📄 অভিযানের সূচনা
খাইবারের যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরী সপ্তম বর্ষে। হুদাইবিয়ার চুক্তি সম্পাদন করে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের বিশ দিনের মাথায় আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর সাহাবিদের নিয়ে খাইবার অভিমুখে অভিযান শুরু করেন। গোটা আরব উপদ্বীপে ইহুদিদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল খাইবারে। মুসলিমরা জানতেন খাইবারে তাদের বিজয় হবেই। কারণ কয়েকদিন আগেই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে খাইবারে বিজয়ের ওয়াদা করেছেন।
"...তাদেরকে পুরষ্কৃত করলেন আসন্ন বিজয় দিয়ে। এবং বিপুল পরিমাণে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, যা তারা লাভ করবে..." (সূরা ফাতহ, ৪৮: ১৮-১৯)
সাহাবিরা উদ্যমের সাথে পথ চলতে লাগলেন। পথিমধ্যে আমীর ইবন আল-আকওয়াকে বলা হলো নাশীদ তৈরি করতে। আমীর ইবন আল-আকওয়া ছিলেন সালামা ইবন আল-আকওয়ার চাচা। বেদুইনদের গান গাওয়ার বিশেষ একটা ভঙ্গি ছিল। তাদের নাশীদ উটের উপর অন্যরকম প্রভাব ফেলত। উটগুলো চলতে চলতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ত, তখন নাশীদগুলো অনেকটা গরমের দিনের এক গ্লাস লেবুর শরবতের মতো কাজ করতো। নাশিদ শুনে তারা চাঙ্গা হয়ে উঠত।
আমীর ইবন আল-আকওয়া নাশিদ ধরলেন, নাশীদটির অর্থ বাংলায় অনেকটা এমন,
ও আল্লাহ! তুমি ছাড়া কীভাবে আমরা পথের দিশা পেতাম-- কীভাবে জানতাম সালাতের কথা, দান-সাদাকাই বা কীভাবে করতাম? ও আল্লাহ, তোমার কাছেই আমাদের আর্তি আমাদের ক্ষমা করে দাও, যত ভুল আমাদের সব মুছে দাও তোমার জন্য আমাদের কুরবান হয়ে যেতে দাও আমাদের আর্তি শুনে নাও ইয়া রব! তোমার শান্তির ঝর্ণা ঝরিয়ে দাও, শত্রুর মুখে আমাদের পাগুলো যেন ইস্পাতের চেয়েও দৃঢ় হয়ে যায় ওরা আর কত ভয় দেখাবে আমাদের? যতোই ভয় দেখাক, আমরা দমব না। ওরা তো সেই কবেই আমাদের বিরুদ্ধে বুনো নেকড়ের দলকে হন্যে হয়ে ডেকে চলেছে।
গানের কথাগুলো রাসূলুল্লাহর খুব মনে ধরল। তিনি মুগ্ধ হয়ে জানতে চাইলেন, কে এই নাশীদ গাইছে? সাহাবিরা আমীর ইবন আল-আকওয়ার নাম বললেন। আল্লাহর রাসূল তাঁর জন্য দুআ করলেন, 'ইয়ারহামুহুল্লাহ'-- আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুক。
এ কথা শোনামাত্র সাহাবিরা বুঝে গেলেন, আমীর ইবন আল-আকওয়ার জন্য শাহাদাত অপেক্ষা করে আছে। শাহাদাত আর ক্ষমা -- এই দুই বস্তু যে আলো আর ছায়ার মতো একটি অপরটির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে সেটা সাহাবিরা ভালোভাবেই জানতেন। আলো থাকলে যেমন ছায়া হবেই, আল্লাহর পথে শহীদ হলেও তেমনি আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। রাসূলুল্লাহর মুখে ইয়ারহামুহুল্লাহ শুনে উমার ইবন খাত্তাব উতলা হয়ে নবীজিকে বলে উঠলেন 'আল্লাহর রাসূল! শাহাদাত তো আমীর ইবন আল-আকওয়ার জন্য অবধারিত হয়ে গেল! ইশ, আল্লাহ যদি আমাদেরও তা দিয়ে ধন্য করতেন!'
আব্বাদ ইবন বিশরকে পাঠানো হলো ইহুদিদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহে। এখনকার মতো সেই সময়েও যুদ্ধকে ঘিরে প্রোপাগান্ডা চলতো। মদীনায় ইহুদিদের পরিণতি দেখে খাইবারের ইহুদিরাও বেশ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। কিন্তু তারা প্রোপাগান্ডা ছড়াতে লাগলো এই বলে যে, তাদের বাহিনী ভীষণ শক্তিশালী, অবরোধের মধ্যেও তারা কয়েক বছর টিকে থাকার সামর্থ্য রাখে ইত্যাদি। অবশ্য এসব প্রোপাগান্ডায় মুসলিমরা মোটেও দমলেন না, তারা খাইবারের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন。
আল্লাহর রাসূল এরপর দুআ করলেন।
'হে আল্লাহ! আপনি আসমান ও তার ছায়াতলে যা কিছু আছে তার প্রতিপালক! আপনি জমিনে যা কিছু হয় তার প্রতিপালক! আপনি শয়তান ও তাদের দ্বারা পথভ্রষ্টদের প্রতিপালক! আপনি বাতাস ও যা কিছু সে বাতাস উড়িয়ে নেয় সেসবের প্রতিপালক! আমি আপনার কাছে এই জনপদ এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে নিহিত কল্যাণ প্রার্থনা করছি। এর মাঝে যা কিছু কল্যাণ আছে, সেসবের প্রার্থনা আপনার কাছে করছি। এই জনপদের বাসিন্দা এবং তাদের যত অকল্যাণ, সেসব থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাইছি।'
এই বলে তিনি সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বললেন, 'আল্লাহর নামে এগিয়ে যাও!'
