📄 ৩) যুদ্ধের ময়দানের একজন হিরো, আখিরাতের খাতায় যার প্রাপ্তি শূন্য
এই যুদ্ধে এক মুসলিম সৈনিক প্রচণ্ড বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলো। শত্রুপক্ষের কেউ তার সামনে দাঁড়াতে পারছিল না। সাহাবিরা তাকে দেখে বলাবলি করছিলেন এই লোকের জান্নাত বুঝি নিশ্চিত! কিন্তু রাসূল বলে উঠলেন, 'এই লোক জাহান্নামে যাবে।' সাহাবিরা কথাটা শুনে চমকে উঠলেন। এমন বীরের মতো যোদ্ধা জাহান্নামে যাবে এটা কারো বিশ্বাসই হচ্ছিল না! একজন সাহাবি সেই সৈনিকের পিছু নিলেন, তিনি দেখতে চান এই লোকের সাথে কী হতে চলেছে। তিনি দেখলেন, যুদ্ধ করতে করতে সেই লোকটি একসময় বেশ আঘাত পেল, আর আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে নিজেই নিজেকে হত্যা করে ফেললো। প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবি এবার রাসূলুল্লাহর কাছে ছুটে গেলেন। রাসূলুল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণী চোখের সামনে সত্য হতে দেখে দৃঢ়তার সাথে বলে উঠলেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসূল!' এরপর রাসূল সেই সাহাবিকে বললেন, 'যাও, লোকদের মাঝে ঘোষণা করে দাও যে, শুধুমাত্র মু'মিনরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাআলা চাইলে একজন ফাসিক লোককেও তাঁর দ্বীনের কাজে লাগাতে পারেন। '⁸³
টিকাঃ
৮৩ সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ২৪২।
📄 ৪) আবু ইয়াসার কা'ব ইবন আমরের ؓ কাহিন
ইনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর একজন সাহাবি, খাইবারের যুদ্ধে তিনি একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
'খাইবারের এক সন্ধ্যায় আমরা আল্লাহর রাসূলের সাথে ছিলাম। এমন সময় দেখলাম এক ইহুদি ভেড়ার পাল নিয়ে দুর্গের ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছে। সে সময় আমরা দুর্গ অবরোধ করে রেখেছিলাম। আল্লাহর রাসূল তখন বললেন, কে আমাকে এই ভেড়ার পালগুলো থেকে ভেড়া ধরে এনে খাওয়াতে পারবে? আমি বললাম, আমি পারবো! রাসূল তখন বললেন, যাও! নিয়ে এসো!
আমি উটপাখির মতো জোরে দৌড়াতে লাগলাম। রাসুলুল্লাহ আমার জন্যে দুআ করলেন এই বলে -- হে আল্লাহ আমাদেরকে তার সঙ্গ দ্বারা উপকৃত করো। আমি যখন ভেড়ার পালকে নাগালে পেলাম তখন পালের প্রথম ভেড়াটি দুর্গের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। তাই আমি পালের শেষ দিকের দুটো ভেড়া ধরে বগলদাবা করে এত জোরে দৌড় দিলাম যে আমার মনে হচ্ছিল আমার সাথে কিছুই নেই! এরপর সেগুলো আল্লাহর রাসূলের কাছে ছুঁড়ে মারলাম। তারপর সেই ভেড়া জবাই করা হলো এবং সবাই খুব তৃপ্তি সহকারে খেল।'
হুনাইনের যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা আলোচনা করতে গিয়ে এই কাহিনীটি পুনরায় স্মরণ করা যায়। ঘটনাটি মজার, কিন্তু এই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আবু ইয়াসার কেঁদে দেন। কারণ রাসূলুল্লাহ তার সাহাচার্য পাবার দুআ করেছিলেন আর যে কারণে তিনি ছিলেন সর্বশেষ মৃত্যুবরণকারী সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম: তার বন্ধুরা অনেকেই তার আগে দুনিয়া ছেড়ে চলে যান, আর তিনি রয়ে যান।
📄 ৫) আল্লাহর রাসূলের ﷽ জন্য ভালোবাসা: উমাইয়্যা বিনত আবি আস-সালতের ؓ কাহিনী
তিনি ছিলেন গিফার গোত্রের। খাইবারের সময়ের ঘটনা, গিফারের এক মহিলা আল্লাহর রাসূলের কাছে গিয়ে বললেন, 'আমরা আপনার সাথে ময়দানে যেতে চাই, যাতে আমরা আহতদের সেবা করতে পারি এবং মুসলিমদের অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করতে পারি।' রাসূলুল্লাহ রাজি হলেন। গিফার গোত্রের কথা আগে বলা হয়েছে, এরা ছিল ডাকাত গোছের একটি কুখ্যাত গোত্র। কিন্তু আবু যার আল গিফারীর বদৌলতে এই গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। আর ইসলামের আলো তাদের পুরোপুরি বদলে দেয়。
গিফার গোত্রের মহিলারা মুসলিম বাহিনীর সাথে খাইবারের দিকে যাত্রা শুরু করল। সেই দলের এক বাচ্চা মেয়েকে আল্লাহর রাসূল তাঁর উটের পেছনে তুলে নিলেন। উটের পিঠে অনেক মাল-সামান টাল করে রাখা। বাচ্চা মেয়েটাকে বসানো হলো সেই মালের স্তূপের ওপর。
সকাল বেলা হলে যাত্রাবিরতির সময় হলো। আল্লাহর রাসূল উট থেকে নেমে পড়লেন। বাচ্চা মেয়েটি নামতে গিয়ে দেখলো মালামালের ওপরে যেখানে সে বসে ছিল সেখানে কিছু রক্ত লেগে আছে।
