলেন না। বিষয়টা রাসূলুল্লাহকে একটু অসুবিধায় ফেলে দিল, কিন্তু তিনি সাফিয়াকে কিছুই বললেন না। পরে তারা আস-সাহবায় থামলেন এবং সেখানেই ওয়ালিমা অনুষ্ঠিত হলো। বিয়ে পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হলো, এরপর রাসূলুল্লাহ সাফিয়ার কাছে জানতে চাইলেন কেন তিনি প্রথমবার থামতে রাজি হলেন না। তখন সাফিয়া ব্যাখ্যা করলেন, 'ঐ এলাকাটা ছিল ইহুদিদের কাছে, তাই আমি আপনার জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কা করছিলাম।' রাসূলুল্লাহ সাফিয়ার উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন। সাফিয়ার উত্তর সাফিয়ার অন্তরের কথাকে প্রকাশ করে। তিনি যদি আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ না করতেন, তাহলে আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তা নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন হতেন না。

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে নারীর স্বামী, ভাই, বাবা সবাই মুসলিমের হাতে মারা গিয়েছে, সেই নারী কীভাবে সেই মুসলিমদের নেতাকে ভালোবাসতে পারে? কীভাবে সে সেই ইসলামকে দ্বীন হিসেবে বেছে নেয়, যার অনুসারীরা তার সবচেয়ে আপনজনদের হত্যা করেছে? সেই প্রশ্নে একটু পরেই আসা যাক।

ওয়ালিমা শেষে যখন তারা ফিরে আসবেন, তখনকার ছোট্ট একটা ঘটনা রাসূলুল্লাহর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বড় একটা ধারণা দেয়। তারা মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন, সাফিয়া উটের পিঠে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর গায়ের চাদর খুলে সাফিয়ার বসার জন্য বালিশ বানিয়ে উটের পিঠে বসিয়ে দিলেন। এরপর নিজের হাঁটু উঁচু করে তুলে ধরলেন যেন সেই হাঁটুর উপর ভর করে সাফিয়া উটের পিঠে উঠতে পারেন।

ইহুদিদের চোখে যিনি আরবদের নেতা, মুসলিমদের কাছে যিনি আল্লাহর রাসূল, সদ্য যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আসা সেই বীর মানুষটি তাঁর স্ত্রীর জন্য মাটিতে বসে পড়েছেন। সবার সামনে স্ত্রীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করেননি। এত বিনয়, দয়া আর মমতা যে মানুষটির তাঁকে ভালো না বেসে কি থাকা যায়?

সাফিয়া ছোটবেলাতেই জেনেছিলেন মুহাম্মাদ হচ্ছেন আল্লাহর সত্য নবী। তার বাবার মুখেই তিনি তা জেনেছেন। কিন্তু এটাই ছিল তার জন্য দুঃখজনক বাস্তবতা যে তার বাবা, স্বামী, ভাই -- সবাই আল্লাহর রাসূলের বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। তার গোত্রের লোকদের আল্লাহর রাসূল মদীনা থেকে বের করে দিয়েছেন। এসব কিছুই ঘটেছে তার চোখের সামনে। তিনি তখন একজন কমবয়সী নারী। স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর রাসূলের প্রতি তার একটা ক্ষোভ কাজ করার কথা। আল্লাহর রাসূল কিন্তু বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি সাফিয়ার আবেগগুলোকে উপেক্ষা করেননি, বরং নিজের আবেগটাও প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফিয়ার কাছে তার বাবা আর স্বামীর মারা যাওয়ার বিষয়টা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতেন। তাকে বুঝিয়ে বলতেন তার বাবা হুয়াইয়ের কী অপরাধ ছিল। এভাবে বোঝাতে বোঝাতে একসময় সাফিয়ার মন থেকে সব রাগ-ক্ষোভ দূর হয়ে গেল। দুঃখের যে ভারী বোঝাটা তার মনে পাথরের মতো চেপে ছিল, সেটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে গেল। পিতা, স্বামী আর আপনজনদের হারালেন সত্যি, কিন্তু আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে সাফিয়ার নতুন জীবন শুরু হলো।