📄 মুখোমুখি মুসলিম এবং খাইবারের ইহুদিরা
খাইবার ছিল এক বিশাল এলাকা জুড়ে অনেকগুলো দুর্গের সমাহার। এই দুর্গগুলো খাইবারের বিভিন্ন স্থানে, পাহাড় পর্বতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এ কারণে খাইবার যুদ্ধ ইহুদিদের সাথে আগের সব যুদ্ধগুলোর তুলনায় বেশ জটিল ছিল। অবস্থানগত দিক থেকেও খাইবার ছিল সুরক্ষিত একটি এলাকা। রাসূলুল্লাহ এক এক করে সবগুলো দুর্গ জয় করার জন্য অগ্রসর হলেন। শুরু হলো নাঈম দুর্গ দিয়ে।
যুদ্ধ শুরু হলো। ইহুদিদের এক সাহসী যোদ্ধা বেরিয়ে এল, তার নাম মারহাব। সে দ্বন্দ্বযুদ্ধের ডাক দিল। মুসলিমদের মধ্য থেকে এগিয়ে গেলেন আমীর ইবন আল-আকওয়া, যার কথা একটু আগেই এসেছে। তিনি খাইবারের যাত্রাপথে নাশীদ গেয়ে সবাইকে চাঙ্গা রেখেছিলেন। দু'জন দু'জনকে আঘাত করে কাবু করতে চাইলেন। এক পর্যায়ে মারহাব তাঁর তলোয়ার দিয়ে আঘাত করতে চাইলেন সেই তলোয়ার আমিরের ঢালে আটকে যায়। সেই সুযোগে আমীর মারহাবের উপরে আঘাত করে তাকে শেষ করে দিতে চাইলেন। কিন্তু তাঁর তলোয়ার ছোট হবার কারণে আঘাত করতে গিয়ে তলোয়ার থাকা অবস্থায় তাঁর নিজের হাঁটুতে লাগে। এই আঘাত থেকে তাঁর হয় রক্তক্ষরণ আর সেই রক্তক্ষরণ থেকে মৃত্যু। ওদিকেই আমীর শহীদ হয়ে গেলেন, আল্লাহর রাসুলের দুআ কবুল হলো। এরপর আমীরের জায়গায় আসলেন আলী। এসেই মারহাবকে হত্যা করলেন। অবশ্য অন্য বর্ণনামতে মারহাবকে হত্যা করেছিলেন মুহাম্মদ ইবন মাসলামাহ।
জীবন সবসময় মানুষের পরিকল্পনামাফিক চলে না। আমীর বীরের মতো শত্রুর দিকে আঘাত হানতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর বদলে নিজেই নিজের তরবারিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো আমিরের সকল আমল ধ্বংস হয়ে গেছে, সে আত্মহত্যা করেছে। চাচার ব্যাপারে এই কথা শুনে সালামা ইবন আল আকওয়ার খুব মন খারাপ হলো। রাসুল ﷺ তাঁকে ডেকে জানতে চাইলেন কী হয়েছে। সালামা জানতে চাইলেন, 'আমার চাচার সকল আমল কি ধ্বংস হয়ে গেছে ইয়া রাসূলাল্লাহ ﷺ? রাসুল ﷺ তাঁকে আশ্বাস দিয়ে প্রত্যুত্তরে বললেন, 'যে এই কথা বলেছে সে মিথ্যে বলেছে। আমীর দ্বিগুণ পুরস্কার পাবে!'
ইহুদিদের এই নাঈম দুর্গ মুসলিমদের পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবরোধের প্রথম কিছুদিন আবু বকরের হাতে ছিল মুসলিম বাহিনীর পতাকা। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে বিজয় আসছিল না। সবাই যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত, এমন সময় আল্লাহর রাসুল ﷺ ঘোষণা দিলেন,
'আগামীকাল আমি এমন একজনকে পতাকা দান করবো যার জন্যে আল্লাহ দুর্গের দরজা খুলে দিবেন। সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে, এবং আল্লাহ আর তাঁর রাসুলও তাঁকে ভালোবাসেন।'
এই ঘোষণা যেন টনিকের মতো কাজে দিল। সবার ক্লান্তি নিমিষে কোথায় চলে গেল। কার হাতে আল্লাহর রাসুল ﷺ পতাকা তুলে দেবেন সেটা ভেবে সবাই রোমাঞ্চিত বোধ করতে লাগলেন। পরদিন সাহাবিরা রাসূলুল্লাহর কাছে জড়ো হলেন। মনে মনে সবাই আশা করছিলেন-- ইশ্! আল্লাহর রাসুল যদি আমার হাতে পতাকা তুলে দিতেন! উমার ইবন খাত্তাব নিজেই বলেছেন তাঁর মনে সেদিন কী ছিল। তিনি বলেছেন, 'আমি কোনোদিন নেতৃত্ব বা পদের আকাঙ্ক্ষা করিনি। তবে খাইবারের সেই দিনে আমার মনে নেতৃত্বের আশা জেগেছিল।'
সবাইকে ছাপিয়ে সেদিন যিনি পতাকা লাভ করেছিলেন তিনি হচ্ছেন আলী ইবন আবি তালিব। কিন্তু যিনি এই বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হলেন, তিনি নিজেই ছিলেন অনুপস্থিত। সকাল বেলা আলী সেখানে ছিলেন না। সাহাবিরা জানালেন আলী চোখের সমস্যায় ভুগছেন। রাসূল আলীকে ডেকে পাঠালেন, তাঁর মুখের কিছু লালা আলীর চোখে লাগিয়ে দিলেন আর সাথে সাথে আলী সুস্থ হয়ে উঠলেন। আল্লাহর রাসূলের আরও একটি মু'জিযা। এরপর তার হাতে পতাকা তুলে দিয়ে বললেন, 'এগিয়ে যাও! আল্লাহ বিজয় দান করা পর্যন্ত পিছু হটো না।' আলী জানতে চাইলেন, 'কোন কথার উপর আমি লোকদের সাথে লড়াই করবো? রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাও যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য প্রদান করে-- আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল। যখনই তারা এ সাক্ষ্য প্রদান করবে তখনই তাদের জান-মাল তোমার হাত থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে। তবে (আইনগত) অধিকারের কথা হলে ভিন্ন। আর তাদের (আন্তরিকতার) হিসাব আল্লাহর কাছে।'⁸⁰
আলী হুংকার দিতে দিতে এগিয়ে চললেন। সাহাবিরাও তার পিছু পিছু ছুটছেন। দুর্গের সামনে এসে পতাকাটি পাথরের মধ্যে গেঁথে দিলেন। এই দৃশ্য দেখে ইহুদিরা জিজ্ঞেস করলো, - কে তুমি? - আমি আলী ইবন আবি তালিব। - তাওরাতের কসম! তোমরা আমাদের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছো!
