📄 ১) আল্লাহর সাথে সততাঃ নাম-না-জানা এক বেদুইনের গল্প
খাইবার যুদ্ধের আগে এক বেদুইন মুসলিম হন এবং যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ জয়ের পর আল্লাহর রাসূল সাহাবিদের মধ্যে গনিমতের সম্পদ বণ্টন করতে শুরু করলেন। দীর্ঘ দিনের দারিদ্র্যের পর মুসলিমরা কিছু সম্পদ লাভ করেছে। সেই বেদুইনের ভাগেও গনিমতের কিছু সম্পদ পড়ল। রাসূল সেগুলো এক সাহাবিকে দিয়ে বললেন সেই বেদুইনের কাছে তার প্রাপ্য ভাগ বুঝিয়ে দিতে। সেই সাহাবি বেদুইনের কাছে সম্পদ নিয়ে এলে বেদুইন লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, - এগুলো কী? - এগুলো হচ্ছে তোমার গনিমতের অংশ। উত্তরটা শুনে বেদুইন সাহাবির যেন মন ভরলো না। তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে গেলেন। জানতে চাইলেন, - এগুলো কী? - এগুলো হলো তোমার গনিমতের অংশ। - ও আল্লাহর রাসূল, আমি তো গনিমতের আশায় মুসলিম হইনি! আমি তো আপনার অনুসরণ করেছি এজন্যে যে আমার এইখানে আঘাত লাগবে, আমি শহীদ হবো আর জান্নাত লাভ করবো!
কথাগুলো সে বললো নিজের ঘাড়ের দিকে হাত ঠেকিয়ে। রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, 'তুমি যদি আল্লাহর সাথে সৎ হয়ে থাকো, তবে আল্লাহ তোমার এই কথাকে সত্যি করবেন।'
কিছুকাল পরের কথা, অন্য আরেকটি যুদ্ধে সেই বেদুইন মারা গেলেন। অবাক করা বিষয় হলো খাইবার বিজয়ের দিনে তিনি শরীরের যে দিকে নির্দেশ করেছিলেন, ঠিক সে স্থানেই তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা যান। তার মৃতদেহ আল্লাহর রাসূলের সামনে আনা হলে তিনি জানতে চাইলেন, 'এই কি সেই লোক?' সাহাবিরা বললেন, 'হ্যাঁ, এই সেই লোক।' এরপর রাসূলুল্লাহ তাঁর গায়ের চাদর খুলে সেই বেদুইনের গায়ে জড়িয়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহর চাদর জড়ানো অবস্থাতেই তাকে দাফন করা হয়। নাম-না-জানা এক বেদুইন রাসূলুল্লাহর চাদরকে নিজের কাফন হিসেবে পেয়ে গেলেন! এরপর রাসূলুল্লাহ দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! তোমার এই বান্দা তোমার রাস্তায় যুদ্ধ করেছে এবং শহীদ হয়েছে। আমি এর সাক্ষী থাকলাম। '⁸¹
টিকাঃ
৮১. সুনান নাসাঈ, অধ্যায় জানাযা, হাদীস ১৩৭।
📄 ২) নাম-না-জানা এক আবিসিনিয়ান রাখালের গল্প
খাইবারের যুদ্ধের খানিক আগের কথা, খাইবারের এক আবিসিনিয়ান রাখাল দেখলো সেখানকার অধিবাসীরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে জানতে চাইলো তারা কার সাথে যুদ্ধ করবে। তারা উত্তর দিলো, 'আমরা এমন লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি যে দাবি করে সে আল্লাহর নবী।' এ কথা শুনে তার মনে পড়ে গেল নবীজির কথা। তাঁর কথা সে আগেও শুনেছে। সে সোজা চলে গেল মুসলিমদের ক্যাম্পে, দেখা করলো আল্লাহর রাসূলের সাথে, জানতে চাইলো ইসলাম সম্পর্কে। আল্লাহর রাসূল তাকে বললেন, - আমি মানুষকে আহবান করি ইসলামের দিকে, যেন মানুষ সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, আমি হচ্ছি আল্লাহর রাসূল এবং মানুষ যেন কেবল আল্লাহর ইবাদাত করে। যদি আমি সাক্ষ্য দিই, আল্লাহর উপর ঈমান আনি, তাহলে আমি বিনিময়ে কী পাবো? -তুমি পাবে জান্নাত。
সেই আবিসিনিয়ান রাখালের জন্য এতটুকুই ছিল যথেষ্ট। সে ইসলাম গ্রহণ করলো এবং জিহাদে যেতে প্রস্তুত হয়ে গেল। জিহাদে কেন যেতে হবে, কবে যেতে হবে, সালাতের আহকাম কী -- এসব নিয়ে সে কোনো তর্ক করলো না। শুধু এতটুকুই জানতে চাইলো, তার সাথে যে ভেড়াগুলো আছে সেগুলো সে কী করবে। আসলে এটাই ছিল সময়ের দাবি। সেই আবিসিনিয়ান রাখাল, সে ছিল একজন দাস, সে যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেল। যুদ্ধের পর তার লাশ আনা হলো, রাসূলুল্লাহ বললেন, 'এ হচ্ছে এমন এক বান্দা যাকে আল্লাহ তাআলা সম্মানিত করেছেন এবং তাকে বিশেষ উদ্দেশ্যে খাইবারের ময়দানের দিকে ধাবিত করেছেন। নিশ্চয়ই আমি তার পাশে দেখেছি জান্নাতের দুই হুরকে, অথচ সে এক ওয়াক্ত সালাতও কখনো আদায় করেনি (অর্থাৎ আদায়ের সুযোগ হয় নি)। ⁸²