বিয়ের পরের ঘটনা, আল্লাহর রাসূল দেখলেন সাফিয়ার মুখে নীল দাগ। তিনি জানতে চাইলেন এই দাগ কীভাবে হলো। সাফিয়া বলতে শুরু করলেন, 'একদিন আমি ঘুমাচ্ছিলাম। আমার মাথা ছিল আমার স্বামীর কোলে, তখন আমি একটি স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার কোলের উপর চাঁদ এসে পড়লো। জেগে উঠে স্বামীকে স্বপ্নের কথা বললাম। আমার স্বামী আমাকে থাপ্পড় মেরে বললো, তুই আরবের বাদশাহকে পেতে চাস!'

সেদিন হয়তো সাফিয়া সেই ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরবর্তীতে কত চমৎকারভাবে সাফিয়ার জীবনকে পাল্টে দিলো। এই স্বপ্ন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুসংবাদ যে আল্লাহর রাসূলের সাথে সাফিয়ার বিয়ে হবে। কিনানা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছিল যে সাফিয়া আল্লাহর রাসূলকে বিয়ে করতে চান। আসলে এটা তার চাওয়া ছিল না। এটা ছিল আল্লাহ আযযা ওয়াজালের পক্ষ থেকে একটি সত্য স্বপ্ন, ভবিষ্যতে কী হবে তার ব্যাপারে ইঙ্গিত।

আগের সেই প্রশ্নে ফিরে যাওয়া যাক, কীভাবে একজন নারীর পক্ষে তার স্বামী আর পিতার হত্যাকারীকে বিয়ে করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর এক শব্দেই দেওয়া সম্ভব, তা হচ্ছে ঈমান। সাফিয়া তাঁর স্বামী আর বাবার সাথে বন্ধন থেকে ঈমানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি ঈমানকে সবকছিুর ওপরে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আর তাই আল্লাহর রাসূল হয়ে যান তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ! রাসূলুল্লাহর নবুওয়াতের কথা তিনি সেই ছোটবেলা থেকেই জানতেন। আর যখন সেই প্রতীক্ষিত নবী তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, তিনি স্বেচ্ছায়, আগ্রহের সাথে এই বিয়েতে সম্মত হলেন। যার অন্তরে ঈমান নেই, সে কখনো সাফিয়ার এই সিদ্ধান্তকে কদর করতে পারবে না।

সত্যি বলতে এই বিয়ে ছিল সাফিয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। এই বিয়ের মাধ্যমে সাফিয়া জাহান্নাম থেকে রক্ষা পেয়ে শুধু যে জান্নাতী হলেন তা-ই না, তিনি হয়ে গেলেন সেরা নারীদের একজন- উম্মুল মুমিনীন। সাফিয়ার পরবর্তী জীবন থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি আল্লাহর রাসূলকে কতটা ভালোবাসতেন। তিনি আল্লাহর রাসূলকে নিজের জীবন থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। রাসূলুল্লাহ যখন মৃত্যুশয্যায় কষ্ট পাচ্ছেন, তখন সাফিয়া বলে উঠেন, 'ইশ! আজ যদি আপনার জায়গায় আমি থাকতাম!' ঈমান এভাবেই মানুষের অন্তরকে বদলে দেয়। আল্লাহ তাআলা উম্মুল মু'মিনীন সাফিয়ার ওপর সন্তুষ্ট হোন।

এ প্রসঙ্গে আবু আইয়ুব আল আনসারীর একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। সাফিয়ার সাথে বিয়ে হওয়ার পর যে রাতে আল্লাহর রাসূল তার সাথে থাকলেন, সে রাতে আবু আইয়ুব আল আনসারী সারা রাত সেই তাঁবুর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে নবীজিকে পাহারা দেন। সকাল বেলা উঠে আল্লাহর রাসূল আবু আইয়ুবকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার আবু আইয়ুব! তুমি এখানে কেন?' আবু আইয়ুব তখন উত্তর দিলেন, 'আমি এই মহিলাকে নিয়ে আপনার জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ করছিলাম আল্লাহর রাসূল। এই মহিলার বাবা, স্বামী আর আপনজনেরা নিহত হয়েছে। আর কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন একজন কাফির। আমি আশঙ্কা করছিলাম যদি প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে তিনি আপনার কোনো ক্ষতি করতে চান--তাই আমি সারারাত আপনাকে পাহারা দিয়েছি।' আবু আইয়ুবের এই সন্দেহ যদিও অমূলক ছিল, তবু তার দুশ্চিন্তা বলে দেয় তিনি আল্লাহর রাসূলকে কতটা ভালোবাসতেন। আল্লাহর রাসূল তার ওপর খুশি হয়ে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ আবু আইয়ুব, আমাকে সারারাত যেভাবে পাহারা দিয়েছে, আপনি সেভাবে তাকে রক্ষা করুন।'