দশ দিনের মাথায় শেষ পর্যন্ত আলীর নেতৃত্বে নাঈম দুর্গ জয় হয়ে গেল। আল্লাহর রাসূলের ওয়াদা সত্য হলো। এরপর মুসলিমরা অগ্রসর হলেন আস-সা'ব দুর্গের দিকে। তিন দিনের মাথায় আস-সা'ব দুর্গ জয় হলো। এ জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন আল-হাব্বাব ইবন আল-মুনযির। এই দুর্গ জয়ের মাধ্যমে মুসলিমরা অনেক খাদ্যের সন্ধান পেলেন। এরপর তারা অগ্রসর হলেন আয-যুবাইর দুর্গের দিকে। সেখানে তাদের অবরোধ করে তাদের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার তিন দিনের মাথায় তারা যুদ্ধ করতে নেমে আসলো এবং পরাজিত হলো।
এরপর মুসলিম সেনাবাহিনী অভিযান চালালো উবাই দুর্গে। গোলাবর্ষণের মাধ্যমে খুব সহজে উবাই দুর্গ আয়ত্তে চলে আসলো। এরপর মুসলিমরা একে একে জয় করলেন আল-কামূস, আল-ওয়াতীহ এবং আস-সুলালাম দুর্গ। চৌদ্দ দিন অবরোধ করে রাখার পর এই দুর্গের ইহুদিরা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়। এভাবেই বিজয় হলো সমগ্র খাইবার। এরপর ইহুদিরা অস্ত্র ছেড়ে সন্ধি আলোচনার জন্য নেমে আসে। এ যুদ্ধে নিহত হয় তিরানব্বই জন ইহুদি। আর মুসলিমদের থেকে শহীদ হন পনেরো থেকে বিশ জন, আল্লাহই ভালো জানেন。
টিকাঃ
৮০ সহীহ বুখারি, অধ্যায় মাঘাযি, হাদীস ২৫০।
📄 খাইবারের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা
১) নেতৃত্বের প্রতি লোভের ভয়াবহতা
নেতৃত্বের প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণ থাকে। কিন্তু ইসলামে নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়ার ব্যাপারে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহর চাচা হওয়া সত্ত্বেও আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব যখন নেতৃস্থানীয় পদ চেয়েছিলেন রাসূল তাকে বলেছিলেন, 'আমরা তাকে এই পদ দেবো না, যে এই পদের জন্যে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে।' এটাই ইসলামের শিক্ষা। উমারের ঈমানের উচ্চতা নিয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই, নেতৃত্বের ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহই ছিল না। কিন্তু খাইবারের সেইদিন উমারের মতো মানুষের মনেও নেতৃত্ব পাবার ইচ্ছে কাজ করছিল। এর কারণ হলো সেদিন এমন এক লোককে নেতৃত্ব দেওয়া হবে যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন এবং সেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। নিঃসন্দেহে এত বড় সম্মান পেতে কার না ইচ্ছে করবে!