মেয়েটি লজ্জায় কুঁকড়ে গেল, এ কী হয়ে গেল! এমন কাণ্ড ঘটবে সে তো কল্পনাই করেনি! সে চুপটি করে উটের পাশে বসে রইলো। নবীজি এর ছিল তীক্ষ্ণদৃষ্টি। মা যেভাবে করে তার সদ্যজাত শিশুর জন্য প্রতিমুহূর্তে খেয়াল রাখে, সাহাবিদের সবার জন্য আল্লাহর রাসূলের তাঁর চেয়েও বেশি খেয়াল থাকতো। তিনি তাকিয়ে দেখতে পেলেন বাচ্চা মেয়েটা কেমন এক অস্বস্তিতে গুটিসুটি মেরে আছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে তোমার? হায়েজ হয়েছে?' মেয়েটি সংক্ষেপে বললো, 'হুঁ।' কিছুই হয়নি, এমন ভঙ্গিতে নবীজি তাকে বললেন, 'আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি পরিষ্কার হয়ে নাও। এরপর একটা জগে পানি আর কিছু লবণ নিয়ে মালামাল থেকে রক্তগুলো পরিষ্কার করে ফেলো। আর এরপর আবার উটের পিঠে বসে পড়ো।'
সেই বাচ্চা মেয়ে নবীজির কথামতো সবকিছু করলো। যুদ্ধের পর গনিমাহ ভাগাভাগি করার সময় এল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যুদ্ধে অংশ নিলেও নারী ও শিশুরা গনিমত পায় না। তবে আমীর চাইলে তাদের কিছু অংশ দেওয়ার অধিকার রাখেন। গনিমতের সম্পদ থেকে নবীজি সেই ছোট্ট উমাইয়্যার জন্য একটা গলার হার নিলেন। তারপর নিজ হাতে তাকে সেটা পরিয়ে দিলেন।
আল্লাহর রাসূলের সাথে উমাইয়্যা খুব অল্প কিছু মুহূর্তই কাটিয়েছে। কিন্তু সেই সময়টি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। দেখতে দেখতে সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটি একদিন বড় হলেন। কিন্তু খাইবারের সেই অসাধারণ মুহূর্তের কথা তিনি আজীবন মনে রেখেছেন। সেদিনের পর থেকে জীবনে যতবার তার ঋতুস্রাব হয়েছে, প্রত্যেক বার তিনি পানি আর লবণ ব্যবহার করে পবিত্র হতেন, একবারের জন্যেও এর অন্যথা হয়নি! তার জীবনের শেষ ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পরেও যেন তাকে এভাবেই পরিষ্কার করা হয়। সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়ে যখন বৃদ্ধা হয়ে গেলেন, তখন এই হাদীস সংগ্রহকারীর কাছে বলেন, 'আল্লাহর শপথ! যে হার আমার ছোটবেলায় আল্লাহর রাসূল আমাকে পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই হার আমি কখনো খুলিনি!' মৃত্যু এসে তাকে এই দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো, তখনো তার গলায় সেই হার ঝুলছে, যেন আখিরাতের সেই সুদীর্ঘ একাকী সফরে পা বাড়ানোর সময়েও আল্লাহর রাসূলের স্নেহটুকু তিনি বুকে করে যাত্রা শুরু করলেন。
সম্মানিত পাঠক! এই ঘটনার উপর মন্তব্য করে এর সৌন্দর্য নষ্ট না করাই শ্রেয়। ছোট্ট অথচ অনন্যসাধারণ এই গল্পটা যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকুক। আল্লাহর রাসূলকে তাঁর সাহাবি আর সাহাবিয়াতরা কতটা ভালোবাসতেন তা আসলে লিখে বা বলে কখনই বোঝানো যাবে না। তাদের ভালোবাসার গভীরতা হয়তো আমরা কিছুটা আঁচ করতে পারবো যখন এই গল্পগুলো আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে। আল্লাহর রাসূল সেই ছোট্ট মেয়েটিকে বলেননি যে নিজেকে পবিত্র করতে চাইলে সবসময় পানি আর লবণই ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু তবু তিনি সারাজীবন ধরে রাসূলের কথাটা মান্য করেছেন --- এটাই হচ্ছে ভালোবাসা। কাউকে ভালোবাসলে মানুষ তাকে মনে রাখে, তার ছোট ছোট কথাগুলিও যত্ন করে স্মরণ করে, তার বলা কাজগুলো মমতা নিয়ে আগ্রহের সাথে করে যায়। সাহাবিদের কাছে রাসূলুল্লাহর স্থান ছিল তাদের অন্তরের গভীরে। তাঁরা তাঁকে শুনতেন আর একবাক্যে মেনে নিতেন। শুধু তাহারাতের ফিকহ পড়ে এই ভালোবাসাকে উপলব্ধি করা যাবে না。
সেই বেদুইন নারীর নাম কী ছিল সেটাও আসলে নিশ্চিত নয়, কেউ বলেন উমাইয়্যা, কেউ বলেন আমীনাহ, আল্লাহই ভালো জানেন। তার নাম যা-ই হোক, তিনি আল্লাহর রাসূলের সাথে তার ছেলেবেলার সেই অল্প কিছু মুহূর্ত মনে রেখেছিলেন সারাটি জীবন ধরে। সেই ছোট্ট বয়সে তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহর রাসূলের বাহিনীর সাথে যাবেন বলে, তাদের সাহায্য করবেন বলে। কী অসাধারণ ত্যাগ তিতিক্ষা আর ভালোবাসাই দেখিয়েছিলেন আল্লাহর রাসূলের চারপাশের মানুষগুলো। পাঠক, আজকে আমাদের অবস্থা কোথায়, আমরা কী তা ভেবে দেখেছি?