টিকাঃ
৯০. সহীহ বুখারি, অধ্যায় ক্রয়-বিক্রয়, হাদীস ১৮১।
৯১. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৬।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুহাজিরদের প্রত্যাবর্তন

📄 মুহাজিরদের প্রত্যাবর্তন


'আমি জানি না আজ আমি কেন এত খুশি ... খাইবার বিজয় নাকি জাফর ইবন আবি তালিবের ফিরে আসা...'

আবিসিনিয়ার মুহাজিররা যখন মদীনায় ফিরে আসলেন, তখন এভাবেই আল্লাহর রাসূল নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন। জাফর ইবন আবি তালিব ছিলেন আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই। দীর্ঘদিন পরে তাকে ফিরে পেয়ে রাসূলুল্লাহ তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দেন। জাফর ইবন আবি তালিবকে কাছে পাওয়া ছিল আল্লাহর রাসূলের জীবনে অত্যন্ত আনন্দের একটা ঘটনা। জাফর ইবন আবি তালিব ছিলেন আবিসিনিয়ার মুহাজিরদের আমীর। রাসূলুল্লাহ আমর ইবন উমাইয়্যা আদ-দামরীকে নাজাশির কাছে পাঠান যেন তিনি মুহাজিরদের মদীনায় পাঠিয়ে দেন। নাজাশি সানন্দে দুটো জাহাজে করে সবাইকে মদীনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেন। এই দলের সাথে আরও একটি দল ছিল। সেটি হচ্ছে আশআরী গোত্র থেকে আগত ৫৩ থেকে ৫৯ জনের একটি দল। সেই দলে ছিলেন রাসূলুল্লাহর সাহাবি আবু মূসা আল-আশআরী। তারা যখন আল্লাহর রাসূলের কথা শুনলেন, তারা সিদ্ধান্ত নিলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে হিজরত করে চলে আসবেন। তারা জাহাজে উঠে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে তাদের জাহাজ মদীনায় না পৌঁছে আবিসিনিয়ার তীরে ভিড়ে। তখন তারা জাফর ইবন আবি তালিবের সন্ধান পেলেন এবং সেখানেই থাকতে শুরু করলেন।

জাফর ইবন আবি তালিবের নেতৃত্বে মুসলিমরা আবিসিনিয়ায় ছিলেন প্রায় দশ বছর। এই দশ বছরে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটে যায়। আল্লাহর রাসূলের হিজরত, ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন, বদর, উহুদ, খন্দক ইত্যাদি। এ কারণে মদীনার কেউ কেউ মনে করেন তারা বুঝি আবিসিনিয়ার মুসলিমদের থেকে এগিয়ে আছেন। এই প্রসঙ্গে মদীনার মুসলিম উমার ইবন খাত্তাব এবং আবিসিনিয়া ফেরত সাহাবিয়াত আসমা বিনত উমাইসের একটি কথোপকথন আছে, যা প্রথম খণ্ডে ভিন্ন প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছিল। ঘটনাটি আবার উল্লেখ করা হলো।

আসমা ছিলেন জাফর ইবন আবি তালিবের স্ত্রী। তিনি একদিন উমারের বাসায় হাফসার সাথে দেখা করতে আসলেন। আসমাকে দেখে উমার বললেন, 'ইনি কি সেই আবিসিনিয়া থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে আসা মহিলা?' হাফসা বললেন, 'হ্যাঁ, ইনিই সেই।' উমার তখন আসমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'আমরা আপনাদের আগে হিজরত করেছি তাই আমরা রাসূলুল্লাহর ওপর আপনাদের থেকে বেশি হকদার।'