নেতৃত্বের প্রতি লোভ কতটা খারাপ সেটা আমরা বুঝতে পারি তিরমিযীর একটি হাদীসে, রাসূল বলেন 'যদি দুটি নেকড়েকে একপাল ভেড়ার নিকট পাঠানো হয় তাহলে নেকড়েদের দ্বারা ভেড়াগুলো যতটা না ক্ষতির সম্মুখীন হবে তার চেয়েও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয় একজন মানুষ যখন সে সম্পদ এবং নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা করে।' কাজেই নেতৃত্বের প্রতি অন্তরে ভালোবাসা নির্মূল করা চাই, কারণ এই নেতৃত্বের বোঝা একদিন আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
২) জিহাদের উদ্দেশ্য
আলীর হাতে যখন আল্লাহর রাসূল পতাকা তুলে দিচ্ছিলেন তখন তাকে বলে দিয়েছিলেন,
'... তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করবে। আল্লাহর যে হক্ব তাদের আদায় করতে হবে সে ব্যাপারে তাদের অবহিত করবে। আল্লাহর কসম! তোমার দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ যদি মাত্র একজন মানুষকেও হিদায়াত দেন তাহলে তা তোমার জন্য লাল উটের চাইতেও মূল্যবান।'
এই হাদীস থেকে আমরা শিক্ষা পাই, কাফিরদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক জিহাদের একটি উদ্দেশ্য হলো দাওয়াত দেওয়া। মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করা, ইসলামের ছায়াতলে মানুষকে প্রবেশ করানো। জিহাদের মাধ্যমে দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাহিলিয়াতের প্রভাব এবং কুফর শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যেন ইসলাম গ্রহণের পথে মানুষের কোনো বাধা না থাকে।
জিহাদের সাথে অন্য যেকোনো যুদ্ধের পার্থক্য এখানেই। অন্য যুদ্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পদ অর্জন, ক্ষুধার তাড়না, কিংবা ক্ষমতার লোভ। কিন্তু মুসলিমরা যুদ্ধ করে একটি পবিত্র উদ্দেশ্যে, তা হলো আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে দেওয়া। রাসূল বলেছেন 'আমি কিছু মানুষকে জান্নাতে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখেছি।' এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে যারা এক সময় মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং পরবর্তীতে মুসলিম হয়েছে। রাসূল আলীকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর উচিত হবে আগে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া। এই দাওয়াতের ফলে যদি একজন লোকও ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে সেটাই হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গনিমাহ।
৩) অন্তরের আন্তরিকতা
বেদুইন এবং আবিসিনিয়ান সেই রাখালের গল্প থেকে শিক্ষা হলো, কেউ যদি আল্লাহর পথে চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করেন। সেই বেদুইন যেমন মৃত্যু চেয়েছেন, আল্লাহ তাকে ঠিক সেভাবে মৃত্যু দিয়েছেন। এর কারণ হলো তিনি ছিলেন সৎ এবং আন্তরিক। জিহাদের নিয়ত তার এতটা বিশুদ্ধ ছিল যে তিনি গনিমাহ পর্যন্ত চাননি। রাসূল বলেছেন, 'আমাকে তরবারি সহ পাঠানো হয়েছে এবং আমার রিযিক তরবারির ছায়াতলে।' এ কারণে আলিমরা বলেন গনিমতের রিযিক হলো শ্রেষ্ঠ রিযিক। কিন্তু এই বেদুইন সাহাবি ঈমানের এমন উঁচু স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন যে তিনি জান্নাত ছাড়া আর কিছুই চাইতেন না। এবং তার এই চাওয়ার মাঝে কোনো খাদ ছিল না। তাই তিনি লাভ করেছিলেন এক বিরল সম্মান, আল্লাহর রাসূলের চাদর।
আল্লাহর রাসূলের ওযুর পানির জন্য সাহাবিরা কাড়াকাড়ি করতেন। আর এই বেদুইন সাহাবি কোনো কাড়াকাড়ি ছাড়াই শুধুমাত্র নিয়তের বিশুদ্ধতার জোরে আল্লাহর রাসূলের চাদর গায়ে জড়িয়ে কবরে গিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এ এক বিরল সম্মান।
৪) গনিমতের সম্পদ চুরির ভয়াবহতা
ঘটনাটি ঘটে খাইবার অথবা খাইবার পরবর্তী ওয়াদী আল-কুরা অভিযানে। রাসূলুল্লাহর এক সাহাবি ইহুদিদের তীরের আঘাতে মারা যান। একদল সাহাবি বলতে থাকেন, 'অমুক শহীদ হয়েছে! অমুক শহীদ হয়েছে!' কিন্তু আল্লাহর রাসূল বললেন, 'কিছুতেই না। গনিমতের মাল থেকে যে চাদর সে চুরি করেছে, আমি দেখেছি সেই চাদর তাকে আগুন হয়ে ঘিরে রেখেছে।' এই লোকটি ছিলেন একজন মুসলিম, একজন মুজাহিদ। কিন্তু গনিমতের সম্পদ চুরি করা এতই ভয়াবহ অপরাধ যে, এজন্য একজন মানুষকে জাহান্নামের আগুনে যেতে হয়।
টিকাঃ
৮৪. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ঈমান, হাদীস ২১৭।
১) নেতৃত্বের প্রতি লোভের ভয়াবহতা
নেতৃত্বের প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণ থাকে। কিন্তু ইসলামে নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়ার ব্যাপারে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহর চাচা হওয়া সত্ত্বেও আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব যখন নেতৃস্থানীয় পদ চেয়েছিলেন রাসূল তাকে বলেছিলেন, 'আমরা তাকে এই পদ দেবো না, যে এই পদের জন্যে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে।' এটাই ইসলামের শিক্ষা। উমারের ঈমানের উচ্চতা নিয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই, নেতৃত্বের ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহই ছিল না। কিন্তু খাইবারের সেইদিন উমারের মতো মানুষের মনেও নেতৃত্ব পাবার ইচ্ছে কাজ করছিল। এর কারণ হলো সেদিন এমন এক লোককে নেতৃত্ব দেওয়া হবে যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন এবং সেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। নিঃসন্দেহে এত বড় সম্মান পেতে কার না ইচ্ছে করবে!