আল্লাহর রাসূল যেমন ছিলেন, তেমন ছিলেন তার চারপাশের মানুষগুলো। কোথাকার এক বেদুইন মেয়ে, নিতান্ত সাধারণ এক গোত্রের অতি সাধারণ এক বালিকা। অথচ আল্লাহর রাসূল কত যত্ন আর আদরভরেই না তার সাথে কথা বলেছেন! যুদ্ধের পর এত এত সৈনিকের মাঝে আলাদা করে তার নাম ধরে তাকে ডেকেছেন, নিজ হাতে তার গলায় হার পরিয়ে দিয়েছেন! সত্যিই তিনি ছিলেন সৃষ্টির সেরা। তাঁর আচরণ ছিল অভাবনীয় রকমের সুন্দর, আর উম্মতের প্রতি তাঁর মায়া এবং ভালোবাসা ছিল নিখাদ। যে মানুষগুলো তাঁর জন্য সবর্ষ বিলিয়ে দিতে উন্মুখ হয়ে থাকতো, তাদের তিনি কখনো ভুলে যাননি। স্নেহের চাদরে মুড়ে সবসময় তাদের আগলে রেখেছেন।
📄 ৬) আল্লাহর রাসূলকে ﷽ হত্যার চেষ্টা
খাইবারের ইহুদিরা পরাজিত হবার পর নবীজি এবং তাঁর কিছু সাহাবিদের দাওয়াত করেন। সাহাবিদের জন্য তারা ভেড়ার মাংস রান্না করে দিলো। আপ্যায়ন করা আসলে তাদের উদ্দেশ্য ছিল না, তাদের উদ্দেশ্য ছিল নবীজিকে হত্যা করা। যাইনাব বিনতে আল-হারিস নামের এক ইহুদি মহিলা এজন্য সেই মাংসে বিষ মিশিয়ে দেয়। রাসূল সাহাবিদের নিয়ে খেতে বসলেন। তারা কেউ ভাবতে পারেনি দাওয়াতের খাবারে বিষ মেশানো থাকতে পারে। বিশর ইবন আল-বারা নিশ্চিন্ত মনে মাংস মুখে নিলেন। নবীজিও মাংস মুখে নিলেন কিন্তু গিলে ফেলার আগেই মুখ থেকে ফেলে দিয়ে বললেন এই খাবারে বিষ মেশানো আছে। ওদিকে বিশর ইবন আল-বারা ততক্ষণে মাংস গিলে ফেলেছেন。
সেই মহিলাকে ডাকা হলো। জিজ্ঞেস করা হলো সে হত্যার উদ্দেশ্যে বিষ মিশিয়েছে কিনা। সে স্বীকার করলো। নবীজি তার এই কাজের কারণ জানতে চাইলেন। মহিলা উত্তর দিল, 'আপনি যদি মিথ্যা নবী হন তাহলে এই বিষে আপনি মারা যাবেন। আর যদি আপনি সত্য নবী হন তাহলে আল্লাহ আপনাকে তা জানিয়ে দেবেন।' রাসূল বললেন, 'আমার উপর বিজয়ী হওয়ার শক্তি আল্লাহ তোমাকে দেননি।'
রাসূল মহিলাকে তখন ছেড়ে দিলেন। এই বিষে বিশর ইবন আল-বারা মারা যান। কিছু বর্ণনামতে সেই মহিলাকে তখন হত্যা করা হয়। এই ঘটনার পরে আল্লাহর রাসূল আরও তিন বছর বেঁচে ছিলেন। নবীজির শেষ দিনগুলোতে যখন তিনি জ্বরে ভুগছিলেন তখন আইশাকে বলেছিলেন, 'আইশা, আমি এখনো সেই খাবারের স্বাদ পাই যা আমাকে খাইবারে খাওয়ানো হয়েছিল।'