এই কথায় আসমা কিছুটা রেগে গেলেন। পাল্টা জবাব দিয়ে বললেন, 'না, তা হতে পারে না, আপনারা আমাদের চাইতে রাসূলের বেশি ঘনিষ্ঠ নন। আপনারা তো আল্লাহর রাসূলের সাথে থাকতেন। তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাইয়ে দিতেন, মূর্খদের শিক্ষা দিতেন। আর আমরা ছিলাম বহুদূরে, অপ্রিয় এক রাজ্যে। আমি রাসূলুল্লাহর কাছে যাচ্ছি। আপনি যে কথা বললেন, সেটা তাঁকে বলবো। বাড়িয়ে-চড়িয়ে কিছুই বলব না, এরপর দেখি উনি কী বলেন।'

আসমার অভিযোগ শুনে রাসূলুল্লাহ জানতে চাইলেন, 'তুমি উত্তরে কী বলেছো?' আসমা তাঁর দেওয়া উত্তরটি রাসূলুল্লাহকে শোনালেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছো আসমা, আমার প্রতি উমার আর তার সঙ্গীদের হক তোমাদের চেয়ে বেশি তো নয়। তারা একটি হিজরতের পুরস্কার পাবে আর তোমরা পাবে দুটি হিজরতের পুরস্কার।'

এ কথা শুনে আসমার মন খুশিতে ভরে উঠলো! এতদিন তারা আল্লাহর রাসূলের থেকে দূরে ছিলেন, সেই শূন্যতার যে নিদারুণ কষ্ট তা যেন এই অসামান্য প্রাপ্তির জন্য নিমিষেই মিলিয়ে গেল। এই হাদীস ছিল আবিসিনিয়া ফেরত সাহাবিদের প্রিয় হাদীস। তারা ঘুরেফিরে বারবার এই হাদীসটা শুনতে চাইতেন। দল বেঁধে আসমার কাছে আসতেন এই কথাগুলো শুনতে, এই হাদীস শুনে তাদের মন ভরে যেতো। আসমার ভাষায়, 'গোটা দুনিয়ায় এ হাদীসের চাইতে প্রিয় তাদের আর কিছু ছিল না।'

একই সময়ে আরও দুটো দল আল্লাহর রাসূলের কাছে আসে। এর মধ্যে একটি হলো শাম অঞ্চলের আদ-দারিঈন থেকে আগত আল-লাখাম গোত্রের লোক। সেখানে ছিলেন তামিম আদ-দারী। তিনি দাজ্জালের একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আরেকটি দলের আগমন ঘটে ইয়েমেন থেকে, তারা ছিল ইয়েমেনের দাউস গোত্রের। এই দলে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা। সেখান থেকে প্রায় পঞ্চাশটি পরিবার মদীনায় হিজরত করে। মদীনায় এসে তারা জানতে পারেন আল্লাহর রাসূল খাইবারে অবস্থান করছেন। তারা আল্লাহর রাসূলের সাথে মিলিত হতে এত আগ্রহী ছিলেন যে তারা মদীনায় অপেক্ষা না করে খাইবারে চলে যান। সেখানে আল্লাহর রাসূলের দেখা পান।

খাইবার থেকে ফিরে আসার পথে একটি ছোট্ট শিক্ষণীয় ঘটনা আছে। খাইবার থেকে ফেরার পথে, আল্লাহর রাসূল বিলালকে বলেন তিনি যেন ফজরের সময় সবাইকে জাগিয়ে দেন। কিন্তু বিলাল ঘুম থেকে উঠতে না পারায় সবারই ফজরের সালাত ছুটে যায়। সূর্যের তাপে সবার ঘুম ভাঙে। তখন আল্লাহর রাসূল বলেন, 'তোমরা যদি কখনো সালাতের কথা ভুলে যাও, তাহলে যখনই সালাতের কথা মনে পড়বে, সাথে সাথে আদায় করবে।' এই বিষয়টা অনেকেই ভুল করে। অনেককে দেখা যায়, ফজরের সালাত ছুটে গেলে সাথে সাথে আদায় না করে যুহরের ওয়াক্তের জন্য জমা করে রাখছে। এটা ঠিক নয়। ঘুমের কারণে বা ভুলে গিয়ে কোনো সালাত অনিচ্ছাকৃতভাবে ছুটে গেলে মনে পড়ার সাথে সাথে সেটা আদায় করে নিতে হবে, ফেলে রাখা যাবে না।