নেতৃত্বের প্রতি লোভ কতটা খারাপ সেটা আমরা বুঝতে পারি তিরমিযীর একটি হাদীসে, রাসূল বলেন 'যদি দুটি নেকড়েকে একপাল ভেড়ার নিকট পাঠানো হয় তাহলে নেকড়েদের দ্বারা ভেড়াগুলো যতটা না ক্ষতির সম্মুখীন হবে তার চেয়েও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয় একজন মানুষ যখন সে সম্পদ এবং নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা করে।' কাজেই নেতৃত্বের প্রতি অন্তরে ভালোবাসা নির্মূল করা চাই, কারণ এই নেতৃত্বের বোঝা একদিন আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
২) জিহাদের উদ্দেশ্য
আলীর হাতে যখন আল্লাহর রাসূল পতাকা তুলে দিচ্ছিলেন তখন তাকে বলে দিয়েছিলেন,
'... তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করবে। আল্লাহর যে হক্ব তাদের আদায় করতে হবে সে ব্যাপারে তাদের অবহিত করবে। আল্লাহর কসম! তোমার দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ যদি মাত্র একজন মানুষকেও হিদায়াত দেন তাহলে তা তোমার জন্য লাল উটের চাইতেও মূল্যবান।'
এই হাদীস থেকে আমরা শিক্ষা পাই, কাফিরদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক জিহাদের একটি উদ্দেশ্য হলো দাওয়াত দেওয়া। মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করা, ইসলামের ছায়াতলে মানুষকে প্রবেশ করানো। জিহাদের মাধ্যমে দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাহিলিয়াতের প্রভাব এবং কুফর শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যেন ইসলাম গ্রহণের পথে মানুষের কোনো বাধা না থাকে।
জিহাদের সাথে অন্য যেকোনো যুদ্ধের পার্থক্য এখানেই। অন্য যুদ্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পদ অর্জন, ক্ষুধার তাড়না, কিংবা ক্ষমতার লোভ। কিন্তু মুসলিমরা যুদ্ধ করে একটি পবিত্র উদ্দেশ্যে, তা হলো আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে দেওয়া। রাসূল বলেছেন 'আমি কিছু মানুষকে জান্নাতে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখেছি।' এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে যারা এক সময় মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং পরবর্তীতে মুসলিম হয়েছে। রাসূল আলীকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর উচিত হবে আগে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া। এই দাওয়াতের ফলে যদি একজন লোকও ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে সেটাই হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গনিমাহ।
৩) অন্তরের আন্তরিকতা
বেদুইন এবং আবিসিনিয়ান সেই রাখালের গল্প থেকে শিক্ষা হলো, কেউ যদি আল্লাহর পথে চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করেন। সেই বেদুইন যেমন মৃত্যু চেয়েছেন, আল্লাহ তাকে ঠিক সেভাবে মৃত্যু দিয়েছেন। এর কারণ হলো তিনি ছিলেন সৎ এবং আন্তরিক। জিহাদের নিয়ত তার এতটা বিশুদ্ধ ছিল যে তিনি গনিমাহ পর্যন্ত চাননি। রাসূল বলেছেন, 'আমাকে তরবারি সহ পাঠানো হয়েছে এবং আমার রিযিক তরবারির ছায়াতলে।' এ কারণে আলিমরা বলেন গনিমতের রিযিক হলো শ্রেষ্ঠ রিযিক। কিন্তু এই বেদুইন সাহাবি ঈমানের এমন উঁচু স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন যে তিনি জান্নাত ছাড়া আর কিছুই চাইতেন না। এবং তার এই চাওয়ার মাঝে কোনো খাদ ছিল না। তাই তিনি লাভ করেছিলেন এক বিরল সম্মান, আল্লাহর রাসূলের চাদর।
আল্লাহর রাসূলের ওযুর পানির জন্য সাহাবিরা কাড়াকাড়ি করতেন। আর এই বেদুইন সাহাবি কোনো কাড়াকাড়ি ছাড়াই শুধুমাত্র নিয়তের বিশুদ্ধতার জোরে আল্লাহর রাসূলের চাদর গায়ে জড়িয়ে কবরে গিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এ এক বিরল সম্মান।
৪) গনিমতের সম্পদ চুরির ভয়াবহতা
ঘটনাটি ঘটে খাইবার অথবা খাইবার পরবর্তী ওয়াদী আল-কুরা অভিযানে। রাসূলুল্লাহর এক সাহাবি ইহুদিদের তীরের আঘাতে মারা যান। একদল সাহাবি বলতে থাকেন, 'অমুক শহীদ হয়েছে! অমুক শহীদ হয়েছে!' কিন্তু আল্লাহর রাসূল বললেন, 'কিছুতেই না। গনিমতের মাল থেকে যে চাদর সে চুরি করেছে, আমি দেখেছি সেই চাদর তাকে আগুন হয়ে ঘিরে রেখেছে।' এই লোকটি ছিলেন একজন মুসলিম, একজন মুজাহিদ। কিন্তু গনিমতের সম্পদ চুরি করা এতই ভয়াবহ অপরাধ যে, এজন্য একজন মানুষকে জাহান্নামের আগুনে যেতে হয়।
টিকাঃ
৮৪. সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ঈমান, হাদীস ২১৭।
📄 খাইবার যুদ্ধের ফলাফল
খাইবারের ইহুদিরা আত্মসমর্পণ করার পরে আল্লাহর রাসূলের সাথে তাদের এই মর্মে চুক্তি হয় যে, তারা পরনের কাপড় পরে খাইবার ছেড়ে চলে যাবে এবং যাবতীয় অর্থ-সম্পদ, জায়গা-জমি, সোনা-রুপা, ঘোড়া, বর্ম সবকিছু রেখে যাবে। রাসূল তাদেরকে বলে দিলেন যদি তারা কোনো অর্থ-সম্পদ লুকানোর চেষ্টা করে তাহলে এর জন্য উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। ইহুদিদের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা নতুন কিছু নয়। রাসূলুল্লাহর যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই জাতিটি মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আসছে।
চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে খাইবারের ইহুদিরা এবার কিছু সম্পদ লুকিয়ে ফেললো। এই সম্পদগুলো ছিল বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের। বনু কুরায়যার ঘটনায় তাকে হত্যা করা হয়েছিল। বনু নাযিরকে যখন বের করে দেওয়া হয়, তখন হুয়াই ইবন আখতাব বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার একটি চামড়ার মাঝে লুকিয়ে খাইবারে রেখে এসেছিল। তার সেই অঢেল সম্পদ তখনও খাইবারে ছিল। বিষয়টা আল্লাহর রাসূল জানতেন। কিনানা ইবন আর-রাবীকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হলো,
- হুয়াইয়ের সেই সম্পদ কোথায়?