টিকাঃ
৮২ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৭।
📄 ৩) যুদ্ধের ময়দানের একজন হিরো, আখিরাতের খাতায় যার প্রাপ্তি শূন্য
এই যুদ্ধে এক মুসলিম সৈনিক প্রচণ্ড বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলো। শত্রুপক্ষের কেউ তার সামনে দাঁড়াতে পারছিল না। সাহাবিরা তাকে দেখে বলাবলি করছিলেন এই লোকের জান্নাত বুঝি নিশ্চিত! কিন্তু রাসূল বলে উঠলেন, 'এই লোক জাহান্নামে যাবে।' সাহাবিরা কথাটা শুনে চমকে উঠলেন। এমন বীরের মতো যোদ্ধা জাহান্নামে যাবে এটা কারো বিশ্বাসই হচ্ছিল না! একজন সাহাবি সেই সৈনিকের পিছু নিলেন, তিনি দেখতে চান এই লোকের সাথে কী হতে চলেছে। তিনি দেখলেন, যুদ্ধ করতে করতে সেই লোকটি একসময় বেশ আঘাত পেল, আর আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে নিজেই নিজেকে হত্যা করে ফেললো। প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবি এবার রাসূলুল্লাহর কাছে ছুটে গেলেন। রাসূলুল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণী চোখের সামনে সত্য হতে দেখে দৃঢ়তার সাথে বলে উঠলেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসূল!' এরপর রাসূল সেই সাহাবিকে বললেন, 'যাও, লোকদের মাঝে ঘোষণা করে দাও যে, শুধুমাত্র মু'মিনরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাআলা চাইলে একজন ফাসিক লোককেও তাঁর দ্বীনের কাজে লাগাতে পারেন। '⁸³
টিকাঃ
৮৩ সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ২৪২।
📄 ৪) আবু ইয়াসার কা'ব ইবন আমরের ؓ কাহিন
ইনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর একজন সাহাবি, খাইবারের যুদ্ধে তিনি একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
'খাইবারের এক সন্ধ্যায় আমরা আল্লাহর রাসূলের সাথে ছিলাম। এমন সময় দেখলাম এক ইহুদি ভেড়ার পাল নিয়ে দুর্গের ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছে। সে সময় আমরা দুর্গ অবরোধ করে রেখেছিলাম। আল্লাহর রাসূল তখন বললেন, কে আমাকে এই ভেড়ার পালগুলো থেকে ভেড়া ধরে এনে খাওয়াতে পারবে? আমি বললাম, আমি পারবো! রাসূল তখন বললেন, যাও! নিয়ে এসো!
আমি উটপাখির মতো জোরে দৌড়াতে লাগলাম। রাসুলুল্লাহ আমার জন্যে দুআ করলেন এই বলে -- হে আল্লাহ আমাদেরকে তার সঙ্গ দ্বারা উপকৃত করো। আমি যখন ভেড়ার পালকে নাগালে পেলাম তখন পালের প্রথম ভেড়াটি দুর্গের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। তাই আমি পালের শেষ দিকের দুটো ভেড়া ধরে বগলদাবা করে এত জোরে দৌড় দিলাম যে আমার মনে হচ্ছিল আমার সাথে কিছুই নেই! এরপর সেগুলো আল্লাহর রাসূলের কাছে ছুঁড়ে মারলাম। তারপর সেই ভেড়া জবাই করা হলো এবং সবাই খুব তৃপ্তি সহকারে খেল।'
হুনাইনের যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা আলোচনা করতে গিয়ে এই কাহিনীটি পুনরায় স্মরণ করা যায়। ঘটনাটি মজার, কিন্তু এই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আবু ইয়াসার কেঁদে দেন। কারণ রাসূলুল্লাহ তার সাহাচার্য পাবার দুআ করেছিলেন আর যে কারণে তিনি ছিলেন সর্বশেষ মৃত্যুবরণকারী সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম: তার বন্ধুরা অনেকেই তার আগে দুনিয়া ছেড়ে চলে যান, আর তিনি রয়ে যান।