'আমি জানি না আজ আমি কেন এত খুশি ... খাইবার বিজয় নাকি জাফর ইবন আবি তালিবের ফিরে আসা...'

আবিসিনিয়ার মুহাজিররা যখন মদীনায় ফিরে আসলেন, তখন এভাবেই আল্লাহর রাসূল নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন। জাফর ইবন আবি তালিব ছিলেন আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই। দীর্ঘদিন পরে তাকে ফিরে পেয়ে রাসূলুল্লাহ তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দেন। জাফর ইবন আবি তালিবকে কাছে পাওয়া ছিল আল্লাহর রাসূলের জীবনে অত্যন্ত আনন্দের একটা ঘটনা। জাফর ইবন আবি তালিব ছিলেন আবিসিনিয়ার মুহাজিরদের আমীর। রাসূলুল্লাহ আমর ইবন উমাইয়্যা আদ-দামরীকে নাজাশির কাছে পাঠান যেন তিনি মুহাজিরদের মদীনায় পাঠিয়ে দেন। নাজাশি সানন্দে দুটো জাহাজে করে সবাইকে মদীনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেন। এই দলের সাথে আরও একটি দল ছিল। সেটি হচ্ছে আশআরী গোত্র থেকে আগত ৫৩ থেকে ৫৯ জনের একটি দল। সেই দলে ছিলেন রাসূলুল্লাহর সাহাবি আবু মূসা আল-আশআরী। তারা যখন আল্লাহর রাসূলের কথা শুনলেন, তারা সিদ্ধান্ত নিলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে হিজরত করে চলে আসবেন। তারা জাহাজে উঠে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে তাদের জাহাজ মদীনায় না পৌঁছে আবিসিনিয়ার তীরে ভিড়ে। তখন তারা জাফর ইবন আবি তালিবের সন্ধান পেলেন এবং সেখানেই থাকতে শুরু করলেন।

জাফর ইবন আবি তালিবের নেতৃত্বে মুসলিমরা আবিসিনিয়ায় ছিলেন প্রায় দশ বছর। এই দশ বছরে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটে যায়। আল্লাহর রাসূলের হিজরত, ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন, বদর, উহুদ, খন্দক ইত্যাদি। এ কারণে মদীনার কেউ কেউ মনে করেন তারা বুঝি আবিসিনিয়ার মুসলিমদের থেকে এগিয়ে আছেন। এই প্রসঙ্গে মদীনার মুসলিম উমার ইবন খাত্তাব এবং আবিসিনিয়া ফেরত সাহাবিয়াত আসমা বিনত উমাইসের একটি কথোপকথন আছে, যা প্রথম খণ্ডে ভিন্ন প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছিল। ঘটনাটি আবার উল্লেখ করা হলো।

আসমা ছিলেন জাফর ইবন আবি তালিবের স্ত্রী। তিনি একদিন উমারের বাসায় হাফসার সাথে দেখা করতে আসলেন। আসমাকে দেখে উমার বললেন, 'ইনি কি সেই আবিসিনিয়া থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে আসা মহিলা?' হাফসা বললেন, 'হ্যাঁ, ইনিই সেই।' উমার তখন আসমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'আমরা আপনাদের আগে হিজরত করেছি তাই আমরা রাসূলুল্লাহর ওপর আপনাদের থেকে বেশি হকদার।'