- সেই সম্পদ তো যুদ্ধ আর আমাদের থাকা খাওয়ায় খরচ হয়ে গেছে।
- না, সেটা হতে পারে না। যুদ্ধ তো মাত্র সেদিন হলো। এই অল্প ক'দিনের মাঝে এই পরিমাণ সম্পদ খরচ হয়ে যাবার কথা না।
কিনানা তবু অস্বীকার করতে থাকলো। ইহুদিরা কত সাবলীলভাবে মিথ্যা বলতে পারে এই তার একটা নমুনা। পরে এক বুড়ো ইহুদি বললো, 'আমি হুয়াই ইবন আখতাবকে প্রায়ই অমুক জায়গায় ঘুরঘুর করতে দেখতাম।' সাহাবিরা তখন সে জায়গায় গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে সেই সম্পদের কিছু অংশের সন্ধান পেলেন। কিনানাকে জিজ্ঞেস করা হলো বাকি সম্পদ কোথায়। সে আবারও বললো সে কিছুই জানে না। তাকে আল যুবাইর ইবন আওয়্যামের হাতে তুলে দেওয়া হলো। সোজা আঙুলে যখন ঘি ওঠে না, তখন তাকে বাঁকা করতেই হয়। তিনি তাকে মারধোর করে বাকি সম্পদের ব্যাপারে তথ্য বের করলেন। এরপর কিনানাকে তুলে দেওয়া হয় মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার হাতে। এই সেই কিনানা যে তার ভাই মাহমুদ ইবন মাসলামাকে হত্যা করেছে। আজ সে তার হাতের মুঠোয়! তিনি কিনানাকে হত্যা করে ভাই হত্যার প্রতিশোধ নেন।
দুর্গ থেকে বের হয়ে ইহুদিরা রাসূলুল্লাহর কাছে অনুরোধ করলো যেন তাদেরকে খাইবারে থাকতে দেওয়া হয়। তারা বললো, 'আমরা আপনাদের চাইতে এই ভূমি চাষাবাদে বেশি দক্ষ।' এই কথা বলে আসলে তারা খাইবারে তাদের থাকতে দেওয়ার জন্য নবীজিকে মানানোর চেষ্টা করছিল। রাসূলুল্লাহ তাদের প্রস্তাবে রাজি হলেন। উৎপাদিত শস্যের অর্ধেক ইহুদিরা পাবে -- এই শর্তে ইহুদিরা খাইবারে থেকে যাওয়ার অনুমতি পেল। তবে রাসূলুল্লাহ একটি শর্ত আরোপ করে দিলেন। তা হলো -- মুসলিমরা যখন চাইবে, তখনই তাদেরকে খাইবার থেকে বের করে দেওয়ার অধিকার রাখে।
ইহুদিদের খাইবারে চাষাবাদ করতে দেওয়াটা মুসলিমদের জন্য লাভজনক ছিল। কেননা সাহাবিদের হাতে জমি দেখাশোনা করার সময় ছিল না। তারা ব্যস্ত ছিলেন ইলম, দাওয়াহ আর জিহাদ নিয়ে। উপরন্তু ইহুদিরা ছিল খাইবারের জমি চাষাবাদে দক্ষ।
ইহুদিদের সাথে আল্লাহর রাসূলের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। এ পর্যন্ত প্রতিটি ইহুদি গোত্র মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করেছে। তাই যেকোনো মুহূর্তে তাদের খাইবার থেকে বের করে দেওয়ার শর্তারোপ করে তাদের সার্বক্ষণিক চাপের মুখে রাখলেন। এতকিছুর পরেও তাদের চরিত্র বদলায়নি। রাসূলুল্লাহ প্রতি বছর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে খাইবারের উৎপাদিত শস্যের পরিমাপ করে আনতে পাঠাতেন। প্রথমে তারা তার পরিমাপ করার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানায়, পরে তারা তাকে ঘুষ দিয়ে কিনে নিতে চায়। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা খুব রেগে যান। তাদের বলেন, 'আল্লাহর দুশমন কোথাকার! তোরা আমাকে ঘুষ দিতে চাস? তোরা জেনে রাখ, তোদের প্রতি ঘৃণা আর আল্লাহর রাসূলের প্রতি আমার ভালোবাসা আমাকে তোদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করার পথে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না!'