এই কথায় আসমা কিছুটা রেগে গেলেন। পাল্টা জবাব দিয়ে বললেন, 'না, তা হতে পারে না, আপনারা আমাদের চাইতে রাসূলের বেশি ঘনিষ্ঠ নন। আপনারা তো আল্লাহর রাসূলের সাথে থাকতেন। তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাইয়ে দিতেন, মূর্খদের শিক্ষা দিতেন। আর আমরা ছিলাম বহুদূরে, অপ্রিয় এক রাজ্যে। আমি রাসূলুল্লাহর কাছে যাচ্ছি। আপনি যে কথা বললেন, সেটা তাঁকে বলবো। বাড়িয়ে-চড়িয়ে কিছুই বলব না, এরপর দেখি উনি কী বলেন।'

আসমার অভিযোগ শুনে রাসূলুল্লাহ জানতে চাইলেন, 'তুমি উত্তরে কী বলেছো?' আসমা তাঁর দেওয়া উত্তরটি রাসূলুল্লাহকে শোনালেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছো আসমা, আমার প্রতি উমার আর তার সঙ্গীদের হক তোমাদের চেয়ে বেশি তো নয়। তারা একটি হিজরতের পুরস্কার পাবে আর তোমরা পাবে দুটি হিজরতের পুরস্কার।'

এ কথা শুনে আসমার মন খুশিতে ভরে উঠলো! এতদিন তারা আল্লাহর রাসূলের থেকে দূরে ছিলেন, সেই শূন্যতার যে নিদারুণ কষ্ট তা যেন এই অসামান্য প্রাপ্তির জন্য নিমিষেই মিলিয়ে গেল। এই হাদীস ছিল আবিসিনিয়া ফেরত সাহাবিদের প্রিয় হাদীস। তারা ঘুরেফিরে বারবার এই হাদীসটা শুনতে চাইতেন। দল বেঁধে আসমার কাছে আসতেন এই কথাগুলো শুনতে, এই হাদীস শুনে তাদের মন ভরে যেতো। আসমার ভাষায়, 'গোটা দুনিয়ায় এ হাদীসের চাইতে প্রিয় তাদের আর কিছু ছিল না।'

একই সময়ে আরও দুটো দল আল্লাহর রাসূলের কাছে আসে। এর মধ্যে একটি হলো শাম অঞ্চলের আদ-দারিঈন থেকে আগত আল-লাখাম গোত্রের লোক। সেখানে ছিলেন তামিম আদ-দারী। তিনি দাজ্জালের একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আরেকটি দলের আগমন ঘটে ইয়েমেন থেকে, তারা ছিল ইয়েমেনের দাউস গোত্রের। এই দলে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা। সেখান থেকে প্রায় পঞ্চাশটি পরিবার মদীনায় হিজরত করে। মদীনায় এসে তারা জানতে পারেন আল্লাহর রাসূল খাইবারে অবস্থান করছেন। তারা আল্লাহর রাসূলের সাথে মিলিত হতে এত আগ্রহী ছিলেন যে তারা মদীনায় অপেক্ষা না করে খাইবারে চলে যান। সেখানে আল্লাহর রাসূলের দেখা পান।

খাইবার থেকে ফিরে আসার পথে একটি ছোট্ট শিক্ষণীয় ঘটনা আছে। খাইবার থেকে ফেরার পথে, আল্লাহর রাসূল বিলালকে বলেন তিনি যেন ফজরের সময় সবাইকে জাগিয়ে দেন। কিন্তু বিলাল ঘুম থেকে উঠতে না পারায় সবারই ফজরের সালাত ছুটে যায়। সূর্যের তাপে সবার ঘুম ভাঙে। তখন আল্লাহর রাসূল বলেন, 'তোমরা যদি কখনো সালাতের কথা ভুলে যাও, তাহলে যখনই সালাতের কথা মনে পড়বে, সাথে সাথে আদায় করবে।' এই বিষয়টা অনেকেই ভুল করে। অনেককে দেখা যায়, ফজরের সালাত ছুটে গেলে সাথে সাথে আদায় না করে যুহরের ওয়াক্তের জন্য জমা করে রাখছে। এটা ঠিক নয়। ঘুমের কারণে বা ভুলে গিয়ে কোনো সালাত অনিচ্ছাকৃতভাবে ছুটে গেলে মনে পড়ার সাথে সাথে সেটা আদায় করে নিতে হবে, ফেলে রাখা যাবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px