পরে অবশ্য তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তাদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণই করেছিলেন। পরবর্তীতে খাইবারের ইহুদিরা আবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। উমারের খিলাফতকালে তারা আবদুল্লাহ ইবন উমারকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে দুই হাত ভেঙে দেয়। এর আগে আল্লাহর রাসূলের যুগেই এক সাহাবিকে হত্যা করেছিল কিন্তু সেবার শক্ত প্রমাণ ছিল না। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবন উমারের সাথে তারা যা করেছিল সেটা ছিল সন্দেহাতীত। তাই উমার তাদেরকে আর সুযোগ দেননি, খাইবার থেকে বের করে দেন। এরপর তারা শামে চলে যায়।
খাইবার বিজয়ের মাধ্যমে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা বেশ সচল হয়। কারণ খাইবার থেকে মুসলিমরা বিপুল গনিমাহ অর্জন করে। আবদুল্লাহ ইবন উমারের একটি কথাতেই বোঝা যায় খাইবারের বিজয় তাদের জীবনে কতটা পরিবর্তন এনেছিল। তিনি বলেন, 'খাইবার বিজয়ের আগ পর্যন্ত আমাদের পেট ভরে এক বেলা খাওয়া হতো না।' মুহাজিররা খেজুর বাগানগুলো আনসারদের ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন। খাইবারের যখন পতন হচ্ছিল তখন ফাদাকের অধিবাসীরা আগেভাগেই আত্মসমর্পণ করে ফেলে। তাদের সাথেও অর্ধেক ফসল ভাগাভাগির চুক্তি হয়। তবে এই ফসলের মালিক হন কেবল আল্লাহর রাসূল কেননা, তাদের প্রাপ্ত সম্পদ ছিল ফাঈ, গনিমাহ নয়। কারণ ফাদাক সামরিক শক্তির জোরে বিজয় হয়নি। এর মাধ্যমে আল্লাহর রাসূলের আর্থিক অবস্থা সহজ হয়ে যায়।
খাইবারের সাথে আরও দুটি অঞ্চল বিজয় হয়। সেগুলো হলো ওয়াদী আল-কুরা এবং তাইমা। ওয়াদী আল-কুরার ইহুদিদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেই তাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং তারা আত্মসমর্পণ করে। তাদের সাথে খাইবারের অনুরূপ চুক্তি করা হয়। আর তাইমার অধিবাসীরা ফাদাকের মতো যুদ্ধ না করেই আত্মসমর্পণ করে।
মুসলিমদের হাতে খাইবার, ফাদাক, ওয়াদী আল-কুরা এবং তাইমার পতন নিয়ে গোটা আরব আলোচনায় মুখর হয়ে উঠলো। কুরাইশরা বিশ্বাসই করতে পারছিল না দুর্ভেদ্য দুর্গ, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা আর দীর্ঘকালীন রসদ সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও খাইবারের পতন হয়েছে। এই পরাজয়ের মাধ্যমে কুরাইশরা একটি বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকলো। আরব উপদ্বীপের দরজা ইসলামের জন্য আরও উন্মুক্ত হয়ে গেল।
টিকাঃ
৮৯. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৪।
খাইবারের ইহুদিরা আত্মসমর্পণ করার পরে আল্লাহর রাসূলের সাথে তাদের এই মর্মে চুক্তি হয় যে, তারা পরনের কাপড় পরে খাইবার ছেড়ে চলে যাবে এবং যাবতীয় অর্থ-সম্পদ, জায়গা-জমি, সোনা-রুপা, ঘোড়া, বর্ম সবকিছু রেখে যাবে। রাসূল তাদেরকে বলে দিলেন যদি তারা কোনো অর্থ-সম্পদ লুকানোর চেষ্টা করে তাহলে এর জন্য উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। ইহুদিদের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা নতুন কিছু নয়। রাসূলুল্লাহর যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই জাতিটি মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আসছে।
চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে খাইবারের ইহুদিরা এবার কিছু সম্পদ লুকিয়ে ফেললো। এই সম্পদগুলো ছিল বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের। বনু কুরায়যার ঘটনায় তাকে হত্যা করা হয়েছিল। বনু নাযিরকে যখন বের করে দেওয়া হয়, তখন হুয়াই ইবন আখতাব বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার একটি চামড়ার মাঝে লুকিয়ে খাইবারে রেখে এসেছিল। তার সেই অঢেল সম্পদ তখনও খাইবারে ছিল। বিষয়টা আল্লাহর রাসূল জানতেন। কিনানা ইবন আর-রাবীকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হলো,
- হুয়াইয়ের সেই সম্পদ কোথায়?
- সেই সম্পদ তো যুদ্ধ আর আমাদের থাকা খাওয়ায় খরচ হয়ে গেছে।
- না, সেটা হতে পারে না। যুদ্ধ তো মাত্র সেদিন হলো। এই অল্প ক'দিনের মাঝে এই পরিমাণ সম্পদ খরচ হয়ে যাবার কথা না।
কিনানা তবু অস্বীকার করতে থাকলো। ইহুদিরা কত সাবলীলভাবে মিথ্যা বলতে পারে এই তার একটা নমুনা। পরে এক বুড়ো ইহুদি বললো, 'আমি হুয়াই ইবন আখতাবকে প্রায়ই অমুক জায়গায় ঘুরঘুর করতে দেখতাম।' সাহাবিরা তখন সে জায়গায় গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে সেই সম্পদের কিছু অংশের সন্ধান পেলেন। কিনানাকে জিজ্ঞেস করা হলো বাকি সম্পদ কোথায়। সে আবারও বললো সে কিছুই জানে না। তাকে আল যুবাইর ইবন আওয়্যামের হাতে তুলে দেওয়া হলো। সোজা আঙুলে যখন ঘি ওঠে না, তখন তাকে বাঁকা করতেই হয়। তিনি তাকে মারধোর করে বাকি সম্পদের ব্যাপারে তথ্য বের করলেন। এরপর কিনানাকে তুলে দেওয়া হয় মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার হাতে। এই সেই কিনানা যে তার ভাই মাহমুদ ইবন মাসলামাকে হত্যা করেছে। আজ সে তার হাতের মুঠোয়! তিনি কিনানাকে হত্যা করে ভাই হত্যার প্রতিশোধ নেন।
দুর্গ থেকে বের হয়ে ইহুদিরা রাসূলুল্লাহর কাছে অনুরোধ করলো যেন তাদেরকে খাইবারে থাকতে দেওয়া হয়। তারা বললো, 'আমরা আপনাদের চাইতে এই ভূমি চাষাবাদে বেশি দক্ষ।' এই কথা বলে আসলে তারা খাইবারে তাদের থাকতে দেওয়ার জন্য নবীজিকে মানানোর চেষ্টা করছিল। রাসূলুল্লাহ তাদের প্রস্তাবে রাজি হলেন। উৎপাদিত শস্যের অর্ধেক ইহুদিরা পাবে -- এই শর্তে ইহুদিরা খাইবারে থেকে যাওয়ার অনুমতি পেল। তবে রাসূলুল্লাহ একটি শর্ত আরোপ করে দিলেন। তা হলো -- মুসলিমরা যখন চাইবে, তখনই তাদেরকে খাইবার থেকে বের করে দেওয়ার অধিকার রাখে।
ইহুদিদের খাইবারে চাষাবাদ করতে দেওয়াটা মুসলিমদের জন্য লাভজনক ছিল। কেননা সাহাবিদের হাতে জমি দেখাশোনা করার সময় ছিল না। তারা ব্যস্ত ছিলেন ইলম, দাওয়াহ আর জিহাদ নিয়ে। উপরন্তু ইহুদিরা ছিল খাইবারের জমি চাষাবাদে দক্ষ।
ইহুদিদের সাথে আল্লাহর রাসূলের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। এ পর্যন্ত প্রতিটি ইহুদি গোত্র মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করেছে। তাই যেকোনো মুহূর্তে তাদের খাইবার থেকে বের করে দেওয়ার শর্তারোপ করে তাদের সার্বক্ষণিক চাপের মুখে রাখলেন। এতকিছুর পরেও তাদের চরিত্র বদলায়নি। রাসূলুল্লাহ প্রতি বছর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে খাইবারের উৎপাদিত শস্যের পরিমাপ করে আনতে পাঠাতেন। প্রথমে তারা তার পরিমাপ করার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানায়, পরে তারা তাকে ঘুষ দিয়ে কিনে নিতে চায়। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা খুব রেগে যান। তাদের বলেন, 'আল্লাহর দুশমন কোথাকার! তোরা আমাকে ঘুষ দিতে চাস? তোরা জেনে রাখ, তোদের প্রতি ঘৃণা আর আল্লাহর রাসূলের প্রতি আমার ভালোবাসা আমাকে তোদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করার পথে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না!'
পরে অবশ্য তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তাদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণই করেছিলেন। পরবর্তীতে খাইবারের ইহুদিরা আবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। উমারের খিলাফতকালে তারা আবদুল্লাহ ইবন উমারকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে দুই হাত ভেঙে দেয়। এর আগে আল্লাহর রাসূলের যুগেই এক সাহাবিকে হত্যা করেছিল কিন্তু সেবার শক্ত প্রমাণ ছিল না। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবন উমারের সাথে তারা যা করেছিল সেটা ছিল সন্দেহাতীত। তাই উমার তাদেরকে আর সুযোগ দেননি, খাইবার থেকে বের করে দেন। এরপর তারা শামে চলে যায়।
খাইবার বিজয়ের মাধ্যমে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা বেশ সচল হয়। কারণ খাইবার থেকে মুসলিমরা বিপুল গনিমাহ অর্জন করে। আবদুল্লাহ ইবন উমারের একটি কথাতেই বোঝা যায় খাইবারের বিজয় তাদের জীবনে কতটা পরিবর্তন এনেছিল। তিনি বলেন, 'খাইবার বিজয়ের আগ পর্যন্ত আমাদের পেট ভরে এক বেলা খাওয়া হতো না।' মুহাজিররা খেজুর বাগানগুলো আনসারদের ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন। খাইবারের যখন পতন হচ্ছিল তখন ফাদাকের অধিবাসীরা আগেভাগেই আত্মসমর্পণ করে ফেলে। তাদের সাথেও অর্ধেক ফসল ভাগাভাগির চুক্তি হয়। তবে এই ফসলের মালিক হন কেবল আল্লাহর রাসূল কেননা, তাদের প্রাপ্ত সম্পদ ছিল ফাঈ, গনিমাহ নয়। কারণ ফাদাক সামরিক শক্তির জোরে বিজয় হয়নি। এর মাধ্যমে আল্লাহর রাসূলের আর্থিক অবস্থা সহজ হয়ে যায়।
খাইবারের সাথে আরও দুটি অঞ্চল বিজয় হয়। সেগুলো হলো ওয়াদী আল-কুরা এবং তাইমা। ওয়াদী আল-কুরার ইহুদিদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেই তাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং তারা আত্মসমর্পণ করে। তাদের সাথে খাইবারের অনুরূপ চুক্তি করা হয়। আর তাইমার অধিবাসীরা ফাদাকের মতো যুদ্ধ না করেই আত্মসমর্পণ করে।
মুসলিমদের হাতে খাইবার, ফাদাক, ওয়াদী আল-কুরা এবং তাইমার পতন নিয়ে গোটা আরব আলোচনায় মুখর হয়ে উঠলো। কুরাইশরা বিশ্বাসই করতে পারছিল না দুর্ভেদ্য দুর্গ, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা আর দীর্ঘকালীন রসদ সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও খাইবারের পতন হয়েছে। এই পরাজয়ের মাধ্যমে কুরাইশরা একটি বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকলো। আরব উপদ্বীপের দরজা ইসলামের জন্য আরও উন্মুক্ত হয়ে গেল।
টিকাঃ
৮৯. সীরাত ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৪।